আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৪
সাবিলা সাবি
অনেক প্রতীক্ষার পর মায়াকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো। চেনা বাড়ির আঙিনায় পা রাখলেও, মায়ার পৃথিবীটা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন তার একমাত্র সঙ্গী এই হুইলচেয়ার। তাকে যখন হুইলচেয়ারে বসিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢোকানো হলো, চারপাশটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মায়ার বিষণ্ণ চোখ দুটো ঘরের প্রতিটি কোণে একবার ঘুরে এল, সে নিজের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে খুঁজে বেড়ালো।
তবে বাড়ির আবহাওয়াটা আজ অন্যরকম। আগামীকাল মায়া আর লিওনের গায়ে হলুদ। ‘হায়াস ম্যানশন’ সেজে উঠছে বর্ণিল সাজে, আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে চারপাশ। বিয়ের আয়োজন চলছে, অথচ মায়ার হুইলচেয়ারের চাকার মৃদু খসখস শব্দটা সেই আনন্দের ঘরে এক এক ফোঁটা বেদনার মতো ঝরে পড়ছিল।
লিওন আপ্রাণ চেষ্টা করছিল চারপাশের পরিবেশটা স্বাভাবিক রাখতে। সে মায়ার হুইলচেয়ারের পাশে এসে দাঁড়াল, তারপর মায়ার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে নিচু গলায় বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে মায়া। কাল আমাদের গায়ে হলুদ, দেখবে সবাই কত খুশি হবে।”
মায়া লিওনের মুখের দিকে তাকিয়ে একটুখানি হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জলটুকু সে কিছুতেই লুকাতে পারল না।
সকাল পেরিয়ে দুপুরের খাবার সময় ডাইনিং টেবিলের পরিবেশটা ছিল অন্যরকম। মায়ার দুর্ঘটনার ঘোর আর কালকের গায়ে হলুদের আয়োজন সবটা মিলিয়ে সবার মনেই একটা চাপা অস্বস্তি কাজ করছে। লিওনের বড় বোন অ্যামেলিয়া আর তার স্বামী রুদ্রনীল ভূঁইয়াও ছিলেন ডাইনিং টেবিলে। পুরো টেবিলে নীরবতা বিরাজমান খাবার খাওয়ার শব্দ ছাড়া কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই যেন মনের ভেতরের অস্থিরতাটুকু লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
খাবারের ফাঁকে লিওনের বাবা আর্থার হায়াস গল্পের মোড় ঘুরিয়ে রুদ্রনীলের ব্যবসার দিকে কথা তুললেন। তিনি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “নীল, তোমার ব্যবসার কী খবর? ইদানীং তো শুনছি লন্ডনের দিকে বেশ ব্যস্ততা বাড়াচ্ছ।”
রুদ্রনীল মৃদু হেসে গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বললো, “সব মিলিয়ে বেশ ভালোই চলছে ড্যাড।ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের কাজটা এখন বেশ ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে লন্ডন আর দুবাইয়ের বাজারে নতুন কিছু প্রজেক্ট শুরু করেছি। এত ব্যস্ততার মধ্যেও চেষ্টা করছি সবটা সামলে নিতে।”
রুদ্রর কথায় লিওনের বাবা আশ্বস্ত হলেন। এরপর ব্যবসার হালচাল আর দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চলল তাদের কথাবার্তা। কিন্তু টেবিলের এক কোণে হুইলচেয়ারে বসে থাকা মায়া আর তার পাশে লিওনের নীরবতা আড্ডার সেই হালকা আমেজটুকুতেও একটা বিষণ্ণতার ছায়া ফেলছিল।
লিওন মাঝে মাঝেই মায়ার খাবারের দিকে খেয়াল রাখছিল, আর অ্যামেলিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মায়ার দিকে চোখেমুখে একরাশ মমতা নিয়ে। উৎসবের প্রস্তুতি আর ব্যবসার সব আলোচনার আড়ালে পরিবারের প্রতিটি মানুষ এই মুহূর্তে নিজের ভেতরের এক কঠিন সময়কে বয়ে বেড়াচ্ছিল।
অ্যামেলিয়া আর রুদ্রনীলের বিয়ের তিন বছর হতে চললো। ভালোবাসার বাঁধনে জড়ানো তাদের এই সম্পর্কের ভিত্তি আজও বেশ মজবুত। তবে তাদের সুখী দাম্পত্যে একটি গভীর বেদনার ছায়া আছে—চিকিৎসকদের সেই কঠিন রায়, শারীরিক জটিলতার কারণে অ্যামেলিয়া কোনোদিন মা হতে পারবে না। এই এক সত্যই তাদের হাসিখুশি সংসারে এক টুকরো অন্ধকার হয়ে জমে আছে।
