Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৭

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৭

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৭
সুরভী আক্তার

শাহিনা কাবিরের আকস্মিক ডাকে সবাই প্রথমে চকিতে তার দিকেই তাকালেন । অতঃপর তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালেন সিঁড়ির দিকে । একসাথে কয়েক জোড়া দৃষ্টি । ততক্ষণে রৌদ্র নিচে নেমে এসেছে । বসে পড়েছে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ারে ।
সবাই তব্দা খেলো হঠাৎ বেপরোয়া ছেলে টাকে দেখে । একই অবিশ্বাস্য অবস্থা দেখা দিলো সকলের চোখে । রৌদ্রের যেনো কোনো উদ্বেগ নেই । ওর কাছে সব স্বাভাবিক । প্লেট উল্টে পরোটা তুলে নিলো । পাশে শাফাহ্ , তার পাশে মেঘা । একবিংশীর প্লেটে অমলেট নেই আজ । রৌদ্র কারোর মুখ পানে দৃষ্টি তোলে নি এখনো । আড়চোখে রমনীর প্লেটের দিকে তাকালো । অমলেট না পেয়ে সবজি তুলে নিলো ওর পাত থেকে । পরোটা চিরে সবজি মাখিয়ে মুখে তুলে হুংকার ছাড়লো…..

” মম , ইভারা কে অমলেট দিয়ে যাও ।
আকস্মিক নীরবতা ছেদ হলো । স্তব্ধতা কাটলো সবার । সন্দিহান ঘোর কাটতেই ঘন পলক ফেললেন সকলে । শাফাহ্ আর মেহের একটু বেশিই অবাক হয়েছে । ভ্যাট ভ্যাট মুখ ফাঁক করে তাকিয়ে আছে ওরা দুটোয় । রৌদ্র ফিরেছে ? এতো তাড়াতাড়ি ?
একে অপরের দিকে তাকালো ওরা । ভ্রু নাচালো মেহের ! শাফাহ্ ঘাড় উঁচিয়ে ওষ্ঠ উল্টায় । ও নিজেও অবাকের চরম সীমানায় । প্লান কাজে দিয়েছে , তবে একটু বেশিই ফাস্ট কাজে দিয়েছে ।
রুবিনা কাবির স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন । ছেলেকে দেখে কেবলই চোখ সরু করলেন তিনি । তার মাঝে খুব একটা প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেলো না । অন্য সময় হলে খুশিতে চিকচিক করে উঠতেন । গদগদ হয়ে হাজার প্রশ্ন করে বসতেন ছেলেকে । কিন্তু এখন কিছুই করলেন না । উদ্বেগ এমন , যেনো আগে থেকেই ছেলের উপস্থিতির আভাস পেয়েছিলেন তিনি ।
কথা বললেন না । চুপচাপ কিচেনে ঢুকলেন । বাকিরা নিস্তব্ধ এখনো । মেঘা সিটিয়ে বসে । আড়চোখে অবলোকন করে তোফায়েল কাবির কে ।
হঠাৎ মুখ খোলেন তৌসিফ কাবির….

” কখন এসেছো ?
” কাল রাতে !
” কখন ?
” দু’টোর দিকে ।
” হঠাৎ ফিরে আসলে !
” টান পড়েছে তাই !
” কে টানলো ?
তৌসিফ কাবিরের পরপর প্রশ্ন । শেষের টা মুখ ফসকে অপ্রস্তুত বলে ফেলেছেন । রৌদ্র চোখ তুললো । ওষ্ঠপূটে দাঁত বসালো । ঠোঁটের কোণে ভিড় জমানো হাসি ঠেলে ফিচেল স্বরে বললো….
” ওওও বাবাই , তোমার বউ মা টেনেছে । এক টানেই ছুটে এসেছি ।
খাওয়ার মাঝে বিষম খেলো মেঘা । আজ আর গলায় কাশি আসলো না । তড়িঘড়ি করে পানি খেয়ে নিলো । চোখ তুললো না জড়তায় । এখানে ওর কিছু বলে লাভ নেই । মনে মনে ফুঁসলো । গজগজ করে বাঁকা চোখে তাকালো রৌদ্রের দিকে । এই লোকের নির্লজ্জতা ছোটাবে আজ ও । নিজে নির্লজ্জ , বেহায়া ,,, তাই বলে কি কারোর লজ্জা নেই ?
তৌসিফ কাবির উত্তর পেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চোখ নামিয়েছেন । ছেলে মেয়েরা ফিক করে হাসলো । সিরাত ধীরে বললো….

