ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২০
মেহজাবিন নাদিয়া
সারিমের রক্তচক্ষুর সামনে বেশিক্ষণ টিকে থাকার সাহস গ্ৰামের মহিলাদের হলো না।
সবাই ভয়ার্ত চোখে একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল। এরপর সারিমের আবার কোনো চড়া ধমক খাওয়ার আগেই,তারা একে একে সুরসুর করে পা টিপে টিপে ঘর থেকে কেটে পড়তে লাগলেন। দেখতে দেখতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো মাঝারি আকারের ঘরটা একদম ফাঁকা হয়ে গেল। কেবল এক কোণায় দাঁড়িয়ে রইল জেবা, আর একপাশে ক্লান্ত শরীরে বসে রইল অরি।
ঘরটা ফাঁকা হতেই সারিমের ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর রূপটা যেন এক লহমায় উবে গেল। সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরির দিকে তাকাল। অরির টানা টানা দুটো চোখ তখন বিষণ্ণতায় ভরা, ক্লান্তিতে ওর ভুবনমোহিনী মুখের ওপর হালকা ফ্যাকাশে ভাব নেমে এসেছে। কপালে আর ঘাড়ে কয়েকটা অবাধ্য চুল লেপ্টে আছে, যা ওকে আরও বেশি মায়াবী করে তুলেছে।
সারিম ধীর পায়ে অরির একদম কাছে এসে দাঁড়াল। অরি চোখ তুলে তাকাতেই সারিম কোনো কথা না বলে ওর মাথার পেছনে হাত বাড়াল। অত্যন্ত যত্নের সাথে, নিজের শক্ত আঙুলের ছোঁয়ায় অরির চুলের ক্লিপ আর রবার ব্যান্ডটা খুলে দিল ।সিল্কের মসৃণ বাদামী চুলগুলো এক ঝটকায় অরির পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
অরি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। ঘরে জেবা দাঁড়িয়ে আছে, ও এভাবে জেবার সামনে…। অরি ফিসফিস করে বলল,
_“কী করছেন সারিম? জেবা দাঁড়িয়ে আছে তো!”
সারিম অরির কথায় কান দিল না। সে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে, পরম যন্তে অরির এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে নিতে লাগল। এরপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তিনটি ভাগে ভাগ করে একটি সুন্দর, পরিপাটি বেণী গেঁথে দিতে শুরু করল। ওর হাতের প্রতিটি ছোঁয়া যেন অরির ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি আর মানসিক চাপকে এক নিমেষে শুষে নিচ্ছিল।
বেণী করা শেষ হলে সারিম নিজের পকেট থেকে রবার ব্যান্ডটা নিয়ে আবার চুলটা সুন্দর করে বেঁধে দিল। কাজটা শেষ করে সে একটু ঝুঁকে এল অরির মুখের সামনে। নিজের চওড়া বুকটার সাথে অরির মাথাটা আলতো করে চেপে ধরল। সারিমের গায়ের চেনা সুবাসটা অরির নাকে আসতেই ওর মনের ভেতরের সবটুকু অস্থিরতা যেন শান্ত হয়ে গেল।
সারিম অরির কপালে গভীর ভালোবাসায় একটা ওম ছড়ানো চুমু এঁকে দিল। তারপর সে অরির দুই কাঁধ ধরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল,
_“তুমি এখানে জেবার সঙ্গে থাকো, বউ। ঘরের বাইরে একদম যাবে না। চারপাশের পরিবেশ ভালো না, মানুষজনও সুবিধার নয়। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, কিছু জরুরি কাজ আছে। কোথাও যাবে না কিন্তু, চুপচাপ জেবার সঙ্গে এখানেই বসে থাকবে।”
অরি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে সায় দিল,
_“আচ্ছা, আপনি সাবধানে যান।”
ঠিক তখনই ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল এক যুবক। লম্বা-চওড়া গড়ন, চোখে চশমা।দেখতে যেমন শান্ত ঠিক তেমনি তার নামোও শান্ত।সে আর কেউ নয়, রুবাব মৃধার একমাত্র ছেলে আনফাল শান্ত চৌধুরী। শান্ত ঘরের ভেতরে এসে সারিমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভদ্র গলায় বলল,
_“সারিম ভাই,বড় মামা নিচে আপনাকে ডাকছেন। কিছু দরকারি শলাপরামর্শ আছে জানাজা আর দাফন নিয়ে। আপনাকে নিচে নিয়ে যেতে বললেন।”
সারিম শান্তর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল,
_“চল, যাচ্ছি।”
তবে ঘর থেকে বের হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, শান্তর দৃষ্টি আচমকা গিয়ে থমকে গেল ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা জেবার ওপর। নীল জামা পরা মেয়েটি, এক হাত দিয়ে নিজের গাল চুলকাচ্ছে আর বড় বড় চোখ করে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। শান্তর চোখে এক পলকের জন্য গভীর কৌতূহল আর বিস্ময় ফুটে উঠল। তবে পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে সারিমের পেছন পেছন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ওরা ঘর থেকে চলে যেতেই এতক্ষণের নীরবতা ভেঙে জেবা এক লাফে এসে অরির পাশে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল। মুখজুড়ে ওর দুষ্টুমির হাসি।অরির কাঁধে একটা মৃদু ধাক্কা দিল জেবা, চোখ টিপে টিপে বলে উঠল,
_“দোস্ত!এক্ষুনি কী দেখলাম আমি! মুখে মুখে তো বলিস-‘আমি ওনাকে স্বামী হিসেবে মানি না,আর তলে তলে এত কিছু? মরা বাড়িতেও দেখি রোমান্স ছাড়ছে না তোর জামাই! চুমু খাওয়া হচ্ছে! হু হু, তলে তলে জল এতদূর গড়িয়েছে,কখন?”
জেবার এমন অকপট টিজিং শুনে অরির ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় একদম টকটকে লাল হয়ে উঠল। অরি নিজের মুখের লজ্জা ভাবটা লুকানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
_“ধুর! তুই যে কি বলিস! এখানে একটা মানুষ মারা গেছেন, আর তুই এসব কী শুরু করলি? ওনার মাথা ঠিক ছিল না, তাই ওমন করেছেন। তুই চুপ করবি এবার?”