শুরুতে এই খবরটা অ্যামেলিয়াকে মানসিকভাবে একদম ভেঙে দিয়েছিল। নিজের অক্ষমতার কথা ভেবে সে কত যে রাত চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। তার বারবার মনে হতো—রুদ্রর জীবনে পূর্ণতা দিতে বুঝি সে ব্যর্থ। কিন্তু রুদ্রনীল ছিল পাহাড়ের মতোই অবিচল। সে কোনোদিনও অ্যামেলিয়ার প্রতি অবহেলা তো দূরের কথা, কোনোদিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে কষ্ট পেতেও দেয়নি।
ডাইনিং টেবিলের সেই আলাপের সময়, রুদ্র যখন ব্যবসার কথা বলছিল, অ্যামেলিয়া আড়চোখে তার স্বামীর দিকে তাকাল। রুদ্রর গলার স্বর, তার চোখে অ্যামেলিয়ার প্রতি থাকা সেই অগাধ ভরসা—সবই যেন বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তিন বছরে তাদের ভালোবাসা কতটা গভীরে শেকড় গেড়েছে। রুদ্রনীলের বিশ্বাস, পূর্ণতা কেবল সন্তান দিয়ে আসে না, বরং মনের মিল আর একে অপরের প্রতি অটুট বিশ্বাসই হলো আসল সার্থকতা। অ্যামেলিয়া জানে, পৃথিবীর বাকি সবাই হয়তো তাকে করুণার চোখে দেখবে, কিন্তু রুদ্রর কাছে সে আজকের দিনেও আগের মতোই অমূল্য।
দুপুরের খাবার শেষ করে রুদ্র অ্যামেলিয়ার হাতের ওপর নিজের হাতটা আলতো করে রাখল। ডাইনিং টেবিলের এই হইচই আর ভিড়ের মধ্যেও তাদের নীরব এই স্পর্শটুকুই এক পরম শান্তির আবেশ তৈরি করে রেখেছিল। সব কোলাহল ছাপিয়ে তারা একে অপরকে নতুন করে আশ্বাস দিচ্ছিল যে, পৃথিবীর সব পূর্ণতা তাদের এই হাতের স্পর্শেই সীমাবদ্ধ।
সন্ধ্যা নামতেই লন্ডনের আকাশ ভারি হয়ে এল, আবহাওয়া হয়ে উঠল গম্ভীর। আজ হিয়া ও আয়মান খানের মুখোমুখি হওয়ার দিন। নিজেকে খুব যত্ন করে সাজিয়ে তুলল হিয়া। তার সাজে আজ লাবণ্যের চেয়ে সাহসিকতাটাই বেশি স্পষ্ট—সে ভালো করেই জানে, তার প্রতিটি চাহনি আর উপস্থিতি আয়মান খানকে মন্ত্রমুগ্ধ করতে বাধ্য। তার এই সাজগোজের উদ্দেশ্য পরিষ্কার আয়মানকে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা আর তাকে আকর্ষণের জালে আরও শক্ত করে বেঁধে ফেলা।
হিয়ার সাথে যাবে ইভানা। ব্লু স্টার ডায়মন্ডের প্রস্তুতি একদম চূড়ান্ত। হোটেলের বাইরে কড়া নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে মার্ক। হিয়ার স্পষ্ট নির্দেশ—বাইরে থেকে পুরো পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে, সামান্যতম ত্রুটিও না হয়। হিয়া প্রতিটি পদক্ষেপ খুব ভেবেচিন্তে নিচ্ছে; আয়মান খান তার দাবার বোর্ডের একটা ঘুঁটি হয়েই থাকবে, সেটাই তার মূল লক্ষ্য।
ওদিকে, আসাদ খান ইতিমধ্যে লন্ডনে পৌঁছে গেছেন। ছেলের সাথে মিলে তিনিও পুরোপুরি তৈরি। দীর্ঘদিনের ব্যবসা আর অভিজ্ঞতার ঝুলি থাকা সত্ত্বেও, হীরা উদ্ধারের এই রোমাঞ্চ তাদের দুজনকে বেশ উত্তেজিত করে তুলেছে। হোটেলের সেই নিরিবিলি সুইটে তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন হিয়ার জন্য। হোটেলের ওই সুইটের দরজাটা যখন খুলবে, তখন ভেতরে কী পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা কেউ জানে না।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে হোটেল চত্বরে এসে থামল হিয়ার গাড়ি। লন্ডনের রাজপথে নজর কাড়া সেই ঝকঝকে কালো রোলস রয়েস ফ্যান্টম থেকে হিয়া যখন নামল, তাকে তখন আকর্ষণীয় আর ভীষণ রকমের সুন্দর দেখাচ্ছিল। হিয়ার অপেক্ষায় থাকা আয়মান খান এতটা উৎসুক ছিল যে, সে নিজেই দ্রুত এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে গেল।
দরজা খুলতেই আয়মান কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। হিয়া আজ সেজেছে অসম্ভব বোল্ড আর আবেদনময়ী লুকে, যা যে কাউকেই নিমেষে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। আয়মানের আকাঙ্ক্ষা শুধু সেই কাঙ্ক্ষিত ‘ব্লু স্টার ডায়মন্ড’ এর ওপর আটকে রইল না; তার চেয়েও বেশি নেশাভরা চোখে সে তাকিয়ে রইল হিয়ার দিকে। হীরাটা এখন তার কাছে গৌণ, আসল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হিয়া নিজেই।
