আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৪
সাবিলা সাবি
মেফেয়ারের সেই ভিক্টোরিয়ান টাউনহাউসে তখন সদ্য ভোরের আলো ফুটছে। বাইরের কুয়াশাভেজা শহরটা যখন সবেমাত্র জেগে উঠছে, ভাইপারের দিনের শুরুটা তখন অনেক আগেই হয়ে গেছে। আজ রাতটাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ—সেন্ট্রাল ব্যাংক ডাকাতির চূড়ান্ত প্রস্তুতি।
৫ ফুট ৭ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী এই নারী, যাকে অপরাধ জগতের সবাই এক নামে চেনে ‘ভাইপার’ হিসেবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে তার চুলগুলোকে শক্ত করে জুটি করে নিল। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ইভানা, এক গ্লাস প্রোটিন শেক নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। ভাইপারের চোখের মণি আজ স্থির, লক্ষ্য কেবল আজকে রাতের সেই সুপরিকল্পিত মিশন।
ভূগর্ভস্থ সেই ব্যক্তিগত জিম রুমে ভাইপার এক গভীর একাগ্রতায় মগ্ন। তার পরনের কালো রঙের আঁটসাঁট স্পোর্টস ওয়্যার শরীরের প্রতিটি বাঁক ও সুডৌল গড়নকে মোহনীয়ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সে একাধারে নারীসুলভ কোমলতা আর অ্যাথলেটিক নমনীয়তার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। মেঝেতে ভর দিয়ে পুশ-আপ করার সময় তার শরীরের প্রতিটি পেশির ছন্দময় নড়াচড়া নিপুণ শিল্পকর্মের মতোই। তার ছিপছিপে অথচ পাথরের মতো শক্ত শরীর, প্রতিটি পুশ-আপে ঢেউয়ের মতো জেগে ওঠা পেশি, আর ঘামে ভেজা লাবণ্যময় ত্বক যেকোনো পুরুষের দৃষ্টি আটকে দিতে বাধ্য। যেখানে পেশীবহুল পুরুষ যোদ্ধারা দুই শ’ পুশ-আপের পর হাঁপিয়ে ওঠে, সেখানে ভাইপার কোনো ক্লান্তি ছাড়াই অনায়াসে পাঁচশতম পুশ-আপ শেষ করে ফেলল। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর শরীরচর্চার পরও তার নিঃশ্বাসের ছন্দে কোনো অস্থিরতা নেই; বরং প্রতিটি নড়াচড়ায় ফুটে উঠছে এক সম্মোহনী মাদকতা। একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইভানা মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখছে, কীভাবে এমন কোমল ও আকর্ষণীয় নারীর রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে অমানবিক শক্তির দাপট। ঘামের বিন্দুগুলো তার পিঠে গড়িয়ে পড়ার সময় এক অনন্য দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা তার সৌন্দর্যকে করে তুলেছে আরও রহস্যময় ও তীব্র।
জিমের কঠোর কসরত শেষ করে ভাইপার উঠল বক্সিং রিঙে। পাঞ্চিং ব্যাগটার সামনে দাঁড়িয়ে তার চাহনি হয়ে উঠল জমাটবাঁধা বরফের মতো শীতল; কোনো শিকারের গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ার আগের সেই নিস্তব্ধ মুহূর্তের মতোই। প্রতিটি ঘুষিতে মিশে আছে হিসেব করা নিখুঁত গতি আর পেশির ইস্পাত কঠিন টান। সে কোনো সাধারণ অপরাধী নয়, সে এক মরণজয়ী অ্যাথলেট—যে নিজের শরীরের প্রতিটি তন্তুকে শান দিচ্ছে আসন্ন ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের জন্য। তার প্রতিটি আঘাতের শব্দে রিঙের চারপাশের বাতাস কেঁপে উঠছে, আর সে মেতে উঠেছে নিজের গড়া ধ্বংসের সেই নেশাতুর খেলায়।
বক্সিং সেশনের শেষে দীর্ঘশ্বাসের সাথে ভাইপার যখন নিজের দম ফিরে পাচ্ছিল, তখন তার নজর গিয়ে থামল ইভানার ওপর। কণ্ঠস্বরে কোনো কম্পন নেই, বরং রয়েছে ধারালো শীতলতা— “সব প্রস্তুতি যেন আজ রাত দুটো নাগাদ নিখুঁত থাকে। ব্যাংকের প্রতিটি ইঞ্চি, প্রতিটি কোণ যেন আমার নখদর্পণে থাকে ইভানা।”
প্রশিক্ষণ শেষে ভাইপার সোজা বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। দীর্ঘ স্নানের স্নিগ্ধতায় শরীরকে সতেজ করে সে তার আভিজাত্যের মোড়ক জড়াতে শুরু করল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে তার হাতটি গিয়ে থামল সেই কাঙ্ক্ষিত বোতলটির ওপর—’ক্লাইভ ক্রিশ্চিয়ান নম্বর ওয়ান ইম্পেরিয়াল ম্যাজেস্টি’। ২ লক্ষ ১৫ হাজার ডলার মূল্যের সেই ক্রিস্টাল বোতলটি থেকে পারফিউম স্প্রে করতেই পুরো ঘর স্যান্ডালউড আর ডার্ক চেরির এক ভারী, মোহময় গন্ধে ছেয়ে গেল; ইভানা এগিয়ে এসে ভাইপারের বাথরোবটির কোমরবন্ধনী ঠিক করে দিল। সেই ঢিলেঢালা পোশাকের ভাঁজেও তার ৫ ফুট ৭ ইঞ্চির সুঠাম কোমল শরীরের আভিজাত্য স্পষ্ট।
অন্যদিকে সিআইডি সদর দপ্তরে তখন বিষণ্ণ স্তব্ধতা। অফিসার নোভা তার ডেস্কে ঝুঁকে পড়েছেন, চোখের সামনে মাত্র দুটি চিরকুট—একটি লিওনের ডেস্কে পাওয়া, আর অন্যটি হোটেলের সেই বী/ভৎস ক্রা*ইম সিন থেকে উদ্ধার করা। কাগজ দুটির দিকে তাকিয়ে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হলো। নোভা ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা চোখের কাছে এনে চিরকুট দুটির হাতের লেখা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করলো। প্রতিটি অক্ষরের বাঁক সুশৃঙ্খল যুদ্ধের নকশা ফুটিয়ে তুলেছে। নোভা মৃদুস্বরে বিড়বিড় করে উঠলেন, “এই হস্তলিপি সাধারণ মানুষের হতে পারে না। প্রতিটি অক্ষর ল্যাটিন শৈলীতে অত্যন্ত নিখুঁত এবং ধারালো। বিশেষ করে ‘L’ অক্ষর—ওট একদম তলোয়ারের মতো টানা, যা একজন প্রশিক্ষিত যোদ্ধার অহংকার আর আভিজাত্যের পরিচয় বহন করে।”
নোভা একটি মার্কার দিয়ে চিরকুটের ওপর গোল চিহ্ন দিলো। গ্রাফোলজির নিয়ম অনুযায়ী, এই লেখার তীব্র চাপ প্রমাণ করে লেখক অত্যন্ত অবসেসিভ এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। নোভা ল্যাপটপে সেই হস্তলিপির অ্যানালাইসিস শুরু করলো। সে গম্ভীর কণ্ঠে বললো, “স্যার, আমি ভাইপারের হাতের লেখার প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করেছি। সে একজন উচ্চশিক্ষিত এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ব্যক্তিত্ব। সবচেয়ে বড় কথা, সে ডান এবং বাঁ—উভয় হাতেই সমান নিখুঁতভাবে লিখতে পারে। সে আমাদের সাথে কেবল অপরাধ করছে না, সে আমাদের সাথে বুদ্ধিদীপ্ত এক খেলা খেলছে।”
লিওন নোভা’র হাত থেকে চিরকুট দুটি নিয়ে অতি মনোযোগের সাথে দেখতে লাগল। চিরকুটে ভাইপারের সেই সম্বোধন—‘আমার দিলবার’ আর ডেস্কে রাখা চিরকুটের লাইনগুলোর দিকে তাকাতেই তার কফি রঙের চোখে তীব্র চিন্তার ছায়া ফুটে উঠল। লিওন ফাইল থেকে ভাইপারের প্রোফাইলটা টেনে নিল। তার কণ্ঠে এক গম্ভীর স্তব্ধতা, “নোভা, ও শুধু অপরাধ করছেনা। ও আমাদের অন্দরমহলেই নিজের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে। এই চিরকুটগুলোই বলে দিচ্ছে, ও আমাকে খুব কাছ থেকে মাপছে। আমার ড্রেস কোড থেকে শুরু করে এই ব্যক্তিগত কেবিনের খুঁটিনাটি—সবই ওর নখদর্পণে।”