” রৌদ্র , মুখ খুলিস না ভাই । খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই । চুপচাপ খা । পরে কথা হবে ।
আজব , রৌদ্র তো চুপচাপই খাচ্ছিলো । ও কি আগ বাড়িয়ে কথা বলেছে নাকি ? যা প্রশ্ন করা হলো , কেবলই ফটাফট তার উত্তর করলো ।
রুবিনা কাবির দুটো অমলেট নিয়ে এসেছেন । মেঘার পাতে দিলেন একটা । আবার ওটাকেই তুলে রৌদ্রের পাতে দিলেন । অন্য টা সামনে রেখে বললেন চড়া গলায়..
” কে কোনটা খাবে সেটা তোমাদের ব্যাপার !
খ্যাট খ্যাটে স্বর তার । তোফায়েল কাবির চোখ তুললেন । স্ত্রী কে পরখ করলেন । ভাবগতিক বুঝলেন না ঠিক ।
কথা বাড়ালেন না এখানে ।
খাওয়া শেষে সিঁড়ি বেয়ে ঘরে উঠছিলো মেঘা । আদ্র আগে আগে উঠছে । মেঘা পা মেলালো ওর সাথে । অমনি এক মুহুর্ত থামলো আদ্র । সিঁড়ির মাথায় থেমে মেঘার দিকে ফিরে ঠোঁট কামড়ে টিটকারী মেরে বললো ফিসফিস করে….

” আচ্ছা মেঘ , রৌদ্র কে কিভাবে টানলি ? যে এক টানেই সুইজারল্যান্ড টু বাংলাদেশে ল্যান্ড করলো মাঝরাতে । না মানে , কোন সুতোর টান বলতো ?
মেঘা কিড়মিড় করলো । আদ্রের মজা বুঝে সজোরে ওর ডান বাহুতে একটা কিল বসালো । চিবিয়ে বললো….
” ভাইয়া , তুমিও ? তোমার ঐ রাইনো মুখো ভাইয়ের কথা বিশ্বাস করছো তুমি ?
” না করার তো কিছু দেখছি না !
আদ্রের গা ছাড়া ভাব । মেঘা রেগে মেগে আগুন ।
ওর রাগান্বিত চেহারা দেখে পরক্ষনে নরম আবেশে হাসলো আদ্র ।
নিচ থেকে ওদের দুজনের অমন ফিসফিস করে কথা বলাটা বেপরোয়া ছেলের চোখ এড়ায় নি । হাত মুঠো করে দাঁত খিচলো সে । রাগে শক্ত চোয়ালে হিসহিস করলো…
” আরেকটা থাপ্পড় খাওয়ার জন্য এতো উতলা হয়ে পড়েছিস ইডিয়ট ?
শুভ্র অফিসে বেরিয়ে যেতেই মেহেরের রুমে হামলে পড়েছে শাফাহ্ । চোখে মুখে একরাশ বিষ্ময় ভরা উৎকণ্ঠা ।

পরশু সন্ধ্যায় মেঘার অগোচরে একটা ফন্দি এঁটেছিলো ওরা । ফন্দি এঁটেছিলেন মূলত রুবিনা কাবির । ওরা সাহায্য করেছে । সেদিন মেঘার ঘুমের সুযোগ নিয়ে ওর ফোন হাতিয়ে ছাদে উঠেছিলো শাফাহ্ । রুবিনা কাবির সেই ফোন থেকে রৌদ্রের নাম্বারে একটা মেসেজ পাঠাতে বলেছিলেন । চঞ্চলা রমনী কথা মতো তাই করেছে । সাধারণ একটা বার্তা ’আই মিস ইউ‘ একটুই লিখে সেন্ড করেছিলো শাফাহ্ । তাও রুবিনা কাবিরের কথায় । রুবিনা কাবির নিজে করতে চেয়েছিলেন । জড়তায় নিজে না করে শাফাহ্ কে দিয়ে করিয়েছেন ।
পরবর্তীতে ভদ্রমহিলা নিচে নেমে আসলে মেহের শাফাহ্ কে আড়াল করে আরো বেশ কয়েকটা মেসেজ পাঠিয়েছে রৌদ্র কে । শাফাহ্ জানে না । কি পাঠিয়েছে ওকে দেখতে দেয় নি মেহের । তার আগেই সব মেসেজ ডিলিট করে দিয়েছিলো , যাতে পরবর্তীতে মেঘার চোখে না পড়ে । সেই মেসেজ গুলো পেয়েই কি ছুটে এসেছে রৌদ্র ? কি এমন মেসেজ করেছিলো , যে পরের রাত্রি গড়াতে না গড়াতেই ছুটে আসলো বেপরোয়া ছেলে টা ।
শাফাহ্ বারবার জিদ্দি খেয়ে জানতে চাইছে….

