Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮
সুরভী আক্তার

বাপের তপ্ত ডাকে রৌদ্রের দাম্ভিকতায় উদ্যত পা যুগল থমকালো একধাপ সিঁড়ি উঠতে গিয়ে । না চাইতেও থামলো সে । বিরক্তি সূচক ‘চ’ উচ্চারণ করলো জিভের ডগায় । তোফায়েল কাবির যে ওকেই থামতে বলেছেন , তা না তাকিয়েও ঠিক ঠাহর করলো সে । আদ্র আর শাফাহ্ তড়িতে তাকালো তোফায়েল কাবিরের কন্ঠ অনুসরণ করে । রৌদ্র নিরুদ্বেগ । প্রতিক্রিয়া হীন গা ছাড়া ভাবে পিছু ফিরলো । বাপের সাথে অনুভূতি হীন নিগুড় দৃষ্টিতে চোখাচোখি হলো । তোফায়েল কাবিরের রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে চোখ নামিয়ে তর্জনী দিয়ে কপাল চুলকালো রৌদ্র ।
তোফায়েল কাবির বললেন নিরেট কন্ঠে….

” বোঝাপড়া বাকি আছে তোমার সাথে । যা যা বলবো , ঠিক কাঁটায় কাঁটায় উত্তর করবে ।
নিচে নেমে আসে রৌদ্র । তোফায়েল কাবির খানিক চুপ থাকলেন । কথা সাজিয়ে কন্ঠ শক্ত করলেন আরো ।
” মেঘা কে মেরেছো কেনো ?
প্রশ্ন টা শুনেই সোফায় গা এলিয়ে দিলো রৌদ্র । পিছনের দিকে শরীর হেলিয়ে দীর্ঘ শ্বাস টানলো,, অতঃপর ফেললো ভারী শ্বাস । চোখ বুজে দুদিকে ঘাড় ঝাঁকালো ‌। বললো….
” বাবাই , তোমার ভাইকে বলে দাও, বারবার এক প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই আমি ! বিরক্ত লাগে…
মস্তিষ্ক আরো বেশি চড়াও হয়ে গেলো তোফায়েল কাবিরের । বরাবর ছেলের এই বেপরোয়া উপেক্ষিত আচরণে ক্ষিপ্ত হতে বাধ্য হন তিনি । এবার আরো বেশি ঝাঁজালো হলো তার কন্ঠ….
” হেয়ালি কথাবার্তা বলবে না একদম ।
মেঘা কে মারার কোনো যৌক্তিক কারন ছিলো না । আচমকা ওর গায়ে হাত তুললে কেনো তুমি ? তাও আবার আমাদের সবার সামনে ?

” তো কি ? ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে সবার আড়ালে মারতে হতো ওকে ?
ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন তোফায়েল কাবির ।
নির্বাক হলেন এক মুহুর্ত । পরমুহূর্তেই ফের কঠোরতা ফিরিয়ে আনলেন…..
” মেঘা আমাদের দায়িত্ব , আর ওকে আঘাত করার কোনো অধিকার তোমার নেই । মনে নেই পাঁচ বছর আগে কি করেছিলে ? ঐ মেয়েটা কে জোর করে বিয়ে করে ফেলে রেখে চলে গেছিলে । পাঁচটা বছর পেরিয়ে গেছে । এই পাঁচ বছরে তোমাকে পাই নি আমরা । মেঘাকে পেয়েছি । কি হয়েছে এই পাঁচ বছরে , কে ঐ মেয়েটা , কি ওর আসল পরিচয় , কাকে নিজের কৃতকর্মে জড়িয়েছো , কোনো খোঁজ নিয়েছো তুমি ? তুমি জানো ঐ মেয়েটা কে ? নাকি চেনো ওকে ? আজ এতো বছর পর ফিরে এসেও পরিবর্তন হও নি একটুও ? কোনো কারন ছাড়া , আচমকা ওর গায়ে হাত তুলেছো তুমি ! কোন অধিকারে ?
রৌদ্রের দিক থেকে নড়চড় বা উত্তর নেই । তোফায়েল কাবির চুপ থেকে আবার বললেন…..

” প্রশ্নের উত্তর দাও আমার । কেনো মেরেছো ওকে ?
” হাত চুলকাচ্ছিলো । তাই মেরেছি ! আর কাউকে মারতে পারতাম না , তাই ওকেই মেরেছি ।
” ও কে ? কেনো মারবে তুমি ওকে ?
” ও কে ? কেনো রাখবেন ওকে এ বাড়িতে ? কেনো আশ্রিত হয়ে পড়ে আছে ও এ বাড়িতে ?
বিপরীতে পাল্টা প্রশ্ন রৌদ্রের । তোফায়েল কাবির মুহুর্ত কয়েক চুপ থেকে উত্তর করলেন…..
” ও আমার মেয়ে । আর আমার মেয়ের পরিচয়েই ও এ বাড়িতে আছে ! কোনো আশ্রিতা হিসেবে নয় । যতদিন ওর এ বাড়িতে থাকার , ততদিন থাকবে ও বাড়িতে । ওর বর্তমান পরিবার আমরা ?
তুমি জানো ওর বিষয়ে কিছু ? নাকি শুধু নেশা করতেই জানো ? পাঁচ বছর আগে চেনা নেই জানা নেই কোথা থেকে একটা মেয়েকে তুলে এনেছিলে , জানা আছে তোমার ? তখন জানতে ও কে ? ওর পরিবার কোথায় ? কারা ওর পরিবার ? আজ শুনে রাখো , মেঘার কেউ নেই ! পাঁচ বছর থেকে মেঘার পরিবার ,পরিজন , সবটা জুড়ে শুধু আমরা ? ও আমাদের দায়িত্ব ! আর আমরা ওর দায়িত্বরত থাকা অবস্থায় ওর উপর কোনো আঁচড় লাগতে দেবো না । ফার্দার যদি ওর গায়ে হাত তুলেছো , তাহলে ভালো হবে না বলে রাখলাম । আমার মেয়েকে প্রটেক্ট করতে পারবো আমি । সেটা তোমাকে এড়িয়ে হলেও !

