Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৬

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৬

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৬
সুরভী আক্তার

চেঁচিয়ে লাভ হলো না । বেপরোয়া রুখো ছেলেকে রুখতে অক্ষম হলো একবিংশীর ক্ষিণ শক্তি । রৌদ্র ওকে টেনে হিচড়ে রুমে নিয়ে গিয়ে থামলো । ঘরের ভেতরে দাঁড় করিয়ে হাত চেপে রেখেই আদেশের সুরে বলল শক্ত গলায়…..
” চুল বেঁধে ফেল ফাস্ট ।
” আপনি আসলেই একটা পাগল । পাগলা গারদে যান , পাগলের চিকিৎসা করান গিয়ে । ইরিটেটিং রাইনো মুখো , এখানে কেনো টেনে এনেছেন আমায় ?
” চুল বাঁধতে বলেছি , বেঁধে নে ।
তপ্ত আদেশের বিপরীতে জেদ করে রাগ দেখালো মেঘা….
” বাঁধবো না আমি । কি করবেন ?
ছাড়ুন , এভাবে হুটহাট করে ছোঁবেন না আমায় !
” কেনো ? ফোস্কা পড়ে যায় আমি ছুঁয়ে দিলে ?
” ঘেন্না লাগে !

মেঘার তৎক্ষণাৎ ঘৃণা ভরা উত্তরে দ্রুত ওর হাত ছেড়ে দিলো রৌদ্র , অপেক্ষা করলো না এক মুহুর্ত । রাগ সংবরণ করে ঘাড় ডললো । মাথার পাশে সমর্পণের ভঙ্গিতে ডান হাত উঁচিয়ে বললো দাঁতে দাঁত চেপে….
” যাহ , ছুঁলাম না তোকে এখন । তবে ,, এমন হুটহাট স্পর্শ মানিয়ে নিতে শিখে রাখ । কজ ,, আমার ছোঁয়ায় তোকে সিক্ত হতে হবে সারাটা জীবন ।
এখন যা বলছি , তাই কর । চুল গুলো বাঁধ । এভাবে মোটেও ভালো দেখাচ্ছে না তোকে ।
আই নো তোকে খোলা চুলে মারাত্মক সুন্দর লাগে । তবে সেই মারাত্মক সৌন্দর্য শুধু আমার চোখে পড়ার জন্য । ইউ আর অনলি মাইন । তোর রুপ, সৌন্দর্য সব আমার । আমার জিনিস অন্যের জন্য উপস্থাপিত হবে না । এভাবে কারোর সম্মুখে কোত্থাও যেতে পারবি না তুই । গটইট ? যা , তাড়াতাড়ি গিয়ে চুল বেঁধে আয় ‌। লেইট হয়ে যাচ্ছি আমরা ।
মেঘা নাক ফুলিয়ে শ্বাস টানে ।
রৌদ্রের শক্ত করে মুচড়ে ধরা নিজের হাতটায় হাত বোলায় অপর হাতে । রৌদ্র ওকে চুপ দেখে আবার বলে….

” কি হলো , যেতে বলেছি তো । যা…
” যাবো না ।
” ইভারা , রাগাস না আমায় । নয়তো থাপ্পর পড়বে গালে ।
যদি বিয়েতে যেতে চাস , তাহলে চুল বেঁধে হিজাব পড়ে তবেই যাবি । এভাবে খোলামেলা হয়ে , সেজেগুজে নয় । কাকে দেখাবি এতো সাজ ?
” কোথায় সেজেছি আমি ?
” যা সেজেছিস , তাতেই জ্বলে যাচ্ছিস পুরো । ট্রাস্ট মি , চোখ ঝলসে যাচ্ছে আমার । আর নিচে ঐ ছেলেগুলো , ওদের সামনে কেনো গেছিলি তখন হ্যাঁ ? ওদের ব্যাড কমেন্ট শুনতে গেছিলি , ইডিয়ট ?
” আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই গেছি , আপনার প্রবলেম কি ? ওরা ব্যাড কমেন্ট করলে আমায় নিয়ে করেছে । আপনার কি তাতে ?
বারংবার মেঘার জেদি আচরণে বিরক্ত হয় রৌদ্র । এই মেয়ে চোখে চোখ রেখে ঠাস ঠাস করে কথা বলার সামর্থ্য রাখে বেশ । টাইম লস ব্যাতীত কিছুই হচ্ছে না এখানে । এতক্ষণে বাকিসব গাড়ি বেরিয়ে গেছে হয়তো । বাড়িতে এরা দুটো ব্যাতীত আর কেউ নেই । এতক্ষণের কোলকাক, হৈ হৈ স্তব্ধ হয়ে গেছে ।
রৌদ্র আর সহ্য করলো না । মেঘার হাত চেপে ধরলো আবার । টেনে কাবাডের দিকে এগোলো । কাবাড ঘেঁটে টুকটুকির একটা হিজাব খুঁজে পেলো সে । সেটাকে অন্য হাতে চেপে ধরে মেঘা কে আবারো টেনে এনে দাঁড় করালো ড্রেসিং টেবিলের সামনে । কাঠ স্বরে আদেশ করলো…