নোভার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চিরকুটের কোণায় লেগে থাকা কালির দাগের ওপর স্থির হলো। “স্যার, এই কালি কোনো সাধারণ কালি নয়। এটা খুব দামি এবং বিরল, যা হয়তো কেবল অভিজাত কোনো ড্রয়িং রুমেই পাওয়া যায়।”
লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ভাইপারের এই আভিজাত্যই কি তবে তার আসল পরিচয়? সে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো, “আগামীকাল সুর্য ওঠার আগে এই রহস্যের জট আমাদের খুলতেই হবে। সে হয়তো এখন আবার কোনো বড় ছক কষছে।”
লন্ডনের মাটির অনেক নিচে, সুরক্ষিত সেই টাউনহাউসের গোপন আস্তানায় নেমে এসেছে এক ভারী স্তব্ধতা। এটি কোনো সাধারণ আস্তানা নয়; এটি ‘ওয়েরউলফ’-এর হৃদপিণ্ড, যেখান থেকে লন্ডনের অন্ধকার জগতের সমস্ত শিরা-উপশিরা নিয়ন্ত্রিত হয়। দেওয়ালে ঝোলানো বিশালাকার এলসিডি স্ক্রিনে লন্ডনের ব্যাংকিং সার্ভারের ফুটেজগুলো একে একে ভেসে উঠছে। ঘরে উপস্থিত সংগঠনের বাছাই করা দুর্ধর্ষ সদস্যরা; তাদের প্রত্যেকের চোখের কোণে ভাইপারের প্রতি ভক্তি আর ভয়ে মেশা এক আচ্ছন্ন ভাব। তারা তাকে কেবল লেডি বস হিসেবে নয়, বরং ‘মিসট্রেস’ বলে সম্বোধন করে—এমন এক সম্মানে, যা একইসাথে আনুগত্য আর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়।
ভাইপার—অর্থাৎ হিয়া—টেবিলের শেষ প্রান্তে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে এখন যেকোনো সময়ের চেয়েও তীক্ষ্ণ এক আগুনের আভা। গম্ভীর কণ্ঠে সে নির্দেশ দিল, “ওয়েরউলফের গ্রুপের প্রতিটি সদস্যকে মাথায় রাখতে হবে, আমরা যা করছি তা কেবল কোনো কাজ নয়, বরং এটা একটা শিল্প। আমাদের অভিযানের প্রতিটি পদক্ষেপ হবে নিখুঁত, গাণিতিক এবং ত্রুটিহীন।”
সে একে একে তার টিমের প্রতিটি সদস্যের ওপর চোখ বুলালো, তাদের কাজের পরিধি স্পষ্ট করে দিল।
ইভানার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “ইভানা, লন্ডনের পুলিশের সিসিটিভি নেটওয়ার্কের ওপর তোমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাই। আমাদের অপারেশনের সময় পুলিশের সব কমিউনিকেশন জ্যাম থাকবে।”
ইভানা—যে ওয়েরউলফের ‘টেকটিক্যাল হেড’ বা প্রযুক্তিগত কৌশলের প্রধান। সে তৎক্ষণাৎ ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুল চালাল; ডিজিটাল সুরক্ষাব্যবস্থা ভাঙার কাজে তার দক্ষতা সংগঠনের মেরুদণ্ড।
ভাইপার ইশারায় মার্ককে কাছে ডাকল। সে তখন একের পর এক সাব-মেশিনগানের যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করছিল। ওয়েরউলফের ‘ওয়েপন মাস্টার’ বা অস্ত্রভাণ্ডারের প্রধান হিসেবে মার্কের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। তার দিকে তাকিয়ে ভাইপার সহজ গলায় বলল, “মার্ক, আজকের কাজে কোনো আওয়াজ যেন বাইরে না যায়। সাইলেন্সড অস্ত্র ব্যবহার করবে। ওয়েরউলফের আগমনে যেন কোনো শব্দ না হয়—আমরা যাবো ছায়ার মতো আর কাজ গুটিয়ে নেব নিঃশব্দে।”
ভাইপার এবার সারার দিকে ফিরল। সারা দলের ‘ইনফিলট্রেটর’—ভেতরে ঢুকে তথ্য হাতানোর কাজটা সেই ভালো বোঝে। তার কাঁধে হাত রেখে ভাইপার সহজ করে বলল, “সারা, ভেতরে সব নজর এখন তোমার ওপর। বস দানিয়েলের কড়া নির্দেশ আছে, সিসিটিভি ফুটেজে যেন আমাদের কোনো চিহ্ন না থাকে। তুমি সেখানে আমার চোখ হয়ে থাকবে।”
ভাইপার এবার সবার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তার কণ্ঠে বরফের মতো শীতলতা। “বস দানিয়েল আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আর আলফা হিসেবে তোমাদের পথ দেখাব আমি। একটা কথা যেন ভুল না হয়, তোমরা ‘ওয়েরউলফ’ এর অংশ। এই খেলায় হেরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের পথে যদি কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সে যেই হোক বা খোদ আইন তাকে মুছে ফেলবে। দুনিয়া যেনো জানতে পারে আমরা এসেছি, শুধু রেখে যাব ধ্বংসের চিহ্ন।”
সবার মাথা নিচু হয়ে এল। ভক্তি আর ভয় মেশানো এক গভীর আনুগত্যে ডুবে গিয়ে তারা সমস্বরে বলে উঠল, “ইয়েস, মিসট্রেস।”
লন্ডনের রাতের আকাশ আজ মেঘাচ্ছন্ন। ঘড়ির কাঁটা ঠিক রাত দুটোর ঘরে। সেন্ট্রাল ব্যাংক অব লন্ডনের চারপাশে এখন পিনপতন নীরবতা। সব ঝক্কি আর কোলাহল সরিয়ে রেখে, ব্যাংকের মেইন সার্ভার রুম আর ভল্টের ভেতর তখন এক নিভৃত অস্থিরতা।
মেফেয়ারের সেই টাউনহাউস থেকে ভাইপার বেরিয়ে এসেছে তার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে। পরনে জেট ব্ল্যাক ট্যাকটিক্যাল গিয়ার, মুখে কালো মাস্ক, আর তার প্রতিটি নড়াচড়ায় ভেসে আসছে সেই চেরি আর স্যান্ডালউডের ভারী, মাদকতাময় ঘ্রাণ। ব্যাংকের মেইন সিকিউরিটি সিস্টেমটি একটি ‘সেন্ট্রাল এআই গ্রিড’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ভাইপার যখন হ্যাকিং শুরু করল, তখন সে জানত না—সিআইডির ডাটাবেজে তার জন্য এক বিশেষ ফাঁদ পাতা আছে।
সিআইডি সদর দপ্তরের কমান্ড সেন্টারের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই একটি উচ্চকণ্ঠের বিপ বিপ শব্দ পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়ল। অফিসার নোভা তার মনিটরের দিকে তাকিয়ে দেখলো, পুরো লন্ডনের ম্যাপে সেন্ট্রাল ব্যাংকের পয়েন্টটি লাল হয়ে দপদপ করছে। নোভা দ্রুত লিওনার্দোর দিকে তাকিয়ে বললো, “স্যার! ভাইপারের হ্যাকিং প্যাটার্ন! আমি গত তিনদিন ধরে যে বিশেষ অ্যালগরিদম সেট করে রেখেছিলাম, সেটা ভাইপারের ডিজিটাল সিগনেচার শনাক্ত করেছে। সে ব্যাংকের মেইন সিকিউরিটি গ্রিড বাইপাস করার চেষ্টা করছে!”
লিওনার্দো মুহূর্তের মধ্যে নিজের বন্দুকটা চেক করে নিল। তার কফি কালারের চোখ দুটোয় তখন আগুনের হলকা। সে জানত, ভাইপার কোনো সাধারণ ব্যাংক ডাকাতি করছে না; এটি সরাসরি তার জন্য একটি আমন্ত্রণ। সে গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিল, “সব টিমকে রেডি করো। এবার আর তাকে ফস্কে যেতে দেওয়া যাবে না!”