” আচ্ছা ? মেয়ে ? রাস্তায় খুঁজে পেয়েছেন ওকে ? আমি না হলে কোথায় পেতেন ওকে ? পরিবার হতে এসেছেন ওর ? বাবা হতে এসেছেন ? কই , রাস্তায় তো এমন অনাথ,বাড়ি ঘর হীনা হাজার হাজার মানুষ পড়ে আছে । তাদের তো এভাবে ঘরে রাখেন নি ! ওকে আশ্রিতা হিসেবে রেখেছেন কেনো তাহলে ?
” ও আশ্রিতা নয় । যথেষ্ট সম্মান নিয়ে ও এবাড়িতে আছে । আমার বা তোমার , কারোর টাকাতেই খাচ্ছে না ও । আর না বেকার এ বাড়িতে পড়ে আছে ।
ওর পরিবার হিসেবে শুধু সঙ্গ দিয়েছি আমরা ওকে ! শুধু সঙ্গ টাই দিয়েছি । আর কিচ্ছু দেই নি এ অবধি , যার পরিপ্রেক্ষিতে ও আশ্রিতা নয় আমাদের । ওর একটা পরিবার , কিছু আপনজনদের প্রয়োজন ছিলো । আমরা সেই প্রয়োজন মিটিয়ে আসছি নির্দিষ্ট সময় যাবৎ । যখন এই সময়কাল টা কেটে যাবে , তখন আমাদের আর প্রয়োজন পড়বে না ওর ।
এ কথা গুলো হয়তো রৌদ্র বুঝলো না । বোঝার চেষ্টা করলো না । বিড়বিড় করলো…

” বাটট,, আমার প্রয়োজন পড়বে ওর । অনির্দিষ্টকালের জন্য আমার প্রয়োজন পড়বে ।
উঠে দাঁড়ালো রৌদ্র । আর কিছু শোনার মতো অভিরুচি আসলো না । তোফায়েল কাবিরের কথা শেষ হয় নি । তিনি আদেশের সুরে ছেলেকে থামতে বললেন । বলতে চাইলেন আরো কিছু । কিন্তু তার ছেলে আর শুনবে না । থামলো না তার বেপরোয়া ছেলে । ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো । আদ্র মাথা ঝাঁকালো দুদিকে ।
মেঘার ঘুম ভেঙ্গেছে । চোখ মুখ ফোলা ওর । অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে আজ । অতিরিক্ত ঘুমের দরুন চোখ ফোলা ফোলা দেখাচ্ছে আরো বেশি । গোসলের পর ভেজা চুল সমেত শুয়েছিলো । হাঁটু ছড়ানো মেঘ বরন কেশরাশী জট পাকিয়ে এলোমেলো । কুঁকড়ে গেছে সিল্কি কুন্তল । এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে কাঁধ ঝাঁপিয়ে । এদিকে খিদেও পেয়েছে ভীষণ । সারাটা দিন পেটে দানা পানি পড়ে নি । ঘুম থেকে উঠেই আবার মাথা এলোমেলো লাগছে । গুলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু । চাপানো দরজা খুলে হাই তুলতে তুলতে ঘর ছাড়লো মেঘা । পড়নে সাদা স্কার্ট আর খয়েরী ফ্রক । চুলে ঢাকা ছিপছিপে গড়নের পুরো শরীর খানা । চোখ এখনো ঘুমের ভারে মশগুল । নিভু নিভু মেলেছে পাপড়ি যুগল । দরজা চাপিয়ে করিডোরে পা বাড়ালো মেঘা । উদ্দেশ্য, এখন নিচে যাবে । আগে খাবে কিছু ।

