স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৭
সানজিদা আক্তার মুন্নী
ভোরের আলো এখনও পুরোপুরি ফোটেনি। জানালার শার্সি বেয়ে নেমে আসছে রাতভর ঝরা বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো। টুপ, টুপ, টুপটাপ করে। আজকের আকাশটাও সারারাত কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে গেছে, এখন শুধু শেষ কয়েকটা অশ্রু ঝরিয়ে দিচ্ছে এই বাড়িটার বুকে। ঘরের ভেতরটা আবছা, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে ভারী হয়ে আছে। আর সেই গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে এক অজানা আতঙ্কের নিঃশ্বাস। নাজহা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়।
চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে আছে মনে হচ্ছে কেউ গলিত সীসা ঢেলে দিয়েছে তার চোখের পাতায়। তার আবছা দৃষ্টির সামনে প্রথমেই ভেসে ওঠে একটা মুখ। তৌসিরের মুখ। ঠিক তার মাথার কাছটায় বসে আছে তৌসির। চুল এলোমেলো, চোখ লাল, কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ, মনে হচ্ছে সারারাত একফোঁটাও ঘুমায়নি। ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া উদ্বেগের ছাপ, আর চোখের নিচে গাঢ় হয়ে আসা কালি বলে দিচ্ছে, ভেতরে ভেতরে কতটা ঝড় বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে।
নাজহার বুকটা ধক করে ওঠে ওর ভেতরটা কেঁপে যায় অজানা এক ভয়ে। যে ভয়ের কোনো নাম নেই, কোনো আকার নেই। শুধু আছে এক হিম শীতল অনুভূতি, যা শিরা বেয়ে নেমে যায় পায়ের আঙুল পর্যন্ত। নিজের ভেজা চুলে হাত পড়তেই আঁতকে ওঠে সে। ভেজা কেন? কীভাবে? আঙুলগুলো অবিশ্বাসে কাঁপতে থাকে নিজের চুলের ওপর, ওর তো মনে হতে থাকে এই চুল তার নিজের নয়, অন্য কারও। ধড়ফড় করে উঠে বসতে যায় সে।
তৌসির দ্রুত তার বাহু ধরে সামলে নেয়। আস্তে করে উঠতে সাহায্য করে। নাজহা অবলার মতো চারদিকে তাকায়। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বিবিজান। উনার চোখ দুটো রাগে জ্বলছে, যেন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা চুলোর ভেতর থেকে ছিটকে আসা আগুনের ফুলকি। ঠোঁট চেপে ধরা, উনার নাকের পাটা ফুলে উঠছে নিঃশ্বাসের তালে তালে। বাইরে এখন ফজরের আযান ভেসে আসছে। “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম”।ভোরের বাতাসে মিশে গিয়ে সেই সুর কাঁপিয়ে দিচ্ছে গোটা বাড়িটাকে। আসলে গতরাতে নাজহা যা যা দেখেছিল, সবই ছিল তার ভ্রম। নিছকই ভ্রম। মানসিক চাপে তার অবস্থা এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে যে ভ্রম দেখতে দেখতে সে সত্যি সত্যিই বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। নেমে গিয়েছিল পুকুরের ঠান্ডা জলে। মনে হয়েছিল তার কেউ তাকে ডাকছিল সেই জলের গভীর থেকে।
একটা চেনা, অথচ অজানা কণ্ঠ। তার মনে হচ্ছিল সেখানেই অপেক্ষা করছিল তার সব যন্ত্রণার অবসান, একটা অন্ধকার অথচ শান্ত পরিণতি। ভাগ্য ভালো, ঠিক সেই মুহূর্তে তৌসিরের ঘুম ভেঙে যায়। পাশে নাজহাকে না দেখে জান হাতে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে আসে সে। ঝুম বৃষ্টির ভেতর চারদিকে চোখ বুলাতেই দেখতে পায়, পুকুরের পাড়ে পড়ে আছে নাজহার ওড়না। কাদায় মাখা, ভেজা, এলোমেলো এক টুকরো প্রাণহীন কাপড়, যা তার মালিককে ছেড়ে দিয়ে এসেছে ওই কালো জলের কাছে। বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তৌসিরের। সে সেদিকে ছুটে গিয়ে দেখে, নাজহা ডুবে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। পানির ওপর শুধু চুলগুলো ভেসে আছে। কালো শ্যাওলার মতো, ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বারবার ডেকেও সাড়া পায় না সে। নাম ধরে চিৎকার করে, “নাজহা! নাজহা!” কিন্তু সেই ডাক বৃষ্টির শব্দে চাপা পড়ে যায়, হারিয়ে যায় ঝড়ো হাওয়ার দাপটে। শেষে যখন তৌসির ওকে টেনে তুলে আনে, ততক্ষণে নাজহা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ঠোঁট নীল, হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা ছিল। তার বুকে কান পেতে শ্বাসের আভাস খুঁজছিল তৌসির। সেই কয়েকটা সেকেন্ড তার কাছে মনে হয়েছিল কয়েক যুগ। তৌসিরের তো মনে হচ্ছিল গোটা একটা জীবন কেটে গেছে সেই কয়েক মুহূর্তে।
এতক্ষণে জ্ঞান ফিরেছে নাজহার। বিবিজান দাঁত চেপে গর্জে ওঠেন। কণ্ঠস্বরে উনার বিষ মেশানো, “মাগি! পেটের বাচ্চাটা মারার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিস যে মাঝরাতে গিয়ে পুকুরে ডুব দিয়েছিস?”
এ বলে তিনি নাজহাকে মারতে এগিয়ে আসেন। তৌসির ছিটকে এসে নাজহাকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নেয়। শক্ত করে আগলে রাখে, মনে হচ্ছে একটা ভাঙা পাখির ছানাকে আগলে রাখছে কোনো শিকারির থাবা থেকে। হাত দিয়ে নাজহাকে আড়াল করে সে বিবিজান কে বলে,
“আমি বুঝাচ্ছি, তুমি মাইরো না ওরে।”
বিবিজান এ কথা শুনে রাগে চিৎকার করে ওঠেন,
“তুই! এইসবের লাগি খালি তুই দায়ী! ওরে লাই দিয়ে মাথায় তুলছত খালি তুই!”
এ বলেই তিনি তড়িৎ গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
নাজহার শরীরটা বড় দুর্বল। গলা দিয়ে কথা সরছে না, তাও সে সর্বশক্তি জড়ো করে তৌসিরকে দূরে ঠেলে দিতে দিতে কেঁপে কেঁপে বলে, “স সরুন। ঘেন্না লাগছে আমার।”
তিনটি শব্দ বলল নাজহা। অথচ প্রতিটি শব্দ একেকটা ছুরি। যা সরাসরি বিঁধে যায় তৌসিরের বুকে। গভীরে, আরও গভীরে, যেখানে রক্তও ঝরে না, শুধু একটা নিঃশব্দ যন্ত্রণা জমা হতে থাকে। তৌসির নাজহাকে ছেড়ে দেয়। তার চোখের সেই নরম ভাবটা মুহূর্তেই উবে যায়, সেখানে জায়গা নেয় এক রুক্ষমপাথুরে দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি নাজহার মুখের ওপর স্থির রেখে দাঁত চেপে সে বলে ওঠে ,
“আমার বাচ্চার কোনো ক্ষতি হইলে, ছিনাল, তোমার সাউয়া ফারমু আমি। অনেক বুঝাইছি, তারপরও তুই কোন দুঃখে রাইত বারোটায় পুকুরে মরতে গেলি? সাহস বেশি বেড়ে গেছে! শিক্ষা হয় নাই? লাশ একটা দেইখা হয় নাই আরো দেখতে চাস?”
