Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬২

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬২

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬২
সুরভী আক্তার

পাক্কা দুই ঘন্টা মেঘার কোলে শুয়ে আরামে ঘুমিয়েছিলো রৌদ্র । মেঘা ওকে দূরে সরায় নি । অভিযোগে টু শব্দও উচ্চারণ করে নি । প্রশ্রয় দিয়েছে । দিতে গিয়ে কখন যে নিজেও সেখানেই কাত হয়ে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে, টেরই পায়নি । ঠিক এক টার সময় ঘুম ছুটতেই নিজেকে রৌদ্রের ঘরে আবিষ্কার করলো সে । ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো । তখনো চোখ দুটি ঘুমে ভার । ঘর ফাঁকা । মেঘা তড়াক করে এদিক ওদিক চায় । কাঙ্ক্ষিত জনকে না পেয়ে হাঁফ ছাড়ে । মাথা চেপে ধরে বসে রয় এক দন্ড । অতঃপর চোখ মুখ ডলে, এক মুহুর্ত বিলম্ব করে না । সদ্য ঘুম ভাঙ্গা এলোমেলো কদম সামলে ছুটে বেরোতে চায় রুম থেকে । দরজার কাছে এসে দেখে ছিটকিনি লাগানো । অনুচ্চ রমনীর হাত পৌঁছায় না উপরে ‌। ভেতর থেকে দরজা লাগানো, তার মানে ঐ লোক ঘরেই আছেন । হয়তো ওয়াশ রুমে । মেঘা এই মূহুর্তে তার সম্মুখে যেতে চাইলো না । পালাতে চাইলো । নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইলো ঐ লোকের থেকে । এদিক ওদিক তাকিয়ে দরকারি কিছু একটা খুঁজলো । একটা চেয়ার টেনে উঠে দাঁড়ালো ছিটকিনি খোলার চেষ্টায় ‌। নড়বড়ে চেয়ারের এক পা । রৌদ্র যেবার ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করলো , সেবারেই এই চেয়ারের উপর ঝড় বয়ে গেছে । বড্ড ধকলে ভেঙে পড়েছে এক পাশ । মেঘার শরীরের ভার পেতেই দুলে উঠলো সেটা । হেলে পড়লো ভাঙা দিকে । মেঘাও হেলে পড়ে তার সাথে । পড়তে পড়তে সামলে নেয় নিজেকে । বুকে হাত রেখে দম ফেলে । অতঃপর হাত বাড়িয়ে ছিটকিনি খোলার চেষ্টা করে ।
খুলতেও পারে এক পর্যায়ে । তবে চেয়ার থেকে নামার আগেই আবেশিত ডাকে জমে যায় একবিংশীর কম্পিত পদ যুগল !

” ইভারা ।
ছলকায় সে ।
চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে তখনও । চেয়ারের সাথে সাথে কাঁপল সেও । রৌদ্রের কপালে ভাঁজ । ভাঙ্গা চেয়ারটা দেখে সে এগিয়ে এসে মেঘা কে নামায় সেটার উপর থেকে । হেসে বলে…..
” ঘুম ভেঙেছে ? কোথায় যাচ্ছো ? এভাবে চেয়ারে উঠেছো যে ,, তুমি পড়ে গেলে আমার কি হবে ? ব্যাথা পাবে তো , আর আমাকেও দেবে ।
বেশ মাখো মাখো বুলি । মেঘার অস্থির চিত্ত স্থির হয় । চেয়ে রয় শান্ত দৃষ্টিতে । ফের হাসে রৌদ্র ।
” দেখছো কি জানপাখি ?
এবারে নড়েচড়ে উঠলো মেয়েটা । ঠেলে সরালো লোকটাকে । সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে । পড়নে কেবলই একখানা ট্রাউজার । তাও ভেজা অনেকটা । গলায় টাওয়েল পেঁচানো বরাবরের ন্যায় । শরীরে বিন্দু বিন্দু জল কনা । কপালে লেপ্টে ভেজা চুল । মেঘার যেনো পলক সরলো না । টেনে হিচড়ে সরাতে হিমশিম খেতে হলো একটুখানি ।
চোখ মুখ পূনরায় শক্ত করে দরজা খুললো । বেরিয়ে যাওয়ার আগেই টেনে ধরলো রৌদ্র….
অসহায় কন্ঠে বললো…..

” কথা বলবে না আমার সাথে ? তোমার উপেক্ষা যে সহ্য হয় না আমার । সামান্য একটু রাগ দেখিয়েছি শুধু, এতেই এতো ? এদিকে যে আমি পুড়ছি । তার বেলায় ? ওটুকুতে কষ্ট পেয়ে মরন যন্ত্রণা দিচ্ছো আমায় ! সে হিসেব কে রাখবে ?
মেঘার সহ্য হয় না ।
চোখ নিভে আসে । যতই চাইছে লোকটাকে কড়া করে কয়েক কথা শুনিয়ে দেবে, ততই দূর্বলতায় পিছুপা হয়ে যাচ্ছে সে । গুড়িয়ে যাচ্ছে কাঁচের ন্যায় । স্বচ্ছ হৃদয়ে ফাটল ধরেছে , তাও ভুলছে না কিছুতেই ।
” সুইটহার্ট । আ’ম সরি ।
মেঘা দরজা যেভাবে খুলেছিলো , ঠিক সেভাবেই খট করে আবার লাগিয়ে দিলো । পিছু ফিরে চেপে ধরলো রৌদ্রের হাত । তড়তড়ে তেজি কদমে বেপরোয়া যুবককে টেনে নিয়ে কাবাডের সামনে দাঁড়ালো । হাত ছাড়লো সেখানে । চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলো কাঁপা গলায়……
” আপনি সত্যিই ভালোবাসেন আমায় ?
হাসলো রৌদ্র । আত্মবিশ্বাস নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে বললো….