শরীর অবসন্ন লাগছে । ধীরে ধীরে পা বাড়ালো মেঘা । বাড়াতে বাড়াতে এলোমেলো চুল গুলো হাত খোপা করে নিলো । দৃষ্টি নিচুতে থাকায় ঠিক সম্মুখে পথ রোধ হতেই কারোর পদ যুগল নজরে আসলো । কপাল গুটিয়ে ধীরে চোখ তুললো মেঘা । অমনি অযাচিত এক জনের মুখশ্রী দেখা মাত্রই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো অবসন্ন শরীর খানা । চেহারায় অসন্তোষ ফুটতে এক মুহুর্ত সময় পার হলো না । ক্ষুণ্নতায় চোখ কুঁচকে নিলো সে । নরম চোয়াল শক্ত করলো । আকস্মিক আঘাতপ্রাপ্ত কপোলখানার দগ্ধা ব্যাথা জেঁকে উঠলো । চিনচিন করে উঠলো গাল খানা । আপনা আপনি দাঁত চেপে হাত উঁচিয়ে গালে রাখলো মেঘা । রৌদ্রের অবস্থা অনড়, স্বাভাবিক । নড়লো না একটুও । পরিবর্তন আসলো না ওর মাঝে । সেভাবেই চোখ নামিয়ে পাঁচ ফুটের মেয়েটাকে স্থির দৃষ্টিতে পরখ করলো । গালে নজর পড়লো । কান্তিমান শুভ্র কপোল লালচে , স্পষ্ট মারের দাগ ।
সেদিক পানে তাকিয়েই অবাধ্য হৃদয়ে আকস্মিক খেদ জাগ্রত হলো বেপরোয়া রৌদ্রের । হাত মুঠো করলো রৌদ্র । তাকিয়ে রইল এক ধ্যানে ।
মেঘার অবসন্নতা কেটে গেছে এই উশৃঙ্খল লোকটাকে দেখা মাত্রই । দূর্বলতা ক্ষোভে রুপান্তরিত হয়েছে । ফোঁস করে শ্বাস ফেললো সে । নিবিড় পা যুগল থমকালো না আর । গজগজ করে রৌদ্র কে পাশ কাটাতেই কানে ঠেকলো বেপরোয়া লোকটার শান্ত স্বর…..

” ইভারা…..
না চাইতেই থমকালো উদ্যত রমনীর অহমিকায় অগ্রসর পা যুগল । আঠার ন্যায় মেঝেতে চিপকে গেলো । শরীর খানা কেমন ঝাঁকিয়ে উঠলো । ওকে ইভারা সম্বোধনে ডাকে না কেউ । সবাই ওকে মেঘা নামেই চেনে । একমাত্র আদ্র আদুরে গলায় মেঘ বলে ডাকে ওকে । মেঘ , আদ্রের মেঘবুড়ি । তাও পাঁচ বছর ধরে । বাকিরা সবাই মেঘা বলে ডাকে ।
ইভারা নামটা প্রায় বিস্মৃত । আজ অনেক দিন পর এই নামে ওকে ডাকলো কেউ । আগে ডাকতো ওর বাবা । মেঘার বাবা । যিনি মেঘার জন্মের ছয় বছর পর গত হয়েছেন তার স্ত্রী কে সঙ্গে নিয়ে । মেঘা কে একমাত্র ওর বাবা’ই ইভারা বলে ডাকতো । মেঘা সেই ডাকের কন্ঠ টাও ভুলে গেছে এতোগুলো বছরে । আকস্মিক আজ , এই মুহূর্তে সেই ডাকটা কর্নকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই প্রকম্পিত হলো একবিংশীর হৃদয় । কেমন স্পন্দিত হয়ে কেঁপে উঠলো মেঘা । ঠিকড়ে ওঠা রাগ শিথিল হলো এক নিমিষেই । তড়িতে পিছু ফিরলো মেঘা । অবিলম্বে চোখাচোখি হলো সেই বেপরোয়া লোকটার সাথে । স্বাভাবিক চাহনি দুজনার । এক মুহুর্ত পর রৌদ্রের শীতল কন্ঠ ভেসে আসলো আবার….

” কাছে আয় তো…
বলেই থামলো । নিজেকে শুধরে নিলো সেকেন্ড পেরোতেই…
” কাছে এসো তো !
মেয়েটা এক মুহুর্ত স্থির হলেও পরমুহুর্তে ফের আগের ন্যায় ক্ষিপ্ত হতে ভুললো না । তাচ্ছিল্য তার সহিত মুখ ফিরিয়ে নিলো । চরম বিরক্তি দেখিয়ে বললো অস্ফুটে….
” ফা*ক অফ ম্যান….
অতঃপর মুখ ফিরিয়ে দৃঢ় পায়ে সোজা সিঁড়ির দিকে এগোলো । রৌদ্র কেবলই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল । আর বললো না কিছু , আটকালো না মেয়েটা কে ।
মেঘা নিচে নামতেই নিচের গুমোট পরিস্থিতি খানিক স্বাভাবিক হলো । টেবিলের পাশে আদ্র আর শাফাহ্ চুপটি করে দাঁড়িয়ে । তোফায়েল কাবির এতক্ষণ রাগ ঝাড়লেন নিজের মাঝেই । মেঘা কে নামতে দেখা মাত্রই চুপ করলেন তিনি । পিনপতন নীরবতা নামলো সবার মাঝে । মেঘা নিচে নেমে একে একে সবাইকে এক পলক করে দেখলো শান্ত চোখে । অতঃপর মাথা নিচু করে কিচেনের দিকে এগোলো । আদ্র উদ্বেগাকুল হয়ে ডাকলো পিছন থেকে….

