আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫২
ইসরাত জাহান দ্যুতি
বিখ্যাত একটা ফ্যান্টাসি বইয়ের মাঝে ডুবে আছে দীধিতি। গত কয়েকদিনে পছন্দের উপন্যাসগুলোও তার বিরক্ত লাগত। কিন্তু আজকে থেকে মনটা একদম ঝরঝরে। ভেবেছে আগামীকাল ভার্সিটি গিয়েও একটু ঘুরে আসবে৷ মাস্টার্সটা কমপ্লিট করাটাও যে জরুরি।
বিশাল সাইজের বইয়ের প্রথম অধ্যায়টা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল। তাও একবারে ক্ষান্ত হলো না। লাগাতার বেজেই চলেছে। এরকম অভদ্রদের মতো ডোরবেল এই মুহূর্তে একজনই বাজাতে পারে। বইটা সোফায় রেখে দীধিতি চোখে-মুখে ভয়াবহ বিরক্ত নিয়ে মনেমনে নাওফিলকে বকাঝকা করল। কিন্তু দরজাটা খুলতেই বেশ অবাক হলো, ‘কাকু তুমি?’ বলেই পাশেই বজ্র চাহনি নিয়ে দাড়ানো নাওফিলের দিকে তাকাল৷ ‘ভেতরে ঢুকতে দাও কাকুকে।’ ঠান্ডা গলায় বলল নাওফিল।
-‘কেমন আছিস, মা? কিরণ আসেনি এখনও?’ বলতে বলতেই সোহাইল শেখ ভেতরে এলেন।
নাওফিল জবাব দিলো, ‘আপনার ফোন পেয়ে মিহাদের গাড়িটা তখনই পাঠিয়ে দিয়েছি ওকে আনতে৷ চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।’
দীধিতি আর জবাব দেওয়ার সুযোগ পেল না৷ জিজ্ঞেস করল সোহাইলকে, ‘তোমার শরীর ভালো আছে তো? এমন শুকিয়ে গেছ কেন?’
-‘বলব। একটু ঠান্ডা পানি খাওয়া আগে।’
দীধিতি আর দাড়াল না৷ লেবুর শরবত করতে ছুটল রান্নাঘরে। সোহাইল সোফায় গা এলিয়ে বসতেই নাওফিল বলল, ‘ঘরে গিয়ে রেস্ট করবেন, কাকু। তারপর কথাবার্তা বলা যাবে৷ অনেক টায়ার্ড দেখাচ্ছে আপনাকে।’
-‘দৌড়ঝাঁপের ওপর আছি রে, বাপ। তোর বাপ আর দাদা তোদের যে কেন রাজনীতির মধ্যে ঢুকাচ্ছে বুঝলাম না৷ বড়ো ভাইকে কত নিষেধ করলাম! ছেলেগুলো সুস্থসবল আছে, ভালো আছে৷ ভালো থাকতে দাও ওদের৷ শুনল না আমার কথা। এই দূর্নীতির দেশের রাজনীতি কি সুস্থ রাজনীতি?’
নাওফিল মৃদু হেসে বলল, ‘আপনাকেও তো ছোটো দাদা বেঁচে থাকতে না কি নিষেধ করেছিলেন। আপনি কি বারণ শুনেছিলেন?’
-‘আমি না শুনে ঢুকেছি বলেই তো বুঝছি অরাজকতার দেশে সৎ হয়ে অন্তত পলিটিক্স করা সম্ভব না৷ তাই বলে কি আমার ছেলেপুলেদেরও সেদিকেই ঠেলব?’
হাসল শুধু নাওফিল৷ সোহাইলকে রেখে রান্নাঘরে এসে দীধিতির খুব কাছে এসে দাড়াল হঠাৎ। চাপাস্বরে রাগ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘রুনা কোথায়?’
পানিতে চিনি গুলে দিতে দিতেই উত্তর দিলো, ‘ছাদে।’ কোনো ভনিতা করল না দীধিতি।
-‘এই দুপুরবেলা ছাদে কী করছে ও?’
