Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৫

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৫

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৫
ইসরাত জাহান দ্যুতি

বছর থেকে আরও চারটি মাস চলে গেছে৷ চার মাসে ঘটেছে প্রতিটি মানুষের জীবনেরই বড়ো ছোটো পরিবর্তন।
সময় এখন বিকাল পাঁচটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট৷ চল্লিশ মিনিট আগে শেখ পরিবারের দুই জমজ ছেলে এসে ঢাকা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিল তাদের ছোটো ভাইয়ের জন্য। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরছে সেই ভাইটি।
ঘড়ির কাটা চল্লিশ মিনিটে পৌঁছতেই ইমিগ্রেশন পার করে আসতে দেখা যায় শেখ পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্র নাওফিল শেখকে৷ তাওসিফ মাথা নুইয়ে কপাল কুচকে বিরক্তি নিয়ে দীধিতির মেসেজের রিপ্লাই করছিল তখন। খেয়াল করেনি ভাইটা চলে এসেছে প্রায় তার কাছে। জীবনটা তাওসিফের আগে পানসে পানসে থাকলেও অন্তত কোনো মসিবত তো ছিল না। কিন্তু এখন তো প্রতিটি দিনই যায় ওর ছোটো ছোটো মিথ্যা দিয়ে আর মাথা ভর্তি চিন্তা নিয়ে। কবে যে এই মিথ্যা মিথ্যি খেলা বন্ধ করবে নাওফিল! বিড়বিড় করে দীধিতিকেও ক’টা কথা শোনাল। মেয়েটা বড্ড জেদী স্বভাবের। সহজ, স্বাভাবিক জীবনটাকে দিনেদিনে স্বেচ্ছায় জটিল করে ফেলছে। মানুষের তো আজীবনই সুখে থাকতে ভূতে কিলায়।

-‘গালি দিস না কি আমাকে? ডিলে তো করিনি। ঠিক টাইমেই তো আসলাম।’
তাওসিফ চমকিত হয়ে মাথা তুলে তাকাতেই একদম সফেদ পাজামা পাঞ্জামিতে নাওফিলকে দেখে বিহ্বল হয়ে গেল। সাতটি মাস পর আদরের ছোট্ট ভাইকে দেখছে৷ একটু স্বাস্থ্যটা বেড়েছে ওর, লম্বা মুখটা তাই গোল গোল লাগছে। কিন্তু ভাইটার এ জন্মে দাড়িটা আর হলো না। আহারে! অথচ নাওফিলের ছোটো থেকেই বহু জল্পনা কল্পনা ছিল দাড়ি-গোঁফ কী করে কেটেছেটে রাখবে সে।
জড়িয়ে ধরল দুজন দুজনকে। তাওসিফ ওর পিঠ চাপড়ে বলল, ‘দাদীর নক্ষত্ররাজের দিনমনি! একদম জ্বলজ্বল করছিস সূর্যের মতোই। তোর মনিমা কি ঘষেমেজে আরও চকচক করে দিয়েছে না কি তোকে? সব কিছু এত গ্লেস দিচ্ছে কেন? দেখি দাঁত দেখা তো ডায়মন্ডের মতো ঝিলিক দিচ্ছে না কি!’ বলেই ছেড়ে দিলো নাওফিলকে৷ ওর মুখের দিকে তাকাতেই নাওফিল দু পাটি দাঁত ‘ইইই’ করে দেখাল। হা হা শব্দে হেসে ফেলল তাওসিফ। হঠাৎ ওর পেছনে, এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে কাউকে খোঁজ করল নাওফিল, কিন্তু দেখতে পেল না। তাই জিজ্ঞেস করল, ‘অফিসার ইয়াসিফ শেখ কই? ও না আসতে চাইল আমাকে নিতে?’

