আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ১০
DRM Shohag
আসমানী নওয়ান রান্নাঘরে ছিল। বিধায় এতক্ষণ অরুণের চিৎকার শুনতে পায়নি। রান্নাঘর থেকে বেরোতেই অরুণের ঘর থেকে চেঁচামেচির শব্দ শুনে তিনি সেদিকে এগোয়। এর মধ্যে কলিংবেল বেজে উঠলে তিনি এগিয়ে এসে দরজা খুলে দেয়। নিয়াজকে দেখে মৃদু হেসে বলে, “ভেতরে এসো বাবা।”
নিয়াজকে তিনি নিজেই আসতে বলেছিলেন। কলে কথা হয়েছিল নিয়াজের সঙ্গে। এরপর সন্ধ্যার সাথে ভালোভাবে কথা বলার জন্য নিয়াজকে বাড়িতে আসতে বলেছে। নিয়াজ ভেতরে প্রবেশ করলে তিনি দরজা আটকে দেয়। নিয়াজ অরুণের চেঁচামেচি শুনে বলে,
“কিছু কি হয়েছে আন্টি?”
আসমানী নওয়ান অরুণের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে, “কি যে বাবা! দেখি কি হয়েছে। তুমি বসো।”
তখনই আকাশের রাগান্বিত স্বর ভেসে আসে। নিয়াজ বুঝল আকাশ আর অরুণের মাঝেই কিছু হয়েছে। তাই সে না বসে আসমানী নওয়ানের পিছু পিছু যায়। ঘরের ভেতর এসে আকাশ, অরুণ আর সন্ধ্যাকে এভাবে ত্রিভুজ আকারে দেখে নিয়াজ আর আসমানী নওয়ান অবাক হয়।
অরুণ তার প্যান্ট ধরে টানছে। আর সন্ধ্যা আকাশের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফটাচ্ছে।
আসমানী নওয়ান এগিয়ে এসে বলে,
“আকাশ কি করছ? ওদের এভাবে ধরে রেখেছ কেন?”
আকাশ মায়ের দিকে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে, “ওরা উল্টাপাল্টা কাজ করছিল। তুমি চুপ কর মা।”
সন্ধ্যার রা’গ হয়। তারা উল্টাপাল্টা কাজ করছিল মানে কি? সন্ধ্যা উপায় না পেয়ে ডান হাত উঠিয়ে আকাশের মুখে খামচে দেয়। আকাশ চোখমুখ কুঁচকে নেয়। তার দু’হাত ঢিলে হয়ে যায়। সুযোগ পেয়ে সন্ধ্যা দ্রুত আকাশের থেকে সরে আসমানী নওয়ানের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
অরুণ তার প্যান্ট টেনে ধরে উল্টোদিকে ভর দিয়ে রেখেছিল ছাড়া পাবার আশায়। ওদিকে আকাশও একই সাথে অরুণের প্যান্ট উল্টোদিক থেকে ধরে রেখেছিল। হঠাৎ আকাশের হাত আলগা হয়ে যাওয়ায় অরুণ চটকে গিয়ে বিছানা থেকে একদম মেঝেতে গিয়ে ধপাস করে পড়ে যায়। শব্দ পেয়ে সকলে তাকায়। অরুণের অবস্থা দেখে নিয়াজ শব্দ করে হেসে দেয়। সন্ধ্যা নিজেও হাসে। আসমানী নওয়ানের হাসি পেলেও তিনি হাসি আটকালেন। অরুণ নিয়াজের দিকে কাঁদোকাঁদো মুখে চেয়ে বলে,
“নিয়াজ শা’লা তুমি কোন সুখে হাসছ হ্যাঁ?”
নিয়াজ কোনোরকমে হাসি আটকায়। বা হাত উঠিয়ে বলে, “স্যরি! তোমার সিচুয়েশনটা অনেক হাস্যকর ছিল। স্যরি হ্যাঁ?”
নিয়াজের কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা বা দিকে ফিরে। নিয়াজকে দেখে জিজ্ঞেস করে,
“কেমন আছেন নিয়াজ ভাইয়া?”
নিয়াজ উত্তর করে,
“আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো? তোমার খোঁজ নিতেই আসলাম। ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে তোমার সাথে।”
সন্ধ্যা ছোট করে বলে, সে ভালো আছে। জিজ্ঞেস করে, “কি কথা ভাইয়া?”
নিয়াজ আড়চোখে আকাশের দিকে একবার তাকায়। যে সন্ধ্যার দিকে খেয়ে ফেলা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। নিয়াজ মনে মনে হাসল। অতঃপর সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বলে, “বাইরে এসো। বসে কথা বলি।”
সন্ধ্যা মাথা নেড়ে এগোয়। আসমানী নওয়ানও সম্মতি দেয়। তিনি তো জানেনই, নিয়াজ সন্ধ্যার সাথে কথা বলতেই এসেছে। সে সবাইকে খাওয়ার জন্য যেতে বলে আগে আগে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
আসমানী নওয়ানের পিছু পিছু সন্ধ্যা এগোয়। তার পিছু নিয়াজ। আকাশ রা’গে ফোঁসফোঁস করতে করতে সন্ধ্যাকে ধরতে এগোয়, তখনই নিয়াজ উল্টো ফিরে আকাশকে এভাবে এগোতে দেখে দ্রুত আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
“আকাশ কি হয়েছে?”
আওয়াজ পেয়ে সন্ধ্যাও পিছু ফিরে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “এই বে’য়া’দ’ব মেয়ের ক্যারেক্টার চাপকে ভালো করব আমি।”
কথাটা বলে আকাশ নিয়াজকে ধাক্কা দিয়ে সন্ধ্যার দিকে এগোলে সন্ধ্যা রাগান্বিত আকাশকে দেখে গুটিয়ে যায়। সে কি করেছে, ঠিক বুঝতে পারছে না।
আকাশের ধাক্কা খেয়ে নিয়াজ বা দিকে দু’পা সরে যায়। নিজেকে সামলে বলে,
“সন্ধ্যা তোমার কেউ না আকাশ। তাই ওর ক্যারেক্টার একেবারে লুজ হলেও তোমার কোনো প্রবলেম হওয়ার কথা না, রাইট?”
নিয়াজের কথায় আকাশের পা থেমে যায় একদম সন্ধ্যার মুখোমুখি এসে। যা বলার জন্য মুখ খুলতে নিয়েছিল সে কথাগুলো গিলে নেয়। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে সন্ধ্যার দিকে চেয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,
“রাইট। আই হ্যাড নো প্রবলেম। বাট, এই বাড়িতে থাকতে হলে ক্যারেক্টার ভালো রাখতে হবে। আদারওয়াইজ, একদম জ’বাই করে ফেলব।”
কথাটা বলে বা হাতে সন্ধ্যার কাঁধ ধরে সন্ধ্যাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। সন্ধ্যা পড়তে পড়তে দরজা ধরে নিজেকে সামলে নেয়। অবাক হয়ে দেখে আকাশের প্রস্থান। আকাশ কি তার ক্যারেক্টার খারাপ বোঝালো? সন্ধ্যা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। এটাও দেখার বাকি ছিল তবে?
