Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৭

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৭

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৭
DRM Shohag

অপ্রত্যাশিত আকাশের থমথমে কণ্ঠে সন্ধ্যা অবাক হয়। আকাশ তাকে থা’প্প’ড় মা’রার জন্য হাত তুলেও থেমে গেল কেন? সবচেয়ে বড় কথা, আকাশ তাকে এভাবে কান্না অফ করতে বলল? ভীষণ অবাক হয় সন্ধ্যা। চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশকে শান্ত দৃষ্টিতে নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আকাশ এই কথা বলল? তার তো বিশ্বাস হয়না। আগে যখন সে কাঁদত, তখন-ও আকাশ এভাবেই তাকে কাঁদতে বারণ করত। আজ আবার-ও একইভাবে আকাশ তাকে কাঁদতে বারণ করল। সন্ধ্যার চোখজোড়া ভিজে ওঠে। এইতো তার আকাশ। মনে হচ্ছে একদম তার আকাশ সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তবে কি আকাশ তাকে আবারও ভালোবাসবে? আর খারাপ ব্যবহার করবে না? এটুকু ভাবতে গিয়ে সন্ধ্যার ভেজা চোখজোড়ায় পানি টইটুম্বুর হয়ে আবারও ক’ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। আকাশ খেয়াল করে, সন্ধ্যা আবার-ও কাঁদছে। এবার সে রা’গ’ল। ধমকে বলে,

“কাঁদতে নিষেধ করলাম না?”
সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। আগের চেয়ে আরেকটু অবাক হয়। আকাশ তাকে সেই আগের মতো কাঁদতে নিষেধ করছে? কেন করছে? সে কাঁদলে আকাশের কি? এই আকাশ তো তাকে শুধু আ’ঘা’ত করে৷
সন্ধ্যাকে সেই একইভাবে চোখের জল ফেলতে দেখে আকাশের আর সহ্য হলো না। রে’গে সে খপ করে সন্ধ্যার হাত ধরে সন্ধ্যাকে টেনে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে সন্ধ্যাকে বাড়ির বাইরে বের করে দিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“রাস্তায় গিয়ে যত খুশি কাঁদ। আর একবার আমার সামনে এসে কাঁদলে থা’প’ড়া’তে থা’প’ড়া’তে একদম জান নিয়ে নিব।”

সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আবার আকাশ তার সাথে খারাপ ব্যবহার করছে। তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে। এবার সন্ধ্যার এতো পরিমাণ রা’গ হলো। সবসময় সে মুখ বুজে সহ্য করবে কেন?
এদিকে আকাশ সন্ধ্যার মুখের উপর দরজা আটকাতে নেয়ার আগেই সন্ধ্যা তেড়ে যায় আকাশের দিকে। পা উঁচু করে দু’হাতে আকাশের ওভারকোটের কলার চেপে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,

“এ্যাই এভির বাচ্চা, এটা আমার স্বামীর বাড়ি। আমাকে আমার স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার তুই কে?”
আকাশ হতভম্ব হয়ে যায়৷ এই ছিঁছকাদুনে মেয়ের মুখ থেকে এমন ধারার কথা সে মোটেও আশা করেনি৷ প্রথমে তাকে নাম ধরে ডাকছিল, এরপর তাকে অ’মানুষ বলল। আর এখন একেবারে তুই করে বলে ফেলল। কত্ত বড় সাহস মেয়েটার! সে ভাবতেই পারছে না। রা’গে শরীর কাঁপছে। দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ভস্ম করে দেয়া দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। এইটুকু মেয়ের থেকে একের পর এক কটু ব্যবহার তার বিন্দুমাত্র হজম হচ্ছেনা।
এদিকে সন্ধ্যা একটু-আধটু ভ’য় পাচ্ছে৷ এই প্রথম সে আকাশকে তুই করে বলল৷ নিজেরই কেমন যেন লাগছে। কিন্তু সেই বা কি করবে? আকাশের প্রতিটা কাজে যেমন খারাপ লাগে, তেমনি রা’গ লাগে৷ তাছাড়া আকাশ তার সৌম্য ভাইয়ার সাথে যা করেছে, এরপর আকাশের সাথে খারাপ ব্যবহার করে তার নিজের গিল্টিফিল হওয়ার ব্যাপারটাই বরং হাস্যকর। আকাশ এর চেয়েও কঠিন ব্যবহার ডিজার্ভ করে৷ সন্ধ্যা আর নিজেকে দুর্বল করল না। বরং শ’ক্ত করল।
আকাশ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“বে’য়া’দ’ব মেয়ে, আমার কলার ছাড় বলছি।”
সন্ধ্যা-ও সাথে সাথে উত্তর করে,
“ছাড়বো না। কি করবেন আপনি?”
আকাশের রা’গ তড়তড় করে বাড়ছে। এই মেয়েকে যে সে কি করবে সে নিজেও জানেনা৷ মনে হচ্ছে একে ঠাস করে মে’রে দিলেও তার শান্তি হবেনা৷ কল্পনার বাহিরে শা’স্তি দিয়ে এরপর একে মা’র’বে।
সন্ধ্যা আবারও বলে,
“আপনার কথায় আর কিচ্ছু হবে না, বুঝেছেন আপনি? আমাকে ভালো না লাগলে আপনি নিজ দায়িত্বে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবেন৷ খবরদার! আমাকে আরেকবার এই বাড়ি থেকে বের হতে বলেছেন তো ভালো না বলে দিলাম।”
কথাটা বলে সন্ধ্যার আকাশের কলার ছেড়ে আকাশকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। আকাশ বাকহারা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ এই এতোটুকু মেয়েটা তাকে কি কি বলছে, আকাশ আর টোটালি নিতে পারছে না৷ সে দ্রুত উল্টোফিরে চেঁচিয়ে বলে,

“বে’য়া’দ’ব মেয়ে। এই বাড়িতে তোর কোনো জায়গা নেই। এক্ষুনি বেরোবি তুই।”
কথাটা বলতে বলতে সন্ধ্যার দিকে এগোয় আকাশ। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। আবারো খারাপ লাগলো আকাশের এহেন ব্যবহারে। সন্ধ্যা শ্বাস নিয়ে নিজেকে কঠোর করে। সে আকাশকে ফেলে যেতে চায় না৷ কখনোই না৷ যদি আকাশ সারাজীবন তাকে না চেয়ে এমনই থাকে, তবে সে নাহয় একদিন চলে যাবে৷ তার আগে আকাশের এমন পরিবর্তন, তার আর তার ভাইয়ার প্রতি আকাশের এরূপ আচরণের জবাব নিয়ে তবেই এই বাড়ি ছাড়বে। সে কেন মুখ লুকিয়ে থাকবে? কেন একা একা গুমড়ে পড়ে কাঁদবে? এমন করলে তার সৌম্য ভাইয়া সবচেয়ে বেশি ক’ষ্ট পাবে। সৌম্য ভাইয়া তো তার বোনুকে এতো দুর্বল দেখতে চায়না। সবচেয়ে বড় কথা, তার সৌম্য ভাইয়ার সাথে হওয়া অন্যায়ের জবাব না নিয়ে সে কোথাও যাবেনা। আর না তো যাবে প্রতিনিয়ত আকাশের তাকে অস্বীকার করার জবাব নিয়ে।
সন্ধ্যা আকাশের দিকে চেয়েই কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে শ’ক্ত করে বলে,