জেবা তো দমবার পাত্র নয়। সে আরও একটু ঘেঁষে বসে অরির কান টেনে দিয়ে বলল,
_“আহা রে! আমার সতী-সাধ্বী দোস্ত!মাথা ওনার ঠিকই আছে একদম জায়গামতো কাজ করছে! তোকে চোখের আড়াল করলেই যেন সারিম ভাইয়ের কলিজা শুকিয়ে যায়, তা তো দেখাই গেল। কিন্তু তুই যে এই মুখ চুন করে বলিস-কিছু না, কিছু না! এটা কিন্তু একদম চিটিংবাজি, বলে দিলাম!”
অরি জেবার কথাটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে চাইল।গলার স্বর কিছুটা গম্ভীর করে বলল,
_“জেবা, প্লিজ! বাইরের পরিস্থিতি দেখছিস না?ছোট চাচা এভাবে হুট করে সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। সবার মধ্যে এখন গভীর একটা শোক বয়ে বেড়াচ্ছে।আর তুই এখানে কি শুরু করলি বলতো!”
জেবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে দিয়ে বলল,
_“কিন্তু চারপাশের এই অদ্ভুত পাবলিকদের দেখে আমার মনে হচ্ছে না যে এদের ভিতরে আদেও শোক বলতে কিছু আছে। এখানে সুর মিলিয়ে কান্না করার কম্পিটিশন চলছে, কার আগে কে বেশি জোরে সুর মিলিয়ে কাদঁতে পারবে!”
দুজনের এমন টুকটাক কথা বলার মাঝেই ঘরের দরজায় আবার কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল। দুজনেই দরজার দিকে তাকাতেই দেখল, সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে ফুল।
মেয়েটির গায়ের রঙ বেশ শ্যামলা হলেও,চোখ-মুখের গড়ন অত্যন্ত রূপবতী। তবে তার পোশাক-আশাকে আর চলন-বলনে এক ধরণের স্পষ্ট গ্রামীণ রক্ষণশীল ভাব লেগে আছে।
ফুল ঘরের ভেতরে পা রেখেই অত্যন্ত গম্ভীর আর কিছুটা আড়ষ্ট গলায় বলল,
_“নিচে মা আপনাদের ডাকছেন। তাড়াতাড়ি নিচে আসেন।”
ফুল কথাটি বলার সময় ওর চোখ দুটো সরাসরি গিয়ে থমকে রইল অরির ওপর। চোখে ছিল এক তীব্র বিষাক্ত চাউনি। যেন ও অরিকে মনে মনে এক মস্ত বড় শত্রু ভাবছে।অরি ফুলের সেই চাউনি দেখে মনে মনে বেশ বিস্মিত হলো। সে তো এই মেয়েটার কোনো ক্ষতি করেনি, তবে ও কেন এভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে? অরি কিছুই বুঝতে পারল না। সে জেবার দিকে তাকাল, জেবাও কাঁধ উঁচিয়ে ইশারায় বোঝাল-‘আমিও কিছু জানি না’।
ফুল আর এক সেকেন্ডও সেখানে না দাঁড়িয়ে হনহন করে নিচে নেমে গেল। অরি আর জেবাও আর দেরি না করে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে ড্রয়িং রুমের দিকে রওনা হলো।
ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই অরি আর জেবার চোখ চড়কগাছ! ওপরের ঘর থেকে সারিমের ধমক খেয়ে যে মহিলাগুলো সুরসুর করে পালিয়ে এসেছিল, ওনারা সবাই এখন নিচের এই বিশাল ড্রয়িং রুমে এসে জমা হয়েছেন।এখানে এসে মহিলাগুলো আবার দ্বিগুণ উৎসাহে, সুর মিলিয়ে মিলিয়ে বুক চাপড়ে কান্না শুরু করে দিয়েছেন! পুরো ড্রয়িং রুমটা যেন একটা হাহাকারের বাজারে পরিণত হয়েছে।
এক পাশে সোফায় বসে আনজুমান বেগম প্রায় জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা। ওনাকে দুই পাশ থেকে ধরে রুবাব মৃধা আর বাড়ির অন্য কিছু বয়স্কা মহিলা সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে নিজেরাও সুর ধরে কাঁদছেন।
জেবা আর অরিকে ড্রয়িং রুমে ঢুকতে দেখেই রুবাব মৃধার কান্না এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিলো। ওনার চোখ দুটো আবার সরু হয়ে উঠল। আরিশান মৃধার সেই কঠোর ধমকের কথা মনে পড়তেই ভেতরের রাগটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল। কিন্তু বড় ভাইয়ের আদেশ তো অমান্য করা যাবে না!ওনাকে এটা করতেই হবে।
রুবাব মৃধা ধীর পায়ে জেবা আর অরির দিকে এগিয়ে এলেন।মুখের অবয়ব অত্যন্ত শক্ত আর তপ্ত। তিনি জেবার সামনে এসে, নিজের ভেতরের চরম অনিচ্ছা আর ক্ষোভ চেপে রেখে,ভারী গলায় বললেন,
_“আসেন, ভাবি! এখানে এসে বসুন।”
সবার সামনে রুবাব মৃধার মুখ থেকে এই ‘ভাবি’ শব্দটা শোনা মাত্রই জেবার নিজেরই ভিমড়ি খাওয়ার দশা হলো! ও চোখ দুটো গোল গোল করে এক পলক অরির দিকে তাকাল।অরি ভিতরে ভিতরে জেবার অবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসছে।
রুবাব মৃধা ওদের দুজনকে সোফার এক পাশে একটু খালি জায়গায় বসতে ইশারা করে বললেন,
_“মৃধা পরিবারের নিয়ম অনুযায়ী, বাড়ির বউ আর ঘরের মেয়েদের এভাবে চুপ করে থাকা শোভা পায় না। যেহেতু সুফিয়ান সম্পর্কে আপনার দেবর,আর তোমার চাচা-শ্বশুর (অরিকে উদ্দেশ্য করে), তাই নিয়ম অনুযায়ী এখন সবার সাথে সুর মিলিয়ে কাঁদতে হবে দুজনকে। এটা পরিবারের শোক পালনের একটা রিচুয়াল বলা চলে”
রুবাব মৃধার এই অদ্ভুত ফরমাইশ শুনে জেবা আর অরি দুজনেই পুরোপুরি বিস্ময়ে থ বনে গেল! ওদের মুখ হাঁ হয়ে গেল।
কাঁদতে হবে? তাও আবার জোর করে, সুর মিলিয়ে?বিষয়টা ওদের কাছে অত্যন্ত আজব আর হাস্যকর ঠেকলো। কেউ মারা গেলে মানুষের মন থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কান্না আসে, কিন্তু এখানে তো রীতিমতো কান্নার অডিশন চলছে!