” হিজাব জড়িয়ে নে মাথায় ,
মেঘার সেই অবিরত তেজি স্বর….
” পারবো না । এভাবেই যাবো আমি । ছাড়ুন আমায়….
এ বেলায় রাগে হাত মুঠিয়ে আসে রৌদ্রের । চোখ রক্তিম সেই আগে থেকেই । এসিতেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালের ধারে । মেঘার হাত ছেড়ে নিজের চুল খামচে ধরলো সে । রাগ সংবরণ করলো সেভাবেই । এক মুহুর্ত কিছু একটা ভেবে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে সব মেয়েলি জিনিসপত্র হাতে জড়িয়ে ছিটিয়ে ফেললো মেঝেতে । ঝরঝরিয়ে সব মেঝেতে পড়তেই চমকালো মেঘা ‌। রৌদ্র মুহুর্ত অতিক্রম না করে দুহাতে মেঘার কোমর জড়িয়ে নিয়ে ওকে শূন্যে ভাসিয়ে সামনাসামনি তুলে বসালো ড্রেসিং টেবিলের উপর । মেঘা কিছু বলার আগেই আঙুল তুলে বললো কন্ঠ চিপে..

” শাট আপ ইডিয়ট , কিচ্ছু বলার চেষ্টাও করবি না । নয়তো আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না বলে রাখলাম । যদি থাপ্পর খেতে না চাস,, তাহলে স্থির হয়ে বসে থাকবি এখানটায় । নয়তো থাপ্পর খাবি আমার হাতে…
পরে ঘ্যান ঘ্যান কাঁদবি না তখন ।
বলেই মেঘার দিকে ঝুঁকে আসে । মাঝখানে একটু দূরত্ব রেখে চুলের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় ওর । খোলা রেশম কোমল কেশদ্বয়ের ভাঁজে হাত পড়তেই ঝিমিয়ে আসে ক্ষুব্ধতা । জেঁকে ওঠে সুপ্তনাভুতি । ঝট করে মেঘার পানে তাকাতেই চোখাচোখি হয় । মূর্ত বনে গেছে মেয়েটা । সেকেন্ড কয়েক বাদ চোখ সরিয়ে আরেকটু ঝুঁকে যায় রৌদ্র । মেঘার বাম উরুর পাশে ড্রেসিং টেবিলে হাত ঠেসে মেঘাকে নিজের মাঝে আবদ্ধ করে নেয় প্রথমে । ঝুঁকে কাঁধ গলিয়ে চুলগাছি ডান পাশ করে নিমিষেই নাক ডুবিয়ে দেয় চুলের ভাঁজে । মিষ্টি মাদকিয় ঘ্রাণে বুজে আসে রক্তিম দু’চোখ । মেঘের মতো ছড়ানো সেই ঘন কৃষ্ণকেশের ঘ্রাণ পেতেই ক্ষুব্ধতা পরিনত হয় পরম শান্তির রেশে ।
নিজেকে সংযত করতে না পেরে খেয়ালের বশে গভীরে নাক ডুবিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস টানে রৌদ্র ।
দূরত্ব কমিয়ে রৌদ্রের অতি সন্নিকটে আসা মাত্রই কম্পিত হয় একবিংশীর কোমল কায়া । লোকটার গরম শ্বাসের সাথে খোঁচা দাড়ি খানিক বিদ্ধ হয় রমনীর কোমল গ্রীবার ধারে । শ্বাস রুখে চোখ বুজে নেয় মেঘা । বন্ধ চোখের কোণে দেখা দেয় অবাধ্য চিকচিকে জল কনা ।
হাত ঔদ্ধত্য করে রৌদ্র কে ঠেলে সরিয়ে দিতে । লোকটার পেটের কাছে হাত রেখে আলতো ধাক্কা দেয় শক্তি জুগিয়ে । তবে এক ইঞ্চি ও সরাতে পারে না । বরং হিসহিসিয়ে ওঠে রৌদ্র….