” সন্দেহ আছে ?
” আছে !
” কোথায় ? কোন কোণে ?
” কোণে নয় , পুরোটা জুড়েই সন্দেহ এখন । আপনি গোটাটাই সন্দিহান ।
বুঝলো না রৌদ্র ।‌ অবুঝের ন্যায় তাকিয়ে রইল চোখ ছোট করে । মেঘার চোখ থেকে পানি পড়েছে । রমনী নিজ উদ্যোগে হাতের উল্টো পিঠে সেটুকু মুছে নিলো । আলমারি খুলে সেই ড্রয়ার টা ওপেন করলো । সেদিন যা যা দেখেছিলো , সবকিছুই আছে । কয়েকটা চুলের কাঁটা যোগ হয়েছে আবার । মেঘা সেসবে ধ্যান দিলো না । সেই রংচঙে জিনিসটার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করলো এ বেলায় । সেদিন এই জিনিসটা চেনা লেগেছিলো । বোকা রমনী চিনতে পারে নি । আজ আর চেনার প্রয়োজন নেই । সন্দেহ নেই বিন্দুমাত্র । একবিংশী সেটাকে বের করে হাতে তুলে নেয় । এর মধ্যেই আরো কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরে চোখ থেকে । টইটম্বুর জলে ভিজে আসে অক্ষিপট । সে সোজাসুজি প্রশ্ন করে ধরা গলায়…..

” এই ওরনাটা কার, রৌদ্র ? বলবেন সত্যি করে ? নাকি মিথ্যের আশ্রয় নেবেন এখানেও ?
রৌদ্র দৃষ্টি বৃহৎ করলো । অস্বাভাবিক লাগলো মেঘার কন্ঠ সহ গোটা মুখশ্রী । রমনীর চোখ ভেজা, কন্ঠ দাপুটে । তার উপর এই ওরনার প্রসঙ্গ কেনো হঠাৎ ?
আঁতকায় রৌদ্র । ঢোক গিলে বলে……
” কেনো ?
” কার ?
উত্তরে সময় নেয় যুবক । ধীরে বলে….
” তোমার !
মেঘার মনের কোণে কোথাও একটা জমে রাখা ক্ষিণ আশার আলোটা বোধহয় দপ করে নিভে গেলো এ বেলায় । চোখ নামিয়ে কেঁদে উঠলো আচমকা । পিছিয়ে গেলো টালমাটাল পায়ে । নড়বড়ে হাঁটু ভেঙ্গে ধপ করে পড়লো মেঝেতে । ফুঁপিয়ে উঠলো ।
ভড়কায় রৌদ্র । দ্রুত হাঁটু মুড়ে বসে সেও । মেয়েটাকে সামলে নেওয়ার চেষ্টায় বলে…..
” ইভারা ,,, কি হয়েছে ?
মেঘা হেঁচকি তোলার মধ্যেই থেমে থেমে দ্বিতীয় প্রশ্ন করে….
” এটা আপনার কাছে এলো কি করে ?
” ছিলো আমার কাছে !
” কিভাবে ?
” যেভাবে তোমাকে পেয়েছি, সেভাবেই !
মেঘা ভরা চোখে চেয়ে রয় নির্বিশেষে । বুলি ফুটায় কম্পিত স্বরে…..

” আপনি আমায় ঠকালেন রৌদ্র ? এভাবে ঠকালেন আমায় !
রৌদ্র এবার ভড়কে যায় পুরোপুরি । হাত বাড়িয়ে রমনীকে টেনে নেয় নিজের দিকে । বলে গলা ভিজিয়ে…..
” ইভারা ,,, কি বলছো তুমি ? এসব কি কথা ? কাঁদছো কেনো হঠাৎ ? আমি,, আমি তো শুধু একটুই ধমকেছিলাম তোমায় ‌। তাও হাজার বার সরি বলেছি এর জন্য । সরি জান । তবুও এমন কেনো করছো ? এই ওরনা , আমায় দাও । ছাড়ো এটা ।
” না ছাড়বো না । ভাইয়া সব বলে দিয়েছে আমায় । আপনি , আপনি একটা গুন্ডা । আপনি তো সেই , তাই না ? যে আমাদের বাড়িতে ভাঙচুর করেছিলো ! চিনে ফেলেছি আমি আপনাকে । সব জেনে গেছি আমি । ছিঃ , আপনি এতোটা নিচ । বেইমান আপনি ! এভাবে অভিনয় করে আমাকে বাধ্য করেছেন আপনার প্রতি আকৃষ্ট হতে । আর কত নাটক করবেন ? কত মিথ্যে লুকাবেন ? এভাবে গুছিয়ে মিথ্যে বলতে একটুও বাধলো আপনার ? এভাবে ঠকালেন আপনি আমায় ?