হিয়ার রূপে সম্মোহিত আয়মান এক ঘোরের জগতে হারিয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েকে শুধু ব্যবসার কাজে নয়, অন্যভাবেও তার নিজের করে পাওয়া প্রয়োজন। হিয়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বাঁকা হাসি, যা বলে দিচ্ছে সে তার ফাঁদ ঠিকঠাক পেতেছে। পেছন থেকে ইভানা সবটা খেয়াল করছিল, আর হোটেলের বাইরে মার্ক সতর্ক চোখে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করছিলো। হিয়া আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হোটেলের ভেতরে পা রাখল, আর তার ঠিক পাশেই সম্মোহিতের মতো হাঁটতে লাগল আয়মান খান—যার কাছে এখন পৃথিবীটা হিয়ার ওই চাহনিতেই থমকে গেছে।
হোটেলের বিলাসবহুল সুইটে পা রাখতেই আসাদ খানের নজর থমকে গেল। আয়মান বলেছিল হিয়া ও ভাইপারের চেহারায় অসম্ভব মিল, কিন্তু সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ভাইপারকে দেখে আসাদ খান স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার চোখ পলকেই পুরো দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করে ফেলল—চেহারায় হিয়ার সাথে মিল থাকলেও, ভাইপারের ব্যক্তিত্ব, চোখের তীক্ষ্ণ চাহনি আর দেহভঙ্গিতে হিয়ার সাথে আকাশ-পাতাল তফাৎ।
হিয়া অত্যন্ত সাবলীল আর গম্ভীর পদক্ষেপে ভেতরে প্রবেশ করল, তার ছায়াসঙ্গী হয়ে রইল ইভানা। রুমটা মুহূর্তের মধ্যে হিয়ার ভারী ব্যক্তিত্বের ভারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। আসাদ খান নিজেকে সামলাতে পারলেও অদৃশ্য এক অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেলেন। মনে হচ্ছিল, চোখের সামনে হিয়া রূপী কোনো এক নারী দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তার গভীরে লুকিয়ে আছে এমন কোনো অজানা রহস্য যা আসাদ খানের অভিজ্ঞতার পরিধিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
আয়মান খানের ঘোর এখনো কাটেনি। সে উত্তেজনার আতিশয্যে বাবাকে বলল, “বাবা, ওই হচ্ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মোস্ট পাওয়ারফুল ক্রিমিনাল ভাইপার।”
আসাদ খান নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেন। মুখে এক চিলতে সৌজন্যমূলক হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলেও, তার দৃষ্টি বারবার ভাইপারের শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ চোখের দিকেই আটকে যাচ্ছিল। তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না—এই রূপের হুবহু মিল কি কেবলই কোনো কাকতালীয় ঘটনা, নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনে রেখেছে কেউ।
আয়মান ও আসাদ খান সোফায় গিয়ে বসলেন। টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে দামি ওয়াইন আর সিগারেট। আসাদ খান ভাইপারের কাজের দক্ষতার খুব প্রশংসা করলেন। গ্লাসে চুমুক দিয়ে তিনি বেশ উৎসাহ নিয়েই বললেন, “সত্যি বলছি ভাইপার, আজ পর্যন্ত লন্ডনের কোনো পুলিশ বা গোয়েন্দা তোমাকে এক পলক দেখারও সুযোগ পায়নি। তোমাকে এভাবে সামনাসামনি পাওয়াটা আমাদের জন্য অনেক বড় ব্যাপার। আমরা সত্যিই ভাগ্যবান।”
হিয়া কোনো কথা বলল না, শুধু ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে শীতল আর রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে সোফায় আয়েশ করে হেলান দিয়ে বসল; তার প্রতিটি নড়াচড়ায় ছিল এক ধরণের রাজকীয় আভিজাত্য। আয়মানের ঘোর তখনও কাটেনি। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভাইপারের দিকে তাকিয়ে ছিল। হিয়ার এই রূপের জাদুতে সে পুরোপুরি মাতাল। আয়মান বাবার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, “বাবা, সত্যি বলছি আমি ভেবেছিলাম ভাইপার নিশ্চয়ই কোনো দুর্ধর্ষ পুরুষ ক্রিমিনাল হবে। কিন্তু এমন একজন সুন্দরী নারীকে সামনে দেখে আমার মাথাই কাজ করছে না। এত সুন্দর কেউ যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এত বড় লিডার হতে পারে, এটা বিশ্বাস করাই কঠিন!”
