আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪১
সুরভী আক্তার
পরদিন সকাল পেরিয়ে প্রায় রাত ।
ঘরবন্দি মেঘা । সেই যে নিজেকে ঘরে আটকে নিলো , আর খোলেনি দোর । বলা চলে , রৌদ্র বাড়িতে থাকলে সে দোর খোলে না । বেপরোয়া ছেলে সেসবে ধার ধারে নি এখনো । বাড়িতেই নেই সে । মেঘা কে দেখে নি কালকের পর । আজ সকালে বেরিয়ে গেছে । এ অবধি ফেরে নি ।
ডিনারে বসবেন সকলে । টেবিলে খাবার সাজানো হচ্ছে । শাফাহ্ একা নিচে নামলো । ওকে একা দেখে চোখ সরু করলেন তোফায়েল কাবির । ডেকে শুধালেন….
” শাফাহ্,,, মেঘা কোথায় ?
” ও তো রুমে ।
” খাবে না ?
” নিচে আসবে না । রুমেই খাবে ।
মিনমিনে গলায় উত্তর করলো শাফাহ্ । বসে না থেকে উঠে দাঁড়ালেন তোফায়েল কাবির । আর কোনো কথা না বলে সোজা উপরের দিকে পা বাড়ালেন ।
নক করলেন মেয়েটার ঘরের দরজায় । কাবাডের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো মেঘা । এলোমেলো হয়ে আছে ওর সব কাপড় চোপড় । বেডের উপর একটা ল্যাগেজ ও আছে । নিজের ড্রেস গুলো গোছাচ্ছে রমনী । ও ভেবেছিলো হয়তো শাফাহ্ । অনুমতি দিলো না দেখেই । ঘরে ঢুকলেন তোফায়েল কাবির । মেঘার কর্মকাণ্ড নীরবে পরখ করলেন প্রথমে । নিশ্চুপ থেকে ধীর গলায় ডাকলেন….
” মেঘা ? এসব কি করছো ?
সচকিতে চায় রমনী । ভদ্রলোক কে দেখে অপ্রস্তুত হলেও মুচকি হাসে । কাবাডের সামনে থেকে সরে আসে ।
” এইতো বাবা , কাপড় গোছাচ্ছি !
” এসব কেনো ?
” ওমা , প্রিপারেশন নেবো না আগে থেকে ? আর তো কিছুদিন । এখন গুছিয়ে রাখছি , পরে ঝামেলা বাঁধাবো না আর । শুধু টুক করে কেটে পড়বো….
থমকান তোফায়েল কাবির । বুক চিরে দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন নিঃশব্দে । কন্ঠ নুইয়ে আসে দ্বিগুণ ।
” আমি তোমাকে রৌদ্রের থেকে দূরে থাকতে বলেছি, আমাদের থেকে নয় ।
” তোমাদের থেকেও দূরে থাকাটা অভ্যাস করে নিচ্ছি বাবা । দূরে যাবো যে…
” মেঘা !
” হ্যাঁ ?
” নিচে চলো , ডিনার করবে ।
মেঘা স্থির হয়ে গেলো । নরম চোখে তাকালো ভদ্রলোকের দিকে । শান্ত কন্ঠে বললো…
” তুমি যাও বাবা , আমি আসছি ।
প্রস্থান করলেন ভদ্রলোক । মেঘা তার প্রস্থানের পিঠে মুচকি হাসে । ঘাড় উঁচিয়ে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে । কাপড় গুলো এলোমেলো হয়ে আছে । কিছু কিছু বাইরে রেখে বাদ বাকি গুলো গোছাবে । এতো সব জিনিসপত্র ওর , কতগুলো ল্যাগেজ লাগবে কে জানে । সবে একটা গোছাতে শুরু করেছে । ল্যাগেজ টা ওভাবেই রেখে চেন আটকে দিলো । বিছানা থেকে নামিয়ে সেটাকে রাখলো কাবাডের একপাশে । পুরো আলমারি জুড়ে ওর কতশত জিনিস । মেঘা চোখ ঘুরিয়ে দেখে । ধীরে ধীরে হাত বোলায় নিজের জিনিস গুলোর উপর ।
রৌদ্র ফিরলো বারোটার পর । ততক্ষণে সবাই ঘুমে কাঁদা । ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো সে । আপন খেয়ালে নিজের জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে আবারো উঠলো । ঘরে পৌঁছানোর আগে করাঘাত করলো রমনীর দোরে । ধাক্কা দিলো । দরজা খুললো না । কপাল কুঁচকে আসলো নির্বিকারে । চোখ সরু করে দরজার আগাগোড়া নজরে নিলো । আজ আবার দরজা আটকানো ?