মেয়েটা ডুকরে কেঁদে উঠলো । রৌদ্র স্তব্ধ হয়ে যায় ।
এক হাঁটু মেঝেতে গেঁড়ে রাখা ছিলো , দ্বিতীয় হাঁটুটাও ধপ করে পড়লো । সম্পুর্ন শরীর দুলে উঠলো তার । উদ্যম শরীরের বিন্দু বিন্দু জল কনা গুলোর সাথে কিছু নোনা জলের ঘাম মিশ্রিত হলো ।
এলোমেলো হয়ে গেলো মস্তিষ্ক । মেঘা কি বলছে এসব ?
রৌদ্র হাঁসফাঁস করে ওঠে । ইয়াশ ফেরার পর থেকেই প্রতিটাক্ষণ এই ভয়েই ছিলো সে । আর এটাই হলো ! কি বলেছে ইয়াশ ? মগজ ধোলাই করেছে ! বাড়তি করে বানিয়ে বলেছে নিশ্চয়ই ? ভুল বুঝিয়েছে ! তার মানে কাল থেকে এ কারনেই রৌদ্র কে এড়িয়ে যাচ্ছিলো একবিংশী ? এদিকে রৌদ্র ঘুনাক্ষরেও টের পেলো না তা ।
মেঘা ভুল বুঝলো ওকে । রৌদ্রের গলা শুকিয়ে আসে ভাবতে গেলে । বিগড়ে যায় মাথা । প্রচন্ড যন্ত্রনা অনুভব হয় মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরনে । দম বন্ধ লাগে নিমিষেই । হাপুসহুপুস করে শ্বাস টানে যুবক । বলে…..

” এই ইডিয়ট ,, কি বলছিস এসব ? কে বলেছে তোকে ? কি জানিস তুই ? আমি বেইমান নই । ঠকাই নি তোকে । মিথ্যে বলিনি ।
” সত্যিটাও তো বলেন নি । সব লুকিয়ে ভালো সেজেছেন এই বোকা নারীর কাছে । নাটক করেছেন ভালোবাসার । আর আমি বোকা , সব বিশ্বাস করে গলে গেছি । মজেছি আপনার প্রেমে ।
” এইইই নাহ, খবরদার আমার ভালোবাসায় প্রশ্ন তুলবি না একদম । আমি ভালোবাসি তোকে ! খুব কঠিন সত্য এটা , বুঝলি ? ভালোবাসি আমি তোকে , নিজের থেকেও বেশি ।
ইয়াশ কি কি বলেছে তোকে ? কি কি বুঝিয়েছে ? আমি জানতাম , ও আমার থেকে তোকে কেড়ে নেওয়ার জন্য এসব করবেই ।
মেঘা হাসলো চোখে পানি নিয়ে । কি নিদারুন করুন হাসি । বললো ভাঙা গলায়…..

” বোঝায় নি কিছু , চোখে আঙুল দিয়ে সত্যটা দেখিয়ে দিয়েছে । আপনার এই মুখোশের আড়ালের বেইমান টাকে চিনিয়েছে । আর আমার ভাইয়া মোটেও আমাকে আপনার কাছ থেকে কাড়তে আসেনি । বরং আপনি আমার ভাইয়ার কাছ থেকে সব কেড়ে নিয়েছেন । শেষে আমাকেও । ভাইয়ার সাথে শত্রুতা মেটাতে আমাকে হাতিয়ার বানালেন আপনি ? ছিঃ , রৌদ্র ! আমার কি দোষ ছিলো এতে ? আমাকে জড়ালেন কেনো এসবে ? কি দোষ ছিলো আমার ভাইয়ার ? কেনো এসব করলেন ?
কাঁদে মেয়েটা ।
তার ভাঙা কান্নায় রৌদ্রের মনে পড়ে সেই প্রথম দিনের কথা । সেদিন মেয়েটা ভয়ে কেঁদেছিলো ।
রৌদ্র তো উল্লাসে ছিলো সব তছনছ করার পর । ইয়াশের কথায় যখন উপর পানে দৃষ্টি তুললো , তখন মেঘাকে দেখলো ।

ক্ষণিকের মাঝে সেই ছোট্ট মেয়েটা বৃদ্ধার বুক থেকে মুখ তুলে নিচে তাকায় পিটপিট করে । তখন প্রথম তার চেহারা দেখে রৌদ্র । বোধহয় থমকেছিলো সেবার । চোখ সরায় নি বহুক্ষণ ।
ততক্ষণে মেয়েটা এসে ইয়াশের পেছনে লুকিয়েছে । কেঁদে কেঁটে একাকার । চেহারার আদল বেহাল । লাল টুকটুকে তার পাতলা চামড়া ।
চোখ নাক ঠোঁট, টকটকে হয়ে উঠেছিল । কাজল টেনেছিলো একটুখানি । যখন ইয়াশের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে ভয়ার্ত চোখে রৌদ্র কে দেখলো । তখন তার ঘেঁটে যাওয়া কাজল কালো আঁখি দুটোতেই খেই হারিয়েছিলো বেপরোয়া যুবক । হয়েছিলো সর্বনাশ সেখানেই । হেসেছিল আনমনে । ডেকেছিলো তৎক্ষণাৎ…..
” হেয়য়য় সুইটহার্ট । ভয় পাচ্ছিস ?
তখন তুই সম্বোধনে আরো বেশি গুটিয়ে গেছিলো মেয়েটা । ভাইয়া কে খামচে নিজেকে আড়াল করেছিলো যথাসম্ভব । রৌদ্র আর কিচ্ছুটি করে নি সেদিন । থামিয়েছিলো তান্ডব । কেবলই শুধিয়েছিলো আরেক বাক্য…..
” এটা তোর বোন, ইয়াশ ?
ইয়াশ উত্তর করে নি ।
সিঁড়ি বেয়ে নামার পথে রমনীর গলা থেকে পিছলে ওরনাটা খসে পড়েছিলো । আসার আগে সেটা তুলে হাতে পেঁচিয়ে ফিরেছিলো রৌদ্র । জানে না কেনো ! তবে নিয়ে ফিরেছিলো । আর এখনো পর্যন্ত নিজের কাছেই রেখেছে সেটাকে । খুব যত্নে । একটু খানি মাদকিয় ঘ্রাণের টানে ।
এখন আবার একবিংশীকে কাঁদতে দেখে ছটফট করে উঠলো সে । রমনীর ভুল ধারণা মেটাতে হাত বাড়িয়ে দিলো । ছোঁয়ার আগেই খেকিয়ে উঠলো মেঘা…..

