ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৭
রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি
সকালের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে ডাইনিং রুমের মেঝেতে পড়েছে। বাড়ির সকালের নাস্তার টেবিলটা যেন আজ ছোটখাটো এক মেলার আসর। গরম গরম পরোটার গন্ধ, চায়ের ধোঁয়া আর পরিবারের সবার হাসির শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত উষ্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে।
মুগ্ধা ইখতিয়ার পাশাপাশি বসা। মুখ নিচু করে নাস্তা করছে ইখতিয়ার। তার স্বভাবসিদ্ধ গম্ভীর চেহারা। তবে আজ ঠোঁটের কোণে অতি সূক্ষ্ম একটা হাসি লুকিয়ে আছে। এমন হাসি, যা কেউ খেয়াল না করলেও মুগ্ধার চোখ এড়ায় না। যে হাসি মুগ্ধা নামক মেয়েটির পুরো শরীরে উষ্ণ শিহরণ বয়ে দেওয়ার কারণ।
ইশতিয়াক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখে মুখে দুষ্টুমির ছাপ।
”ভাইয়া, লটারি পাইছো নাকি গো,তোমারে আজকে খুব খুশি খুশি লাগতেছে কেন? ”
ইখতিয়ার নির্বিকার। খেতে খেতে বলল,
”লাগলে লাগতেছে।”
”আহা! এই উত্তরই সন্দেহজনক। মনে হয় লটারি সহ পুরষ্কার তুলে নিয়ে চলে আসছো, ভেরি সন্দেহজনক”
ইশতিয়াক গালে বাম হাতের তর্জনী ঠেকিয়ে বলল।ইশরাফিল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
”তোর প্রশ্নগুলোই সন্দেহজনক।”
টেবিলজুড়ে হাসির রোল উঠল। ইশতিয়াক নাটকীয় ভঙ্গিতে বাম হাত দিয়ে বুক চেপে ধরল।
”তোমরা তো মানুষ ভালো, আচরণ রাজাকারের মতো কেন?”
ইসরায়েল মুখভর্তি খাবার নিয়ে বলল,
” ভুল বুজতেছিস আব্বু, তুই একঝাঁক বাংলাদেশের মধ্যে একটা পাকিস্তান”
মুগ্ধা হেসে ফেলল। ইসরাফিলকে সহমত করল।
”আসলে চাচ্চু ঠিক বলেছো।”
ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
”কি ঠিক বলেছে চাচ্চু?”
”তুই একটা বিরোধী দলের লোক”
”চোরের সাক্ষী মাতাল।”
ইশতিয়াক চোখ ঘোরাল। মুগ্ধা হাই তুলে বলল,
”আর তুই তো ডাকাত”
আবারও হাসি। ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকাল। দুষ্টু হেসে বলল,
”আচ্ছা, তুই এত কিছু জানিস কিভাবে রে? স্বজাতি নাকি ”
”নারে, প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করি।”
ইশতিয়াক যেন অবাক হলো এমন ভান তার। নিজের দিকে আঙুল দিয়ে অবিশ্বাস্য স্বরে বলল,
”আমাকে?”
”হুম হুম।”
মুগ্ধা মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল।
”আর ভাইয়ারে?”
কথাটা বলেই ইশতিয়াক চতুর দৃষ্টিতে তাকাল।মুহূর্তে মুগ্ধার মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠল।ইশরাফিল হো হো করে হেসে উঠল। ইসরায়েলও তাল মিলাল।
শুধু ইখতিয়ার মাথা নিচু করে পরোটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে মৃদু হাসল। রহিমা সব দেখছিলেন। বৃদ্ধা চোখে স্নেহের ঝিলিক।
সংসারের এমন দৃশ্য তার খুব প্রিয়। মানুষ আসলে সুখের মুহূর্তগুলো বুঝতে পারে না, অথচ এই ছোট ছোট হাসিগুলোই একদিন স্মৃতি হয়ে বুকের মধ্যে বাসা বাঁধে।
ঘরে ফিরে আসতেই দৃশ্যটা বদলে গেল যেন।বাইরের কোলাহল যেন দরজার ওপাশেই আটকে রইল। ইখতিয়ার ঘরে ঢুকেই শশব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আলমারি খুলে আকাশ-নীল রঙের একটা শার্ট বের করল। তার সঙ্গে কালো জিন্স। খুব দ্রুত পোশাক বদলে নিল সে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে সামান্য জেল লাগাল। এবার বেশ পরিপাটি লাগছে।
মুগ্ধা বিছানার কোণায় বসে সব দেখছে। চোখে তার উপচে পড়া কৌতুহল । ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে আছে। যেন বুকের ভেতর একটা ছোট্ট পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে।
কোথায় যাবে ইখতিয়ার? কেন যাবে? আজ তো শুক্রবার।কখন ফিরবে?