ব্যাংকের ইন্টারনাল সার্ভারে ভাইপারের হ্যাকিংয়ের সময় ডেটা ট্রাফিক অসামঞ্জস্য বা অ্যানোমালি ধরা পড়ল। সে ব্যাংকের মেইন অ্যালার্ম সিস্টেম ডিজেবল করতে পারলেও, ভল্ট এরিয়ায় থাকা সেই সাইলেন্ট ট্রিগার সক্রিয় হয়ে উঠল। ভাইপার যেইমাত্র ভল্টের ডিজিটাল লকের ওপর তার কোডগুলো প্রয়োগ করল, সেই সাইলেন্ট ট্র্যাপটি সিআইডি হেডকোয়ার্টারে রেড ফ্লাগ সংকেত পাঠাল। সিআইডি এখন ভাইপারের প্রতিটি ডিজিটাল পদচিহ্ন ট্র্যাক করছে।
ব্যাংকের মূল ভল্টের সামনে দাঁড়িয়ে ভাইপার ল্যাপটপে শেষ কোডটি বসাচ্ছে। কিবোর্ডে তার আঙুলের দ্রুত লয় দেখে মনে হচ্ছিল, সে কাজ করছে না, বরং কোনো এক রহস্যময় সুর তুলছে। ভল্টের ভারী দরজাটা যখন একটা গুমোট আওয়াজ তুলে সরতে শুরু করল, সে বুঝতে পারল, এই খেলা এখন আর শুধু ভল্ট ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সে এখন লিওনের সরাসরি নজরে।
ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তার সেই চিরচেনা বিষাক্ত হাসি। সে আসলে লিওনকে টার্গেট করেনি; বরং তাকে নিজের মরণফাঁদে টেনে এনেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, বাইরে কড়া ব্রেক আর টায়ারের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ছাপিয়ে ব্যাংকের সামনে এসে থামল সিআইডির একের পর এক গাড়ি।
সেন্ট্রাল ব্যাংকের চারপাশ ঘিরে নেমে আসা নিস্তব্ধতা যেন কোনো এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। বাইরে রাত যত গভীর হচ্ছে, লিওনার্দোর বুকের ভেতরটা ততটাই উত্তাল হয়ে উঠছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ওই বিশাল অট্টালিকার ভেতরে ঠিক কতটা শীতলতা খেলা করছে, তা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সিআইডি টিমের প্রতিটি সদস্য হাড়েমজ্জায় টের পাচ্ছে।
সামনের এলসিডি মনিটরগুলোতে ফুটে ওঠা দৃশ্যগুলো যেন সিনেমার কোনো বীভৎস ফ্রেম। ভাইপারের লোকজন প্রতিটি জিম্মির মাথার ওপর পিস্তল উঁচিয়ে ধরে আছে—যেকোনো মুহূর্তে আঙুলের সামান্য চাপে একটি তাজা প্রাণ ঝরে পড়ার অপেক্ষায়। মনিটরের অস্পষ্ট আলোয় লিওনার্দো দেখছে, আতঙ্কিত মানুষগুলোর চোখের দৃষ্টি—কারও চোখে পাথরের মতো জমাট বাঁধা ভয়, কারো বা গাল বেয়ে নামছে অবিরত অশ্রুধারা। এই প্রতিটি অশ্রুবিন্দু লিওনার্দোর হৃদয়ে তপ্ত সিসার মতো এসে পড়ছে। বাইরে থেকে করিডোরের ভেতরের দৃশ্যগুলো দেখে মনে হচ্ছে, সেটি আর ব্যাংকের করিডোর নেই; সেটি এখন এক বিভীষিকাময় মৃ/ত্যুপুরী।
লিওনার্দোর হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসে। তার দলের সবার কপালে চিন্তার গভীর রেখা—কেউ বা বিড়বিড় করে অস্ত্র পরীক্ষা করছে, কেউ বা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে মনিটর থেকে, সহ্য করতে পারছে না এই অসহ্য নিষ্ঠুরতা। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন যেন সময়ের সাথে পাল্লা দেওয়া এক দাবার চাল। বাইরে থাকা দলটির ভেতরে যে অস্থিরতা আর চাপা উত্তজনা, তা যেন ওই করিডোরের বন্দি মানুষগুলোর দমবন্ধ করা কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
রাত বাড়ছে, কিন্তু নিস্তব্ধতা ভাঙছে না। বাইরে লিওনার্দো এবং তার দল এক অমোঘ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে—ভিতরে থাকা মানুষগুলোর জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড এখন তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। একটি ভুল, একটি শব্দ, একটি সামান্য ভুল পদক্ষেপ—আর ওপাশে নেমে আসবে চিরস্থায়ী অন্ধকার।
ব্যাংকের ঠিক উল্টো দিকের অন্ধকার গলিতে দাঁড় করানো সিআইডির হাই-টেক ভ্যানটি এখন এই অপারেশনের প্রাণকেন্দ্র। বাইরের তীব্র উত্তেজনার মাঝেও ভ্যানের ভেতরে নিস্তব্ধতা—শুধুমাত্র ল্যাপটপ আর মনিটরের কুলিং ফ্যানের গুনগুন শব্দ ভেসে আসছে। ব্যাংকের করিডোর থেকে বেশ খানিকটা দূরত্বে এই সুরক্ষিত আস্তানা থেকেই লিওনার্দো পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে।
ব্যাংকের বাইরে সিআইডির সেই কন্ট্রোল প্যানেলে বসে থাকা লিওনের চোখেমুখে তখন হাজারো চিন্তা। তাদের ল্যাপটপের স্ক্রিনে ব্যাংকের ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজ ভেসে উঠছে। হঠাৎই ল্যাপটপের ডিসপ্লেটা কেঁপে উঠল, আর একটা ইনকামিং ভিডিও কলের নোটিফিকেশন এল। লিওন কলটা রিসিভ করতেই স্ক্রিনজুড়ে ভেসে উঠল ভাইপারের সেই শীতল মুখ। ভাইপার বসে আছে একদম শান্ত হয়ে, যেন কোনো বড় ড্রয়িংরুমে আয়েশ করে সে কফি খাচ্ছে। কিন্তু ল্যাপটপের ওই স্ক্রিনে ফুটে ওঠা দৃশ্যটি একদম ভিন্ন—তার মাথার পাশে ধরা পিস্তলের নল আর জিম্মিদের কাঁপা কাঁপা শ্বাস। ভাইপার হাসল। খুব আলতো, প্রায় অলক্ষ্য এক হাসি। তার ভ্রুর পিয়ার্সিংটা নীল আলোয় চিকচিক করে উঠল। লিওনার্দো দেখল, ভাইপার সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সে ঠিক জানে লিওন কোথায় বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে।
“অফিসার লিওন,” ভাইপারের কণ্ঠস্বর স্পিকারে যান্ত্রিক শোনালেও তাতে মিশে ছিল অদ্ভুত এক স্থিরতা। সে ব্যস্ত নয়, তাড়াহুড়োও নেই তার। সে তার বন্দুকের নলটা দিয়ে স্ক্রিনে থাকা এক জিম্মির কপালে আলতো করে চাপ দিল। জিম্মিটি কেঁপে উঠল, কিন্তু শব্দ করার সাহস পেল না। লিওনার্দোর ল্যাপটপ থেকে ভাইপারের কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল, “বাইরে খুব গরম, তাই না? আমি ভাবলাম তোমাদের একটু শীতল করি। কী বলো?”
ভাইপারের চোখের নিচের কাটা দাগটা কুঁচকে উঠল তার বাঁকা হাসির সাথে। সে ক্যামেরা থেকে চোখ সরাল না। লিওনার্দো ল্যাপটপের কিবোর্ডে হাত রাখল, তার আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছে কি না তা সে নিজেও জানে না। ভাইপার যে তাকে সরাসরি কথা বলার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, এটা কেবল একটি কৌশল—তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার একটি নিখুঁত চাল। কন্ট্রোল রুমে থাকা বাকিদের মধ্যে কোনো নড়াচড়া নেই। তারা জানে, এখন যে কোনো ভুল শব্দ বা ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হবে করিডোরের ওই মানুষগুলোকে।
লিওনার্দোর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, দাঁতে দাঁত চেপে সে গর্জে উঠল, “খেলনা বন্ধ করো, ভাইপার! বেরিয়ে এসো! তোমার এই নোংরা কৌশলে কোনো নিরীহ মানুষের গায়ে যদি একটা আঁচড়ও লাগে, তবে কথা দিচ্ছি—পৃথিবীর কোনো কোণেই তুমি আমার হাত থেকে রেহাই পাবে না। আজকের পর থেকে তোমার পৃথিবী বলতে শুধু ওই অন্ধকার জেলখানাটাই থাকবে।”
স্ক্রিনের ওপাশে ভাইপার বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। শান্ত ভঙ্গিতে সে কিবোর্ডের ওপর আঙুল বোলাল। তারপর এক মুহূর্তের জন্য লিওনার্দোর কফি-রঙা চোখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর ছিল বিষাক্ত অথচ অদ্ভুতভাবে মায়াবী—যেখানে উত্তেজনার চেয়েও বেশি ছিল এক গভীর, অসুস্থ আসক্তি। ভাইপার অত্যন্ত ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “অফিসার, আপনি কেন ভাবছেন আমি পালাতে চাই? আমি তো চাই না আপনি আমাকে ছেড়ে দিন। বরং আমার আকাঙ্ক্ষা হলো, আপনি আমাকে আইনের হাত থেকে বাঁচাবেন না—বরং আপনার হৃদয়ের কারাগারে বন্দি করে রাখবেন।”
ভাইপারের প্রতিটি কথাই ব্যাংকের থমথমে বাতাসে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ল। লিওন স্থির হয়ে ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। একদিকে আইনের শত বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে ভাইপারের এই ভয়ংকর, পাগলাটে প্রেমের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে লিওনার্দো নিজেকে এক অচেনা গোলকধাঁধায় বন্দি বলে মনে করল। ভাইপার ওপাশ থেকে আবারও ফিসফিসিয়ে উঠল, “শিকারি যখন শিকারের অপেক্ষায় ওত পেতে থাকে, তখনই তো খেলার আসল নেশা। লিওন, আজ রাতের শুরুটা তো মাত্র হলো। দেখি, আপনার আইন আমার বোনা এই মরণফাঁদকে সামলায় কীভাবে!”
