Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৬

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৬

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৬
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎মুহূর্তের মধ্যেই ঘরের আবহাওয়া বদলে গেল। কয়েক ক্ষন আগেও ইখতিয়ারের চোখেমুখে ছিল একরাশ ঘোর, আর এখন তার মুখের ভাব এমন যেন কেউ পছন্দের খাবারের প্লেটের সামনে এসে হঠাৎ তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। বাইরে আবার ধুপধাপ শব্দ। আবার আওয়াজ এলো,
‎”সেভেন আপ! বেঁচে আছস নাকি?”
‎ইখতিয়ার দাঁত চেপে দরজার দিকে তাকাল।
‎তারপর দ্রুত মুগ্ধাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
‎”আমি ওয়াশরুমে যাই। তুমি শয়তানটারে দেখ।”

‎কথা শেষ করেই সে এমন গতিতে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল যেন ঘটনাস্থল থেকে কোনো আসামি পালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ কানে আসতেই মুগ্ধার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
‎অনেক কষ্টে হাসিটা চেপে রেখে দরজা খুলল সে।
‎দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ইশতিয়াক প্রায় হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
‎তার সরু চোখদুটো কৌতূহলে চকচক করছে। দেখে মনে হচ্ছে কোনো গোয়েন্দা বহুদিনের রহস্য উদঘাটনে নেমেছে। প্রথমে বিছানার দিকে তাকাল।
‎তারপর জানালার দিকে। তারপর আলমারি।
‎আবার বিছানা। সবশেষে মুগ্ধার দিকে।
‎মুগ্ধা বিরক্ত হয়ে বলল,
‎”কি খুঁজছিস?”
‎ইশতিয়াক উত্তর দিল না। আরও একটু চারপাশে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,

‎”কিছু একটা তো হচ্ছিল।”
‎”তোর মাথায় কিছু একটা হইছে।”
‎”না, আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলতেছে।”
‎মুগ্ধা চোখ উল্টে ফেলল। ইশতিয়াক এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
‎”তোর বর কই?”
‎মুগ্ধা ঝাঁঝালো স্বরে বলল,
‎”আমার বর কই জেনে তোর কাজ কি?”
‎ইশতিয়াক মশা তাড়ানোর মতো হাত নাড়ল।
‎”ধুর! রঙ টাইমে চলে আইলাম কিনা তাই?”
‎”ওয়াশরুমে, তোরে গালাগালি মাইনষে এমনি দেই?”
‎”না না দেবের মতো এমনি স্বভাবে দেয়রে।”
‎মাথা নেড়ে এমন একটা ভাব করল যেন রহস্যের অর্ধেক সমাধান হয়ে গেছে। মুগ্ধা বিরক্তিতে ফুঁসছে, কিন্তু ইশতিয়াকের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।
‎হঠাৎ সে বিষয় পাল্টে বলল,
‎”আচ্ছা সেভেন আপ, তোর ব্রাজিল যে মোরগের কাছে হাইরা গেছে দেখছোস?”
‎কথাটা শুনে মুগ্ধার বুক ধক করে উঠল।
‎আরে! আজ তো ভোরে খেলা ছিল!

‎এতসব ঘটনার ভিড়ে সে পুরোপুরি ভুলেই গিয়েছিল। দ্রুত ফোনটা হাতে নিয়ে স্কোর দেখতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড পরই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
‎মাথা তুলে ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে বলল,
‎”ড্র হইছে হারামি।”
‎ইশতিয়াক নির্বিকার। হাই তুলে বলল,
‎”ও আর হারার মধ্যে পার্থক্য কি?”
‎মুগ্ধা এমনভাবে তাকাল যেন সামনে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণীটা বসে আছে।
‎”পার্থক্য জানস না?”
‎”জিতে নাই তো।”
‎”তাই বলে হারছে?”
‎”আমার হিসাবে হারছে।”