“আমি বলেছি আমি আমার স্বামীর বাড়ি থেকে কোথাও যাবো না। শুনতে পাননা আপনি?”
আকাশের পা থেমে যায়। সন্ধ্যার থেকে কয়েক হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে। সন্ধ্যার আবারো সেই এক কথা শুনে আরও রা’গল। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। আমার লাইফে বউ তো দূর, গার্লফ্রেন্ড অব্দি ছিল না।”
যতবার তাকে অস্বীকার করার জন্য আকাশের মুখ থেকে কটু বাক্য উচ্চারিত হয়, ততবার সন্ধ্যার দলা পাকিয়ে কান্না আসে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়না। সন্ধ্যা নিজেকে সামলালো। আকাশের এমন আচরণের কারণ তো সে ঠিক বের করবে। অতঃপর বলে,

“আপনি মিথ্যে বলছেন। আপনার বউ ছিল। আর আপনি তাকে ভালোও…..
আকাশ মাঝখান থেকে চিৎকার করে বলে, “আর একটা মিথ্যে বললে তোকে জুতো পেটা করব বে’য়া’দ’ব মেয়ে।”
সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। আকাশের কথার উত্তর হিসেবে বলে,
“আপনি মিথ্যা বললে আপনাকে আমি চটি পেটা করব।”
সন্ধ্যার বলা চটি পেটার অর্থ বুঝল না আকাশ। অদ্ভুদকণ্ঠে আওড়ায়,
“হোয়াট ইজ চটি?”
আকাশ ডান পাশে দাঁড়ানো একজন গার্ড বলে, “বস মেয়েরা পায়ে যেটা পড়ে, ওটাকে চটি বলে।”
কথাটা শুনে আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। কিহ! এই মেয়ে ওর পায়ের চটি দিয়ে তাকে পেটাতে চাইছে? কত বড় সাহস ভাবা যায়! শ’ক্ত চোখে সন্ধ্যার দিকে তাকায়। ডান হাতে গলায় ঝুলানো চেইন ধরে টানে, যেন সন্ধ্যাকে ঠিক এভাবেই ছিঁড়বে।

সন্ধ্যা ঢোক গিলল। এই আকাশকে দেখে তার হুট করেই ভীষণ ভ’য় লাগে। যেটা এখন লাগছে। সে অলরেডি অনেক কিছু বলে ফেলেছে। আসমানী নওয়ান-ও বাড়িতে নেই। এই আকাশ তো আর আগের আকাশ নয়, যে তার কথায় রা’গলেও ভালোবাসতে আসবে, বরং এই লোকটা রে’গে তাকে মা’র’তে আসে। সন্ধ্যা আর এখানে দাঁড়ালো না। আকাশকে আবারো তার দিকে এগোতে দেখে সে একপ্রকার দৌড়ে একটি ঘরে গিয়ে ঘরের দরজা ঠাস করে বন্ধ করে দেয়।
আকাশ সন্ধ্যাকে ধরার আগেই সন্ধ্যা দরজা বন্ধ করে দেয়ায় আকাশ রে’গে আরও বোম হয়ে যায়। রাগান্বিত স্বরে বলে, “বে’য়া’দ’ব মেয়ে। তোকে ছাড়বো না আমি।”
পিছন থেকে একজন বলে,
“কিন্তু বস, আপনি তো মেয়েটিকে ধরতেই পারলেন না। ছাড়বেন না কিভাবে?”
আকাশ লোকটির দিকে তেড়ে আসে। কলার ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“ধরতে পারলাম না মানে? ওকে আমি ধরেই ছাড়বো৷ নয়ত আমার নাম-ও এভি নয়।”
কথাটা বলে একটি চেয়ারে লাথি দিয়ে হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় আকাশ।

সৌম্য ইরাকে নিয়ে তাদের গ্রামের এক পুকুর পাড়ে বসে আছে। উপরে গাছ। শীতের রোদের ছিঁটেফোঁটা তাদের গায়ে এসে পড়ছে। সৌম্য’র গায়ে একটি জ্যাকেট, ইরার পরনে শাড়ির উপর একটা পাতলা সোয়েটার। তার উপর একটি চাদর জড়ানো। সৌম্য এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে পুকুরের টলটলে পানির দিকে। যেখানে রোদ্র অনেকটা জায়গাজুড়ে বিছিয়ে আছে। ইরা সৌম্য’র কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে রেখেছে৷ মেয়েটির অশ্রু থামছে না আজ। কেন এমন হচ্ছে তাদের সাথে? কেন তার সৌম্য’র সাথে এমন হচ্ছে? বেশ কিছুক্ষণ পর ইরা নিজেকে সামলায়। সোজা হয়ে বসে দু’হাতে চোখমুখ মুছে নেয়। সৌম্য’র দিকে তাকিয়ে মলিন গলায় বলে,
“আমরা এখন কোথায় যাবো সৌম্য?”

সৌম্য তাকায় তার বউয়ের দিকে৷ মেয়েটার মুখের ডানপাশ বেশ কালচে রঙের। সৌম্য তাকিয়ে রইল। তার বউয়ের মুখের এই দাগ, এই ত্যাগ শুধু তার জন্য। সে কেন দুঃখ পাচ্ছে? ভালোবাসার চেয়ে বড় কিছু হয়? হয়না। তার বাড়ি ধ্বসে পড়েছে তাতে কি? তার ইরাবতী, তার ভালোবাসা তো আছে। তার কাঁধে মাথা রাখছে। এটাই প্রকৃত সুখ। সৌম্যকে চুপ দেখে ইরার চোখজোড়া আবারও ভেজে। ভাঙা স্বরে ডাকে, “সৌম্য?”
সৌম্য ইরাকে তার বুকে শ’ক্ত করে জড়িয়ে নেয়। ইরা-ও জড়িয়ে ধরল সৌম্যকে। ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা। ভাবে তার সৌম্য’র ক’ষ্ট হচ্ছে। তার সৌম্য ক’ষ্ট পেলে সে কি করে ঠিক থাকবে? সে পারেনা। সে চায়, সৌম্য ভালো থাকুক। খুব ভালো থাকুক। কিন্তু কেন আল্লাহ তার সৌম্যকে একটুখানি ভালো থাকতে দেয়না?

সৌম্য অনেকটা সময় চুপ থাকলো। একটা টুঁ-শব্দটিও করল না। নিরব থেকে ইরাকে অনুভব করল। তার ভালোবাসা এটা। ভাগ্যের জোরে এই মেয়েটাকে সে পেয়েছিল। বহু ক’ষ্ট সহ্য করে সে তার ইরাবতীকে পেয়েছিল। কথাগুলো ভেবে সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইরাকে ছেড়ে দু’হাতের আঁজলায় ইরার মুখ নেয়। ইরা কান্নামাখা চোখজোড়া খুলে তাকায় সৌম্য’র পানে। সৌম্য দু’হাতের বুড়ো আঙুল দ্বারা ইরার ভেজা গাল মুছে দেয়। ইরার চোখে চোখ রেখে বলে,
“রিজিকের মালিক আল্লাহ। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু……
এটুকু বলে থেমে যায় সৌম্য। ইরার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে বলে,
“ওসব বাড়ি-গাড়ি ধ্বংস হয়ে যাক। হাজারটা বাঁধা পেরিয়ে, দিনশেষে আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা চিরদিন অটুট থাকুক। আমি দুনিয়াবি বাড়ি-গাড়ি, টাকার মোহে আটকাই না। আমি আটকে গেছি তোমার মোহে ইরাপাখি। শুধু তুমি বদলে যেও না। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমায় ভালোবেসো। আমি আমার ইরাপাখির সুখের জন্য জান কু’র’বা’ন করব। এতেই প্রকৃত সুখ।”

