ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৮
রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি
দুপুরটা আজ যেন অশুভ । অন্তত শেখবাড়ির জন্য তো। রোদ আছে, কিন্তু উজ্জ্বলতা নেই। পুরো বাড়িটা অদ্ভুত নীরব। যেন কেউ বাড়িটার বুক থেকে সমস্ত শব্দ কেড়ে নিয়েছে।
গেট খুলে ভেতরে ঢুকল ইখতিয়ার। তার হাঁটার গতি দ্রুত। বুকের ভেতরটা কেমন অস্বস্তিতে মোচড়াচ্ছে। ফোনের ওপাশে মুগ্ধার সেই কান্নাভেজা গলা শোনার পর থেকে মনের ভেতর একটা অজানা ভয় বাসা বেঁধেছে।
ড্রয়িংরুম ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। এই বাড়িতে এত নীরবতা সাধারণত থাকে না। ইশতিয়াক থাকলে তো নয়ই। ছেলেটার হাসি, চিৎকার, অকারণ বকবকানি যেন সবসময় বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে ঘুরে বেড়ায়।
আজ কিছুই নেই। শুধুই শূন্যতা ঘিরে যেন চারিদিকে। ইখতিয়ারের বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। সে প্রায় দৌড়ে নিজের ঘরের দিকে গেল।
দরজা খুলতেই দেখল, বিছানার ওপর বসে আছে মুগ্ধা। মেয়েটার অবস্থা দেখে তার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। চোখদুটো কান্নায় ফুলে গেছে।
নাক লাল। চুল এলোমেলো। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে একা একা কেঁদেছে।
ইখতিয়ারকে দেখামাত্রই সে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে এলো। একদৌড়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দুই চোখ বেয়ে আবার পানি গড়িয়ে পড়ল।
”ইখতিয়ার…”
স্বরটা এমন ছিল, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত ভয় এক শব্দে বেরিয়ে এসেছে। ইখতিয়ারের বুক কেঁপে উঠল।
”কী হইছে?”
মুগ্ধা মাথা নাড়ল। কথা বলার চেষ্টা করল। পারল না। আবার কেঁদে ফেলল। থেমে থেমে বলল,
”ইশতিয়াকের… এক্সিডেন্ট হইছে…”
কথাটা শুনে ইখতিয়ারের শরীর অবশ হয়ে গেল।মনে হলো কেউ তার বুকের মাঝখানে মুষ্টি মেরে আঘাত করেছে। ইশতিয়াক? তার ছোট ভাই।
যে ছেলেটাকে ছোটবেলা থেকে বকেছে, শাসন করেছে, আগলে রেখেছে। যে ছেলেটা আজও কোনো বিপদে পড়লে প্রথমে “ভাইয়া” বলে ডাকে।
সকালে বের হওয়ার সময়ও তো হাসছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কী হয়ে গেল?
”কোথায়?”
গলাটা নিজের কাছেই অপরিচিত শোনাল ইখতিয়ারের। মুগ্ধা কান্না জড়ানো গলায় বলল,
” সবাই চলে গেছে… আমাকে নেয় নাই…”
তার অভিমানী চোখদুটো আবারও ভিজে উঠল।
”কেউ কিছু বলে নাই… আমি পরে দাদির কাছে শুনছি…”
ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে বারংবার। চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে সেখানে।
”কোথায় নিয়া গেছে?”
”সিটি হসপিটাল…”
”চোট কেমন?”
”শুনছি পায়ে অনেক চোট পাইছে…”
মুগ্ধা ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকে রাখতে চাইল।
পারল না। ইখতিয়ারের বুকের ভেতরকার সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তের জন্য ভেঙে পড়তে চাইল।যদি কিছু হয়ে যায়? যদি ছেলেটা খুব বেশি আঘাত পেয়ে থাকে? দি…
এখন এসব ভাবা যাবে না। ধীরে ধীরে সে দুই হাতে মুগ্ধার মুখটা তুলে ধরল। মেয়েটার চোখদুটো ভিজে। সেখানে ভয় জমে আছে। একটা শিশুর মতো অসহায় ভয়। ইখতিয়ার নিজের কষ্টটাকে বুকের গভীরে ঠেলে দিল। খুব আস্তে বলল,
” এইদিকে তাকাও।”
মুগ্ধা তাকাল।
” ইশতিয়াক কিছু হইবো না। এত কাঁদতে আছে?”