কথাগুলো শুনে নাজহার সারা শরীর জ্বলে ওঠে। বুকের ভেতরটা মনে হচ্ছে প্রায় কেউ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। ধীরে, খুব ধীরে। ইঞ্চি ইঞ্চি করে। নাজহার মন চায় অনেক কিছু বলতে। চিৎকার করতে। সব ভেঙে চুরমার করে দিতে। সে বলতে চায়, “আমি তো মরতেই চেয়েছিলাম! আপনারা আমায় বাঁচিয়ে কেন এনেছেন?” কিন্তু আফসোস সে তা বলতে পারে না।দুর্বল লতার মতো বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়ে সে। তার সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে, শরীরের প্রতিটা হাড় আলাদা আলাদা করে কাঁদছে। নিজের নিজের ভাষায়। নাজহা নিশ্চল হয়ে যায় তার চোখের কোণ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে একফোঁটা পানি।
তৌসির বোধহয় বুঝতে পারে নাজহার অবস্থা। তাই আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসে। মাকে এক বাটি সুপ বানিয়ে দিতে বলে। মা সুপ বানিয়ে দিলে সেটা হাতে নিয়ে ছুটে আসে ঘরে। ঘরে ঢুকে দেখে, নাজহা ঠিক আগের মতোই পড়ে আছে। নিথর রুপে, পাথরের মূর্তির মতো। শুধু মাঝে মাঝে ওর কাঁধটা একটু কেঁপে উঠছে, যা থেকে বোঝা যায়, ওর ভেতরে এখনও কান্না চলছে নিঃশব্দে। একটা চাপা কান্না, যা বাইরে আসতে চেয়েও আসতে পারছে না। তৌসির খাটপাশীর ওপর সুপের বাটিটা রেখে বলে, “উঠ। উঠে খাইয়া নে।”
নাজহা কোনো উত্তর দেয় না। তৌসির এবার গলায় ঠান্ডা একটা স্বর এনে বলে, “নাজহা, আমারে জোর করতে বাধ্য করিস না। চুপচাপ উঠে বস।”
নাজহা ছোট্ট করে জবাব দেয়, “খাব না এখন।”
“তাইলে কখন খাবি? কথা কইতে পারতেছোছ না, উঠ, উইঠা খা।”
নাজহা সেই আগের মতোই বলে, “খাব না এখন।”
তৌসির আর সহ্য করতে পারে না। নাজহার কাছে গিয়ে ওকে ধরে টেনে তুলে বসিয়ে দেয়। নাজহা নিজের শরীর থেকে তৌসিরের হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে কেঁপে কেঁপে বলে, “ছাড়ুন আমায়! ছুবেন না! ঘেন্না লাগে আমার আপনার ছোয়া!”
কথাগুলো প্রায় বাতাসে ভেসে এসে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে তৌসিরের গায়ে। কিন্তু সে সেই আঘাত গিলে নেয়, যেমন সমুদ্র গিলে নেয় হাজারো নদীর পানি অথচ মুখ ফুটে কিছু বলে না। তৌসির এবার কিছুটা ধমকে ওঠে,
“সাউয়া লাগে তোমার!”
বলেই সুপের ট্রে’টা নাজহার দিকে এগিয়ে দেয়। নাজহার বরাবরই সুপ অপছন্দ। আর এখন তো সেটা বিষ মনে হচ্ছে। বাটির ভেতর থেকে উঠে আসা ধোঁয়াটাও তার গলা চেপে ধরছে, একটা অদৃশ্য ফাঁসের মতো। সে চুপ করে বসে থাকে। সুপে হাতই দেয় না। তৌসির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কি হইছে? খাস না ক্যান?”
নাজহা ফিসফিসিয়ে বলে, “খাব না।”
তৌসিরের রাগ চড়চড় করে বাড়তে থাকে। তবু নিজেকে কোনোমতে সামলে বলে, “সুপ খাবি না, তাহলে অন্য কিছু দিব?”
“না। খাব না।”
“খাইতে হইবো, এনার্জি কেম্নে পাবি?”
“খাব না।”
বারবার এক কথা শুনে এবার তৌসিরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে ধমকে ওঠে, “এক কথা বারবার চুদাইস না, ছিনাল! নে, খা তাড়াতাড়ি!”
নাজহার ভেতরটা রাগে ফুঁসে ওঠে। সমস্ত শক্তি এক করে সুপের বাটিটা এক ঝটকায় ধাক্কা দিতে যায় সে, কিন্তু তার আগেই তৌসির ট্রে’টা নিজের হাতে তুলে নেয়। কণ্ঠে বরফের মতো ঠান্ডা একটা স্বর এনে বলে, “খাবি না তো? তাহলে সারাদিন না খেয়ে থাকবি, বুঝে নিস।”
এ বলে তৌসির গটগট করে বেরিয়ে যায়। দরজাটা খোলাই থাকে, ঠিক তখনই বালিশের পাশে রাখা নাজহার মোবাইলটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে নামটা দেখেই তার বুকটা মোচড় দেয়। ফাইজান কল দিয়েছে নাজহা হন্তদন্ত হয়ে ফোনটা হাতে তুলে কানে চাপে। ওপাশ থেকে ফাইজানের চিন্তিত গলা ভেসে আসে, “হ্যালো মণি, শুনছো, মাস্টার ভাইকে না পাওয়া যাচ্ছেনা গতকাল থেকে। সবাই ধরে নিছে কেউ গুম করে ফেলেছে। আমরা অনেক খুঁজতেছি, কিন্তু পাচ্ছি না।”
নাজহার ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগ্না-ভাগ্নিরা ওকে ‘মণি’ বলে ডাকে। আর বয়সে ছোট দাদা-নানা, মানে নাজহার চাচাদের সবাই ডাকে ‘ভাই’। এই ছোট ছোট ডাকনামগুলোতে লুকিয়ে আছে একটা গোটা পরিবারের ভালোবাসার ইতিহাস। আর যে ইতিহাস এখন একটু একটু করে রক্তে ভিজে যাচ্ছে। মাস্টার চাচ্চুর নামটা কানে যেতেই নাজহার বুকটা মুচড়ে ওঠে। নিজের অজান্তেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে। কারণ সে যে জানে সে যে জানে তার চাচ্চু আর নেই। কোনোদিন আর ফিরবেন না। সেই মুখটা, সেই হাসিমুখটা, শুধু স্মৃতিতে থাকবে। আর কোথাও না। ফাইজান ওপাশ থেকে নাজহার কান্নার শব্দ শুনতে পেয়ে নরম সুরে বলে, “মণি, তুমি কেঁদো না। আল্লাহ ভরসা। দেখা যাক কি হয়।”