” খবরদার ছোঁবেন না আমায় । কাছে আসবেন না । দূরে যান আমার থেকে । চাইনা আপনার মতো ঠগবাজ বেইমানের স্পর্শ । চাইনা আপনাকেও ।
রৌদ্রের সহ্যের বাঁধ ভেঙে যায় । হাঁসফাঁস করে ওঠে সে….
” ইভারা প্লিজ ,,, ইয়াশ কি কি বলেছে তোকে ? বল আমায় । প্লিজ আমাকে বলার সুযোগ দে । কথাটা শোন একটাবার । ও তোকে যা যা বলেছে, সব সত্যিই নয় ।
” তাহলে সত্য কি ?
” সত্য এটাই , আমি তোকে ভালোবাসি । ভীষণ ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি । কোনো বেইমানি করিনি আমি । হাতিয়ার বানাই নি তোকে ।
” আসলেই ? আমি না খুব বোকা । কখনো জোর দিয়ে কোনো প্রশ্নই করিনি আপনাকে । যা বলেছেন , বিশ্বাস করে নিয়েছি গর্দভের মতো । ইভা আপুকে বিয়ে করতে চাইলেন আপনি । এ নিয়েও আপনাকে কিচ্ছুটি শুধোয় নি । আমাকে ওভাবে শত্রুতার জেরে বিয়ে করলেন কেনো , বুঝতে পারছি এবার । বউ পালিয়ে গেছিলো , এটার রাগ সহ দুটো রাগ একসাথে ঝেড়েছেন , তাই না ?
” ইভারা , রাগাবি না আমায় ।
আমি কোনো রাগ ঝাড়িনি । বরং শুরু থেকে তোকেই চেয়েছিলাম , মাঝপথে ভুলক্রমে ইভা এসে গেছে । বাট প্লিজ সুইটহার্ট , তুই আমার কথাটা শোন ,,, আমি সত্যিই ভালোবাসি তোকে । ইয়াশের সাথে কোনো শত্রুতা নেই আমার । বরং যখন থেকে তোকে দেখেছি, তখন থেকে ওর বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করেছি আমি । যাতে তোকে পেতে পারি । কিন্তু না , স্বাভাবিক ভাবে তোকে পাওয়া হতোই না । তাই এতো নাটক । কিন্তু আমার ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র অভিনয় ছিলো না বিশ্বাস কর । এইই ইভারা….
মেঘা হাঁটু জড়িয়ে মেঝেতে দৃষ্টি গেড়ে মনযোগ দিয়ে শুনলো । ক্লান্ত স্বরে প্রশ্ন করলো…..

” আরাফ ভাইয়া , আর রিসা আপু ,,, ওদের কে কেড়ে নিলেন কিভাবে ? জানা হয় নি এটা ।
” কেড়ে নেইনি আমি । তোমার ভাইয়া ভুল বুঝেছে ।
” ভুল কেবল আমরাই বুঝি । বুঝেছি অনেক । আর বুঝতে চাই না । শোধরাতে চাই এবার । আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি…
রৌদ্র ধক্ করে ওঠে । দম টানে । শ্বাস নেই বুকে, সে মরিয়া হয়ে উঠলো নিঃশ্বাস নিতে । তবুও ঝুঁকে বললো……
” কি ?
” থাকবো না আমি আপনার সাথে । চলে যাবো । ডিভোর্স দেবো আপনাকে । বিচ্ছেদ চাই আমার । আমাদের এই ভালোবাসা–বাসির সম্পর্কটা এটুকুতেই শেষ । বর্ধিত না হোক আর ‌। আর ভুল না হোক আমার দ্বারা ।
” ইভারা !

মেঘার ভেতর মুচড়ে আসলো ডাক শুনে । ডুকরে কান্না পেলো ভীষণ । ঝরঝরিয়ে পানি গড়ালো গাল ঝাঁপিয়ে । মুখ চেপে ধরলো তালুতে । রৌদ্র পিছিয়ে বসে ।
নির্বাক হয়ে যায় সে । মেয়েটা তাকে বুঝলো না ? এই ভয়েই তো ছিলো সে । আর ভয়টাই কাল হয়ে দাঁড়ালো ।
মনে হলো ধোঁয়াশা চারদিকে । তলিয়ে যাচ্ছে সে । খালি হয়ে আসছে মস্তিষ্ক । বুকে পাথর চাপানো হয়েছে যেনো । দম নেই । উদগ্রীব হয়ে উঠলো যুবক ।
মেঘা উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেলো চোখ মুছতে মুছতে । যুবক নিভু চোখে চেয়ে দেখলো কেবল । না আটকালো । আর না পলক পড়লো চোখে । নড়লোও না । শক্তি পেলো না কিছু করার । লাল হয়ে উঠলো উজ্জ্বল শ্যামলা দেহ খানা । শরীরের শিরা উপশিরা সব যেনো ঠিকড়ে বেরোলো । রক্তিম আঁখি যুগল নিভে এলো পুরোপুরি ।