‎চেয়ার টেনে বসে পড়ল ইশতিয়াক।পা নাচাতে নাচাতে এমন ভাব ধরল যেন ফুটবলের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সে নিজেই। মুগ্ধার রাগ ক্রমশ বাড়ছে।
‎”তুই ফুটবল বুঝস?”
‎”অনেক।”
‎” ব্রাজিলের খেলা দেখছোস?”
‎”না।”
‎”তাইলে?”
‎”স্কোর দেখছি, ব্রাজিলের খেলা দেখায় আমি আবার এলার্জি আছে।”
‎মুগ্ধা কপালে হাত দিল। ইশতিয়াক আবার শুরু করল,
‎”দেখ, জিতলে খুশি। না জিতলে দুঃখ। মাঝখানে ড্র বইলা কোনো জিনিস নাই।”
‎”তোর মাথাতেও কোনো জিনিস নাই।”
‎”এই জন্যই সত্য কথা কেউ শুনতে চায় না।”

‎দুজনের তর্ক চলতেই থাকল। একজন বলছে ড্র মানে ড্র। আরেকজন বলছে ড্র মানেই সম্মানজনক হার। শেষমেশ মুগ্ধার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
‎সে দরজার দিকে আঙুল তুলে বলল,
‎”দূর হ!”
‎ইশতিয়াক নিরীহ মুখ করে বলল,
‎”ক্যান?”
‎”তুই আমার ঘর থেকে বের হ।”
‎”আমি তো ভালো কথাই কইতেছি।”
‎”বের হ হতচ্ছাড়া!”
‎ইশতিয়াক উঠে দাঁড়াল। কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি। দরজার কাছে গিয়ে আবার ঘুরে তাকাল।
‎তারপর অর্থপূর্ণ গলায় বলল,
‎”আচ্ছা আচ্ছা যাইতেছি। তবে আমি আসার আগে যা চলতেছিল, চালাইয়া যাইস। খুব শিগগিরই তাহলে চাচা ডাক শুনতে পাব”
‎কথাটা বলেই সে দৌড় দিল।

‎”ইশতিয়াক!”
‎মুগ্ধার চিৎকার যেন করিডোর কাঁপিয়ে দিল।
‎দরজার বাইরে ভেসে এলো ইশতিয়াকের বিজয়ী হাসি। আর ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে মুগ্ধা রাগে, লজ্জায় আর হাসিতে একাকার হয়ে গেল।
‎ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এল ইখতিয়ার। ভেজা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে চারপাশে তাকাল সে।তারপর মুগ্ধার টকটকে লাল মুখ দেখে ভ্রু তুলল। মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল। আর ইখতিয়ার সব না বুঝলেও এটুকু বুঝল—
‎ইশতিয়াক নামক ঘূর্ণিঝড়টা আবারও এই ঘরের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। নিজেও আনমনে হেসে উঠল।

‎শেখ বাড়ির ড্রয়িংরুম আজ যেন ছোটখাটো এক আনন্দমেলার আসর। শুক্রবার সকাল বলে কারও তেমন তাড়া নেই। জানালার ফাঁক গলে আসা রোদের নরম আলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে গরম চায়ের সুবাস, সঙ্গে রান্নাঘর থেকে আসা নাশতার ঘ্রাণ। পুরো পরিবেশটায় এমন এক আরাম মিশে আছে, যেন ব্যস্ত পৃথিবী আজ একটু থেমে বিশ্রাম নিচ্ছে।
‎সোফায় বসে আছেন ইসরায়েল শেখ। হাতে চায়ের কাপ। মুখে প্রশান্তির ছাপ। সকাল থেকে এই দিয়ে তিন কাপ চা নিলেন তিনি । পাশেই ইসরাফিল পত্রিকা হাতে বসে আছেন। যদিও পত্রিকার চেয়ে আশপাশের মানুষের কথাবার্তিতেই তার আগ্রহ বেশি।
‎রাফেয়া বেগম ইন্তিয়ার সঙ্গে গল্প করছেন।
‎রহিমা বেগম তসবির দানা গুনছেন। তবে মুখের কোণের চাপা হাসিটা দেখে বোঝা যাচ্ছে, চারপাশের সব খবরই তার কানে যাচ্ছে। আর ইশতিয়াক?
‎সে একপাশে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে তার মাথার ভেতর কোনো দুষ্টু পরিকল্পনা পাকাপাকি রূপ নিচ্ছে।ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল মুগ্ধা।
‎লাল শাড়িতে তাকে আজ বেশ উজ্জ্বল লাগছে।
‎সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই ইশতিয়াকের চোখ চকচক করে উঠল। সে গলা খাঁকারি দিল।