-‘বাড়ির সবখানে গোপন ক্যামেরা রেখেছ আর ছাদের প্রতিটা কোনায় কোনায় রাখতে পারোনি? তাহলে আর আমার থেকে কৈফিয়ত চাইতে হত না৷’
-‘সরাসরি উত্তর দাও বলছি।’ চাপাস্বরেই ধমকাল নাওফিল।
কিন্তু দীধিতি তাতে ভ্রুক্ষেপও করল না৷ ওর হাতে একটা শরবতের গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে সোহাইলের কাছে এসে তাকে দ্বিতীয় গ্লাসটা দিয়ে বলল, ‘শরবতটা খেয়ে একটু ঘরে গিয়ে রেস্ট করবে চলো৷ অসুস্থ লাগছে তোমাকে।’
নাওফিল এসে বসল তখন তার পাশেই। শরবতটা কয়েক চুমুকে শেষ করে জিজ্ঞেস করলেন সোহাইল, ‘কিরণের আসতে কি আধা ঘণ্টার বেশি লাগবে?’
-‘জ্যামের জন্য একটু লেট হচ্ছে হয়ত। ও না আসা অবধি আপনি ঘরে গিয়ে রেস্ট করেন, কাকু।’ নাওফিল বলল।
দীধিতি বুঝতে পারছে খুব জরুরি কোনো কাজে এসেছেন সোহাইল। সে কাজটাও হয়ত তার আর কিরণের সাথেই৷ তাহলে কি মায়ের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে এসেছেন তিনি? আজ বেলা এগারোটার সময়ও তো ফোনে কথা বললেন ঝুমুর৷ সুস্থই আছে বললেন৷ সোহাইল শেখের ব্যাপারে তেমন কোনো কথা তো মা বললেন না৷ তাহলে কী দরকারে এলেন তিনি?
নাওফিল, দীধিতির অনুরোধে সোহাইল সত্যিই একটু বিশ্রাম নিতে উপরে চলে এলেন৷ তাওসিফের ঘরটাতেই তাকে রেখে এলো ওরা। তারপরই বাসার বাইরে বের হলো নাওফিল৷ তা দেখে দীধিতিও পিছু পিছু ছুটল, ‘কোথায় যাও তুমি?’
কোনো জবাব দিলো না নাওফিল। দুজন এক সঙ্গেই এলিভেটরে ঢুকল। দীধিতি বুঝতে পারল রুনার খোঁজে বেরিয়েছে সে। তবু কিছু বলল না৷ ছাদে পৌঁছনোর পর নাওফিল ট্যারেসে এগোলো৷ দীধিতি নির্বিকারভাবেই পিছু পিছুই যেতে থাকল তার। রুনাকে দেখতে পেলো নাওফিল, এই রোদের মধ্যেই ডিভানে চিত হয়ে শুয়ে আছে সে৷ চিত্রটা একটু অস্বাভাবিক লাগছে। নিস্তেজ মানুষের মতো লাগছে দূর থেকে৷ ওর কাছে এসেই নাওফিল আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, ‘স্মরণ! কী করেছ তুমি ওকে?’
মেজাজ খারাপ হচ্ছে দীধিতির৷ তাই কোনো সাড়া দিলো না। চুপচাপ দাড়িয়ে রইল বুকের ওপর হাত বেঁধে। রুনার চোয়ালের শেষ দিকে ব্যান্ডেজ করা দেখে নাওফিল ওকে ডাকতে থাকল অনবরত। ওর থেকেও কোনো সাড়া না পেয়ে গায়ে স্পর্শ করে ডাকতে গেলে তখন দীধিতি হুঁশিয়ার করে উঠল, ‘একদম ছোঁবে না ডাইনিটাকে।’ বলেই টেবিলে রাখা পানির জগটা এনে ঢালতে থাকল রুনার মুখের ওপর। তার মাঝেই জ্ঞানহারা রুনা চোখ মেলে কাতর গলায় ‘পানি! পানি!’ বলতে থাকল৷ নাওফিল রক্তিম চোখে দীধিতির দিকে তাকিয়ে তখন৷ সেদিকে পাত্তা দিলো না দীধিতি৷ নিষ্ঠুরের মতো জগের বাকি পানিটুকু রুনার ঠোঁটের ওপর ঢালতে থাকল৷ বুভুক্ষর মতোই হা করে পানির স্বাদটুকু গ্রহণ করল রুনা। কিন্তু পরাণ ভরে তা পান করতে দিলো না দীধিতি। খুবই নির্মম এক আচরণ! ‘তুমি ওকে টর্চার করেছ কেন, স্মরণ? আর এটা কী আচরণ তোমার? পানি দাও ওকে। আমার তো তোমার কার্যকলাপে তোমাকেই ডাইনি লাগছে।’