প্রায় বিকেল চারটে । কেটেছে ঘন্টা দুয়েকের বেশি । বাড়ি পুরো ফাঁকা । কেউ নেই কাবির ম্যানশনে । কেবল মেঘা ব্যাতীত । রমনী নিজেকে গুটিয়ে ঘরের এক কোণে বসে আছে চুপচাপ । জানালা দরজা সব বন্ধ । আলো নেভানো । ঘুটঘুটে অন্ধকার পুরো ঘর জুড়ে ‌। সে চুপ থাকলেও চোখদুটো চুপ নেই । নিয়ন্ত্রণ হীন ঝড়াচ্ছে নোনা জল । হেঁচকি উঠছে । মাথা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে । কাঁদছে প্রায় এক ঘন্টা যাবৎ ।
ঘন্টা খানেক আগে রৌদ্রকে নিয়ে হসপিটালে ছুটেছে সবাই । কি হয়েছে জানা নেই । লাঞ্চের সময় নিচে নামে নি । অনেকক্ষণ যাবৎ সাড়াশব্দ না পেয়ে ছেলের ঘরে উঠেছিলেন রুবিনা কাবির । তখন দেখলেন , ছেলের জ্ঞান শূন্য নিথর অবস্থা ।

তার বিকট চিৎকারে এক মুহুর্তেই বাড়ির সবাই জড়ো সেখানে ‌। মেঘাও গেছিলো । গিয়ে যা দেখলো , তাতে পুরো স্তব্ধ সে । সেই ঘর থেকে বেরোনোর সময় রৌদ্রকে যেভাবে ফেলে রেখে গেছিলো , সেভাবে এক জায়গাতেই পরে আছে লোকটা । কাবাডের সামনে তার নিস্পন্দ সুঠাম দেহ খানা । কাবাডের দরজা এখনো খোলা । মেঘার ওরনাটা রৌদ্রের হাতের মুঠোয় । জ্ঞান খোয়ানোর আগে বুকের সাথে চেপে ধরেছে । শরীর ভেজা নেই । শুকিয়ে গেছে ততক্ষনে । কপালে এখনো লেপ্টে আছে চুল গুলো । কেবলই লোকটার জ্ঞান নেই ।
নিমিষেই তোলপাড় পুরো বাড়ি । ডাকাডাকি হলো । লোকটা শুনলো না । ইয়াশ সইতে না পেরে আগ বাড়িয়ে নার্ভ চেক করতেই আঁতকে ওঠে । তৎক্ষণাৎ তার নির্দেশেই তড়িঘড়ি করে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয় ওকে ।
তারপর এখন কেটে গেছে আরো এক ঘন্টা । মেঘা যায়নি । কাঁদছে সে একলা ঘরে একলা বাড়িতে । তার কান্না দেখবে কে এই নির্জনে ? কাঁদুক যত খুশি ।
মেয়েটা শব্দ করে কাঁদে আরো কতক্ষন । সময় পেরিয়েছে অনেকটা । এক পর্যায়ে তার কন্ঠ রোধ হয়ে আসে । নিভে আসে চোখ দুটি । সব তার জন্যই হয়েছে ।

সে আর কাঁদতে পারলো না । মুছে নিলো জবজবে চোখ দুটি । টলমলে পায়ে উঠে দাঁড়ালো । আঁধারেই ছুটলো উন্মাদের ন্যায় । ঘর পেরিয়ে নিচে নামলো । সেখানে এক মুহুর্ত থেমে আবার ছুটলো । পার্কিংয়ে একটা গাড়ি আছে । ইয়াশ নতুন যেটা কিনলো , সেটা । মেঘা এপাশ ওপাশ চায় । বেশি না ভেবে উঠে বসে ড্রাইভিং সিটে । হাত কাঁপে ঠকঠক করে । দূরুদুরু বুক । চোখ বুজে লম্বা লম্বা শ্বাস টানে । আদ্র ওকে ড্রাইভিং শেখাতে চেয়েছিলো বহু আগে । মেঘা গুরুত্ব দেয় নি । দুদিন চেষ্টা করেই হাল ছেড়েছে । আজ আবার হাল ধরলো একলা হাতে । দুঃসাহস করলো বিরাট । সাহসে কমতি নেই আজ । কম্পিত অদক্ষ হাত শত্রুতা করলো না তার সাথে ।
সে হসপিটালে পৌঁছায় মিনিট বিশেকের মধ্যেই । দোতলায় সিসিইউ এর সামনে কাবির পরিবারের সবার ভিড় । রুবিনা কাবির কাঁদছেন ফুঁপিয়ে । তাকে শান্তনা দিচ্ছেন শাহিনা কাবির আর শিশির । সিরাত ও এসেছে । সকলের মুখেই চিন্তার ছাপ ।
তোফায়েল কাবির অতিরিক্ত চিন্তায় পায়চারি করছেন দরজার সামনে ।
মেঘা ছুটে যায় । সিরাত কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে , বলে কোনো রকমে…..

