আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৭ (২)
সুরভী আক্তার
মেঘার কন্ঠে উৎকণ্ঠা । বিচলিত সে । চোখে আহ্লাদ ভরপুর । রৌদ্র আলতো করে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ায় । চিকচিক করে ওঠে একবিংশী । রৌদ্রের হাতে একটা চেন । যেটা ওর নিজের । ওর মায়ের শেষ স্মৃতি । সেটাকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিলো মেঘা । চোখ ভরে আসে আনন্দের অশ্রুতে । এটা হারিয়েছিলো সে । পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে কত খুঁজেছে , পাওয়া যায় নি ।
মেঘা চেনটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে । ধড়ফড় করে বুক । চুমু খায় পরপর । উদ্বিগ্ন হয়ে ভেজা চোখ তুলে জানতে চায়…
” এটা তো হারিয়ে গেছিলো । কোথায় পেলেন আপনি ?
” পেয়েছি !
” জানলেন কি করে এটা আমার ?
” তুমি গোটা’টাই আমার । আর আমার বউয়ের কি আছে কি নেই , আমি জানবো না ?
মেঘা হাসি চওড়া করে । আনচান লাগে উদগ্রীবতায় । অস্থির হয়ে আকস্মিক একটা অপ্রত্যাশিত ঘটন ঘটিয়ে ফেললো । খুশির চোটে হুট করেই দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রৌদ্র কে । সুঠাম বুকে জায়গা করে মাথা গুঁজে নিলো । আকড়ে নিলো লোকটার পিঠ ।
রৌদ্রের সুঠাম শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে রমনীর শক্ত আলিঙ্গন পেয়ে । তব্দা খেয়ে মূর্ত বনে যায় সে । স্তব্ধ হয় নিঃশ্বাস । হাত জোড়া এখনো নিশ্চল । উঠলো না রমনীকে জড়ানোর জন্য । সে যেনো ডুবলো এক অবিশ্বাস্য ঘোরে । যে ঘোর কাটলো একবিংশী উচ্ছাসে…..
” থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ সো মাচ্…..
আপনি জানেন , এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় একটা জিনিস । আমার আম্মুর শেষ স্মৃতি । হারিয়েছিলাম এটা ,, কত খুঁজেছি জানেন ? কোত্থাও পাই নি । আর আপনি পেয়েছেন এটা ? কোথায় পেয়েছেন , কবে পেয়েছেন ?
রৌদ্রের নিঃশ্বাস জোরালো হয় । বক্ষ স্পন্দনের সাথে বাড়ে হৃৎপিণ্ডের ওঠানামা । শুল্ক ঢোক গেলে সে । গলা ভিজিয়ে আলগোছে খেই হারানো রমনীর পিঠে হাত তোলে । ধীরে বলে…
” অনেক আগে !
” তাহলে আগে দেন নি কেনো ?
” ফিরিয়ে দেওয়ার পর উষ্ণ আলিঙ্গনে এমন সুখানুভূতি পাবো জানলে অনেক আগেই দিয়ে দিতাম ।
এহেন হীম কথায় ঘোর কাটে একবিংশীর । ঝট করে রৌদ্র কে ছাড়ে সে । ঠেলে দূরে সরায় । চিবুক নামিয়ে জিভে কামড় বসায় । বেঘোরে কি লজ্জা জনক পরিস্থিতি তৈরি করলো । গাল দুখানা লাল হয়ে আসে ওর । তড়াক করে পিঠ ফিরিয়ে মুখ লুকায় । রক্ষে হয় না তবুও । দর্পণে ভেসে ওঠে রমনীর লালিত রাঙা মুখাবয়ব । যেদিকে খেয়াল নেই তার । তবে রৌদ্রের ঠিকি আছে । তার আছে মাদকিয় দৃষ্টি ।
সে উথাল পাথাল সুখের জোয়ারে ভরা গালে হাসে নিঃশব্দে । এগিয়ে যায় আবার । মেঘা আড়চোখ তুলে থেমে থেমে তুতলিয়ে বলে…..