রুবাব মৃধা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আবার গিয়ে নিজের জায়গায় আনজুমান বেগমের পাশে বসে পড়লেন এবং ফুলও ওনার পাশে বসে মায়ের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
চারপাশের এই হুলুস্থুল আর অদ্ভুত পরিস্থিতি দেখে অরি আর জেবা কী করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না। সবকিছু ওদের গ্রামীণ মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত তামাশা বলে মনে হচ্ছিল।দুজনে অগত্যা ড্রয়িং রুমের এক কোণায়, লোকচক্ষুর আড়ালে একটা কাঠের চেয়ারে পাশাপাশি গিয়ে বসল।
বসতেই জেবা আর নিজের ভেতরের কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। সে অরির দিকে মুখটা সামান্য ঝুঁকিয়ে, অত্যন্ত নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলতে শুরু করল,
_“দোস্ত! এই গ্রামের মহিলাগুলো কীভাবে কাঁদছে দেখেছিস? একেকজন যেন ইন্ডিয়ান আইডলের সিঙ্গার! কী সুন্দর তাল, লয়, আর সুর মিলিয়ে কাঁদছে! কিন্তু আমার তো একটুও কান্না আসছে না রে। এখন কী করি বল তো? ওই মহিলা তো আমার দিকে ডাইনি দেখার মতো করে তাকাচ্ছে! মনে হচ্ছে আমি না কাঁদলে আমাকেই সুফিয়ান মৃধার খুনি বানিয়ে দেবে!”
অরি নিজের কপাল চেপে ধরে বলল
_“আমারও একদম একই অবস্থা,বাদামনী! মাথাটা প্রচণ্ড ঝিমঝিম করছে। জোর করে তো আর কান্না আসে না। এদের এই ভণ্ডামি দেখতে দেখতে আমার নিজেরই দম আটকে আসছে।”
_”ঐ রুবাব মহিলা যেভাবে চোখ গরম করে রেখেছে, আমি যদি এখন না কাঁদি, তবে আমার ওপর আবার কোন নতুন হুকুম জারি হবে কে জানে! আচ্ছা দোস্ত, একটা আইডিয়া আছে। আমি কি রান্নাঘরে গিয়ে দুটো পেঁয়াজ কেটে নিয়ে আসব? চোখে ধরলে অন্তত জলটা তো বের হবে!”
ঠিক তখনই, সারিম কিছু জরুরি খোঁজে ড্রয়িং রুমের পেছনের করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল। দূর থেকে ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ঘরের কোণায় বসে থাকা অরি আর জেবার ওপর। ওদের দুজনকে এই কান্নার বাজারের মধ্যে এভাবে ফিসফিস করতে দেখে সারিমের কপাল কুঁচকে গেল। সে অত্যন্ত দ্রুত পায়ে, গম্ভীর মুখে ওদের একদম পেছনে এসে দাঁড়াল।
সারিমের আকস্মিক উপস্থিতি টের পেয়ে অরি চমকে উঠল। সারিম কিছুটা রেগে, নিচু ভাবে চড়া গলায় জিজ্ঞেস করল-
_“তোমরা দুজন এখানে কী করছ? আমি তোমাকে ওপরের ঘরে চুপচাপ বসে থাকতে বলেছিলাম না, চন্দ্রিমা? নিচে কেন এসেছ?”
অরি ভীতু গলায় বলল
_“আপনার ফুফু আমাদের নিচে ডেকে এনেছেন। উনি বললেন, এটা নাকি এ বাড়ির নিয়ম। আমাদের নাকি এখন সবার সামনে সুর মিলিয়ে কাঁদতে হবে। না কাঁদলে নাকি সমাজ কী বলবে…!”
সারিমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।সে এইসব গ্রামীণ নিয়মের কথা শুনে মনে মনে চরম বিরক্ত হলো। ঠিক তখনই জেবা মুখটা কাঁচুমাচু করে সারিমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিষ্পাপ গলায় বলল—
_ “ভাইয়া, বিশ্বাস করেন, আমি অনেক চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার সত্যি একটুও কান্না পাচ্ছে না! এখন আমি কী করব? পেঁয়াজ কাটব নাকি?”
সারিম জেবার কথা শুনে এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা, ক্রূর হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে কিছু একটা গভীর চিন্তা করে জেবাকে বলল—
_“পেঁয়াজ কাটার কী দরকার?চোখে গ্লিসারিন দুই ফোঁটা লাগিয়ে দিলেই একদম গঙ্গা-যমুনা বয়ে যাবে। কোনো খাটনি ছাড়াই কান্নার রোল উঠে যাবে।”
কথাটা বলেই সারিম আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ঘরের মাঝখানে সোফায় বসে থাকা ফুলকে উদ্দেশ্য করে বেশ চড়া গলায় ডাক দিল—
_“ফুল! এদিকে আয়!”