‎”আসসালামু আলাইকুম সেভেন আপ।”
‎মুগ্ধা চোখ কুঁচকে তাকাল।
‎”সকাল সকাল শুরু করিস না বা’ল।”
‎ইশতিয়াক বুকে হাত দিয়ে আহত মানুষের অভিনয় করল। যেন কত কষ্ট পেয়েছে সে।
‎”দেখছো? মানুষ কত ভালোবেসে কথা কয়, আর উনি রাগ দেখান।”
‎মুগ্ধা এবার সত্যি সত্যি চোখ রাঙাল।
‎”তোরে আমি একদিন—”
‎”কি করবা?”
‎ইশতিয়াক আগ্রহ নিয়ে সামনে ঝুঁকল । মুগ্ধা দাঁত চেপে বলল,
‎”একদিন হাতে পাইলে বুঝবি।”
‎ইশতিয়াক সঙ্গে সঙ্গে সোফার পেছনে সরে গেল।
‎”আব্বু! দেখ! তোমার বড় ছেলের বউ আমাকে হুমকি দিতেছে! বিচার কর”

‎ড্রয়িংরুমে হাসির রোল উঠল।মুগ্ধা বিরক্তিতে ফুঁসতে লাগল। শেষমেশ আর না পেরে সরাসরি ইসরায়েল শেখের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
‎”আব্বু, আপনার ছেলেরে আমি একদিন মেরে ফেলমু।”
‎কথাটা বলেই সে হাঁফ ছাড়ল।কিন্তু পরের মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
‎ইসরায়েল শেখ চায়ের কাপ নামিয়ে তাকালেন।
‎ইসরাফিলও পত্রিকা নামিয়ে দিলেন। রাফেয়া বেগম ভুরু তুললেন। এমনকি রহিমা বেগমও তসবির দানা থামিয়ে তাকালেন।
‎মুগ্ধা প্রথমে কিছু বুঝতে পারল না।তারপর হঠাৎ উপলব্ধি হলো। এই বাড়িতে “আপনার ছেলে” বলতে তো সবাই ইখতিয়ারকেই আগে বুঝবে!মুহূর্তেই তার চোখ কপালে উঠল।ইসরাফিল বিস্মিত গলায় বললেন,
‎”ইখতিয়াররে কেন মাইরা ফেলবা আম্মা?”
‎মুগ্ধা প্রায় লাফিয়ে উঠল।

‎”হায় আল্লাহ!”
‎জিভ কেটে দ্রুত মাথা নাড়ল।
‎”উনারে না!”
‎তারপর আঙুল তুলে ইশতিয়াককে দেখাল।
‎”এই বাদরটারে!”
‎ পুরো ড্রয়িংরুম একসঙ্গে হেসে উঠল। এমনকি ইসরায়েল শেখের মুখেও হাসি ফুটে উঠল। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
‎”ও আচ্ছা, তাইলে ঠিক আছে।”
‎আবারও হাসির ঝড় উঠল। ইশতিয়াক বুক চাপড়ে নাটক শুরু করল।
‎”দেখছো! আমার নিজের আব্বুও আমারে বাঁচাইতে চায় না!”
‎ইসরায়েল শেখ শান্ত গলায় বললেন,
‎”তোমারে বাঁচাইতে গেলে আগে তোমার অপরাধ কমাইতে হইবো আব্বা।”
‎ইসরাফিল সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন,
‎”ওর অপরাধের তালিকা লিখতে গেলে তিন খণ্ড বই লাগবো।”
‎ইশতিয়াক হতাশ মুখে মাথা নাড়ল। বেচারা মুখচ্ছবি। নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
‎”এই বাড়িতে আমি একা।”
‎”তুমি একা না তো আব্বু, “তোমার বদ বুদ্ধিগুলো ওতো তোমার সঙ্গে আছে।”
‎ইসরাফিল কৌতুক করে বললেন। আবারও হাসির রোল ফেটে পড়ল। মুগ্ধা এবার সুযোগ পেয়ে গেল।
‎সে বিজয়ীর মতো বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।আজ তার দলে লোকসংখ্যা বেশি। ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে মজা নিতে ভুলল না মুগ্ধা।