নিয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্ধ্যার সামনে এসে দাঁড়ায়। ডাকে, “সন্ধ্যা?”
সন্ধ্যা দ্রুত নিজেকে সামলে ধরা গলায় বলে, “জ্বি ভাইয়া?”
নিয়াজ মৃদুস্বরে বলে,
“তোমার তো খুশি হওয়া উচিৎ। আকাশ তোমার ক্যারেক্টার খারাপ মিন করলেও ও তোমার পাশে কোনো ছেলেকে টলারেট করতে পারছে না। আমাদের সাথে ঘটা ঘটনাগুলো ওর মনে নেই বলে এরকম রিয়েকশন দিচ্ছে। বুঝতে পেরেছ?”
সন্ধ্যা মাথা নেড়ে বোঝালো সে বুঝেছে। কিন্তু আকাশ ডিরেক্লি তাকে ক্যারেক্টারলেস বলে গেল। এতেই সন্ধ্যার ছোট মন ব্য’থায় ভরে ওঠে।
নিয়াজ আবারো বলে,
“তোমাকে কিছু সমাধান দিতে এসেছি। চলো বসে কথা বলি।”
সন্ধ্যা সম্মতি দিয়ে এগোতে নিলে পিছন থেকে অরুণ বলে, “কি প্ল্যান করছ তোমরা? আমিও শুনতে চাই।”
নিয়াজ এগিয়ে এসে অরুণের বেডের উপর বসল। অরুণ-ও কমফোর্ট এর ভেতর ভালোভাবে বসল। সন্ধ্যা একটি চেয়ার টেনে বসে। নিয়াজ গলা ঝেড়ে বলে,
“একটি মানুষের স্মৃতি ন’ষ্ট হয়ে গেলেও, সে আগে কাউকে ভালোবাসলে, সেই অনুভূতি কখনো ম’রে যায় না। বরং একদম আগের ন্যায় সতেজ থাকে। শুধু সে ধরতে পারেনা। ভালোবাসা হৃদয় দ্বারা অনুভব করলেও, এসব চালিত হয় মস্তিষ্ক দ্বারা। স্মৃতি ধোঁয়াশা হয়ে গেলেও আগের ঘটা প্রতিটি ঘটনা মস্তিষ্কে গাঁথা থাকে। তুমি বুঝতে পারছ আমার কথা?”
সন্ধ্যা ঢোক গিলে বলে,
“উনি আমাকে এখনো ভালোবাসেন ভাইয়া?”
সন্ধ্যার কথায় নিয়াজ আর অরুণ দু’জনেই একটু হাসল। যদি ভালো না-ই বাসতো, তবে সেই আগের আকাশ হয়েও সে শুধু কয়েকটা থা’প্প’ড়ের বিনিময়ে সন্ধ্যার এতো পা’গ’লা’মি সহ্য করে যেত? কবেই সন্ধ্যার স্থান মাটির তলায় হত। কত মেয়ে ম’রে’ছে এই আকাশের হাতে! নিয়াজ সেসব দিকে গেল না। বলে,
“আকাশ তোমাকে যেভাবে দেখতে পছন্দ করত! তুমি যেভাবে কথা বললে ও অনেক প্রভাবিত হত! এসব কিছু আকাশের সামনে একটু পুনরাবৃত্তি করলে আকাশের কিছুটা উন্নতি হতে পারে। বুঝেছ?”
সন্ধ্যা মাথা নেড়ে বোঝায়, সে বুঝেছে। বলে, “তাহলে ওনার সব মনে পড়বে ভাইয়া?”
নিয়াজ বলে, “সঠিক বলতে পারব না। হতে পারে। আবার উল্টো রিয়েকশনও হতে পারে। বাট তোমার চেষ্টা করতে হবে। আকাশ গত চার মাস কাউকেই মনে করতে পারেনি। তবে জেডিকে সামনে থেকে দেখে মাঝে মাঝে চিনত। আবার কখনো চিনত না। এরপর ধীরে ধীরে সব মনে পড়েছে৷ এরকম তোমার ক্ষেত্রেও হতে পারে।”
সন্ধ্যা মন দিয়ে শুনলো নিয়াজের কথা। নাক ডাকার শব্দ পেয়ে সন্ধ্যা সামনে তাকায়। নিয়াজও বাদিকে ফিরলে দেখল অরুণ তার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে নাক ডাকছে। নিয়াজ আর সন্ধ্যা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হেসে ফেলল। সন্ধ্যা চেয়ার থেকে উঠে বাইরে যেতে যেতে বলে,
“খেতে আসুন ভাইয়া”
নিয়াজ ডাকে, “সন্ধ্যা?”
সন্ধ্যা তাকায় নিয়াজের দিকে। নিয়াজ জিজ্ঞেস করে, “শিমু কোথায়, জানো?”
সন্ধ্যার ভ্রু কুঁচকে তাকায়। নিয়াজের প্রশ্নটা তার কাছে ভীষণ অদ্ভুদ লাগলো। নিয়াজ প্রশ্নটা করে বিব্রতবোধ করছে। সন্ধ্যা ভাবনা রেখে উত্তর দেয়,
“শিমু আর খালাম্মা শিমুর দাদি বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে ভাইয়া।”
নিয়াজ মাথা নিচু রেখে ছোট করে বলে, “আচ্ছা।”
সন্ধ্যা কিছু বলতে গিয়েও বলল না। তবে নিয়াজের শিমুর খোঁজ করার ব্যাপারটি বুঝল না। চুপচাপ বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
ধরনীর বুকে তখন বিকেলের আমেজ। দুপুরের কড়া রোদ পড়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে৷ দৃষ্টি বকুল গাছতলায়। তার মনে আছে, আজ থেকে চার মাস আগে আকাশ তাকে শাড়ি পড়ে, আলতা পরে এক বকুল গাছতলায় অপেক্ষা করতে বলেছিল। সে অপেক্ষা করেছিল, কিন্তু আকাশ আর আসেনি। কথাটা ভেবে সন্ধ্যার ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। মনে পড়ে, সকালে বলে যাওয়া নিয়াজের সেই কথাগুলো। সন্ধ্যা কিছু একটা ভেবে ঘরে চলে আসে। আসমানী নওয়ানের কাভার্ড থেকে একটি বক্স বের করে। এই বক্সটি আকাশ তার এক্সিডেন্টের আগে পাঠিয়েছিল। সন্ধ্যা বক্সের ভেতর থেকে একে একে সবকিছু বের করে।
পাঁচটি সাদা শাড়ি, দশটি আলতার কৌটা। চার ডজন চুড়ি, একজোড়া রূপোর নুপুর, একপাতা কালো ছোট্ট টিপ। আর সবশেষে একটি খাম, যার ভেতর আকাশের লেখা চিঠি আছে।
সন্ধ্যা সবগুলো ভীষণ যত্ন করে রেখেছিল। সবকিছু আলতো হাতে ছুঁয়ে দেয়। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। এগুলো যে তার শুভ্র-পুরুষের দেয়া উপহার।
শাড়িগুলোর মধ্যে একটি শাড়ি বেছে নেয় সন্ধ্যা। শাড়িটি খুব সুন্দর করে তার গায়ে জড়িয়ে নেয় একদম গ্রাম্য স্টাইলে। একটি আলতার কৌটা নিয়ে দু’পায়ে আলতা দেয়। রূপার নুপুরজোড়া দু’পাশে পরে নেয়।
খোপা করা চুলগুলো ছেড়ে দেয়। যা হাঁটুতে গিয়ে ঠেকে। এরপর সন্ধ্যা আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। আয়নায় সৃষ্ট নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়। আজ কতগুলো মাস পর সে দ্বিতীয়বারের মতো এভাবে নিজেকে তৈরী করল আকাশের জন্য।
কথাটা ভেবে সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
আকাশের দেয়া কালো টিপের পাতা থেকে একটি টিপ বের করে কপালের মাঝ বরাবর দেয়। আয়না থেকে দু’পা পিছিয়ে যায়। নিজেকে নিখুঁতভাবে দেখে। ভাবে, আকাশ তাকে এভাবে দেখে কি কোনো রিয়েকশন দিবে? দিলেও ঠিক কেমন রিয়েকশন দিবে? না-কি তাকে এড়িয়ে চলে যাবে?