” মেহের আপু , বলো না – তুমি সেদিন কি মেসেজ পাঠিয়েছিলে ভাইয়া কে ?
মেহের মুখ ভার করলো । অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে হাসি আটকে বললো….
” তুই বুঝবি না । তোর কাজ নেই ওসব জেনে ।
” এহহহ্ ,, বলবে না তুমি ? আচ্ছা যাও,শুনবো না ! কিন্তু আমি মামনি কে বলে দেবো , তার কথার বাইরে গিয়ে তুমি আরো অনেক উল্টো পাল্টা মেসেজ পাঠিয়েছো ভাইয়া কে । মামনি শুধু ‘আই মিস ইউ’ পাঠাতে বলেছিলো ।
” যা , গিয়ে বল । কি বলবি ? বরং বললে মামনি খুশিই হবে । আমি যা পাঠিয়েছিলাম , তা দেখেই এক রাতের মধ্যে ফিরে এসেছে রৌদ্র ভাইয়া । নতুবা কেবল একটা মাত্র মেসেজ দেখলে এতো তাড়াতাড়ি আসতো না । বুঝলি ? অবশ্য তোর মোটা মাথায় এসব ঢুকবে না ।
শাফাহ্ ওষ্ঠ উল্টায় । ওর মোটা মাথায় এসব আসলেই ঢুকছে না । অতো দূর গভীরে ভাবার বোধশক্তি নেই তার

দিনের শেষ ভাগ । সন্ধ্যার লগন ধরনীকে তিমিরে ঢেকে দিচ্ছে । বাড়ির পিছনের দিকটায় পানা পুকুর আছে একটা । আজকাল সময়ে অসময়ে বৃষ্টি নামে মাঝে মাঝে । পুকুরে পানি জমেছে ভরপুর । ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে সেখান থেকেই ।
শিশির খাটের উপর হাঁটু জড়িয়ে গুটিয়ে বসে আছে একলা নির্জনে । জানালা খোলা । লোহার শিকে কপাল ঠেকিয়ে পুকুরের দিকে একস্থির হয়ে চেয়ে আছে । মেয়েটা বরাবর দেখতে গেলে নির্জীব । হাসে না বেশি । ক্ষণে ক্ষণে যেওবা হাসতো ,সে হাসি টুকুও মিলিয়ে গেছে গত তিন দিন থেকে । ইকরা আপুর বিয়ের সম্বন্ধ আসলো । আগেও এসেছে অনেক । সবগুলোই ফিরিয়ে দিয়েছে ইকরা । পাড়া প্রতিবেশী ওদের পরিবারের সাথে মেশে না । বলতে গেলে একঘরে ওরা ।
ইকরা কে নিয়ে কানাঘুষো চলে পাড়ায় । মেয়ে বড় হয়েছে , বয়স বাড়ছে । বিয়ে দেয় না তবুও । লোকচক্ষুতে কটু লাগে এই দৃশ্য ।
ইকরা ছাড়া এই পরিবার টা আরো নিঃস্ব হয়ে যাবে , তারা কেউ এটা আর দেখে না ।
শিশির এবারে পড়েছে দ্বিধা দ্বন্দ্বে । সেদিন ভদ্রমহিলা বলে গেলেন , তিনি একসাথে দুই মেয়েকেই নিজের ছেলেদের বউ করতে চান । একজনকে ঘরে তুলবেন ।