প্রশ্নগুলো একটার পর একটা মাথায় আসছে, অথচ মুখে আনতে পারছে না। এই মানুষটার সামনে এলেই তার জিভ যেন নিজের দায়িত্ব ভুলে যায়।
ইখতিয়ার টেবিল থেকে কয়েকটা কাগজ তুলে ফাইলে ভরল। ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল। মুগ্ধা কেবলই তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিটা ছিল বর্ষার দিনে জানালায় বসে থাকা এক শিশুর মতো— শুধু দেখছে, কিছু বলতে পারছে না।
দরজার কাছে গিয়ে ইখতিয়ার থেমে গেল। কিছু মুহূর্ত। তারপর ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল সে। মুগ্ধা তখনও বসে আছে। চোখদুটো শান্ত, অথচ সেই শান্তির ভেতরে হাজার প্রশ্নের ঢেউ।
ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা হালকা নরম হয়ে গেল। যেন কোন ঠান্ডা স্রোত গলে গেল। কিছু কিছু মানুষ থাকে, যাদের জন্য শত ব্যস্ততার মাঝেও পা থেমে যায়। ব্যাস্ততা যাদের অনুভূতিকে কাবু করতে পারে না। মুগ্ধা ঠিক তেমনই হয়ে উঠেছে ইখতিয়ারের বেখেয়ালি জীবনে।
সে আবার ফিরে এল। মুগ্ধা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ইখতিয়ার সামনে দাঁড়াল। একটা কথাও বলল না। না কোন মৃদু ধ্বনি।
শুধু ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মুগ্ধার কপালের এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল। তারপর খুব যত্ন করে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। স্পর্শটা ছিল সকালের শিশিরের মতো ক্ষণিক, অথচ গভীর।
মুগ্ধা যেন জমে গেল। তার হৃদস্পন্দন আচমকা নিয়ম ভুলে দৌড়াতে শুরু করল। ইখতিয়ার ফিসফিস করে বলল,
” দেরি করব না। সাবধানে থেকো”
মুগ্ধার জবাবের অপেক্ষা সে করল না। দাঁড়াল না আর। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটুকু কানে আসতেই মুগ্ধা ধীরে ধীরে কপালে হাত রাখল। মনে হলো সেখানে এখনও স্পর্শটা রয়ে গেছে। যেন কেউ কপালে চুমু নয়, একমুঠো উষ্ণতা রেখে গেছে। আর সে নির্বাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক যেমন আকাশ সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ তার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ইখতিয়ার চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ নিজের ঘরেই বসে রইল মুগ্ধা। কপালে হাত রেখে একবার জানালার দিকে তাকায়, আবার নিজের উপরই বিরক্ত হয়। শেষমেশ মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে সামলে নিল সে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে ভাবল, এভাবে বসে থাকলে চলবে না।
বাড়ির মানুষজনের সঙ্গে থাকলেই মন অন্যদিকে যাবে। নিচতলায় নেমে ড্রয়িংরুমে এসে বসল মুগ্ধা। সকালের ব্যস্ততা কেটে যাওয়ায় বাড়িটা এখন অনেকটা শান্ত। কোথাও থালা-বাসনের হালকা শব্দ, কোথাও রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা মসলার গন্ধ। রহিমা নিজের মতো তসবিহ পড়ছেন।
ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে চাবি ঘোরানোর শব্দ ভেসে এলো।
মুগ্ধা তাকিয়ে দেখল, ইশতিয়াক নামছে।
না, নামছে বললে ভুল হবে। ছেলেটা এমন ভাব নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে, যেন কোনো সিনেমার নায়ক বিদেশ থেকে বহু বছর পর নিজের শহরে ফিরেছে। এক হাতে গাড়ির চাবি ঘুরছে, অন্য হাত পকেটে। মুখে আত্মবিশ্বাস এমন, যেন পুরো পৃথিবীর দায়িত্ব আজ তার কাঁধে।
চুলে জেলের ছোঁয়া, গায়ে ঝকঝকে শার্ট, চোখেমুখে অকারণ ভাব।
