আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি
সেদিন রাত এগারোটায় ঝুমুর দুই মেয়েকে নিয়ে সৌরভদের বাড়ি থেকে ফেরেন। দীধিতি ঘরে ঢুকে তখন বিছানা গুছিয়ে নিচ্ছে শুয়ে পড়ার জন্য। আর কিরণ রাগে গজগজ করছে আচ্ছামতো সৌরভকে গালি দিতে দিতে। দুই বোন যখন শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখনই চিন্তাশীল ঝুমুর হাতে সেই বিয়ের কাগজটা নিয়ে ওদের ঘরে আসেন। কোনো অতিরিক্ত কথা ছাড়ায় তিনি দীধিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, ‘যে ছেলেটির সঙ্গে সম্পর্কে আছিস তার সঙ্গে বিয়েটা লুকিয়ে করলি কেন, স্মরণ?’
কিরণ লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়, প্রচণ্ড বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কী সব বলছ, আম্মু? স্বপ্নে টপ্নে এমন কিছু দেখেছ না কি আপুকে নিয়ে?’
কথাটা শেষ হতে দেরি কিন্তু গালে থাপ্পর পড়তে দেরি হয়নি কিরণের। ঝুমুর আজ অবধি রাগের বশে কিরণের গায়েই হাত তুলেছেন বারবার। দীধিতির ওপরের রাগটাও আগাগোড়াই তিনি এভাবেই কিরণের ওপর দিয়ে নেন। আর এখানেই তিনি বারবার স্পষ্ট করে বোঝান, দীধিতি তার আপন সন্তান নয়। এই সময়গুলোতে দীধিতির কাছে লাগে ওর জীবনটাকে একদমই অর্থশূন্য৷ মনে হয় এত বড়ো পৃথিবীতে কেউ নেই ওর…বিষাক্ত লাগে সব কিছু…অন্তত একটা কেউ থাকতে পারত ওর! যখন নিজেকে চির একা লাগে তখন ছুটে যেতে পারত তার কাছে।
ঝুমুরের হাতে থাকা খামটির দিকে নজর যায় দীধিতির। মায়ের চোখেমুখে তখন স্ফুলিঙ্গ ছুটছে যেন। কাগজটা কী তা বুঝতে না পারলেও মনে হচ্ছে ওই কাগজের মাধ্যমেই ঝুমুর সত্যটা জানতে পেরেছেন। তাই আর মিথ্যার আশ্রয় নিলো না আরেক মিথ্যাকে ঢাকতে।
কিরণ গাল ধরে ভেজা চোখে মায়ের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তখনও। শুধু অভিমানী দৃষ্টিজোড়া তার নত। সেও বুঝতে পারছে বোনের ওপরের রাগটাই প্রকাশ করেছে মা তাকে মেরে৷ যেটা সব সময় ওকেও ব্যথিত করে, রাগান্বিত করে। ও-ও বোঝে মা আপুকে নিজের মেয়ে আজও ভাবতে পারেনি। কারণ, মা নিজেই ওকে একদিন এ সত্যটা নির্বিকার স্বরে জানিয়ে দিয়েছিল৷ এরপর কিরণের মনে দীধিতিকে নিয়ে যদি বিরূপ মনোভাব জন্মায়, তা নিয়ে ঝুমুর মোটেও বিচলিত ছিলেন না। আর এটাই কিরণকে রাগিয়ে তোলে। কেন ওর মা মহৎ পারল না? বাবা তার সারা জীবনের সঞ্চয়ের বড়ো ভাগটা রেখে গেছেন আপুর জন্য। বাবার এই কাজটিই কি মা মেনে নিতে পারেননি? অথচ ওর মতো বাস্তব অভিজ্ঞতা কম থাকা একটা মেয়েও বুঝতে পারে, বাবা মায়ের এই স্বার্থপর, ছোটো মানসিকতার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত ছেড়ে গেছেন ওদের জন্য। মা যদি ওর মতো করে সেই ছোটো থেকেই ভালোবাসত আপুকে, তাহলে বাবাও ভাগাভাগির সময় এমন কম বেশি করতেন না নিশ্চয়ই?