” মেঘ !
থেমে উত্তর করলো মেঘা….
” হ্যাঁ ভাইয়া ।
” খিদে পেয়েছে ? কিচেনে যাচ্ছিস কেনো ?
মা , মেঘের খাবার নিয়ে এসো ।
” প্রয়োজন নেই । আমি নিজেই নিয়ে আসছি….
সদর দরজা থেকে এমন সময় শুভ্রের বিচলিত কন্ঠস্বর ভেসে আসলো । ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে হাঁক ছাড়ল সে….
” খাবার আমি নিয়ে এসেছি ।
চকিতে একাধিক জোড়া দৃষ্টি তাকালো শুভ্রের দিকে । হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলো শুভ্র । ফর্মাল ড্রেসআপে পরিপাটি ছেলেটা খানিক এলোমেলো হয়ে গেছে সারা দিনের ধকলে । মেঘা খায় নি সকাল থেকে । এটা শোনার পর আসার পথে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসেছে সে । মেঘার ফেভারিট বিরিয়ানি ।
শুভ্র এগিয়ে এসে বিরিয়ানির প্যাকেট গুলো টেবিলের উপর রাখলো । বোনকে উদ্দেশ্য করে বললো…

” টুকটুকি , খাবার গুলো সার্ভ করে দে । সবার জন্য এনেছি । মেঘা কে আগে দিবি । মিষ্টি মেয়ে খায় নি সকাল থেকে । মেঘা এদিকে আয়….
অগত্যা এগিয়ে আসলো মেঘা । শুভ্র গুরুভার গলায় বলল….
” সকাল থেকে খাস নি কেনো ?
” খিদে ছিলো না ভাইয়া !
উপরে করিডোরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে মেঘার উত্তর শুনে বিড়বিড় করলো রৌদ্র…
” এক থাপ্পড়েই সারাদিন পেট ভরা ছিলো ইডিয়টের । এখনো আমার হাতে আরো উনপঞ্চাশ টা থাপ্পর খাওয়া বাকি আছে ওর । গাল ফুলিয়ে চেহারার হাল বেহাল করেছে এই এক থাপ্পড়েই , আর বাকি থাপ্পর গুলো ওর গালে বসাবো কি করে আমি ? ননসেন্স…
বিড়বিড় ছেড়ে এতক্ষণে নিজের ঘরে ঢুকলো রৌদ্র ।
মেঘার উত্তরে শুভ্র বললো একই ভার গলায়….

” এখন তো খিদে পেয়েছে ? এখন খাবি ? টুকটুকি সার্ভ করতে বললাম তো তোকে ! দাঁড়িয়ে আছিস কেনো ? চটপট সার্ভ করে দে । আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি….
শাফাহ্ ভেংচালো….
” এহহ্ , চাকর পেয়েছো আমায় ? আমি পারবো না এসব কিছু করতে ! আম্মু কে ডাকছি….
” চাকর পাই নি , চাকরানি পেয়েছি তোকে । দেখেছিস তোর কতো সম্মান ? রাণী বলছি তোকে ! এবার চাকরানি মহাশয়া , দয়া করে খাবার গুলো বেড়ে দিন । আমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসছি । একসাথে খাবো ।
তেতে উঠল শাফাহ্….
” ভাইয়াআআআ ???
” বল বনু !
শুভ্রের শান্ত ধীর উত্তর । রাগতে গিয়েও গলে জল হয় মেয়েটা । ভাইয়ার ভীষণ আদুরে সে । আদুরে হয়ে বলে গদগদ হয়ে….

” যাও তো । ফ্রেশ হয়ে নাও ।
শুভ্র মুচকি হেসে উপরে উঠলো ।
খানিক বাদ ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমেছে । টেবিলে বসে পড়েছে ছেলে মেয়েরা । আদ্র, শুভ্র, শাফাহ্,মেঘা , সিরাতও বাদ পড়ে নি যোগ দিতে । রামিশা কে শাহিনা কাবিরের কোলে দিয়ে যোগ দিয়েছে ওদের সাথে । আহিয়ান ফেরে নি এখনো । আড্ডা জমিয়ে খাওয়া দাওয়ার পাট চুকালো ওরা । রৌদ্র কে ডাকলো না , জড়ালো না নিজেদের সাথে । কারন টা অবশ্য মেঘা ।
রাতে ছেলে মেয়েরা আর খায় নি কেউ । রান্নার প্রয়োজন হয় নি রাতে । শুভ্রের আনা সেই বিরিয়ানি দিয়েই ডিনার সারা হয়েছে ।
পুরোটা বিকেল ঘুমিয়েছে মেঘা । চোখে আর বিন্দুমাত্র ঘুম নেই । এমনিতেও রাত জাগা পেঁচা সে । ঘুম আসে না মাঝেমাঝে । ভীষণ অস্থির লাগে এমতাবস্থায় । আজও ঘুম আসছে না একটুও । অনেকক্ষণ শুয়ে শুয়ে নিরবে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলো মেয়েটা । শুয়ে থাকতেও ভালো লাগছে না আর । বিরক্তিতে উঠে বসলো মেঘা । দম বন্ধ লাগছে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে । বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে কিছু একটা বের করে বুকের সাথে চেপে ধরে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগোলো মেঘা । সন্তর্পণে শব্দ হীন দরজা খুলে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে । দোতলা থেকে সোজা উঠলো ছাদে । রাত্রি হয়তো তিনটে পেরিয়েছে । নিস্তব্ধ পুরো বাড়ি , পুরো শহর । সবাই তখন গভীর ঘুমে । আর মেঘা গভীর বেদনায় ।