” ইউ নো সুইটহার্ট , ইউর হেয়ার স্মেল ইজ সো এট্রাক্টিভ । কি মাখিস বলতো চুলে ?
এক মুহুর্ত পর সে নিজেই সরে আসে । ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করে । দ্বিতীয় বার তাকায় না মেঘার দিকে । মেয়েটার চুলগুলো নিজ হাতে গুছিয়ে কোনো রকমে পেঁচিয়ে একটা কাঁটা দিয়ে আটকে দেয় । হিজাব টা নিয়ে পেঁচিয়ে দেয় মাথায় । খুঁজে খুঁজে পিন বের করে হিজাবের একেক কিনারায় আটকে দেয় কোনো রকমে । যাতে পরবর্তীতে খুলে না যায় । খুব পারদর্শী না হলেও বেশ সুন্দর করে প্রথম চেষ্টাতেই হিজাব টা বেঁধে দিতে সক্ষম হলো রৌদ্র‌ ।
শেষ হতেই বুক ফুলিয়ে দীর্ঘ হাঁফ টানলো । এক কদম পিছিয়ে কোমরের ধারে হাত ঠেসে সম্পুর্ন দৃষ্টিতে পুরোপুরি অবলোকন করলো মেঘা কে । মেয়েটাকে হিজাব পেঁচিয়ে অন্যরকম সুন্দর লাগছে । চোখে ধরছে এটাও । তর্জনীর দ্বারা চোয়াল চুলকে শব্দহীনা মৃদু হাসে রৌদ্র । তাকায় মেঘার চোখের দিকে ‌। রমনীর দুচোখ ঘোলাটে । কার্নিশে চিক চিক করছে জল কনা । ক্ষণে ক্ষণে ফেঁপে উঠছে নাকের পাটা । নাকের ডগা সহ দু গাল লালচে ।
চোখ হতে এক্ষুনি যেন পানি গড়াবে টুপ করে । একাধারে সেই তখন থেকে চেয়ে আছে রৌদ্রের দিকে ‌। চোখে পানি দেখেও ভ্রুক্ষেপ প্রকাশ করলো না রৌদ্র ।

ওষ্ঠ জোড়ার দিকে দৃষ্টি পড়লো এবার । টকটকে গাঢ় লিপস্টিক ঠোঁট জোড়াকে ফুটিয়ে তুলেছে ‌। রৌদ্র এক ঝটকায় এগিয়ে যায় । গতি কমিয়ে রয়ে সয়ে মেয়েটার কাছাকাছি হেলে দাঁড়ায় । ডান হাত উঠিয়ে আলগোছে রাখে মেয়েটার বাম চোয়ালে । সুপ্ত অনুভূতিতে এবারও আর চোখ খুলে রাখতে পারে না মেঘা , বুজে আসে অবলীলায় । রৌদ্র তা দেখে হাসে মৃদুমন্দ ‌। বৃদ্ধা আঙ্গুল ওষ্ঠাধরের নিকট নিয়ে আলতো করে স্লাইড করে, সেদিক পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই ঢোক গেলে শুল্ক ,, ফিসফিসিয়ে বলে অনুমতি নেওয়ার স্বরে….
” লিপস্টিক উঠিয়ে দেই সানি ? লিপস্টিক থাকলে লোকের দৃষ্টি পড়বে তোর ঠোঁটের দিকে । আমি চাই না কারোর দৃষ্টি আমার প্রপার্টির দিকে পড়ুক । ইউ মাই ট্রেজার , অর ইউর লিপস অলসো মাই এক্সক্লুসিভ ট্রেজার…
এ পর্যায়ে শাড়ি খামচে ওষ্ঠ উল্টায় মেঘা ‌। ফোঁপানোর শব্দ ভেসে আসে কানে ‌। ঝট করে ওষ্ঠ থেকে চোখ তুলে রমনীর মুখপানে তাকায় রৌদ্র । মেঘার বাম গাল বেয়ে বন্ধ চোখ ছাপিয়ে পানি গড়াচ্ছে এক ফোঁটা । আঁখি দ্বয়ের দীঘল পাপড়ি যুগল আধো ভেজা । পরপর আবার ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা ।
সহসা হাত সরায় রৌদ্র । বাড়িয়ে ফেলে দূরত্ব । চাপা স্বরে বলে কান্নার হেতু আন্দাজ করে…..