” আপু ,,, উনি কেমন আছেন এখন ? কোথায় উনি ?
সিরাত সামলালো….
” কাঁদছিস কেনো ? কোথায় ছিলি তুই এতক্ষণ ?
” আগে বলো রৌদ্র কোথায় ? কি হয়েছে ওনার,আপু ?
” রৌদ্র ভেতরে । কি হয়েছে জানি না এখনো । ডক্টর বলেন নি কিছু । একবার বেরিয়েছিলেন , আবার ঢুকেছেন । তোর ভাইয়াও আছে সাথে । আই থিংক সিরিয়াস কিছু !
মেঘার কান্না বাড়লো । আহাজারি করে উঠলো ।
রমনীর এমন বিস্ময়কর কান্নায় তাজ্জব সকলে । মেঘার প্রতি রৌদ্রের পাগলামি দেখেছেন সকলে । তবে রৌদ্রের প্রতি মেঘার টা দেখা হয় নি । আজ হলো । চোখের জলের থেকে বড় আর কি হতে পারে ? এই জলেই কি মেঘার পাগলামি প্রকাশ পায় না ?
সিরাত মেঘা কে সামলাতে হিমশিম । আদ্র সামলেছে শেষে । মিনিট কয়েকের মধ্যে সিসিইউ এর দরজা খুলে ডক্টর বের হন । সাথে ইয়াশ । মেঘা ঝাঁপিয়ে পড়ে অমনি । কান্না রুখে ভাইয়াকে আঁকড়ে ধরে বলে…..

” ভাইয়া , ভাইয়া ওনার কি হয়েছে ? বলো না । তুমি তো ডাক্তার । বলো কি হয়েছে ওনার ? ওনাকে ঠিক করে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও তুমি । আমি ওনাকে ভালোভাবে দেখতে চাই । প্লিজ ভাইয়া ,, ওনাকে যে করেই হোক ঠিক করে দাও । আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না । শুধু ওনার সুস্থতা চাই । ওনাকে চাই আমি ।
ইয়াশ বোনের ব্যাকুলতায় থমকায় । নিগুঢ় চোখে চেয়ে রয় কিছুক্ষণ । এটা তার বোন ? এইতো দুপুরের পর কতকি বললো । এখন আবার এসব আহাজারি করছে ? তাও কিনা রৌদ্রের জন্য ? ঐ পাগলটা একেও পাগল বানিয়ে ছেড়েছে !

” লিটিল বার্ড ,, কাম ডাউন । লেটস সি ,,, কিচ্ছু হয় নি । সব ঠিক আছে । রৌদ্র ঠিক আছে এখন । কিছু হয় নি ওর । নাউ, হি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার ।
বোনের আদল আগলে নিয়ে চোখ মুছিয়ে দেয় ইয়াশ । কিছুটা শান্ত হয় মেঘা । পাশ থেকে তোফায়েল কাবির হাঁসফাঁস করে জানতে চান……
” ইয়াশ বাবা , কি হয়েছে রৌদ্রের ? ডক্টর , বলুন আপনারা !
ডক্টর এক পলক ইয়াশের দিকে তাকালেন । বললেন হাঁফ ছেড়ে…..
” অতিরিক্ত মেন্টাল প্রেসার থেকে হার্ট অ্যাটাক । ফার্স্ট টাইম অ্যাটাক এসেছে । আপনারা হসপিটালে নিয়ে আসতে আসতে অনেকটা লেইট করে ফেলেছিলেন । আরেকটু দেরি হলে খারাপ কিছুও হতে পারতো । তার কন্ডিশন খুব একটা ভালো ছিল না । বাট , এখন মোটামুটি ঠিক আছেন উনি । মেন্টাল অ্যাজিটেশনের জন্য ঘুমের ঔষধ দেওয়া হয়েছে । ঘুমানো টা হেল্পফুল হবে । ওনার বিশ্রামের প্রয়োজন ।
বাড়ির সবাই নিস্তব্ধ । ডক্টর থেমে বললেন…..

” এই যুবক বয়সে তার এতোটা চাপ কিভাবে আসে বুঝলাম না । তবে নেক্সট টাইম তাকে আর প্রেসার নিতে দেবেন না । হেলথ্ কন্ডিশন খুব একটা ভালো নয় তার ।
রুবিনা কাবির এসবের ধার ধারলেন না । ছেলেকে দেখতে চান তিনি । ছটফট করে উঠে দাঁড়ালেন…..
” আমার ছেলের জ্ঞান ফিরেছে কি ? ফিরবে কখন ? আমি দেখতে চাই ওকে ।
” চব্বিশ ঘণ্টার আগে তার জ্ঞান ফিরে আসার সম্ভবনা কম । দেখতে পারেন ওনাকে । তবে যেকোনো একজন করে । কথা বলতে পারবেন না । টু শব্দও করা যাবে না তার কানের কাছে । আশা করি বুঝতে পারছেন ।
মেঘা ইয়াশের বুকে হেলান দিয়ে শান্ত হয়ে গেছে পুরো ।
একে একে সবাই এক ঝলক করে দেখে আসলো রৌদ্রকে । ইয়াশ ঝাঁকায় বোনকে…..