নিশীথ রাতের নিরবতায় আবছা আলোয় ছাদে উঠলো সে । বাঁকা চাঁদ মধ্য গগনে ঠাঁই করে মৃদু জোৎস্না ছড়াচ্ছে । মাঝে মাঝে লুকোচ্ছে মেঘের আবডালে । শহরের সব আলো নিভে গেছে , বন্ধ হয়েছে ব্যাস্ত কোলাহল । চারপাশ পুরো শান্ত । মেঘা পা টিপে টিপে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো । আকাশ পানে মুখ তুলে চোখ বুজে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । অতঃপর চোখ মেলে তাকালো । আজ গগনে চাঁদের পাশে তাঁরার অস্তিত্ব নেই । একটাও তাঁরা দেখা যাচ্ছে না আজ । মুখ খানা এতেই মলিন হলো মেঘার । ছোট্ট বাচ্চার ন্যায় ঠোঁট উল্টালো মেয়েটা ।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে কসরত করে খুঁজলো দুটো তাঁরা । কিন্তু পেলো না । পিছু ফিরে ধীরে ধীরে বসলো ছাদের মেঝেতে । রেলিংয়ে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটু জড়িয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিলো । বুকের সাথে চেপে ধরা মাঝারি আকারের ফ্রেম টা সামনা সামনি ধরলো এবার । ছাদে জ্বলে থাকা একটা রুপোলি আলোয় পাশাপাশি দুটো ছবি জ্বলজ্বল করে প্রকট হয়ে উঠলো ফ্রেমে ।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে অভিযোগ করলো মেঘা….

” আম্মু , আব্বু , আজ আসো নি তোমরা ? আমি না তোমাদের সাথে দেখা করতে আসলাম এই রাতে । জানো , আজ আমার ঘুম আসছে না কিছুতেই । ভীষণ ছটফট লাগছে । সবাই ঘুমিয়ে গেছে আমি ছাড়া । তোমরাও মেঘের আড়ালে ঘুমিয়ে গেছো ? খুঁজলাম তোমাদের , পেলাম না । আমার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে চলে গেছো ? আমি আসতে দেরি করে ফেলেছি আজ ? কটা বাজে ? তিনটে পেরিয়েছে , এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছো তোমরা ? সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে আজ , কিন্তু আমার কেনো ঘুম আসছে না বলতো ? কেমন কষ্ট কষ্ট লাগছে আমার ‌।
মেঘা একটু থামে । অনুভব করে , ফ্রেম টা ঝাপসা হয়ে এসেছে ওর নিকট । অস্পষ্ট দেখাচ্ছে ওর আম্মু আব্বুর মুখশ্রী । তার মানে চোখ ভরে এসেছে । পানি জমেছে আঁখি কোটরে । মেঘা তড়িতে হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছলো । ঢোক গেলার চেষ্টা করলো । কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এসেছে । কি অদ্ভুত ! বুক ভারাক্রান্ত লাগছে কেনো ?
মুখ কুঁচকে শ্বাস টানে মেঘা । বারবার চোখ ভরে আসছে । নিজেকে সামলে রাখা ভীষণ দায় হয়ে পড়ছে । হাঁফ ছাড়ে মেঘা । আর পারে না নিজেকে ধরে রাখতে ।

নিস্তব্ধতায় একাকিত্বে গুমড়ে ওঠে মেয়েটা । ঠোঁট ভেঙে বাঁধ ছেড়ে কোটর ফেটে বারি ধারা বয়ে চলে । নিস্তব্ধ যামিনী কে সাক্ষী রেখে আম্মু আব্বুর ছবির উপর হাত বুলিয়ে অভিযোগ করে তাদের আদুরে রাজকন্যা….
” আব্বু জানো , ঐ লোকটা আমাকে মেরেছে ! এই দেখো, আমার গালে নিজের পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়ে দিয়েছে । তোমরা কখনো মেরেছো আমায় ? ফুলের টোকা দিয়েছো আমার শরীরে ? ধমকেছো কখনো ? ধমকাও নি তো , মারো নি কখনো ! কিন্তু ঐ লোকটা , এই নিয়ে দু-দুবার মেরেছে আমায় । আঘাত করেছে ! আমার খুব লেগেছে জানো ? তোমরা কেনো আমাকে একলা রেখে চলে গেলে আম্মু ? কেনো গেলে বলতো ? যেখানে গেছো , সেখানে আমায় নিয়ে গেলে হতো না ? আমার জায়গা হতো না তোমাদের সাথে ? তোমরা আমার সাথে থাকলে আজ আমার জীবন টা এমন হতো না । সবটা বদলে যেতো ।

কেউ নেই আমার ? কেনো আমাকে একলা রেখে চলে গেলে তোমরা ? মরা মানুষের নামে অভিযোগ রাখতে নেই । আমি দেবো না তোমাদের উপর কোনো অভিযোগ । কোনো দাবি রাখবো না তোমাদের উপর । কিন্তু তোমাদের ছেলে ? ওকে ছাড়বো না আমি । ওকে ক্ষমা করবো না কিছুতেই । দেখে নিও , তোমাদের ছেলে পার পাবে না আমার থেকে । আমাকে সম্পুর্ন একলা করে দেওয়ার জন্য ওকে ছাড়বো না আমি । ওকে খুব মারবো দেখো । ও ছাড় পাবে না আমার থেকে । তোমাদের পর তোমাদের বজ্জাত ছেলেও আমাকে একলা রেখে চলে গেছে । দাদু মনির কথা তো বাদই দিলাম । তোমাদের উপর আর দাদু মনির উপর একটুও রেগে নেই আমি । কিন্তু তোমাদের ছেলের উপর খুব রেগে আছি । ওকে আমি কাছে পেলে ছাড়বো না বলে রাখলাম । আমাকে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ করার জন্য শাস্তি পেতে হবে ওকে ।