” ইডিয়ট , কাঁদবি না একদম ।
পরক্ষনে দম টেনে আবার বলে ঘাড় ডলে…..
” সিরিয়াসলি ঘৃণা করিস আমায় ?
এবেলায় কন্ঠ স্বরের ধাচ আন্দাজ করা যায় না । কেমন করুন শোনালো প্রশ্নটা । ভেজা চোখ জোড়া মেললো মেঘা । চাইলো ওষ্ঠপূটে দাঁত চেপে কান্না রোধের চেষ্টা করে । ভেজা চোখ মুছলো হাতের উল্টো পিঠে । উত্তরের চেষ্টা না করে লাফিয়ে নামলো বসা হতে । চোখ মুছতে মুছতে প্রস্থানের জন্য ছোটার উদ্দেশ্য পা বাড়াতে গেলে রৌদ্র আকস্মিক বললো একই স্বরে….
” আর থাকছি না আমি । কাল যাচ্ছি ফিরে । এই এক রাত টুকুই থাকবো শুধু । কাল রাত হতে হতে আমি পগারপার । দেশের গন্ডির বাইরে চলে যাবো একদম । তোর থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে চলে যাবো । ঘৃণা টুকু গচ্ছিত রাখবি , যদি ফের দেখা হয় । তাহলে যেন এভাবেই কাঁদতে পারিস আমায় দেখে, আমার স্পর্শে । সে কান্না ঘৃণার হোক , বা অন্য কিছুর । এর পরবর্তী সাক্ষাতেও তোর চোখে পানি দেখতে চাই আমি । যদি না দেখি ‌, তাহলে থাপ্পর মেরে কাঁদাবো বলে রাখলাম ।
বাড়িতে কেউ নেই । সবাই মেঘা কে ফেলে রেখে চলে গেছে । কেউ দ্বিতীয় বার আর খোঁজ করলো না ওর ‌। নিচে নেমে কাউকেই খুঁজে পায় নি মেঘা । পুরো বাড়ি ফাঁকা । কান্না গিলে পানি খেয়ে গলা ভিজিয়েছে মেয়েটা । যত শক্ত হতে চায় লোকটার সামনে , লোকটার অবাধ্য চাহনি আর স্পর্শের বিচরণে বারংবার মিইয়ে যায় শক্ত খোলস ধারি হৃদয় ।

মেঘা এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে চুপটি করে উঠে বসেছে গাড়িতে ।
এদিকে রৌদ্র ওকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান । ঘর হতে আগে বেরিয়েছে সেই মেয়ে ।
পুরো বাড়িতে ঐ মেয়েকে খোঁজা শেষ ইতোমধ্যে । রৌদ্র পেলো না । ছাদেও দেখেছে । না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে বেপরোয়া হৃদয় । কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এক মুহুর্তেই কোথায় উধাও হয়ে গেলো ঐ মেয়ে ?
ছটফট করে খুঁজতে খুঁজতে বাইরে বেরোলো রৌদ্র । সদর বরাবর গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা । ফ্রন্ট সিটে জানালার পাশে মেঘা বসে আছে । রৌদ্র ওকে এক ঝলক দেখা মাত্রই প্রাণ ফিরে পেলো । দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । সময় নষ্ট করলো না আর । দ্রুত উঠে পড়লো গাড়িতে ।
স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট করতে করতে বাঁকা চোখে চেয়ে নমনীয় স্বরে বলল আচমকা….
” সিট বেল্ট বেঁধে নাও ।