কিরণের বাহু ধরে ওকে পিছিয়ে এনে নিজে মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায় দীধিতি। সেদিনের ঘটে যাওয়া সমস্ত গল্পটাই বলে মা’কে। তাওসিফের সঙ্গে পরিচয়ের শুরুটাও বলে শুধু নাওফিলকে এ গল্পে একদম অদৃশ্য করে, অস্বীকৃতি জানিয়ে। যদিও প্রথমে দীধিতি ভেবেছিল ওই লোকগুলোর কাছে নিজের নির্যাতিত, অপদস্থ হওয়ার গল্পটাকে লুকিয়ে যেতে। কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে সে বলে দিলো এ কারণেই, নয়ত মা তাকে আরও দূরে ঠেলে দেবে। না হোক জন্মদাত্রী। মা কী তা তো জেনেছেই সে এই নারীকে মা ডেকে। কোনোভাবেই ঝুমুরকে হারাতে চায় না।
ঝুমুরের দুর্বল শরীর আরও ভেঙে আসতে চায় তখন। ধপ্ করে বসে পড়ে বিছানাতে। কিরণ ততক্ষণে বোনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছে। বেলকনির দরজাটা খোলা। সৌরভ তখন নিজের ঘরের জানালার কাছে রাখা টেবিলে বসে বন্ধুদের দেওয়া নোটগুলোই চোখ বুলাচ্ছিল। কিরণের অমন মরা কান্নার আওয়াজ পেয়ে আঁতকে ওঠে সে। জানালা থেকে খুব একটা স্পষ্ট দেখা গেল না কিছু। কিন্তু তখনও কিরণ যেভাবে কান্না করে যাচ্ছে, তাতে যে কারোরই মনে হবে বিরাট কোনো বিপদ ঘটেছে। ঝুমুর আন্টির কিছু হলো না কি আবার কে জানে! সে ঘর থেকে বেরিয়ে বাবা-মায়ের ঘরে গিয়ে তাদের ডেকে তোলে জলদি৷ তারপর কিরণের কান্নার কথা বলে ছুটে আসে তিনজনই। সৌরভের ক্লাস ফাইভে পড়া ছোটো বোনটা শুধু ঘুমিয়ে ঘরে।
ঝুমুর নীরবে চোখের পানি ফেলছেন। আজ মন থেকে সুহাইলের জন্য তিনি খুব সম্মানবোধ করছেন। ছত্রিশ বছর বয়সে বিধবা হলেও ঝুমুরের সৌন্দর্যে তখনও ঘাটতি পড়েনি। কত কত বিয়ের প্রস্তাব তখনও পেয়েছেন তিনি। তবুও কেবল কিরণের কথা চিন্তা করেই দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেননি। হ্যাঁ, শুধু কিরণের কথায় ভেবেছেন তিনি। শুধু দীধিতি থাকলে জীবনটাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিতে একবারও ভাবতেন না। ছত্রিশ থেকে ছেচল্লিশ বছর বয়সে এসে কখনই তিনি কোনো বিপদের সম্মুখীন হননি। সব সময় সুহাইল দূরে থেকেও আগলে রেখেছেন৷ এই যে কিরণের সঙ্গে দুর্ঘটনাটা ঘটল, সেই ছেলেদু’টোর জীবনই বরবাদ করে দিয়েছেন সুহাইল। দীধিতিও যশোরে থাকাকালীন কোনো বিপদে পড়েনি। আজ যদি মেয়েদুটোর জীবনেও এমন সুহাইলের মতো একজন থাকত সব সময়, তবেও কি এমন খারাপ কিছু হত ওদের সাথে? দীধিতিকে কিরণের মতো করে ভালো না বাসলেও এতগুলো বছরে অপরিসীম মায়া তো সৃষ্টি হয়েছেই এই মেয়ের জন্য। তাই তো কিরণের আগে দীধিতির সুনিশ্চিত জীবনের চিন্তা করছেন তিনি রাত-দিন।
সৌরভ আর সৌরভের বাবা-মা দরজায় অনরবরত নক করে যাচ্ছে, কলিংবেল চেপে যাচ্ছে। কিরণ দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে দিলে তারা ভেতরে এসে জিজ্ঞেস করতে থাকে কী হয়েছে? কিরণ কান্না চেহারায় কিছু না বলে ঘরে চলে আসে৷ তারাও ওর পিছু পিছু ঝুমুরের কাছে আসলে ঝুমুর সৌরভের মা রেণুকে দেখেই তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেন৷ বিপদে আপদে এই পরিবারটা সব সময়ই নিঃস্বার্থভাবে পাশে এসে দাঁড়ায় ওদের। তাই কোনো দ্বিধাবোধ না করে জানিয়ে দেন তিনি দীধিতির সঙ্গে কী হয়েছে। রাত সাড়ে বারোটা অবধি এই নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত, শীতল এক পরিবেশ বজায় থাকে সকলের মধ্যে। একটা সময় সৌরভের বাবা জামসেদ বলেন, ‘কাল সকাল হলে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করব এরপর কী করা যায়৷ এখন সবাই ঘুমিয়ে যান৷ আমরা আছি তো আপনাদের সাথে সব সময়! এত টেনশন কীসের?’