নাজহা উত্তর দিতে পারে না। বুক ফেটে কান্না আসছে তার। মুখ চেপে ধরে, নাক টেনে নিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কোনোমতে সে বলে, “আ আমি আমি কাঁদব না? আমার ছেলে নাই হয়ে গেছে। ত… তোরা সাবধানে থাকিস বাবারা। তালহা ভাই ঠিক আছে তো? ছোট চাচ্চু, বাড়ির সবাইকে বলিস সাবধানে থাকতে। আমাদের পরিবারের কাল নেমে এসেছে আবার। ত তুই সাবধানে থাকিস বাবা।”
প্রতিটা শব্দ রক্ত ঝরিয়ে বের হচ্ছে ওর গলা থেকে। প্রতিটা নাম উচ্চারণ করার সময় বুকটা কেঁপে উঠছে এই ভয়ে, পরের ফোনে এই নামগুলোর মধ্যে কারটা আর শোনা যাবে না? কোন নামটা পরিণত হবে আরেকটা শোকগাথায়? কোন প্রিয় মুখটা আর কোনোদিন তাকে ‘মণি’ বলে ডাকবে না? ফাইজান নিজের মণিকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে শান্ত করার চেষ্টা করে,
“মণি, রাতে তোমার দাদিশ্বাশুড়ি ফোন দিয়েছিলেন। বলছেন তুমি নাকি প্রেগন্যান্ট। তুমি এই অবস্থায় স্ট্রেস নিও না। আমরা তো তোমায় দেখতে যাব, সবাই এই পণ করেছি। কিন্তু দেখো তো, মাস্টার ভাইকে পাচ্ছি না…”
নাজহা এ কথা শুনে একদম থ হয়ে যায়। তার মানে, এ খবরটাও সবাই জেনে গেছে। যে খবরটা সে নিজেও মেনে নিতে পারছে না, যে খবরটা তার কাছে এক অনাহূত অভিশাপের মতো, সেই খবর ছড়িয়ে গেছে গোটা পরিবারে। উৎসবের সুরে। যে গর্ভে সে নিজেই আশ্রয় দিতে চায় না, সেই গর্ভের জন্য পরিবারের লোকজন খুশিতে মেতে উঠেছে। কী নিদারুণ পরিহাস তার নিয়তির। নাজহা কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে ছোট্ট গলায় বলে, “শুন, এখন আসতে হবে না। মাস্টার চাচ্চুর খুঁজ কর সবাই। আর তুই একা একবার আসিস পারলে, আমায় দেখতে। আমার শরীরও ভালো না।”
‘মাস্টার চাচ্চুর খুঁজ কর’, এই ভয়াবহ মিথ্যাটা বলতে গিয়ে নাজহার গলা কেঁপে ওঠে। কিন্তু কী করার আছে তার?এ মিথ্যাটা তাকে বলতেই হবে। নয়তো ওরা একে একে সবাইকে মেরে ফেলবে। ওই হায়েনাগুলো, যাদের হাতে তার চাচ্চুর রক্ত লেগে আছে, তারা থামবে না যতক্ষণ না পুরো পরিবার শেষ হয়। সত্যিটা তার পরিবারের সর্বনাশ ডেকে আনবে, আর মিথ্যাটা শুধু তার নিজের আত্মাকে পোড়াবে। দু’য়ের মধ্যে দ্বিতীয়টাই বেছে নিতে হবে তাকে। বেছে নিতে হচ্ছে। প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। ফাইজান ওকে নিজের খেয়াল রাখতে বলে ফোন রেখে দেয়। নাজহা ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখে। তার হাতটা কাঁপছে। ঠোঁট কাঁপছে। তার বুকের ভেতরটা কাঁপছে। সমস্ত পৃথিবীটাই মনে হচ্ছে কাঁপছে তার চোখের সামনে, একটা ভূমিকম্পের মতো, যা শুধু সে-ই অনুভব করছে, আর কেউ না। এত যন্ত্রণা, এত যন্ত্রণা সে আর নিতে পারছে না।
হাঁটুতে মুখ গুঁজে চুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে। কান্নার শব্দে কেঁপে ওঠে তার সরু কাঁধ, ঠিক একটা ভাঙা ডালে বসা পাখির মতো। নাজহা চুলের গোছা মুঠোয় ধরা, তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ছে ভেজা চুল, আর তার সঙ্গে গলে পড়ছে এক অপ্রকাশ্য কান্না, যা পৃথিবীর কাছে অজানাই থেকে যাবে।
আড়াল থেকে তৌসির সব শুনছে। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে, নিঃশ্বাস আটকে, সব শুনছে। সব দেখছে।
নাজহার কলিজা পুড়ে যাওয়া যন্ত্রণা। ছটফট করা প্রতিটা নিঃশ্বাস। চাপা কান্নার প্রতিটা ফোঁপানি। আঙুলে আঁকড়ে ধরা চুলের প্রতিটা গোছা। সব ভালো করেই দেখছে সে।
অথচ দেখেও তার কিছু করার নেই। দরজার চৌকাঠে হাত রেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে তৌসির। তার বুকের ভেতরটায় কোথাও একটা পাথর চাপা পড়ে আছে, যা সে কাউকে দেখাতে পারছে না।ভেতরের তৌসির আর বাইরের তৌসির, এই দুই মানুষের মাঝে যে ফারাক, তা কেউ দেখতে পায় না। দেখতে পায় না নাজহাও। হয়তো কোনোদিন দেখবেও না। হয়তো এই দুই তৌসিরের মাঝখানের দেয়ালটা এতই পুরু, এতই অভেদ্য, যে সেটা ভাঙার আগেই তাদের গল্পটা শেষ হয়ে যাবে। হয়তো এটাই ভাগ্যের নিষ্ঠুর রসিকতা।
বেলা এগারোটা। আকাশের ঠিক মাঝখানে সূর্যটা এক প্রকাণ্ড আগুনের গোলা হয়ে ঝুলে আছে, যেখান থেকে অবিশ্রান্ত ঝরছে অসহ্য তপ্ত রোদের খরতাপ। শিকদার কুঠিরের চারপাশের প্রকৃতি আজ উত্তাপে খাঁ খাঁ করছে, চারিদিকের বাতাস মনে হচ্ছে এক নিদারুণ আগুনের হলকা। তীব্র গরমে গাছের একটা পাতাও নড়ছে না, পাখিরা ক্লান্তিতে গান ভুলে নিঝুম হয়ে গেছে, আর চরাচরের বাতাস হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই রৌদ্রদগ্ধ, বিস্তীর্ণ প্রান্তরের দিকে দূর থেকে তাকালে মনে হয় তৃষ্ণার্ত মাটি থেকে চিকচিকে মরীচিকা কাঁপছে। এই তপ্ত পরিবেশের বুকেই কুঠিরের আদিগন্ত বাগানটায় তৌসির, ওয়াসেম আর ইয়াদ, তিনজনই বসে আছে মুখোমুখি। মাঝখানে একটা পুরনো কাঠের টেবিল, কাঠের গায়ে বছরের পর বছরের ঘষা লেগে চকচকে হয়ে গেছে কোথাও কোথাও। তার ওপর ছড়িয়ে আছে কিছু কাগজপত্র, দুটো চায়ের কাপ, যেগুলো অনেকক্ষণ ধরে কারো ঠোঁটের স্পর্শ পায়নি, চা ঠান্ডা হয়ে গায়ে সরের পাতলা পর্দা পড়েছে। প্রত্যেকের চোখে-মুখে চিন্তার গভীর ছাপ, কপালের ভাঁজে জমে আছে পরিকল্পনার দুর্বহ ভার। তৌসির আঙুল দিয়ে টেবিলে তাল ঠুকছে অজান্তেই, অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে তার আঙুলের ডগা থেকে। ওয়াসেমের চোয়াল শক্ত, ভেতরে দাঁত কামড়ে রেখেছে কোনো অপ্রকাশ্য রাগে। আর ইয়াদ মাঝে মাঝে নিজের চুলে হাত চালাচ্ছে অন্যমনস্কভাবে, মনে হবে হয়তো ওর চুলের ফাঁকে কোথাও লুকিয়ে আছে এই জটিল ধাঁধার সমাধান।