অন্যজন এ বাড়িতেই থাকবে । দ্বিতীয় টা মহা সুযোগ । এটাও সম্ভব ? কেউ একজন ইকরা আপুকে ভালোবেসে নিজের পরিবার ছেড়ে এ বাড়িতে এসে থাকবে ?
আবিদ কে যতদূর দেখলো , ছেলেটা মন্দ নয় । ইকরার ও একটা সফট কর্নার আছে ওনার প্রতি । শিশির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করেছে এটা ।
সেদিন থেকেই ইকরা কে বোঝানোর চেষ্টা চলছে । এখনো নারাজ রমনী । সে বিয়ে করবে না । তার উপর নিজের বোন যুক্ত হলে তো আরোও বিয়ে করবে না । শিশিরের পড়াশোনার ইচ্ছে আছে । জীবনে কিছু একটা করার ইচ্ছে আছে । বিয়ের পর ও সব ইচ্ছের বিসর্জন দেবে ? এটাতো হতে দেওয়া যায় না ।
শিশির আনমনে ভাবছে । ওদের জীবনটা একসময় কি ছিলো , আর এখন কি হয়ে গেলো । আজ থেকে বারো বছর আগে যখন বাবা বেঁচে ছিলেন , তখন সবটা ঠিক ছিলো । আর এখন সব এলোমেলো ।
আজমিরা বেগম ঘরে ঢুকলেন । মেয়েকে নিথর হয়ে বসে থাকতে দেখে ডাকলেন…

” শিশির ?
নড়েচড়ে ওঠে মেয়েটা । উত্তর করে…
” হ্যাঁ মা ।
ভদ্রমহিলা বসলেন খাটের এক কোণে । কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছোট মেয়ের মলিন মুখখানা দেখলেন চোখ ভরে । বললেন ভেজা গলায়….
” একটা কথা রাখবি আমার ?
” বলো !
” এই বিয়েতে রাজি হবি তুই ? ইকরার কাছে শুনেছি , ওদের ফ্যামিলি ভালো । শুধু ভালো নয় , খুব ভালো ।
” ভালো হলেই ভালো ।
মেয়েটা শুকনো কন্ঠে বুলি ফুটিয়ে মুখ ফিরিয়ে আবার শিকলে কপাল ঠেকায় । আজমিরা বেগম নীরবতা পালন করেন । অতঃপর বলতে আড়ম্ভ করেন….

” তুই তো অনেক কিছুই পেয়েছিস শিশির । কিন্তু ইকরা কিছু পায় নি এ জীবনে । সবসময় আমাদের কথা ভেবে এসেছে ‌। ওর বয়সই বা কতো বল ? তোর থেকে দুই বছরের বড় । এতেই দেখ , কত দায়িত্বের ভার ওর কাঁধে । যে ভারে নিজের জীবন নিয়েও দু দন্ড ভাবে না ও । কতগুলো বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে । সব ফিরিয়ে দিয়েছে । কেননা বিয়ে হলে ওকে চলে যেতে হবে আমাদের ছেড়ে । আমাদের দেখার জন্য কেউ থাকবে না । সিফাতের কথা কত ভাবে ও । কিন্তু সারাজীবন কি এভাবে চলবে বল ? এবার একটা সুযোগ এসেছে ওর জীবনটা গোছানোর । আবিদ ছেলেটা খারাপ নয় । যে ছেলে ওর জন্য সব ছাড়তে পারে , সে ছেলে কি ওকে ছাড়বে নাকি কখনো ? ওদের কোনো দাবি দাওয়াও নেই । কেবল একটাই শর্ত , তোকে চায় ওরা ।
ভদ্রমহিলা থামলেন । শিশির আনমনে শুনছে । তবে মনযোগ আছে মায়ের কথায় ।

” তোকেও তো একদিন না একদিন বিয়ে দিতেই হবে । একেবারে যদি ঝামেলা চুকে যায়, তাহলে খারাপ কিসে বল ?
” আমি ঝামেলা হয়ে গেলাম মা ?
” সেভাবে বলি নি আমি । এতো ভালো একটা পরিবার থেকে সম্বন্ধ এসেছে । আমি ইকরার কথা ভেবে তোকে বলছি , রাজি হয়ে যা এই বিয়েতে । ইকরা তোর কথা ভেবেই দ্বিমত করছে । তুই রাজি হয়ে গেলে ও বাঁধা দিতে পারবে না আর ।
” আমি পড়তে চাই ।
” পড়বি । আমি বলবো ওনাদের । বিয়ের পর পড়বি তুই । যারা নিজেদের এক ছেলেকে ঘর জামাই রাখতে দ্বিমত করেন না , তারা তোর পড়াশোনা নিয়েও দ্বিমত করবেন না নিশ্চয়ই । ইকরার কথা একটু ভাব । ও আজ ফিরলে আমি যে করেই হোক মানাবো ওকে । আগে তুই তোর সিদ্ধান্ত বল ।
শিশিরের বুক চিরে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে আসে । চোখ বুজে নেয় ও । উত্তর করতে গলায় বাঁধে । যেনো শ্বাস রুখে আসে দলা পাকিয়ে ।
তবুও রুদ্ধ গলায় কথা ফোঁটায় রমনী….