শেষ কথাদুটো স্পষ্টই কানে গেল রুনার। তা শুনতে পেয়েই আহ্লাদে ভেসে আবেগী কান্না ঠেলে বের হলো ওর৷ ‘উঁউউ… উঁউউ’ করে নিজস্ব কায়দায় কাঁদতে আরম্ভ করল সে৷ অর্থাৎ নাওফিল দীধিতিকে ডাইনি বলায় সে বেজায় সন্তুষ্ট৷
আর সেটা বুঝতে পেরেই দীধিতি নিয়ন্ত্রণহারা রাগে ফেটে পড়ল৷ জগের তলায় থাকা শেষ পানিটুকু নাওফিলের মুখে ছুঁড়ে মেরে জগটাই আছড়ে ফেলল মেঝেতে। আচমকা কাচ চূর্ণ হওয়ার ঝনঝন আওয়াজে রুনা আতঙ্কে কান্নাস্বরেই ‘ও আল্লাহ’ বলে চেঁচিয়ে উঠে বসে পড়ল তখন।
-‘তোমার চৌদ্দগোষ্ঠী আর এই নোংরা মেয়েটা ডাইনি। আমাকে বাস্টার্ড বলে এরা সবাই নিজেদের মাঝে। আমি ডাইনি সেটা বিয়ে করার আগে মনে হয়নি তোমার?’ খেপে উঠল দীধিতি।
নাওফিল একদমই সমর্থন করল না তাকে, ‘তোমাকে দেখে কুকুর ঘেউঘেউ করে উঠলে তুমিও কি কুকুরের মতো করেই ঘেউঘেউ করবে? ওকে তোমার টর্চার করা একদমই ঠিক হয়নি। কী করেছ তুমি ওর ফেসে? এত বড়ো ব্যান্ডেজ কেন প্রয়োজন হয়েছে ওর?’
-‘কে বলেছে টর্চার করেছি ওকে? ওকে আমি খুনই করতে চেয়েছিলাম ছুরি দিয়ে। কিন্তু করিনি, যেটা ওর ভাগ্য। উলটে ট্রিটমেন্ট দিয়েছি। ওর মতো স্লাট আমাকে বলে কিনা আমি নাওফিল শেখের যোগ্য না! তাহলে কি ও ভীষণ যোগ্য তোমার? কত বড়ো স্পর্ধা হলে তোমাকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করে ও! আর ওর প্রতিটা কার্যকলাপও সন্দেহজনক। আমার ঘরের বাইরে দাড়িয়ে আড়ি পেতে থাকে, যখন তখন ছাদে এসে ফোনে কী যেন করে। ওকে আজকের মধ্যে এই বাড়ি থেকে না তাড়ালে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে এবার সত্যিই খুন করব।’
রুনার গুনগুনিয়ে কান্না থেমে নেই৷ নাওফিলের মুখপানে অসহায় চোখে চেয়ে আছে। যেন একমাত্র অভিভাবক এবং রক্ষাকর্তা নাওফিলই ওর জন্য। আর নাওফিল! সরল রূপের বউকে হঠাৎ এমন সাংঘাতিক হয়ে উঠতে দেখে টেনশনে পড়ে গেছে, অনেকটা আশ্চর্যও হয়েছে। ‘সিরিয়াসলি? তুমি ছুরি দিয়ে ওকে খুন করতে চেয়েছিলে? ও আমাকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করলেই কি আমি ওকে আমার বেডরুমে নিয়ে যাব? তুমি কীভাবে এত বড়ো অঘটন ঘটাতে গিয়েছিলে? সন্ত্রাস মেয়ে একটা!’ প্রচণ্ড রেগেও গেছে নাওফিল৷ এত বেশি বাড়াবাড়ি সে আশা করেনি দীধিতির থেকে।
এদিকে দীধিতি রুনার পক্ষে নাওফিলের এই প্রতিক্রিয়া দেখে রাগে, দুঃখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। চেঁচিয়ে বলল, ‘আমি সন্ত্রাস না। তুমি আর তোমার বাপ, চাচা সন্ত্রাস! সন্ত্রাসের বাচ্চা তুমি!’ বলা শেষে কালক্ষেপণ না করে বেরিয়ে পড়ল ট্যারেস থেকে৷
কিন্তু নাওফিল সহ্য করল না সন্ত্রাসের বাচ্চা অপবাদটা। ‘আমি সন্ত্রাসের বাচ্চা হলে তুমিও সন্ত্রাসের বাচ্চা!’ ফিরতি জবাবটা অবিলম্বেই ছুঁড়ে দিলো পেছন থেকে। তখনই দাড়িয়ে পড়ল দীধিতি৷ দাঁতে দাঁত চিবিয়ে হুমকিস্বরূপ বলল তাকে, ‘রাতে এসো খালি আমার কাছে। ছেঁচে দেবো একদম!’ গটগটিয়ে চলে গেল এরপর। দেখতে পেলো না দাড়িয়ে থাকা নাওফিলের আহাম্মক বনে যাওয়া মুখটা৷ মারাত্মক হুমকিটা শুনে বিড়বিড় করে উঠল নাওফিল, ‘কী সব থ্রেট! পাগল ছাগল!’