ইভানা একপাশে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মুখে সব শুনছিল। হিয়া তার আঙুলের ডগায় ধরা সিগারেটে মৃদু টোকা দিল। সে জানত, আয়মানের এই মুগ্ধতা আর দুর্বলতাই হবে তাদের পতনের শুরুর ধাপ। ভাইপারের এই রহস্যময় নীরবতা আসাদ খানকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিল, তিনি সোফায় একটু নড়েচড়ে বসলেন।
হিয়া তার হাতের ব্যাগটি ধীরে ধীরে খুলল। মখমলের ছোট্ট বাক্স থেকে বেরিয়ে এল সেই বহু প্রতীক্ষিত ‘ব্লু স্টার ডায়মন্ড’টা যার নীলচে আলোয় কক্ষের অন্ধকার কোণে আভা ছড়িয়ে দিল। হিয়া সেটি টেবিলের ওপর রাখতেই আয়মান খান একেবারে স্থির হয়ে গেল; তার চোখের পলক ফেলার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে গেল।
হিয়া ঠিক যখন হীরাটি আয়মানের দিকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল, আয়মান ঝট করে তার হাতটা চেপে ধরে মৃদু হেসে বলল, “এক মিনিট, ভাইপার। হীরাটা দেওয়ার আগে একটা কথা বলা দরকার। আসলে এই ডায়মন্ডটি কেনার ব্যাপারে আমরা অন্য একজন ক্লায়েন্টের সাথে চুক্তি করে ফেলেছি। আসল ক্রেতা তিনিই।”
হিয়া ভ্রু কুঁচকে আয়মানের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন সামান্য বিস্ময় আর অস্বস্তি। সে কল্পনাও করতে পারেনি এই চুক্তির মাঝে তৃতীয় কোনো পক্ষ থাকতে পারে। কিছুটা গম্ভীর গলায় হিয়া জিজ্ঞেস করল, “তুমি তো আমাকে আগে বলোনি যে এখানে অন্য কেউ জড়িত আছে। কে সেই ব্যক্তি?”
আয়মান খান সোফা থেকে উঠে ধীর পায়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন জয়ের নেশা। ঘড়ির কাঁটার দিকে একবার তাকিয়ে সে শীতল কণ্ঠে বলল, “তিনি গাড়ি থেকে নেমে পড়েছেন। এই তো, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এই রুমে ঢুকবেন। আমাদের আসল ডিলটা আসলে তার সাথেই।”
পুরো কক্ষে টানটান উত্তেজনা। ইভানা মুহূর্তের মধ্যে সতর্ক হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। হিয়া বাইরের দিকে স্থির হয়ে বসে থাকলেও, তার মস্তিষ্কের ভেতর তখন বিদ্যুতের গতিতে নতুন ছক কাটা শুরু হয়ে গেছে। কে হতে পারে সেই রহস্যময় ক্রেতা, যার জন্য আয়মান আজ এত বড় ঝুঁকি নিল?
আয়মানের ফোনটা বেজে উঠতেই সে এক চিলতে হেসে ইশারা করল। ফোন রিসিভ করে কথা বলতে বলতে সে দরজা খুলতে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই করিডোর থেকে ভারি পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। হিয়া বাইরের দিক থেকে উদাসীন ভঙ্গিতে বসে থাকলেও, তার ভেতরটা তখন সেই রহস্যময় ক্রেতাকে দেখার জন্য তীব্র অপেক্ষায় ছিল।
কিন্তু দরজা খুলে যিনি ভেতরে ঢুকলেন, তাকে দেখার সাথে সাথেই হিয়ার পৃথিবীটা এক ঝটকায় থমকে গেল। মাথার ভেতরটা বনবন করে ঘুরে উঠল তার। বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল, শ্বাস নিতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে—সে বুঝতে পারল, প্যানিক অ্যাটাক শুরু হতে যাচ্ছে। হিয়ার পা কাঁপছে, হাতের মুঠো থেকে সিগারেটের ছাই ঝরে পড়ল কার্পেটের ওপর।
আগন্তুক এসে ঠিক তার উল্টো দিকের সোফাতেই বসল। সেই ব্যক্তিও হিয়াকে দেখে পুরোপুরি পাথর হয়ে গেল, মনে হলো চোখের সামনে অবিশ্বাস্য কিছু দেখছে!
আয়মান খান তখন উত্তেজনায় ফুটছে। সে গেস্টের কাঁধে হাত রেখে গর্বভরে বলল, “তুমি যা ভাবছো ও কিন্তু সে নয়! ও হলো সেই দুর্ধর্ষ ভাইপার, যাকে ধরতে ইন্টারপোল পর্যন্ত হিমশিম খাচ্ছে। ভাবো তো, এত কড়া নিরাপত্তা ভেদ করে সে কীভাবে ডায়মন্ডটি চুরি করেছে!”