তখন সৌরভের মুখটা একবারের জন্যও কেউ খেয়াল করেনি। নয়ত দেখতে পেত, চোখের কোণে জল জমে গেছে তার। বিষাদে সিক্ত রক্তিম চোখজোড়ায় দীধিতিকে নিষ্পলক কতক্ষণ দেখে নিয়ে সকলের আগে হনহনিয়ে সে বেড়িয়ে যায় বাসা থেকে।
ঝুমুর ঘরে চলে গেলে দীধিতি কিরণকে পাঠিয়ে দেয় রাতটা মায়ের সঙ্গে থাকতে বলে। কিরণও মায়ের শরীরের চিন্তা করে চলে গেলে দরজা আটকে দীধিতি ওই মুহূর্তেই তাওসিফকে কল করে। হাতে সেই বিয়ের কাগজটা। আজকে একেবারে পরিষ্কার, তাওসিফ সেদিন বিয়েটা করেইনি ওকে। নাওফিলের সঙ্গে কোনো পরিকল্পনায় সামিল সেও। আর এই ফটোকপি বিয়ের কাগজটা শুধু একটা ফালতু কাগজ৷ কেবলই দীধিতিকে চিন্তায় ফেলার জন্য, ওর পরিবারেও ঝামেলা সৃষ্টির জন্য।
তাওসিফ ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ অত রাতে দীধিতির কল দেখে প্রথমে রিসিভ করতে ইচ্ছে না হলেও পরে নাওফিলের কথা ভেবেই ধরল, ‘হ্যাঁ বলুন, দীধিতি।’
-‘বিয়ে যদি না-ই করবেন নাটক করার কী দরকার ছিল?’ ক্ষিপ্ত আচরণ প্রচণ্ড দীধিতির।
তা দেখে তাওসিফের মেজাজ তুঙ্গে চড়ে গেল। এত রাতে ফোন দিয়ে বাইরের একটা মেয়ে ওকে ধমকায় কোন সাহসে? চেঁচিয়ে বলতে গেল, ‘তোমার মতো ছলনাময়ী, ক্রিমিনাল মাইন্ডেড মেয়েকে তাওসিফ শেখের মতো ছেলে বিয়ে করতে চাইবেই বা কেন? শেখ পরিবারের বউ হওয়ার যোগ্যতা আছে তোমার? বেইমান রেজা হকের পেলেপুষে বড়ো করা মেয়েও যে তার ব্যক্তিত্বকেই অনুসরণ করছে তা জেনেও শেখ বাড়ির পুত্রবধূর ট্যাগ গ্রহণ করতে দিয়েছি, সেটাই তোমার এ জন্মের ভাগ্য।’
কথাগুলো পেটের মধ্যেই রয়ে যায় ওর। নাওফিলের কথা চিন্তা করেই মাথা ঠান্ডা করে মেকি বিস্ময় নিয়ে শুধায়, ‘কী বলছেন দীধিতি? বিয়ে না করে নাটক করব কেন?’