সারিমের মুখ থেকে নিজের নাম শোনামাত্রই ফুল যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল! সে অত্যন্ত উৎফুল্ল আর চঞ্চল পায়ে,ওরনা সামলাতে সামলাতে সারিমের সামনে এসে দাঁড়াল।
দূর থেকে রুবাব মৃধাও এটা দেখে মনে মনে বেশ খুশি হলেন।ভাবলেন,যাক! সারিম শেষমেশ ওনার মেয়ের দিকে ফিরে তাকিয়েছে!’
ফুল সারিমের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম গলায় জিজ্ঞেস করল-
_“বলো সারিম ভাই, কী বলবে?”
সারিম একদম কাঠখোট্টা গলায় জিজ্ঞেস করল,
_“তোর ঘরে কি গ্লিসারিন স্প্রে আছে?”
ফুল কিছুটা অবাক হলো, তবে মাথা নেড়ে বলল-
_“হ্যাঁ, আছে। সাজগোজের বাক্সে একটা নতুন বোতল রাখা আছে।”
সারিম আদেশসূচক গলায় বলল-
_“ওটা এক্ষুনি নিয়ে আয়।দশ সেকেন্ডের মধ্যে যেন আমার সামনে পাই।”
ফুল আর কোনো প্রশ্ন না করে দ্রুত পায়ে ওপরের ঘরের দিকে ছুটে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই গ্লিসারিনের বোতলটা এনে সারিমের হাতে দিল। বোতলটা হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই সারিমের রূপ এক নিমেষে বদলে গেল। সে ফুলের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত চড়া আর কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল-
_“জিনিস দেওয়া শেষ তো? এখন দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, আগের জায়গায় গিয়ে মায়ের পাশে বসে কান্নার গীত গা! এখানে তোর আর কোনো দরকার নেই!”
সারিমের আকস্মি নির্মম ধমকে ফুলের মনের ভেতরের সেই মেকি আনন্দের রঙিন ফানুসটা এক লহমায় ফেটে গেল। ওর বুকটা যন্ত্রণায় রি রি করে উঠল। সে অত্যন্ত কষ্ট পেয়ে, মুখটা নিচু করে আবার নিজের আগের জায়গায় ফিরে গিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।এবারের কান্নাটা আর মেকি ছিল না, ওটা ছিল সারিমের দেওয়া অবহেলার আসল কান্না।
এদিকে সারিম বোতলটা হাতে নিয়ে জেবা আর অরির দিকে ঘুরল। জেবা তখনও হাঁ করে সারিমের হাতের বোতলটার দিকে তাকিয়ে ছিল,ভাবছিল—‘এটা দিয়ে কী হবে?’
ঠিক তখনি জেবা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সারিম অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বোতলের মুখটা জেবার চোখের সামনে ধরল। কোনো সুযোগ না দিয়েই সে একসাথে পরপর কয়েকটা স্প্রে জেবার দুই চোখের একদম ভেতরে করে দিল!
গ্লিসারিনের সেই তীব্র ঝাঁঝালো তরল চোখে পড়া মাত্রই জেবার পুরো দুনিয়া যেন ওলটপালট হয়ে গেল!সে মস্ত বড় চিৎকার দিয়ে উঠল। চোখের ভেতরে এক তীব্র, অসহ্য জ্বালা শুরু হয়ে গেল ওর।
সারিম অরির কিছুই করল না। সে অরির চোখে কোনো স্প্রে না করে, গ্লিসারিনের বোতলটা এক পাশে দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে, ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসিটা বজায় রেখেই সেখান থেকে দ্রুত পায়ে কেটে পড়ল।
এদিকে জেবার অবস্থা তখন একদম নাজেহাল! চোখের তীব্র জ্বালায় ও দুই হাত দিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে ধপাস করে মেঝের ওপর বসে পড়ল।চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেছে,চোখ বেয়ে শ্রাবণের ধারার মতো গড়গড় করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।ব্যথায় আর জ্বালায় সুর ছাড়াই একদম খালি গলায় চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল-
জেবার এই তীব্র, আকুল আর হৃদয়বিদারক কান্না দেখে পুরো ড্রয়িং রুমের বাকি সব মহিলার কান্নার রোল এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল! সবাই নিজেদের কান্না থামিয়ে অত্যন্ত বিস্ময় আর শ্রদ্ধার চোখে জেবার দিকে তাকিয়ে রইল। ওনারা ভাবল—‘মেয়েটা হয়তো প্রয়াত দেবরের শোকে কষ্টে কাঁদছে!
বিকেলের বাতাসে সর্ষে খেতের তপ্ত ঘ্রাণ আর এক বুক-চাপা হাহাকার।
কিছুক্ষণ আগেই সুফিয়ান মৃধার শেষ গোসল সম্পন্ন হয়েছে। ধবধবে সাদা কাফনের কাপড়ে জড়ানো ওনার নিথর দেহটা যখন শেষবারের মতো জায়নামাজে শায়িত করা হলো,পুরো মৃধা পরিবারের ওপর যেন এক অলিখিত অন্ধকার নেমে এলো। এই সেই মানুষ, যিনি আজ ভোরেও এই মেঠো পথে হেঁটেছেন, হেসেছেন, অথচ এখন তিনি চিরতরে নীরব, এক অনড় কায়া।
উঠোনের মাঝখানে আনা হলো কাঠের ভারী খাটিয়াটি। খাটিয়ার চারপাশটা ঘিরে তখন গ্রামের গণ্যমান্য মুরব্বি, চেনা-অচেনা যুবক আর উৎসুক বালকদের এক বিশাল জটলা। সবার চোখে-মুখে এক বিষণ্ণ গম্ভীরতা।
হুট করেই ভেতরের ঘর থেকে এক বুক-ফাটা আর্তনাদ চারপাশের বাতাসকে চিরে দিল। আনজুমান বেগম প্রায় পাগলের মতো ছুটে এলেন বাইরে। ওনার পরনের সাদা শাড়িটা ধুলোবালিতে মাখামাখি, উষ্কখুষ্ক চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। স্বামীকে চিরতরে চলে যেতে দেখে ওনার ভেতরের সমস্ত বাঁধ যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তিনি খাটিয়ার দিকে এগোতে চাইলেন, স্বামীর নিথর দেহটা আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইলেন।
_“ওগো,আপনি আমাকে একা রেখে কই যান? আমার স্বামী কে তোমরা নিয়ে যাইও না! ও স্বামী আপনি, একটা বার চোখ মেলে তাকান! দেখেন আমার দিকে!আপনি কথা কেন বলছেন না?”