শক্তি খাটানোর চেষ্টা করলো সে । কিছুতেই খুলতে পারলো না । মেঘা দরজা আটকে ঘুমালেও শাফাহ্ দরজা খুলে রাখতো ঘুমানোর আগে । রৌদ্রের কথা মোতাবেক মেঘার ঘুমানো অবধি জেগে থাকতো সে ।
আজ ও দরজা খুলে দেয় নি ! বিব্রত হয়ে মুখ খিচে নেয় রৌদ্র । কফির মগটা চেপে ধরে গটগটিয়ে নিজের ঘরে যায় । ফোন তুলে শাফাহ্’র ফোনে কল লাগায় । দু তিনবার রিসিভ হয় না । চতুর্থ বার রিসিভ হতেই চাপা স্বরে ধমকায় রৌদ্র….
” গবেট , তোকে বলেছিলাম না দরজা খুলে ঘুমাবি ? মনে নেই ? আর চকলেট পাবি না বলে রাখলাম ! চকলেট নিতে চাইলে দরজা খুলে দে ।
ফোনের ওপাশ থেকে কিছু শোনা গেলো না । নিরবতা দেখে রৌদ্র ঘর থেকে বেরিয়ে এ ঘরের দরজার সামনে আসতে আসতে আবার ধমকায়….
” কি হলো ? দরজা খুলতে বলেছি , কানে যায় নি ?
টুং টুং করে ফোন কাঁটার আওয়াজ কানে বাজলো । রৌদ্র ভাবলো হয়তো শাফাহ্ উঠেছে । কিন্তু না । মিনিট কয়েক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও কোনো কিছুর আভাস পাওয়া গেলো না । চরম রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে রৌদ্রের । কফির মগ রুমে রেখে এসেছে । ফোনটা মুঠো করে পকেটে ঢুকিয়ে নিলো । রাতের নিস্তব্ধতায় গুমোট চারপাশ । দূরে কোথাও কেউ শ্বাস ফেললেও তার শব্দ শোনা যাবে । সে জায়গায় রৌদ্র সিদ্ধান্ত নিলো দরজা ভাঙার । যেই ভাবা সেই কাজ । একটু পেছালো । আগপিছ না ভেবেই আচমকা সজোরে একটা লাথি বসালো দু কপাটের দরজায় । অমনি হাট করে দমকা শব্দ তুলে ঠাস করে খুলে গেলো দরজাটা । দুটো কপাট মেলে গেলো দুদিকে । একপাশে টেবিল , অন্যপাশে দেয়ালের সাথে বাড়ি খেয়ে বিকট শব্দ তুলে কাপলো বাড়ি সুদ্ধ । ছিটকিনি ভেঙে গেছে । রৌদ্র পরোয়া করলো না । করেছেই বা কবে ? হাঁফ ফেলে ঘরে ঢুকলো ।
বেঘোরে ঘুমের অতলে হারিয়েছে দুই রমনী । এই যে বিকট শব্দ হলো , তাতেও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই ওদের মাঝে । নড়চড় দেখা গেলো কারোর ।
রৌদ্র বাম পাশের শাফাহ্ কে দেখে কিড়মিড়িয়ে বিড়বিড় করলো….