হিয়া পাথরের মতো স্থির হয়ে আছে। সে মুখ নিচু করে বসে আছে, যাতে কেউ তার চোখের অস্থিরতা দেখতে না পায়। তার পুরো শরীর তখন ভয়ে কাঁপছে। গেস্ট অপলক দৃষ্টিতে ভাইপারের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু ভাইপারের গলার কাছে শব্দ আটকে আছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিজেকে আড়াল করতে হিয়া কোনোমতে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “আমি… আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি।”
কথাটা শেষ করেই সে এক মুহূর্ত দেরি করল না। আসাদ খান বা আয়মানের কোনো প্রশ্ন শোনার সুযোগ না দিয়েই সে টলমল পায়ে ওয়াশরুমের দিকে দৌড়ে গেল। ভেতরে ঢুকেই ছিটকিনিটা আটকে দিয়ে সে ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল।
ওয়াশরুমের ঝকঝকে আলো হিয়ার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে। সে বেসিনের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে পড়েছে, শরীরটা তার থরথর করে কাঁপছে। সাত বছর আগের সেই ভয়াবহ স্মৃতি যা এতদিন সে মনের অন্ধকার কোণে শিকল দিয়ে আটকে রেখেছিল আজ ঠিক জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে। সেই মানুষটির চোখের দিকে তাকানোর সাথে সাথেই হিয়ার মনে হলো, সে আর সেই দুর্ধর্ষ ‘ভাইপার’ নেই; সে এখন সেই অসহায় হিয়া, যে সাত বছর আগে নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছিল।
তার কানের কাছে সেই পুরোনো আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এতদিন সে নিজেকে পাথর করে গড়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে, কিন্তু আজ এই লোকটিকে দেখার পর তার সমস্ত আত্মবিশ্বাস বালির বাঁধের মতো ধসে পড়তে যাচ্ছে।
হিয়া নিজের কামড়ানো ঠোঁটজোড়া শক্ত করে চেপে ধরল। নখ দিয়ে নিজের হাতের তালু সে এতটাই জোরে খুঁজল যে চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করে নিজেকে বোঝাতে লাগল, “না, আমি আর সেই অসহায় হিয়া নই। আমি ভাইপার। এই লোকটাই আমার ধ্বংসের কারণ, এই লোকটার জন্যই আমাকে আজ এই পথে নামতে হয়েছে। আজ যদি আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে যাই, তবে গত সাত বছরের সেই নরকবাসের আর কোনো মূল্য থাকবে না।”
চোখ বন্ধ করে হিয়া লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিল। প্যানিক অ্যাটাকের তীব্রতা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। সে নিজের ভেজা হাতে মুখ মুছে নিল। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে হিয়া ঠোঁটে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করল। তার চোখের ভয়ার্ত চাহনি মুছে গিয়ে সেখানে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে এক জ্বলন্ত প্রতিহিংসা।
কক্ষে আয়মান খান, আসাদ খান এবং সেই ‘গেস্ট’ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তারা হয়তো ভাবছে ভাইপার হঠাৎ অসুস্থ বোধ করছে, কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারছে না যে, এই ওয়াশরুমের রুদ্ধদ্বার প্রকোষ্ঠে ভাইপার পুনরায় জন্ম নিচ্ছে।
হিয়া উঠে দাঁড়াল। আয়নার দিকে স্থির তাকিয়ে শান্ত অথচ শীতল গলায় নিজেকেই বলল, “আজ আর পালানো নয়। আজ মুখোমুখি হওয়ার পালা। যে নরক আমাকে উপহার দিয়েছিল, সেই নরকের আগুনেই ওকে পুড়তে হবে খুব দ্রুত।” সে ধীরে ধীরে ওয়াশরুমের দরজাটা খুলল এবং বাইরের দিকে পা বাড়াল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন আগের চেয়েও বেশি হিসেবী আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠলো।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হিয়া আবার রুমে পা রাখল। তার চলনভঙ্গি আগের মতোই আত্মবিশ্বাসী ছিলো, যদিও তার ভেতরে তখনো একটা প্রবল মানসিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সে সোফায় বসল ঠিকই, কিন্তু একবারের জন্যও সেই গেস্টের দিকে সরাসরি তাকাল না। চোখের দৃষ্টি স্থির রেখে, এক নীরব অবজ্ঞার সাথে সে ‘ব্লু স্টার ডায়মন্ড’ টেবিলের ওপর ঠেলে দিল।
কিন্তু গেস্টের চোখ হিয়ার ওপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরছে না। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হিয়ার আগাগোড়া পরখ করছে, তার ওই পাথরশীতল মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাত বছর আগের মানুষটিকে খুঁজে বের করার মরিয়া চেষ্টা করছে।
হঠাৎ আয়মান খান একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়ে বসল। সে হিয়ার দিকে একটু ঝুঁকে এসে বলল, “ভাইপার, আজ আমার জীবনের অন্যতম খুশির একটা দিন। আমি তোমার সাথে কাপল ডান্স করতে চাই।”
হিয়ার ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেল, কিন্তু সাথে সাথেই তার ঠোঁটে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফিরে এল। আয়মানের চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় সে বলল, “আমার সাথে ডান্স করতে গেলে কিন্তু অনেক বড় ঝুঁকি নিতে হবে, মিস্টার আয়মান। তুমি কি সেই ধকল সইবার জন্য প্রস্তুত?”
