আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৩২+৩৩+৩৪
ফারজানা মনি
মিম চুপচাপ গিয়ে আরিফের বাইকের পিছনে বসলো। আরিফ বাইকের লুকিং মিরোরে দেখলো, মিম পিছনে ধরে কোনরকমে বসে আছে। আরিফ মিমকে ধরে বসতে বলল। কিন্তু মিম কি কম ত্যারা। বলল: প্রয়োজন নেই। আপনার কাজ আপনি করেন।
আরিফ মিমের কথাটি শুনে সামনে তাকিয়ে চোখে সানগ্লাস দিল। হঠাৎ বাইকটি স্টার্ট দেওয়ায় মিম তার ব্যালেন্স ঠিক রাখতে না পেরে আরিফের কাঁধে হুমড়ি খেয়ে পরলো। মীম ভয় পেয়ে আরিফের কাঁধে এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরেছে। আরিফ লুকিং গ্লাসে মিমকে এক নজর দেখে মুচকি
হাসলো। একটু খোঁচা মেরে বলল: গরিবের কথা বাসি হলেও ফলে।
মিম মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে ফিরে আছে। আরিফ তা দেখে আরেক দফা হেসে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল। সারা রাস্তা মীম আর কিছুই বলেনি।
মাহমুদা খানের সময়টা আজ বড্ড বেশি ভালো যাচ্ছে। নিজের বাপের বাড়ির পরিবারের সাথে সময় কাটাতে কার না বেশি ভালো লাগে।
দেখতে দেখতে সময় ৩ টার কাটায়। পাঁচ মিনিট হলো ফিরেছে। এসেই টুকটাক সবার সাথে কথা বলে ফ্রেশ হতে উপরে চলে গেছে।
মেঘ রুমে ঢুকেই দেখল আবির মাত্র গোসল করে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হচ্ছে।
সরি আপুরা ভাইয়ারা। আমি চেয়েও আজকের পর্বটা বড় করে দিতে পারলাম না। বাড়িতে হঠাৎ মেহমান এসেছে। তাই আজকে এখানেই শেষ করতে হলো। প্লিজ তোমরা কেউ মন খারাপ করো না। কালকে বড় করে দুইটা পর্ব দেওয়া হবে।
মেঘ আবিরকে দেখে কিছুটা থমকে গেছে। তাকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মোহ মায়াময় দৃষ্টিতে। আবিরের গালের হালকা ভেজা ভেজা ছোট চাপ দাড়ি গুলো মেঘকে যেন তার কাছে টানছে। আবিরের সামনের ভেজা চুল থেকে টুপটাপ বৃষ্টিধারার মতো জল গড়াচ্ছে। অদ্ভুত এক মায়া এই শ্যাম কালো পুরুষের মুখে। যা দেখে চলন্ত হৃদয়টাও হঠাৎ ব্রেক ফেল করে ।
আবির মেঘের মুখের সামনে এক হাত নেড়ে বলে উঠলো: হ্যালো.. ম্যাম.. আপনি একটু হুসে ফিরলে আমার ব্ল্যাক বেল্টের ওয়াচটা খুঁজে দেন প্লিজ। খুঁজে পাচ্ছি না তো।
মেঘ নিশ্চুপ নয়নে তাকিয়ে আছে। আবি র এবার মেঘের কাজ ঝাকিয়ে বলল: মেঘ.. কি হল তোমার?
মেঘ একটু থতমত খেয়ে বলল : কই কিছু নাতো..
আবির মেঘকে পেছন ঘুরিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল: কি হয়েছে? শরীর ঠিক আছে?
মেঘ: হুম।
আবির: তাহলে এত চুপচাপ কেন?
মেঘ আবিরের দিকে ঘুরে গলা জড়িয়ে ধরে বলল: চুপচাপ না আপনাকে দেখছিলাম।
বলেই মেঘ লজ্জায় মাথা নুয়ে নিল। আবির জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, তা কি দেখলে?
মেঘ নেশাতুর দৃষ্টি নিয়ে বলল: আপনার ভেজা ভেজা চুল.. খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর….