রুবাব মৃধা নিজের চোখের পানি মুছতে মুছতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন ছোট ভাবি সম বোনকে। আনজুমান বেগমকে আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে ওনার নিজের কণ্ঠও বুজে এলো,
_“আনজুমান, নিজেকে সামলাও! আল্লাহর ওয়াস্তে সুফিয়ানের শেষ যাত্রাটা কঠিন করবে না। ওকে যেতে দেও,ওর যাওয়া সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে…”
কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই তখন সেই সদ্য বিধবা নারীর কানে পৌঁছাচ্ছিল না। তিনি রুবাব মৃধার বাহুডোর থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগলেন, ওনার নখ দিয়ে নিজের বুক চাপড়াতে লাগলেন। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত গ্রামের মানুষের চোখও ছলছল করে উঠল।
ঠিক তখনই খাটিয়ার চারপাশটা ঘিরে দাঁড়ালেন চারজন পুরুষ।সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন আরিশান মৃধা। ওনার মুখাবয়ব পাথরের মতো শক্ত, অনমনীয় চোয়াল জোড়া ধুঁকছে। বহু বছর পর এই ‘সুখ কুঞ্জ’-এ পা রেখে ওনাকে সর্বপ্রথম ভাইয়ের লাশ কাঁধে তুলতে হবে, এটা ওনার কল্পনারও অতীত ছিল। চশমার পেছনের লালচে চোখ দুটোয় এক গভীর স্তব্ধতা। কোনো কথা না বলে, এক গভীর অবদমিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি খাটিয়ার সামনের ডান দিকটা নিজের চওড়া কাঁধে তুলে নিলেন।
ওনার ঠিক বিপরীত পাশে এসে দাঁড়াল সারিম।সে খাটিয়ার বাম দিকটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে কাঁধে চেপে নিল।
খাটিয়ার পেছনের অংশটা সামলানোর জন্য এগিয়ে এলো শান্ত এবং সুফিয়ান মৃধার ছেলে অয়ন। মাত্র পনেরো-ষোলো বছরের ছেলেটা বাবার এই আকস্মিক চলে যাওয়াটা এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না।ফর্সা মুখটা ভয়ে আর শোকে কুঁকড়ে গেছে, চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। কাঁধটা কাঁপছে ওর।শান্ত অয়নের কাঁধে একটা হাত রেখে আশ্বস্ত করল, এরপর নিজেই শক্ত করে খাটিয়ার একপাশ ধরে অয়নকে সাহায্য করল।
মুরব্বিদের মধ্য থেকে একজন উচ্চস্বরে বলে উঠলেন,
_“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ…”
নিমেষেই চারপাশের শত শত মানুষের কণ্ঠ সেই জিকিরে সুর মেলাল। আরিশান মৃধা, সারিম, শান্ত আর অয়ন—চারজনে মিলে খাটিয়াটা আলতো করে মাটি থেকে ওপরে তুলে নিলেন।
_“আপনি আমাকে একা ফেলে যাবেন না! সুফিয়ান…!”
আনজুমান বেগমের শেষ গগনবিদারী আর্তনাদটা সুখ কুঞ্জের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, কিন্তু খাটিয়ার টা থামল না।
ধীর ও নিয়ন্ত্রিত পায়ে সুখ কুঞ্জের গেইট পার হয়ে মেঠো পথের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। ওনাদের পেছনে পেছনে গ্রামের শতখানেক বয়োবৃদ্ধ, যুবক আর ছোট ছোট বালকেরা এক দীর্ঘ মিছিলের মতো অনুগমন করতে লাগল। সবার মুখে একটাই সুর, একটাই জিকির।
ধীরে ধীরে পথ দিগন্ত বিস্তৃত সর্ষে খেতের আড়ালে বিলীন হতে লাগল। সুফিয়ান মৃধার নিথর দেহটা নিয়ে ওনারা চলে গেলেন গ্রামের চিরস্থায়ী ঠিকানার দিকে—যেখান থেকে আর কোনোদিন কোনো মানুষ ফিরে আসে না।
রাত তখন নয়টা। চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে প্রাচীন ‘সুখ কুঞ্জ’ বাড়িটা যেন এক বিশাল স্তব্ধতার চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ সময় পর সুফিয়ান মৃধাকে চিরতরে মাটির নিচে শায়িত করে কবরস্থানের কাজ শেষ করে অবশেষে বাড়ির পুরুষেরা একে একে অন্দরে প্রবেশ করলেন।
আজ সুখ কুঞ্জে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়-স্বজন, গ্রামের মুরুব্বি আর মেহমানদের উপস্থিতিতে পুরো বাড়ি কানায় কানায় ভরপুর। বসার ঘর থেকে শুরু করে বারান্দা, উঠোন—সবখানেই মানুষের জটলা। এত মানুষের ভিড়ে কোথাও একটু শান্তিতে বসার বা আরাম করার জো নেই। মেহমানদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি আর সারাদিনের ধকল শেষে ইতিমধ্যে যে যেখানে পেরেছেন একটু জায়গা করে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ আবার নিচু স্বরে,মৃত ব্যক্তির গুণগান আর সংসারের নানা বিষয়ে জেগে জেগে কথাবার্তা বলছেন।
ভেতরের একটা নিভৃত ঘরে রুবাব মৃধা আনজুমান বেগমকে আগলে ধরে বসে আছেন। ভদ্রমহিলা স্বামীর এই আকস্মিক, অতর্কিত মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। একটু পরপরই ওনার চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দেওয়ালের দিকে। পুরো বাড়ির এই দমবন্ধ করা, অদ্ভুত পরিস্থিতি আর মানুষের গুঞ্জন সহ্য করা যেন দায় হয়ে উঠছিল।
আরিশান মৃধা আর সারিম একসাথেই বাড়িতে পা রাখে। বাড়ি ফেরার পর আরিশান মৃধাকে প্রচণ্ড ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। কেবল শারীরিক ক্লান্তি নয়, ওনার ভেতরের মানসিক ভাঙনটাই যেন ওনাকে সবচেয়ে বেশি কাবু করে ফেলেছে। চারপাশের এই কোলাহল আর মেকি পরিবেশের মাঝে ওনার নিজের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কোনো দিকে না তাকিয়ে, কারও সাথে কোনো কথা না বলে আরিশান মৃধা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলার দিকে চলে গেলেন।