ভিডিও কলটি হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর কন্ট্রোল রুমের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে দাঁড়াল। নীলচে আলোর রেশটুকু মিলিয়ে যেতেই চারপাশটা নেমে এল গাঢ় অন্ধকারে, কেবল জেনারেটরের হালকা গুনগুন শব্দ আর বাইরে বৃষ্টির ছাঁট পড়ার মৃদু আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।লিওনার্দো ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। তার চোখের সামনে তখনো ভাইপারের সেই বাঁকা হাসি আর চোখের নিচের কাটা দাগটি জীবন্ত হয়ে ভাসছে।লিওনার্দো তার সিগন্যাল ডিভাইসটি টেবিলের ওপর আছাড় দিয়ে রাখল। ধাতব শব্দের আঘাতে কন্ট্রোল রুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল।
ব্যাংকের করিডোর তখন থমথমে। ভিডিও কলের সেই তীব্র ও ব্যক্তিগত সংলাপের পর সিআইডি টিমের ভেতর এক অস্বাভাবিক অস্থিরতা ভর করেছে। লিওনার্দোর চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি নিবদ্ধ ব্যাংক ভবনের সেই নিস্তব্ধ দেয়ালগুলোর দিকে। পাশ থেকে অফিসার নোভা ভ্রু কুঁচকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো, “স্যার, এই ভাইপার এসব কী বলছে? ওর কথায় তো কেবল অপরাধের অভিসন্ধি নয়, বরং আরও গভীর কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা পাগলামি ফুটে উঠছে।”
নোভাকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই অফিসার রওশন সুযোগ বুঝে রসিকতার সুরে বলে উঠল, “আরে মিস নোভা, আপনি তো নতুন এসেছেন! আপনি কি সেই চিরকুটগুলো দেখেননি? এই অপরাধী যে লিওন স্যারের ওপর রীতিমতো ক্রাশ খেয়ে বসে আছে, তা তো খোলাখুলিই বোঝা যাচ্ছে!”
রওশনের কথা শেষ হওয়ার আগেই লিওনার্দো ঘুরে তাকালো। তার দৃষ্টিতে তখন আগুনের হলকা। সে রওশনের দিকে দুই পা এগিয়ে গিয়ে কঠোর ধমক দিয়ে গর্জে উঠল, “অফিসার রওশন, আরেকবার যদি তুমি এই ফালতু কথা বলেছ, তবে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না! এটা কোনো আড্ডাখানা নয়, একটা অপারেশন চলছে। জিম্মি হওয়া মানুষগুলোর জীবনের প্রশ্ন এখানে। এখন এইসব ফালতু কথা বন্ধ করে দেখো, কীভাবে ভেতরে ঢোকার যায়! আর কতক্ষণ এভাবে হাত গুটিয়ে গাড়িতে বসে থাকব?”
রওশন ভয়ে চুপসে গিয়ে মাথা নিচু করে নিল। পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে অফিসার নোভা ফাইল থেকে রিপোর্টগুলো লিওনার্দোর সামনে মেলে ধরলো। “স্যার, আমি ওর আগের অপরাধের তালিকা বিশ্লেষণ করছিলাম। এই ভাইপারের কর্মকাণ্ড অবিশ্বাস্য! এর আগে দুবাই, আমেরিকা—এমনকি রাশিয়ার মতো কঠিন দেশেও সে বড় বড় ব্যাংক ডাকাতি করেছে। শুধু তাই নয়, রাশিয়ার কুখ্যাত ড্রাগ মাফিয়াদের সাথে মিলে সে গোপনে ড্রাগস পাচারের বড় একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছিল। যেখানেই সে গেছে, সেখানেই ধ্বংস আর রক্তের দাগ রেখে এসেছে, অথচ আজ পর্যন্ত কেউ তাকে ছুঁতেও পারেনি।”
লিওনার্দো গম্ভীর মুখে নোভাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, “তার মানে সে শুধু একজন দুর্ধর্ষ খু/নি নয়, সে আন্তর্জাতিক আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন দক্ষ খেলোয়াড়। সে জানে পুলিশ কীভাবে কাজ করে, আর ঠিক সেই সুযোগটাই সে নিচ্ছে। নোভা, ব্যাংকের ব্লু-প্রিন্টটা বের করো। যেভাবেই হোক, আমাদের কোনো একটা বিকল্প রাস্তা বের করতে হবে। সে আমাদের ডাকছে ঠিকই, কিন্তু আমরা তার ফাঁদে পা দেব না। মানুষগুলোকে আমাদের জীবিত উদ্ধার করতেই হবে।”
লিওনার্দোর কণ্ঠে একজন দক্ষ অফিসারের দৃঢ়তা স্পষ্ট। সে জানে, ভাইপার তাকে ব্যক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জ জানালেও, এখন তার একমাত্র লক্ষ্য—নিরাপরাধ মানুষগুলোকে রক্ষা করা। ভাইপারের ড্রাগস পাচারের ওই অন্ধকার ইতিহাস মনে পড়তেই লিওনের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় হলো। সে বুঝতে পারল, এটা কেবল ব্যাংক ডাকাতি নয়, এটা এক আন্তর্জাতিক অপরাধের জাল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে আজ দাঁড়িয়ে আছে সেই রহস্যময়ী ‘ভাইপার’ অথবা এর পেছনে আরো বড় মাপের কেউ।
ব্যাংকের ভল্ট এরিয়ায় তখন টানটান উত্তেজনা। একদিকে ভাইপারের নিখুঁত হ্যাকিং, অন্যদিকে জিম্মিদের আর্তনাদ। কিন্তু হুট করেই পরিস্থিতি বদলে গেল। ব্যাংকের ম্যানেজার, যিনি এতক্ষন ভাইপারের প্রতিটি চাল খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তিনি সুযোগ বুঝে লুকিয়ে রাখা একটি রিভলভার বের করে ফেললেন। তার সাথে থাকা আরও দুজন অভিজ্ঞ সিকিউরিটি গার্ড ভাইপারকে ঘিরে ফেলে।
ম্যানেজার গর্জে উঠলেন, “খেলা শেষ, ভাইপার! আমাদের জিম্মি করার সাহস তোর কীভাবে হলো?”
ভাইপার তখনো ভল্টের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শীতল হাসি ফুটে উঠল। সে উঠে দাঁড়াল না, উল্টো ল্যাপটপটা একপাশে রেখে খুব শান্ত গলায় বলল, “সাহস? সাহস তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন যা বাকি আছে, তা হলো কেবল আমার ধৈর্য।”
ম্যানেজার আর গার্ডরা যখন ভাইপারের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন ভাইপারের শরীর যেন স্প্রিংয়ের মতো কাজ শুরু করল। কোনো সাধারণ নারীর মতো নয়, সে যেন এক প্রচণ্ড গতির ঝড়ে রূপান্তরিত হলো।প্রথম গার্ডটি ঘুষি মারতে আসতেই ভাইপার বিদ্যুৎগতিতে মাথা নিচু করে তার কবজিটা মুচড়ে দিল—একটা হাড় ভাঙার মটমট শব্দ পুরো ভল্ট এরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। গার্ডটি যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দ্বিতীয় গার্ডটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভাইপার তার পা দিয়ে গার্ডের বুকে এক জোরালো কিক মারল, যা তাকে ছিটকে গিয়ে ব্যাংকের দেয়ালে আছড়ে ফেলল। ম্যানেজার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ট্রিগার চাপতে গেলেন, কিন্তু ভাইপার ততক্ষণে তার সামনে। সে ম্যানেজারের হাতটা ধরে শূন্যে ঘুরিয়ে দিয়ে তার নিজেরই বন্দুকের বাট দিয়ে তার চোয়ালে এক আঘাত করল। ম্যানেজার ছিটকে পড়লেন, তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে লাগল। ভাইপার তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল না, বরং অত্যন্ত নৃ/সংসভাবে তাদের ওপর প্রহার করতে লাগল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ব্যাংকের ওই গার্ড আর ম্যানেজার আধম/রা হয়ে মেঝেতে পড়ে রইলেন। ভাইপার তার কালো গ্লাভস পরা হাতে রক্ত মুছে আবার শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ব্যাংকের সিসিটিভি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সে হাত নাড়াল, সে জানে বাইরে বসে লিওনার্দো তাকে স্ক্রিনে দেখছে। সে ঠান্ডা গলায় ফিসফিস করে বলল, “শিকারিরা যখন নিজেরা শিকার হতে আসে, তখন তাদের করুণ পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত, তাই না অফিসার লিওন?”