আবির: আর…
মেঘ লাজুক কণ্ঠে বলল: আর আপনার মায়াবী মুখশ্রী।
আবির হাসলো। মেঘের দু গালে হাত রেখে আবির কপালে চুমু দিয়ে মজার সুরে বলল: যাক.. জীবনে আর যাই করি না কেন… বউকে তো পাগল করতে পেরেছি। ধন্য এ জীবন ধন্য..
মেঘ লজ্জায় আবিরের বুকে মুখ লুকালো। হঠাৎ মেঘের কানে মিমের ডাক আসতেই, মেঘ আবিরের বুক থেকে মাথা তুলে বলল: আমি নিচে যাচ্ছি আপনিও আসুন।
বলেই মেঘ হন্ততন্ত হয়ে ছুটে গেল। আবির মেঘের যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। আবির জানে, তার প্রিয়সি মাঝে মাঝেই এমন পাগলামি করে। তাই একটু মুচকি হেসে আলমারি থেকে জামা কাপড় পড়ে রেডি হয়ে নিচ্ছে।
ফুপ্পিদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে , একটু রাকিব আর রাসেলের সাথে দেখা করতে যাবে সে। অনেকদিন হলো অফিসের বাইরে তাদের আড্ডা দেওয়া হয় না।
মেঘ নিচে গিয়ে দেখল, আজকে কেউই দুপুরে খাওয়ার পর রুমে রেস্ট করতে যায়নি। সবাই মাহমুদা খানের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত। মেঘও সেখানে গিয়ে শামিল হলো।
মেঘ আর বন্যা মাহমুদা খানের দুই পাশে বসে আছে। মিম এসে বলল: দেখি দেখি একটু সাইট দাও.. আমিও ফুপ্পির কাছে বসতে চাই। সব আদর কি তোমরাই খাবে?
পাশ থেকে আরিফ আস্তে আস্তে বলে উঠলো: আমার বউ হয়ে যাও.. সারা জীবনের মতো আমার কাছে রেখে দিব.. আমার মায়ের আদর খাবে।
কিন্তু মিম মনে হয় তা শুনতে পাইনি। আর শুনতে পাবেই বা কি করে, এত মানুষের ভিড়ে আরিফ তো কথাটা আস্তে আস্তেই বলেছে যেন কেউ শুনতে না পায়।
মেঘের নজর সিঁড়ির দিকে পড়তেই লক্ষ করল আবীর নামছে। ব্ল্যাক প্যান্ট এর সাথে একটা হোয়াইট টি শার্ট। চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করা। হাতে একটা ব্লাক ওয়াচ। চোখে সানগ্লাস এটে ফোনে কথা বলতে বলতে নামছে।
মেঘ কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার মন আজও পুরনো দিনের মতো একটা গানই গেয়ে ওঠলো,
“দৃষ্টিতে যেন সে রাজপুতিন,
খুন হয়ে যায়, আমি চিরদিন।
নামধাম জানিনা, তার কিছু,
তবুও নিলাম আমি , তার পিছু।
কালো সানগ্লাসটাই কেন এত সুখ?
হেই যুবক…….”
মাহমুদা খানের কন্ঠে মেঘের ঘোর কাটলো। মেঘ নিজের মাথায় নিজেই থাপ্পর দিয়ে বলল: তুই আর মানুষ হবি না..
বন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল: কিরে তোর আবার কি হলো?
মেঘ: কই কিছু না…
বন্যা: তুই আমার থেকে কথা লুকাচ্ছিস মেঘ? তোকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। সত্যি করে বলতো,, তুই কি আমার ভাসুর কে দেখে আবার ক্রাশ ট্রাশ খাইছোস নাকি??
মেঘ একটু ভাব নিয়ে বলল: আমার জামাইকে দেখে ক্রাশ খাবো না তো তোকে দেখলে ক্রাশ খাব।
ইতিমধ্যেই আবির নিচে নেমে এসেছে। মালিহা খান বলে উঠলো: কিরে কোথাও যাচ্ছিস নাকি?