আজকে সকাল থেকেই দীধিতির শান্ত, শীতল হাবভাব অস্বাভাবিক লেগেছিল নাওফিলের কাছে৷ তাই অফিস গিয়েও সর্বক্ষণ চোখে চোখে রেখেছে দুজনকে। সর্বোচ্চ ভেবেছিল সে, রুনাকে হয়ত কয়েকটা চড় থাপ্পড় কষে বাসা থেকে বের করে দিতে পারে দীধিতি। যেটা দীধিতির জন্য অস্বাভাবিক নয় বটে৷ কিন্তু এই মুহূর্তে তা চায় না নাওফিল। কারণ, আজকের রাতটা এমনিতেই রুনার জন্য ভয়াবহ হতে চলেছে৷ কত কথা জানার আছে এই জাসু মেয়েটার থেকে! সব বানচাল না হয়ে যায় রুনা অসুস্থ হয়ে পড়লে৷
সুর করে কান্নাটা বহাল রেখে রুনা নিজের জন্য সাফাই গাইল তখন, ‘বিশ্বাস করেন, স্যার৷ আমি এসব কিচ্ছু বলিনি ম্যামকে৷ উলটে ম্যামই চোটপাট শুরু করল আমাকে রান্নার জন্য এনেছেন বলে।’
-‘এই তোমার গান বন্ধ করো তো। অসহ্য লাগছে কানের কাছে৷ ঘরে যাও, ঘরে গিয়ে রেস্ট নাও৷ আমি মেডিসিনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। বাসায় মেহমান। কোনোরকম কান্নাকাটি করবে না।’ ধমকে বলল নাওফিল।
-‘আচ্ছা। আর আমার ফোনটা স্যার? ওটা তো ম্যাম রেখে দিলেন।’ মিনমিন গলায় জানাল রুনা।
নাওফিলের মুখভঙ্গি মুহূর্তেই বদলে গেল৷ ‘গ্রেট! গুণ্ডা বউ দেখি কাজের কাজ করেছে একটা।’ মনে মনে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলো সে৷ কিন্তু রুনাকে গম্ভীর গলায় বলল, ‘এখন না৷ মাথা গরম আছে ওর, পরে এনে দেবো। তুমি নিচে চলো।’
-‘কিন্তু স্যার ফোনটা খুব দরকার ছিল।’ এইটুকু বেলার মধ্যেই মুখ চোখ পুরো শুকিয়ে গেছে রুনার৷ শরীরের ব্যথা আর মনে ভয় বলে কথা।
-‘জান আগে না ফোন আগে তোমার?’ ধমকাল নাওফিল আরেকবার।
রুনাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে নাওফিল ফ্রেশ হতে হতেই কিরণ বাসায় চলে এলো৷ সোহাইল তা জানতে পেরে আর দেরি করলেন না আলোচনায় বসতে। টি টেবিলে নাশতা যেমন করে সাজানো ছিল তেমনই আছে৷ এতক্ষণে একটা দানাপানিও মুখে তোলেননি তিনি৷ কতবার অনুরোধ করল তাকে সবাই কিছু মুখে তুলতে৷ কিন্তু কথা শেষ না করে তিনি কিছু খাবেন না। কিরণ তার পাশে এসে বসল। দীধিতি আর নাওফিল মুখোমুখি সোফাতে পাশাপাশি বসল। এরপরই আলোচনা প্রসঙ্গ শুরু হলো। নাওফিলকে ভাবনাতীত বলে বসলেন সোহাইল, ‘আমি তোর শ্বশুর হতে চাই, বাপ৷’
-‘হ্যাঁ?’ হতবুদ্ধি হলো নাওফিল। কিন্তু দীধিতি আর কিরণ ঠিকই বুঝল। কিরণ তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, ‘তাহলে ফাইনালি আম্মু তোমাকে চান্স দিচ্ছে, কাকু?’