‎ইশতিয়াক চারপাশে তাকাল।
‎একজনও তার পক্ষে নেই। মুখটা এমন হয়ে গেল যেন পরীক্ষার হলে গিয়ে বুঝেছে ভুল সিলেবাস পড়ে এসেছে। হঠাৎ সে আঙুল তুলে ঘোষণা দিল,
‎”ঠিক আছে। হাসেন সবাই। কিন্তু আমি একদিন হুট কইরা বিয়া কইরা আনমু,আমারও দল লাগবো।”
‎ইশতিয়াকের বাচ্চামি দেখে ইসরাফিল হেসে ফেললেন। রাফেয়া বেগমও মুখ চেপে হাসলেন।
‎ইশতিয়াক আরও উৎসাহ পেয়ে বলল,
‎”আমার বউ আইসা আমার পক্ষ নিবো। তখন বুঝামু, ঝগড়া কাকে বলে,কোমড় বেঁধে লাগব দুইজনে।”
‎ইসরায়েল শেখ চায়ে চুমুক দিয়ে শান্তভাবে বললেন,
‎”তুমি হুট কইরা বিয়া কইরা আনবা?”
‎”হ।”
‎”তাইলে তুমিও হুট কইরা দেখবা তোমার নামে থাকা সম্পত্তি সব অনাথ আশ্রমে দান হইয়া গেছে।”
‎চুমুক দেওয়ার মতো স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথাটা বলে ফেললেন তিনি। কিন্তু কথার প্রভাব হলো বজ্রপাতের মতো। ইশতিয়াকের মুখ হাঁ হয়ে গেল।
‎চোখ গোল। পলক পড়ছে না। যেন তার সামনে কেউ পৃথিবী ধ্বংসের খবর ঘোষণা করেছে।

‎”কি?”
‎ইসরায়েল শেখ মাথা নাড়লেন।
‎”একদম।”
‎ইশতিয়াক এবার সত্যি সত্যি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তার মুখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সদ্য বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছে ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে ইন্তিয়া বেগমের গলা ভেসে এলো।
‎”শুধু সম্পত্তি না।”
‎সবাই তাকাল। ইন্তিয়া বেগম হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন। মুখে দুষ্টু হাসি।
‎”তোমার ঘরে গিয়াও দেখবা তোমার জিনিসপত্র নাই।”
‎ইশতিয়াক হতভম্ব। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
‎”কই যাবে?”
‎”ফালাইয়া দিমু, ওখানে আমি হাস-মুরগি পালব।”
‎পুরো ড্রয়িংরুম কেঁপে উঠল হাসিতে। ইশতিয়াক বুক চেপে ধরল। মনে হলো হৃদয়ে কেউ ছুরি মেরেছে।
‎”আম্মু! আমি তোমার পেটের সন্তান! কুড়ায় পাওনি তো?”
‎”কুড়াই পাইলে ব্রান্ডের জিনিস আনতাম।”

‎আরেক দফা হাসি চলল।ইশতিয়াক এবার নাটকীয় ভঙ্গিতে সোফায় বসে পড়ল। এক হাত কপালে।
‎আরেক হাত বুকে।
‎”আমি কি এতিম।”
‎ইসরাফিল বললেন,
‎”এতিম না। অতিষ্ঠ।”
‎”চাচ্চু!”
‎”সত্য কথা।”
‎ইশতিয়াক এবার মাথা উঁচু করে ছাদের দিকে তাকাল। তার চেহারায় এমন বেদনা, যেন পুরো পৃথিবী তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। আর সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধা খিলখিল করে হেসে উঠল।
‎আজ অনেকদিন পর তার হাসিটা এত নির্ভার।
‎আর সেই হাসির শব্দে শেখ বাড়ির সকালের আনন্দ যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। হাসির ঢেউ একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়ল— ঠিক পুকুরে ছুঁড়ে দেওয়া ছোট্ট পাথরের ঢেউয়ের মতো।