” গাব্বু , মরেছিস ঘুমের রাজ্যে ? আর যদি চকলেট দিয়েছি তোকে , তাহলে নিজের নাম বদলে রাখবো আমি । গবেট একটা , ঠিকঠাক ভাবে ছোট্ট একটা দায়িত্ব পালন করতে পারিস না !
ঘুমন্ত রমনীর কানে পৌঁছালো না । ফোঁস ফোঁস করলো রৌদ্র । নিজেকে ধাতস্থ করে খাটের ডান পাশে পা বাড়ালো । মেঘা শুয়ে ডান কাত হয়ে । একটু গুটিয়ে ঘুমিয়ে আছে । হাঁটু ভাঁজ করে মুড়ে ওর সম্মুখে মেঝেতে বসে রৌদ্র । হলদে ডিম লাইট জ্বলছে । যার আলোয় রমনীর ফর্সা চেহারা হলদেটে দেখাচ্ছে ।
এদিকে দরজার বিকট শব্দে ঘুম ভেঙ্গেছে আদ্রের । পাশেই তার রুম । চমকে উঠেছিলো সে । ধড়ফড় করে বাইরে বেরিয়েছে । চোখ নিভু ঘুমের ভারে । চোখ ডলে করিডোরে এপাশ ওপাশ তাকাতেই দেখতে পেলো মেঘা আর শাফাহ্’র ঘরের দরজা সটান খুলে রাখা । কয়েক স্তর ভাঁজ পড়লো ওর কপালে । পরিক্ষণের উদ্দেশ্য একটু পা এগোতেই দরজার বাইরে থেকে ভেতরকার দৃশ্য নজরে পড়লো । আবছা ক্ষুণ্ন আলোয় প্রথমেই নজরে পড়লো রৌদ্রের উপর । মেঝেতে বসে মেঘার দিকে ঝুঁকেছে সে । রমনীর অবিন্যস্ত কেশরাশী কুন্ডলি পাকিয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বালিশে ।
মুখের উপর আছড়ে পড়েছে গুচ্ছ কয়েক । রৌদ্র হাত বাড়িয়ে তা সরিয়ে দিলো । দৃশ্যমান করলো একবিংশীর পূর্ণ মুখশ্রী ।
আদ্র ওকে এভাবে দেখা মাত্রই ভ্যাবাচ্যাকা খায় । ঘুম ঘুম চোখ জোড়া বৃহৎ হয়ে আসে তার । চটপট ঘন পলক ফেলে ঢোক গেলে । মাথা ঝাঁকিয়ে পিছিয়ে আসে । রৌদ্র মেঘার ঘরে ? তার মানে ঘরে ঢোকার জন্য , দরজা ভাঙলো সে ? আর এটারই শব্দ হলো ? বিস্ময়ে মুখ ফাঁক হয়ে আসে তার । জিভে কামড় বসিয়ে দ্রুত জায়গা ত্যাগ করে আরো কিছু দেখে ফেলার আগেই ।
এদিকে রৌদ্রের উদ্বেগ নেই ।
প্রশান্তি পেয়েছে সে । ঠান্ডা হয়েছে সব উদ্বিগ্নতা ।
চোখ বুজে দীর্ঘ সময় ধরে রাখলো নিজেকে । অনেক আগেই মাথাটা নামিয়ে রেখেছে মেঘার বালিশের পাশে মাথার কাছটায় । কপাল ছুই ছুই দুজনার । ইদানিং বেশ ঠান্ডা পড়েছে । কম্ফোর্টার মুড়িয়ে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে একবিংশী । তার গরম শ্বাস ক্ষণে ক্ষণে আছড়ে পড়ছে বেপরোয়া লোকটার মুখের উপর । রৌদ্রের কেমন শিরশিরে ঠান্ডা অনুভুত হয় । আলগোছে মাথা উঁচায় সে । একটু এগোয় । ঘুমন্ত রমনীর মুখখানার তিন স্থানে তিনটে পরশ আঁকে । প্রথমেই চিকন লতার সুক্ষ্ম নাক ফুলটায় । দ্বিতীয়ত , ভ্রুর পাশের কাঁটা দাগ টাকে নির্দিষ্ট করে । আর তৃতীয়ত পাতলা অধরের এক কোণে ।
রমনী ঘুমিয়ে , তাই বাঁধা দেওয়ার কেউ নেই । মৃদু মৃদু পরশ বুলিয়ে সরে আসে রৌদ্রের । রমনীর বাম গালে হাত রাখে । এবারে চতুর্থ পরশ টা আঁকে একবিংশীর বন্ধ চোখের কার্নিশে । ঠোঁট সরাতেই অনুভুত হয় , ঠোঁট ভেজা তার । কেমন নোনা স্বাদ পায় । কপাল গুটায় সে । এই মেয়ে কি ঘুমের ঘোরে কাঁদছে নাকি ? চোখের পাপড়িতে পানি জমলো কি করে ?