আবির: জ্বী আম্মু.. রাকিব রাসেলদের সাথে দেখা করতে যাব।
মাহমুদা খান আবির কে বলল: রেডি হয়ে এসেছিস ভালো হয়েছে। মেঘ, বন্যা ও মিম সবাইকে আমি আজকে নিয়ে যেতে চাই । সাথে তুইও চল। কয়েকটা দিন ওই বাড়ি থেকেই অফিস করিস।
আবির কয়েক মিনিট চুপ করে থেকে বলল: ফুপ্পি.. তুমি বন্যা আর মিমকে নিয়ে যাও মেঘকে নিয়ে আমি বৃহস্পতিবার চলে যাব। জানোই তো ও শরীর ভালো থাকে না।
মিম বলে উঠলো: না ভাইয়া.. আমরা মেঘ আপুকে ছাড়া কোথাও যাব না। আমরাও বৃহস্পতিবারই যাব।
এবার মনে হয় বন্যা ও একটু সাহস পেল। বলে উঠলো ফুপি আম্মা.. আমার মেঘের সাথেই একেবারে যাই?
মালিহা খান উঠে গিয়ে আবিরের কান টেনে ধরল। বলল: বাড়ির খুব বড় কর্তা হয়ে গেছিস তাই না? আমার ভাইজানের উপর দিয়ে যাচ্ছিস।
আবির : উফ.. শব্দ করে বলে উঠলেন: আমি আসার সময় আব্বু চাচ্চুর সাথে কথা বলে এসেছি।
আবির মাহমুদা খান কে বলল: ফুপ্পি_ মেঘ আমাকে আগেই জানিয়েছিল যে, তুমি ওদের নিতে এসেছ এবং বাকি সবাইকে শুক্রবার যেতে বলেছো। আমি তাই আসার সময় আব্বু চাচ্চুর সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে এসেছি। তারাও আমার সাথে একমত। তারাও চায় ওরা বৃহস্পতিবার যাক আর বাকিরা শুক্রবার পৌঁছে যাবে ইনশাল্লাহ।
মাহমুদা খান কিছুটা মন খারাপ করে বলল: ঠিক আছে তাই হবে।
আবির উঠে গিয়ে মাহমুদা খানের সামনে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে, মাহমুদা খানের হাতটাকে তার নিজের হাতে নিয়ে শীতল কণ্ঠে বললো: প্লিজ ফুপ্পি, মন খারাপ করোনা। বৃহস্পতিবার ওদেরকে নিয়ে আমি সকাল সকাল পৌঁছে যাব। ইদানিং অফিসের কাজে আমি প্রচুর ব্যস্ত থাকি। এই সময় মেঘকে নিয়ে আমি আর বারতি কোন টেনশন করতে চাই না। প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা করো।
মাহমুদা খান মুখে হাসি এনে বললেন, ঠিক আছে বাবা.. তুই কিন্তু বৃহস্পতিবার ওদেরকে নিয়ে সকাল সকালই চলে যাবি। আমাকে যেন বারবার কল দিতে না হয়।
আবির হাসলো। পেছন থেকে আরিফ মাহমুদা খানের কাঁদে এক হাতে রেখে বলল: আম্মু তুমি একটুও টেনশন করো না। ভাইয়া যদি যেতে লেট করে আমি নিজে এসে ওদেরকে নিয়ে যাবো।
এ পর্যায়ে সকলে ই একটু হাসলেন। আবির ও মাহমুদা খান উঠে দাঁড়ালো। মাহমুদা খান সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এবার রওনা হবে। আবিরও যাচ্ছে তাদের পৌঁছে দিতে। অবশ্য মাহমুদা খান অনেকবার আবিরকে মানা করেছে। কিন্তু আবির শুনতে নারাজ ।
আরিফ ও একে একে সবার থেকে বিদায় নিয়ে মিমের কাছে গেল। একটু কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বললো : জান_ আর মাত্র কয়েকটা দিন। আমার বাড়িতে গেলে তোমাকে না রাখতে পারলেও তোমার মনটাকে ঠিকি রেখে দেবো। মিম মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। আরিফের এসব ফাজলামি কথা শুনে রাগী রাগী লুক নিয়ে আরিফের দিকে তাকাল। আরিফ মিমের দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে বলল: লাভ ইউ।