‎সকালের কোলাহল, ড্রয়িংরুমের হাসাহাসি, ইশতিয়াকের নাটক— সবকিছু থেকে খানিকটা দূরে এসে অবশেষে একটু শান্তি পেল ইখতিয়ার।
‎ঘরটা অদ্ভুত নীরব।
‎জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পর্দাটা হালকা বাতাসে দুলছে। সকালের রোদ বিছানার এক কোণে এসে পড়েছে। সেই আলোয় ধুলোকণাগুলোও যেন অলস ভঙ্গিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। ইখতিয়ার আলমারির দরজা বন্ধ করল।
‎তারপর বিছানার কিনারায় বসে পড়ল। মুখে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।

‎একটা মানুষকে বছরের পর বছর কাছে রেখেও কখনো কখনো নতুন করে চিনতে হয়। মুগ্ধাকে এখন তার ঠিক তেমনই লাগছে। যেন বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা একটা জানালা হঠাৎ খুলে গেছে।
‎আর ভেতরে জমে থাকা আলো একসঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। মনে হতেই ইখতিয়ারের ঠোঁটের কোণের হাসিটা একটু গাঢ় হলো। ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল।
‎স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।

‎আরহাম।
‎নামটা দেখেই বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেল।
‎এই মানুষটার ফোন মানেই শান্তি নষ্ট হওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কল রিসিভ করল সে।
‎”কি?”
‎ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ভেসে এলো চাপা হাসি। সেই হাসি শুনেই ইখতিয়ারের মাথায় বিপদ সংকেত জ্বলে উঠল।
‎এই হাসি কখনোই ভালো কিছুর পূর্বাভাস দেয় না।
‎আরহাম গম্ভীর গলায় বলল,
‎”ভাবিরে ডিভোর্স কবে দিচ্ছিস?”
‎ইখতিয়ারের মুখের সমস্ত রঙ উধাও হয়ে গেল।
‎তারপর পরের মুহূর্তেই আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হলো।
‎”মাথা খারাপ হইছে তোর ?”
‎ওপাশে আরহামের হাসি আরও বেড়ে গেল।
‎”না, সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করতেছি।”
‎”ক্যান?”
‎”বাড়ি থেকে বিয়ার জন্য চাপ দিতেছে তো।”

‎ইখতিয়ার চোখ বন্ধ করল। বুক ভরে শ্বাস নিল।
‎নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু আরহাম থামার ছেলে নয়।
‎”তুই যদি ডিভোর্স দিস, আমি লাইনে দাঁড়ায়া আছি।”
‎ইখতিয়ারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
‎”আরহাম।”
‎”হুম?”
‎”চুপ কর।”
‎”ক্যান?”
‎”কারণ আমি এখন জেলে যেতে চাই না। চুপ যা”
‎ওপাশে হাসির শব্দ। হাসির শব্দটা এমন নির্লজ্জ যে মনে হচ্ছে মানুষটা ফোনের ওপাশে বসে পপকর্ন খেতে খেতে সিনেমা দেখছে। আরহাম আবার শুরু করল,
‎”আরে ভাই, আমি তো তোর উপকারই করতেছি।”
‎”কি উপকার?”
‎”ভাবিরে খুশিতে রাখমু।”
‎ইখতিয়ারের হাত মুঠো হয়ে গেল। কপালের রগ ফুলে উঠল।
‎”তুই এখন কোথায়?”
‎”ক্যান?”
‎”লোকেশন পাঠা।”
‎”মারবি?”
‎”না।”
‎”তাইলে?”

