Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৭

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৭

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৭
ইসরাত জাহান দ্যুতি

-‘আ’ম রিয়েলি স্যরি, নাওফিল।’ মর্মাহত গলায় বলল দীধিতি।
কিন্তু দীধিতিকে অদেখার মতো এড়িয়ে গিয়ে নাওফিল ওয়ালেট থেকে কতগুলো টাকা নিয়ে সরাসরি লিভিংরুমে চলে এলো। রহিম চাচার হাতে টাকাগুলো তুলে দিয়ে বলল, ‘কষ্ট পেয়েছেন, জানি। কিন্তু আপনার বউমা’র সাথে আজকে যেটা হলো, সেটার পর আমি আরও টাইট সিকিউরিটির ব্যবস্থা করব। আর তার জন্য প্রয়োজন ইয়াং গার্ড। আমায় মাফ করবেন, চাচা। আমি কথা দিয়েছি যেহেতু এক সপ্তাহের মাঝেই আপনাদের অন্য জায়গায় চাকরি খুঁজে দেব। আল্লাহ চাইলে এ কথার নড়চড় হবে না।’

রহিম মানুষটি কষ্ট পেয়েছে বটে। কিন্তু নিজের দায়িত্বহীনতার কথা ভেবেই কষ্টটা বেশি পাচ্ছে মূলত৷ নাওফিলের অমায়িক আচরণ দেখছে সে গত তিন বছর যাবৎ। ছেলেটা প্রতি বছরের রোজাতে, ইদে, যাকাতে তাকে দু’হাত ভরে দান, উপহার দিয়েছে৷ তাই আজকের কাজটিতে সে মোটেও নাওফিলকে অবিবেচক ভাবল না। বরং উপলব্ধি করল, সত্যিই তার আর তার ছেলের নির্বুদ্ধিতার কারণে দীপ্ত অনায়াসে ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছে৷ তাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল আর সচেতন হওয়া জরুরি ছিল।
নাওফিলের হাতটা টেনে ধরে এনে রুমান ওকে নিজের পাশে বসাল, রেগে গিয়ে বলল, ‘তুই দীধিতিকে ধমকাচ্ছিস কেন? ও যেভাবে নিজেকে সেফ করেছে তাতে ওকে যে কেউ বাহবা দেবে। তুই যদি এজন্য রাগ করে থাকিস তোকে কেন জানায়নি ও, তাহলে সেটা আমার দোষ৷ আমি আসার পরই ওকে নিষেধ করে দিই তুই না ফেরা অবধি তোকে যেন কিছু না জানায় ও। যতটা স্বাভাবিকভাবে পরিস্থিতিটা সামলে নিতে পেরেছি আমরা, তোকে ওই মুহূর্তে জানানো মানেই এবার দীপ্ত তোর হাতে মারা পড়ত৷’

-‘তাহলে কি ওকে বুকে ধরে চুমু খেতে বলছিস?’ পাথরমূর্তির মতো স্থির বসে গোঁয়ার গলায় বলে উঠল নাওফিল।
এই আম্ভরিক পরিবেশটাই এমন বেমানান কথাটা শুনে বন্ধুরা না হেসে পারলই না। নাওফিল কিন্তু কঠিন মুখ করেই রইল । রুমান হাসি থামিয়ে বলল, ‘গতবার তুই যে ক্রাইমটা করেছিলি ওকে নিয়ে, আমি আগেভাগে জানলে সেবারও তোকে আটকাতাম। তুই আজ ওই সময় এলেই পরিস্থিতি বিগড়ে ফেলতি৷ দীপ্তর আগের অপরাধই তুই ভুলতে পারিসনি। আজকের কাজটার পর কি আর তুই মাথা ঠান্ডা রাখতে পারতি? এই রিস্কটা নেব না বলেই তোকে কেউ জানাইনি তখন। আর দীধিতিকেও জানাতে দিইনি।’
দীধিতির সঙ্গে যেন কোনোভাবেই নাওফিল ঝামেলা না করে, তার জন্য চার বন্ধু অনেকক্ষণ ধরে বহু কথা খরচ করে শেষমেশ বিকালে তারা সবাই বিদায় নিলো৷

আসরের ওয়াক্তে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে নাওফিল বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। ফোনটা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দীধিতি তাই কলও করতে পারেনি৷ তবে এর মাঝে ঐশী যখন সন্ধ্যা সাতটায় এসে আধ ঘণ্টার মতো থেকে গেছে ওর সঙ্গে৷ তখন তার ফোন থেকে দু’বার কল করেছিল সে নাওফিলকে। কিন্তু ফোনটা রিসিভ হয়নি।
সেই থেকেই মনের মাঝে খুব অশান্তি নিয়ে বেলকনিতে বসে আছে সে। রাত আটটা বাজলে নাওফিল ঘরে ফিরল এরপর। ওর আগমনের আওয়াজ পেয়ে সে ঘরে ছুটে এলেও মুখ তুলে একবার দীধিতির দিকে তাকিয়েও দেখল না তখন নাওফিল। স্তিমিত স্বরে ওকে বলল দীধিতি, ‘আমি আর এমন ভুল কখনও করব না, নাওফিল৷ প্লিজ কথা বলো আমার সঙ্গে।’ কান্না করে না বসলেও কণ্ঠটা ভেজা ভেজাই হয়ে উঠল মুহূর্তেই।
নাওফিল তখন হাতের ঘড়ি, মাথার টুপি আর পকেট থেকে ওয়ালেট নিয়ে দীধিতির পছন্দসই ড্রেসিংটেবিলটার সামনে এলোমেলোভাবে মৃদু গতিতে ছুঁড়ে ফেলছিল । সাধারণত সে নিজের এসব প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো দীধিতির ড্রেসিংটেবিলে থাকা প্রসাধনীর মাঝে রাখে না। গুছিয়ে সরাসরি কেবিনেটেই তুলে রাখে। এই অতি সামান্য বিষয়টা দীধিতি লক্ষ করলেই বুঝতে পারত, নাওফিলের মন মেজাজ তবে কতটা বিক্ষিপ্ত!