অন্য পাশে বসে নুহমান আর কেরআমত ব্যস্ত নিজেদের কাজে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশ অফিসার রিয়াজ, পরনে অফিসিয়াল ইউনিফর্ম, কাঁধে চকচকে ব্যাজ, কোমরে ঝোলানো হাতিয়ার, কিন্তু চোখে শকুনের ক্ষুধা। উর্দি যাকে রক্ষাকর্তা বানানোর কথা ছিল, সেই উর্দিই আজ তার শিকার ধরার ছদ্মবেশ। তিনজন মিলে মেতে উঠেছে এক ঘৃণ্য খেলায়, যেখানে শিকার মানুষ, আর হাতিয়ার ক্ষমতার ছায়া। ঘটনাটা এই, তিন দিন আগে স্থানীয় ত্রিশ-চল্লিশজন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটা মিছিল বের করেছিল। স্লোগান উঠেছিল, পতাকা উড়েছিল, আর সেই মিছিলের সূত্র ধরেই কেস হয়েছে। কিন্তু কেসটা শুধু সেই চল্লিশজনের নামে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মিছিলে যারা ছিলই না, যাদের ঘরের চৌকাঠের বাইরেও সেদিন পা পড়েনি, এমন আরও অনেক স্থানীয় আওয়ামী নেতা-কর্মীর নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে তালিকায়, কারণ এখন তারা ক্ষমতায় তাই তাদের কাগজে নাম তোলাটাই সবচেয়ে সহজ কাজ। সব মিলিয়ে কেস হয়েছে একশোরও বেশি মানুষের নামে। আর এই বাকি ষাটজন, যারা আসলে মিছিলেই ছিল না, তাদের একে একে কল দিচ্ছে নুহমান, কেরআমত আর রিয়াজ। আর হুমকি দিচ্ছে “টাকা না দিলে জেলে পচাব। সারাজীবন গারদের ভাত খাবি।” এসব শুনে কারো গলায় ভয়, কারো গলায় কান্না, কারো গলায় হাতজোড় করার আকুতি, কেউ আবার চুপ করে শুধু শ্বাস ফেলে, মনে হয় কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে কারণ নিজেদের আমলে এমন অত্যাচার তারাও করেছে। তারা আরো বেশি করেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের তো ঘরবাড়ি তে ঠিকতে দেয়নি। বিনা দোষে একেকজনের নামে একশোটা কেস করা হতো তখন। রুদ্ররা কারো কাছ থেকে চল্লিশ হাজার, কারো কাছ থেকে ত্রিশ, কারো কাছ থেকে ষাট হাজার, এভাবেই টাকা গিলে নিচ্ছে। আর এটাই তো তন্ময় চাচাকে এমপি বানানোর আরেকটা গোপন ফায়দা, ক্ষমতার নাম ভাঙিয়ে মানুষ কে নিংড়ে নেওয়া, তাদের ঘামের পয়সা কেড়ে নিজেদের সিন্দুক ভারী করা।
অন্যদিকে তৌসির, ওয়াসেম আর ইয়াদ মাথা ঠেকিয়ে বসেছে অন্য এক ভিন্ন পরিকল্পনায়। তাদের চোখে এখন একটাই লক্ষ্য, খলিলের বাড়ি। সেই বাড়িতে ঢোকার ছক কষছে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে, প্রতিটা সম্ভাবনাকে উল্টেপাল্টে দেখছে, প্রতিটা ফাঁকফোকর খুঁজে দেখছে শকুনের চোখে। খলিল সাধারণ কেউ নয়। তার চারপাশে এমন এক নিরাপত্তার বলয়, এমন এক চক্রান্তের জাল, যে তাকে স্পর্শ করতে গেলে আগে দশটা দেয়াল ভাঙতে হবে, দশজন পাহারাদারের চোখ ফাঁকি দিতে হবে। তাকে মারা যতটা সহজ মনে হয়, ততটা সহজ মোটেও নয়। তবে এই দুর্ভেদ্য দুর্গেও একটা ছোট্ট ফাঁক আছে, একটা ফাটল, যেখান দিয়ে সাপ ঢুকতে পারে নিঃশব্দে। খলিলের ছোট মেয়েটা এখনো অবিবাহিত, আর তার জন্য চারদিকে পাত্র খোঁজা হচ্ছে। আরও বড় সুবিধা হলো, খলিল এখনো তৌসির, ওয়াসেম বা ইয়াদ, এই তিনজনের কাউকেই চোখে দেখেনি, চিনে না। তাই তিনজনকে নিতে হবে তিন রকমের ছদ্মবেশ, সাজিয়ে নিতে হবে আলাদা পরিচয়, আলাদা পরিবার, আলাদা ব্যবসার গল্প। সব মিলিয়ে এক পুরোদস্তুর নাটক, যার প্রতিটি সংলাপ মুখস্থ থাকতে হবে জলের মতো, প্রতিটি অভিব্যক্তি হতে হবে নিখুঁত, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি কাঁধ ঝাঁকানো পর্যন্ত হিসেব করা। তবেই ঢোকা যাবে সেই কেল্লায়। বিবিজান এই বুদ্ধিটাই দিয়েছেন, কারো মাধ্যমে খলিলের মেয়ের জামাই হওয়ার সম্বন্ধ নিয়ে যেতে। বলা যতটা সহজ, করা ততটাই কঠিন। কারণ এটা এক কথায় প্রায় অসম্ভব এক কাজ।কারণটাও স্পষ্ট। তারা তিনজনই বিবাহিত। তৌসির এই মুহূর্তে কোথাও যেতে পারবে না, কারণ নাজহার দিকে চোখ রাখতে হবে চব্বিশ ঘণ্টা। ও কখন কী করে বসে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই, ওর মনের গতিপ্রকৃতি ঝড়ের চেয়েও অনিশ্চিত। তৌসির হতাশ গলায় বলে ওঠে, “আচ্ছা, আমরা নাটক তো সাজাইলাম, কারণ আমাদের পক্ষে সাজানো সম্ভব। কিন্তু বিয়াটা করব কে? আমি চাই না আমরা তিনজন ছাড়া কেউ এতে জড়াক। রুদ্র, নাযেম, মিনহাজ, এই মাদারচোদ রা তো কখনোই না। আর আমরা তিনজনই তো বিবাহিত। কেউ কারো বউ ছাড়া অন্য কারো নামে বিয়াতে বসতে পারমু না। বিয়া যদিও করব না, তারপরও যদি কোনো এক্সিডেন্ট ঘটে, আর সত্যিই করতে হয়?”