আয়মান তখন পুরো ঘোরের মধ্যে। সে হাসিমুখে উত্তর দিল, “আমি জানি। আগুনের সাথে খেলতে গেলে একটু তো পুড়তেই হবে। আর সেই পোড়াটুকু আমি আনন্দের সাথেই মাথা পেতে নেব।”
পরিস্থিতির খাতিরে এবং নিজের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে হিয়া শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হলো। সে উঠে দাঁড়াল এবং আয়মানের সাথে ডান্স ফ্লোরে পা রাখল। আয়মান যখন তার হাত ধরল, তখন হিয়ার শরীর মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে এলেও পরক্ষণেই সে নিজেকে মানিয়ে নিল। মিউজিকের তালে তালে সে নিখুঁতভাবে পা মেলাতে লাগল। তার প্রতিটি মুভমেন্ট ছিল অসাধারণ, ঠিক যেমনটা তার চরিত্রের সাথে মানানসই।
সোফায় বসে সেই গেস্ট একদৃষ্টিতে এই ডান্স দেখছিলো। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল গভীর কিছু, যা হয়তো কেবল হিয়া বুঝতে পারত। অন্যদিকে, আসাদ খান বেশ খুশি। ছেলেকে এত খুশি আর উত্তেজিত দেখে তিনি মনে মনে বেশ তৃপ্ত। তিনি ভাবছেন, আজকের চুক্তিটাও সফল হলো, আবার ছেলেও এমন এক অভাবনীয় সঙ্গ উপভোগ করছে। নাচতে নাচতেও হিয়া অনুভব করছিল সেই গেস্টের ভারী দৃষ্টি, যা তার মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বইয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু সে নিজেকে শক্ত রাখল। কারণ সে জানে, এই রাতের আসল খেলা তো কেবল শুরু হলো।
অবশেষে হিয়া প্রস্থান করলো। হিয়ার চলে যাওয়ার পর হোটেলের সেই রাজকীয় সুইটটিকে থমথমে নিস্তব্ধতায় ডুবে গেলো। হিয়া তার কাজ গুছিয়ে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই শীতল আবেশটুকু গেস্টের মনের ভেতর এক তীব্র জেদের জন্ম দিয়েছে। এমন মানুষ সে সচরাচর দেখেনা—যাকে দেখার পর নিজের সমস্ত চাওয়া এক নিমেষে মরীচিকার মতো অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এই গেস্টের স্বভাবই হলো, যার ওপর তার নজর পড়ে, তাকে যে কোনো মূল্যে নিজের মুঠোয় আনা। কিন্তু ভাইপারের ওই পাথরশীতল ব্যক্তিত্ব আর তার রহস্যময় দৃষ্টি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, এই শিকার ধরা মোটেও সহজ হবে না।
গেস্ট আয়মানের দিকে ঝুঁকে এসে গলার স্বর নামিয়ে, অনেকটা তীক্ষ্ণ সুরে বললো, “ভাইপারকে আমার চাই। যেভাবেই হোক, তাকে আমার চাই।”
কিন্তু আয়মান তখন ভাইপারের মাদকতায় পুরোপুরি আচ্ছন্ন। তার কাছে ভাইপার মানে এক নিষিদ্ধ নেশা, যাকে সে কোনোভাবেই অন্য কারো হাতে তুলে দিতে রাজি নয়। গেস্টের নির্দেশের বিপরীতে আয়মান কঠোরভাবে মাথা নাড়ল; তার চোখে তখন ভাইপারকে নিজের করে পাওয়ার এক উন্মাদ জেদ।
আয়মানের এই ঔদ্ধত্য দেখে গেস্ট বুঝে গেল, একে দিয়ে কাজ হবে না। সে আর কোনো বাক্যব্যয় করল না, বরং তার রহস্যময়ী চাহনি আর শীতল অভিব্যক্তি নিয়ে ধীরপায়ে বেরিয়ে গেল।
ক্রোধ আর অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষায় সে হোটেলেরই অন্য একটি রুম বুক করল এবং বারের এক মেয়েকে নিয়ে এল নিজের কামনায়। কিন্তু তার মনের পর্দায় তখন শুধু ভাইপারের সেই বাঁকা হাসি, নাচের প্রতিটি ভঙ্গি আর তার শরীরের লেপ্টে থাকা পারফিউমের তীব্র ঘ্রাণ। সবচেয়ে বড় কথা—ভাইপারের চেহারার সাথে হিয়ার সেই বিস্ময়কর মিল তাকে প্রতিনিয়ত অস্থির করে তুলছে।
মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মুহূর্তে সে নিজের চোখ দু’টো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। সে কল্পনা করতে চাইল, তার নিচে শুয়ে থাকা এই নারীটি আসলে হিয়া রুপি ভাইপার। মেয়েটির শরীরের ভাঁজে, তার গ্রীবায় সে কেবল হিয়ার ঘ্রাণ খুঁজে বেড়াচ্ছে। সে মেয়েটিকে ভোগ করছিল এক পৈশাচিক আক্রোশে; তার প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি তাড়নায় ফুটে উঠছিল ভাইপারকে পাওয়ার এক অসুস্থ, বিকৃত আর উন্মত্ত আসক্তি। সে এমন এক মরীচিকার পেছনে ছুটছে, যেখানে শরীরটা অন্য কারো হলেও, তার কামনার সমস্ত ক্ষুধা কেবল ভাইপারের জন্য।