” আ..আমি জড়িয়ে ধরতে চাই নি । এক্সাইটমেন্টে ভুল করে হয়ে গেছে ।
” এমন ভুল হাজার বার হোক । হাজার বার যেনো এই সুখ পাই আমি । কি ভালো লাগে এই অনুভুতি ,, ধারনা আছে তোমার ?
কান গরম হয়ে আসে মেয়েটার ।
রৌদ্র ওর কাঁধের নিকট ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে বলে….
” দাও ,, পরিয়ে দিই ।
সহসা তাই করলো মেঘা । রৌদ্রের এমন মারাত্মক দৃষ্টির কবল থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি করে ওর হাতে চেইনটা তুলে দিলো । শ্বাস ফেলতে লাগলো বুক ফুলিয়ে ।
রৌদ্র ফিচেল হাসে । রমনীর কাঁধের উপর কুন্ডলি পাকানো খোঁপাটা আলগোছে একপাশে সরিয়ে দেয় । তার ঠান্ডা আঙ্গুল দ্বয়ের মৃদুমন্দ স্পর্শে শরীর শিউরে ওঠে মেঘার । শিরশির করে ওঠে সর্বাঙ্গ । পায়ের নখ খোটে মেঝেতে । চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় ।
তা দেখে হাসি প্রগাঢ় হয় বেপরোয়া লোকটার ওষ্ঠপূটে । চেইন টা আলগোছে পরিয়ে দেয় গলায় । অতঃপর সেটার দিকে অসহায় চোখে তাকায় । কি সুন্দর জ্বলজ্বল করছে ফর্সা গ্রীবায় । এটা অসহনীয় । হিংসাত্মক সত্তা থেকে কেমন আনচান লাগে মনে । নিভে যাওয়া স্বরে বলে সে….
” এটা সবসময় গলায় ঝুলিয়ে রাখা কি খুব প্রয়োজন , সানি ? খুলে রাখলে হয় না ?
থামে একটু । রমনীকে কাঁপতে দেখে সে । শ্বাস নিতে দেখে ঘন ঘন । কম্পন বাড়িয়ে নত হয়ে হুট করে ওষ্ঠাস্পর্শ আঁকে কাঁধের ভাঁজে । ব্যাস ,, গলে পড়ে রমনী । এক ঝটকায় ফিরে দাঁড়ায় । রৌদ্রের উদরের দু’পাশে হাত রেখে ঠেলে সরায় ওকে । চোখে চোখ রেখে না বোধক মাথা নাড়ায় । কাকুতি করে ধরা গলায়….
” বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে । দূরে সরুন প্লিজ….
” এরকম একটু বেশি বেশি হলে কি খুব ক্ষতি হবে ? প্লিজ….!
” রৌদ্র !!
” ইয়েস সুইটহার্ট ।
” সরুন ,, আমি ঘুমাবো ।
” খিদে পেয়েছে ।
” খেয়ে নিন একা !
” হাতের অবস্থা কাহিল ।
মেঘা চোখ নামায় । ঢোক গিলে পাশ কাটিয়ে সরে আসে । চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানে উপর পানে মুখ তুলে । তিরতির করে কাঁপে সর্বাঙ্গ । কম্পন রুখে টেবিলের দিকে এগোয় রমনী । ট্রে হাতে তুলে নিয়ে ডাকে…
” আসুন ।
ফিক করে হাসে রৌদ্র । অগত্যা এগিয়ে যায় ।
” রাগ কমেছে ?