মেঘা অনড় , শুনলো না কথা । বাঁধলো না সিটবেল্ট । রৌদ্র ও এবার আর জোর খাটালো না ।
ওরা বিয়ে বাড়ি পৌঁছেছে বিয়ে পড়ানো শেষ হওয়ার পর । মোটামুটি মাঝপথে সবকিছু । মেঘা গাড়ি থেকে নেমে সোজা গার্ডেনের দিকে এগিয়েছে । পথিমধ্যে কথা তো দূর , আড়চোখে ও তাকায় নি রৌদ্রের পানে । সায়ান দের বাড়ির গার্ডেনে বিয়ের ভেন্যু সাজানো হয়েছে । উপচে পড়া ভিড় পুরো জায়গায় ।
মেঘা কোনো রকমে ভিড় ঠেলে স্টেজের দিকে এগোলো । পাশাপাশি শুভ্র আর মেহের বসে আছে । লাল টুকটুকে রাঙা শাড়িতে রাঙা বউ রুপে সেজেছে মেহের । মেয়েটা একেই স্নিগ্ধ কোমল সৌন্দর্যের অধিকারিণী , দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায় । তার উপর বিয়ের ভারী সাজে পুরো চোখ ধাঁধানো সুন্দর লাগছে আজ ওকে । দূর হতে চিকচিক করে জ্বলছে ভীষণ । পাশাপাশি বেশ মানিয়েছে দু’টোকেই । মেহেরের ডান পাশে শুভ্র , আর বাম পাশে শাফাহ্ বসে । সামনে ক্যামেরা ম্যান ছবি তুলছে হয়তো । মেঘা এতক্ষণে মুচকি হাসলো । মন খারাপ ঠেলে সরালো অদূরে । ভরা গালে হাসি ফুটিয়ে তড়িঘড়ি করে এগোলো ওদিকে !
স্টেজের পাশ থেকে সিরাত ডাকলো এমত সময়…
এগিয়ে এসে বলল…

” মেঘা , এতক্ষণ কোথায় ছিলি ? এসেছি থেকে খুঁজছি তোকে ! কোন গাড়িতে এসেছিস তুই ?
” না , আপু । আমি তো কেবলই…
বলতে বলতে কথা ঘোরালো….
” এখানেই ছিলাম আপু ।
সিরাত চোখ সরু করে তাকায় । শুধোয়….
” হিজাব পড়লি কখন ? সাজগোজ সব ঘেঁটে ফেলেছিস দেখছি । তোকে কত সুন্দর করে সাজালাম আমি । যদিও এভাবে আরো বেশি সুন্দর লাগছে । এখন যা , শুভ্র বারবার তোর খোঁজ করছিলো ।
মেঘা স্টেজে উঠলো । বসলো শুভ্রের অপর পাশে । মেহের বোধহয় কেঁদেছে খানিক আগে । দেখেই বোঝা যাচ্ছে । ওর সাথে টুকটাক কথা বললো মেঘা । তুললো অগনিত ছবি । বিয়ে পড়ানোর পর মেহের এখন পুরোপুরি কাবির পরিবারের সদস্য । পুরো কাবির পরিবার মিলে একটা ফ্যামিলি ফটো তোলা হবে ফ্রেমে বাঁধানোর জন্য । সেই মোতাবেক আদ্র সবাইকে টেনে জড়ো করলো স্টেজের উপর । শুভ্র আর মেহের কে কেন্দ্র করে দাঁড়ালো সকলে । ওরা দুজন বসে , বাড়ির দুই কর্তা আর গিন্নি’দের ছেলে বউমার দু’পাশে জোড় বেঁধে বসানো হলো । বাকিরা সবাই পেছনে দাঁড়ালো সারিবদ্ধভাবে । সিরাত,আহিয়ান , ওদের দুজনের কোলে মাঝামাঝি রামিশা । মেঘা কে ওদের সাথে টেনে নিয়েছে আদ্র । এই মেয়ে বলে, সে নাকি এ পরিবারের সদস্য নয় । তবে ওর কথায় কেউ তোয়াক্কা করলে তবেই তো ! সবাই ফ্রেমে যুক্ত হলেও বাদ পড়েছে রৌদ্র । আদ্র ওকে আশপাশ খুঁজে পেলো না । অবশেষে নিজেই আসলো সে । আদ্র এগিয়ে গিয়ে বললো…

” রুডি , ফ্যামিলি ফটো তুলবো । চলে আয় !
না তাকিয়ে কাঠ জবাব রৌদ্রের….
” তোদের ফ্যামিলি থেকে আমার অস্তিত্ব পাঁচ বছর আগেই মুছে গেছে । আমি মৃত , কাবির পরিবারের ছোট ছেলে মৃত । মৃতদের ফটো তোলা হয়েছিলো কবে ?
আদ্র ওকে নিজে থেকে জোর করলো না আর । সে গিয়ে ইচ্ছাকৃত দাঁড়ালো মেঘার পাশে ।
কোথা থেকে সায়ান ছুটে আসলো এ পর্যায়ে ,
” ও হ্যালো , আমাকে ছাড়া ফ্যামিলি ফটো তোলা হচ্ছে । আমি কি এ বাড়ির সদস্য নই । আমাকে নেওয়া হবে না এই ফ্রেমে ?