মুগ্ধার হাসি পেয়ে গেল।
ছেলেটার এই একটা গুণ আছে। তাকে দেখলেই মন খারাপ বেশিক্ষণ টিকতে চায় না। ইশতিয়াক নিচে নেমে প্রথমেই কর্ণারে থাকা আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিল। তারপর কলার ঠিক করে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়াল, যেন কোনো ফ্যাশন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের জন্য ছবি তুলতে এসেছে। মুগ্ধা সোফায় বসে দৃশ্যটা দেখছিল। মনে হচ্ছিল, বাড়ির মধ্যে নয়, কোনো নাটকের মহড়া চলছে।
ইশতিয়াক এবার তার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। অবশ্য এই হাসি দেখলে যে কারও বোঝার কথা, এখন কিছু একটা হবে।ধীরে ধীরে মুগ্ধার সামনে এসে দাঁড়াল সে।
মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল। কারণ অভিজ্ঞতা বলে, ইশতিয়াক যখন অতিরিক্ত ভদ্র হয়, তখনই বিপদের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। ছেলেটা কিছুক্ষণ রহস্যময় ভাব ধরে রেখে শেষমেশ বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে এগোল। যাওয়ার আগে আবার ফিরে তাকাল।চোখে সেই পরিচিত দুষ্টুমি। না! আর সহ্য করতে পারল না। জিজ্ঞেস করল,
”কাহা যা রাহি হে বে তু?”
ইশতিয়াক কলার উচালো। বলল,
”মেরি ধারকান কি পাস”
মুগ্ধা চোখ কুচকালো। বলল,
”কিউ বে? তু ক্যায়া মার গেয়া যো তেরে ধারকান তেরে পাস নেহি হে”
ইশতিয়াক মুখ বেঁকিয়ে তাকাল। যেন বেফাঁস কিছু শুনে বলেছে। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
” আমার আনরোমান্টিক ভাইটার পাল্লায় পড়ে, আমার রোমান্টিক বেস্টিটা আনরোমান্টিক হয়ে গেল রে, এ দুঃখ কোথায় রাখব রে, আমার কচু গাছ এনে দে রে, দড়ি দিব রে”
ইশতিয়াকের উদ্ভট প্রলাপে মুগ্ধার ঠোঁট বেঁকে গেল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো,
”বা’ল চুপ যা”
”আইচ্ছা যাইগা, ভালো থাইকো বান্ধবী আমার”
মুগ্ধা কিছু বলল না। দাঁতে দাঁত পিষল বসে বসে।ইশতিয়াক মুখ ঘুরিয়ে এগিয়ে গেল। আবার কি মনে করে ফিরে এলো । মুগ্ধার সামনে বরাবর দাঁড়াল।
তারপর জানতে চাইল, তার জন্য কিছু আনতে হবে কি না।
মুগ্ধা এক মুহূর্তও ভাবল না।
যেন জানত ইশতিয়াক জিজ্ঞেস করবেই। অনেক আগেই উত্তর ঠিক করে রেখেছিল সে। আদুরে মুখ করে বলল,
”কলেজের সামনে যে ঝালমুড়ি বিক্রি করে, ওইখানকার ঝালমুড়ি আনবি।”
ইশতিয়াক এমন মুখ করল, যেন জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এইমাত্র খেল।
তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছিল, সে হয়তো ভেবেছিল মুগ্ধা দামি কোনো খাবারের নাম বলবে। কিন্তু পৃথিবীর সবকিছু বাদ দিয়ে ঝালমুড়ির দাবি শুনে তার নায়কসুলভ ভাবমূর্তি মুহূর্তে নড়বড়ে হয়ে গেল। মুগ্ধা অবশ্য নির্বিকার।
তার কাছে ঝালমুড়ির আবেদন কোনো অংশে কম নয়। বরং কলেজের সামনে বিক্রি হওয়া ঝালমুড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অদ্ভুত এক নস্টালজিয়া। বিকেলের আড্ডা, বন্ধুদের হাসাহাসি, ক্লাস শেষে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে খাওয়া—সবকিছু যেন সেই স্বাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। ইশতিয়াক তবু মজা করল,
”আমি না হয় সৌজন্যবোধে বলেছি, তাই বলে তুই খাবার চাবি? রাক্ষসি একটা”
মুগ্ধা তেড়ে গেল। বলল,
”ঝালমুড়ি না নিয়ে বাড়ি আসিস না যেন”
”পারতাম নট”
”ঝালমুড়ি আনবি নয়তো তোর সব মিথ্যা বাড়িতে বলে দিব,হু”
”কি জানোস তুই?”