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। বুক ধুকধুক করছে। চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। ক’সেকেন্ডের মাথায় দুরুদুরু বুক নিয়ে ছোট ছোট পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পা চলছে না মনে হচ্ছে। তবুও এগোয়। সিঁড়ির দিকে এগোতে নিলে আকাশকে দেখে সন্ধ্যার পা থেমে যায়। দৃষ্টি আটকে রয় তার শুভ্র-পুরুষের পানে। আকাশ ফোনে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে নামছিল। পরনে সবসময়ের মতো সাদা শার্ট-প্যান্ট। ডান হাত প্যান্টের পকেটে। বা হাতে ফোন কানে ধরে রেখেছে।
আকাশ ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ সন্ধ্যার পানে দৃষ্টি পড়লে বুলি থেমে যায় ছেলেটার। সন্ধ্যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলায়। আলতা রাঙা পা শাড়ির আড়াল থেকে উঁকি দেয়, যেখানে আকাশের দৃষ্টি আটকায়। আকাশ ঢোক গিলল। পরিচিত লাগে কেন এসব। কিছু মনে করার চেষ্টা করলে মাথায় চাপ পড়ে। য’ন্ত্র’ণার আবির্ভাব হয় মাথায়। আকাশ তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে উঠিয়ে সন্ধ্যার মুখে আনে। অদ্ভুদ চোখে চেয়ে থাকে সন্ধ্যার পানে। বেশ কিছুক্ষণ কেমন স্তব্ধ চোখে চেয়ে থাকে। একসময় ধীরপায়ে নামতে থাকতে সিঁড়ি বেয়ে। দৃষ্টি সন্ধ্যার পানে। ফোনের ওপাশের ব্য’ক্তিকে বলে,
“হোল্ড।”
এরপর ফোন কান থেকে নামিয়ে নেয়। ততক্ষণে আকাশ সন্ধ্যার একদম সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আকাশকে এমন ঠান্ডা রূপে দেখে সন্ধ্যা ঢোক গিলল। অবাক হয়, এটুকু সময়ে আকাশের চোখ দু’টো লাল হতে দেখে। সন্ধ্যা বুঝল না, আকাশ কি তার উপর রে’গে গিয়েছে? ভাবনার মাঝেই আকাশ গম্ভীর গলায় বলে,
“কে তুমি?”
আকাশের গুরুগম্ভীর আওয়াজে সন্ধ্যা ঢোক গিলল৷ আকাশ কেমন হাসফাস করে। বা হাতের ফোন শ’ক্ত মুঠো করে ধরে। চোখ বুজে ভারী শ্বাস ফেলে। মাথা ডানে-বামে নাড়ায়। আকাশের অস্থিরতা বাড়ে। সন্ধ্যা ভ’য় পায়। আকাশ এমন করছে কেন? সে সাহস করে জিজ্ঞেস করে, “শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালা ঠিক আছেন?”
সাথে সাথে আকাশ চোখ মেলে তাকায়। চোখ দু’টো আগের চেয়েও লাল। সন্ধ্যার বলা শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালা শব্দটি তার মাথার ভেতর বাজতে লাগলো। মাথার ভেতর সন্ধ্যার এই বেশ, সন্ধ্যার বলা শব্দটি কিলবিল করতে লাগলো। মাথা ব্য’থা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আকাশের সহ্য হয়না। সে চোখের পলকে ডান হাতে গায়ের জোরে সন্ধ্যাকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে বলে,
“কে তুমি? আমাকে ডিস্টার্ব করছ কেন?”
সন্ধ্যা পড়ে যেতে নিলে পিছন থেকে আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে আগলে নেয়। ভদ্রমহিলা বাড়িতে ছিলেন না। মাত্র বাড়ির ভেতর প্রবেশ করেছে, তখনই এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। ভাগ্য সহায় থাকায় সন্ধ্যাকে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে নেয়। অবাক চোখে চেয়ে বলে, “আকাশ এমন করছ কেন?”
আকাশ তার হাতের ফোন ছুড়ে ফেলে চিৎকার করে বলে,
“ও কে? কে ও? আমাকে শান্তি দেয় না কেন?”
কথাগুলো বলতে বলতে আকাশ দু’টো চেয়ারে লাথি বসায়। হাতের কাছে বড় বড় দু’টো ফুলদানি নিয়ে ছুড়ে ফেলে। কেমন ছটফট করে। আসমানী নওয়ান বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলের পানে। সন্ধ্যা ভ’য়ে আসমানী নওয়ানের সাথে সিটিয়ে আছে। ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।
ভাবনার মাঝেই হঠাৎ আকাশ বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার ডান হাত ধরে টেনে সন্ধ্যাকে ধাক্কা দেয়। আসমানী নওয়ান ধরতে গিয়েও পারল না। আকাশ দিকবিদিকশুন্য হয়ে সন্ধ্যার বাম গালে ক’ষিয়ে একটা থা’প্প’ড় মে’রে দেয়। সন্ধ্যা পড়ে যেতে নিলে আকাশ সন্ধ্যাকে টেনে সন্ধ্যার একই গালে আরেকটা থা’প্প’ড় মা’রে। সন্ধ্যার মাথা ভনভন করে। আকাশ থামলো না। সন্ধ্যাকে টেনে আরেকটা থা’প্প’ড় মা’রার আগেই আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে টেনে তার বুকে আগলে নেয়। আকাশের উদ্দেশ্যে রাগান্বিত বাণী ছুড়ে দেয়,
“আকাশ কি শুরু করেছ তুমি?”