-‘অফ ডিউটিতে ফুল ডিউটি করছে। বাইরে তো চল, গাড়িতে গেলেই দেখতে পাবি।’
নাওফিলের হাতে দুটো বড়ো বড়ো লাগেজ। একটা ওর হাত থেকে নিয়ে নিলো তাওসিফ। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে ঝাঁ চকচকে ল্যাম্বরগিনি হুরাকান ইভো দেখে চোখ কপালে উঠল নাওফিলের, ‘স্পোর্টস কার ঠেলার শখ হলো কার? তোর না পুলিশের?’
-‘এসব শখ আমার নাই৷ নিহাদ কিনেছে এক সপ্তাহ হলো।’
-‘ওর চাকরি একদিন যাবে দেখিস! বাড়ি থেকেও ধাওয়া খাবে যদি দাদা টের পান মোটা অঙ্কের ঘুষ খায় তার নাতি।’
-‘ও কী বলে জানিস? “দাদী তো তার ছোটো ছেলের জন্য রাত দিন কাঁদেন ছবি বুকে নিয়ে। তাই আমি ঠিক করেছি জায়িন মাহতাবকে ফুললি নিজের মাঝে ধারণ করব৷” চলনের ধরন ওর ছোটো কাকুর মতো! দাদী না কি ও হাই স্কুলে থাকতে বলেছিলেন একদিন। আবার সেদিনও না কি বলেছেন। ওই দিন থেকে ওর পাগলামো দেখে কে! এখন সে উঠতে বসতে, খেতে, ঘুমাতে, সব কিছুতেই বাসার লোককে বোঝায় ইয়াসিফ শেখ নিহাদ মানেই জায়িন মাহতাব নক্ষত্ররাজ।’

নাওফিল মুচকি হাসতে হাসতে এগিয়ে যায় গাড়ির দিকে। তাওসিফ ইয়াসিফ হয়ত দু’তিন মিনিটের ছোটো বড়ো। আর নাওফিল হবে ওদের ছ’মাসের ছোটো। বাংলাদেশে নাওফিলের স্থায়ী বাস শুরু হয় চার বছর বয়স থেকে। সেই থেকেই তাওসিফ আর ইয়াসিফ একে অপরকে যতটা না ভালোবাসত আর যত্ন করত, তার চেয়ে বেশি করত ওরা দু’জন মিলে নাওফিলকে। তবে এক সঙ্গে তিনজন যত বড়ো হতে লাগল তত ইয়াসিফ ওদের দুজন থেকে ব্যতিক্রম হতে থাকল। কেমন যেন একটা ধূর্ততা আর দুষ্টুমিভাব সব সময় ওর চোখে মুখে দেখা যেত বারো বছর বয়স থেকেই। প্রাণবন্ত হাসি দিয়েই সবার মন জয় করে নেওয়ার চমৎকার গুণ আছে ওর। কিন্তু তাওসিফ আর ইয়াসিফের চেহারায় পুরোপুরি মিল নেই৷ তাওসিফ দেখতে হয়েছে দাদীর মতো বেশি আর নাওফিল নিজের বাবা-মা মিলিয়ে। ওকে দেখলে কারও কাছে মনে হয় আয়মানের মতো৷ আবার কারও কাছে মনে হয় জায়িনের মতো৷ একটু নানুর বংশের সাথেও মিল রয়েছে ওর। কিন্তু একমাত্র ইয়াসিফ বাবা-চাচা মিলিয়ে দেখতে হয়েছে। মায়ের নাকটা আর হাত পায়ের আঙুলগুলো ছাড়া বিশেষ কোনো কিছুই সে পায়নি। তাই ইয়াসিফের চেহারাতেই সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে জায়িনের মুখের আদল। নাওফিল আসার আগ অবধি মাহতাব শেখ আর তার বেগমের কাছে বেশি আদর পেয়েছে তাই ইয়াসিফই৷

জানালায় এসে টোকা দিলো নাওফিল। গাড়ির ভেতরে কী চলছে তা বাইরে থেকে দেখা যায় না বলেই রক্ষা। ইয়াসিফ বের হওয়ার আগেই রূপসী এক মডেল দ্রুত গাড়ি থেকে বের হলো মুখে মাস্ক আর চোখে চশমা পরে। সে আগেপিছে কিছু না দেখে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে চলে ওপাশে। তাওসিফ চেয়ে দেখল তা। অবশেষে ইয়াসিফ দরজা খুলে বেরিয়ে এলো৷ পরনে আর্মি প্রিন্টেড ন্যারো মোবাইল প্যান্ট আর কালো রঙা পলো শার্ট৷ বাইরের রোদটা সরাসরি ওর উজ্জ্বল মুখটাতে এসে পড়লে রোদচশমাটা চোখে পরে নিলো৷ নাওফিল নিজের বাবার অসংখ্য ছবি দেখেছে। একটা সময় জায়িনও মোবাইল প্যান্ট পরত৷ এমনকি আয়মানও। কিন্তু তবুও বাবা-মা’কে স্মরণ করে নিজে কখনও সে ব্যবহার করেনি৷ ইয়াসিফকে এই বেশে দেখে এক পলকের জন্যও চোখের ভুল মনে করে জায়িন হবে একদম। নাওফিল হেসে তাকে জড়িয়ে ধরতে আসলেই হঠাৎ আবার পথিমধ্যে থেমে গেল৷ ওদিকে ইয়াসিফও হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ভাইকে বুকে নেওয়ার জন্য৷ কিন্তু মাঝপথে ব্রেক কষল কেন নাওফিল?