কথাগুলো বলে সৌম্য থামে। ইরার কপালে তার ঠেকানো কপাল সরায়। তাকায় ইরার পানে। ইরা অবাক হয়ে সৌম্যকে দেখে। অতি আনন্দে আবেগী অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সৌম্য’র গালে হাত দিয়ে বলে,
“ভালোবাসি সৌম্য।”
সৌম্য হাসল। কোথায় যেন শুনেছিল, গাছতলায় বসেও সুখী হওয়া যায়, যদি পাশে ভালোবাসার মানুষটা থাকে। কথাটা আজ তাদের সাথে ভীষণরকমভাবে মিলে গেল। সৌম্য ইরার হাতের তালুতে একটা চুমু এঁকে বলে,
“বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সা হারানোর শোক আমাকে দুঃখ দিতে পারেনা ইরাবতী। তাই এসব ভেবে আর কাঁদবে না। আমি বাড়ি হারিয়েছি তোমাকে না। তাই আমি সুখী।”
ইরা উত্তর করে,

“আমিও। কিন্তু আকাশ ভাইয়া….
মাঝপথে সৌম্য মলিন হেসে বলে,
“মানুষ কাউকে ক’ষ্ট দিয়ে যতটা অশান্তিতে ভোগে, ততটা অশান্তিতে সে ভোগেনা, যে তার স্বীকার হয়। আকাশ ভাইয়ার মাঝে যদি একটি মন থেকে থাকে, তবে সে তার ছোট ভাইকে দেয়া ক’ষ্টের কারণে দিনশেষে ঠিকই ছটফট করবে। সে কেন এমন করছে জানিনা। তবে আমি এটুকু জানি, সময় যেমন সবকিছু এলোমেলো করে দেয়, সেই সময়-ই আবার সবকিছু গুছিয়ে দেয়। ততদিন ধৈর্য রাখতে হয় ইরাবতী।”
ইরা খুব মন দিয়ে শুনলো সৌম্য’র কথা। সৌম্য কি সুন্দর করে কথা বলে। ইরার এখন অনেকটা হালকা লাগছে। সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“ল্যাপটপ তো নেই৷ আবারো চাকরির পরীক্ষা দিব ইরাবতী। কয়েকমাস আমার অভাবী সংসারে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেনা ইরাপাখি?”
এবার ইরার কান্না পায়। সৌম্য এভাবে কেন বলে? সে সৌম্য’র দুঃখের দিনে সৌম্য’র পাশে থাকবে না তো কার পাশে থাকবে? ইরা হাঁটুতে ভর দিয়ে সামান্য উঁচু হয়। সৌম্য কিছু বোঝার আগেই ইরা শ’ক্ত করে সৌম্য’র গলা জড়িয়ে ধরে ধরা গলায় বলে,
“তুমি জানোনা, আমি আমার সৌম্য’র জন্য সবকিছু করতে পারি?”
সৌম্য মৃদু হাসল। কিছু বলল না।

ধরনীর বুকে সন্ধ্যা নেমেছে। সৌম্য ইরাকে নিয়ে বাস কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছে৷ কিছুক্ষণ আগেই বাস থেকে নামলো। কোথায় যাবে সেটাই ভাবছে।
গত তিন মাস আগে ইরার মা মা’রা গিয়েছে। ইরার বাবার যে সম্পত্তি ছিল, সব সম্পত্তি ইরা আর ইরার মায়ের থেকে ইরার মায়ের বাড়ির মানুষেরা কবে লিখে নিয়েছে, ওরা নিজেরাও জানেনা। ঠিক যেমন আকাশ তার সাইন কিভাবে নিয়েছে সে জানেনা। কথাগুলো ভেবে সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
গ্রামে জমি কিনে বাড়ি করার পর হাত অনেক খালি ছিল। এর মধ্যে সন্ধ্যার গলা অপারেশনে মোটা অংকের একটা টাকা গিয়ে বলতে গেলে এক টাকাও ছিল না৷ এরপর ক’মাস ফ্রিল্যান্সিং করে কিছু টাকা জমিয়েছিল৷ আর সেই কিছুর পরিমাণ মাত্র ১৮ হাজার টাকা। যে টাকা দিয়ে তারা এই ঢাকা শহরে কোন বাড়ি উঠবে? কি খাবে, সেসব নিয়েই ভাবছে সৌম্য।

প্রায় অনেকক্ষণ যাবৎ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ইরার পা ব্য’থা হয়ে গিয়েছে৷ ঢাকা টু বগুড়া টানা দু’বার জার্নি করে এমনিতেও শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। ইরা তার ক্লান্তিকর মাথা সৌম্য’র বাহুতে ঠেকালে সৌম্য ইরার দিকে তাকায়। জিজ্ঞেস করে,
“খারাপ লাগছে ইরাবতী?”
ইরা ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়া মুখখানা সৌম্য’র দিকে করে বলে, “একটু।”
সৌম্য বা হাতে ইরাকে তার সাথে আগলে নিল। আশেপাশে তাকিয়ে রিক্সা খোঁজে। ঠিক করল, রিহানের বাড়ি যাবে। আকাশের বাড়ি তো কখনোই যাবেনা। আপাতত আজকের রাতটা থাকার জন্য রিহানের বাড়ি ছাড়া আর কিছু মাথায় আসলো না। ঠিক করল, আজ রাতে রিহানের বাড়ি থেকে আগামীকাল বাড়ি খুঁজতে বেরোবে।
একটি রিক্সা তাদের সামনে এসে দাঁড়ালে সৌম্য ইরাকে নিয়ে রিক্সায় উঠে পড়ে। রিক্সা চলতে শুরু করলে সৌম্য নিজ থেকে ইরার মাথা তার কাঁধে রেখে ইরাকে বা হাতে জড়িয়ে ধরে। ইরা চোখ বুজল। হাজারটা দুঃখের মাঝে, প্রিয় মানুষের কাঁধে মাথা রাখার সুখ তার কাছে এখনো আছে। সৌম্য’র ভাষায় এটাই প্রকৃত সুখ। এইতো তারা বাড়ি হারিয়েও সুখী। দিব্যি সুখী। কারণ তাদের ভালোবাসা হারায়নি। আর না কখনো হারাবে।

মাগরিবের নামাজ পড়ে জায়নামাজে বসে সন্ধ্যা কতক্ষণ যে কাঁদল তার ইয়ত্তা নেই। খুব করে চাইল, আল্লাহ সব ঠিক করে দিক। সুখ না দিল, কিন্তু এতো দুঃখ থেকে অন্তত মুক্তি দিক। কেঁদেকেটে জায়নামাজ ভাঁজ করে রাখে। আসমানী নওয়ানের ডাকে সন্ধ্যা তাকায় দরজার দিকে। মায়ের মতো একজনকে দেখে সন্ধ্যা দৌড়ে এসে ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে।
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার পিঠে হাত রাখে। আজ সারাদিন সে বাড়ি ছিল না। অনকের সাথে কথা বলেছে, অনেক খুঁজেছে গত তিনবছরের একফোঁটা প্রমাণের আশায়, যা দিয়ে আকাশকে সামান্য হলেও কনভিন্স করতে পাবে। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। আর বাড়ি ফিরে সৌম্য’র সাথে করা আকাশের ঘটনায় ভদ্রমহিলা রীতিমতো বড়সড় শক্ পেয়েছে। তিনি একটুও বুঝতে পারছেন না আকাশ এসব কেন করছে। কি এমন শ’ত্রু’তা বাঁধল যে আকাশ সৌম্য’র পিছনে এভাবে উঠেপড়ে লাগলো?
সন্ধ্যা বহুক’ষ্টে নিজেকে সামলে বলে,