আকাশ কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে দু’হাতে মাথার চুল টেনে ধরে কেমন যেন ছটফট করে। রে’গে ছটফটানি কণ্ঠে বলে,
“আমি কিচ্ছু শুরু করিনি। ওই মেয়েটা শুরু করেছে। ও এসব কি পরেছে, ও অদ্ভুদ সব নাম উচ্চারণ করে আমার জীবন অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে। অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে আমার জীবনটা।”
সন্ধ্যার চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। ঝাপসা চোখে তাকায় আকাশের দিকে। আজ আবারো প্রিয় মানুষটার চোখে নিজের প্রতি এতো রা’গ, এতো বিরক্তি, এতো ক্ষো’ভ দেখে মেয়েটার শরীর ভেঙে আসছে। তার এখান থেকে যাওয়া প্রয়োজন। অথচ শরীরে একফোঁটা শ’ক্তি নেই। বুকটা চেপে আসছে। যে বেশে সে এসেছে, এসবই তো এই মানুষটার দেয়া উপহার। আর তার মুখে উচ্চারিত শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালা নামটি এই মানুষের একসময়ের প্রিয় শব্দ। সময়ের সাথে সাথে সব কি নিখুঁতভাবে উল্টে গিয়েছে! সন্ধ্যার চোখের পানির বাঁধ ভাঙে। করুণ চোখে চেয়ে রয় এই চেনা মানুষটির মাঝে অচেনা এক মানবের দিকে।
আকাশ মাথা তুলে তাকায়। দু’জনের চোখাচোখি হয়। আকাশের চোখ দু’টো অসম্ভব লাল। তার নজর আটকায় সন্ধ্যার করুণ দৃষ্টিজোড়ায়। খেয়ালে আসে সন্ধ্যার লাল হওয়া আঁচড়ে ভরা গালে, ঠোঁটের কোণা কে’টে র’ক্ত বেরিয়ে এসেছে। সন্ধ্যা আকাশের দিকে চেয়ে পরাজিত সৈন্যের ন্যায় ব্য’থাতুর একখানা হাসি উপহার দিল বোধয় আকাশকে।
সন্ধ্যার আহত মুখশ্রী, কান্নামাখা চোখ, ব্য’থাতুর হাসিতে আকাশের দম আটকে আসে। শরীরটা কাঁপছে তার। কাঁপছে হাত সাথে বুকটাও। কেন এমন হচ্ছে? উত্তর নেই। তীব্র মাথা ব্য’থায় আকাশ ছটফটায়।
সন্ধ্যা আকাশের থেকে তার দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। এরপর আসমানী নওয়ানের থেকে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে। আর তাকায় না আকাশের দিকে। দুর্বল শরীরটা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে যায় তার ঘরে। এক বুক আশা বেঁধে ঘর থেকে বেরিয়ে আসা মেয়েটা কি নিশ্চুপভাবে হার মেনে নিয়ে জায়গাটি প্রস্থান করল!
আকাশ-ও দাঁড়ালো না। এলোমেলো পায়ে দু’তিন সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। আসমানী নওয়ান অসহায় চোখে চেয়ে দেখল কেবল ছেলেমেয়েদের অগোছালো এই জীবন। কয়েক সেকেন্ড এর মাথায় উপর থেকে জিনিস ভাঙার শব্দ পেয়ে আসমানী নওয়ান দ্রুতপায়ে দোতলায় উঠে যায়। দাঁড়ায় আকাশের রুমের সামনে গিয়ে। ঘরের জিনিস সব এলোমেলো করে ফেলেছে। সব জিনিস এদিক-ওদিক ছোড়াছুড়ি করেছে। এক পর্যায়ে আকাশ ক্লান্ত হয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। আসমানী নওয়ান ছেলের অবস্থা দেখে দৌড়ে গিয়ে ছেলের সামনে দাঁড়ালে আকাশ তার মায়ের পা৷ সাপ্টে ধরে করুণ সুরে বলে,
“ওই মেয়েটা কে মা? ওকে দেখলে আমার ভীষণ মাথা ব্য’থা করে। ইচ্ছে করে এই মাথা ভে’ঙে ফেলি। মেয়েটাকে দূরে সরাও প্লিজ! আমি আর নিতে পারছিনা মা।”
ছেলের আ’হা’জা’রিতে ভরা কথা শুনে আসমানী নওয়ানের চোখজোড়া ভিজে উঠল। একদিন এই আকাশ সন্ধ্যার মৃ’ত্যুর সংবাদ পেয়ে তার পা ধরে আ’হা’জা’রি করেছিল, সন্ধ্যাকে তার বুকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। আর আজ সেই আকাশ সন্ধ্যাকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য তার পা ধরে আ’হা’জা’রি করছে। একেই বুঝি ভাগ্য বলে?
ধরনীর বুকে রাতের আমেজ নেমেছে। ঘড়ির কাটায় তখন রাত ৮ টা। সন্ধ্যা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে অরুণ তাকে ফোনে জানিয়েছে, সেই সিমের ব্যাপারে। যে ছেলেটির থেকে অরুণ সিম নিয়েছিল, সেই ছেলে অরুণকে বলেছে,, আসলে সিমটি এক লোক তাকে অরুণকে দিতে বলেছিল। বিনিময়ে সেই ছেলেকে কিছু টাকা দিয়েছে। ছেলেটির বক্তব্য, যে সিম দিয়েছে সে পুরোপুরি নিজেকে আবৃত করে রেখেছিল। শুধু দু’চোখ দেখা যাচ্ছিল। পরনে কালো হুডি ছিল। এর বেশি কিছু জানেনা সে। এটুকুই। অরুণ সেই ছেলেকে আর কিছু বলেনি৷ সে চিন্তিত। কে এই ছেলে? যে পিছন থেকে এসব কলকাঠি নাড়ছে। সে সন্ধ্যাকে আশ্বাস দিয়েছে। এসব নিয়ে চিন্তা করতে বারণ করেছে। এর সাথে সে সন্ধ্যাকে আরেকটি নিউজ দিয়েছে, আকাশ আজ রাতের ফ্লাইটে ইংল্যান্ড চলে যাচ্ছে। আকাশকে অন্যরকম লাগছিল বলে সে জিজ্ঞাসা করেছিল সন্ধ্যাকে। বাসায় কিছু হয়েছিল কি-না!