মেঘা ফুঁপিয়ে থামে । হেঁচকি তোলে । মাথা টা পিছনের দিকে হেলিয়ে দেয় । উপর পানে মুখ তুলে চায় । শিরশির করে বাতাস বইছে । গরমেও শরীরে কাঁটা দিচ্ছে মেঘার । বুকখানা মুচড়ে উঠছে আব্বু আম্মুর কথা খেয়ালে আসতেই । যাদের মুখশ্রী ওর ক্ষিণ স্মৃতিতেও বিলিন প্রায় । এই ছবিটা দেখে দেখে আব্বু আম্মু কে স্বরন করে মেঘা । একলা রাতে তাঁরা ভরা আকাশের পানে খুঁজে বেড়ায় দুটো শুকতারা । ছোট বেলায় দাদু মনি শান্তনা দিতো ঐ শুকতারা দুটোকে দেখিয়ে । ও দুটো নাকি মেঘার বাবা মা । পাশাপাশি অবস্থানে সেই দূরাকাশ থেকে মেঘা কে চোখ ভরে দেখেন তারা । মেঘা এটাকে আশ্রয় করে রেখেছে । নিজের মনকে মানাতে খুব কষ্ট হলে সেই দুটো তাঁরার কাছে এসে নালিশ জুড়ে বসে ।
আজ কষ্ট হচ্ছে । অজ্ঞাত ভারে বুক জ্বালা পোড়া করছে । আকাশ পানে মুখ তুলে চোখ বুজে নেয় মেঘা । কান্না গিলে বিড়বিড় করে ফুঁসে উঠে…..
” আই হেইট হিম । আই ডিপলি হেইট রুডভিক কাবির রৌদ্র । নেভার উইল আই ফরগিভ হিম । নেভার…
আই হেইট ইউ রুডভিক কাবির রৌদ্র ।

পূর্ব দিগন্ত সিঁদুর রাঙা হয়ে উঠছে । অরুণ আলোয় রাঙা প্রভাতের সূচনা । নতুন একখানা সকাল । ভোরের কাঁচা মিঠে রোদ সবে পড়েছে ধরনীতে । আকাশ চিরে উদিত হয়েছে দিবাকর । পাখির কিচিরমিচির ডাকে মুখোরিত গগন । এই এতো সকালে সূর্য উদিত হলেও প্রখরতা কম নয় মোটেও ! উদিত হওয়া থেকেই তপ্ত তেজ ঝেড়ে দিচ্ছে সূর্যি মামা । হবে সবে সকাল সাতটার কাছাকাছি ।
খোলা ছাদে এখনো রেলিংয়ে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে ঘুমন্ত রমনী । ঘুমের ভারে ডান দিকে হেলে পড়েছে অঙ্গনা তনু । বাম হাত অবহেলায় ছাদের মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে , আর ডান হাত দিয়ে বুকের সাথে চেপে রাখা সেই ছবির ফ্রেম টা । আব্বু আম্মুর কাছে নালিশ করতে করতে রাত্রির একধারে কখন চোখ বুজে এসেছে বুঝতেই পারে নি মেঘা । ঘুমে টলে পড়েছে এখানেই ।

এখন সে বিভোর ঘুমে । লম্বা বিনুনি টা পেঁচিয়ে পড়ে আছে ছাদের মেঝেতে । বিনুনি থেকে ছুটে আসা ছোট ছোট অলক গুচ্ছ মুখে লুটাচ্ছে । প্রভাতে বদন চুম্বন করছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অলকাবলী । ফর্সা ধবধবে মুখমন্ডলে কালো কালো নিমিত্ত কেশরাশী মৃদুমন্দ হাওয়ায় উড়ে উড়ে জায়গা করে নিচ্ছে । ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে মাঝে মাঝে নড়ে চড়ে উঠছে রমনী । তবে ঘুম ভাঙ্গছে না তার । ভ্যাপসা গরমে ঘেমে গেছে কমনীয় দেহ । গ্রীবা তেলতেলে হয়ে গেছে ঘামে ।
তবুও ঘুম ছোটাতে নারাজ একবিংশী । ঘুম পাচ্ছে তার । ভীষণ আরাম না হলেও শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে সে ।
এমতকালে ছাদে আগমন এ বাড়ির বেপরোয়া ছেলের । সকাল সকাল ঘুম ছুটিয়ে সিগারেট ফুঁকতে এসেছে সে । দরজা থেকেই সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটে চেপে ধরেছে । ফুঁকতে ফুঁকতে ছাদে অগ্রসর হয়ে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো কোনো দিকে না তাকিয়ে । অর্ধ সিগারেট শেষ করে সেটাকে করতলে উচ্ছিষ্টের ন্যায় পিষ্ট করলো ।
অপর একটি সিগারেট জ্বালালো সে । সেটা ঠোঁটে চেপে ধরার আগেই বাঁ দিকে দৃষ্টি পড়লো অকস্মাৎ । অবিলম্বে দৃষ্টি জোড়া সূক্ষ্ম হয়ে আসলো । কপালে পড়লো তিন স্তরের ভাঁজ । সিগারেট টা আর ঠোঁটে বসানো হলো । চোখ সরু করে তাকিয়ে সেটাকেও ছুড়ে ফেললো রৌদ্র ।
কিছুটা অবাকই হলো সে । সন্দেহ কাটাতে পা চালালো দৃষ্টি বরাবর । এই মেয়ে এখানে কি করে ? সামনে দাঁড়ালো রৌদ্র । প্রখর তপনের রশ্মি তীর্যক ভাবে এসে পড়েছে মেঘার মুখের উপর । যার দরুন রমনীর মুখ কুঁচকে এসেছে বিরক্তিতে ।
রৌদ্র আরো বেশি কুঁচকে ফেললো কপাল । মেয়েটাকে পুরোপুরি পরখ করলো । বিড়বিড় করলো নিজের মাঝে …