“তোমার ছেলে এসব কিভাবে করতে পারলো আম্মা? সৌম্য ভাইয়া অনেক ক’ষ্ট পেয়েছে। আমার খুব ক’ষ্ট হচ্ছে। তোমার ছেলেকে কিন্তু ছাড়বো না বলে দিলাম।”
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার চোখের পানি মুছে দেয়। মৃদুস্বরে বলে, “সৌম্য এখন কোথায়?”
সন্ধ্যা উত্তর দেয়, “জানিনা। অনেকবার কল করেছি, কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ দেখায়। আমার চিন্তা হচ্ছে।”
আসমানী নওয়ান কিছু একটা ভেবে বলে, “তোর ভাইয়ের একটা বন্ধু ছিল যে। কি যেন নাম?”
“রিহান ভাইয়া?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। ওই রিহানকে একটা কল করে দেখ। সৌম্য কোথায় ও জানতে পারে। ও তো সৌম্য’র বন্ধু।”
সন্ধ্যা মাথা নাড়লো। এটা তো তার মাথায় আসেনি৷ দু’হাতে ভেজা মুখ মুছে সন্ধ্যা তার ফোন থেকে রিহানের নাম্বারে কল করে। ১ম বারেই রিসিভ হয়। সন্ধ্যা বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“রিহান ভাইয়া আমার সৌম্য ভাইয়া কোথায়, আপনি কি জানেন?”
ওপাশে রিহান চুপ থাকলো। অনেকগুলো মাস পর আজ সন্ধ্যার কণ্ঠ শুনলো ছেলেটা। কণ্ঠ শুনেই বুঝেছে সন্ধ্যা কেঁদেছে হয়ত। সৌম্য, ইরা তার বাসায় আসার পর সে ইরার থেকে সব শুনেছে। সৌম্য চাপা স্বভাবের৷ ওকে জিজ্ঞেস করলে ও এড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু ইরা নিজ থেকেই বলেছে। রিহান আকাশের ফিরে আসা থেকে শুরু করে আকাশের প্রতিটি কর্মকান্ড শুনে অবাক হয়েছে। সন্ধ্যা ভালো নেই ভেবে ছেলেটার মুখে ব্য’থার ছাপ। সে সন্ধ্যাকে পায়নি, কিন্তু সে সবসময় চেয়েছে সন্ধ্যা ভালো থাকুক। কিন্তু সন্ধ্যা ভালো নেই। এটা ভাবলেই রিহানের ক’ষ্টের রেশ বেড়ে যায়।
সন্ধ্যা কোনো রেসপন্স না পেয়ে আবার ডাকে, “রিহান ভাইয়া?”
রিহানের ধ্যান ভাঙে। উত্তর দেয়,

“সৌম্য আমার বাড়িতে আছে।
কথাটা বলে রিহান বেশ দোনামোনা করে বলে, তুমি কি কেঁদেছ সন্ধ্যা?”
সৌম্য রিহানের বাড়ি শুনে সন্ধ্যা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তবে রিহানের প্রশ্নে সে ভীষণ বিব্রতবোধ করে। ছোট করে বলে,
“স্বর্দি লেগেছে ভাইয়া। রাখছি।”
বলেই কল কেটে দেয় সন্ধ্যা। রিহান চোখ বুজে চাপা শ্বাস ফেলে। রিহানের ইচ্ছে ছিল সন্ধ্যার বাচ্চা হওয়ার পর, বাচ্চাটার বয়স কয়েক মাস হলে, সে সন্ধ্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দিবে। সন্ধ্যার পুরো জীবন এখনো পড়ে আছে। সারাজীবন তো কেউ একা থাকেনা। সন্ধ্যা-ও দিনে দিনে আকাশকে ভুলে মুভ অন করবে। আর সন্ধ্যার সঙ্গী হবে সে। তার ভাবনার শুরু হতে না হতেই ইতি ঘটে গেল। রিহানের ভীষণ আফসোস হলো, আকাশ ফিরে আসায়। কেন যেন রা’গ-ও হলো আকাশের উপর। আকাশ না ফিরলে সন্ধ্যারাণী তার হতো। সন্ধ্যার বাচ্চাকে সে ফেলত না। সে সন্ধ্যার বাচ্চার বাবা হত। তার কোনো প্রবলেম ছিল না। কিন্তু সব এক নিমিষেই ভেস্তে গেল আকাশ ফিরে আসায়।

সৌম্য রিহানদের বাড়ি আছে, এটা সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানকে জানালে ভদ্রমহিলা সন্ধ্যাকে নিয়ে রিহানদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। আর দেরি করেনি। আকাশ সৌম্যকে বের করে দেয়ার পর সৌম্য যে আর এই বাড়ি আসবেনা, এটা তারা সবাই খুব ভালো করেই জানে। না জানার কথাও না। সৌম্য ভীষণ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ছেলে, তা সবার জানা। আর এজন্য আসমানী নওয়ান নিজেই সৌম্য’র কাছে আসছেন। সন্ধ্যা রিহানদের বাড়ি চেনে তাই অসুবিধা হয়নি। আসমানী নওয়ান মূলত আকাশের ব্যাপারে অনেক অজানা কথা সন্ধ্যা আর সৌম্যকে জানাতে চায়। এই পরিস্থিতিতে আকাশের ব্যাপারটি খোলাশা করার ভীষণ প্রয়োজনবোধন করল। সাথে এটাও জানাবে, আকাশ স্মৃতি হারানোর কারণে সৌম্যকে চিনলেও উদ্ভট আচরণ করছে, আর সন্ধ্যাকে চিনছে না।
সন্ধ্যা আর আসমানী নওয়ান রিহানদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা দু’বার কলিংবেল চাপলে রিহানের মা এসে দরজা খুলে দেয়। সন্ধ্যা রিহানের মাকে সালাম দিলে ভদ্রমহিলা গোমরামুখে সন্ধ্যার সালামের উত্তর নেয়। সৌম্য, সন্ধ্যা তার বাড়ি আসায় সে মোটেও খুশি নয়। কারণ তার ছেলের ছন্নছাড়া জীবনের জন্য সে সন্ধ্যাকেই দায়ী করে। রিহানকে হাজারবার বিয়ে করার কথা বলেও রাজি করাতে পারেনি। রিহানের উত্তর, ‘সে এক্ষুনি বিয়ে করবেনা৷ সময় লাগবে তার।’

তিনি খুব ভালোই বোঝে রিহান তাকে থামিয়ে রাখার জন্য এই কথা বলে। ছেলের এমন অবস্থা দেখলে কোন মা মেনে নেয়? এজন্যই সন্ধ্যার দোষ না থাকলে সে সন্ধ্যাকেই দোষী মনে করে।
আসমানী নওয়ান, সন্ধ্যা বাড়ির ভেতর যায়। ডাকে ‘সৌম্য ভাইয়া’ বলে। বোনুর গলা পেয়ে সৌম্য রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সৌম্য’র পরনে হাতকাটা একটা কালো টি-শার্ট, কালো প্যান্ট।
বেশিক্ষণ হয়নি রিহানের বাড়ি এসে পৌঁছেছে। জ্যাকেট খুলে রেখে হাতমুখ ধুয়ে মাত্র বেরিয়েছে, তখন-ই বোনুর গলা পেয়ে বেরিয়ে এসেছে।