সন্ধ্যা ছোট করে উত্তর দেয়, ‘কিছু হয়নি।’ এরপর কল কে’টে দেয়।
কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বিকাল থেকে এতক্ষণ শুধু কেঁদেছে। ফলস্বরূপ মাথা ব্য’থা করছে তার। সন্ধ্যা বেলকনি থেকে ঘরে আসে। আসমানী নওয়ানের ঔষধের বক্স থেকে দু’টো ঘুমের ঔষধ বের করে একসাথে খেয়ে নেয়। উদ্দেশ্য ঘুমিয়ে যাওয়া। জেগে থেকে বেহায়ার মতো আকাশকে না দেখা। আকাশ চলে যাক। তার অগোচরেই চলে যাক। অনেক দূরে চলে যাক। কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যার দমবন্ধ লাগলো। সে ওয়াশরুমে চলে যায়। ওজু করে বেরিয়ে মেঝেয় জায়নামাজ বিছিয়ে এশার নামাজ পড়ে নেয়। এরপর আরও অনেকক্ষণ জায়নামাজে বসে থাকে। নিরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়। আকাশ তার থেকে দূরে চলে যেতে চায়। আকাশ তাকে আর চায় না। তাকে ভুলে গিয়েছে৷ নিয়াজ ভাইয়া মিথ্যে বলেছিল। আকাশ তাকে ভালোবাসে না, বরং ঘৃ’ণা করে। সে আকাশের তালিকায় খুব অ’সহ্যের মানুষ হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা বুঝে গিয়েছে। শুধু সে নিজেকে সামলাতে পারেনা। পারেনা আকাশের দেয়া ভালোবাসাগুলো ভুলে যেতে। পারেনা ওই মানুষটাকে ভুলে ভালো থাকতে। এসব ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা জায়নামাজের উপর উপুড় হয়ে আরও খানিক ফোঁপায়। যে ভাগ্যের খাতা দুঃখ দিয়ে ভর্তি সে খাতায় সুখের আশা করা বড্ড বেমানান। সন্ধ্যা মাঝে মাঝে ভুল করে বসে। আর করবেনা সে। আর কখনো ভুলেও সুখের মিথ্যে আশা বাঁধবে না বুকে।
প্রায় ৩০ মিনিটের মাথায় সন্ধ্যা জায়নামাজ থেকে উঠে জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে দেয়। এরপর বিছানায় এসে কমফোর্টের নিচে শুয়ে পড়ে। কমফোর্টের নিচে মুখ লুকিয়ে কতক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদে! একসময় কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে যায়।
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে ঘুমোতে দেখে আর ডাক দেয়না। মেয়ের পাশে সে-ও শুয়ে পড়ে। আকাশ কোথায় গিয়েছে কে জানে! সেই যে বিকেলে বেরোলো৷ আর ফিরল না। বুকটায় আজকাল বড্ড ব্য’থা করে ভদ্রমহিলার। ছেলে-মেয়ে দু’টোর সুখের সংসার দেখতে চেয়েছিল। তা বোধয় আর হলো না। সব কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল! সবার ভাগ্যে জমা হলো শুধু দুঃখ!
ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১ টা বেজে ১০ মিনিট। আকাশ এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। কাউকেই জানায়নি সে চলে যাচ্ছে। ইচ্ছে করেনি জানাতে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও কি যেন ভেবে পিছিয়ে আসে। পা চালায় মায়ের ঘরের দিকে।
আসমানী নওয়ানের ঘরের ভিড়ানো দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। সন্ধ্যা আর তার মা পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে। আকাশ ধীরপায়ে এগিয়ে এসে
সন্ধ্যার মাথার কাছে দাঁড়ায়। প্রাণহীন দৃষ্টিজোড়া সন্ধ্যার ঘুমন্ত মলিন মুখপানে রাখে। ঢোক গিলল ছেলেটা। কি যেন ভেবে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার মাথার কাছে হাঁটুমুড়ে বসে। দৃষ্টি বাম গালে রাখে, যেখানটায় সে আজ বিকেলে দু’টো শক্তপোক্ত থা’প্প’ড় দিয়েছিল। গায়ে যত শ’ক্তি ছিল, সব শক্তি প্রয়োগ করে থা’প্প’ড় দু’টো দিয়েছিল। আকাশের বুকে চিনচিন ব্য’থা হয়। বা হাত ধীরে ধীরে সন্ধ্যার মাথায় রাখে। ডান হাতের বুড়ো আঙুল সন্ধ্যার বা পাশের ঠোঁটের কোণায় রাখে, যেখানটায় এক ছোট্ট ক্ষ’ত সৃষ্টি হয়েছে তার থা’প্প’ড়ের বদৌলতে। আকাশ সন্ধ্যাতে দৃষ্টি রেখে মলিন গলায় বলে,
“জানিনা না কে তুমি! জানিনা তোমায় ব্য’থা দিয়ে আমি কেন এতো ব্য’থা পাই! তুমি আমায় দেখে কেনই বা এতো পা’গ’লা’মি কর তাও জানিনা। আমার হিসাবের খাতা বড্ড গরমিল মেয়ে! বাট আই প্রমিস, তোমায় আর কখনো হার্ট করবনা।”
কথাগুলো বলে অনেকটা সময় নিয়ে আকাশ সন্ধ্যার পানে চেয়ে থাকে। কিছু একটা ভেবে শুকনো ঢোক গিলল। মুখ এগিয়ে নিয়ে সন্ধ্যার ঠোঁটের কোণায় ক্ষ’তস্থান টায় ঠোঁট ছোঁয়ায়। সাথে সাথে তার পুরো শরীর কেঁপে ওঠে। যেন বিদুৎ শক খেয়েছে। আকাশ দ্রুত দূরে সরে আসে। চোখ বুজে ঘনঘন শ্বাস ফেলে। একটু পর চোখ মেলে তাকায়। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁটজোড়া ভিজিয়ে বলে,
“ডাবল স্যরি! থা’প্প’ড় অ্যান্ড কিস করার জন্য। ভালো থেকো মায়ের পাতানো মেয়ে। আই উইশ, আমাদের আর কখনো দেখা না হোক। বিকজ অফ, আমি তোমাকে ভুল করেও যেন হার্ট না করে ফেলি!”
এরপর আকাশ সন্ধ্যার পাশ থেকে উঠে দাঁড়ায়। এতক্ষণ কি করল, কি বলল, কেন বলল সব যেন তার নিজেরই মাথার উপর দিয়ে গেল। মায়ের কপালে একটা চুমু খায়। এই কাজটি কেন করল, তাও বুঝল না। নিজের কাছে নিজেকে অদ্ভুদ ঠেকছে। আকাশ আর এখানে দাঁড়ালো না। বেরিয়ে যায় রুম থেকে।
মাঝরাতে হঠাৎ সন্ধ্যার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমের ঔষধ খাওয়ার পরও টানা ঘুম হলো না। মনে হচ্ছিল, ঘুমের মাঝে যেন সে ছটফট করছিল। মাথাটা ভীষণ ভারী লাগছে। অতিরিক্ত কান্নার ফল এটা৷ চোখ দু’টো টেনে তুলতে পারেনা। বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকে। এক সময় ধীরে ধীরে জোরপূর্বক চোখজোড়া টেনে খুলে ফেলে। ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া অন্ধকার ঘরের ছাদের দিকে নিবদ্ধ করে রাখে। চোখের পর্দায় বিকালের সেই দুঃখভরা দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে। মেয়েটা নির্জীব চোখে কতক্ষণ চেয়ে রইল কে জানে! এরপর ধীরে ধীরে উঠে বসে। পাশে আসমানী নওয়ান ঘুমিয়ে। সন্ধ্যা বিছানা থেকে নেমে ছোট ছোট পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সারাবাড়ি জুড়ে মিটিমিটি আলো। সন্ধ্যা দেয়াল ঘড়িতে নজর করলে বুঝল এখন মাঝরাত। তার মানে আকাশ চলে গিয়েছে? কথাটা ভেবে সন্ধ্যার বুকে একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। চোখের কোণ ভিজে যায়। সন্ধ্যা নিজেকে সামলায়।
ছোট ছোট ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। আকাশের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ভিড়ানো দরজা নির্দ্বিধায় বা হাতে ঠেলে আলগা করে। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরটায় চোখ বুলায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। সুইচ টিপে লাইট জ্বালিয়ে দেয়। সাথে সাথে ঘরময় আলো ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যা এলোমেলো ঘরে চোখ বুলায়। আকাশ করেছে এসব, তার জানা। সব তার উপর আকাশের রা’গের প্রতিফলন। কথাটা ভেবে সন্ধ্যা নিজের উপর বিদ্রূপ হাসল। বেলকনিতে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে টেবিলের কাছে এসে পা থেমে যায়। নজরে পড়ে পুরো টেবিল জুড়ে কাগজের ছড়াছড়ি। প্রতিটি কাগজ মুঠো করে ফেলে রাখা। পাশেই একটি পাতলা ডায়েরি। বোঝা যাচ্ছে, এই মোটা ডায়েরি থেকে পৃষ্ঠা গুলো ছিঁড়ে ন’ষ্ট করা হয়েছে। সন্ধ্যা ধীরে ধীরে হাত বাড়ায় কাগজগুলোয় কি আছে দেখার জন্য। তার জন্য ভালো কিছু নেই ইতোমধ্যে এটুকু আন্দাজ হয়ে গিয়েছে। হাত কাঁপছে মেয়েটির। কাঁপা হাতে একটি কাগজের ভাঁজ খুলে দেখল যেখানে লেখা,
‘I hate you shondha.’