সারিম বাবার পেছনে যেতে নিলেও ঠিক সেই মুহূর্তে ওর পকেটে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ওর চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। ঢাকা শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে ফোন এসেছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সারিম আর ওপরে না গিয়ে, একটু নিরিবিলি জায়গার খোঁজে করিডোর পার হয়ে পেছনের অন্ধকারের দিকে চলে গেল কথা বলতে।
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে নিজের চেনা করিডোরটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে হুট করেই একটা ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন আরিশান মৃধা।
বহু বছর… দীর্ঘ কয়েকটা দশক পার হয়ে গেছে এই চৌকাঠ ওনি মাড়াননি। এই সেই ঘর, যেখানে ওনার শৈশব, কৈশোর আর উদ্দাম তারুণ্যের সোনালী দিনগুলো কেটেছিল। এক বুক দুরুদুরু কাঁপন নিয়ে ওনি ধীরহাতে দরজার হাতলটা ঘুরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন।
ঘরের ভেতরে পা রাখতেই আরিশান মৃধা বিস্ময়ে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ওনার মনে হলো, সময় যেন এই ঘরের ভেতর এসে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। ঘরের প্রতিটি আসবাবপত্র, দেওয়ালের রঙ, এমনকি খাটের কোণের সেই পুরোনো কাঠের আলমারিটা—সবকিছু একদম ঠিক আগের মতোই আছে, যেমনটা ওনি আজ থেকে বহু বছর আগে এই বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় রেখে গিয়েছিলেন। এতটুকু পরিবর্তন হয়নি কোথাও। তবে ঘরটা অত্যন্ত পরিপাটি, ধুলোবালিহীন আর চমৎকারভাবে গুছিয়ে রাখা। আরিশান মৃধা এক পলকেই বুঝলেন, ওনার অনুপস্থিতিতে এই ঘরের স্মৃতিগুলোকে আগলে রাখার পেছনের কারিগর আর কেউ নয়, রুবাব মৃধা।ভদ্রমহিলা মুখে যতই রাগ বা অভিমান দেখান না কেন, বড় ভাইয়ের প্রতি ওনার অন্তরের টানটা যে ম্লান হয়নি, এই ঘরটাই তার জীবন্ত প্রমাণ।
আরিশান মৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের গা থেকে দামী কোটটা খুলে খাটের পাশে রাখলেন। এরপর ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলেন। সারাদিনের তপ্ত ক্লান্তি যেন জলের স্পর্শে কিছুটা লাঘব হলো।
একটু মুক্ত, ফ্রেশ হাওয়া নেওয়ার তীব্র তৃষ্ণায় ওনি ঘরের লাগোয়া বারান্দার দরজাটা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। বাইরের নিশুতি রাতের শীতল বাতাস ওনার কপাল ছুঁয়ে গেল। ভারাক্রান্ত, বিষণ্ণ মনটাকে একটু প্রকৃতির মাঝে বিলিয়ে দিয়ে ওনি রেলিংয়ে দু-হাত রেখে আকাশের দিকে তাকালেন।
ঠিক তখনই চাঁদের আবছা আলোয় ওনার নজর গিয়ে আটকালো বারান্দার দেওয়ালের একটা কোণে। সেখানে বহু পুরোনো, অস্পষ্ট কিছু একটা খোদাই করা রয়েছে। আরিশান মৃধা কিছুটা ঝুঁকে ভালো করে তাকালেন। ওনার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ কিন্তু মায়াবী হাসির রেখা ফুটে উঠল।
এ তো ওনার নিজের হাতের লেখা! ওনার কিশোর বয়সে, একদিন অলস দুপুরে এই বারান্দায় বসে আনমনা মনে চুনকাম করা দেওয়ালে একটা ‘লাভ শেপ’ এঁকেছিলেন ওনি। আর তার ঠিক মাঝখানে অক্ষরে খোদাই করে লিখেছিলেন ওনার আর ওনার জীবনের প্রথম ও একমাত্র প্রেম-আনতারা মৃধার নাম। ‘আরিশান + আনতারা’।
সময় বদলেছে, পরিস্থিতি বদলেছে, আনতারাও আজ ওপারে পাড়ি জমিয়েছে; কিন্তু দেওয়ালে খোদাই করা সেই ভালোবাসার চিহ্নটা আজো অবিকল রয়ে গেছে। আরিশান মৃধা অত্যন্ত আলতো করে, পরম যন্তে নিজের ডান হাতের আঙুলগুলো সেই নামটার ওপর বুলিয়ে নিলেন। ওনার চোখ দুটো আলতো করে বন্ধ হয়ে এলো।নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে ওনার প্রয়াত স্ত্রী আনতারাকে অনুভব করতে চাইলেন।
বন্ধ চোখের দৃশ্যপটে এক নিমেষেই ভেসে উঠল এক মিষ্টি, হাসির ছটা ছড়ানো রূপবতী রমণীর মুখ। সেই চিরচেনা মায়াবী চোখ, সেই গভীর চাউনি আর ওনার দিকে তাকিয়ে করা মান-অভিমানের মিষ্টি হাসি। আনতারার সেই মুখটা মনে পড়তেই আরিশান মৃধার ঠোঁটের কোণে এক পরম তৃপ্তির ও সুখের হাসির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ওনি বিরবির করে বললেন, ‘
_”আমি আজো শুধু তোমারই আছি,তারা…’
কিন্তু ঠিক পরক্ষণেই, ওনার সেই কল্পনার দৃশ্যপটে এক একী অদ্ভুত ওলটপালট ঘটে গেল!মিষ্টি হাসির রমণী তারার সেই মুখটার মাঝেই হঠাৎ করে, অত্যন্ত তীব্রভাবে ভেসে উঠল সম্পূর্ণ অন্য একটা মুখাবয়ব। নীল রঙের জামা পরা, চোখের জলে নাক-মুখ লাল হয়ে থাকা, তীব্র অভিমানে আর রাগে ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে রাখা এক চিলতে কচি মুখশ্রী। মুখটা আর কারও নয়-জেবার! আজ দুপুরে গাড়িতে জেবা যেভাবে ওনার ওপর অভিমান করে সিটের কোণায় লেপ্টে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিল, ঠিক সেই মুখটা এক ঝটকায় তারার জায়গাটুকু দখল করে নিল।
_“না!”