” মেঘা ?
” ……..
” রুডি কে দেখবি না ? দেখে আয় ।
চোখ তুললো একবিংশী । ঠোঁট কামড়ে আবারো ফুঁপিয়ে উঠলো । মাথা নাড়ালো দুদিকে । তার মাথা নাড়ানোর কারনটা ঠিক বুঝে নিলো ইয়াশ ।
,,,,,,
পেরিয়েছে একুশ ঘন্টা ।
পরদিন দুপুর । রাতে হসপিটালেই ছিলো মেঘা । রুবিনা কাবির ও ছাড়েন নি । আদ্র ও ছিলো । তবে রৌদ্রের সাথে কেবিনে ছিলো মেঘা । মেয়েটা টু শব্দও উচ্চারণ করে নি তারপর থেকে । মিইয়ে গেছে পুরোপুরি । খায়নি । জোর করেও জুস ব্যাতিত কিচ্ছুটি খাওয়ানো যায়নি ওকে । পেটে দানাপানি পড়ে নি দুপুর গড়িয়েছে তবুও ।
রাতে ঘুমিয়েছে কি না কে জানে ? চোখ ভারী । লাল পুরো । ঝুলে এসেছে চোয়াল । এক রাতেই কালি জমেছে চোখের নিচে । শুকিয়ে গেছে নির্ভেজাল নিদারুণ সুন্দর মুখশ্রী ।
রাত কেটেছে জেগে থেকেই । পলক পড়া ব্যাতীত রৌদ্র কে চোখের আড়াল করে নি । নিস্তেজ হাতখানা হাতের মুঠোয় নিয়ে আকড়ে রেখেছিলো ‌গোটা রাত ।

এখনো জ্ঞান ফেরেনি লোকটার । বাড়ির সবাই এসেছেন আবার । কেবিন ফাঁকা করে মিনিট পাঁচেক ধরে রৌদ্রের চেকআপে মগ্ন ডাক্তাররা । ইয়াশ ও বেশ সহযোগী । বাইরে চুপচাপ বসে আছে মেঘা । ওকে খাওয়ানোর জন্য সিরাতের হাতে খাবার ধরিয়ে দিয়েছে আদ্র । কিন্তু জেদি মেয়ে মুখে তুলবে না কিছু । যেনো পন ধরেছে , রৌদ্রের আঁখি দ্বয়ের খোলা পাপড়ি না দেখা অবধি গলা দিয়ে নামাবে না কিছু । ব্যর্থ হলো সিরাত ।
এবারে ডাক্তার বেরিয়ে সুখবর দিলেন । জ্ঞান ফিরেছে রৌদ্রের । অমনি বাঁধা ভুলে কেবিনের ভেতর হামলে পড়লেন সকলে ।
ঝাপসা চোখে পিটপিট করে দরজার দিকেই চেয়ে ছিলো রৌদ্র । সবাইকে হুমড়ি খেয়ে ঢুকতে দেখে আনমনে একটু হাসলো । রুবিনা কাবির ছেলের পাশে গিয়ে বসেন ঝটপট । মাতৃত্বের ব্যাকুলতায় পুরো মুখশ্রী জুড়ে হাত বুলিয়ে দেন । চোখ ঝাপসা হয়ে আসে মুহুর্তেই ।
” রৌদ্র,, বাবা কেমন আছিস এখন ? ভালো লাগছে ? নাকি কষ্ট হচ্ছে কোথাও ? কোথায় কষ্ট হচ্ছে বল !
রৌদ্র কেবলই চেয়ে রয় । এপাশ ওপাশ তাকায় চোখ ঘুরিয়ে । নীরবে আকুল দু-চোখ খুঁজে বেড়ায় কাঙ্ক্ষিত জনকে ।
একেক জনের একেক প্রশ্ন । রৌদ্রের কানে পৌঁছালো না কিছুই । তোফায়েল কাবির ও ডাকলেন । শুনলো না তার অবাধ্য ছেলে । অভিমান থেকে সাঁড়া দিলো না ।
আদ্র এগিয়েও মায়ের মতো করে চিন্তিত মুখে একই প্রশ্ন করে ভাইকে । কিন্তু ভাইয়ের জবাব নেই । আর না প্রতিক্রিয়া ।
শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত অসুস্থ চোখ দুটি ব্যর্থ হলো যুবকের । সবার এতো সব প্রশ্নের উদ্বিগ্নতার ধার ধারলো না । খুঁজে পেলো না রমনীকে ‌। সবার আকুলতা , গোটা গোটা প্রশ্ন , ডাক-হাঁক , সব ছাপিয়ে যুবক ক্ষিণ আওয়াজে শুধালো….
” মম , আমার ইভারা কোথায় ?
থমকায় পরিস্থিতি । নীরব হয়ে যায় পুরো ঘর । এতো এতো আপনজন , কাউকেই প্রয়োজন ভাবলো না এই ছেলে । খোঁজ চাইলো প্রিয়জনের । এ কেমন রৌদ্র ? সেই বেপরোয়া কি ? না তো ,, এতো চেনা নয় । বরং অচেনার পরিচয়ের সীমাও অতিক্রম করে চলেছে দিনকে দিন ।