বাইরে সিআইডির কন্ট্রোল প্যানেলে নোভা শিউরে উঠলেন। স্ক্রিনে ভাইপারের এই দানবীয় ক্ষমতা দেখে লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারলো, ভাইপারকে আটকানো এখন কোনো সাধারণ টাস্ক ফোর্সের কাজ নয়—এটি একটি অসম লড়াই। লিওন তার টিমকে সংকেত দিলো, “সবাই প্রস্তুত হও! জিম্মি উদ্ধারের সময় এসে গেছে।”
ব্যাংকের ভেতর সিসিটিভি ফুটেজে ভাইপারের এই অমানবিক নৃ*শংসতা আর তার অ্যাথলেটিক দক্ষতার প্রদর্শনী দেখে সিআইডি টিমের প্রতিটি সদস্যের শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল। বিশেষ করে অফিসার রওশন, যে এতক্ষণ এই অপরাধীকে নিয়ে মশকরা করছিল, সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার চোয়াল ঝুলে পড়া অবস্থায় বিড়বিড় করে উঠল, “ও গড! এটা কি আদতে কোনো মেয়ে, নাকি জীবন্ত লাভা? বাপরে বাপ! এমন শক্তি একটা মানুষের শরীরে থাকা কীভাবে সম্ভব?”
রওশনের কথাগুলো এই মুহূর্তে টিমের সবার মনেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। যে নিপুণতায় ভাইপার দুজন সশস্ত্র গার্ড এবং ম্যানেজারকে কব্জা করল, তা কোনো মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। লিওনার্দো একদৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের মণি স্থির, কিন্তু ভেতরে রাগের আর বিস্ময়ের এক বিশাল দহন। রওশনের দিকে না তাকিয়েই সে শান্ত কিন্তু শাণিত গলায় বলল, “ও লাভা নয় রওশন, ও হলো আগ্নেয়গিরির সেই উত্তাপ যা সব কিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ও সাধারণ অপরাধী হলে এতদিন অনেক আগেই ধরা পড়ত।”
নোভা পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে ল্যাপটপের কিবোর্ডে টাইপ করছিলো। সে ভীত কণ্ঠে বললো, “স্যার, ওর এই শারীরিক দক্ষতা কোনো সাধারণ জিম বা ট্রেনিংয়ের ফসল নয়। এ এক দীর্ঘদিনের কঠোর, যন্ত্রণাদায়ক প্র্যাকটিসের ফল। ও যখন মুভ করছে, ওর প্রতিটি পেশি যেন কোনো নিখুঁত মেশিনের মতো কাজ করছে।”
লিওনার্দো তার হ্যান্ডগানটি লোড করতে করতে কমান্ড সেন্টারের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সে জানে, বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু স্ক্রিন দেখে বিচার করলে চলবে না। সে তার টিমের উদ্দেশ্যে দৃঢ় কণ্ঠে নির্দেশ দিল, “রওশন, নোভা—সবাই শোনো! ও আমাদের সামনে তার শক্তির প্রদর্শন করছে আমাদের ভয় দেখানোর জন্য। কিন্তু মনে রেখো, একটা আগ্নেয়গিরিরও দুর্বল জায়গা থাকে। ও যদি লাভা হয়, তবে আমি সেই হিমবাহ যা ওকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। এবার সরাসরি ভেতরে ঢোকার সময় হয়েছে। কোনো ভুল নয়, কোনো দ্বিধা নয়—লক্ষ্য থাকবে শুধুমাত্র জিম্মিদের বাঁচানো।”
লিওনার্দোর এই দৃঢ়তায় টিমের সবার মধ্যে আবার সাহস ফিরে এল। তারা জানে, ভাইপার হয়তো দানবীয় শক্তির অধিকারী, কিন্তু লিওনার্দোর রণকৌশল আর সিআইডির সম্মিলিত শক্তির কাছে তাকে নতিস্বীকার করতেই হবে। সিআইডি টিম এবার ব্যাংকের ভল্ট অভিমুখে চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।
ব্যাংকের ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজ মুহূর্তের মধ্যে ব্ল্যাকআউট হয়ে গেল। লিওনার্দো কোনো সময় নষ্ট না করে সংকেত দিল, “চার্জ! নাও!” ভারী বুটের শব্দে ব্যাংকের করিডোর কেঁপে উঠল। সিআইডি টিম ভেতরে ঢুকে দেখল, ব্যাংকের মূল ভল্ট লুণ্ঠিত, মেঝেতে পড়ে আছে ম্যানেজার ও গার্ডরা, কিন্তু পুরো বিল্ডিং এখন জনশূন্য!ভাইপার তার টিম নিয়ে ততক্ষণে পেছনের গোপন পথ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
ভাইপারের নির্লিপ্ততায় তখনই ফাটল ধরল, যখন ব্যাংকের এক কোণে ধুলোমাখা জায়গায় একটা ছোট্ট মেয়েকে দেখতে পেল সে। ভিড়ের চাপে মেয়েটি ছিটকে গিয়ে আটকে গেছে লিফটের সরু খাঁচায়—ওর এক পা লোহার রেলিং আর দেয়ালের মাঝখানে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে সে অস্ফুটে কাঁদছে। লিফটের মেকানিজমটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটা যেকোনো মুহূর্তে নিচের দিকে ধসে পড়ার উপক্রম। ভাইপারের সেই পাথরের মতো শীতল হৃদয়ে এক মুহূর্তের জন্য সূঁচ ফুঁটল। সে তাকে ফেলে রেখে চলে যেতে পারল না। দ্রুত লিফটের ভাঙা খাঁচায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সে মেয়েটিকে টেনে বের করতে চাইল, কিন্তু লোহার ধারালো ফ্রেমে তার নিজের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটটা আটকে প্রচণ্ড এক টান খেল। কাপড় ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো ভেতরের সুরক্ষাকবচ, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তার বুকের বাঁ পাশটা খোলা পড়ে গেল। মেয়েটিকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের সুরক্ষাকবচই সে আজ তুচ্ছ করে ফেলল, আর এই দেরিটুকুই তার সমস্ত নিখুঁত হিসেব এলোমেলো করে দিল। ওদিকে ব্যাংকের বাইরে সিআইডির ঘেরাও তখন আরও দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে পুলিশের টহলদার গাড়িগুলোর সাইরেন চিরে দিল নিস্তব্ধ রাত। ব্যাংকের গেট ঘিরে সিআইডির ব্যূহ তখন অভেদ্য। ভাইপারের পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে, ধরা পড়ার সব পথ বন্ধ। কিন্তু সিআইডি ভুলে গিয়েছিল—ভাইপারের মস্তিষ্ক ঘড়ির কাঁটার চেয়েও দ্রুত দৌড়ায়।
মেয়েটিকে নিরাপদ জায়গায় নামিয়ে দিয়েই ভাইপারের আঙুলগুলো তার পকেটের স্মোক গ্রেনেডের পিনে গিয়ে ঠেকল। পরক্ষণেই এক তীব্র বিস্ফোরণে ব্যাংকের করিডোরটা ধোঁয়ার বিষাক্ত কুণ্ডলীতে ঢেকে গেল। সিআইডির চোখ যখন ধোঁয়ার আড়ালে দিশেহারা, ঠিক সেই সুযোগে ভাইপার এক অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় দেয়ালের কার্নিশ বেয়ে সীমানা প্রাচীর টপকে রাস্তায় ছিটকে পড়ল।তার শরীরের রক্ত তখন উত্তাল, জ্যাকেটটা ছিঁড়ে শরীরটা কিছুটা অরক্ষিত, কিন্তু তার চোখের সেই শীতল জেদ এক মুহূর্তের জন্যও কমেনি।
ভাইপারের সঙ্গীদের গাড়িগুলো ততক্ষণে অন্ধকারের গহ্বরে মিলিয়ে গেছে। ভাইপার এখন পুরো একা। সে যখন মোড় নিয়ে উল্টো দিকে দৌড় দিল, ঠিক তখনই লিওনার্দোর তীক্ষ্ণ নজরে পড়ে গেল সেই পরিচিত অবয়ব। লিওনের কণ্ঠনালী চিরে এক তর্জনীসম হুংকার বেরিয়ে এল—“থামো বলছি!”