-‘চুপ কর নির্লজ্জ!’ ধমকাল দীধিতি।
নাওফিল শুনেছিল এ বিষয়ে ইয়াসিফের কাছে৷ কিন্তু তখন নিজের ব্যাপারগুলো নিয়েই এত বেশি চাপে ছিল যে, সোহাইল শেখ আর ঝুমুরের বিষয়টি মাথা থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। ‘আমাকে একটু খুলে বলো তোমরা৷ কাকু কী বললেন আমি ক্লিয়ারলি বুঝিনি।’
হতাশ সুরে বললেন সোহাইল, ‘যা বুঝেছিস বাপ তাই ঢের। আমার বিয়েটা আব্বা আম্মা দেখে যেতে পারলেন না বলে কম কথা তো শুনি না বোনদের কাছে৷ স্মরণ আর কিরণের মায়ের আশায় থেকে থেকে আজ এই পর্যন্ত। আমি যতটা পেরেছি ততটাই স্মরণ আর কিরণের খেয়াল রাখার চেষ্টা করেছি ওদের বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে৷ কতবার বেহায়ার মতো প্রস্তাব রেখেছি ঝুমুরের কাছে৷ তার একটা অজুহাতই ছিল আমাকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়ার৷ সেটা হলো মেয়েদের ভবিষ্যত গড়ে না দেওয়া পর্যন্ত, সুপাত্রে ওদের না তুলে দেওয়া পর্যন্ত আমার প্রস্তাবে সে আগ্রহী হতে পারবে না৷ আমিও অপেক্ষাতে থাকলাম। দেখতে দেখতে স্মরণ সুপাত্র পেয়ে গেল৷ কিরণের জন্যও শুনলাম সৌরভের বাড়িতে কথা চলছিল৷ হঠাৎ করে তা বন্ধ হয়ে গেল৷ ঝুমুর তা নিয়ে কেমন মুষড়ে পড়েছিল মাঝে। আমি দূর থেকেই খেয়াল রাখার চেষ্টা করি। যতটা শোভা পায়। কিন্তু গত পরশু আমি ঢাকায় আসি৷ আর সেদিনই শুনি ঝুমুরকে বাথরুমে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে পেয়েছে শিউলি৷ মাথাও কেটে গেছে নাকি৷ সৌরভের বাবা মা সেদিন ছিল না বাড়িতে৷ যে তাদের সাহায্য নেবে শিউলি। বেচারি ভয় পেলেও ভাগ্যিস আমার কথা মনে করে কল করেছিল৷ আমি তক্ষুনি লোক পাঠাই। তারা গিয়ে দ্রুত হসপিটাল নেয় ঝুমুরকে৷ আগে তো হাই প্রেশার ছিল৷ তার ওপর ডায়াবেটিসও ধরা পড়েছে৷ গুরুতর অবস্থা হতে পারত সেদিন। যদি সঠিক সময়ে হসপিটাল না নেওয়া হত। কালই রিলিজ করে দিয়েছে। এখন আলহামদুলিল্লাহ সুস্থ সে৷ এই বয়সে তার পাশে একজন মানুষ দরকার৷ আমার নিজেরও প্রয়োজন। তাই গতকাল ঢাকা থেকে যশোর ফিরেই তার সঙ্গে দেখা করি এবং আবারও বেহায়ার মতো প্রস্তাব রাখি। কিন্তু এবার সে কী অজুহাত দিলো জানিস? তার জামাই হয়ে গেছে, কয়দিন পর নাতি নাতনি হবে৷ এখন আর এসব নিয়ে ভাবতে চায় না সে৷ অথচ আমি যে বছরের পর বছর তার আশায় যৌবনকাল পার করে বৃদ্ধকালে চলে এলাম। আমার অপেক্ষার কি কোনো মূল্য নেই?’