”কি জানি না আমি?”
ইশতিয়াক কিছুক্ষন তাকিয়ে মাথা নেড়ে অসহায় ভঙ্গিতে হাসল। আসলেই তো, ইশতিয়াকের এমন কিছু নেই যা মুগ্ধা জানে না। শুধু স্নিগ্ধার ব্যাপারটা ছাড়া। শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল। মুখ ঘুরিয়ে উল্টো দিক ফিরে হাঁটা দিলো।
দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে আবার চাবিটা আঙুলে ঘুরাতে লাগল। নায়কসুলভ সেই ভাবটা আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
কিন্তু মুগ্ধার চোখে দৃশ্যটা অন্যরকম লাগল।
নায়ক নয়, বরং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী এক দুষ্টু ছেলে। মুগ্ধার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
পরের মুহূর্তেই ইশতিয়াক দরজা পেরিয়ে বাইরে চলে গেল। মুগ্ধা হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে উঠল,
”হ্যান্ডসাম লাগছে কিন্তু”
”যা তোর ঝালমুড়ি পেয়ে যাবি ”
মুগ্ধা হেসে উঠল। ইশতিয়াক বাইকে বসল। দ্রুত যেতে হবে। স্নিগ্ধা অপেক্ষা করবে যে। এখন বাজে সাড়ে এগারো। স্নিগ্ধার এগারোটায় কোচিং শেষ হয়। আজ স্নিগ্ধার কোচিং এ বিদায় অনুষ্ঠান ছিল। আর পরিক্ষা ছাড়া বাইরে আসবে না সে। সেজন্য আজ দেখা করতেই হবে। স্নিগ্ধাকে অপেক্ষা করানো যাবে না। ওখানকার জায়গাটাও খুব একটা ভালো না। নানারকম চিন্তা করে ইশতিয়াক গাড়িতে টান দিলো। যতদ্রত যাওয়া যায় প্রিয়তমার সন্নিকটে।
শহরের ব্যস্ততম এলাকার পুরোনো সেই ক্লিনিকটা আজও আগের মতোই আছে।
দেয়ালে হালকা ধূসর রঙ, করিডোরজুড়ে ওষুধ আর ফিনাইলের গন্ধ, অপেক্ষমাণ রোগীদের ক্লান্ত মুখ। মানুষের ভিড় থাকলেও জায়গাটার মধ্যে এক ধরনের ভারী নীরবতা লেগে আছে। যেন এখানে আসা প্রত্যেক মানুষ নিজের ভেতরে কোনো না কোনো যুদ্ধ নিয়ে বসে আছে। আলাদা তাদের জটিলতা তবে গন্তব্য এক।
ওয়েটিং রুমের এক কোণায় বসে আছে ইখতিয়ার।
তার পাশে আরহাম। প্রথম আধাঘণ্টা ঠিকঠাক কেটেছিল। তারপর একঘণ্টা। তারপর দেড় ঘণ্টা।
এখন দুই ঘণ্টার কাছাকাছি। ইখতিয়ারের ধৈর্য শেষ না হলেও মুখের শান্ত ভাবটা ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে। আরহাম বারবার ঘড়ি দেখছে। পা নাড়ছে। মোবাইল বের করছে। ঢুকিয়ে রাখছে।
কারণ সে জানে, আজকের এই বিপদের মূল হোতা সে নিজেই।
সিরিয়াল দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তার। আর আরহাম নামক সেই মহান ব্যক্তি যথারীতি দেরি করে এসে এমন সিরিয়াল নম্বর এনেছে, যেন ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে নয়, জমি রেজিস্ট্রি করতে এসেছে।
হঠাৎ ইখতিয়ার ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। একদম চুপচাপ। কোনো কথা নেই। কোনো অভিব্যক্তি নেই। শুধু তাকিয়ে আছে।