লেখাটি পড়ে সন্ধ্যার মনে হলো বুকের বা পাশটায় কেউ খামচে ধরেছে। এই হাতের লেখা যে আকাশের, এটুকু চিনতে সন্ধ্যার একটুও অসুবিধা হয়না৷ মুহূর্তেই মেয়েটির চোখজোড়া ভরে ওঠে। সন্ধ্যা একে একে সবগুলো কাগজের ভাঁজ খুলে দেখল, প্রতিটি কাগজের পাতায় কালো কলমের কালিতে জ্বলজ্বল করছে,
‘I hate you Shondha.’ লেখাটি।
সন্ধ্যা কাঁপা দু’হাতে টেবিলের কোণা আঁকড়ে ধরে সামান্য ঝুঁকে দাঁড়ায়। চোখ বুজে ভারী শ্বাস ফেলে। সময় নিয়ে নিজেকে সামলায়৷ ধীরে ধীরে চেয়ার টেনে বসে। টেবিলের এক কোণা থেকে একটি নতুন ডায়েরি টেনে বের করে। কভার পাতা উল্টে ডায়েরির মাঝ বরাবর সাদা পাতা বের করে। ডান হাতে কলম তুলে নেয়। লিখতে শুরু করে কিছু। হাতটা কাঁপছে। এই কম্পন বড্ড জ্বালায় সন্ধ্যাকে। মেয়েটা ভারী বিরক্ত হলো। এভাবেই লিখল,
“I hate you too Akash.”
ডায়েরির মাঝ বরাবর দু’পাতা ভরে কেবল একটি বাক্যই লিখে গেল ততক্ষণ, যতক্ষণ পাতা দু’টো কলমের কালিতে সেই শব্দগুলো দ্বারা না ভরল।
এরপর সন্ধ্যার হাত থেমে যায়। ডান চোখ থেকে এক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে ডায়েরির লেখাগুলোর মাঝ বরাবর টুপ করে এসে পড়ে। চোখের জল গড়িয়ে পড়ার আগেই সন্ধ্যা দ্রুত তার বা হাতে মুছে নেয়। এই দামি জল আর ন’ষ্ট করবে না। আর ক’দিন পর যে সে মা হবে! মায়েদের চোখে কান্না মানায় না। সে-ও আর কাঁদবে না। কখনো কাঁদবে না। সব স্মৃতি ভুলে সে কেবল তার সন্তানের মা হবে।
সন্ধ্যা উঠে দাঁড়ালো। কলম রেখে ডান হাতে ডায়েরিটি তুলে নিয়ে ধীরপায়ে বেলকনির দিকে এগোয়।
সন্ধ্যার পরনে কেবল একটি শাড়ি। যা আঁচল বা কাঁধ বেয়ে নেমে মেঝে ছুঁইছুঁই। হাঁটুসমান চুলগুলো বড্ড এলোমেলো। দু’হাতে ডায়েরিটি বুকের সাথে চেপে রেখেছে সন্ধ্যা।
ঘড়ির কাটা তখন ঠিক দু’টোর ঘরে। কনকনে শীতের রাত। ঠান্ডা বাতাস হুড়হুড় করে ভেসে আসছে। যা সন্ধ্যার শরীরে কাঁটার ন্যায় বিঁধছে। অথচ মেয়েটির মুখে বিন্দুমাত্র বাহ্যিক ক’ষ্টের ছাপ নেই। তার দৃষ্টি ওই দূর আকাশ পানে। একদম মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। দৃষ্টির একবিন্দু নড়চড় নেই। স্মৃতির পাতা হাতড়ালে কতশত রঙিন দৃশ্য চোখে ভাসে, যে দৃশ্যে তার শুভ্র-পুরুষের অগণিত ভালোবাসা মিশে আছে৷
খুব করে মনে পড়ল একদিনের কথা। তখন তারা সবাই সৌম্য ভাইয়ার গ্রামের বাড়ি ছিল। হঠাৎ আকাশের কাজ পড়ে যাওয়ায় আকাশ গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু আকাশ তাকে ছাড়া আসতে চাইছিল না। তাকে কতকিছু বলে রাজি করাচ্ছিল, যেন সে আকাশের সাথে ঢাকা ফিরে।
আকাশ দু’হাত সন্ধ্যার গালে রেখে মৃদুস্বরে বলে,
“আমার সোনা বউ তুমি। আমার ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে। আমার সাথে আজ ঢাকায় যাবে সন্ধ্যামালতী? আমি আর তুমি যাবো।”
সন্ধ্যা কি বলবে বুঝল না। আকাশ আবদার করে,
“সোনা বউ, প্লিজ চলো। আবার দু’দিনের মাথায় তোমাকে নিয়ে চলে আসব এখানে। তুমি তো অনেকদিন হলো কলেজ যাওনা। এর মাঝে কয়েকদিন কলেজ যেও।”
সন্ধ্যা সম্মতি দিলে আকাশ সন্ধ্যার সারা মুখে সমানে চুমু খায়। আকাশকে থামতে না দেখে সন্ধ্যা আকাশের দিকে রে’গে তাকালে আকাশ ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে,
“এভাবে তাকাও কেন বউ? একটু চুমুই তো খাই। চুমু খেতে আমার ভালো লাগে। আমি কি করব?”
সন্ধ্যা ঠোঁট নাড়িয়ে বোঝায়,
“তাই বলে এতো?”