তৌসিরের গলায় শুধু চিন্তা নয়, এক ধরনের পিতৃসুলভ সতর্কতা মিশে আছে। সে নিজে সংসারে আঘাত পেয়েছে, ভাঙনের যন্ত্রণা চিনেছে হাড়ে হাড়ে, তাই অন্যের সংসার নিয়ে তার ভয় আরো বেশি, আশঙ্কা আরো গভীর। কথা শেষ হতে না হতেই ওয়াসেম নড়েচড়ে কিছুটা সোজা হয়ে বসে। বুক ফুলিয়ে, চোখে এক ধরনের ঔদ্ধত্যের আগুন জ্বালিয়ে বলে ওঠে, “আমি করব। আমি পাত্র হব। বিয়ে হলে হবে, সমস্যা কী? পরে বাপের সাথে মেয়েকেও পুতে দিব।”
ইয়াদ আর তৌসির কথাটা শুনে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে যায়। দুজনের মুখেই দ্বিধা, চোখে এক ধরনের সংশয়ের ছায়া। তারপর প্রায় ওরা একসঙ্গে বলে ওঠে, “তৃষ্ণা কষ্ট পাবে। আমরা চাই না, ও বেচারি কষ্ট পাক।”
ওয়াসেম একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে, মনে হয় ওর বুকের ভেতর জমে থাকা সব ভার একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে কণ্ঠনালির পথ ধরে। তারপর গলার স্বর নিচু করে বলে, “দেখ, ও কষ্ট পাবে, এটা আমিও জানি। কিন্তু আমি চাই প্রতিশোধ। আর আমার প্রতিশোধের জন্য আমি যা কিছু করতে পারি। ও আমায় বাধা দিবে না। দাঁড়া, তোদের শুনাই। নিজের চোখে দেখ, নিজের কানে শোন।”
এ বলেই ওয়াসেম ফোনটা পকেট থেকে বের করে। সিতুজার নাম্বারে ভিডিও কল দেয়। উদ্দেশ্য একটাই, তৌসির আর ইয়াদকে দেখানোর বাহানায় তৃষ্ণাকে একনজর দেখা, ওর গলার স্বরটা একটু শোনা, ওর মুখটায় একবার চোখ বুলানো। বুকের ভেতরের তৃষ্ণাটা যে কাল রাত থেকে গলা শুকিয়ে দিচ্ছে, সেটা কাউকে বুঝতে দেওয়া যাবে না, এমনকি নিজেকেও না।
দু-তিনবার রিং হতেই সিতুজা ফোন ধরেন। ওয়াসেম মায়ের সাথে কিছুক্ষণ ভালো-মন্দ কথা বলে, কুশল জিজ্ঞেস করে, খাওয়া-দাওয়ার খবর নেয়, তারপর হালকা গলায় বলে তৃষ্ণার কাছে ফোনটা দিতে। সিতুজা জানান, তৃষ্ণার আবার জ্বর এসেছে। শরীরটা একদম ভেঙে পড়েছে। তিনি ফোনটা হাতে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যান তৃষ্ণার ঘরের দিকে। তৃষ্ণা তখন রুমের সোফায় বসে আছে। গায়ে একটা পাতলা চাদর জড়ানো, চোখ-মুখ জ্বরে লালচে হয়ে আছে, কপালে ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দু চিকচিক করছে। ঠোঁট দুটো শুকনো, ফেটে গেছে কোথাও কোথাও, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে লেপ্টে আছে ঘামে ভিজে। হাঁচি দিতে দিতে যেন নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক ধ্বংসপ্রাপ্ত লতার মতো লাগছে তাকে, যে লতা ঝড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো কোনোমতে মাটি আঁকড়ে পড়ে আছে শেষ একটুকরো শিকড়ের জোরে।
সিতুজা ফোনটা ওর হাতে দিয়ে স্নেহের গলায় বলেন, “নে, ওয়াসেম ফোন দিল, তোর সাথে কথা বলবে। তোরা কথা বল, আমি আসি।”
তৃষ্ণা অবলার মতো অবাক চোখে সিতুজার দিকে তাকায়। তার চোখে একটা প্রশ্ন ঝুলে থাকে নিরুচ্চারে, “আমার সাথে কেন কথা বলবেন উনি?” তারপর কাঁপা হাতে ফোনটা নিয়ে সামনে ধরে। স্ক্রিনে ওয়াসেমকে দেখে ওর বুকটা ধক করে কেঁপে ওঠে, ওর মনে হতে থাকে হয়তো কেউ হঠাৎ পেছন থেকে কাঁধে হাত রাখল ঠান্ডা আঙুলে। ওপাশে ওয়াসেম তৃষ্ণার এই হাল দেখে মনে মনে একদম অস্থির হয়ে ওঠে। বুকের ভেতরটায় মনে হচ্ছে কেউ মুঠো করে ধরে চাপ দিচ্ছে, তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে গলার কাছে এসে। ইচ্ছে হচ্ছে এখনই উড়াল দিয়ে পৌঁছে যেতে তৃষ্ণার কাছে, কপালে হাত রাখে, জ্বরটা মেপে দেখে, চাদরটা ঠিক করে গায়ে টেনে দেয়। কিন্তু মুখে শান্ত গলায় কাঠিন্য টেনে এনে বলে, “কী হয়েছে তোর?”
তৃষ্ণা আমতা আমতা করে, কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারছে না, জিহ্বাটাও মনে হচ্ছে আজ তার বশে নেই। শেষমেষ বলে, “ঐ, একটু জ্বর এসেছে। আপনি আমার সাথে কথা বলবেন? কোনো প্রয়োজন?”
ওয়াসেম একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে, “তোর সাথে প্রয়োজন ছাড়া কখন আমি কথা বলি, যে আজ পিরিত দেখাতে কথা বলব? শুন, তোকে একটা খুশির খবর দেই।”
তৃষ্ণা বিচলিত হয়ে বলে, “কী?”
ওয়াসেম কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকে। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকে, সে ঠিক করে প্রতিটি শব্দ মেপে মেপে বলবে, একটা ভুল উচ্চারণও যেনো না হয়। তারপর ধীরে ধীরে বলে, “আমি বাংলাদেশ থেকে গিয়ে একটা বিয়ে করব। মেয়ে পছন্দ করে রেখে এসেছি। তোকে বললাম, কাউকে বলিস না।”
কথাটা শুনে তৃষ্ণার কলিজাটা মনে হয় কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। ওর বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল এক অসহ্য যন্ত্রণায়, এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো শ্বাসটাই বুঝি বন্ধ হয়ে গেছে। ওর চোখের সামনের পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল, আবার থিতু হলো ধীরে ধীরে। তবু ক্ষীণ গলায়, কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে তৃষ্ণা বলে, “ওহ। কবে আসবেন? আমি কি ঘরটা ছেড়ে দিব?”
“যা ইচ্ছে কর। শুধু মনে রাখিস, আমি বিয়ে করার পর তুই বাড়িতে থাকতে পারবি না।”
তৃষ্ণা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ায়, “আচ্ছা, আমি চলে যাব।”
এই উত্তরটা শুনে ওয়াসেম হঠাৎ আগুনের মতো জ্বলে ওঠে, ভেতরে কোথাও একটা বারুদের ফুলকি লাগে। ওয়াসেম তো প্রায় চিৎকার করে ওঠে, “এই বান্ধীর বাচ্চা, কই যাবি তুই? যে বললি চলে যাব!”