হাসলেন সকলে । সায়ান এ বাড়ির সদস্যদের থেকে কম কিছু নয় । আহ্লাদ করে ছলবলে সে দাঁড়ালো শাফাহ্’র পাশে । ক্যামেরা ম্যান কে ইশারা করলো ছবি তোলার জন্য । ক্লিক করার আগেই বাঁধা পড়লো । আকস্মিক স্টেজে উঠে হামলে পড়লো রৌদ্র । আদ্র কে এক মুহুর্তের জন্য মেঘার পাশে সহ্য করতে বড্ড নারাজ তার বেপরোয়া হিংসাত্মক হৃদয় । চোয়াল শক্ত করে মেঘা কে হেঁচকা টানে আদ্রের থেকে দূরে সরালো সে । মুহুর্তেই ফাঁক পেয়ে দাঁড়ালো দুজনার মাঝে । আদ্র কে নিজের ডান পাশে উপেক্ষায় রেখে মেঘা কে দাঁড় করালো বাম পাশে । নিজে চিপকে দাঁড়ালো মেঘার পাশে ‌। ফিক করে হাসলো আদ্র । মেঘা তাকালো ক্ষুব্ধ হয়ে । ক্যামেরা ফোকাসে আছে দেখে বাড়াবাড়ি করলো না কেউ । আবার সামনে তাকালো সকলে । ক্যামেরা ম্যান প্রথম ক্লিক করার আগেই রৌদ্র আলতো করে নিজের হাতটা বাড়িয়ে রাখলো মেঘার পাতলা কোমরের নিকট । সহসা ছলকে কম্পিত হয়ে রৌদ্রের দিকে দৃষ্টি তুললো মেঘা । রৌদ্র ও তাই । সেও একস্থির হয়ে মেঘার দিকে দৃষ্টি নামালো । দুজনার কিয়ৎ কালের চোখাচোখির মাঝে ক্যামেরা বন্দি হলো কয়েকটা ছবি । পুরো পরিবার আবদ্ধ হলো এক ফ্রেমে ।
খাওয়া দাওয়ার পালা মোটামুটি শেষ । মেহেরের বিদায় হবে ক্ষণিকের মধ্যে । এখন থেকেই কেঁদে কেটে হয়রান নমনীয় মেয়েটা ‌। বারবার নাক টেনে ফুঁপিয়ে উঠছে ‌। চোখ মুছে নিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে । এখনো বর বউ দুজনায় পাশাপাশি বসে । শাফাহ্ আর মেঘা মিলে কোথা থেকে একটা বড় সড় গোল মিরর নিয়ে আসলো । মিররের ধার ঘেঁষে কাঁচা ফুল ডিজাইন করা । মেহের আর শুভ্রর মাথার উপর দিয়ে পাতলা ওরনা ধরা হলো দুজনকে ঢেকে ফেলে । মেঘা আর শাফাহ্ দুজনায় বসলো ওদের দুটোর সামন বরাবর পায়ের কাছে । প্রথমেই মিররটা শুভ্রর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো । দর্পন বাঁকা করে মেহেরের মুখশ্রী প্রতিবিম্বে ভাসিয়ে শুভ্র কে জিজ্ঞেস করল মেঘা..

” আচ্ছা ভাইয়া, বলোতো আয়নাতে কাকে দেখতে পারছো ? কাকে দেখা যায় আয়নাতে ?
আয়নাতে গাঢ় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো শুভ্র । মেহেরের আধো ভেজা চোখ জোড়া সমেত মেয়েটার পুরো নাজুক চেহারা মন ভরে খুঁটিয়ে দেখলো এতক্ষণে । এতোটা সময় ধরে এতো মানুষের ভিড়ে জড়তায় পুরোপুরি দৃষ্টিতে ঠিকভাবে তাকতে অবধি পারে নি মেয়েটার দিকে । মন ভরে দেখা শেষে হাঁফ ছাড়ল নিঃশব্দে । মৃদু হাসলো , মেঘার প্রশ্নের উত্তর করলো গা ছাড়া ভাবে….
” একটা গাধা কে দেখতে পাচ্ছি ।
অমনি ওষ্ঠ উল্টায় মেহের । কাঁদো কাঁদো মুখখানা চুপসে যায় আরো । এই লোক সবসময় ওকে গাধা বলে , তাই বলে এখনো বলবে ? একেই কান্না পাচ্ছে ওর । তার উপর এতো গুলো মানুষের সামনে ওকে আরো বেশি লজ্জিত করছে শুভ্র ।
শুভ্রর রসিকতা বুঝে সবাই ফিকে হাসলো । শাফাহ্ ঝেড়ে বললো….