আকাশ সন্ধ্যার ঠোঁটজোড়ায় আবার-ও একটা চুমু খেয়ে সন্ধ্যার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “নাহ, এতোই না। এর চেয়েও অনেক বেশি ভালো লাগে আমার সন্ধ্যামালতীকে চুমু খেতে। মনে হয়, চুমু খেতে খেতে টুপ করে গিলে খাই তোমাকে।”
কথাটা বলে আকাশ আবার-ও সন্ধ্যার নাকের ডগায় একটা চুমু খায়। সন্ধ্যা হতাশ চোখে চেয়ে রইল আকাশের দিকে। আকাশ মৃদুস্বরে বলে,
“রেডি হও। এক্ষুনি বের হব।”
এক্ষুনি বের হবে শুনে সন্ধ্যা অবাক হয়ে তাকালে আকাশ সন্ধ্যার গালে একটা চুমু খেয়ে বলে, “যা যা খেতে চাইবে সব খাওয়াবো বউ। এক্ষুনি না বের হলে লেট হয়ে যাবে।”
কথাটা বলে আবার-ও সন্ধ্যাকে চুমু খেতে নিলে সন্ধ্যা দু’হাতে তার মুখ ঢেকে নেয়। আকাশ হাসলো। সন্ধ্যাকে ছেড়ে বলে, “রেডি হয়ে নাও বউ। ফাস্ট কর।”
পুরনো সে দিনের কথা ভেবে সন্ধ্যার বুকটা গভীর শূণ্যতায় কেমন হাহাকার করে উঠল। একটা সময়, যে আকাশ তার সারা মুখে চুমু খাওয়ার জন্য কতশত সুতো খুঁজে বেড়াতো। আজ সেই মানুষটাই তার মুখে কি নির্দ্বিধায় আ’ঘা’ত করে! তাকে দু’চোখে সহ্য করতে পারেনা। সন্ধ্যার চোখদু’টো জলকণায় ভরে ওঠে। তার আকাশ হারিয়ে গিয়েছে। সেই ভালোবাসার আকাশের অস্তিত্ব মুছে গিয়েছে।
সন্ধ্যা তার বা হাত উম্মুক্ত পেটে রাখে। চোখ বুজে অনুভব করতে চায় তার চার মাসের সত্তাকে। যে এখানটায় বেড়ে উঠছে। আজ থেকে এটাই তার জীবন। তার পরিচয় হবে সে তার সন্তানের মা। সে আর স্বামীর ভালোবাসা পাবার কাঙাল হবেনা। তার সন্তান তার সব হবে, যে তার শুভ্র-পুরুষের অংশ। কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যা প্রশান্তির শ্বাস নেয় ক’বার।
এরপর দু’চোখ মেলে তাকায় সে। দূর আকাশপানে ঝাপসা চোখ নিবদ্ধ রেখে ধরা গলায় বলে,
“আমাকে একটি ছোট্ট প্রাণ উপহার দেয়ার জন্য আপনার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো আকাশ।
একটু থেমে আবারো বলে,
এইযে আকাশ শুনতে পাচ্ছেন?
আমি আর কখনো আপনাকে মনে করব না। ভুলে যাবো আমার শুভ্র-পুরুষকে। ভুলে যাবো আমার পাঞ্জাবি-ওয়ালাকে। আর ভালোবাসার নেশায় পা’গ’লামি করতে যাবো না আপনার দ্বারে। এই এক জীবনে আপনাকে চাওয়ার দুঃসাহস আর কখনো দেখাবো না। আজ থেকে আপনি মুক্ত। আমিহীনা আপনি খুব ভালো থাকুন আকাশ।”
কথাগুলো বলে সন্ধ্যা চোখ বুজে নেয়৷ দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়ায়। শীতের রাতের ঠান্ডা বাতাস কি দারুণভাবে ছুঁয়ে দেয় সন্ধ্যার সর্বাঙ্গ! মেয়েটি অনুভূতিহীন মানবীর ন্যায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে রয়। হৃদয়ের ব্য’থারা শরীরের ব্য’থার সাথে পাল্লা দিয়ে জিতে যায়। সন্ধ্যার শীতে কাঁপুনি নয়, বরং হৃদয়ের ব্য’থা হাড় ভাঙার ন্যায় সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
আকাশ এয়ারপোর্টের বাইরে এক সাইডে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট, সাদা ওভারকোর্ট। বা হাত ওভারকোর্টের পকেটে। ডান হাতের ফাঁকে জ্ব’ল’ন্ত সি’গা’রেট। যাতে একটু পর পর টান দেয়৷ মুখাবয়বে গাম্ভীর্যের ছাপ। চোখ দু’টো ভীষণ লাল। সোনালি চোখের মণি দু’টো থেকে যেন ঝিলিক দিচ্ছে। দৃষ্টি ব্যস্ত শহরটায়। হাতের সিগারেটটি প্রায় শেষ হয়ে আসলে, ছোট্ট অংশটি ছুড়ে ফেলে। যেটা গিয়ে পড়ে একটি ফাঁকা সিগারেটের প্যাকেটের পাশে। যে প্যাকেকটিতে ভরা সিগারেট ছিল। সবগুলো আকাশ ঠোঁটের ফাঁকে রেখে পুড়িয়ে ছাই করেছে।
প্যান্টের পকেট থেকে আরেকটি সিগারেটের প্যাকেট বের করে। প্যাকেটের ভেতর থেকে একটি সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে নিয়ে, প্যাকেটটি পুনরায় পকেটে রাখে। লাইটার দ্বারা সিগারেট জ্বালিয়ে আবারো ফুঁকতে শুরু করে।
বড্ড তৃষ্ণার্ত সে। কিসের যে তৃষ্ণা, তা ধরতে পারেনা। অথচ সেই তৃষ্ণা মেটাতে বৃথা চেষ্টা চলায় সিগারেট পুড়ানোর মাধ্যমে।
অরুণ এয়ারপোর্টের সামনে এসে গাড়ি থামায়। সে আজ সারাদিন ওই সিম দেয়া ব’দ’মা’শ লোকের হদিশ করে বেড়িয়েছে। ফলাফল শূণ্য। এদিকে ঘড়ি দেখে মাথায় হাত। আকাশ চলে গেল কি-না। দ্রুত এয়ারপোর্টের দিকে রওয়ানা হয়েছে। আসমানী নওয়ানকেও জানাতে পারেনি কাজের চক্করে। আপাতত এসব ভাবনা চেপে রাখল অরুণ। গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খোঁজে আকাশকে। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে পেয়ে সে দ্রুত পা চালায়। দাঁড়ায় আকাশের পাশে। বলে,
“একা একাই চলে আসলি যে! একবার তো কল করতে পারতি!”
আকাশ কিছু বলল না। যেন শুনতে পায়নি। সে তার মতো একটু পর পর সিগারেটে টান দেয়। অরুণ জিজ্ঞেস করে, “চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলি কেন?”
আকাশ এবারেও চুপ থাকলো। বেশ অনেকটা সময় পর গম্ভীর স্বরে উত্তর করে, “ওকে হার্ট করতে চাইনা।”
অরুণ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ঝামেলা তো একটা হয়েছে৷ কিন্তু কি এটা বুঝল না সে। বলে,
“সন্ধ্যার কথা বলছিস?”