রৌদ্র বোঝে না । আরেকটু ঝুঁকে আবারো ঠোঁট ছোঁয়ায় নেভানো পত্র যুগলের পিঠে । একই নোনা স্বাদ পায় পূণরায় । তবে , বেশি ভাবলো না এই নিয়ে । হয়তো ঘুমের মধ্যে চোখে পানি জমেছে । এটা স্বাভাবিক । মিনির ক্ষেত্রে দেখেছে ও । ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাঁদে মিনি । রিসা বলতো এটা হয় অনেকের ।
আরামে ঘুমোচ্ছে এই মেয়ে । রৌদ্র রোজ রাতে ওর রুমে আসে , একদিন ও আভাস পায় না এই মেয়ে ! কি গভীর ঘুম তার । রৌদ্রের ঘুম কেড়ে আয়েশে রয় এই রমনী ।
রৌদ্র কেমন নিদারুণ কন্ঠে বিড়বিড় করে…..
” ইডিয়ট , তোর কাছে আসার জন্য কত কি করতে হয় আমায় । কত অশান্তি লাগে তোর বিরহে । তুই এভাবে আরামে ঘুমাস কি করে আমি হীনা ? একটুও কষ্ট হয় না ? আমার যে হয় কষ্ট । খুব কষ্ট হয় । কবে ঘুঁচবে এই যন্ত্রনা গুলো । কবে হবি আমার ?
দীর্ঘ ছুটির পর আজ থেকে ভার্সিটি শুরু নতুন করে । নতুন সেমিস্টারে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু আজ থেকেই । মাঝে দিন কয়েক কেটেছে । ছুটি শেষ । প্রথম দিন হওয়াতে মেঘা আর শাফাহ্ ভার্সিটি মিস দেয় নি আজ । ফিরেছে সেই চিরচেনা প্রাঙ্গণে । মেঘা আসতে চায় নি । সে তো আর পড়বে না । রেজিস্ট্রেশন করবে না নতুন করে । তাহলে এসে কি হবে ? শাফাহ্ জোর পূর্বক নিয়ে এসেছে ওকে । প্রথম দিনেই ফর্ম পূরণ করে রাখবে ওরা । বাকিটা আদ্র সামলে নেবে । মেঘা মূলত এসেছে শিশিরের সাথে দেখা করার জন্য । শাফাহ্ শিশির কেও ডেকেছে । ক্যাম্পাসে ভিড় খুব আজ । কতগুলো দিন বাদ পূনরায় সমাগমে মুখোর হয়ে উঠেছে ভার্সিটি প্রাঙ্গণ । মেঘা,শাফাহ্ আর শিশির গেইটের ভেতরে মিলিত হয়েছে । ফর্ম তুলে পূরন করা শেষ ইতোমধ্যে । মেঘা ফর্ম তোলে নি । শিশির তা দেখে শুধালো…
” তুই ফর্ম তুলবি না ?