” তোমরা যা করবে ,, আমি তাতেই রাজি মা । আমার দ্বিমত নেই ।
ভদ্রমহিলা সহসা হাসলেন উজ্জ্বল হয়ে । বুক হালকা হলো তার । উঠে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন….
” তাহলে আজ তোর আপু আসুক । আমি বলবো ওকে । তোরা দুই বোন দুই জা হবি । অবশেষে আমার মেয়েদের বিয়ে হবে । সিফাত শুনলে খুব খুশি হবে দেখবি ।
গদগদ হয়েই ঘর ছাড়লেন ভদ্রমহিলা । শিশির কেবলই মায়ের খুশি টুকু দেখলো চোখ ভরে । নিঃশব্দে দীর্ঘ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো অগণিত ।

রৌদ্র সেই সকালেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল । আর দেখা মেলে নি তার । ডিনার শেষ সকলের । সবার ধারণা বেপরোয়া ছেলে রাত বিরেতে ফিরবে । যেমনটা করে সে । কিন্তু আজ সবার ধারনায় জল ঢেলে ঠিক রাত্রি নয়টায় বাড়ি ফিরেছে রৌদ্র । কর্তারা ড্রইং রুমেই বসে ছিলেন । রৌদ্র পাত্তা দিলো না । হাঁক ছেড়ে ডাকলো….
” মম , খেতে দাও কিছু । রুমে নিয়ে এসো । খিদে পেয়েছে ভীষণ ।
ড্রইং রুমে থেকেও রুবিনা কাবির সাঁড়া দিলেন না । রৌদ্র সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে থামলো । আবার ডেকে বললো…
” কি হলো মম , শুনছো ? খাবার নিয়ে এসো ।
রুবিনা কাবির বেজায় চটেছেন ।

ছেলের বেপরোয়া গিরি তার ও সহ্য হচ্ছে না আর । তিনি কত ভাবেন ঐ ছেলের জন্য । অথচ ছেলে তাকে তোয়াক্কাই করে না । উল্টো দিকে একটা উটকো মেয়ের সামান্য একটা মেসেজ পেয়ে ছুটে এসেছে ‌। এটা বড্ড আঘাত হেনেছে তার হৃদয়ে । রৌদ্র তো ঐ মেয়েকে বউ বলে মানে না । নেশার ঘোরে বিয়ে করে নেশা কেটে গেছে । বউ মানবে না বলে বিদেশে কাটালো দীর্ঘ পাঁচ বছর । এখন আবার হঠাৎ করে ফিরে এসে কিসের এতো টান জমলো বউয়ের প্রতি ? মায়ের আগে কিনা বউ !?
রাগে গজগজ করলেন রুবিনা কাবির । রৌদ্র উঠে যেতেই দৃঢ় পায়ে কিচেনে ঢুকলেন তিনি ।
করলা কেটে টুকরো করে রেখেছিলেন আগে থেকেই । দশের অধীক কাঁচা মরিচ সহ টুকরো করলা গুলো ব্লেন্ডারে দিলেন রাগের মাথায় । শাহিনা কাবির বোতলে পানি ভরার জন্য কিচেনে ঢুকেছিলেন । রুবিনা কাবিরের এমন কান্ড দেখে হকচকিয়ে বললেন….

” একি রুবিনা , এসব কি করছিস ? এতো গুলো মরিচ দিয়ে করলা ব্লেন্ড করে কি করবি এই রাতে ?
” মিষ্টত্ব কমাবো একটু । এ বাড়ির বেপরোয়া ছেলে আজকাল বদলে যাচ্ছে । দেখি কতটা বদলেছে । করলা তো তার অপ্রিয় । এখন প্রিয় মানুষের হাতে ঝাল ঝাল তেতো করলার জুস খায় কিনা দেখি একটু ।
শাহিনা কাবির বুঝলেন না । নির্বোধের ন্যায় বললেন…
” কিসব বলছিস ? এই রাতে করলার জুস কে খাবে ? রৌদ্র ? পাগল হয়ে গেছিস ? করলা খায় না ও । আর এতো ঝাল দিয়েছিস , তুই জানিস না ও ঝাল খেতে পারে না ?
” আরো কত কি জানতাম । সব জানা তো ভুল বেরোলো দেখছি । অনেক সহ্য করেছি ওর বেপরোয়া গিরি । নরম হতে হতে নিজের দাম কমিয়ে ফেলেছি । তোয়াক্কাই করে না ও আমাকে । আমি ওর তোয়াক্কা করবো কেনো ? দেখি , কার তোয়াক্কা করে ও ! যার তোয়াক্কা করে , তাকে দিয়েই ওকে শায়েস্তা করাবো আমি ।
” তোর কথা আমি বুঝি না বাপু ।