দীধিতি, কিরণ, দুজনই কেঁদে ফেলল৷ জিজ্ঞেস করল দীধিতি, ‘আমাদের একবারও কেউ জানাল না আম্মুর অবস্থা? আজকে যখন কথা বললাম, তখনও একটাবার বলল না আম্মু।’
-‘সে বলবেও না কোনোদিন। কিরণ এখন তোর কাছে৷ কিরণকে নিয়ে তো আর কোনো চিন্তা নেই৷ একার মতো একা পড়ে থাকবে ঘরের মধ্যে, ঠিকমতো নিজের খেয়াল নেবে না৷ আর দুইদিন পরপরই এরকম অসুস্থ হয়ে পড়বে৷ অথচ সে নিজেও একজন ডাক্তার৷ কিন্তু নিজের জন্য কেয়ারলেস সে।’ অভিযোগ গলায় বললেন সোহাইল।
কিরণ কাঁদতে কাঁদতে বলে দিলো, ‘তুমি আর আম্মুর কথা শুনো না। আমরা রাজি। আম্মুকে আমাদের জন্য নিজের জীবনকে আর হেলাফেলা করতে দেবো না। প্রয়োজনে বিয়ের সময় আমরা থাকব না সামনে। যেন আড়ষ্ট না হয় আম্মু৷ তাও তোমাদের বিয়েটা এখনই হওয়া দরকার।’
মুখে যা এলো তা-ই বলে দিলো কিরণ৷ কোথায়, কীভাবে, কতটুকু বলতে হবে, কতটুকু সংযত হতে হবে, এসবের ধারে কাছেও গেল না সে। অকপটে এসব কথা শুনে সোহাইল, নাওফিল, দীধিতি, তিনজনই কিছুটা বিব্রত হলেও কেউ কিছু বলল না কিরণকে ছোটো মানুষ ভেবেই। সোহাইল বললেন নাওফিলকে, ‘আমি গতকাল খুব রিয়্যাক্ট করে ফেলেছিলাম। অধৈর্য হয়ে পড়েছিলাম খুব৷ আমার বোনদের ফোন করে বলেছিলাম তাকে একটু বোঝাতে৷ তখন ঝুমুর তাদের বহু অনুরোধকে বোধ হয় সরাসরি নাকোচ করতে পারেনি৷ যাকগে তাও অন্তত যে বলেছে , আমার বড়ো মেয়ে, বড়ো জামাই আছে। তারা যথেষ্ট বুঝদার মানুষ৷ বলতে গেলে এই শেষ বয়সে আমার জীবনের এমন একটা সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি না৷ আমার এই সিদ্ধান্তের সাথে ওদের সম্মানও জড়িয়ে৷ এ ব্যাপারে ওরা যেটা বিবেচনা করবে আমি সেটাই করব।’
-‘এজন্যই কি আম্মু সকালে জিজ্ঞেস করেছিল নাওফিল ফ্রি হবে কখন?’ স্বগতোক্তির মতো বলল দীধিতি।
-‘হতে পারে৷ তবে আমার বিশ্বাস সে তোদেরকে বলবে আমি যদি তোদের কাছে আমার প্রস্তাব রাখি, তোরা যেন না করে দিস৷ আর এজন্যই আমি ছুটে আসছি তোদের কাছে৷ এখন তোরা বিবেচনা কর আমার দিকটাও আর তার দিকটাও৷ তোরা যা বলবি আমি তাই মেনে নেব।’ সোহাইল নাওফিলের দিকে চেয়েই বললেন। তিনি নাওফিলের থেকে সাহায্য আশা করছেন আর তা নাওফিল তার চোখের চাউনি দেখেই বুঝে নিলো।