‘ এই মেয়ে কি এখানেই ঘুমিয়েছিলো নাকি ?
ঝুঁকে বসলো রৌদ্র । শ্বাস ফেললো কপাল কুঁচকে । খুব কাছে আসলো মেঘার । মুখ মন্ডলে আছড়ে পড়া চুল গুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলো । ক্ষিণ বাতাসের ঝাপটায় নড়ে উঠলো মেয়েটা । বোধহয় স্বস্তি পেলো একটু । ঘুমের মাঝে ওষ্ঠপূটে হাসির দেখা মিললো । রৌদ্র তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো ।
আজব তো , এই মেয়ে ঘরে না গিয়ে এখানে কি করছে ? ঘুমোচ্ছে কেনো এভাবে ?
ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকালো রৌদ্র । ভাবলো একবার ডাকবে । কন্ঠ খুলতে গিয়ে থেমে গেলো । ডাকলো না আর । বরং গাঢ় দৃষ্টিতে তাকালো মেঘার দিকে । প্রখর করলো দৃষ্টি জোড়া । প্রখর নেত্রে সুযোগ পেয়েই খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ঘুমন্ত মেয়েটা কে ।

মেয়েটা ঘেমে গেছে । ঘামে চিকচিক করছে মুখশ্রী । গলা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম । একে একে মেয়েটা কে সরু চোখে পরখ করতে করতে রৌদ্রের দৃষ্টি থমকালো মেয়েটার গলার নিকট । ধবধবে গ্রীবায় চিকচিক করছে সোনালী একখানা চেইন । এঁকে বেঁকে বসে গেছে ঘামের সাথে । গলার ভাঁজে চিপকে স্বর্ণকোমল জৌলুস ছড়াচ্ছে ।
রৌদ্রের মোটেও পছন্দ হলো না এটাকে । ওর আগে এই চেইন টা দখলদারি ফলিয়েছে এই মেয়ের গলায় । এটা মানতে বড্ড বাঁধলো রৌদ্রের । মুখ শক্ত করলো সে । আপাতত ছাড় দিলো । আরো আরো খুঁটিয়ে দেখতে লাগল মেয়েটাকে । মেয়েটার নাকের ডগায় একখানা ছোট্ট তিল । ওষ্ঠ খানিক উল্টানো । আনমনে হাসে রৌদ্র । আবারো দৃষ্টি আটকায় মেয়েটার ডান ভ্রুর নিকট । ভ্রুর ঠিক কোণে একখানা কাটা দাগ । অক্ষিলতার সেখানটা লোমহীন । কি হয়েছে এখানে ? কাটলো কি করে ? জানা নেই রৌদ্রের ।

রৌদ্র সেদিক থেকেও দৃষ্টি সরালো । এদিকে সূর্যের রশ্মিতে বিরক্ত মেঘা । ঘুমে প্রচন্ড ব্যাঘাত ঘটছে তার । মুখ কুঁচকে ফেললো সে । তবে চোখের পাতা আলগা করতে পারলো না ঘুমের ভারে ।
রৌদ্র পরখ করলো ওকে । চোখ তুলে চাইলো দিবাকর পানে । এটা এতো ডিস্টার্ব করছে কেনো এই মেয়েকে ? দেখছে না এই মেয়ে ঘুমাচ্ছে । প্রচন্ড রাগলো রৌদ্র । তবে যার উপর রাগলো , সে হাতের নাগালের বাইরে । প্রায় পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরত্বে তার অবস্থান । ধরা ছোঁয়ার বাইরে হয়ে বেশ মজা নিচ্ছে সূর্য । রৌদ্র মেঘার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে হিসহিসিয়ে বললো…..
” ওর সাহস কম নয় Sunny ( রৌদ্রময়ী ) , আমি তোকে জ্বালানোর আগেই ও জ্বালাচ্ছে তোকে । আই ফিল জ্বেলাস অফ হিম !