সেই আদেশ শোনার কোনো আগ্রহই নেই ভাইপারের। শুরু হলো এক অসমখেলা—একদিকে রাষ্ট্রশক্তির লৌহকঠিন আইন, অন্যদিকে এক অনিয়ন্ত্রিত ঝড়ের মতো ভাইপার। শহরের ধমনী বেয়ে তারা ছুটল, ঠিক সেই মুহূর্তেই, ভাগ্যবিধাতার খেলায় রাস্তা দিয়ে হালকা গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছিল এক বাইক আরোহী। ভাইপারের চোখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো করুণার অবকাশ নেই; সে চলন্ত অবস্থায়ই তার সর্বশক্তি দিয়ে এক প্রচণ্ড লাথি ছুড়ে দিল বাইকারের বুকে।
ধাতব শব্দে বাইকার যখন রাস্তায় ছিটকে পড়ল, এক পলকের আর্তনাদে সেই মানুষটি রাস্তায় আছড়ে পড়ল ধুলোর ধূসরতায়। ভাইপারের শরীর মুহূর্তের জন্য মহাকর্ষকে উপেক্ষা করে শূন্যে স্থির হলো, এরপরই তার ল্যান্ডিং—সোজা বাইকের সিটে। এক্সিলারেটরের এক হিংস্র মোচড়ে বাইকের ইঞ্জিন গর্জে উঠল, ধোঁয়ার কুন্ডলী আর যান্ত্রিক আস্ফালনে ভাইপার মিলিয়ে গেল আঁধারের অতল গহ্বরে, লিওনার্দোর বিষ্ময়বিমূঢ় চোখের সামনেই।
পেছন থেকে নোভার এসইউভি ধেয়ে আসলো, টায়ারের ঘর্ষণে পিচের ওপর ফুটে উঠল কালো কালশিটে দাগ। লিওন পাশের সিটে বসে পড়লো ঝটপট স্টিয়ারিংয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ল, তার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো রুদ্ধশ্বাসে— “নোভা, পিছু ছাড়বে না! ওকে আজকের রাতে কোনোভাবেই হারানো চলবে না!”
ভাইপারের বাইক তখন শহরের বুকে এক উন্মত্ত প্রমত্ততা। সে যখন এক তীক্ষ্ণ মোড়ে বাইকটি বাঁকালো, তার শরীর মাটির সাথে প্রায় সমান্তরাল। পেছনে ধেয়ে আসছে সিআইডির চারটি গাড়ি। কিন্তু ভাইপার হলো অদৃশ্য তরল স্রোত; শহরের সরু, জীর্ণ অলিগলির গোলকধাঁধায় সে অবলীলায় গলে যাচ্ছে। অলিগলির দেয়ালে প্রতিফলিত হচ্ছে বাইকের হেডলাইটের তীব্র আলো, আর প্রতিবার মোড় ঘোরার সময় চাকার ঘর্ষণে স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে পড়ছে অন্ধকার চিরে।
লিওন ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে দেখছে সেই বিভ্রম। ভাইপারের বাইকটি রাতের নিস্তব্ধতার সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে—অলিগলির ছায়ার মতো সে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। নোভার হাতের কারসাজি আর লিওনের তীব্র লক্ষ্যভেদী দৃষ্টিকেও সে যেন উপহাস করে যাচ্ছে তার চাতুর্যে।
লন্ডনের রাতের ব্যস্ত রাস্তায় সিআইডির গাড়ির সাইরেন আর ভাইপারের বাইকের ইঞ্জিনের গর্জনে এক ভয়াবহ আবহ তৈরি হয়েছে। লিওন তার গাড়ির জানালা দিয়ে পিস্তল উঁচিয়ে ধরল। তার চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি লেজারের মতো ভাইপারের ওপর স্থির। লিওন চিৎকার করে বলে উঠল, “স্টপ! বাইক থামাও! না হলে আমি শুট করতে বাধ্য হব!”
পাশ থেকে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা নোভা আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠল, “স্যার, আপনি কী করছেন? গু/লি করবেন নাকি? সে তো আন্ডারওয়ার্ল্ডের এত বড় একটা ক্লু, তাকে এভাবে মে/রে ফেললে আমরা কোনো তথ্যই পাব না!”
লিওন রাগে গর্জে উঠল, “ওর মতো কুখ্যাত অপরাধীকে বাঁচিয়ে দেশের ক্ষতি করে কোনো লাভ নেই! একের পর এক খু/ন আর ব্যাংক ডাকা/তি—এর চেয়ে ওকে শেষ করে দেওয়া ভালো।”
লিওন আবারও সতর্ক কন্ঠে বলে উঠলো, “শেষবারের মতো বলছি, বাইক থামাও!”
ভাইপারের বাইকের গতি বাতাসের সীমানাকেও চ্যালেঞ্জ করছিল, ঠিক তখনই ঘটলো এক অভাবনীয় মোড়—ভাইপার এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত, তার বুকজুড়ে সেই রক্ষাকবচটি নেই। মেয়েটিকে বাঁচাতে গিয়ে সে যে ঝুঁকি নিয়েছিল, তা আজ তার নিজেরই মৃ/ত্যুর পরোয়ানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লিওনের এসইউভি তখন ভাইপারের বাইকের ঠিক কয়েক গজ সামনে। সে জানে, এই সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবে না। লিওন স্থির করল তার লক্ষ্য, ট্রিগার চাপল অবহেলায়। শব্দের চেয়েও দ্রুত ছুটে গেল সেই তপ্ত সিসা। ভাইপারের কাঁধের নিচে, কলারবোনের ছাপিয়ে আরেকটু নিচে অদূরে সেই আঘাতটি লাগল। একটা জ্বলন্ত আগুনের ফুলকির মতো গুলিটা অন্ধকার ভেদ করে সরাসরি আঘাত করল ভাইপারের কাঁধের নিচে। আরেকটু হলেই হ্রদপিন্ডটা এফড় ওফড় হয়ে যেতো। লিওন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না; তার মনে হয়েছিল, এই প্রচণ্ড গুলির আঘাতে ভাইপার হয়তো কোনো ঝরা পাতার মতো পিচঢালা রাস্তায় আছড়ে পড়বে। তার সেই বাইকটা গিয়ে ধাক্কা খাবে অন্ধকারের কোনো দেয়ালে, আর ভাইপারের সেই উদ্ধত জীবন শেষ হয়ে যাবে এই রাস্তার নোংরা ধুলোয়। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল, তা লিওনের কল্পনার বাইরে। গুলির তীব্র আঘাতে ভাইপারের শরীরটা একবার কুঁকড়ে উঠল, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এক চাপা আর্তনাদ—কিন্তু সে পড়ে গেল না। তার রক্তক্ষরণ হচ্ছে, শার্ট ভিজে কালচে হয়ে আসছে, কিন্তু তার আঙুলগুলো স্টিয়ারিং হ্যান্ডেলটাকে এক চরম শক্তিতে চেপে ধরল। সে কি ব্যথার ওপারে চলে গেছে? নাকি তার ভেতরে এমন কোনো আগুন জ্বলছে, যা মৃ/ত্যুকেও বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে?
হঠাৎ করেই সে বাইকটি ঘুরিয়ে নিল এক ঘন অন্ধকার জঙ্গলের সরু পথ দিয়ে। সিআইডির ভারী এসইউভি সেই সরু এবং কাঁটাঝোপে ভরা পথে প্রবেশ করতে পারল না। গাড়িগুলো থমকে গেল। লিওন গাড়ি থেকে নেমে দৌড়াতে শুরু করল, কিন্তু ভাইপার ততক্ষণে অন্ধকারের আড়ালে অদৃশ্য। লিওন গর্জে উঠে বলল, “নোভা, কুইক! আকাশপথের সাহায্য নাও!”