দীধিতি কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ওর কাছে এসে দাঁড়িয়ে বাহুতে হাতটা ছোঁয়াতেই নাওফিল তখন অকস্মাৎ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ক্রুদ্ধ চোখে। ওর এমন চাহনির সাথে দীধিতি কখনই পরিচিত ছিল না। থমকে তাই এক পা পিছিয়ে এলো সে। বেদনার্ত চোখে ওর দিকে চেয়ে থাকলে নাওফিল অস্বাভাবিক ভারী কণ্ঠ জানিয়ে দিলো সে সময়, ‘খেয়ে-দেয়ে মেডিসিন নিয়ে শুয়ে পড়ো। আমাকে বিরক্ত করবে না।’
-‘আমি তো বলছি আর কখনই ভুল করব না। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও না!’
-‘ভুল করব না! ভুল করব না! এই এক কথা বলে আমাকে তুমি প্রচণ্ড বিরক্ত করছ, দীধি৷ আমার মন, মেজাজ কিচ্ছু ঠিক নেই৷ আমি আপাতত তোমাকে নিতে পারছি না৷ প্লিজ বি কাইন্ড টু মি।’
এত দূরছাই আচরণ কি মোটেও প্রাপ্য দীধিতির? শুধু কি ভুল করার জন্যই নাওফিল তার প্রতি বিরক্ত? দীধিতির তো তা মনে হচ্ছে না! নাওফিলের আচরণে স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে, সে এই মুহূর্তেই চাইছেই না তার সান্নিধ্য, তার উপস্থিতি। কিন্তু কেন? মনের কথাগুলো অবিলম্বে প্রকাশ করে ফেলল দীধিতি, ‘বিরক্ত কেন তুমি? আমাকে কেন সহ্য করতে পারছ না? শুধুই ভুল করেছি বলে?’

ওকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে নাওফিল ফোনটা নিয়ে বেলকনিতে চলে এলো। কিন্তু দীধিতির মনের ওই ভাবনাগুলে থেকে তার এবার জিদ পেয়ে বসল এটা জানার জন্যই, অন্য কোনো কারণ আছে কি না নাওফিলের এরূপ ব্যবহারের! পিছুপিছু তাই চলে এসে ওর মুখোমুখি দাঁড়াল, ‘বলছ না কেন তুমি? জবাব না দিলে আমি তোমাকে বিরক্ত করবই।’
দীধিতির চোখে চেয়ে নাওফিল ভীষণ কড়াস্বরে বলে বসল, ‘আমি ভুলতেই পারছি না দীপ্ত তোমাকে ঠিক আমার মতো করেই জড়িয়ে ধরেছে, আমার মতো করেই ছুঁয়েছে। আর তোমার শরীরে মেখে থাকা ওর পারফিউমের ঘ্রাণ! আমার মাথা এলোমেলো আছে খুব। আমি কোনোভাবেই ভুলতে পারছি না এসব। মন চাইছে.. … !’

এরপর আর একটি কথাও শোনার প্রয়োজন মনে করল না দীধিতি। এবার সে বুঝে গেছে, নাওফিল আসলে ওর শরীরটাকে দীপ্তর স্পর্শে অপবিত্র ভেবেই ঘৃণা অনুভব করছে। স্বামীর রঙিন ভালোবাসা এখন তবে বিলীন, বিবর্ণ।
নাওফিলের কথার মাঝপথেই তাই পরাজয় স্বীকার করার মতো নিভু নিভু স্বরে বলল দীধিতি, ‘আমি দুঃখিত খুব, আমার বুঝতে দেরি হয়ে গেল বলে৷ আর বিরক্ত করব না তোমাকে৷’ বলেই সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো৷ কিন্তু মাঝ থেকে যে অজানা থেকেই গেল তার, নাওফিলের বুকের ভেতরের এই দহন জ্বালা না নেভার কারণ কেবল দীপ্ত, আর দীপ্তকে ওর নাগাল থেকে দূরে রাখা।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৬

দীধিতির যাওয়ার পানে ফিরে না চেয়ে নাওফিল তুষারকে কল করল। রিসিভ হতেই গরম দিয়ে বলে উঠল, ‘আমি লাস্ট টাইম বলছি, তুষার৷ আমাকে ওর সন্ধান দে। আমাকে খুঁজে বের করতে হলে ওর রক্ত আর হাড়গোড় ছাড়া কিচ্ছু পাবি না কিন্তু। আমার মাথা ঠান্ডা তোরাই করতে দিচ্ছিস না।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৭ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here