তৃষ্ণা ওয়াসেমের কথায় ব্যথাতুর হাসি হাসে। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে শুধু এক জীবনব্যাপী ক্লান্তির ছাপ, এক যুগের অপমান জমে জমে যে হাসি ঠোঁটের কোণে পাথর হয়ে গেছে ও নিরলস গলায় বলে, “সে আমি রাস্তায় থেকে যাব। আমাদের মতো মানুষের জন্য রাস্তাই একদম ঠিক আছে।”
“হ্যাঁ, থাকবি তো। তুই তো ওখানকারই মানুষ। যা, থাক গিয়ে। রাখ ফোন।”
এই বলে ওয়াসেম ফোনটা কেটে দেয়। কাটার পরও কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, ওর মনে হয় ওপাশে কেউ এখনো আছে, ওর চোখে স্ক্রিনের কালো আয়নায় তৃষ্ণার সেই ভেঙে পড়া মুখটা এখনো ভাসছে।
ফোন কেটে ওয়াসেম তৌসির আর ইয়াদের দিকে তাকায়। মুখে এক ধরনের কৃত্রিম নির্লিপ্ততা টেনে এনে বলে, “দেখলি তো? ওর পরোয়া না করাই ভালো। আমি বিয়ে করলেও ও যাবে না। বিয়ের সময় যদি চলে যায়, তো গেল। আর যদি না যায়, তাহলে ওকে আমি রাণীর মতো রাখব। বলে দিলাম, তোদের দেখিস।”
কথাটা শুনে তৌসির ভাবলেশহীন মুখে কিছুক্ষণ ওয়াসেমের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর একটু ঝুঁকে এসে, গলার স্বরে এক ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার ভার মিশিয়ে বলে ওঠে, “সময় থাকতে মূল্য দে, ওয়াসেম। হারিয়ে গেলে সব শেষ হয়ে যায়। এই দেখ, আমার একটা ভুলে আমার সোনার সংসারটা কেমন ধ্বংস হয়ে গেল। যে আমার জন্য নিজের পরিবার ছেড়েছে, তাকেই আমি এত বড় যন্ত্রণা দিলাম। নাজহা বিশ্বাসঘাতক না রে, ভুলটা আমার, আমি বুঝিনি।”
ইয়াদ এ কথা শুনে বিরক্তিতে নাক কুঁচকে ফেলে। হাত নেড়ে বলে ওঠে, “দূর ল্যাওড়া! একজন বউ রে দেখতে পারে না, তো আরেকজন বউ ছাড়া কোনো বাল বুঝে না।”
এই বলে সে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়, পা চালিয়ে চলে যায় গেটের দিকে। তবে দরজার চৌকাঠ পেরোনোর আগে একবার পেছনে তাকায়, কিছু বলতে চেয়েও বলল না, তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে যায়। ওর পায়ের শব্দটা দীর্ঘ বারান্দা পেরিয়ে মিলিয়ে যেতে বেশ খানিকটা সময় নেয়।
ওদিকে তৃষ্ণা চুপ করে বসে আছে সোফায়। ফোনটা পাশে রাখা, স্ক্রিন কালো, একটা মৃত আয়না। জ্বরে শরীর কাঁপছে, কিন্তু মনের ভেতরের কাঁপুনিটা আরো প্রবল, আরো গভীর, যে কাঁপুনি কোনো ওষুধে সারে না, কোনো চাদরে চাপা পড়ে না। মনে মনে একটা ম্লান হাসি হাসছে সে, কারণ ও তো জানতই, এমন কিছুই একদিন হবে। ও জানত, ওয়াসেমের মতো মানুষ ওর মতো একজনকে কোনোদিনই আঁকড়ে ধরে রাখবে না, যেমন আকাশ কখনো ধুলোকে বুকে তুলে নেয় না। তবু কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। বুকের ভেতরে মনে হচ্ছে কেউ একটা বরফের ছুরি চালিয়ে দিয়েছে, আর সেই ক্ষত থেকে রক্ত নয়, ঝরছে নীরব অশ্রু। তৃষ্ণার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে, গাল বেয়ে নেমে আসছে চিবুকে, তারপর চাদরে, ভিজিয়ে দিচ্ছে চাদরের কোণা ধীরে ধীরে। কিন্তু তার মুখে কোনো শব্দ নেই, কোনো ডাক নেই, কোনো হাহাকার নেই।
ও মনে মনে ঠিক করে নিচ্ছে, যেদিন নতুন বউ আনতে ওয়াসেম বের হবে, সেদিন সেও বেরিয়ে যাবে এ বাড়ি থেকে। আর একটা মুহূর্তও থাকবে না এখানে, এক পাও ফেলবে না এই চৌকাঠে। ভিক্ষা করবে রাস্তায় রাস্তায়, ক্ষুধার্ত হয়ে গাছের নিচে শুয়ে রাত কাটাবে, কুকুরের সাথে এক টুকরো রুটি ভাগ করে খাবে, তাও এই বাড়ির চৌকাঠ আর ছোঁবে না। যেখানে নিজের অস্তিত্বটাই অপ্রয়োজনীয়, যেখানে নিজের নিঃশ্বাসটাও অন্যের দয়ার দান, সেখানে দয়ার ভাত খাওয়ার চেয়ে রাস্তার ধুলো ভালো, অনেক ভালো।
এদিকে ওয়াসেম ইয়াদের পেছন পেছন উঠে বাড়িতে আসে এসে নিজের রুমে আসে। দরজা বন্ধ করে আবার মায়ের ফোনে কল দেয়। গলায় এবার একটু কোমলতা মেশানো, একটু আগের সেই কাঠখোট্টা স্বরের কোনো চিহ্নই নেই। মাকে বলে, এই ফোনটা যেন আপাতত তৃষ্ণাকে দিয়ে দেন, আর তিনি অন্য একটা চালান কিছুদিন। সিতুজা তো মনে মনে চানই যে ওয়াসেম যাতে তৃষ্ণাকে ভালোবাসে, ওকে আপন করে নেয়, এই ভাঙাচোরা সংসারটাকে নতুন করে সাজায়। তাই ছেলের এই অনুরোধে তিনি ভেতরে ভেতরে খুশিই হলেন। ফোনটা নিয়ে আবার তৃষ্ণার কাছে যান। মৃদু হাসি মুখে এনে ওকে বলেন, “এ কয়দিন এটা তোর কাছে রাখ। ওয়াসেম বলল।”
তৃষ্ণা কিছু না বলে মাথা নাড়িয়ে ফোনটা হাতে নেয়। বুঝে উঠতে পারে না, ওয়াসেমের মনে আসলে কী চলছে, কোন খেলার দান কোথায় বসাচ্ছে সে। কিছুক্ষণ পর ফোনটা বেজে ওঠে। ওয়াসেম ভিডিও কল দিয়েছে। তৃষ্ণা প্রথমে ধরে না, ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকে শুধু, দ্বিতীয়বার বাজলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধরে। ফোন ধরতেই ওয়াসেম ধমকে ওঠে, “তোর সমস্যা কী? ফোন ধরিস না কেন? ফোন দিয়েছি, শুধু আমার সাথে কথা বলবি, অন্য কারো সাথে নয়, কিন্তু।”
তৃষ্ণার বুক ফাটছে ভেতরে ভেতরে, তবু নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলে, “আমি ফোন দিয়ে কী করব? আমি তো এসব চালাতে পারি না। আর আপনার সাথে কেন কথা বলব?”
ওয়াসেম আরো বিরক্ত হয়ে বলে, “আমি জানি না কেন বলবি, তবে যখন ফোন দিব তখন ধরে নিস। নয়তো বুঝিসি তো, আল্লাহ আল্লাহ ডাকাবো। আমি আগামীকালই রওনা দিব।”
তৃষ্ণা এটা শুনে চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর সাহস করে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কি এসেই বিয়ে করে নিবেন?”
ওয়াসেম এবার একদম একা ঘরে। তৌসির, ইয়াদ কেউ নেই আশপাশে, কোনো সাক্ষী নেই, কোনো বিচারক নেই। তাই মুখোশটা একটু আলগা হয়ে যায়, একটু খসে পড়ে কোণা থেকে। গলার স্বরে আসে অজান্তেই এক ধরনের কোমলতা, যে কোমলতা সে নিজেও বুঝতে পারে না কোথা থেকে এল। ওয়াসেম নরম গলায় বলে, “আরে দূর, কিসের বিয়ে! বিয়ে যদি করতেই হতো, তো আমি আরো একবার তোকেই করতাম।”
তৃষ্ণার বুকটা ধক করে ওঠে। সে বিশ্বাস করতে পারে না নিজের কানকে, মনে হচ্ছে জ্বরের ঘোরে কিছু একটা শুনে ফেলেছে। ও আস্তে আস্তে বলে, “কিন্তু আপনি যে বললেন আগে বিয়ে করবেন?”