” কিন্তু…”
”কিছু হইবো না।”
এবার গলাটা একটু শক্ত করল সে।যেন মুগ্ধাকে নয়, নিজেকেই বোঝাচ্ছে।
”ও অনেক শক্ত ছেলে।”
মুগ্ধা ফুঁপিয়ে উঠল।মেয়েটার মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিল ইখতিয়ার। মুগ্ধা শিশুর মতো আঁকড়ে ধরল তাকে। সেই মুহূর্তে ইখতিয়ার বুঝল—
মুগ্ধা শুধু ইশতিয়াকের জন্য কাঁদছে না।সে ভয় পেয়েছে বিস্তর। তার আপন মানুষদের হারানোর ভয়। আর ইখতিয়ার?
দাঁড়িয়ে আছে দুই দিকের ঝড়ের মাঝে।
একদিকে বুকফাটা দুশ্চিন্তা তার ভাইয়ের জন্য।
অন্যদিকে তার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকা মেয়েটা।মুগ্ধার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সে চোখ বন্ধ করল। মনে মনে শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া চাইল।
সিটি হসপিটালের তৃতীয় তলার করিডোরটা আজ যেন অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে আছে। সাদা দেয়াল, সাদা আলো, সাদা পোশাকের নার্স—সবকিছুই কেমন নিষ্প্রাণ লাগছে। অথচ এই করিডোরেই এখন শেখ পরিবারের প্রতিটা মানুষের হৃদস্পন্দন আটকে আছে।
কেউ চেয়ারে বসে আছেন, কেউ অস্থির পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। কারও মুখে কথা নেই। শুধু চোখে চোখে উৎকণ্ঠা। মনে হচ্ছে সবাই একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—ইশতিয়াক কেমন আছে? রমের দরজাটা বন্ধ। ভেতরে ডাক্তাররা আছেন।
সময়টা যেন জেদ ধরে বসেছে। এগোচ্ছেই না। দেয়ালের ঘড়ির কাঁটাও আজ বড় নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। তখনই করিডোরে এসে পৌঁছালো ইখতিয়ার আর মুগ্ধা। সবাই একসাথে তাকালো তাদের দিকে।
মুগ্ধার অবস্থা দেখে রাফেয়া বেগমের বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। মুখ শুকিয়ে গেছে।
যেই মেয়েটা সারাক্ষণ ইশতিয়াকের সাথে খুনসুটি আর ঝগড়া করে, সেই তাকে দেখে আজ কেউ বলবে না তাদের এক মুহূর্তও মেলে না।
কছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো ভালোবাসার ভাষায় প্রকাশ পায় না। প্রকাশ পায় অনুভূতিতে।
ইখতিয়ার দ্রুত এগিয়ে গেল ইসরায়েলের কাছে।
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে তার। মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করল,
“কী হইছে?”