ভাইয়ের শুকনো মুখ দেখে সন্ধ্যার চোখের কোণে পানি জমে। দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে ভাইয়ের বুকে মাথা রাখে। জড়িয়ে ধরে শ’ক্ত করে। তার ভাই তার প্রথম আশ্রয়স্থল। একসময় তার পাশে একটা পোকাও ছিল না, শুধু তার ভাইয়া ছিল। কত ক’ষ্ট করে তাকে বড় করেছে তার ভাইয়া! বাবা-মা সবার ভালোবাসা তার ভাইয়া একাই তাকে দিয়েছিল। সেই মানুষটা আজ যখন এতো খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যায়, তখন সন্ধ্যা কি করে মানবে? সন্ধ্যা খুব করে চাইল, তার সৌম্য ভাইয়ার সব দুঃখ তার হোক। কিন্তু তার ভাইয়া ভালো থাকুক।

সৌম্য সন্ধ্যার মাথায় হাত রেখে ডাকে, “বোনু?”
সন্ধ্যা মাথা তুলে তাকায়। ভেজা কণ্ঠে বলে, “ভাইয়া তোমার বাড়ি….
সন্ধ্যার গলা বেঁধে আসে। সৌম্য মৃদু হাসল। বোনের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে, “এসব কেন ভাবছিস? আমি ঠিক আছি বোনু। আমার কাছে ইরাবতী আর তুই আছিস তো। তোরাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ।”
সন্ধ্যা মলিন মুখে তাকায়। আসমানী নওয়ান এগিয়ে এসে বলেন,
“সৌম্য আব্বা আমার কিছু কথা আছে তোমাদের সাথে। বসবা একটু?”
সৌম্য আসমানী নওয়ানের দিকে তাকায়। ছেলের কাজে ভদ্রমহিলা যে ভীষণ আপসেট তা তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সৌম্য সম্মতি দেয়। রিহান ড্রইংরুমে নিয়ে যায় সবাইকে নিয়ে। সৌম্য’র দু’পাশে ইরা আর সন্ধ্যা বসে। আসমানী নওয়ান সামনে বসে। আরেকপাশে রিহান বসে। যার দৃষ্টি সন্ধ্যার শুকনো মুখের দিকে। সন্ধ্যা বাইরে বের হলে মাঝে মাঝে রাস্তা থেকে দূর থেকে দেখত। মাঝে অনেকগুলো দিন আর দেখা হয়নি৷ আসমানী নওয়ানের কথায় তার ধ্যান ভাঙে।

“জ্যাক ডাল্টন। যাকে আমরা সবাই জেডি বলে ডাকি। জেডি আকাশের স্কুল লাইফের ফ্রেন্ড। আকাশ যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে, তখন তাদের বন্ধুত্ব হয়েছিল। ওদের বন্ধুত্ব স্কুল, কলেজ, এমনকি ভার্সিটি পর্যন্ত সবার চোখে পড়ার মতো ছিল। এমন-ও হয়েছে আকাশ জেডির মেসে গিয়ে এক সপ্তাহ টানা থেকেছে। আকাশের বাবা আকাশকে নিতে গেলে আকাশ আসতো না। এই আলিশান বাড়ি রেখে ও জেডির কাছে গিয়ে পড়ে থাকতো ছোটোখাটো মেসে। একজনের জায়গায় দু’জন গাদাগাদি করে থাকতো। আমি, আকাশের বাবা রা’গ করলেও আকাশ সেসব গায়ে মাখতো না। এভি / জেডি এদের সম্পর্কটাই ছিল এমন যে ওদের নিয়ে পুরো দুনিয়ার মানুষ হাজারটা কথা বললেও ওরা দু’জন দু’জনের গলা ধরে থাকতো। কারো কথা কানে নিত না। কলেজ লাইফ পর্যন্ত আমি আকাশ, জেডি দু’জনকেই খুব ভালোভাবে দেখলাম।

কিন্তু ভার্সিটি ওঠার পর জেডি হঠাৎ ইংল্যান্ড পাড়ি জমায়। আকাশ তখন দিশেহারা ছিল। জেডি তার ২৪ ঘণ্টা একসাথে থাকার মতো বন্ধু ছিল। হঠাৎ এতো কাছের বন্ধু কিছু না বলে না কয়ে চলে গেলে যেমন হয়, আকাশের অবস্থা তেমনি হয়েছিল। ভার্সিটির ১ম সেমিস্টারের এক্সাম পর্যন্ত আকাশ দেয়নি জেডির শোকে। আমার আর ওর বাবার কাছে এসে বাচ্চাদের মতো বায়নাও করেছে জেডিকে বাংলাদেশে ফিরতে বলতে। কিন্তু জেডির সাথে আমাদের আকাশের মাধ্যমেই পরিচয়। আমরা জানতাম না জেডি কোথায়। যেগাযোগ-ও করতে পারিনি। দেখতে দেখতে সেকেন্ড সেমিস্টার চলে আসে। আকাশের পড়ায় মন নেই। সে বন্ধুর শোকে তখনো কাতর। আমি আর আকাশের বাবা আকাশকে বোঝালাম সে আবারও এক্সাম না দিলে ইয়ার লস যাবে। আর সে অনার্স শেষ করলে তাকে আমরা বিদেশ পাঠাবো। যে দেশে জেডি গিয়েছে সেই দেশেই পাঠাবো। আকাশের কথা ছিল, জেডি ভার্সিটি ভর্তি হওয়ার পর চলে গিয়েছে। ও ফিরলে তারা একসাথেই এক্সাম দিবে৷ নয়তো সে একা একা উপর ক্লাসে উঠে যাবে, যা আকাশের ভীষণ অপছন্দের ছিল। যেখানে সে আর জেডি স্কুল লাইফ থেকে আলাদা ক্লাস তো দূর, আলাদা বেঞ্চেও কখনো বসেনি সেখানে তাদের ক্লাস আলাদা হয়ে যাবে? আকাশ মানেনি।

ভাগ্য সহায় থাকায় চার মাসের মাথায় জেডি বাংলাদেশে ফিরে আসে। এয়ারপোর্ট থেকে সর্বপ্রথম আমাদের বাড়িতেই আসে। কোনোদিকে না তাকিয়ে আকাশকে জাপ্টে ধরে সে সেদিন কেমন অদ্ভুদভাবে কেঁদেছিল। আমি, আকাশের বাবা অবাক হয়েছিলাম। আকাশ ভীষণ বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে, জেডির কি হয়েছে। আমরাও জিজ্ঞেস করি। কিন্তু জেডি কিছুই বলেনি। খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়েছিল। পরবর্তীতে জেডি আকাশকে এ ব্যাপারে কিছু বলেছিল কি-না জানিনা। আমি জিজ্ঞেস করলে আকাশ প্রতিবার-ই এড়িয়ে গিয়েছে। এরপর আবারো তাদের সেই বন্ধুত্ব। তারা একসাথে এক্সাম দিল। ১ম সেমিস্টারের রিটেক দিল একসাথে। কিন্তু বছরখানেক পর খেয়াল করলাম আকাশের মাঝে অনেক পরিবর্তন। ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়তে থাকলো। আকাশের উগ্রতা, চালচলন কেমন যেন হয়ে গেল। আকাশকে চিনতেই পারতাম না আমরা। আমার নিজেকে দিশেহারা লাগে। আমি কি করব, কোথায় যাবো কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না৷ আকাশের আচরণে এতো পরিবর্তন হয়েছিল যে ও রাতে ক্লাবে পর্যন্ত যেত। সারারাত ক্লাবে কা’টিয়ে সকালে বাড়ি ফিরত।”