এদিকে হিয়া নিজের গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসে আছে। রিয়ারভিউ মিররের দিকে তাকাতেই তার চোখে ফুটে উঠল প্রতিজ্ঞা। সে জানে, এই আয়মানের আসক্তি খুব তাড়াতাড়ি সাধারণ কোনো মুগ্ধতা থেকে; ভয়ংকর অবসেশনে পরিণত হবে।
হিয়ার পরিকল্পনাটা অনেকটা নিখুঁত গোলকধাঁধার মতো। সে জানে, আসাদ খানের মতো শক্তপোক্ত শিকড় উপড়ে ফেলার জন্য কুড়ালের প্রয়োজন নেই, কেবল উইপোকার মতো ভেতর থেকে সবটুকু খেয়ে ফেলা যথেষ্ট।
হিয়া আয়মানের সেই অন্ধ অবসেশনকে পুঁজি করে নিজের ছক কষবে। সে আয়মানকে ধীরে ধীরে এটা বিশ্বাস করাতে শুরু করবে যে, আসাদ খান কেবল ব্যবসার প্রতিবন্ধক নন, বরং ভাইপারকে পাওয়ার পথেও তিনি একমাত্র কাঁটা। হিয়া এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে যেখানে আয়মানের মনে হবে, সে যদি তার বাবার সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে না পারে এবং বাবার সিদ্ধান্তগুলোকে উল্টে দিতে না পারে, তবে ভাইপারকে সে কোনোদিন নিজের করে পাবে না।
হিয়া আয়মানকে ক্রমাগত উসকে দিবে যাতে করে আয়মান নিজেই তার বাবার গোপন সব লেনদেন, অবৈধ সম্পত্তির হিসাব আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেটওয়ার্কের তথ্যগুলো হিয়াকে দেয়। হিয়া আয়মানকে এই মিথ্যে বিশ্বাসে ডুবিয়ে রাখবে যে, এই তথ্যগুলো পেলে সে তার বাবাকে সরিয়ে এক নতুন পৃথিবী গড়বে, যেখানে তারা দুজনে স্বাধীন।
কিন্তু পর্দার আড়ালে হিয়ার লক্ষ্য থাকবে অন্য। সে আয়মানের মাধ্যমে সংগৃহীত সেই নথিপত্রগুলো এমনভাবে সাজাতে লাগবে যা সরাসরি পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তুলে দিলে আসাদ খানের কোনো নিস্তার থাকবে না। হিয়ার পরিকল্পনা হলো, আয়মান নিজের হাতেই তার বাবার সাম্রাজ্যের গোপন কুঠুরির চাবিগুলো হিয়ার হাতে তুলে দেবে। আর হিয়া সেই চাবি দিয়ে পুলিশের জন্য এমন দরজা খুলে দেবে, যা আসাদ খানের জীবনের সব অধ্যায় চিরতরে বন্ধ করে দেবে।
হিয়া খুব সন্তর্পণে এই বিষ ছড়িয়ে দিবে—আয়মান ভাবছে সে ভাইপারকে জয়ের জন্য তুরুপের তাস খেলছে, অথচ সে আসলে নিজের বাবার সর্বনাশ ডেকে আনছে। হিয়া চাইছে এই ধ্বংসযজ্ঞ এমনভাবে ঘটুক যেখানে আয়মান নিজের হাতেই তার বাবার পতন দেখে, আর শেষ মুহূর্তে আয়মান যখন বুঝতে পারবে সে কার হাতে পুতুল হয়েছে, ততক্ষণে আসাদ খানের সাম্রাজ্য ছাই ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। হিয়া দূর থেকে বসে সেই অনিবার্য পতনের চিত্রনাট্য লিখছে, যেখানে আয়মান তার বাবার রক্তেই নিজের হাত রাঙাবে।
পরেরদিন রাতে ‘হায়াস ম্যানশনের’ অন্দরমহলে লিওন আর মায়ার গায়ে হলুদের আসর সাজানো হলো। বাইরে কনকনে শীতের রাত, কিন্তু ভেতরে উষ্ণ আলো আর গাদা ফুলের সুবাস। লিওনের মা শিরিন হায়াস নিজে উপস্থিত থেকে বাঙালি ঐতিহ্যের আদলে অনুষ্ঠানটি সাজিয়েছেন। অতিথির সংখ্যা হাতেগোনা; বিশেষ করে লিওনের বোন অ্যামেলিয়া এবং তার স্বামী রুদ্রের উপস্থিতিতে বাড়ির পরিবেশটা বেশ ঘরোয়া। ভিড়ের মাঝে সিআইডি অফিসার রওশন আর নোভাকেও দেখা যাচ্ছে, যারা মূলত নজরদারির ছলেই সেখানে উপস্থিত।
লিওন নিজের রুমে তৈরি হচ্ছে। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে তার মনে হলো, অনেকদিন হলো সেই রহস্যময়ী ভাইপারের ছায়া তার আশেপাশে দেখা যাচ্ছেনা। এতদিন পর সবকিছু কি তবে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে? কিন্তু এই ভাবনার ভেতরেই এক দলা অস্থিরতা কাজ করল—ভাইপারকে ধরার নেশাটা এখনো তার ভেতরে জ্বলছে। সে কি আসলেই ভাইপারের হাত থেকে নিস্তার পেয়েছে, নাকি এটা কোনো বড় ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা?