মেঘা কেবলই মাথা ঝাঁকায় দুদিকে ।
বেশি ঘাঁটে না শিশির । কাউকে জোর পূর্বক অতিরিক্ত প্রশ্ন করার অভ্যাস নেই তার ।
সময়ও নেই হাতে । খুব অল্প সময় নিয়ে বাইরে বেরিয়েছে । ফিরতে হবে শীঘ্রই । মাঝে আবার আরো একটা কাজ আছে । সেটার জন্য ছটফট করছে রিতিমত ।
শাফাহ্ এপাশ ওপাশ তাকাচ্ছে । অপেক্ষায় আছে আদ্রের । আদ্র নিচ তলার একটা কেবিনে ওদের বসিয়ে রেখে চলে গেছে । আসলেই ওর হাতে এই কাগজটা তুলে দিয়ে নালিশ ঠুকবে মেঘা কে নিয়ে । এই মেয়ে যে ফর্ম তোলে নি তা জানাবে আগে ।
আদ্র আসলো ক্ষণিকের মাঝে । ওর কাজ নেই এখানে । মেঘা আর শাফাহ্ কে নিয়ে এসেছিলো শুধু । অফিস রুমে ছিলো এতক্ষণ ।
ও আসতেই তেড়ে গেলো শাফাহ্….
” ভাইয়া , দেখো মেঘা ফর্ম তোলে নি ! আমি কতবার বললাম , শুনছে না ও ।
আদ্র কেবলই মলিন উত্তর করলো ..
” তুলতে হবে না ।
ওর হাতে একটা পেপার । মেঘা চোখ বোলায় সেটার দিকে । বুঝতে বাকি রয় না । দীর্ঘ হাঁফ ছেড়ে বলে….
” লাভ নেই ভাইয়া , এই কদিনের জন্য ক্লাস করে কি হবে ?
” লাভ লস তোকে বুঝতে বলিনি ।
টুকটুকি , ফর্ম দে ।
শাফাহ্ বাড়িয়ে দিলো ওর কাগজটা । পিছু ফিরে শিশিরের উদ্দেশ্যে বললো….
” শিশির , তোর টাও দে না । ভাইয়া জমা দিয়ে দেবে ! বেকার তোকে আর ঝামেলা পোহাতে হবে না ।
শিশির তাকালো আদ্রের দিকে । তবে আদ্র তাকালো না । এতক্ষণেও চোখ তোলে নি । কপালে কেমন ভাঁজ । শাফাহ্’র আগ বাড়িয়ে বলা কথায় বোধহয় বিরক্ত হলো । আদ্র জমা দিলে একটু হলেও রেহাই পাবে মেয়েটা । নয়তো ঝামেলা পোহাতে হবে আলাদা করে । সময় পার হবে অনেকটা । হাতে সময় নেই । আদ্রের বিরক্তি বুঝে দোনামোনা করলো মেয়েটা….
” থাক, আমি দিয়ে আসছি !
কথা শেষ হতেই আদ্র ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো । চোখ নিচু করেই রাশভারী গলায় বললো….
” দাও….
রক্ষা পায় মেয়েটা । তড়িঘড়ি করে ওর হাতে কাগজটা ধরিয়ে দিয়ে বলে…
” থ্যাংক ইউ স্যার !
আদ্র বিপরীতে কিছুই বললো না । গুরুভার কন্ঠে না তাকিয়েই বললো….