রুবিনা কাবির প্রত্যুত্তর করলেন না । ব্লেন্ড করে গ্লাস ভর্তি জুস ঢেলে বেরিয়ে আসলেন কিচেন থেকে । সোজা উপরে উঠে মেঘার ঘরে ঢুকলেন । শাফাহ্ মেঘা ফোন ঘাটছে এলোমেলো হয়ে শুয়ে । রুবিনা কাবির মেঘা কে ডেকে ভনীতা হীন বললেন আদেশের সুরে….
” এই মেয়ে , এই জুসটা রৌদ্রের ঘরে দিয়ে আয় তো । বলবি তুই নিজে বানিয়েছিস । যে করেই হোক সবটা ওকে খাওয়াবি । তার পর ফাঁকা গ্লাস এনে দিবি আমার হাতে ।
মেঘা টালমাটাল হয়ে উঠে বসলো । তৎক্ষণাৎ কিছু বুঝলো না । রুবিনা কাবির এক কথা আবার বললেন । মেঘা নেমে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই ওর হাতে গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে কড়া কন্ঠে বললেন….
” একটা কথাও বলবি না । যা বলছি তাই কর । যা , এটা রৌদ্র কে দিয়ে আয় গিয়ে । সবটা যদি খাওয়াতে পারিস , তাহলে রান্না শেখাবো তোকে । রান্না শিখতে চাস তো….
” কিন্তু মামনি । আমি ওনার ঘরে…

রুবিনা কাবির কথা শেষ করতে দিলেন না ওকে । ঠেলে ঠুলে এ ঘর থেকে বের করিয়ে রৌদ্রের ঘরের দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন ওকে । মেঘা পুরো আহম্মক বনে রইলো । আচমকা ভদ্রমহিলার এমন আচরণের মানে বুঝলো না । ভেতরে নিশ্চিত বাঘ । যেচে পড়ে বাঘের খাঁচায় যাবে ও । ঐ লোকের অভ্যাস ভালো না ।
মেঘা থম মেরে কিংকর্তব্য বিমূঢ় দাঁড়িয়েই রইলো । রুবিনা কাবির চোখ পাকাতেই ধড়ফড় করে ঘরে ঢুকলো আবার । সেখান থেকে সরে আসলেন ভদ্রমহিলা । ঘরে রৌদ্র নেই । ওয়াশ রুমে শাওয়ার নিচ্ছে । দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ে মেঘা । এখন ও এই জুসটা রেখে কেটে পড়বে এখান থেকে । তাই করার জন্য উদ্যত হলো । বেড সাইড টেবিলের পাশে জুসের গ্লাস রেখে পিছু ফেরা মাত্রই থমকে দাঁড়ালো । পিটপিট করে ঘাড় ঘোরালো বাঁ দিকে । বিছানার উপর রৌদ্রের ফোন । ধক্ করে ওঠে একবিংশী ।
বেপরোয়া লোকটাকে নিয়ে করা আজগুবি ধারনা গুলো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে । কি আছে ঐ লোকের ফোনে ? কি আছে বিদেশে ? কে আছে ? সেদিন ভিডিও কলে কিছুই দেখে নি মেঘা । কিন্তু ঐ দিন ঐ বাচ্চা টাকে দেখেছিলো যে ? সে কে ? কে ফোন করে রৌদ্র কে ? রৌদ্র একদিন মুখ ফসকে বলেছিলো , ও বাচ্চা সামলানো শিখেছে বাচ্চা জন্ম দিয়ে । তাহলে ঐ বাচ্চা টা কি…..