আরিশান মৃধা তড়িৎগতিতে চোখ দুটো মেলে ফেললেন। ওনার বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল, কপালে সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু জমে উঠল। ওনি রেলিংটা শক্ত করে চেপে ধরে কয়েক পা পিছিয়ে এলেন।
ওনার পুরো শরীর যেন এক অজানা আশঙ্কায় আর পাপে কেঁপে উঠল। ওনার নিজের ভেতরের বিবেক ওনাকে চাবুকের মতো আঘাত করল। এ ওনার কী হলো? নিজের তারারর পবিত্র স্মৃতির মাঝে ওনি জেবাকে কীভাবে দেখতে পেলেন? কীভাবে জেবার সেই ক্রন্দনরত, মায়াবী মুখটা ওনার মনের মণিকোঠায় এভাবে হানা দিতে পারে?
আরিশান মৃধা নিজের দুই হাত দিয়ে কপালটা চেপে ধরে নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।মনে মনে নিজেকেই তীব্রভাবে ধমকে উঠলেন,
_”‘কী ভাবছিস এসব আরিশান মৃধা? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? জেবা তোর মেয়ের বয়সী একটা মেয়ে! ও একটা বাচ্চা! তুই ওকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া তো দূর, ওকে ওই নজরে কখনো দেখিসইনি, আর দেখবিও না! এই বিয়েটা কেবল পরিস্থিতির শিকার, একটা মস্ত বড় ভুল। এই বিয়েকে তুই কোনোভাবেই কোনোদিন প্রশ্রয় দিবি না!’
কিন্তু নিজের মনকে যতই যুক্তি দিয়ে ওনি বোঝাতে চাইলেন না কেন, ভেতরের এক অবাধ্য শিহরণ আর জেবার ওই তীব্র অভিমানী লালচে মুখটা ওনার মনের গভীরে এক অন্যরকম ঝড়ের সংকেত দিচ্ছিল, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধার মতো লৌহমানবের পক্ষেও অস্বীকার করা কঠিন হয়ে পড়ছিল।
ফোনের ওপাশে থাকা ব্যাক্তির সঙ্গে কথা বলা শেষ করে কলটা কেটে দিল সারিম।পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের সূক্ষ্ম ঘামটুকু মুছে নিল।একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকার আর বাড়ির এই গমগমে পরিবেশ ওর ভেতরের ক্লান্তিটাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে অলিন্দ পার হয়ে এগিয়ে গেল সারিম ওর ঘরটার দিকে।এই বিশাল ‘সুখ কুঞ্জ’-এ ওর জন্য এই নির্দিষ্ট রুমটাই বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
দরজাটা আলতো করে ধাক্কা দিয়ে,ভেতরে প্রবেশ করতেই সারিমের চোখের মণি দুটো সামান্য সংকুচিত হলো। দেখল, ঘরের ভেতরের পরিবেশটা বেশ জমজমাট। খাটের ওপর আরাম করে বসে আছে অরি আর জেবা। দুজনে মিলে ফিসফিস করে গল্প করছে। সারাদিনের এত ধকল আর কান্নাকাটির পর জেবার চোখের গ্লিসারিনের জ্বালাটা এখন অনেকটাই কমে এসেছে, তবে ওর চোখ দুটো এখনো হালকা লালচে হয়ে আছে।
সারিমকে আকস্মিক ঘরে ঢুকতে দেখে অরি ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে তাকাল।বেশ রাশভারী গলায় জিজ্ঞেস করল,
_“কিছু বলবেন? কোনো দরকার আছে আপনার?”
সারিম অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নির্বিকার গলায় বলল,
_“দরকার থাকবে না কেন? এটা আমার রুম। ঘুমাতে এসেছি।”
অরি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বেশ আধিপত্য বিস্তারের ভঙ্গিতে বলে উঠল,
_“কিন্তু দুঃখিত, এখন আপনাকে এই রুমটা ছাড়তে হবে। আজ রাতে আমি আর জেবা এই রুমে থাকব। আপনি বরং বাবার রুমে গিয়ে ওনার সাথে আজ রাতটা শেয়ার করুন।”
সারিম মনে মনে একটা বাঁকা হাসল।সে তো সারিম মৃধা! এতো সহজে শিকার হাতছাড়া করার পাত্র ও নয়। বউয়ের সাথে এই নির্জন রাতে একই ছাদের তলায় থাকার জন্য ওর ভেতরের ‘জাউরা’ বুদ্ধিটা এক নিমেষে সচল হয়ে উঠল।নিজের মুখে কোনো ভাবান্তর না এনে, অত্যন্ত গম্ভীর একটা ফেস বানিয়ে, সোজা খাটের কোণায় বসে থাকা জেবার দিকে তাকাল।
বেশ বানিয়ে বানিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
_“জেবা, বাবা তোমাকে ওনার রুমে ডেকেছেন।আমাকে বলল তোমাকে রুমে পাঠিয়ে দিতে। এক্ষুনি যাও,ওনি কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পছন্দ করেন না।”
সারিমের মুখে এই কথা শোনা মাত্রই জেবার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।সে চোখ দুটো গোল গোল করে অরির দিকে তাকাল। আরিশান মৃধার মতো ওই লৌহমানব ওকে এতো রাতে নিজের রুমে কেন ডাকবেন!এটা যেন জেবার কাছে অবিশ্বাস করার মতো কথা।জেবা একটু চিন্তিত হয়ে ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বলল,
_“আমায় ডেকেছেন? কিন্তু কেন?কোনো কারন আছে নাকি!”