যদিও এ ব্যাপারগুলো বাস্তবিকই খুব জটিল এবং সমালোচিত ব্যাপার। তবে সোহাইল শেখ নাওফিলের পরিবারের দূরের কেউ নন। মাহতাব শেখের ছোটো ভাইয়ের একমাত্র সন্তান সোহাইল শেখ। জান্নাতি বেগম নিজের গোষ্ঠীর ছেলেপুলেদের ভীষণ আদর সোহাগ করেন মেয়েদের তুলনায়।
এই যে সোহাইল আজও অবিবাহিত থেকে গেছেন যে নারীর জন্য, সে নারীকে তিনি যে কত গালমন্দ করেছেন! তাই এই বুড়ো বয়সেও সোহাইলের বিয়ের খবরটা শেখ গোষ্ঠীর মধ্যে জানাজানি হলে ইদের দিনের মতোই আনন্দিত হবে সবাই। তবে জান্নাতি বেগম যখন জানতে পারবেন সেই নারী স্বয়ং নাওফিলেরই শাশুড়ি, তখন এর মাশুলগুলো গুনতে হবে দীধিতিকে৷ এমনিতেই তো তিনি সহ্য করেন না ওকে৷ উপরন্তু ঝুমুর সোহাইলের আকাঙ্ক্ষিত নারী। তার বউ হওয়ার পর আরও বিষ হবে দীধিতি জান্নাতি বেগমের চোখে৷ এটা খুবই ভাবনার বিষয়৷ তাই নাওফিল সোহাইল শেখের আকুতিভরা চাউনিকে এড়িয়ে দীধিতি আর কিরণকে বলল, ‘তোমরা দুজনই বাস্তবতা অনেকটা বোঝো৷ কিরণ কম বুঝলেও স্মরণ যথেষ্ট বুঝদার। তাই আবেগ থেকে বেশি প্রাধান্য দেবে তোমরা বিবেককে৷ যে সিদ্ধান্ত নেবে তার ভবিষ্যতটাও কী হতে পারে বা কেমন হতে পারে, সে ব্যাপারেও একটু ভেবো৷ যদিও ভবিষ্যত কী হবে তা আল্লাহ পাকই নির্ধারণ করে রেখেছেন৷ কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি দেখেও অনেক সময় ভবিষ্যতের পরিস্থিতি কিছুটা আন্দাজ করা যায়৷ তাই তোমরা যা ভাববে তা ঠান্ডা মাথায় ভাববে৷ আমি এ ব্যাপারে কোনো কোনো মতামত রাখছি না আপাতত। কারণ, তোমরা যেটা চাইবে আমি সেটাতেই সায় দেবো।’
সোহাইল শেখ সহমত বোঝাতে মাথা দুলালেন। তবে মনেমনে একটু অখুশিই হয়েছেন নাওফিলকে তার হয়ে কথা না বলার জন্য।
কিরণ চুপচাপ রইল বড়ো বোনের মতামতের আশায়৷ কারণ, এই বিয়েটা হলে তার ভালো-মন্দ প্রভাবটা এই মুহূর্তে বেশি পড়বে দীধিতির শ্বশুর বাড়িতেই৷ ও-ও জানে, সেখানের মানুষগুলো এখন পর্যন্ত ওর বোনতে খুশিমনে গ্রহণ করেনি৷
নাওফিলও একইভাবে দীধিতির মতামতের অপেক্ষায়। সত্যি বলতে এখানে সে অনেকটা স্বার্থপরের মতো ভাবছে৷ সে চাইছে না ঝুমুর আর সোহাইলের বিয়েটা হোক৷ এই বিয়েটার জন্য নিজের বউয়ের ওপর অশান্তি বয়ে আসা সে সহ্য করতে পারবে না।
খুব বেশি আর অপেক্ষা করতে হলো না কাউকে৷ দীধিতি চপল সুরে সোহাইলকে বলল, ‘আমরা সম্মতি দিয়ে দিলে আম্মুকে রাজি করতে তো আর বেগ পেতে হবে না তোমাকে, তাই না?’