এসব ধারনা বারংবার কুড়ে খায় রমনীকে । আজ সুযোগ পেয়েছে ও । রৌদ্রের ফোন চেক করলেই সব জানা যাবে ।মেঘা ভয়ে ভয়ে ওয়াশ রুমের দিকে তাকায় । হাত কাঁপে । কম্পিত হাত বাড়িয়ে বিছানার উপর থেকে ফোনটা তুলে নেয় হাতে । আজ ও দেখেই ছাড়বে এই লোকের ফোন ।
পাসওয়ার্ড তো জানা । থেমে থেমে চিরচেনা সেই পাসওয়ার্ড টা টাইপ করলো রমনী । লক খুলে ফোন ওপেন হলো সহসা । বোধহয় এক সেকেন্ড ও দেরি হলো না । ফোনের হোম স্ক্রিনের ওয়াল পেপারের দিকে নজর পড়া মাত্রই চড়কে উঠলো একবিংশীর মস্তিষ্ক ।

পুরো পৃথিবী যেনো কেঁপে উঠলো তার নিকট । হাঁটু গুঁড়িয়ে আসলো । সমস্ত শক্তি খুইয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো সে । থমকে রইলো পুরো স্তব্ধ হয়ে । আঁখি কোটর ভরে উঠলো অবাধ্য নোনা জলে ।
অবিশ্বাস্য লাগলো সবটা । চোখ নিভিয়ে আবারো তাকালো । নাহ , মিথ্যে নয় । ওয়াল পেপারে ভাসছে চিরচেনা একখানা মুখ । তার নিজের মুখ । ঘুমন্ত একবিংশীর নির্ভেজাল মুখশ্রী । একখানা পুরুষালি হাত দেখা যাচ্ছে কপালের পাশে । বোধহয় আলগোছে রমনীর কপালে ধারে আছড়ে পড়া কুন্তল গাছি সরিয়ে দেওয়ার জন্য উদ্যত করেছে হাত খানা । মেঘার হৃদস্পন্দন থেমে যায় এক মুহুর্ত ।
এই ছবিটা এই লোকের ফোনের ওয়াল পেপারে কেনো ? এটা তো মেঘার ঘুমন্ত অবস্থার ছবি । কবে তোলা হলো এটা ? আর এই ফোনের ওয়াল পেপারে ভাসছে কেনো ?
মেঘা শুল্ক ঢোক গেলে । সর্বাঙ্গের কম্পন বাড়ে । শিরশির করে হাত পায়ের তালু । এসি চলছে , তবুও উষ্ণ তরলের ঢেউ গড়াচ্ছে শিরদাঁড়া বেয়ে ।

ঠোঁট ভিজিয়ে দুদিকে মাথা ঝাঁকায় রমনী । চোখ বুজে দীর্ঘ শ্বাস টেনে তড়িঘড়ি করে কললিস্ট ওপেন করে । উপরে যতগুলো নাম্বার ভেসে ওঠা , সব আননোন নাম্বার ‌। ভিন্ন কোডে বিদেশি নাম্বার । সেভ নেই একটাও । স্ক্রল করে নিচে নামে মেঘা , কেবল একটা সেইভ নাম্বার চোখে পড়লো । ‘My property’ দিয়ে সেইভ করা একটা নাম্বার । মেঘাকে খুঁটিয়ে দেখতে হলো না । সেইভ নামটার পাশে তার এগারো ডিজিটের নাম্বার টা চকচক করছে ।
আবারো যেনো ধাক্কা খেলো রমনী । স্তব্ধ হলো দ্বিতীয় বার । রৌদ্র ওকে MP ডাকে মাঝে মাঝে । মেঘা কখনো ভেবে দেখে নি এটার অর্থ কি হতে পারে ! ভেবে দেখার আগেই আজ উত্তর পেয়ে গেলো । MP মানে My property । অর্থাৎ , মেঘা ঐ বেপরোয়া লোকটার প্রোপার্টি ?
ভেবেই নাক টেনে মুখ বাঁকায় রমনী । অভিমানে মনকে সংযত করে, ও কারোর প্রোপার্টি নয় ।
দ্বিতীয় কোনো সেইভ নাম্বার পাওয়া গেলো না ফোনে । আর না কোনো নাম্বার বাচ্চার ছবি দিয়ে সেইভ করা হয়েছে । কিন্তু মেঘা তো সেদিন দেখেছিলো । স্পস্ট মনে আছে , ও ভুল দেখতেই পারে না ।
কললিস্ট থেকে বেরিয়ে গ্যালারি ওপেন করলো মেঘা । কোনো ছবিতে ট্যাপ করার আগেই বেপোরোয়া লোকটার গুরুভার কন্ঠ কানে বিধলো ঝংকার তুলে….