একটানা কথাগুলো বলে আসমানী নওয়ান থেমে যায়। সন্ধ্যার দৃষ্টিতে বিস্ময়। আসমানী নওয়ান খেয়াল করলেন তা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো বলতে শুরু করেন,
“আকাশের জীবনে কোনো মেয়ের অস্তিত্ব ছিল না। কারণ আমি পুরোপুরি জানিনা। তবে ওর মেয়েদের প্রতি ভীষণ বিতৃষ্ণা ছিল কোনো এক অজ্ঞাত কারণে। এটা বুঝেছিলাম, যখন আমি ওকে ভালো পথে আনার জন্য বিয়ে দিতে চাইছিলাম। ও ভার্সিটি পড়াকালীন ওকে বিয়ে দিলে, ভালো মেয়ের সংস্পর্শে এসে ও ভালো হয়ে যাবে ভেবেছিলাম। কিন্তু আকাশকে রাজি করাতে পারিনি। অনেক চেষ্টা করেছি৷ বারবার ব্যর্থ হয়েছি।

এরপর জানতে পারলাম আকাশ আসলে জেডি’র জন্যই এমন হয়েছে। ওই যে কথায় আছে, ‘সঙ্গদোষে লোহা ভাসে।’ আকাশের ক্ষেত্রে তেমনি হয়েছিল। জেডির সব চালচলন যেন আকাশ নিজের মাঝে নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছিল। আমার তখন জেডিকে অসহ্য লাগতো। ওর জন্যই আমার ছেলে সেদিন বেপথে গিয়েছিল। আমি জেডির সঙ্গ ছাড়ানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি এখানেও ব্যর্থ হয়েছি। জেডি আর আকাশের বন্ধুত্বের বন্ধন এতোটা দৃঢ় ছিল, এগুলো ঠুনকো কিছুতে ভাঙতো না। আমি অনেক চেষ্টা চালানোর পর একদিন সফল হই, যখন আকাশ আর জেডি থার্ড ইয়ারে, তখন। অরুণ আমাকে অনেক সাহায্য
করেছিল এ ব্যাপারে।

এরপর আকাশ ভার্সিটির সবার সামনে জেডিকে অপমান করেছিল খুব বাজেভাবে। জেডি-ও প্রিয় বন্ধুর থেকে এতো অপমানিত হয়ে দেশ ছেড়ে চলে যায়। তারপর আকাশ কেমন যেন নির্জীব হয়ে যায়।”
আসমানী নওয়ান কথায় দাঁড়ি টানে। সময় নেয়।
সৌম্য, ইরা, রিহান ভার্সিটি গিয়েছিল, যখন আকাশেরা লাস্ট ইয়ারে ছিল। তারা মাঝে-মাঝে জেডি আর এভিকে দেখত। আবার কখনো দেখত না৷ তারা এতোকিছু জানতোও না। লোকমুখে শুধু শুনেছিল এভি/জেডি দুই বন্ধু। এটুকুই।
সকলের মুখে অজানা কৌতুহল। বোধয় জানতে চাইছে, আসমানী নওয়ান আর অরুণ কি এমন করেছিল যে, এভি/জেডি এদের এতো ভালো বন্ধুত্ব মুহূর্তেই ভেঙে গেল?

আসমানী নওয়ান এ বিষয়ে কিছু বললেন না। এটুকু স্কিপ করে আবার-ও বলতে শুরু করেন,
“আকাশ ভীষণ একরোখা টাইপ। ওকে যদি কোনো কিছু একবার বিশ্বাস করানো যায়, তাহলে সেখান থেকে বের করা খুব কঠিন। ক’দিন পর জেডি দেশে ফিরে আসে। আকাশের পিছু পিছু ঘোরে। কিন্তু আকাশ তার জায়গায় স্ট্রিক। কিছুদিনের মাথায় আকাশ ওর সোনালি চোখের মণিজোড়া ঢেকে ফেলে কালো লেন্সে। কারণ জেডি ওর সোনালি চোখ পছন্দ করত। ও জেডিকে ক’ষ্ট দেয়ার জন্য, জেডির পছন্দ এভোয়েড করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আমি নিষেধ করিনি। বরং বলেছিলাম, ও অন্ধ হয়ে গেলেও লেন্স পড়ে থাকুক। তবুও জেডিকে ভুলে যাক। জেডির ছায়াও আকাশের উপর না পড়ুক। ভালো মানুষ হয়ে থাক। এটাই চেয়েছিলাম।

দেখত দেখতে আকাশের অনার্স শেষ হয়। সে আমাদের জানায়, সে ইংল্যান্ড পিএইচডি করতে যেতে চায়। আমরা নিষেধ করিনি। বরং ভেবেছিলাম ওখানে গিয়ে নতুন বন্ধু হবে। নতুন বন্ধু পেয়ে জেডিকে ভুলে যাবে। কিন্তু আমাদের ভাবনা সঠিক হয়নি। আকাশ ইংল্যান্ডে গিয়ে পড়াশোনা করেছে ঠিকই, সাথে নিজেকে গড়েছিল এক মাফিয়া হিসেবে। যে বিভিন্ন খারাপ কাজে জড়িত হয়ে গিয়েছিল। খু’ন খারাপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল।
পিএইচডি শেষ করে আকাশ যখন বাড়ি ফিরল তখন আমরা কেউ আকাশকে চিনতে পারিনি। সে কারো কথা শুনতো না।

বাসায় অনেক বড় বড় উচ্চপদস্থ মানুষদের যাওয়া-আসা থাকতো। যাদের সাথে আকাশের মেলামেশা ছিল। রাত-বিরাতে বাড়ি ফেরা। কেউ একটু উঁচু গলায় কথা বললে হাত-পা ভেঙে দেয়া,, আবার কাউকে কাউকে চোখের পলকে লা’শ বানিয়ে দেয়া। নিত্যদিন মদ্যপান করত পানির মতো। মানুষ দিনে যে পরিমাণ পানি-ও খায়না, তেমন মদ পান করত আকাশ। এসবই ছিল আকাশের নিত্যদিনের সঙ্গী।
আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আকাশের বেশভূষায়। আকাশকে যতবার বোঝাতে গিয়েছি, আকাশ ততবার গা ছাড়া ভাবে থেকেছে। আমার সাথে হেয়ালি করেছে। অবাক করার ব্যাপার ছিল জেডি ইংল্যান্ড থাকলেও জেডির সাথে আকাশ তার সম্পর্ক সেদিনও জোড়া লাগায়নি। একরোখা, জেদি আকাশ জেডিকে বরাবরেই মতোই দূরে সরিয়ে রেখেছিল।

আমি অধৈর্য হয়ে গেলাম। মনে হলো, আকাশকে বিদেশে পড়তে পাঠানোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমি আর না পেরে আকাশকে শাসন করতে গেলাম। চিৎকার, চেঁচামেচি করলাম। থা’প্প’ড় মা’রলাম। আকাশ সেদিন অনেক রে’গে গিয়েছিল। পুরো বাড়ির জিনিস সব তছনছ করে রা’গ নিয়ে আবারো পাড়ি জমিয়েছিল ইংল্যান্ড। যা আজ থেকে তিন বছর আগের কথা। আজ আকাশের স্মৃতি সেখানেই আটকে আছে।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে আসমানী নওয়ানের গলা বেঁধে আসে। চোখের কোণে জলকণা। সবাই কেবল অবাক হয়ে শুনছে আকাশের সেই কালো অতীত৷ কৌতুহল জেগেছে, তাহলে মাঝের আকাশ এতো ভালো কিভাবে ছিল?
আসমানী নওয়ান নিজেকে সামলে আবারও বলে,