” তোরা গেটের বাইরে যা , আমি আসছি ।
রমনীরা গেটের বাইরে অপেক্ষমাণ । মিনিট কয়েক পেরিয়েছে । শিশির চঞ্চলা হয়ে বারংবার এপাশ ওপাশ তাকাচ্ছে । হাতে মুঠো ফোনটা । খচখচ করছে সে । কেউ একজনের আসার কথা । ঐ যে ওর হবু স্বামী । হঠাৎ আজ কথা হলো তার সাথে । সে নাকি শিশিরের সাথে দেখা করবে । এর আগে কথা হয় নি । আজ সকালে ফোন করেছিলো । বললো বাইরে দেখা করতে ।
সেই তাগিদেই শিশিরের বের হওয়া হয়েছে আজ । একেবারে ভার্সিটির কাজটাও গুছিয়ে নিলো । তিনি বলেছিলেন গেটের বাইরে অপেক্ষা করতে । দুপুর বারোটার দিকে আসবেন । কিন্তু এখন বাজে বারোটা বিশ । আসার কোনো নাম গন্ধ নেই । শিশির নিজে থেকে ফোন ও দেয় নি । ফোন হাতে নিয়ে উশখুশ করছে । যদি লোকটা একবার ফোন করে , তাহলে অন্তত জানতে পারবে তিনি কতদূরে আছেন ।
মেঘা আর শাফাহ্’র সামনে ইতস্তত সে ।
বারবার রাস্তার এপাশ ওপাশ তাকাতেও কেমন অস্বস্তি লাগছে । বাকি দুই রমনী ঠোঁট চেপে দেখছে ওর উদ্বিগ্নতা । হবু স্বামীর সাথে দেখা করার জন্য কতটা ব্যাকুল এই মেয়ে ।
আদ্র পার্কিং থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে । রাস্তায় উঠে একপাশে থামলো সে । গাড়ির সামনের উত্তল দর্পণে ভেসে ওঠা পিছনে তিন রমনীর দিকে তাকালো । শাফাহ্ দৌড়ে গিয়ে বলে আসলো…যেনো একটু অপেক্ষা করে । শিশিরের ফিয়ন্সে আসবে । দেখা করবে ওরাও ।
এটুকুই যথেষ্ট ছিলো শান্ত ছেলেটার মন মস্তিষ্কে অশান্তির বীজ বপনের জন্য । ক্ষণিকেই যেনো দপ করে জ্বলে উঠলো মস্তিষ্ক । চোয়াল হয়ে আসলো শক্ত । এতক্ষণ নিজের উপর চরম বিরক্ত ছিলো সে । ঐ বেয়াদব মেয়েটার উপস্থিতিও কেমন অস্থিরতা সৃষ্টি করছিলো । তাইতো তাকায় নি একবারও । সব উচাটন সামলাতে চোখ নামিয়ে রেখেছিলো ।
কেমন অস্বস্তি হচ্ছে । ঐ মেয়েকে নিয়ে হঠাৎ কিসের এতো মাথা ব্যথা ওর ? কেনো এতো খারাপ লাগে ? এ কদিনে মাথাটা পুরো ঝালাপালা করে দিয়েছে ঐ বেয়াদব টা ।
দুহাতে স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরলো আদ্র । দাঁতে দাঁত পিষে চোখ খিচে বন্ধ করলো । সিটে মাথা এলিয়ে মুখ গোল করে শ্বাস ফেললো আলতো মাথা ঝাঁকিয়ে । বোঝালো নিজেকে । আর ভুলেও তাকাবে না ওদিকে । ঐ মেয়ের কথা ভাববেও না । যে মেয়ের নামটা অবধি মনে থাকে না , সেই মেয়েটাই পুরো মন মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে পুরোটায় দখলদারী চালিয়ে বসে আছে । উদগ্রীব করে ছেড়েছে সটান এই যুবককে ।
আজব তো , আগে এমন হতো কই ? ওর বিয়ের বার্তা পাওয়ার পর থেকেই এ কি অনাচার শুরু হয়েছে ?
পেছনে তিন রমনী দাঁড়িয়ে । ক্ষণিকের ব্যবধানে একটা বাইক এসে থামলো ওদের সামনে । বাইকে দু’জন । সামনের জন মাথার হেলমেট খুলতেই ধক্ করে ওঠে শিশির । এতো সেই লোক , যাকে সেদিন ও এক পলকে দেখেছিলো । এই সেই লোক , যার অপেক্ষায় অধীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও এখানে । #আয়ান ,, নামটা অস্ফুটে বিড়বিড় করে শিশির ।
আয়ানের পেছনে আরো একজন । কেমন উশৃঙ্খল পোশাকে বখাটে দুটোই । শিশির আড়চোখে মেঘা আর শাফাহ্ কে দেখে । এক ধাপ এগোয় অতঃপর । বাইকটার পাশে দাঁড়াতেই কাঙ্ক্ষিত ছেলেটা চিবিয়ে বলে হুট করেই ….