ইসরায়েল দীর্ঘশ্বাস ফেলে সব বলল। কিভাবে দুর্ঘটনাটা হয়েছে, কতটা রক্ত পড়েছে, কিভাবে হাসপাতালে আনা হয়েছে—সব।
কথাগুলো শুনতে শুনতে ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল।
এদিকে ইন্তিয়া বেগম আবার ফুঁপিয়ে উঠলেন।
রাফেয়া বেগম তাকে সামলানোর চেষ্টা করছেন।
এখন তাদের পাশে বসে মুগ্ধাও কাঁদছে।
চোখের পানি মুছছে, আবার গড়িয়ে পড়ছে।
ইখতিয়ার কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কাউকে কিছু বুঝতে দিল না।
শুধু মুগ্ধার পাশে দাঁড়িয়ে তার হাতটা নিজের মুঠোর ভেতর নিয়ে নিল। শক্ত করে। মুগ্ধা চমকে তাকালো। ইখতিয়ার কিছু বলল না। তবু সেই স্পর্শে যেন হাজারটা সান্ত্বনা লুকিয়ে ছিল। মুগ্ধার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো ধীরে ধীরে স্থির হয়ে এলো।
যেন উত্তাল নদী হঠাৎ কোনো শক্ত পাড় খুঁজে পেয়েছে।
রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার। মুহূর্তের মধ্যে সবাই উঠে দাঁড়াল। করিডোরের বাতাস পর্যন্ত যেন থেমে গেল। ডাক্তার মাস্ক নামিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
”এখন চিন্তার কিছু নেই। রোগী ভালো আছে। আপনারা দেখা করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, বেশি উত্তেজিত হয়ে নড়ে ওঠে না যেন।”
কথাগুলো শোনার পর সবার বুক থেকে যেন একসাথে একটা ভার নেমে গেল। আলহামদুলিল্লাহ।
শব্দটা কারও মুখে উচ্চারিত হলো, কারও চোখে।
এক এক করে সবাই ভেতরে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। শুধু মুগ্ধা একটু পেছনে দাঁড়িয়ে রইল।
আঁচল দিয়ে চোখের কোণের পানি মুছে নিল।
গভীর একটা শ্বাস নিল। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। কারণ সে চায় না, ইশতিয়াক তাকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখুক। তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়াল। হৃদপিণ্ডটা তখনও কাঁপছে।
বুকের ভেতর একটা ভীত পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে বারবার।
রুমে ঢুকেই সবাই কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল।
ইশতিয়াক দিব্যি বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। মাথার নিচে দুটো বালিশ। বাম পা-টা উঁচু করে রাখা, হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত মোটা ব্যান্ডেজ। দশটা সেলাই লেগেছে। এক হাতে ক্যানোলা, আর অন্য হাতে অর্ধেক খাওয়া আপেল।
অথচ ছেলেটার মুখে এমন ভাব, যেন হাসপাতালে নয়, পিকনিকে এসেছে।
সবাই একবার তার মুখের দিকে তাকায়, আরেকবার পায়ের দিকে। কারো চোখে স্বস্তি, তো কারো চোখে রাগ।
”তুই একদিন আমাদের হার্ট অ্যাটাক করাবি,” ইন্তিয়া বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন। চোখেমুখে স্বস্তির দেখা।
”আমি তো নিজেই প্রায় হার্ট অ্যাটাক খাইছিলাম, আম্মু,”
আপেলে কামড় বসিয়ে উত্তর দিল ইশতিয়াক।
চাপা হাসি পড়ে গেল সবার মুখে। সবাই খোঁজখবর নিল, কেউ বকল, কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কিন্তু ইশতিয়াকের চোখ হঠাৎ আটকে রইল এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মুগ্ধার উপর।
মেয়েটা একদম চুপ। ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকে ডাকল,
“এই ভাবি জান”
“কী?”
”সবাই কাঁদল। তুই তো কাঁদলি না। আমার জন্য একটু কান্দ না ভাই! দেখি”
“বয়েই গেছে।”
” আহারে! কী পাষাণ নারী!”
রুমে আবার হাসির ঢেউ উঠল। ইশতিয়াক আবার বলল,
“আমি মৃত্যুর মুখ থেইকা ফিরা আসছি, আর তুই মজা লইতেছিস?”
”তো তোরে ট্রাকের সায়ে গিয়ে ঢঙ মারতে আমি বলেছিলাম?”
” ভাইয়া, দেখ! এই মাইয়া আমারে একটুও সম্মান করে না। এরে ফেরত দিয়ে আমার জন্য নতুন ভাবি নিয়ে আসো”
ইখতিয়ার ঠোঁট চেপে হাসল। মুগ্ধার চোখে তখনও শুকিয়ে না যাওয়া কান্নার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু সে মুখে কিছুই প্রকাশ করল না। ডাক্তার একদিন হাসপাতালে থাকতে বলেছেন। তাই সবাই বিকেলে আবার আসবে বলে বের হতে লাগল।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ডাক দিল ইশতিয়াক,
” এই ভাবি! আমারে একটু মিস করিস,হ্যাঁ?”