” ভাইয়া , একদম ভুল ভাল তকমা দেবে না আমার ভাবিকে । বি সিরিয়াস , বলো কি কি দেখতে পাচ্ছো মিররে ?
শুভ্র চোখ সরু করে বলা শুরু করলো….
” একটা গাধার বাম চোখের কার্নিশে এক ফোঁটা পানি চিকচিক করছে , আর ডান চোখের কার্নিশের পানি মুছতে গিয়ে কাজল ঘেঁটে ফেলেছে সেই গাধা টা । মাথার টিকলি উল্টে গেছে , সেটাও ঠিক করছে না সেই বেখেয়ালি গাধা । মাথার ঘোমটা পিছিয়ে গেছে একটু । আপাতত এসবই দেখতে পারছি । আর হ্যাঁ , সেই গাধা টা এখন আমার দিকেই ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে …
এবার আশপাশ থেকে সশব্দে হাসির শব্দ শোনা গেলো । শুভ্র কথা শেষ করেই ঠোঁট কামড়ে হেসে উঠলো খানিক । পাশ ফিরে মেহেরের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো । বললো…
” কি রে , ঠিক বললাম তো ? গাধা !!
সায়ান শুভ্রের বাহুতে আলতো আঘাত করে বলে….
” আমার বোনকে গাধা বলার দুঃসাহস কে দিয়েছে তোকে ? ঠিকঠাক কমপ্লিমেন্ট দে । কেমন লাগছে আমার বোনকে ?
শুভ্র সিরিয়াস হয় এবার । আবার তাকায় আয়নার দিকে । ততক্ষণে মেহের চোখ নামিয়ে নিয়েছে । এবার এই লজ্জা বতীকে দেখে মৃদু স্বরে বলে…
” সুন্দরের প্রশংসা করতে নেই । যেই শব্দেই প্রশংসা করা হোক না কেনো , সুন্দরের সৌন্দর্য তুলে ধরে বর্ননায় বোঝানো যায় না কাউকে । তোর বোনকে কেমন লাগছে সেটা এক বাক্যে বা হাজার বাক্যেও বোঝাতে অক্ষম আমি । তবে এক বাক্যই শুনে রাখ , তোর বোনকে আজ আমার বউ রুপে দেখে মন ভরে গেছে আমার । অন্য কিছু অনুভব করছি , যার অনুভূতি আমি নিজেও ঠাহর করতে পারছি না । সবশেষে তোর বোন কে আজ আমার আমার লাগছে ।

বিয়ে বিদায়ের পালা চুকিয়ে কাবির ম্যানসনে ফিরতে ফিরতে রাত্রি এগারোটা পেরিয়েছে ।
এখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় বারোটার ঘর পেরিয়ে একটার ঘর ছুঁই ছুঁই করছে । বাড়তি সব ঝামেলা মিটিয়ে শুভ্র কে এতক্ষণে পাঠানো হলো উপরে । বাকিদের দেখা নেই । শুভ্রর ঘরের সামনে সবাই ওঁত পেতে অপেক্ষা করছে , তা ওর অজানা নয় । ধীর পায়ে একা একাই উপরে উঠলো সে । ওকে আজ সঙ্গ দেওয়ার কেউ নেই । যা ভেবেছিলো তাই । ওর ঘরের বাইরে সাত মাথা এক হয়েছে । মেঘা , শাফাহ্, আদ্র,সিরাত, আহিয়ান, সাবা আর পিচ্চি আয়াজ । দরজা আটকে ঘরের বাইরে সাত মাথা এক করে ফন্দি ফিকির আটছে ওরা । শুভ্র শ্বাস টানলো । বুক ফুলিয়ে ঘাড় উঁচালো । গম্ভীর ভাব টেনে দৃঢ় পায়ে এগোলো । ওকে দেখা মাত্রই স্বাভাবিক হলো সপ্ত পান্ডব । একসাথে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে সকলে গলা খাঁকারি দিলো । ঠোঁট কামড়ে চেপে নিলো হাসি । শুভ্র গলা ভার করে বললো ওদের আগে…..