” উঠে বস !
তৎক্ষণাৎ কপালে ভাঁজ পড়ে শ্যামলিনী কন্যার । বুঝে পায় না । অস্ফুটে উচ্চারণ করে….
” জি ?
” বাইকের পেছনে ওঠ , লং ড্রাইভে যাবো তোকে নিয়ে ! এই টনি , চেপে বস একটু । তোর ভাবি বসবে তোর পিছে…
মুখ খানা কুঁচকে আসে শিশিরের । এমন ব্যাবহার আর কথার মানে বুঝলো না সে । ফোনে যখন কথা বললো , তখন তো ঠিক ভাবেই কথা বলেছে । এখন এভাবে কথা বলছে কেনো ?
পেছনে শাফাহ্ আর মেঘাও কপাল কুঁচকে সরু করেছে । একে অপরের দিকে তাকালো ওরা । এটাই তাহলে শিশিরের ফিয়ন্সে ? কেমন বখাটে ছাপ স্পষ্ট চেহারায় । পোশাক আশাকের ঠিক নেই । দুহাতের দশ আঙুলে দশটা আংটি । হাতের কব্জিতে অগনিত পেঁচানো রুপোলি চেন । গলায় আরো দুটো । এখানে ওখানে বখাটেদের উৎপাত দেখেছে শাফাহ্ আর মেঘা । সেসব বখাটে দের থেকে কোনো অংশে কম নয় এরা । ভাবসাব আর চেহারা সুরত এক ।
তাজ্জব বনলো ওরা । শিশির ও তাই । সেও বিস্ময়ে হতবাক । আগের দিন যখন আয়ান কে দেখলো , এভাবে দেখে নি । বেশ পরিপাটি ভদ্র সভ্য সাজপোশাকে দেখেছিলো । ঢোক গেলে মেয়েটা । ঠোঁট ভিজিয়ে বলে….
” আপনার সাথে দেখা করার কথা ছিল , ডেকেছিলেন আপনি । বলেছিলেন কিছু বলার আছে । যা বলবেন এখানেই বলুন , আমি বাড়ি ফিরবো ।
পেছনের ছেলেটা কেমন করে হাসে । সেই শুরু থেকেই বিশ্রী নজরে চেয়েছিলো শিশিরের দিকে ।
এবার তাকালো শিশিরের পেছনে শাফাহ্ আর মেঘার দিকে । কেমন গা দুলিয়ে বিশ্রী ভঙ্গিতে হাসলো আবারো । দুই রমনী কে আগাগোড়া পরখ করতে করতে বাজে ইঙ্গিতে বললো….
” আরে মামা , আগে বলবি তো ! তোর পাখির সাথে দেখি আরো দুটো পাখি এক্সট্রা আছে এখানে । আমি না হয় আমার বাইকটাও নিয়ে আসতাম । শুধু তুই কেনো লং ড্রাইভে যাবি ? আমিও যাবো ! তোর সাথে একটা , আর আমার সাথে না হয় দুটো মাল যেতো ! উফফফ , দেখেছিস মাল দুটো ? কড়া না ? একেবারে খাসা হতো ওদের সঙ্গ নিতে….
বিশ্রী নজরের সাথে সাথে এমন বাজে কথায় ঘৃণায় মুখ বিকৃত হয়ে আসে মেঘার । চোখ মুখ খিচে ফোঁস করে ওঠে । হিসহিসিয়ে এগিয়ে শিশিরের পাশাপাশি দাঁড়ায় । রেগে বলে দাঁত চেপে….