“অকাল পড়েছে তো আমার ”
”একটু?”
” পারতাম না।”
”ভাইয়ারে আমি আবার বিয়ে দিয়ে নতুন ভাবি আনব”
মুগ্ধা চোখ ছোট করে তার ব্যান্ডেজ করা পায়ের দিকে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
”পায়ের দিকে তাকা। বেশি কিছু বললে পা বরাবর ঘুষি মাইরা পা হাতে ধরায়া দিব।”
মুহূর্তেই ঘরে আবার হাসির ফোয়ারা উঠলো। ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল।
সবাই বেরিয়ে যেতেই রুমটা কেমন যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে মানুষের কণ্ঠস্বর, হাসাহাসি আর ব্যস্ততার শব্দ ছিল, সেখানে এখন শুধু এসির মৃদু আওয়াজ আর মনিটরের ক্ষীণ বিপ-বিপ শব্দ ভেসে আসছে। নিস্তব্ধতাটা যেন ধীরে ধীরে পুরো কেবিনটাকে গিলে ফেলছে।
ইশতিয়াক হাতের আপেলটা আস্তে করে পাশে রেখে দিল। মুখের হাসিটাও মিলিয়ে গেল। চোখ নামল নিজের পায়ের দিকে। সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো পা-টা যেন তার শরীরেরই অংশ নয়। হাঁটুর নিচ থেকে কোনো অনুভূতি পাচ্ছে না। অথচ অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছে পুরো শরীর আগুনে পুড়ছে।
ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল সে। অমনি সেই দৃশ্যটা ফিরে এলো।
রাস্তার মোড়। বিকট হর্ন। হঠাৎ সামনে চলে আসা ট্রাক। ব্রেক কষার শব্দ। আর মৃত্যুর ঠান্ডা ছায়া।
বুকটা ধক করে উঠল। আজ যদি একটু এদিক-সেদিক হতো? আজ যদি আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে না দিতেন? ভাবতেই শরীর কেঁপে উঠল।
ঠোঁট নড়ল নিঃশব্দে।
আলহামদুলিল্লাহ…”
চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
কষ্টে নয়। বেঁচে যাওয়ার বিস্ময়ে হয়তো।
প্রায় মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে আসা মানুষদের চোখে এমন জল আসে। সেই জলের কোনো নাম হয় না। চোখ বন্ধ রেখেই শুয়ে ছিল ইশতিয়াক।
হঠাৎ মিনিট দশেক পর ক্ষীণ একটা ফোঁপানির শব্দ কানে এলো। এখন আবার কাঁদে কে?তড়াক করে চোখ খুলল সে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে স্নিগ্ধা। কাঁধে এখনো কলেজের ব্যাগ। চোখদুটো টলমল করছে। মুখ লাল হয়ে গেছে কান্নায়।
যেন ছুটতে ছুটতে এসেছে।
এইমাত্র খবর পেয়েছে সে। তার এক বন্ধু বলেছে। খবর পাওয়ার পর এক মুহূর্তও দেরি করেনি।
অমনি এক নার্স ভেতরে ঢুকে স্নিগ্ধাকে বের করে দিতে চাইল। ভিজিটিং আওয়ার শেষ। নিয়ম মানতে হবে। স্নিগ্ধা অসহায় দৃষ্টিতে ইশতিয়াকের পানে তাকিয়ে। কিন্তু ইশতিয়াক ধীর গলায় বলল,
” আপু, প্লিজ। বিশ মিনিট।”
নার্স একবার স্নিগ্ধার দিকে তাকাল। একবার ইশতিয়াকের দিকে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।
” ঠিক আছে। কোনো সমস্যা হলে ডাক দিবেন। আমি বাইরে আছি”
দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল সে। স্নিগ্ধা তখনো দাঁড়িয়ে। মাথা নিচু তার।
কাঁধ কাঁপছে। ইশতিয়াক মৃদু হাসল।
সে হাসিতে ব্যথা আছে, মায়া আছে, ভালোবাসা আছে।
”এইদিকে আসবা না?”