“ঐটা এমনি বলছি।”
“এমনি কেন বললেন?”
“আমার ইচ্ছে হইছে, তাই বলছি। তুই আমার বিয়ে করা বউ, তোর সাথে আমি যা ইচ্ছা বলতে পারি। তাতে তোর সমস্যা কী? তুই এত প্রশ্ন কেন করছিস?”
তৃষ্ণা এটা শুনে চুপ হয়ে যায়। এই লোকটাকে বুঝে ওঠা সত্যিই অসম্ভব। একবার আকাশে ওড়ায়, পরক্ষণেই মাটিতে আছড়ে ফেলে। আবার যখন ভাবে মাটিতেই পড়ে থাকবে, তখনই আবার হাত বাড়িয়ে তোলে। মাঝেমধ্যে তৃষ্ণার তো মনে হয় একটা মানুষের ভেতরে দুটো মানুষ বাস করে, একজন বাইরের পৃথিবীর জন্য, একজন শুধু ওর জন্য। ওয়াসেম আর কথা বাড়ায় না। ফোনটা রেখে দেয় চুপচাপ। কিন্তু ফোন রাখার পরই মুখে ফুটে ওঠে এক চাপা হাসি, যে হাসি সে কাউকে দেখাতে চায় না, এমনকি নিজের আয়নাকেও না। বুকের ভেতরে তো তার লাড্ডু ফুটছে, একটার পর একটা, মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে শিরা-উপশিরায়। তৃষ্ণাকে মাত্র একটা দিন না দেখতে পেয়েই সে পাগল-উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। আর এখন ওকে দেখতে পেয়ে বুকের ভেতরে আতশবাজি ফুটছে, আলোর ফুলকি ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে, ঘরের অন্ধকার কোণাগুলো পর্যন্ত আলোকিত হয়ে উঠছে। মাত্র একটা দিন, অথচ মনে হচ্ছিল যুগ পেরিয়ে গেছে, শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। সে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে, ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটের কোণে সেই চাপা হাসিটা এখনো লেগে আছে, এই আনন্দের হাসিটা তো ঠোঁট থেকে নামতেই চাচ্ছে না।
ঘরের ভারী কাঠের দরজা ঠেলে তৌসির ভেতরে পা রাখে। পা রাখতেই মুহূর্তেই তার পা থমকে যায়। চোখের সামনে যে দৃশ্যটি ভেসে ওঠে, তা তৌসিরের চোখে এক নিঃশব্দ প্রলয়ের পূর্বাভাস। বিছানার এক কোণে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত অবস্থায় এক কাতে শুয়ে আছে নাজহা। বেলকনির দরজা দিয়ে চুঁইয়ে আসা আবছা আলোয় নাজহাকে দেখাচ্ছে কোনো ভাঙা পুতুলের ন্যায়, যাকে কেউ অযত্নে ছুঁড়ে ফেলে গেছে। তার পরনের কালো পালাজোটা হাঁটুর বেশ কিছুটা ওপরে উঠে আছে, যার ফলে তার ধবধবে ফর্সা পা দুটো এই আবছা আলোতেও জ্বলজ্বল করছে। তৌসিরের চোখ আটকে যায় ঠিক সেখানেই, মনে হচ্ছে কোনো বেনামী সুতো তার দৃষ্টিকে শিকল পরিয়ে দিয়েছে। নাজহার গায়ের ড্রেসটা এলোমেলো, উন্মুক্ত পেটের কিছুটা অংশ স্পষ্ট দৃশ্যমান। তার লালচে কালো কোঁকড়ানো চুলগুলো বিছানাময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, শরতের ঝরা পাতার মতো অগোছালো এক কাব্যের৷ তো।
ফ্যাকাশে মুখে ঘুমিয়ে থাকা এই নাজহা তৌসিরের বুকের ভেতর এক তীব্র ঝড় তুলে দেয়, এক প্রলয়ংকরী ঝড়, যার বেগে তার নিজস্ব সত্তাই কেঁপে ওঠে। তৌসিরের ভেতরের নিজের পৌরুষ এক নিমেষে জেগে ওঠে। তার তীব্র ইচ্ছে হয় ছুটে গিয়ে নাজহাকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিতে, তার এলোমেলো চুলে আঙুল চালিয়ে দিতে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। নাজহার সাথে তার সম্পর্কটা যখন থেকে শারীরিক রূপ পায়, ঠিক তখন থেকেই এই টানটা সে বড্ড বেশি অনুভব করে। বিয়ের পর প্রথম দিকে এমনটা হয়নি, কারণ এই অনুভূতির স্বাদ তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা ছিল, কোনো অজানা ফুলের গন্ধের মতো, যা প্রথমবার নাকে এসে লাগে। কিন্তু নাজহার সাথে সবকিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার পর এই তীব্র আকর্ষণটা ধীরে ধীরে শিকড় গাড়ে তার ভেতরে, আর এই বীজ বুনে দেয় নাজহাই। নাজহা কোনোদিন তাকে বাধা দেয়নি, প্রতিবার তারা একে অপরের মাঝে হারিয়ে গেছে গত এক মাসের প্রতি রাতি তাদের নির্ঘুমে কেটেছে। আর এখন, হঠাৎ চোখের পলকে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তৌসিরের ভেতরের সেই টানটা আরও তীব্র, আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠেছে। তবে সেই তীব্রতার পরিধি এখন শুধুই নাজহাকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরা আর তার চুলে হাত বুলিয়ে দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ।
তৌসির ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে নাজহার সামনে দাড়ায়। তারপর নিঃশব্দে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে আলতো হাতে নাজহার গালে নিজের হাতটা রাখে সে, এতটাই সাবধানে, যে মনে হচ্ছে একটু চাপ পড়লেই নাজহা ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। ধীরে ধীরে তৌসির নিজের নাক ডুবিয়ে দেয় নাজহার নরম গালে, ঠোঁট দুটো চেপে ধরে নাজহার স্পর্শকাতর ত্বকে। এক গভীর, শান্তির নিশ্বাস নেয় সে ঠিক যেমন বহুদিন পর কোনো তৃষ্ণার্ত পথিক শীতল জলের সন্ধান পায়। তৌসিরের ভেতরটা কাঁপতে থাকে। ঠিক তখনই নাজহার চোখের পাতা কেঁপে ওঠে। ধীরে ধীরে চোখ খোলে সে। শুরুতে ঘুমের ঘোরে কী হচ্ছে তা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, চেতনা তার কুয়াশার চাদর সরিয়ে ফিরে আসতে সময় নিচ্ছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মাথায় যখন সে বুঝতে পারে তৌসির তার গালে চুমু খাচ্ছে, তখন তার ঘুম-জড়ানো চোখে দপ করে জ্বলে ওঠে আগুন। ঘৃণায় আর আক্রোশে চিৎকার করে ওঠে সে। এক ঝটকায় তৌসিরের হাত সরিয়ে দিয়ে বলে, “আমাকে কেন স্পর্শ করছেন? একটা খুনি আপনি! আমার ঘেন্না লাগে! তো থাকতে দিন না আমায় আমার মতো!”