” হেয়য়য় MP ? হোয়াট আর ইউ ডুয়িং ?
ছলকায় একবিংশী । ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় । রৌদ্রের ফোনটা পেছনে লুকিয়ে আলগোছে বালিশের নিচে আড়াল করে ।
পাপড়ি ভিজেছে কার্নিশের নোনা জলে । মেঘা ঝট করে তাকালো । রৌদ্রের খোলামেলা ভেজা ভেজা উদ্যম শরীর দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আবারো ঝট করেই দৃষ্টি নামিয়ে নিলো । পদ যুগলের বৃদ্ধাঙ্গুলের নখ খুটলো মেঝেতে । চোখ খিচে দুহাতে ওরনার কোণা খামচে ধরলো একবিংশী । ধড়ফড় অনুভূতি জোরালো হলো অধীক মাত্রায় ‌।
রমনী দৃষ্টি চুরিয়ে গা বাঁচায় । তিরতির করে কেঁপে উচ্চারণ করে ধরা গলায়….

” কি.. কিছু না । জুস এনেছিলাম আপনার জন্য ! খেয়ে নিন….
রৌদ্র বেশ অবাকই হলো । ঘাড় উঁচিয়ে ভেজা চুল টাওয়েল দিয়ে মুছতে মুছতে বললো…..
” ওওও , আনবিলিভেবল !! তুমি আমার জন্য জুস দিতে এসেছো ? ইন্টারেস্টিং !! ব্যাপার কি বলতো , অদ্ভুত লাগছে তোমায় ! জুস দিতে এসেছো , নাকি বাহানা খুঁজে নিজেকে দিতে এসেছো ?
মেঘা মুখ বিকৃত করলো তাৎক্ষণিক । না তাকিয়ে রেগে বললো…
” বাজে কথা বলবেন না । খেয়ে দেয়ে গ্লাস খালি করুন ।
রৌদ্র ওকে পাশ কাটিয়ে বসলো খাটের পাশে ‌। বিছানার মাঝামাঝি ফোন নেই , সেটা নজর কাড়লো । বালিশের নিচে ফোন গেলো কি করে ? উত্তর খুঁজে নেওয়া মাত্রই ঠোঁট কামড়ে হাসে রৌদ্র ।
মেঘা ওকে সন্দেহ করছে , বুঝতে বাকি নেই ।
হাঁফ ছাড়ল বুক চিরে । গ্লাসটা হাতে তুলে নাক সিটকে পরখ করলো । জানতে চাইলো…

” এটা কিসের জুস ?
” জানি না । খেয়ে নিন !
” খিদে পেয়েছে , জুসে পেট ভরবে না !
” মামনি খাবার নিয়ে আসবে একটু পর । এটা খেয়ে আমাকে উদ্ধার করুন আগে ।
রৌদ্র দুদিকে মাথা নাড়ায় । মেঘা এখনো চোখ নামিয়ে রেখেছে । তাকালেই চরম বিপদ । গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে । ভয় পাচ্ছে । এ পর্যায়ে ওকে দেখে মনে হলো , একটু ছুঁয়ে দিলেই মিলিয়ে যাবে যেনো ।
চোখ নামিয়ে গ্লাসে চুমুক বসায় রৌদ্র । একটু খানি তরল ঠোঁট ছাপিয়ে জিভ স্পর্শ করা মাত্রই চোখ মুখ বিকৃত করে ছিটকে মুখ সরিয়ে নেয় ‌। ওয়াক করে মুখের থু থু ফেলে । গ্লাস রেখে সটান দাঁড়িয়ে যায় । হা করে শ্বাস টানার চেষ্টা করে । কি তেতো এটা ! ঝালের পরিমাণ অত্যাধিক । তেতো স্বাদে মুখ কুঁচকে আসে ‌। গুলিয়ে আসে গা ।
রৌদ্র রেগে মেগে ধমকায়…

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৬

” হোয়াট রাবিশ !! ওয়াককক্ ,,, ইডিয়ট , এটা কিসের জুস নিয়ে এসেছিস তুই ?
মেঘা বুঝলো না । চোখ তুললো এবার । উল্টে নিজেই জানতে চাইলো….
” কিসের জুস ?
” থাপ্পর খাবি , কি এনেছিস এটা ?
” জুস , খেয়ে নিন !
” ছ্যাহহহ্‌, এটা জুসস ? ইডিয়ট , বাড়ির সমস্ত ঝাল মিশিয়ে এনেছিস এটাতে ? করলা , হোয়াট দ্যা ফা*ক । করলার জুস খাওয়াতে এনেছিস আমায় ?

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here