আরহামের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে ঢোঁক গিলল।
”ভাই বিশ্বাস কর… আমার মনে হয় ডাক আসতে বেশি দেরি হবে না।”
ইখতিয়ার কিছু বলল না। শুধু তাকিয়েই রইল।
আরহাম আবার ঢোঁক গিলল।
”আসলে রাস্তায় একটু জ্যাম ছিল।”
ইখতিয়ার ভ্রু তুলল। আরহাম দ্রুত সংশোধন করল।
”আচ্ছা ঠিক আছে, জ্যাম ছিল না। আমি ঘুম থেকে দেরি করে উঠছিলাম।”
ইখতিয়ারের চোখ সরু হয়ে এলো।
”সরি।”
একটা মাত্র শব্দ। তারপর আরহাম চুপ।
কারণ সে জানে, এখন বেশি কথা বললে অবস্থা আরো খারাপ হবে। ঠিক তখনই নার্স এসে ডাক দিল।
” মিস্টার ইখতিয়ার।”
আরহামের মুখে এমন ভাব ফুটল যেন মৃত্যুদণ্ড মওকুফ হয়েছে। জোরে নিঃশ্বাস ছাড়লো সে।
”আলহামদুলিল্লাহ!”
ইখতিয়ার উঠে দাঁড়াল। আরহামও দ্রুত পেছন পেছন হাঁটল।
ডাক্তারের কেবিনে ঢুকতেই ভেতরের পরিবেশটা চোখে পড়ল।
বইয়ে ভর্তি শেলফ। দেয়ালে সার্টিফিকেট। টেবিলের পাশে সবুজ একটা মানিপ্ল্যান্ট। জানালা দিয়ে আসা বিকেলের আলোয় পুরো ঘরটা শান্ত লাগছে।
টেবিলের ওপাশে বসে আছেন ষাটোর্ধ্ব এক ভদ্রলোক। মাথার বেশিরভাগ চুল সাদা।
চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। তিনি প্রথমে ফাইল দেখছিলেন। তারপর চোখ তুলে ইখতিয়ারকে দেখলেন। মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন। চোখে চিনতে পারার আভাস ফুটে উঠল। গত কযেক বছর ধরে তিনি অনেক বার ইখতিয়ারের চিকিৎসা করছে। তবু যেন ইখতিয়ার নিজেই সুস্থ হতে নারাজ।
”ইখতিয়ার?”
ইখতিয়ার মাথা নাড়ল। ডাক্তারের মুখে মৃদু হাসি ফুটল।
”জ্বী, আসসালামু ওয়ালাইকুম”
”ওয়ালাইকুম আসসালাম, অনেকদিন পর দেখছি তোমাকে।”
তিনি নিজের সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে দিলেন।
”বসো।”
ইখতিয়ার বসল। ডাক্তার কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন চোখ দিয়ে মানুষটার ভেতরটা পড়ার চেষ্টা করছেন।
কয়েকটা সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করলেন।
”কেমন আছো?”
”জ্বী ভালো। আপনি?”
” আলহামদুলিল্লাহ,ঘুম কেমন হচ্ছে?”
”আগের চেয়ে ভালো।”
”কাজের চাপ?”
”সামলাতে পারছি।”
ডাক্তার মাথা নাড়লেন। তারপর ফাইল বন্ধ করে আঙুল জোড়া করলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ ইখতিয়ারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর টেবিলের উপর রাখা কলমটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে নরম গলায় বললেন,
”মুনতাহার কথা এখনও মনে পড়ে?”
ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা কেমন যেন টনটন করে উঠল। সরল স্বীকারোক্তি দিলো সে।
”পড়ে।”
”প্রতিদিন?”