রমনী নিরুত্তর । সোফার একপাশে বসলো খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে । রৌদ্র বসে ওর পাশে । মেঘা ভাত মেখে এক লোকমা তুলে ধরে ওর মুখ সম্মুখে ।
চেয়ে থেকেই লোকমা মুখে নেয় রৌদ্র । খেতে খেতে ফিচেল স্বরে টিটকারী মেরে বলে…
” তোর অনেক জিনিস আমার কাছে আছে সুইটহার্ট , আজ থেকে রোজ একটা করে ফেরত দেবো । বিনিময়ে আমাকে সুখানুভূতি দিতে হবে তোকে ।
মেঘা হাত থামিয়ে রেগে তাকালো । জিভে কামড় বসালো রৌদ্র, নিজেকে শুধরে নিলো….
” উহু সরি,,, তোমাকে ।
” চুপ চাপ খেয়ে নিন ।
” আজ বিছানায় শুই ? সোফায় আরাম হয় না ! বিছানায় ঘুমালে তোমাকে আর আলাদা করে নিচে নেমে আমার হাত জড়াতে হবে না । বসে বসে ঘুমাতেও হবে না ।
মেঘা ভ্যাবাচ্যাকা খেলো । থতমত খেয়ে ঘন পলক ঝাপটালো । রৌদ্র ঠোঁট চেপে বলে গলা খাঁকারি দিয়ে….
” কে যেনো কাল রাতে আমার হাতে একশত এগারোটা চুমু খেলো । উঁহু , একশত বারোটা । চোখের কোণে একটা পরশ পেয়েছি । সেটার কথা ভুলে যাই কিভাবে !
হা বনে হতবাক বনলো রমনী । এই লোক জানে ? সজ্ঞানে ছিলেন ইনি । না থাকলে জানবেই বা কি করে ? ইশশ্,, কি লজ্জা ! চোখ মুখ লাল হয়ে আসে এক্কেরে ।
হেসে ফেলে রৌদ্র । আরেক লোকমা মুখে তুলে চিবুতে চিবুতে অস্পষ্ট মেকি স্বরে বলে…
” স্বপ্ন দেখেছি হয়তো । তাই না ? স্বপ্নে এসেও শান্তি দাও না । চুমু দিয়ে জ্বালা বাড়িও দাও ।
” চুপ করুন রাইনো মুখো । সবসময় বাজে কথা বলেন…
” বাহ্ , তুমি আমার সুযোগ নিয়ে এসব করে দেখালে ক্ষতি নেই, আর আমি বললেই বাজে হয়ে গেলো ? এমনিতেও , বাজে কম কিছুই হচ্ছে । আরো অনেক কিছুই হওয়ার কথা ছিলো । যে কারনে ডেকেছো আমায় !
” কি করলাম আমি ? কখন ডাকলাম ?
” কি করোনি তাই বলো ? জ্বালিয়েছো আমায় ,, পুড়িয়েছো প্রনয়শিখায় ! তুমি ইনোসেন্ট নও সুইটহার্ট । ভান করো ইনোসেন্ট হওয়ার ।
” আজব , কি করেছি আমি ?
মেঘা যেনো কিছুই জানে না । রৌদ্র খেতে খেতে ফোন বের করলো । হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে কিছু একটা বের করলো । অতঃপর ফোন ধরলো রমনীর চোখের সামনে ।
” ভুলে গেলে সুইটহার্ট ? এসব কবে হবে ?
মেঘা বিরক্তি নিয়ে ফোনের দিকে তাকায় । কয়েকটা মেসেজ । ওর নিজের নাম্বার থেকে । এ অবধি সে রৌদ্র কে মেসেজ করে নি কখনো । তাহলে কোথা থেকে ? কি মেসেজ এসব ? আগ্রহ নিয়ে প্রথম তিনটে মেসেজ পড়া মাত্রই পাথরের ন্যায় জমে যায় রমনী ।
চোখ বড় বড় করে সটান হয়ে বসে রয় । বাকিগুলো পড়ার জন্য জবান উঠলো না । দম কুলালো না । মাথা চক্কর দিতেই ঘোলাটে হলো চোখ জোড়া ।
চোখ উল্টায় রমনী । পুরো শরীরে ঝিঁ ঝিঁ ধরে । তৎক্ষণাৎ চিৎকার দিয়ে ওঠে…..