আকাশ ছোট করে বলে, “মেবি।”
অরুণ হতাশার শ্বাস ফেলে। সন্ধ্যাকে নিয়ে কথা বলতে গেলে কত দ্বিধা এই ছেলের! জিজ্ঞেস করে,
“সন্ধ্যাকে কেন হার্ট করতে চাস না?”
আকাশ ছোট্ট উত্তর, “জানিনা।”
“ফিরবি কবে?”
আকাশ ডান হাতের দু’আঙুলের সাহায্যে সিগারেটে তিনটি টোকা দেয়। সিগারেটের মাথায় জ্ব’ল’তে থাকা আ’গু’নের ডগা থেকে কিছু ছাইয়ের অংশ অবহেলে পড়ে গেল, আবার কিছু অংশ বাতাসে উড়ে গেল। আকাশ সিগারেটটির জ্ব’ল’ন্ত মাথায় বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে চোখ বুজে নেয়। মুখে ব্য’থার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। অথচ বুকের বা পাশটায় ভীষণ অদ্ভুদ চিনেচিনে এক ব্য’থা অনুভব হয়। আকাশ আশ্চর্য বনে যায়। সত্যিই তার হিসাবের খাতা বড্ড এলোমেলো। আকাশ সিগারেটের জ্ব’ল’ন্ত অংশে বুড়ো আঙুলটি আরেকটু চেপে শ’ক্ত কণ্ঠে বলে,
“যেদিন ওকে হার্ট করতে শিখে যাবো, সেদিন ফিরবো।”
অরুণ চুপচাপ আকাশের কান্ড দেখছিল। কি বলবে সেটা ভাবতে ভাবতেই আকাশের উত্তর ভেসে আসে। অরুণের কি হলো কে জানে! সে শব্দ করে হেসে দেয়। আকাশ বিরক্ত চোখে তাকায় অরুণের দিকে। অরুণ বহুক’ষ্টে নিজেকে সামলে বলে,
“এটা তুই কখনোই পারবিনা আকাশ।”
আকাশ রাগান্বিত স্বরে উত্তর দেয়,
“তবে ফিরবো না।
একটু থেমে একই সুরে বলে,
“এভি পারেনা এমন কোনো কাজ নেই। পরেরবার ফিরে এসে মেয়েটিকে যাস্ট খু’ন করে ফেলব।”
অরুণ বোধয় আকাশের কথায় আরও মজা পেল। যেন আকাশ মাত্র কোনো কৌতুক বলেছে। আকাশ রে’গে তাকায় অরুণের দিকে। এই হাসি তার সহ্য হচ্ছেনা। সে হয়ত এই হাসির কারণ ধরতে পেরেছে। অরুণ তার ভবিষ্যৎের পরাজিত রূপ ভেবে হাসছে। যে পরাজিত টুকু মানতে ভীষণভাবে নারাজ আকাশ। যে সন্ধ্যাকে তার হাতের সামান্য থা’প্প’ড়ের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য দেশ ছাড়ছে, সে সন্ধ্যাকে খু’ন করবে? ব্যাপারটি ভেবে বোধয় আকাশ নিজেই নিজেকে আরও গভীরভাবে পরাজিত রূপে দেখতে পেল। আকাশ হাসফাস করল। মাথাটা এদিক-ওদিক ঘোরায়। বা হাতে অরুণকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে ওঠে, “স্টপিট অরুণ!”
অরুণ দু’পা পেছায়। তাকায় আকাশের দিকে। খারাপ লাগলো ছেলেটার। আকাশও দুঃখ পায়, য’ন্ত্র’ণা হয়। অথচ সেই দুঃখ, য’ন্ত্র’ণার কারণ আকাশ ধরতে পারেনা। আর তাই এর প্রশমন-ও করতে পারেনা। উল্টে আকাশের রা’গ, জেদের আড়ালে সব চাপা পড়ে থাকে। অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
“তুই সন্ধ্যাকে আ’ঘা’ত করতে চাস কেন আকাশ?”
অরুণের প্রশ্নে আকাশ আনমোনা হয়। সন্ধ্যা তার দিকে শেষবার কত করুণভাবে তাকিয়েছিল! কি ছিল সেই দৃষ্টির মাঝে? আকাশ বুঝতে পারেনা। শুধু বোঝে, ওই দৃষ্টি তার বুকে ব্য’থা বাড়ায়। মেয়েটিকে দেখলে তার মস্তিষ্ক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়। কেন এমন হয়? আকাশ উত্তর খুঁজে পায়না। দৃষ্টি দূর অজানায় রেখে নিভু নিভু স্বরে বলে,
“ও ভীষণ জ্বা’লা’য় আমায়। আমার সব শান্তি কেড়ে নিয়েছে। ওর জন্য মাঝে মাঝে নিজেকে মে’ন্টা’ল পেশেন্ট মনে হয়।”
কথাগুলো বলে আকাশ ঢোক গিলল। ফ্লাইটের সময় হয়ে গিয়েছে। আকাশ আর দাঁড়ালো না। হাতের সিগারেট ছুড়ে ফেলে দু’হাত ওভারকোর্টের পকেটে রেখে এগিয়ে যায়। পিছু পিছু যায় আকাশের কিছু গার্ড। যাদের মাঝে কারো কারো হাতে লাগেজ। কিছুদূর গিয়ে আকাশ কেন যেন দাঁড়িয়ে যায়। পিছু ফিরে অরুণের দিকে তাকায়। ডাকে, “অরুণ?”
অরুণ মাথা নিচু করে কিছু ভাবছিল হয়ত। আকাশের কণ্ঠ কানে ভেসে আসতেই অরুণ মাথা উঁচু করে সামনে তাকায়। জিজ্ঞেস করে, “কিছু বলবি?”
আকাশ কিছু বলতে চাইছে বোধয়। কিন্তু পেটের কথা মুখে আসছে না। সে বোধয় সন্ধ্যাকে নিয়ে কিছু বলতে চায়। বেশ কিছুক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ চালিয়েও এতে সফল না হয়ে ছোট করে বলে, “মায়ের খেয়াল রাখিস। আর….”
আকাশ থামে। অরুণের আগ্রহী চোখে চেয়ে। আকাশ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে, “আর বাই।”
আকাশের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে
অরুণের দৃষ্টিতে তীব্র অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে।
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৯
আকাশ কথাটা বলে অন্ধকার আকাশপানে চেয়ে বড় করে শ্বাস টেনে নেয় একবার। এরপর আর দাঁড়ায় না। বড় বড় পা ফেলে উল্টোপথে এগোয়। সামনে যত এগোয়, বুকের দহন তত বাড়ে। পা গুলো তুলতে গেলে কি ভীষণ লাগে! যেন পিছন থেকে কেউ তার পা টেনে ধরছে। আকাশ চোখ বুজে মাথা ডানে-বামে নাড়ায়৷ ওভারকোর্টের ভেতর থেকে ডান বের করে বুকের বা পাশে একটা পাঞ্চ মে’রে বিরক্তি কণ্ঠে আওড়ায়,
“বা’লের এক হৃদয় আমার। আমার বুকে থেকে আরেকজনের কথা ভেবে ব্য’থা করে। শা’লা বেঈমান হৃদয়!”