বড়ো একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সোহাইল৷ তিনিও হাসিখুশি মুখে বললেন, ‘নাহ, এতকাল তো এই অজুহাতেই আমাকে আটকে রেখেছে৷ তোদের সম্মতি পত্র তার মুখের ওপর তুলে ধরলে সে আর সহজে আমাকে ফেরানোর সুযোগ পাবে না।’
-‘তাহলে আম্মুকে আমি আর কিরণ যা বলার বলব। প্রয়োজনে তার একমাত্র জামাইও বলবে৷ বাকি যা বলার বা যা করার তুমি ফিরে গিয়ে কোরো৷’
নাওফিল কপট হাসি টানল মুখে৷ কিন্তু আদতে সে ঝুমুরের সঙ্গে কথা বলতে একটুও আগ্রহী নয়৷ এই মহিলা তাকে আর স্মরণকে কেমন আপন ভাবে তা সে ভালোই জানে। আজ অবধি জামাই আদরের চিন্তাও করেননি তিনি৷ কিরণ এখানে আছে বলেই বাধ্য হয়ে প্রতিদিন দীধিতির সাথে কথা বলেন। তা কি সে বোঝে না? এমনকি দীধিতিও বোঝে।
কিরণ বেশ খুশি৷ ‘আপু, মিষ্টি মুখ করা উচিত আমাদের৷’ দীধিতিও আনন্দ চোখে বলল, ‘নিশ্চয়ই। বসো তোমরা আমি মিষ্টি নিয়ে আসি।’
-‘চল, আমিও যাব।’ কিরণ উঠে পড়ল।
ওরা দু’বোন যেতেই নাওফিলকে ইশারায় কাছে এসে বসতে বললেন সোহাইল। নাওফিল এলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই মন থেকে রাজি আছিস তো? ঝুমুর কিন্তু তোর সঙ্গে কথা বলবে।’
-‘আচ্ছা সমস্যা নেই৷ স্মরণ যেখানে রাজি সেখানে শাশুড়িকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করব আমি নিশ্চয়ই। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।’
-‘তুই বিশ্বাস করবি কি না জানি না। এই দুটো মেয়েকে কখনই ঝামেলা মনে করিনি বা আমার বাধা মনে করিনি৷ এতিম দুটো বাচ্চাকে চোখের সামনে দেখতে দেখতে কখন যে স্নেহে জড়িয়ে নিয়েছি ওদের, তা আমিও টের পাইনি৷ এই তো সেদিন কিরণের সঙ্গে কত বড়ো একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সারা যশোর তল্লাশি চালিয়ে আমি কুত্তার বাচ্চা দুইটার লাইফ হেল করে দিয়েছি৷ আমি সর্বক্ষণ চেষ্টা করেছি এই তিনটা মানুষকে সব সময় আগলে রাখার।’
কথাগুলো শেষ করে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত সুদর্শন সোহাইল সোফায় মাথা এলিয়ে দিলেন। তবে ক্লান্তিতে নয়, পরম শান্তিতে৷ কতদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে তার। বয়সটা ঠেকেছে চল্লিশের ওপারে, চুলে একটু আধটু পাকও ধরেছে। কিন্তু ঝুমুর নারীটিকে পাওয়ার তৃষ্ণা আর মিটেনি। তা ভাবতে ভাবতেই বিড়বিড়িয়ে স্বগতোক্তির মতো বলে উঠলেন, ‘কত পথ পেরিয়ে অবশেষে!’
তখনই নাওফিল অপ্রত্যাশিত প্রসঙ্গ তুলল, ‘স্মরণের সঙ্গে হওয়া দুর্ঘটনাটা আরও ভয়ঙ্কর ছিল, তাই না কাকু?’
-‘কোন দুর্ঘটনা? স্মরণের সঙ্গে তাও?’ সোহাইলের ভ্রু কুচকে গেল। তা দেখে নাওফিল বেশ অবাক হলেও স্বাভাবিকভাবে মনে করিয়ে দিলো, ‘সৌরভ আর স্মরণকে কিডন্যাপ করার পর যা হয়েছিল ওদের সাথে।’
-‘ওহো… হ্যাঁ হ্যাঁ৷ কয়েক বছর আগের ঘটনা ছিল ওটা৷ তোকে বলেছে স্মরণ?’
-‘হুঁ। কিন্তু খুব বেশি বিস্তারিত বলতে পারেনি৷ ও তো সেন্সেই ছিল না সেদিন।’
-‘হ্যাঁ, সৌরভ আর ওকে হঠাৎ করেই কিডন্যাপ করে একটা দল৷ সৌরভও খুব পরিষ্কার বলতে পারেনি ঘটনাটা। যার জন্যই কিডন্যাপারদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।’
নাওফিলের কপালও কিঞ্চিৎ কুচকাল এ কথায়, ‘সৌরভ ক্লিয়ার করে কিছু বলেনি পুলিশদের?’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫১
-‘নাহ, ও-ও তো সেন্সে ছিল না৷ ওর বুকে ছুরি লেগেছিল। হসপিটাল নিয়ে আসার পর ডাক্তাররা ওর শরীরে ডেঞ্জারাস ড্রাগস পায়৷ জ্ঞান ফিরলে স্মরণকে খোঁজে শুধু। ওকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তখন
একবার বলে লোকগুলো ওকে আর স্মরণকে খুন করতে চেয়েছিল৷ আরেকবার বলে স্মরণের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। পুলিশ ওর থেকে কার্যকরী কোনো ক্লু পায়নি বলেই লোকগুলোকে ধরা যায়নি।’