” আস্তাগফিরুল্লাহ…
এসব কি রাইনো মুখো ?
” আমার রোমান্টিক বউয়ের আকাঙ্ক্ষা । এসব পূরনের জন্যই তো এসেছি আমি । ডেকেছো তুমি । না এসে থাকতে পারি ?
” ছিঃ,, আপনি খুব খারাপ ! ফোন দূরে সরান আমার থেকে ! আমি কখনো ডাকিনি আপনাকে । আপনি মিথ্যে বলছেন । নিজে থেকে আমার ফোন এসব উল্টো পাল্টা মেসেজ সেন্ড করেছেন, তাই না ?
” লেটস সি ,, ডেট দেখো । আমি ফিরে আসার আগের সন্ধার মেসেজ । তখন তো আমি ছিলাম না । পরের রাতে ফিরেছি…! বাই দ্যা ওয়ে ,, তুমি যে এতো কিছু চাও ,আগে বললেই পারতে ! এভাবে লোক দেখানো ইগনোর করে লাভ কি ? উই আর লিগ্যালি হাসবেন্ড ওয়াইফ । দিস ইজ নট আন-ইউজুয়াল । হতেই পারে…
” আআআআআ ,, চুপ করুন অসভ্য লোক ! মিথ্যে বলবেন না আমার নামে । আমি এসব মেসেজ কক্ষনো দেই নি আপনাকে ।
” সভ্য মেয়ে ,, মিথ্যে বলছি না আমি । আই নো ইউ ওয়ান্ট মি ,, ইউ ওয়ান্ট মি ডেসপারেটলি । আমি পাগল ,, পিচ্চি ভেবে ফেলে রেখে গেছিলাম । দেরি করে ফেলেছি আসতে । এরমধ্যেই পাকনা হয়ে গেছো ভীষণ । আমাকে সিডিউস করছো ? এসব চলে তোমার মনে মনে ? চাইছো এসব ? নটি গার্ল… ধরলে কিন্তু ছাড় পাবে না পরে ।
ক্ষুব্ধ হয়ে এঁটো হাতে রৌদ্রের বাহুতে সজোরে একটা কিল বসালো মেঘা । ভাতের প্লেট কোলে রেখে রেগে মেগে অস্থির হয়ে বললো….
” আপনি আসলেই একটা নির্লজ্জ । বলছি তো, এসব মেসেজ আমি দেই নি আপনাকে । সত্যিই বলছি ।
” দেখতেই পাচ্ছি আমি । তোমার ফোন থেকে ভুত দেয় নি নিশ্চয়ই ! মেরি জান ,,, তুমি যা চাও, আমি সেটা তোমার চেয়েও হাজার গুণ বেশি চাই । ভীষণ ভাবে চাই । একটা বার প্রশ্রয় দাও শুধু ,,
বাকি কথা শেষ করার আগেই মেঘা হাত ছোড়াছুড়ি করে এলোপাথাড়ি আরো কয়েকবার মারলো ওর বাহুতে । রৌদ্র কিঞ্চিত মুখ কুঁচকে ব্যাথাতুর ভঙ্গিমায় বলে…
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৭
” ব্যাথা পাই তো , জান !
” চুপ করুন ,, আর একবার মুখ খুলেছেন তো মুখ সেলাই করে দেবো আপনার । যান তো ,, আমি কথাই বলবো না । অসভ্য , নির্লজ্জ বেহায়া ইরিটেটিং ম্যান…
প্লেট রেখে উঠে দাঁড়ালো মেঘা । পিছু ডাকে রৌদ্র…
” আরে , আগে খাইয়ে তো দাও ।
” আর পারবো না ।
” ইভারা ,,