স্নিগ্ধা মাথা তুলল। চোখ ভরা পানি।
”কি হইছে? এত দূরে দাঁড়ায়া আছো কেন? আসো মেরি জান”
মেয়েটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। চেয়ার টেনে বসল বিছানার পাশে। বসতেই চোখ চলে গেল ইশতিয়াকের পায়ের দিকে।
ব্যাস।
আটকে রাখা কান্নাটা ভেঙে গেল।
হেঁচকি তুলে কেঁদে উঠল সে। কান্না শুনে ইশতিয়াকের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের ব্যথার জন্য না। এই মেয়েটার জন্য। এক হাত নাড়ার ক্ষমতা ছিল। সেই হাতটা বাড়িয়ে দিল।
আস্তে করে ছুঁয়ে দিল স্নিগ্ধার গাল।
”আরে , কাঁদো কেন? মরিনি তো”
স্নিগ্ধার কান্নার বেগ বাড়ল। কান্নার মাঝেই স্নিগ্ধা বলল,
“খুব কষ্ট হচ্ছে?”
ইশতিয়াক হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
” না।”
” মিথ্যা।”
” আচ্ছা একটু হচ্ছে।”
” আমার জন্য হইছে। আমি যদি দেখা করতে না চাইতাম…”
ইশতিয়াক সাথে সাথে থামিয়ে দিল।
” হুশ।”
তার গলাটা এবার একটু গম্ভীর।
” দুর্ঘটনা হইছে। ভাগ্যে ছিল। তোমার কোনো দোষ নাই।”
মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।
ইশতিয়াক আবার পরিবেশ হালকা করার চেষ্টা করল।
” আচ্ছা শোনো।”
“কী?”
” ফ্যায়ারেল কেমন ছিল?”
স্নিগ্ধা চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“ভালো।”
ইশতিয়াক হাত দিয়ে মুখ ছুঁলো স্নিগ্ধার। চোখের পানি মুছিয়ে দিলো। স্নিগ্ধার মাথা টেনে নিজের ঠোঁটের কাছে আনল। যত্নের পরশ আঁকল স্নিগ্ধার মাথায়। স্নিগ্ধার মুখে সামান্য হাসি ফুটল।
সেই হাসিটুকু দেখেই যেন ইশতিয়াক স্বস্তি পেল।
তারপর ভ্রু নাচিয়ে বলল,
” তুমি না আমারে ভালোবাসো না?
জোরজবরদস্তি কইরা প্রেমে আনছি না? তাইলে এত কান্দতেছো ক্যান?”
” এসব কি কথা?”
স্নিগ্ধা এবার মুখ বাঁকাল। ইশতিয়াক হাসল। বলল,
”যদি আমার কিছু হয়ে যেত, আল্লাহ যদি আমারে নিয়া যেত”
স্নিগ্ধা আবার কেঁদে ফেলল। আজ ঘনঘন কান্না পাচ্ছে তার। অথচ কারো সামনে কাঁদে না সে। বেডে মাথা ঠেকিয়ে ফোপাচ্ছে স্নিগ্ধা। ইশতিয়াক মুখ কাচুমাচু করল। বলল,
”আরে হয়নি তো কিছু এমনিই বলছিলাম, এতো কাঁদো কেন, শুধু ভ্যা ভ্যা করে”
স্নিগ্ধা কটমট করে তাকালো। তখনই অসাবধানতায় হাতে টান লাগল ইশতিয়াকের।
ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল তার।
একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে এলো। সাথে সাথে স্নিগ্ধা লাফিয়ে উঠল।
মেয়েটা তাড়াতাড়ি তার পাশে এসে দাঁড়াল।
তারপর ছোট্ট বাচ্চাদের মতো ফুঁ দিতে লাগল ব্যথার জায়গায়। ইশতিয়াক চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
মেয়েটা সাইন্সের স্টুডেন্ট।