-‘আপনি আমার ঠিকানায় বিয়ের কাগজ পাঠাবেন তা আগে আমাকে ইনফর্ম করেছেন? আর কাগজে আপনার সিগনেচারের জায়গায় নাওফিল শেখ জাদ সই করা কেন? এসবের অর্থ কী?’
-‘এসব কী বলছেন? আমি তো কোনো বিয়ের কাগজ পাঠাইনি। পাঠালে অবশ্যই আপনাকে আমি আগে জানাব। আমি তো লয়্যারের সঙ্গে আজও ঝামেলা করেছি জলদি ডকুমেন্টস দেওয়ার জন্য। তিনি না কি খুঁজে পাচ্ছেন না। আমার কাছে সময় চেয়েছেন এক সপ্তাহ। তোমার কাছে তাহলে ওই কাগজ কে পাঠাল? আর নাওফিলের সই-ই বা থাকবে কেন? ও তো দেশেই নেই।’
খুব সুন্দরভাবে সে রাতে দীধিতির মাথা এলোমেলো করে দিয়েছিল তাওসিফ৷ কিছুক্ষণ এ নিয়ে ফোনের ওপাশে বসে অনেক দুশ্চিন্তা দেখিয়ে তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে। আর মনেমনে দীধিতিকে গালি দিতেও ভোলে না। এইটুকু মেয়েটা কী যে ধূর্ত আর ফন্দিবাজ তা জানার পর থেকে আর ওর উদ্দেশ্য জানার পর থেকে একরকম ঘৃণা বোধ হয় তাওসিফের।
দীধিতি সত্যিই সারাটা রাত সেদিন ঘুমাতে পারেনি। নাওফিলই যে এসব করছে রাগ আর ক্ষোভ থেকে, তা বুঝতে দেরি হয়নি। তবে তাওসিফ যে ওকে আশ্বাস দিয়েছে ওদের বিয়েটার কথা বাড়িতে শেখ বাড়িতে মানিয়ে নেবেই, এজন্য অনেকটা নিশ্চিন্ত ও। নাওফিলের মুখোমুখি তো ওকে হতেই হবে একদিন৷ সেটার জন্যও প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।
এরপর থেকে চারটা মাস চলছে বাড়িতে তাওসিফের রাজি করানোর অধ্যায়। ঝুমুরও অপেক্ষায় আছেন কবে তাওসিফের পরিবার আসবে তার বাড়িতে! এর মধ্যে সৌরভের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে কিরণের সঙ্গে সৌরভের বিয়ে নিয়ে কথা বলে রেখেছেন, কিরণকে নাকফুলও পরিয়ে দিয়েছেন রেণু৷ কিরণকে নিয়ে ঝুমুর আর কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। কিরণও মায়ের চিন্তাকে প্রাধান্য দিয়ে কোনো দ্বিমত জানায়নি। শুধু বোঝা যায়নি সৌরভের অভিব্যক্তি। সেই রাতের পরদিনই সে ঢাকা ফিরে গেছে। তাকে ফোনে জানানো হয়েছে কিরণের কথা৷ কিন্তু সে কোনো জবাব দেয়নি এ নিয়ে—– তাই জামসেদ আর রেণু ভেবে নিয়েছেন ছেলে নীরব সম্মতি জানিয়েছে।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৫
সুহাইল শেখও বসে নেই। ঝুমুর কী করছেন না করছেন সব খবরাখবরই রাখেন তিনি। দীধিতি আর কিরণের বিয়ে হয়ে যাবে এ বছরই, এ খবরও তিনি পেয়েছেন। সেই মোতাবেক পরিকল্পনাও করে ফেলেছেন ঝুমুরও যাতে এরপর নিজে থেকে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়, এ ব্যবস্থাও করবেন।
চার মাস ধরে পরিবারকে রাজি করানোর গল্পটা ছিল একদমই মিথ্যা তাওসিফের। অপেক্ষা ছিল শুধু নাওফিলের আগমনের। নাওফিল সে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। এবার দীধিতিকে নিয়ে চূড়ান্ত ফয়সালার পালা।