বাট উই আর সেম সেম । হি ইজ সান , অর আই এম ব্লেজিং সান , এন্ড ইউ আর মাই সানি ! অনলি মাইন…
আজ ও সুযোগ লুফে নিয়ে তোকে নিজের প্রখরতায় জ্বালাচ্ছে , কাল আমি জ্বালাবো । আর সারাজীবন আমিই জ্বালাবো তোকে । খুব করে জ্বালাবো । পোড়াবো তোকে । গেট রেডি টু বার্ন বাই মি , সানি…..
কথা শেষ করে মেঘার মুখের উপর আরো একবার ফুঁ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো রৌদ্র । ছুঁতে গিয়েও ছুঁয়ে দেখা হলো না । বিরক্তি লাগলো খানিক ‌। এই সূর্য কে সে কিছুতেই সহ্য করবে না । মেঘার উপর ওর দহন ফেলতে দেবে না । ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে দেবে না ।
দাঁত চিবিয়ে সূর্যের রশ্মি বরাবর ঢাল হয়ে মেঘা কে আড়াল করে দাঁড়ালো রৌদ্র । নিজের সুঠাম দেহের ছায়ায় ঢেকে ফেললো মেঘা কে । এই মেয়ে এখানে কেনো ঘুমাচ্ছে সেটাই তো বুঝলো এখনো । বুকে হাত গুটিয়ে নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো রৌদ্র । একস্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল মেঘার ঘুমন্ত মুখপানে । শীতল ছায়া পেয়ে আরামে নড়েচড়ে উঠলো মেয়েটা । ফের ডুবলো ঘুমের গহীনে । রৌদ্র চেয়েই রইলো কেবল । সূর্যের প্রখর তীব্রতা নিজের পিঠে বহন করে আবডালে লুকিয়ে রাখলো এই ঘুমন্ত পরীটার অনুচ্চ কায়া ।

ঘড়ির কাঁটায় টিকটিক করে পার হলো কিছুটা সময় । রোজকার রুটিন মাফিক ঘুম থেকে ওঠার সময় হয়ে গেছে মেঘার । তার উপর এখানে গরম । গা ম্যাজ ম্যাজ করছে মেঘার । নড়চড় বাড়ছে ঘুমের মাঝে । ভার্সিটি আছে । তপ্ত গরমে চরম বিরক্ত হলো মেঘা । রোজকার মতো আরামে ঘুম ভাঙ্গলো না । বিরক্তি সমেত পিটপিট করে চোখ খুললো মেয়েটা । গা মোড়ালো হাই তুলে । ঝাপসা চোখে খোলা ছাদের আশপাশ অবলোকন হতেই বৃহৎ হয়ে আসলো অক্ষি যুগল‌‌‌ ।‌ সহসা ছ্যাত করে উঠলো মেয়েটা । এলানো শরীর টা নিয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো ।
ছাদ জুড়ে তপ্ত রোদ্দুর ছড়াছড়ি । তবে মেঘা নিজেকে ছায়ায় আবিষ্কার করলো । হাতের ফ্রেম টা আরো বেশি চেপে ধরে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো মেঘা । বিড়বিড় করলো….

” শিট ,,, এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি ?
বিচলিত হলো মেঘা । ছটফট করে ডানপাশে তাকাতেই ভড়কালো অকস্মাৎ । বুকে হাত গুটিয়ে এবেলায় টান টান হয়ে শক্ত চোয়ালে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্র । মেঘার সদ্য ঘুম ছোটা চক্ষু দ্বয় ছলকে ওঠে । সবটা বুঝতে পারে না । কালকে যে কখন এখানে ঘুমিয়ে পড়েছে , তাই ঠাহর করতে পারল না ঠিকমতো । তার উপর হুট করে রৌদ্র কে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরো বেশি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো মেয়েটা । সন্দিহান হয়ে এদিক ওদিক তাকালো চোখ ডলে । রৌদ্রের ভাবমূর্তির পরিবর্তন নেই । সটান দাঁড়িয়ে আছে সে । সূচালো দৃষ্টি একস্থির মেঘার উপর । মেঘা শুল্ক ঢোক গিলে কপালের ঘাম মুছলো । কিছুটা মুহুর্ত অস্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রৌদ্রের দিকে । এই লোক এখানে কি করে ? কখন আসলো ? আর মেঘা কেই বা এভাবে দেখছে কেনো ?
রৌদ্রের তামাটে চেহারায় ঘাম বিন্দু বিন্দু । সূর্য টা ঠিক মাথা বরাবর পিছন দিকে ।
মস্তিষ্ক সম্পুর্ন সজাগ হওয়া মাত্রই মেঘা মুখ কুঁচকে ফেলে । বিদ্রুপে চোখ ফিরিয়ে হাত মুঠো করে দপাদপ পা চালায় ছাদের দরজার দিকে । রৌদ্র কে পাশ কাটাতে গেলেই গোটানো হাত নামিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে অদ্ভুত স্বরে ডাকে রৌদ্র….

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭

” হেয়য় সানি ।‌ গুড মর্নিং !!
থামলো মেঘা । একটু খানি চোখ পাকিয়ে পিছু ফিরে তাকালো । রৌদ্রের ফিচেল হাসির রেখা বাড়লো এতেই । মুখ ঝামটালো মেঘা । বললো রৌদ্র বাঁকা স্বরে…..
” ঘুমানোর জন্য ঘরে জায়গা ছিলো না ? এখানে ঘুমাচ্ছিলি কেনো ? ঘর কম পড়ে গেছে কাবির ম্যানসনে ? তোর ঘুমের জন্য একটা ঘর খুঁজে পাস নি এ বাড়িতে ? আমার ঘরে আসলেই পারতি । বুকে নিয়ে খুব যত্নে ঘুম পাড়াতাম তোকে ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৯