মিম আরিফের কর্মকান্ড দেখে চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে। এক নজর আশেপাশের সবার দিকে তাকিয়ে, আরিফের যাওয়ার পানে দেখলো। নির্লজ্জ লোক একটা , মুখে কিছুই আটকায় না মনে মনে বলে উঠলো মিম।
আবির মাহমুদা খানকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে জান্নাতের সাথে কয়েকটা কথা বলেই বের হয়ে আসলো। রাকিব লিমন,রাসেল, মোবারক তার জন্য অপেক্ষা করছে।
প্রায় সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। বন্যার মনটা কিছুটা ছটফট করছে। বিয়ের পর গত এক সপ্তাহে তানভীর তার কাছাকাছি ছিল সব সময়। আজ থেকে দৈনন্দিন জীবনে ফিরে গেছে তানভীর। তানভীর একটা সরকারি চাকরি করে। প্রতিদিন পাঁচটায় তার অফিস ছুটি হয়ে যায়। এখন সময় সন্ধ্যা ছয়টার কাটায়।
বন্যা যখন এসব ভাবনায় মগ্ন। তখনই একটা শক্ত পুরুষালি হাত তার কোমর পেঁচিয়ে ধরল। মুহূর্তেই বন্যার শরীরটা ভয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। বন্যার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে চাইতেই তার গালে ভেজা ভেজা চুলের শীতল স্পর্শ ঠেকলো। শরীর থেকে ছুটে আসছে অন্যরকম এক গ্রান, যে গ্রান বন্যার অতি পরিচিত। এই গ্ৰান কোনো দামি পারফিউমের নয়। এই গ্রান তার প্রিয় পুরুষ তানভীর খানের।
বন্যা বুঝতে পেরে আবেশে চোখ বন্ধ করে নিলো। তানভীর তার ভেজা গাল গুলো বন্যার গালের সাথে ঠেকিয়ে বলে উঠলো: মিস ইউ বউ..
বন্যা একটু লাজুক হেসে বলল: মিস ইউ টু।
বন্যা এবার তানভীরের দিকে ঘুরে গলা জড়িয়ে বলল: কখন এসেছেন আমি দেখিনি তো।
তানভীর মুচকি হাসে বলল: তুমি রান্না ঘরে ছিলে।
বন্যা: ওহহহ.. এবার ছাড়েন। চা বা কফি আনব?
তানভীর: না.. আমি বের হবো একটু । আবির ভাইয়া অপেক্ষা করছে।
বন্যা: ওহ.. ঠিক আছে।
তানভীর: বন্যা শুনো..
বন্যা: হুম..
তানভীর: বনু কই?
বন্যা: রুমেই আছে হয়তো।
তানভীর: বনুর একটু খেয়াল রেখো। মেয়েটা একটু বেশিই চঞ্চল। জানি, ভাইয়া একাই এনাফ বনুর জন্য। কিন্তু ভাইয়ার অনুপস্থিতিতে ও সারাক্ষণ তোমার সাথেই থাকে।
বন্যা তানভীরের বাহু জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে বলল: আপনি নিশ্চিত থাকেন।
তানভীর হেসে বন্যার কপালে গভীর চুমু একে দিয়ে বলল: আমি আসছি।
বন্যা বিদায় জানাল। এবার বন্যা মেঘের রুমে গেল।
বন্যা: ননদিনী আসবো ?
মেঘ : তোকে কতবার বলবো , আমার রুমে আসার জন্য পারমিশনের প্রয়োজন নেই।
বন্যা হেসে বলল: যদি আবির ভাইয়া রুমে থাকতো?
মেঘ বলল: তো কি হয়েছে?
বন্যা : বাদ দে এসব।
মেঘ মিটিমিটি হেসে বলল: বেবি.. হানিমুন কেমন গেল?
বন্যা অন্যদিকে ফিরে মুচকি মুচকি হাসছে।
মেঘ: কিরে বন্যা এদিকে ফির..
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ২৯+৩০+৩১
বন্যা অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ আবারো ডাকলো।
এবার বন্যা ফিরে বলল: ভালো।
মেঘ: আমি তাড়াতাড়ি ফুপ্পি হবোতো?
বন্যার মুখ টা লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। মেঘ হেসে বলল: হয়েছে আর লজ্জা পেতে হবে না। বন্যা একটু স্বাভাবিক হয়ে বলল: বৃহস্পতিবার নিয়ে তোর কোন প্লান আছে?
মেঘ: হুম আছেতো।