”হ্যাঁ… তবে আগের মতো না।”
ডাক্তার মাথা নাড়লেন। পূণরায় জিজ্ঞেস করলেন,
”স্বপ্নে আসে?”
ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ রইল। চোখ বন্ধ করে জবাব দিলো,
”মাঝে মাঝে।”
”তখন কেমন লাগে?”
”ঘুম ভাঙার পর মনে হয়… সবকিছু আবার নতুন করে হারালাম। দমবন্ধ লাগে। নিজেরে নিজে মারতে ইচ্ছা করে ”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল মুহুর্তেই। ডাক্তার ধীর স্বরে বললেন,
”এখনও কি নিজেকে দোষ দাও?”
ইখতিয়ারের চোখ নিচু হয়ে গেল। নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
”চেষ্টা করি না দিতে… কিন্তু পারি না সবসময়।”
”কী নিয়ে দোষ দাও?”
”মনে হয় আরেকটু চেষ্টা করলে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম। আরেকটু সময় দিলে, আরেকটু গুরুত্ব দিলে…”
তার গলা আটকে এলো। থেমে গেল ইখতিয়ার। আবারো দীর্ঘশ্বাস চিড়ে বেরিয়ে এলো তার হৃদয় থেকে। ধীর শব্দে বলল,
”কিন্তু আল্লাহ জানেন, আমি সত্যিই তাকে খুব ভালো বন্ধু মনে করে ভালোবাসতাম।”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একজন সাইকোলজিস্ট হিসাবে এমন অহরহ রোগীকে তাকে সামলাতে হয়। তাই মন খারাপ তাকে আর ধরা দেয়না। নয়তো ইখতিয়ারের কষ্টে সেও কষ্ট পেতো বোধ হয় ।
”তুমি কি মনে করো মুনতাহা চাইত তুমি সারাজীবন এই অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচো?”
ইখতিয়ার উত্তর দিতে পারল না। শুধু নীরবে মাথা নাড়ল।
”না।”
”তাহলে তুমি কেন নিজেকে শাস্তি দিয়ে যাচ্ছ?”
ইখতিয়ার ঠোঁট কামড়ে ধরল। এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও নেই। ডাক্তার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বললেন,
”তোমার স্ত্রীর সাথে কেমন সম্পর্ক এখন?”
মুগ্ধার মুখটা হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল ইখতিয়ারের। লাজুক চোখ। অকারণ হাসি। অদ্ভুত সব আবদার। ইখতিয়ারের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ক্ষীণ হাসি ফুটল। ডাক্তার সেটা খেয়াল করলেন। ডাক্তার নিজেও হাসলেন। চুল তার এমনি পাঁকেনি। তবু পরখ করতে জিজ্ঞেস করলেন,
”হাসলে কেন?”
ইখতিয়ার মাথা নিচু করল।
”জানি না।”
”তার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে?”
”লাগে।”
”বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে?”
”করে।”
”কেন?”
প্রশ্নটা শুনে ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
”কারণ কেউ অপেক্ষা করে। রাত জেগে বসে থাকে”
ডাক্তারের চোখ নরম হয়ে এলো।
”তার মন খারাপ থাকলে তোমার খারাপ লাগে?”
”লাগে। পৃথিবী কিনে দিয়ে হলেও তার মুখে হাসি ফোটাতে ইচ্ছে করে ”
”তাকে কষ্টে দেখতে পারো?”
” না।”
”সে অন্য কারো সাথে বেশি সময় কাটালে খারাপ লাগবে?”