হলুদের অনুষ্ঠান শেষে সব আয়োজন শেষ হলো। লিওন পরম মমতায় মায়াকে হুইলচেয়ার থেকে কোলে তুলে নিয়ে তার রুমে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। মায়া আজ কিছুটা অন্যরকম মুডে। সে প্রথমবারের মতো সাহস সঞ্চয় করে লিওনের গালে আলতো করে একটা চুমু খেল।
মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল লিওন। সে চাইছিল এই ছোঁয়ার উষ্ণতা অনুভব করতে, মায়ার প্রতি নিজের ভেতরের অবদমিত ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে। কিন্তু একরাশ শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। মায়ার সেই চুমু লিওনের কাছে কোনো রোমান্টিক সংকেত হয়ে ধরা দিল না, বরং ছোট বোনের ভাইয়ের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহের মতো অনুভূত হলো। লিওন ছোটবেলা থেকেই মায়াকে আগলে রেখেছে, তাকে নিজের চেয়েও বেশি স্নেহ করেছে। আজও সেই স্নেহের বাঁধন এতই মজবুত যে, মায়ার প্রতি অন্য কোনো মোহ বা প্রেমের অনুভূতি তৈরি করতে গিয়ে সে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
লিওনের বুকের ভেতরটা দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠল—সে কি সত্যিই মায়াকে কেবল বোন হিসেবেই আজীবন দেখে যাবে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো জটিল মনস্তাত্ত্বিক কারণ লুকিয়ে আছে?
লিওন যখন রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তার বুকের ভেতরটা তখন জ্বলছে। মায়ার সেই চুমুর স্পর্শটা এখনো তার গালে লেগে আছে, কিন্তু সেখানে নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন। তার মনে পড়ে গেল সেইদিনের কথা—যেদিন হিয়া তাকে খুব কাছ থেকে জড়িয়ে ধরেছিল। সেই স্বল্পস্থায়ী স্পর্শে লিওনের শরীরের প্রতিটি কোষ যে তীব্র শিহরণে কেঁপে উঠেছিল, মায়ার এই চুমুতে তার এক শতাংশও খুঁজে পেল না সে। নিজের ওপরই এক প্রচণ্ড রাগে লিওনের হাতের মুষ্টি শক্ত হয়ে গেল।
গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় হিয়ার কক্ষের ভেতরটা তখন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইভানার দেওয়া খবরটা হিয়ার কানে তপ্ত সিসার মতো ঢুকল—লিওন আর মায়ার গায়ে হলুদ শেষ হয়েছে, আর কালই বিয়ে! খবরটা শোনার সাথে সাথে হিয়ার ভেতরের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। সে মায়াকে পঙ্গু বানিয়েছিল এই বিয়েটা আটকানোর জন্যই, কিন্তু সেই বাধাও লিওন আর তার পরিবারকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
রাগের মাথায় হিয়া ঘরের আসবাবপত্র এলোপাথাড়ি ছুড়ে মারতে শুরু করল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল লিওনের সাথে মায়ার হাসিখুশি মুখগুলো, যা তার বুকটাকে হিংসায় দগ্ধ করছে। হিয়া নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আয়নায় এক প্রচণ্ড ঘুষি বসাল। আয়নার কাঁচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল, আর হিয়ার হাতের মুঠো থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করল। কিন্তু সেই শারীরিক যন্ত্রণা হিয়ার ভেতরের ক্ষোভের কাছে কিছুই না।
রক্তাক্ত হাতটা আয়নার ফ্রেমে রেখেই হিয়া হিমশীতল স্বরে বিড়বিড় করল, “লিওন, তুমি কি ভাবছো নিজেকে? আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে না। আমি মায়াকে পঙ্গু করেছিলাম তোমাকে পাওয়ার জন্য, তোমাকে হারানোর জন্য নয়। কালকের সূর্যাস্তে তোমার বিয়ের দিন হতে পারে, কিন্তু সূর্যোদয় হবে তোমার সর্বনাশের।”
হিয়ার চোখে তখন পাগলাটে জেদ। সে ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “সব ব্যবস্থা কর! কাল কোনোভাবেই এই বিয়ে হতে দেব না। লিওন আমার, তাকে যেভাবেই হোক আমার কাছে তুলে আনতে হবে। আমার জিনিস, আমার অধিকার—আমি ছিনিয়ে আনব। কালকের রাতটা হবে লন্ডনের ইতিহাসের সবচেয়ে বিভীষিকাময় রাত!”
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৩
তার কণ্ঠে এখন কোনো মায়া নেই, আছে কেবল এক ধ্বংসাত্মক প্রতিজ্ঞা। হিয়া তার ফোনটা তুলে নিয়ে কাউকে ফোন করল—তার কণ্ঠস্বরে তখন ভয়ংকর শীতলতা, যেখানে লিওনের ভবিষ্যৎ আর মায়ার ভাগ্য এক সুতোয় ঝুলে আছে। সে কালকের লড়াইয়ের জন্য দাবার বোর্ড গুছিয়ে ফেলেছে। যে করেই হোক এই বিয়ে সে জীবন থাকতে হতে দিবে না।