” হোয়াট রাবিশ ,, এসব কি ধরনের বিহেভিয়ার ? মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজ ।
আর ভাইয়া , আপনি শিশিরের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন তো । আপনার ফ্রেন্ড এসব কি বলছে ? আপনি চুপ করে আছেন কেনো এভাবে ?
আয়ানের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই । বরং ওর দৃষ্টি আরো তীক্ষ্ণ হলো রমনীর শরীরের ভাঁজে । পা থেকে মাথা অবধি পরখ করলো লোলুপ দৃষ্টিতে । লতানো কোমরের মাঝামাঝি দৃষ্টি আটকে চিবুক চুলকে বললো…
” উফফফ , জোস তো । কি ফিগার মাইরি । তেজ ও আছে দেখছি । শালি সুন্দর আছোস ! এক্কেরে খাসা সুন্দর ।
আর এটাকে দেখ , আস্ত একটা বস্তি । কি জুটলো আমার কপালে । মা যে কোনদিক থেকে এই বস্তি টাকে আমার জন্য বাছাই করলো কে জানে । বড়টা তবু চলে । আবিদের ভাগ্যেই ভালোটা জোটে সবসময় । আর আমার ভাগ্যে এই পঁচা মাল । ছ্যাহহ্ , এরে নিয়ে মজাটাই আসবে না ।
শেষের কথা গুলো শিশিরের উদ্দেশ্যে । মেয়েটা কেবলই মূর্ত বনে অবিশ্বাসে চেয়ে । চোখ যেনো অবিশ্বাসে ছানাবড়া । কথা গুলো শুনে শরীর খানা কেমন ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে । মেঘা এবার তাকায় শিশিরের দিকে ।
” শিশির,, এসব কি হচ্ছে ? এই ননসেন্স, উশৃঙ্খল বখাটে ছেলেটার সাথে তোর বিয়ে ? হাউ পসিবল ?
মেঘার কন্ঠে একরাশ অবিশ্বাস ।
এদিকে আদ্র সিটে মাথা এলিয়ে উইং মিররের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে শান্ত চোখে । বাইকের ছেলে দুটো পিঠ ফিরিয়ে উল্টো দিকের পথে । ওদের মুখ দেখার উপায় নেই । আদ্র তো এক চোখে দেখছে অদূরে দাঁড়ানো শান্ত মেয়েটার দিকে । ওরা কি কথা বলছে তাও বোঝার জোঁ নেই । ক্ষণে ক্ষণে শ্বাস পড়ছে বুক চিরে ।
এক পর্যায়ে দৃষ্টিতে ঘন পলক ফেললো । এতক্ষণ ধরে কি কথা বলছে ওরা ? জানতে তৎপর হয়ে উঠলো তার বিচলিত মন । দেখতেও চাইলো সেই ছেলেটাকে , যার সাথে এই বেয়াদব মেয়েটার বিয়ে । কি যেনো নাম ও মেয়েটার , মনে করতে গিয়ে খেই হারালো । জিভে ডগায় নামটা ঘুরছে , তবে উচ্চারণ হচ্ছে না । মনে আছে , মুখে নেই । আদ্র চোখ বুজে বিড়বিড় করলো…
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪০
” ইয়াহহ্ , ভেঁজা বেড়াল । ভেজা ,, শিশির ! আ’ম রাইট ? বাট বেয়াদব । হিটস পারফেক্ট…
আয়ান চোয়াল খিচে শিশির কে আবার আদেশ করে ।
” বাইকে উঠ । আমার অন্যান্য ফ্রেন্ডরা দেখা করবে তোর সাথে । আমাদের আড্ডা খানায় নিয়ে যাবো তোকে । জলদি উঠে বস পেছনে ।
শিশির তাকায় বাইকের দিকে । আয়ানের পেছনে ছেলেটা । ও বসবে কোথায় ? আর যাবেই বা কেনো ?
কন্ঠের রোধ আর চোখের অবিশ্বাস ঠেলে শক্ত হলো মেয়েটা , ঘন পলক ফেলে চোখের ঝাপসা ভাব দূর করলো ….