-‘কী হলো?’
নাওফিল ওর ঠোঁটের নিচে ইশারা করে বলল, ‘মানুষের ভালো জিনিস আমাদের টানে না৷ টানে শুধু বদ স্বভাবগুলো৷ কে বলেছে ছোটো চাচাকে আইকন মানতে? মানবিই যদি কেবল তা পেশার ক্ষেত্রে৷’
-‘কিন্তু চিহ্ন যেন না থাকে বলেই তো পায়েলকে লিপস্টিক পরে আসতে বারণ করেছিলাম।’ ঠোঁটের নিচে মুছে নিলো দ্রুত ইয়াসিফ।
তাওসিফ গাড়িতে বসে বলে, ‘মেয়ে মানুষ পথে বের হবে তাও লিপস্টিক ছাড়া? একমাত্র আমার স্পেশাল বউ দীধিতিকে দেখেছি প্রতিবার লিপস্টিক ছাড়া।’
ইয়াসিফের গালে আর গলাতেও লেগে আছে মডেল পায়েলের রেখে যাওয়া বিশেষ চিহ্ন৷ পকেট থেকে টিস্যুর প্যাকেটটা বের করে নাওফিল ইয়াসিফের হাতে দিয়ে বলল, ‘এটাকে লিপস্টিক বলে না, অফিসার৷ খাওয়ার সময় আঠালো কিছু বুঝিসনি? কী যেন বলে এটার নাম?’ বলেই ইশারায় আবার গাল আর গলা দেখিয়ে দিলো ইয়াসিফকে। তারপর গাড়িতে চড়ে বসল ও-ও।
ইয়াসিফ মুছতে মুছতে কিড়মিড়িয়ে বলল, ‘শয়তান মেয়েটা মনের ভুলেও আমার সামনে সাজগোজ না করে আসে না। খাওয়ার সময় তো একটু মিষ্টি মিষ্টি লেগেছিল বলেই মজা পেয়েছিলাম।’
সে সময়ই তাওসিফ উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, ‘মনে পড়েছে! ওটাকে লিপগ্লস বলে।’

-‘সুপারব! ইন্টেলিজেন্ট বয়! জীবনে চুমুচামা না খেলে কী! তাই বলে কি স্পেশাল ভিডিয়োও দেখিনি! তাই তো?’ ইয়াসিফ এসে ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে রগড় করে বলল তাওসিফকে।
তাওসিফ ঘনঘন মাথা নেড়েনেড়ে অস্বীকৃতি জানাল, ‘নেভার নেভার। আমি রোমান্টিক মুভি ছাড়া কিচ্ছু দেখিনি। নিজের দোষ আমার ঘাড়ে চাপাবি না কিন্তু।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৪

কথা শেষ হতেই আবার দীধিতির থেকে একটা মেসেজ আসে। তাওসিফ তখন এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের ফোনটা পেছন ঘুরে নাওফিলের কোলে ছুঁড়ে দেয়, ‘আজকে থেকে এই দায়িত্ব খতম আমার। আর পারব না।’
দীধিতি একরকম হুমকি বাণী লিখেছে, ‘চার মাস সময় প্রচুর সময়। এখনও যদি আপনার পরিবারকে আপনি না বোঝাতে পারেন তাহলে আর পারতেও হবে না। আমিই না হয় যে কোনোদিন এসে পড়ব! মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিন সেদিনটা সামলানোর।’
-‘বেচারির মা চার মাস আগের সেদিনটাতেই এখনও আটকে আছেন রে!’ আফসোসের সুরে সামনে থেকে বলল ইয়াসিফ।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here