‎”গিয়া দেখে আসব আশেপাশে ক’বর দেওয়া যায় কিনা।”
‎ওপাশে এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠল আরহাম।
‎হাসতে হাসতে তার প্রায় দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা।
‎ইখতিয়ার বিরক্তিতে ফোনটা দূরে সরিয়ে রাখল।
‎এই ছেলেটাকে সে বহু বছর ধরে চেনে। তবুও মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণীটার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
‎আরহাম হাসি থামিয়ে আবার বলল,
‎”আচ্ছা, সত্যি কই। ভাবির লগে সব ঠিকঠাক?”
‎ইখতিয়ার ভ্রু কুঁচকাল।
‎”তোর জানার দরকার?”
‎”অবশ্যই।”
‎”ক্যান?”
‎”আমি তো বন্ধু।”
‎”তুই বন্ধু না, দুর্যোগ।”
‎”ধন্যবাদ।”
‎”এইটা প্রশংসা না।”
‎”তাও ধন্যবাদ।”
‎ইখতিয়ার মাথা চেপে ধরল। কিছু মানুষ থাকে যাদের সঙ্গে তর্ক করা মানে চলন্ত ট্রেনকে ধাক্কা দিয়ে থামানোর চেষ্টা করা।
‎আরহাম ঠিক সেই শ্রেণির মানুষ।
‎হঠাৎ ওপাশ থেকে আবার প্রশ্ন এলো,

‎”আচ্ছা, ভাবি কি…?”
‎ইখতিয়ারের চোখ সরু হয়ে গেল। সে বুঝে গেছে । নিজেকে শান্ত করে বলবে,
‎”তুই আবার বাড়ি আসবি না।”
‎”ক্যান?”
‎”একদম আসবি না।”
‎”আরে!”
‎”মুগ্ধার সামনে তো একদমই না।”
‎কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে এমন একটা কড়া সুর ফুটে উঠল যে, অন্য কেউ হলে হয়তো ভয় পেয়ে যেত। কিংবা রাগ করতো। কিন্তু আরহাম?
‎সে আবারও হাসল।
‎”ওহ!”
‎একটা দীর্ঘ শব্দ বের করল সে।
‎”অবস্থা তাইলে এতদূর গড়াইছে?”
‎”চুপ কর।”
‎”লজ্জা পাইছিস?”
‎”আরহাম!”
‎”আচ্ছা আচ্ছা।”

‎ওপাশে আবার চাপা হাসি। ইখতিয়ার ফোন কেটে দেওয়ার কথা ভাবল। কিন্তু ঠিক তখনই আরহামের কণ্ঠটা একটু বদলে গেল। ফাজলামির সুরটা কমে এলো।
‎”আচ্ছা বাদ দে। একটা কাজের কথা বলি।”
‎ইখতিয়ার সন্দেহের চোখে ফোনের দিকে তাকাল।
‎এই মানুষের মুখে “কাজের কথা” শুনতে যতটা অস্বাভাবিক, মরুভূমিতে পেঙ্গুইন দেখা তার চেয়েও বেশি অস্বাভাবিক।
‎”কি?”
‎”আজ তোর ডেট আছে মনে আছে তো?”
‎ইখতিয়ার কপাল কুঁচকাল। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল। আজকের তারিখ। আজকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট। আরহাম বলল,
‎”সিরিয়াল দেওয়া আছে।”
‎”হুম।”
‎”ডাক্তার কিন্তু তোর জন্য বসে থাকবে না।”

‎ইখতিয়ার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই কয়দিন এত কিছু ঘটেছে যে বিষয়টা মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল।
‎আরহাম এবার স্বাভাবিক গলায় বলল,
‎”দ্রুত আয়।”
‎একটু থেমে আবার যোগ করল,
‎”আর শোন।”
‎”কি?”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৫

‎”ভাবিরে ডিভোর্স দিলে বলিস।”
‎ইখতিয়ারের চোখ বন্ধ হয়ে গেল। বিচ্ছিরি এক গালি দিতে চাইল। কিন্তু তার আগেই ফোন কেটে দিল আরহাম। আরহাম কি আর জানে না এখন ইখতিয়ার তাকে কি বলতে পারে? ঠিক জানে। সামনে পাইলে জ্যান্ত পুঁ’তে দিত।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here