তৌসির কোনো জবাব দেয় না, শুধু বিছানায় নাজহার ঠিক পাশটিতে বসে পড়ে। নাজহা তড়িৎবেগে উঠে বসে, নিজের পালাজোটা তড়িঘড়ি টেনে নিচে নামিয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বসে ক্ষোভ উগরে দেয় সে, “ছুঁবেন না আমায়! ঘেন্না লাগে আমার, ঘৃণা করি আমি আপনাকে! আপনি কেন বুঝতে পারেন না যে আপনি একটা জানোয়ার?”
এ শুনে তৌসির কিছু একটা বলতে যায়, ঠোঁট নড়ে ওঠে তার, কিন্তু শব্দ আকার পাওয়ার আগেই ঘরের দরজা ধাক্কা খেয়ে খুলে যায়। ভেতরে প্রবেশ করেন বিবিজান, তাঁর হাতে একটা ওষুধের কৌটো। তিনি ওষুধটা তৌসিরের হাতে বাড়িয়ে দিয়ে বিষাক্ত চোখে তাকান নাজহার দিকে, সেই দৃষ্টিতে বিষাক্ত সাপের হিংস্রতা নিয়ে বলেন “যদি তুই আমার নাতির ইচ্ছে পূরণ না করস, তাইলে কিন্তু খবর আছে। ভালো করেই তো বুঝতে পারতাছিস আমি কী করুম। ও তোর জামাই। ও যদি ওর নিচে দিনে একশোবারও শুইতে কয় তোরে। তোর শুইতে হইব।”
উনার এই বিষাক্ত কথাগুলো চাবুকের মতো আঘাত করে নাজহার গায়ে। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। রাগে দাঁত চেপে চিৎকার করে ওঠে সে, “একশোবার শোয়ার এতই শখ থাকলে আপনি নিজে শুয়ে পড়ুন না তাহলে! আপনি তো ব্যাস, আপনি শুতে বেশ ভালোই পারবেন!”
কথাটা শোনা মাত্রই বিবিজানের চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠে। ক্ষোভে তিনি নাজহাকে আঘাত করতে উদ্যত হন, তাঁর হাত উঠে আসে শূন্যে। তৌসির তৎক্ষণাৎ উঠে গিয়ে উনাকে আটকে দেয়, তাঁর হাত ধরে বেশ অস্থির গলায় বলে ওঠে সে, “তুমি এখন যাও তো, ওরে আমি বোঝাচ্ছি। ওর অবস্থা এখন একদম ভালো নয়।” তৌসিরের কথা শুনে বিবিজান নাজহার দিকে দাঁত কিড়মিড় করে তাকান তারপর তৌসিরকে বলেন, “আমি বাইরে থাইকা দরজা লাগাইয়া দিয়া গেলাম। যতক্ষণ না শুনছি ওর মুখ দিয়া ফেনা বাইর হইছে, ততক্ষণ আমি এই দরজা খুলুম না। ওর চিৎকারের আওয়াজ যেন্যা আমার ঘর পর্যন্ত যায়। আর ও যদি কোনো রকম নারাজ হয়, তোরে বাধা দেয়, আমারে শুধু কবি, আরেকটার গলা কাটতে আমার সময় লাগব না!”
এই বলেই বিবিজান ঘর থেকে বেরিয়ে যান। বাইরে থেকে দরজার বন্ধ করে দেন। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যেতেই নাজহা তৌসিরের দিকে তাকায়। তার চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই, শুধু আছে এক ধ্বংসাত্মক রাগ। নিজের গায়ের ড্রেসটা সে দু হাতে টেনে ছিঁড়ে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলে এক ঝটকায়। সেই ছিন্নভিন্ন কাপড়ের টুকরোগুলো বিছানায় পড়ে থাকে এক পরাজিত পতাকার মতো। এরপর নাজহা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। তবে এই কান্না কোনো অসহায়ত্বের কান্না নয়, এটা এক অন্তর্দাহের কান্না, তীব্র রাগের কান্না, যে কান্নায় ভেজা নয় বরং পুড়ে যাওয়ার গন্ধ মেশানো নাজহা কেঁদে ওঠে, “ভোগ করার লালসা জেগেছে, তাই না?ভোগ করতে না দিলে তো আমার পরিবারের ক্ষতি করবেন, এটাই তো আপনার চাল? তাহলে করুন ভোগ! একবারে মেরেই ফেলুন আমাকে!”
তৌসির কোনো কথা বাড়ায় না। তার মুখে কোনো রাগ নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই, আছে শুধু এক গভীর বেদনার ছাপ। ধীর ধীরে সে নাজহার দিকে এগিয়ে যায় সে। নাজহার ছড়ানো চুলগুলো হাত দিয়ে আলতো করে গুটিয়ে একটা খোঁপা বানিয়ে দেয়। তারপর তার ঠিক পেছনে গিয়ে বসে। নাজহার পিঠের কাঁচা ক্ষতের ওপর আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায় তৌসির। এই ক্ষতটা সে কোনোদিনই হতে দিত না, যদি সে সামনে থাকত, যদি সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন না থাকত, তবে কখনোই এই আঘাত নাজহার গায়ে লাগতে দিত না। নাজহার পিঠের প্রতিটা চিহ্ন তার বুকেও একই গভীরতায় ক্ষত হয়ে বসে আছে। নিজের আঙুলে বিবিজানের দেওয়া ওষুধটা কিছুটা নিয়ে সেই কাঁচা ক্ষতে লাগিয়ে দিতে থাকে সে। এই ওষুধটা দিলে অন্তত পিঠে কোনো স্থায়ী দাগ পড়বে না তাই দেওয়া। কিন্তু নাজহা এখন রাগ আর ঘৃণায় অন্ধ, তার চেতনা কোনো রক্তিম কুয়াশায় ডুবে আছে। সে নিজের দুই হাত পেছনে নিয়ে গিয়ে পিঠের সেই কাঁচা ক্ষতটা নির্মমভাবে খাবলে ধরে। তার নখের তীব্র আঁচড়ে ক্ষতের ওপর লেগে থাকা হালকা চামড়ার পর্দাটা ছিলে গিয়ে গলগল করে রক্ত বের হতে শুরু করে। সেই দৃশ্য দেখে তৌসিরের বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। হন্তদন্ত হয়ে সে নাজহার দুটো হাত শক্ত করে চেপে ধরে সে,সামনে এসে তাকে নিজের বুকের মাঝে পিষে ধরে ব্যাকুল গলায় বলে ওঠে, “এমন করিস না! ক্ষততে বড্ড যন্ত্রণা হবে রে তোর!”
নাজহা তৌসিরের এই লৌহকঠিন বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে থাকে, ডানা ভাঙা পাখির মতো হাঁসফাঁস করে, কিন্তু পারে না। তৌসির তাকে বড্ড শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে, কারণ এখন ছেড়ে দিলেই সে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কোনো উপায় না পেয়ে নাজহা আক্রোশে তৌসিরের কাঁধে কামড়ে ধরে। দাঁত বসিয়ে দেয় তার মাংসে আর কাঁদতে কাঁদতে সে বলে, “তৌসির, আপনি মরে যান! নয়তো আমায় মেরে ফেলুন! আপনার মতো অভিশাপ কে আমি আর কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছি না। তৌসির, আপনি না মরে যান প্লিজ! দয়া করে আপনি মরে যান!”
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৬
তৌসির কাঁধের সেই তীব্র যন্ত্রণাকে গায়েই মাখে না। সে নাজহার মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একদম শূন্য, আবেগহীন গলায় বলে, “এভাবে তো পারমু না রে মরতে। আমার তো বাঁচার বহুত ইচ্ছা। দয়াল নিজে থাইকা ডাক না দিলে, তাঁর কাছে যামু কেমনে?