ইখতিয়ার উত্তর দেওয়ার আগেই থেমে গেল। মনে হলো প্রশ্নটা তার বুকের ভেতরের এমন একটা দরজায় আঘাত করেছে, যেটা সে নিজেও খুলে দেখেনি।কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে বলল,
”লাগবে”
ডাক্তার মৃদু হেসে চেয়ারে হেলান দিলেন।
”ইখতিয়ার, তুমি কি জানো? তোমার মতো মানুষ যখন খারাপ অতীতকে ভুলে যায়, তখন সে সুস্থ হয় না। সুস্থ হয় তখন, যখন অতীতকে বুকে রেখেও নতুন কাউকে জায়গা দিতে শেখে।”
ইখতিয়ারের চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল। ডাক্তার আবারও বললেন,
”মুনতাহা তোমার জীবনের একটা অধ্যায়। খুব সুন্দর, খুব কষ্টের একটা অধ্যায়। কিন্তু পুরো বই না।”
ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল। ফলে কথাগুলো ইখতিয়ারের কানে বারবার বাজতে থাকে।
”আর আমার মনে হচ্ছে, তুমি ধীরে ধীরে নতুন অধ্যায়ে পা রাখছো।”
ইখতিয়ার মাথা নিচু করল। তার বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠছে। ডাক্তার আবার বললেন,
”মৃত মানুষদের ভালোবাসা কখনও বিশ্বাসঘাতকতা নয়, ইখতিয়ার। কিন্তু জীবিত মানুষদের ভালোবাসা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা… সেটা নিজের প্রতি অবিচার”
কথাটা শুনে ইখতিয়ার চোখ বন্ধ করল। আর বহুদিন পর তার মনে হলো, হয়তো সত্যিই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসে গেছে।
ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে কিছু লিখলো। আবার ইখতিয়ার বেরিয়ে আসার সময় বলল,
”ইখতিয়ার, হাসতে শিখো, হাসাতে শিখো, বাঁচতে শিখো, যে তোমার জন্য বাঁচতে চাই, তাকে বাঁচাও, দেখো সব রঙিন হয়ে যাবে, আই নোট ইউ ক্যান ডু ইট মাই বয়, গো এ্যাহেড”
ইখতিয়ার মুচকি হেসে বেরিয়ে এলো।
চেম্বারের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো ইখতিয়ার। করিডোরটা আগের মতোই আছে, অথচ তার কাছে সবকিছু কেমন অপরিচিত লাগছে। ডাক্তারের কথাগুলো এখনও মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। যেন শান্ত হ্রদের বুকে কেউ একের পর এক পাথর ছুড়ে দিয়েছে, আর ঢেউগুলো এখনও থামেনি। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখদুটো অদ্ভুত ভারী।
নিজেই বুঝতে পারছে না কী অনুভব করছে।
স্বস্তি? অপরাধবোধ? নাকি নতুন কোনো অনুভূতির শুরু? পাশে হাঁটতে হাঁটতে আরহাম আর চুপ থাকতে পারল না।
”কী বলল ডাক্তার?”
” হুম।”
”হুম মানে?”
”কিছু না।”
”ওষুধ বাড়াইছে?”
”না।”
” কমাইছে?”
”হ্যাঁ।”
” ভাই, আমি সিকিউ প্রশ্ন করছি, তুই এমসিকিউ উত্তর দিচ্ছিস কেন? চিন্তা হয় তো!”
ইখতিয়ার কোনো উত্তর দিল না। শুধু সামনে তাকিয়ে হাঁটতে লাগল। আরহাম বিরক্ত হয়ে মাথা চুলকাল। ঠিক তখনই ইখতিয়ারের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
মুগ্ধা কলিং…
ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা অজান্তেই নরম হয়ে এলো। সে দ্রুত কলটা রিসিভ করল।
” হ্যালো”
কথাটা শেষ করার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো চাপা কান্নার শব্দ।
” ই… ইখতিয়ার…”
কাঁপা কাঁপা স্বর। আটকে যাওয়া নিঃশ্বাস। কান্নায় জড়িয়ে যাওয়া শব্দ। মুহূর্তেই ইখতিয়ারের শরীর শক্ত হয়ে গেল। হৃদপিণ্ডটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য ধুকপুক করতে ভুলে গেল। মুখের সমস্ত রঙ উধাও। চোখের মণি সংকুচিত হয়ে এলো।
যেন মাথার ওপর আচমকা বজ্রপাত হয়েছে।
ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৬
” মুগ্ধা? কী হয়েছে? কাঁদছ কেন? ঠিক আছো তুমি? বাড়ির কারো কিছু হয়েছে?”
ওপাশে কান্নার বেগ বাড়ল। অত্যান্ত শোকে তার তুমি,আপনি সমন্ধন গুলিয়ে গেল। গলা ভাঙা স্বরে শুধু আওড়ালো,
”কো..কোথায় তুমি? আম..আমায় ওর ওখানে নিয়ে যাও”