” আমার ঘরের সামনে কি চাই তোদের ?
শাফাহ্ সামনে হাত পেতে স্বভাব সুলভ উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে বললো সহসা…..
” পঞ্চাশ লাখ টাকা !
বৃহৎ নয়নে তাকায় শুভ্র….
” কি ? শুনি নি ….
” পঞ্চাশ লাখ টাকা । টাকা দাও ঘরে যাও ।
” মামার বাড়ির আবদার পেয়েছিস , কিসের টাকা দেবো তোদের ?
আদ্র মুখ খুললো….
” তোমার ঘর সাজিয়েছি,তার টাকা ।
” আমার ঘর সাজিয়েছিস তো আমার কি ? আমি তোদের সাজাতে বলেছি ?
মেঘা ঘুমে টলছে । এতক্ষণে ঘুমে কাদা হয় রোজ । আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে । হাই তুলে বললো সে….
” ভাইয়া , সময় নষ্ট করো না তো । এতে তোমারই লস । যা চাইছি দিয়ে দাও ।
শুভ্র গলা খাঁকারি দেয় । সিরাত তাল মেলায়….
” একদম । শুভ্র ভাইয়া , টাকা দিয়ে দাও ।
বড় বোনের মুখে ভাইয়া ডাক শুনে ফ্যাল ফ্যাল তাকায় শুভ্র….
” আপু তুমিও ? তুমি না আমার বড় !
” সো হোয়াট ! সবচেয়ে বড় মানি ? মানি যেদিকে আসবে , আমি আজ সেদিকে ! তাড়াতাড়ি টাকা দিয়ে দে তো । দেরি হয়ে যাচ্ছে । অপেক্ষা করছে তোর বউ ।
শুভ্র লজ্জা পায় । লজ্জা লজ্জা লাগে কেমন ।
আদ্র শাফাহ্’র কাঁধে কনুই ঠেসে হাত বাড়িয়ে বলে…..
” ভাইয়া , বেস্ট অফ লাক । বাট তার আগে ফেলো কড়ি মাখো তেল ।
” টাকা রুমে আছে , দরজা খুলে দে , এনে দিচ্ছি ।
” এহহ্ , তা তো হবে না । আগে টাকা,পরে এন্ট্রি ।
বোনের কথায় গলা ভার করে শুভ্র….

” আমাকে ঝাড়লেও দু পয়সা পাবি না । রুমে না গেলে টাকা দেবো কি করে ? ডোর খুলে দে , আমি রুমে গিয়ে টাকা নিয়ে আসছি । পালিয়ে যাচ্ছি না কোথাও । এ বাড়িতেই থাকবো ….
ইনোসেন্ট হয়ে ওর কথায় ভুললো সকলে ।
শুভ্র বরাবর স্পষ্টভাষী । যা বলে তাই করে । আর ভাই বোনদের ঠকাবে না নিশ্চয়ই !
দরজার সামন থেকে সরে গিয়ে দরজা খুলে দিলো আদ্র । শুভ্র ফিচেল হাসলো , দ্রুত ঢুকলো ঘরের ভিতর । পিছু ফিরে সকলের ভোলাভালা মুখপানে তাকালো একবার ।
শাফাহ্ মিনমিন করে বললো….

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৫ (২)

” তাড়াতাড়ি টাকা নিয়ে এসো ভাইয়া , আমি আমার ভাগের টাকা দিয়ে চকলেট কিনে খাবো ।
শুভ্র বাঁকা হাসি প্রগাঢ় করে । তৎক্ষণাৎ বলে….
” বেশি চকলেট খেতে নেই বনু , দাঁতে পোকা ধরবে । এন্ড থ্যাংক ইউ , আমার ঘরটা এতো সুন্দর করে সাজানোর জন্য ‌। এভরিঅন , উইস মি বেস্ট অফ লাক । গুড নাইট….
কথা শেষ করেই সপ্ত পান্ডবের মুখের উপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো শুভ্র ‌। চমকানোর অভিব্যক্তি প্রকাশ করার আগেই বিরাট ঝটকা খেলো সকলে । হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here