আধ ঘণ্টার মধ্যে সিআইডির হেলিকপ্টার এসে আকাশ থেকে সার্চলাইট দিয়ে পুরো জঙ্গল তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। হেলিকপ্টারের বিশাল সার্চলাইটের আলোয় গাছগাছালির নিচে কোনো প্রাণের স্পন্দনই ধরা পড়ল না। লিওন পুরো এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজল, কিন্তু কোথাও কোনো পায়ের ছাপ বা বাইকের চিহ্ন নেই। ভাইপার যেন বাতাসের সাথে মিশে গেছে। লিওন হাত মুঠো করে জঙ্গলের মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। ভাইপারের রক্তমাখা চিহ্নটুকু পর্যন্ত সেখানে নেই। সে বুঝতে পারল, এই শিকারি সাধারণ কোনো বনজঙ্গলের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়নি, বরং সে লিওনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক রহস্যময় জগতে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে।
লন্ডনের শহরতলি ছাড়িয়ে অনেক গভীরে, পুরনো এক পরিত্যক্ত ওয়্যারহাউস—যা ভাইপারের অন্যতম গোপন আস্তানা। জঙ্গলের চিপা রাস্তা দিয়ে কোনোমতে বাইক চালিয়ে আসার সময় ভাইপারের শরীর তখন অবসাদ আর রক্তক্ষরণে অবশ হয়ে আসছিল। আস্তানার বিশাল লোহার গেটটা পার হতেই সে বাইক থেকে টলে পড়ে গেল।
আগে থেকেই সতর্ক থাকা ইভানা এবং তার অনুগতরা দ্রুত দৌড়ে এল। ভাইপারের শ্বেতশুভ্র মুখমণ্ডল এখন ফ্যাকাশে, বাম কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে অবিরাম। তাকে দ্রুত ভেতরের অপারেশন টেবিলে নেওয়া হলো। অস্ত্রোপচারের জন্য তখন কোনো অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়ার সময় নেই। ইভানা যখন সার্জিক্যাল কাঁচি আর ফরসেপ দিয়ে সেই তপ্ত গু/লিটি বের করার চেষ্টা করল, যন্ত্রণায় ভাইপারের মুখ দিয়ে এক আকাশভেদী আর্তনাদ বেরিয়ে এল। তার লোহা-কঠিন শরীরটা যন্ত্রণায় ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছিল। ওই শাণিত ফরসেপ যখন হাড়ের নিচ থেকে গুলিটি টেনে বের করল, ভাইপার অস্ফুটে নাম উচ্চারণ করল, “মা…”
কিছুক্ষণ পর আস্তানার দরজায় ভারী বুটের আওয়াজ শোনা গেল। তাদের বস দানিয়েল ঘরে ঢুকল। তার চোখেমুখে কোনো দয়া নেই, আছে কেবল শীতল হিসেব। সে রক্তমাখা টেবিলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “বোকা মেয়ে! একটা ছোট মেয়ের জন্য নিজের জীবন বাজি রাখার মানে কী? অফিসার লিওনার্দো এখন জানে তুমি আহত। সে এবার শিকারি কুকুরের মতো তোমাকে খুঁজবে।”
ভাইপার তখন অচৈতন্যপ্রায়। দানিয়েল তার দিকে একবার তাকিয়েই ঘুরে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে নিস্পৃহ স্বরে নির্দেশ দিল, “ওকে যেভাবে হোক বাঁচাও। কিন্তু ও যদি জ্ঞান ফেরার পর আর আগের মতো কাজ করতে না পারে, তবে সেই ব্যর্থতার মূল্য ওকেই দিতে হবে।”
দানিয়েল চলে যাওয়ার পর পুরো আস্তানা নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। ভাইপারের ধীরগতির হৃদস্পন্দন মনিটরে ‘বিপ… বিপ…’ শব্দে জানান দিচ্ছে সে মৃ/ত্যুর দ্বারপ্রান্তে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আর গু/লির আঘাতে তার শরীর পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সারা রাত পার হয়ে গেল। ভাইপারের জ্ঞান ফিরল না। তাদের পার্সোনাল চিকিৎসকরা জানালো, তার শরীর ‘কোমা’ বা গভীর সংজ্ঞাহীনতার দিকে চলে গেছে। ইভানা তার পাশে বসে কাঁদছে, কিন্তু ভাইপার নিথর। তার কপালে এখনো সেই ঘামের বিন্দু, ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত জেদ।
সিআইডি ল্যাবে তখন ডিজিটাল স্ক্রিনগুলোয় তথ্য ভেসে উঠছে। সেই বাইকটি যার কাছ থেকে ভাইপার ছিনিয়ে নিয়েছিল, সেই হতভাগ্য বাইকারকে খুঁজে বের করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। নোভা বাইকারটিকে জেরা করে দ্রুত লিওনের কাছে রিপোর্ট নিয়ে এলো। “স্যার, বাইকটির মালিকের কাছ থেকে জানা গেছে, ওই বাইকটিতে জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো ছিল, কিন্তু ভাইপার সেটাকে এমনভাবে ড্যামেজ করেছে যে এখন আর সঠিক লোকেশন পাওয়া যাচ্ছে না।”
লিওন জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল, তার মনে এখনো সেই দৃশ্যটা ভাসছে—ভাইপারকে গু/লি করার মুহূর্ত। সে ধীর গলায় বলল, “সে জানে আমরা প্রযুক্তির সাহায্য নেব। সে জিপিএস ড্যামেজ করলেও বাইকটি যে রাস্তায় গেছে, তার সিসিটিভি ফুটেজ তো ড্যামেজ করতে পারেনি!”
ল্যাবের ফরেনসিক বিভাগ থেকে একটি জরুরি ডাক এল। লিওন এবং নোভা সেখানে পৌঁছাতেই ফরেনসিক প্রধান বললেন, “স্যার, ওই রাস্তায় পাওয়া রক্তের নমুনা থেকে আমরা ডিএনএ প্রোফাইলিং করেছি। ফলাফল অস্বাভাবিক! এটি কোনো সাধারণ রক্ত নয়, এতে কিছু বিশেষ রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা সাধারণত কোনো হাই-প্রোফাইল ট্রেনিং বা স্টেরয়েডের সংমিশ্রণ হতে পারে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই ডিএনএ প্রোফাইল আমাদের ডাটাবেজে থাকা কোনো ক্রিমিনালের সাথে মিলছে না।”
নোভা ল্যাপটপে দ্রুত টাইপ করতে করতে বললেন, “স্যার, আমি বাইকের চাকার দাগ বিশ্লেষণ করে একটি থিওরি দাঁড় করিয়েছি। সে বাইকটি নিয়ে সোজাসুজি যায়নি, বরং জঙ্গলের গভীরে এমন এক পথে ঢুকেছে যা সাধারণ মানচিত্রে নেই। এটা নিশ্চিত যে ওই জঙ্গলের কোনো এক গোপন আস্তানায় সে আশ্রয় নিয়েছে।”
লিওন পিস্তলটা হোলস্টারে ভরতে ভরতে গম্ভীর কণ্ঠে বললো, “সে শুধু পালিয়ে যায়নি, সে আহত। নোভা, লন্ডন জুড়ে যতগুলো প্রাইভেট ক্লিনিক এবং আন্ডারগ্রাউন্ড মেডিকেল সেন্টার আছে, সবগুলোতে আমাদের ইনফর্মার পাঠিয়ে দাও। ভাইপারের মতো কেউ এভাবে গু/লি খেয়ে বসে থাকার কথা নয়। সে নিশ্চয়ই কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে।”
বাইরের লন্ডনের আকাশে তখন ঝুম বৃষ্টি। লিওন জানে, ভাইপার এখন মৃ/ত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। কিন্তু তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—আইনের লোক হিসেবে সে চায় অপরাধীকে পাকড়াও করতে, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে সেই গু/লি করার মুহূর্তটি তাকে তাড়া করে ফিরছে।
এদিকে, জঙ্গল ঘেরা সেই পরিত্যক্ত আস্তানায় ভাইপারের মনিটরগুলো তখনো সিগন্যাল দিচ্ছে। ইভানা আতঙ্কিত হয়ে দেখছে, সিআইডি তাদের নেটওয়ার্কের প্রতিটি কোণ দিয়ে তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে।
অফিসার নোভা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল, “স্যার! একটা হিট পাওয়া গেছে! শহরের বাইরে পরিত্যক্ত একটি ওয়্যারহাউস এরিয়ায় গত এক ঘণ্টায় অস্বাভাবিক পাওয়ার কনজাম্পশন রেকর্ড করা হয়েছে। এটা কি কাকতালীয়?”
লিওন মুহূর্তের মধ্যে নিজের জ্যাকেটটা টেনে নিল। তার চোখে এখন সিআইডি অফিসারের সেই কঠোর শীতলতা ফিরে এসেছে। “তৈরি হও সবাই! আজকের রাতটাই হবে চূড়ান্ত। ধরা তাকে পড়তেই হবে!”
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইভানা আর দলের বাকি সদস্যরা ভাইপারকে নিয়ে কৌশলে সেই ওয়্যারহাউস থেকে বেরিয়ে এসেছে নিজেদের টাউনহাউসে ফিরে এসেছে।তাদের আলাদা পার্সোনাল অপারেশন রুম রয়েছে সেই হাউজে। সেখানেই অপারেশন রুমে রাখা হয়েছে ভাইপারকে।
তিনদিন পর……
টাউনহাউসের সেই নিস্তব্ধ অপারেশন রুমে পরিবেশটা হুট করেই ভারী হয়ে উঠল। ভাইপারের জ্ঞান ফেরার খবর পেয়েই দানিয়েল সেখানে হাজির হয়েছে। ইভা এবং মেডিকেল টিম মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, যেন এই মুহূর্তে বসের রাগের ঝাপটা সহ্য করার ক্ষমতা তাদের নেই। দানিয়েল ধীর পায়ে ভাইপারের খাটের পাশে এসে দাঁড়াল। ভাইপারের শ্বেতশুভ্র মুখমণ্ডল, কাঁধের ব্যান্ডেজ আর অক্সিজেন মাস্কের আড়ালে ঢাকা তার শ্বাস-প্রশ্বাস—সবই দানিয়েলের চোখের সামনে। দানিয়েল তার হাতের দস্তানা খুলে ভাইপারের কপালে আলতো করে হাত রাখল, কিন্তু তার চোখের চাহনিতে কোনো কোমলতা নেই, আছে এক গভীর ধিক্কার।
দানিয়েল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে বলল, “তোমার এই মায়াবী আবেগ কবে শেষ হবে, হিয়া?”