“আমি অনেক কেঁদেকেটে, অসুস্থতার দোহাই দিয়ে, অনেক ক’ষ্টে আকাশকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলাম। খুব কৌশলে আকাশের সাথে কাজ করেছিলাম। আকাশের গড়া সবকিছুতে আমি পিছন থেকে তালা লাগিয়েছিলাম। এরপর শেষমেশ আকাশকে রিহাবে পর্যন্ত পাঠিয়েছিলাম। দীর্ঘ এক বছর আকাশ রিহাবে ছিল। আমি বা আকাশের বাবা কেউই একদিনের জন্য-ও আকাশকে দেখতে যায়নি। একবছরের মাথায় খবর আসলো, আকাশ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আর টিকতে না পেরে ছুটে গিয়েছিলাম আমার ছেলের কাছে৷ আকাশের চুল-দাঁড়ি সব বড় হয়ে গিয়েছিল। কেমন পা’গ’লের মতো দেখাচ্ছিল। উষ্ক-খুষ্ক রোগা আকাশকে দেখে বুকটা ফেঁটে যাচ্ছিল। একটা বছর বুকে পাথর চেপে দূরে ছিলাম। ছেলের ভালোর জন্য যতটা কঠোর হতে হয়, হয়েছিলাম। তার ফল সেদিন পেয়েছিলাম। পেয়েছিলাম বাচ্চাদের মতো আকাশকে। সে আমাকে দেখে সেদিন বাচ্চাদের মতো নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলেছিল। দু’হাতে আমার পা সাপ্টে ধরে বলেছিল,

‘মা, তোমার পায়ে পড়ি। আমায় বাড়ি নিয়ে যাও মা। এখানটায় খুব অন্ধকার, জানো? আমার দমবন্ধ লাগে। আমার এখানে থাকতে খুব ক’ষ্ট হয়। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি আর খারাপ কাজের সাথে নিজেকে জড়াবো না। আমি ভালো হয়ে যাবো মা। আমাকে তোমার সাথে বাড়ি নিয়ে যাও। আমায় মন ভরে প্রকৃতি অনুভব করতে দাও। আমার আর কিচ্ছু চাইনা মা। এই অন্ধকার ঘরে আমাকে আর রেখে যেও না। দয়া কর মা।”
আকাশের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুতে আমার দু’পা ভিজেছিল সেদিন। দীর্ঘ রাত পেরিয়ে সকালে যেমন সূর্যের আলো দেখতে পাই। তেমনি সেদিন আমি আমার আকাশের অন্ধকার জীবন থেকে আলোকিত জীবনে আসারা এক নতুন সকাল দেখেছিলাম। আকাশকে বাড়ি নিয়ে আসলাম। সে তার বাবার ব্যবসায় জয়েন করল। আমার ছেলেটা ভালো হয়ে গেল। জন্ম থেকে যেটুকু রা’গ ছিল, সেটাই মাঝেমাঝে এপ্লাই করত। তাছাড়া আমার ভীষণ বাধ্য ছিল। এরপর আকাশের মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে সন্ধ্যার সাথে বিয়ে দিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, আমি যে আকাশকে গড়েছিলাম, সে সন্ধ্যাকে ঠিক একদিন ভালোবাসবে৷ আমার বিশ্বাস সত্য প্রমাণিত হলো। কিন্তু তার পরিণতি এমন হবে ঘুনাক্ষরে-ও টের পাইনি।”

সকলে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। সন্ধ্যার চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। কেন কাঁদছে সে জানেনা। রিহাবে বলা আকাশের অসহায়ত্বে ঘেরা কথাগুলো বলার সময় আকাশের অবস্থা যেন সন্ধ্যার চোখে ভাসল। আকাশ এতো ক’ষ্ট করে সেই লাইফ থেকে ফিরে আবারো সেই পথে চলে গিয়েছে। এর চেয়ে ক’ষ্টের আর কি আছে?
আসমানী নওয়ানের চোখ থেকে দু’ফোটা জল গড়ায়। সে নিজেকে সামলে বলে,
“আকাশকে জেডি বাঁচিয়েছে জানি। এরপর ও ইংল্যান্ড থেকে আবারো সেই জীবনের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিয়েছে৷ আর সেই এক্সিডেন্টে ছেলেটার কিছু স্মৃতি মুছে গিয়েছে। যে স্মৃতির পাতায় তার কামব্যাক থেকে শুরু করে সন্ধ্যাকে বিয়ে করা, সন্ধ্যাকে ভালোবাসা,, এসব ছিল। সব মুছে গিয়েছে।”

লাস্ট কথাটায় সন্ধ্যার জন্য বোধয় সবচেয়ে বড় ঝটকা ছিল। এজন্য আকাশ তাকে চিনতে পারেনা? মেয়েদের প্রতি সেই বিতৃষ্ণা আকাশের মনে পুষে আছে? সন্ধ্যার চোখ বেয়ে ক’ফোঁটা জল গড়ায়। এইবার আকাশের করা প্রতিটি কাজের পিছনে কারণ বুঝল। আকাশ কি আর কখনো তাকে মনে করবে না? কথাটা ভাবতেই সন্ধ্যার আরও কান্না পায়। তার আকাশ যে এই আকাশের মাঝেই হারিয়ে গেছে। সে কিভাবে খুঁজে পাবে তার আকাশকে?
সৌম্য, ইরা, রিহান সকলে স্তম্ভিত হয়ে বসে আছে। তারা কেউ জানতো না আকাশের এসব কাহিনী। আজ জেনে মনে হলো, সকলেই বড়সড় শক খেয়েছে।

আসমানী নওয়ান সৌম্য’র দিকে চেয়ে বলেন,
“সৌম্য আব্বা, আকাশ তোমার সাথে এমন কেন করছে তা আমি জানিনা। কিন্তু কেউ এর পিছনে আছে। যে আকাশকে নিশ্চয়ই ভুল কিছু বুঝিয়েছে। যে কারণে আকাশ তোমাকে শ’ত্রু ভেবে বারবার আ’ঘা’ত করছে। তুমি আকাশকে ভুল বুঝো না আব্বা।”
সৌম্য ঢোক গিলল। কেন যেন একটু হলেও শান্তি লাগলো। কারণ আকাশ নিজের অনিচ্ছায় সব কাজ করছে৷ কাছের মানুষরা কারণবশত বদলে যাওয়ার মতো আচরণ করলে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ইচ্ছে করে বদলে গেলে মেনে নেয়া যায় না। আকাশ যা করছে সব অনিচ্ছায়, কারো প্ররোচনায়। কথাগুলো ভেবে সৌম্য ঢোক গিলল। ছোট করে বলে, “জ্বি।”
আসমানী নওয়ান আর বসলেন না। অনেক রাত হয়েছে। সন্ধ্যাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে সন্ধ্যা সৌম্য’র থেকে বিদায় নেয়৷ সৌম্য সন্ধ্যাকে সাহস দেয়। সন্ধ্যা বুঝেছে বোধয় অনেক কিছু।