সে জানে ফুঁ দিলে ব্যথা কমে না। তবু করছে। অবুজ মন হয়তো ভাবছে এতে হয়তো ইশতিয়াক আরাম পাবে। ভালোবাসা মানুষকে অনেক সময় যুক্তির বাইরে নিয়ে যায়। প্রিয় মানুষের কষ্ট দেখলে পৃথিবীর সব জ্ঞান, সব হিসাব হার মেনে যায়।
স্নিগ্ধা ফুঁ দিচ্ছে। আর ইশতিয়াক তাকিয়ে আছে।
অদ্ভুতভাবে মনে হলো, শরীরের ব্যথা নেই তার।
এখনো আর জ্বলছে না। বুকের ভেতরের অস্থিরতাটা আর নেই। যেন ঝড়ের পর সমুদ্র ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এসেছে।
প্রেমাদরে ধুয়ে গেছে তার সকল কষ্ট, ব্যাথা, যন্ত্রনা।
সন্ধ্যা নেমেছে শহরের বুকে।
হাসপাতালের জানালার ওপাশে আকাশটা কমলা থেকে ধীরে ধীরে গাঢ় নীলে রূপ নিচ্ছে। করিডোরের আলো জ্বলে উঠেছে। চারপাশে এক ধরনের ক্লান্ত নীরবতা। দিনের ব্যস্ততা কমে এলেও হাসপাতালের পরিবেশ কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
বিছানায় আধশোয়া হয়ে ছিল ইশতিয়াক। এক হাতে ফোন। অন্য হাতের ক্যানোলা নিয়ে বিরক্ত মুখে খুঁটাখুঁটি করছে। ঠিক তখনই দরজাটা খুলে গেল। ইখতিয়ার ঢুকল। তার ঠিক পেছনেই মুগ্ধা।
দুজনকে একসাথে দেখে ইশতিয়াকের ভ্রু কুঁচকে গেল। মনে হলো কেউ তার রুমে রোগী দেখতে না এসে বেড়াতে এসেছে।
” এইটা কী?”
ইখতিয়ার চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
”কোনটা কী?”
” এইটা হাসপাতাল নাকি হানিমুন স্পট?”
মুগ্ধা চোখ কুঁচকাল। ইশতিয়াক থামল না।
”জোড়ায় জোড়ায় আইছো ক্যান? ভাইয়া একলা আসলেই তো হইত।”
” চুপ কর।”
”না সত্যি। আমারে দেখতে আসছো নাকি কাপল ভিজিটে আসছো তোমরা?”
মুগ্ধা এবার ব্যাগটা ধপাস করে টেবিলের উপর রাখল। ইশতিয়াকের পায়ের দিকে আঙুল তুলে বলল,
“আর একটা কথা বললে সেলাইয়ের উপর চাপড় মারব।”
ইশতিয়াক সঙ্গে সঙ্গে এক হাত দিয়ে কম্বল টেনে পা ঢেকে ফেলল।
” দেখছো ভাইয়া? রোগীর উপর নির্যাতন করতেছে।”
ইখতিয়ার হাসি চেপে রাখল। এই দুজনের ঝগড়া না শুনলে মনে হয় দিনটাই অসম্পূর্ণ। কিছু একটা মনে করে ইখতিয়ারের হাসিটা মিলিয়ে গেল। ইশতিয়াকের দিকে ভ্রু সামান্য কুঁচকে তাকাল সে।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৭
” মেয়েটা কে?”
মুহূর্তে যেন পুরো রুমের বাতাস বদলে গেল ।ইশতিয়াকের মুখের হাসি থেমে গেল। গলা শুকিয়ে কাঠ। হৃদপিণ্ডটা ধপধপ করে উঠল।
মুগ্ধাও অবাক হয়ে তাকাল। ইশতিয়াক ঢোক গিলল। থেমে থেমে বলল,
”কোন মেয়ে?”
ইখতিয়ারের দৃষ্টি স্থির। শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত চোখের ভেতর তীক্ষ্ণ কৌতূহল। আবার বলল,
”নার্স বলল একটা মেয়ে এসেছিল, আবার নাকি খুব কাঁদছিলো, কে সেই মেয়ে? নাম কি?”