হা বনে চেয়ে রন সকলে । সাথে ইয়াশ ও ।‌ সে বোধহয় বিমূক , স্তব্ধ, বিমুগ্ধ । চোখে অবিশ্বাস ।
মায়ের উত্তর না পেয়ে রৌদ্র হাত নাড়ানোর চেষ্টা করলো । করুন অবিসন্ন ধীরুজ স্বরে বলল আবার….
” আসে নি ও ? এখনো ভুল বুঝে বসে আছে ? ও আমায় ভুল বুঝেছে, মম । প্লিজ তুমি ওকে আটকাও । বোঝাও ওকে । নয়তো ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে । মম, তোমার ছেলে বাঁচবে না ওকে ছাড়া । মরে যাবে একদম । প্লিজ ওকে আমার করে আটকে রাখো । ওকে বলো আমি ভালো নেই , মরে যাচ্ছি । দেখবে, ঠিক ছুটে আসবে ।
রৌদ্রের কথা শেষ হতেই আঁতকে উঠলেন রুবিনা কাবির । ছেলের মুখ চেপে ধরলেন । দরজার কাছ থেকে শব্দ আসে তৎক্ষণাৎ । হেঁচকি তুলে ছুটে আসে মেঘা । ধক্ করে চায় রৌদ্র । মেঘা বেডের অপর পাশে দাঁড়ায় । মেঝেতে হাঁটু গেড়ে রৌদ্রের হাত আঁকড়ে ধরে । লোকটার খোলা পাপড়ি সমেত , তামাটে মুখখানা দেখে হু হু করে কেঁদে ওঠে ঠোঁট ভেঙে ।

” আ’ম সরি রাইনো মুখো ,, খুব করে সরি । আমার জন্য এসব হয়েছে । আপনার এই অবস্থার জন্য দায়ী আমি । সব আমার ভুল । আর ভুল হবে না । ভুল বুঝবো না আপনাকে । শুনে নিন ,, আমি কোত্থাও যাবো না আপনাকে ছেড়ে । কোত্থাও না ।
হাসলো রৌদ্র । জানতে চাইলো শ্বাস টেনে….
” সত্যিই ?
” পাক্কা !
রৌদ্র উত্তরে ভারী প্রশান্ত হলো । আবারো হাসলো এক চিলতে । হাত বাড়িয়ে দিয়ে নির্লজ্জ ভাবে চেয়ে বসলো সকলের সামনে…..
” তাহলে বুকে এসো এক্ষুনি !
মেঘার কান্না গলায় আটকায় ।
এখানে সবাই উপস্থিত । থতমত খেলেন রৌদ্রের কথায় । মেঘা আহম্মক বনে যায় । অসুস্থতার নামে নির্লজ্জ লোকটার দিকে তাকিয়ে রয় ভ্যাট ভ্যাট করে । লজ্জায় নত হয়ে ওষ্ঠ উল্টে চোখ পাকায় । তার চোখ রাঙানি থোরিই না কেয়ার করে রৌদ্র । কাউকেই কেয়ার করলো না । এখনো নিস্তেজ হয়ে বেডে পড়ে আছে ।
কোথা থেকে যেনো বল পেলো হঠাৎই । মেঘার বাহু টেনে ওকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে নিতে বললো গলা উঁচিয়ে….

” ধ্যাত , এসো তো । বুকটা ফাঁকা লাগছে বড্ড , তোমার প্রয়োজন এখানটায় । মম , সবাইকে চোখ বন্ধ করতে বলো । আমি আমার বউকে জড়িয়ে ধরবো এখন । ভালো হয় যদি বাইরে যাও সবাই । আই নিড সাম কোয়ালিটি টাইম উইথ মাই ওয়াইফ , রাইট নাউ…
মেঘা মিইয়ে যায় পুরোপুরি । ইশশ্ , কি লজ্জা সবার সামনে । লাল নীল হলুদ সবুজ , সব রঙে রঙিন হয়ে ওঠে একবিংশী । ততক্ষণে রৌদ্র ওকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরেছে । চোখ বুজে ঠোঁট ছুঁইয়েছে কানের লতিতে ।
সবাই চোখ নামিয়েছেন । এই ছেলের জন্য তারা লজ্জায় পড়ে যান , অথচ ছেলের কোনো পরোয়াই নেই । কি নির্লজ্জ ছেলেরে বাবা ।
রুবিনা কাবির চোরা চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন কটমট করে । বিড়বিড় করলেন , তার মতোই হয়েছে এই ছেলে । তিনিও তো কম নির্লজ্জ ছিলেন না যৌবনে । এবার বুঝুক । তার ছেলে তার চেয়ে চার কাঠি উপরে ।
একে একে চোখ নামিয়ে ঘর ছাড়েন বড়রা । রৌদ্র একবার আধো আধো চোখ খুলে দেখলো , আদ্র, শাফাহ্, শিশির, এরা আছে এখনো ‌। পা বাড়িয়েছে ওরাও । রৌদ্র চাপা ভেংচি কাটলো ভাইয়ের উদ্দেশ্যে….

” ছ্যাহহহহ্ , লজ্জা থাকা উচিত । ছোট ভাইয়ের প্রেম দেখতে আসে ।
ইয়াশ ও ছিলো । নজরে পড়ে নি । তার আগেই মেঘাকে নিবিড় ভাবে মিশিয়ে নিয়ে আবার চোখ বুজেছে রৌদ্র….
মেঘা তার গলার নিকট দাঁত বসিয়ে বিড়বিড় করলো…..

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬১

” অসভ্য, নির্লজ্জ, বেহায়া, ইরিটেটিং রাইনো মুখো । আপনি খুব খারাপ । আই হেইট ইউ ।
” বাট আই লাভ ইউ, সভ্য মেয়ে ।
শাফাহ্ বেরোতে বেরোতে ইয়াশ কে দেখলো । পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে চোখ তুলে বিড়বিড় করলো…..
” হ্যাভ ইউ নো শেম ?

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here