বাড়ি এসে সন্ধ্যা ফ্রেশ হয়ে এসে আয়নায় নিজেকে দেখে। ডান গালে সকালে আকাশের মা’রা থা’প্প’ড় খেয়ে গালের অবস্থা খুব খারাপ। সৌম্যর কাছে যাওয়ার আগে সে এখানে পাউডার দিয়েছিল, যেন সৌম্য বুঝতে না পারে। এমনিই তার ভাইয়ের কত দুঃখ। তার দুঃখে সৌম্য ভাইয়াকে আর ব্য’থিত করতে চায়নি।
সন্ধ্যার মন ছটফট করে আকাশকে দেখার জন্য। সেই আকাশ, যে আকাশের মাঝেই কোথাও না কোথাও তার আকাশের অস্তিত্ব মিশে আছে। কিন্তু বাড়ি এসে আকাশকে দেখেনি। আকাশ বোধয় সেই সকালে বেরিয়েছে আর বাড়ি ফেরেনি।

আসমানী নওয়ান বাড়ি এসে ফ্রেশ হয়ে নেয়। এরপর সে সন্ধ্যার জন্য ঘরে ভাত আনলে সন্ধ্যা আয়নার সামনে থেকে সরে এসে বিছানায় বসে। ভদ্রমহিলা সন্ধ্যার পাশে বসে সন্ধ্যাকে নিজহাতে খাবার খাইয়ে দেয়। সন্ধ্যা জেদ করেনা। চুপচাপ খেয়ে নেয়। আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে খাওয়ানো শেষে প্লেট রেখে আসে। এরপর সে সন্ধ্যার পাশে বসে সন্ধ্যার গালে হাত রেখে মলিন গলায় বলে,
“আমি মা হয়ে আকাশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে অনেক ক’ষ্ট সয়েছি মা। আমার হয়ত আর সেই ধৈর্য নেই। এবার আকাশকে সঠিক পথে আনার ভার তুই নিবি তো মা?”
সন্ধ্যা ছলছল চোখে তাকায়। সে বোধয় বড় হয়ে গেল। এতোদিন সবাই তার দায়িত্ব পালন করেছে। কখনো তার সৌম্য ভাইয়া, আবার কখনো তার আকাশ। এবার দায়িত্ব এসে পড়েছে তার উপর। সন্ধ্যা নিজেকে শ’ক্ত করে। সে আকাশের পাশে না থাকলে আর কে থাকবে? সে আকাশের প্রতি কখনো কঠোর হবে, কখনো বা নমনীয় হবে। আর এভাবেই ঠিক একদিন আকাশ আবারও আগের মতো হয়ে যাবে। আবারও তাকে মনে করবে। এসবই তো তার দায়িত্ব। সে যে আকাশের সন্ধ্যামালতী।

ঘড়ির কাটায় রাত ১ টা। আকাশ বাড়ি ফিরেছে মাত্র। চারপাশটা অন্ধকার দেখে ভীষণ বিরক্ত হলো। ঘরে যাওয়ার জন্য সামনের দিকে পা বাড়ায়। পরনে সাদা প্যান্ট, সাদা শার্ট, তার উপর সাদা জ্যাকেট।
স্বভাবসুলভ আকাশ ডানবামে মাথা নাড়ায়। কয়েক পা এগিয়ে হঠাৎ ডানদিকে কিছু একটা চোখে পড়ে। আকাশ সাথে সাথে আবার-ও ডানদিকে মাথা ঘোরায়। মায়ের ঘরের লাইট জ্বালানো। দরজা বরাবর বিছানা। এদিকে ফিরে কম্বলের নিচে সন্ধ্যা ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু আকাশের যেটা অবাক লাগলো, সন্ধ্যা ঘুমোতে ঘুমোতে হাসছে। আকাশ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। এই মেয়ে সত্যি সত্যি কি পা’গ’ল না-কি? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আবার কেউ হাসে? আকাশ এগিয়ে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে।

এগিয়ে এসে দাঁড়ায় সন্ধ্যার মাথার কাছে। সে এখানে আসতে আসতে সন্ধ্যার হাসি মিলিয়ে গিয়েছে। আকাশ বিরক্ত হলো৷ এতক্ষণ হাসছিল, সে আসতেই থেমে গেল। ইচ্ছে করল, ঠাস করে একটা লাগাতে। তাছাড়া আকাশের সকালের কথা মনে পড়ল। একে একে সন্ধ্যার বলা বে’য়া’দ’বি কথাগুলো কানে বাজতেই আকাশের দৃষ্টি শ’ক্ত হয়ে আসে। এই মেয়ে তো হিসাব ছাড়া তার হাতের থা’প্প’ড় ডিজার্ব করে। কথাটা ভেবে সন্ধ্যার গালে নজর করলে আকাশের শ’ক্ত দৃষ্টি মুহূর্তেই শীতল হয়ে আসে। সেই থা’প্প’ড় মা’রা গালটি এদিক ফেরানো। যেখানে লাইটের আলোয় জ্বলজ্বল করছে কা’টা কা’টা। মনে হচ্ছে কিছু দ্বারা চিঁড়ে গিয়েছে, কে’টে গিয়েছে। জখম হয়ে আছে। আকাশ এক দেখাতেই বুঝল এটা তার সকালের থা’প্প’ড়ের ফল। আকাশের কি হলো কে জানে, সে ধীরে ধীরে ঠান্ডা মেঝেতে বসে পড়ল। ডান হাতে একটি হুইস্কি’র বোতল মেঝেতে শব্দ করে রাখে। যার অর্ধেক আকাশ অলরেডি খেয়েছে। হুইস্কি খাওয়া অভ্যেস থাকায় অনেক খেলেও সে মাতাল হয়না।

আকাশের দৃষ্টি সন্ধ্যার ঘুমন্ত মুখপানে। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা সন্ধ্যাকে আকাশের চোখে ভীষণ সুন্দর লাগলো। সন্ধ্যার পুরো মুখ নিখুঁতভাবে দেখতে গিয়ে দৃষ্টি ঘুরে সন্ধ্যা কা’টা গালে এসে পড়লে আকাশের অস্থির লাগলো। যে কিছুক্ষণ আগেই সন্ধ্যাকে বেহিসাব থা’প্প’ড় মা’রতে চাইল, এখন তার-ই অস্থির লাগছে সন্ধ্যার ক্ষ’ত গাল দেখে। মনে হচ্ছে ওয়াই-ফাইয়ের নেটওয়ার্কের ন্যায় এই মেয়ের গালের ব্য’থাটা তার বুকে ট্রান্সফার হচ্ছে। আকাশ ঢোক গিলল।
বেশ কিছুক্ষণ পর আকাশ সন্ধ্যার ঘুমন্ত মুখপানে চেয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,
“কে তুমি? তোমায় ব্য’থা দিয়ে আমি কেন ব্য’থা পাই মেয়ে?”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৬

আকাশের কণ্ঠ অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। আকাশ যদি নিজেকে একবার এই রূপে দেখত, তাহলে হয়ত সে নিজেই নিজেকে কয়েকটা গা’লি দিত। কারণ তার ডিকশনারিতে, তার মেয়েদের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই। কিন্তু তার নিজেতে ধ্যান নেই। সে মগ্ন সন্ধ্যাতে। দৃষ্টিতে মুগ্ধতা।
আসমানী নওয়ান ওয়াশরুমে গিয়েছিল। ভদ্রমহিলা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বেখায়লে সামনে তাকালে বিস্মিত হয়। আকাশকে সন্ধ্যার পাশে এভাবে দেখার ব্যাপারটি তার কাছে টোটালি আনএক্সপেক্টেড ছিল।

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৮