‘ভাইপার’ নামটা আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাছে ত্রাস, কিন্তু এই চার দেওয়ালে, এই অন্ধকার আস্তানার অন্দরমহলে দানিয়েল তাকে ‘হিয়া’ বলেই ডাকে মাঝেমাঝে। যখনই দানিয়েল হিয়াকে বিপদে পড়ে আহত অবস্থায় দেখে, অথবা যখন সে বুঝতে পারে হিয়া কোনো আবেগের বশবর্তী হয়ে নিজের কাজ নষ্ট করছে, তখনই সে এই পুরনো নামটা ব্যবহার করে। এটা অনেকটা তিরস্কারের মতো —যেন সে হিয়ার সেই পবিত্র হৃদয়ের অবশিষ্টাংশকে মনে করিয়ে দিয়ে তাকে অপমান করছে।ভাইপার, অর্থাৎ হিয়া, ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। তার চোখের সেই বরফশীতল চাহনি এখন খানিকটা ম্লান, কিন্তু তাতে দানিয়েলের প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট। সে কোনো কথা বলল না, শুধু দানিয়েলের চোখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, আছে এক অবিনশ্বর জেদ। দানিয়েল তার চেয়ারটা টেনে হিয়ার একদম কাছে বসল। তার কণ্ঠস্বর এখন আরও গম্ভীর, আরও তীক্ষ্ণ। “একটা সাধারণ মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে তুমি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিলে। লিওনার্দো হায়াস তোমার শত্রু, তোমার শিকার—সে তোমার ভালোবাসার মানুষ নয়। কিন্তু তুমি যে ভুলটা করলে, তার দাম তোমার এই পুরো সাম্রাজ্যকে দিতে হতে পারে।”
হিয়া অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে খুব কষ্টে খসখসে স্বরে বলল, “আপনি… আপনি ভুল বুঝবেন না, বস। সে আমার শিকার ঠিকই, কিন্তু ….।” কথাটা সম্পুর্ন করতে পারলো না হিয়া তার আগেই দানিয়েল হিয়ার কাঁধের ব্যান্ডেজ করা জায়গায় একবার আঙুল ছোঁয়াল। ব্যথাতে হিয়ার মুখটা কুঁচকে গেল, কিন্তু সে শব্দ করল না। দানিয়েল ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে বলল, “কিন্তু? তোমার এই আবেগের নেশাই তোমাকে একদিন ধ্বংস করবে। আমি তোমাকে বানিয়েছিলাম এক নিখুঁত অস্ত্র হিসেবে, কিন্তু তুমি কি আবারও সেই অসহায় ‘নুজহাত হিয়া’ হয়ে যাচ্ছ? যদি তাই হয়, তবে লিওনার্দো তোমাকে মা/রার আগেই আমি তোমাকে শেষ করে দেব।”
দানিয়েল উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। হিয়া তার দিকে তাকিয়েই রইল। দানিয়েলের দেওয়া এই হুমকিটা তার কাছে নতুন নয়, কিন্তু আজকের এই ‘হিয়া’ সম্বোধনটা তার হৃদয়ের গভীরে এক সুপ্ত ক্ষত তৈরি করে দিয়ে গেল। সে কি সত্যিই আবারও সেই নুজহাত হিয়া হয়ে যাচ্ছে, যে লিওনার্দোর গিটারের সুর শুনে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলো?
দানিয়েল ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই হিয়া একা হয়ে গেল। অন্ধকারের সেই ঘরে শুয়ে সে শুধু ভাবল—দানিয়েল হয়তো ভুল, সে ‘হিয়া’ হয়ে ফিরে আসছে না, সে ‘ভাইপার’ হয়েই লিওনার্দোকে নিজের করে নিতে চায়। সে জানে, এই আঘাতের পর তার লড়াইটা এখন আরও বেশি ব্যক্তিগত, আরও বেশি মরণপণ।
পরের দিন সকাল। টাউনহাউসের জানালা দিয়ে আসা ভোরের আলো ভাইপারের ঘরের সেই অন্ধকার আর ভারী গাম্ভীর্যকে খানিকটা মলিন করেছে। সে এখন আগের চেয়ে কিছুটা সুস্থ, যদিও তার বাম কাঁধের ক্ষতটা এখনো দগদগে।
অপারেশন টেবিলের পাশে ছোট্ট একটি ট্রে-তে রাখা ছিল সেই অভিশপ্ত বুলেটটি, যা সার্জারির সময় ইভা বের করেছিল। ভাইপার ধীরস্থিরভাবে হাত বাড়িয়ে বুলেটটি তুলে নিল। আঙুলের ডগায় বুলেটটির গা স্পর্শ করতেই তার চোখ আটকে গেল সূক্ষ্ম খোদাই করা দুটি অক্ষরে—’LH’*। লিওনার্দো হায়াস। বুলেটটির দিকে তাকিয়ে ভাইপারের ঠোঁটের কোণে রহস্যময়, মায়াবী মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে জানত না লিওন এটা জেনেশুনে করেছে কি না, কিন্তু এই সিসার টুকরোটা তার কাছে এখন কোনো মারণাস্ত্র নয়, বরং এক অদ্ভুত প্রেমের নিদর্শনের মতো মনে হলো। সে হালকা স্বরে আপনমনে বিড়বিড় করল, “পৃথিবীর সবাই তার ভালোবাসার মানুষকে কত কী উপহার দেয়—ফুল, আংটি, প্রেমপত্র। আর তুমি, লিওন? তুমি আমাকে দিলে একটা বুলেট। বেশ তো! সবাই ফুল দেয়, তুমি নাহয় বুলেটই দিলে। আর আমি তোমার দেওয়া এই ভালোবাসার উপহারটি পরম আদরেই গ্রহণ করলাম।”
সে মুহূর্তের মধ্যে তার দলের লোক ডেকে পাঠাল। তার নির্দেশে দক্ষ জহুরির হাতে বুলেটটিকে রুপোর একটি কারুকার্যময় খাঁচায় বন্দি করে একটি সুন্দর লকেট তৈরি করা হলো। ভাইপার নিজেই নিজের হাতে সেই লকেটটি গলায় পরল। ঠান্ডা রুপো আর বুলেটটির স্পর্শ তার বুকের ওপর যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল। এরপর সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কলারবোনের নিচে গভীর ক্ষত, যেখানে এখনো সেলাইয়ের দাগ স্পষ্ট। সেই কাটা দাগের পাশেই সে এক নতুন পণ করল। সে চায় লিওনের স্মৃতিটা তার শরীরের চামড়ায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকুক। কোনো অ্যানেস্থেশিয়া ছাড়াই, হাতে তুলে নিল ট্যাটু মেশিন।
মেশিনের ঘড়ঘড় শব্দে ঘরটা ভরে গেল। সে নিজের ক্ষতবিক্ষত জায়গায় অত্যন্ত নিপুণভাবে খোদাই করে লিখল—’LEON’। সূঁচের প্রতিটি বিঁধে যাওয়া যন্ত্রণাকে সে উপভোগ করল। লিওনের নামে এই ট্যাটুটি তার কাছে কোনো যন্ত্রণার চিহ্ন নয়, বরং এক গর্বের চিহ্ন। সে নিজের শরীরকে উৎসর্গ করল সেই মানুষের নামে, যে আজ তাকে মারার জন্য বদ্ধপরিকর। ট্যাটু করা শেষ হতেই সে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। ক্ষত, বুলেটের লকেট আর লিওনের নাম—সব মিলিয়ে সে এখন এক অদ্ভুত সুন্দর, অথচ ধ্বংসাত্মক নারী হয়ে উঠলো।
ভাইপারের রুমের খোলা বারান্দা দিয়ে আকাশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সে তার পোষা প্রশিক্ষিত ঈগল শ্যাডোকে ডেকে আনল। তার ডানাগুলো শক্তপোক্ত এবং চোখে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ভাইপার একটি ছোট চিরকুট ভাঁজ করে ঈগলের পায়ে আটকে দিলো।
চিরকুটে লেখা—
“এই যে মিস্টার বাজপাখি, গু/লি করার জায়গা পাওনি? আরেকটু হলেই তো বুলেট সোজাসুজি গিয়ে লাগত আমার হার্টে। আর জানো তো, সেখানে কিন্তু তোমারই অস্তিত্বের বিচরণ। নিজের অস্তিত্বকে কেউ কি ধ্বংস করে, দিলবার?”
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩
ভাইপার ঈগলটিকে আকাশের দিকে ছেড়ে দিল। ঈগলটি ডানা ঝাপটে বাতাসের স্রোতে মিশে গেল লিওনার্দোর বাসার দিকে। ভাইপার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে দেখল, তার সেই ‘ভালোবাসার বার্তা’ নিয়ে তার শ্যাডো নিখুঁত লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।
লিওনার্দোর বারান্দায় যখন সেই চিরকুটটি পড়বে, তখন তার চোখেমুখে কী প্রতিক্রিয়া হবে—সেটা ভাবতেই ভাইপারের ঠোঁটে এক মায়াবী বিষণ্ণতার হাসি ফুটে উঠল। খেলাটা এখন আর কেবল দৌড়-পাল্লা নয়, এটা এখন অনুভূতির চরম এক দাবার চাল।