সারিম একটা সূক্ষ্ম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_“কারণটা তো বাবাই ভালো জানেন। তবে যেহেতু ডাকছেন, নিশ্চয়ই কোনো দরকারি কাজের জন্যই ডাকছেন। তুমি জলদি যাও।”
জেবা আর কোনো দ্বিরুক্তি করল না।লোকটা ডেকেছে যেহেতু নিশ্চই কোনো কারন আছে এর পিছনে—তবে ওর অবচেতন মনে অদ্ভুত ভয় জাগিয়ে তুলল।সে বিছানা থেকে ধীরপায়ে নেমে দাঁড়াল। কিন্তু বেড থেকে নামার পর জেবা শরীরটা সোজা করতেই আচমকা ওর তলপেটে একটা হালকা মোচড় দেওয়া ব্যথা অনুভূত হলো। জেবা এক হাত দিয়ে পেটটা সামান্য চেপে ধরল। তবে বিষয়টাকে খুব একটা পাত্তা দিল না। মনে মনে ভাবল,সারাদিন না খাওয়া ফলে মনে হয় গ্যাসট্রিকের সমস্যা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
জেবা ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই সারিম এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে খট করে দরজার ছিটকিনিটা আটকে দিল। ভেতরের ভারী কাঠের খিলটা কড়া আওয়াজে লেগে যেতেই অরির বুকের ভেতরটা অজানা এক আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
সারিম কোনো কথা না বলে নিজের পরনের পাঞ্জাবির ওপরের বোতামগুলো একে একে খুলতে শুরু করল। ওর এই আকস্মিক উগ্র পুরুষালী রূপ দেখে অরি বিছানার ওপর কিছুটা গুটিসুটি মেরে বসল। ওর ফর্সা কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।অরি বেশ ঘাবড়ে যাওয়ার মতো কাঁপতি গলায় জিজ্ঞেস করল,
_“এই… কী করছেন কী আপনি? জামা খুলছেন কেন? আর দরজা কেন অফ করলেন?”
সারিম ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে ধীর পায়ে অরির দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ওর চাউনিতে তখন এক ক্ষুধার্ত বাঘের তীব্রতা। খাটের ওপর এক হাঁটু গেড়ে বসে অরির একদম গায়ের ওপর কিছুটা ঝুঁকে এলো সারিম। ওর শরীরের তপ্ত নিঃশ্বাস অরির গাল ছুঁয়ে যাচ্ছিল। অত্যন্ত নিচু, ফিসফিসানি কণ্ঠে সারিম বলল,
_“বউয়ের সঙ্গে একই রুমে একা থাকতে হলে,দরজা অফ করতেই হয়,জান।তা জানো না বুঝি।”
অরি নিজের ভেতরের অবাধ্য ঢোকটা গিলে নিজেকে যতটা সম্ভব পেছনের দিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সারিমের চওড়া শরীরটার সামনে ও যেন এক চিলতে খাঁচায় বন্দী পাখি। সারিম ওর দিকে আরও একটু ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে বলল,
_“রুম একদম ফাঁকা। এবার জলদি খুলে ফেলো।”
অরি চোখ দুটো বড় বড় করে সারিমের এই আকস্মিক অদ্ভুত দাবিতে বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা হলো। ও আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,
_“কী… কী খুলব মানে? আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”
সারিম আরও এক ইঞ্চি এগিয়ে এসে অরির কানের লতিতে নিজের ঠোঁটটা আলতো করে ছুঁইয়ে দিল। এক গভীর নেশাক্ত গলায় বলল,
_“তোমাকে কিছুক্ষণ এর জন্য স্বামীর ক্লান্তি দূর করার জন্য ‘লালি’ সাজতে হবে।”
অরি এবার পুরোপুরি আকাশ থেকে পড়ল।সারিমের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
_“এই লালি আবার কী? আপনি কীসব আজেবাজে ভাষা ব্যবহার করছেন?”
সারিম একটু নিচু স্বরে হাসল। ওর সেই হাসিতে এক অদ্ভুত কামনার ছটা।সে বলল,
_“মুখে বললে তো বুঝবে না চন্দ্রিমা। জিনিসটা কী, তা তোমাকে একদম প্র্যাক্টিক্যালি বোঝাচ্ছি!কি বলো?।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই সারিম নিজের দু হাত দিয়ে এক ঝটকায় অরির কোমরটা জড়িয়ে ধরল। অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওকে বিছানার নরম গদির সাথে বেশ শক্ত করে অনমনীয়ভাবে চেপে ধরল সে। অরির ছিপছিপে শরীরটা সারিমের ভারী শরীরের নিচে নিমেষেই পিষ্ট হতে চাইল।
অরি আপ্রাণ চেষ্টা করল সারিমের বুকটা নিজের দু হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিতে। বেশ রেগে এবং হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
_“ছাড়ুন আমাকে! কী শুরু করছেন কী এসব,মরা বাড়িতে এসে? দেখেন… আমি কিন্তু আপনাকে এখনো মনে-প্রাণে স্বামী হিসেবে…”
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই সারিম নিজের একটা হাত দিয়ে অরির মুখটা আলতো করে চেপে ধরল।চোখ দুটো তখন কামনার এক অন্য স্তরে অবস্থান করছে।সে অত্যন্ত কর্তৃত্বসূচক কণ্ঠে বলে উঠল,
_“তাহলে পরীক্ষাটা বাতিল করে দেই, কী বলো?তুমি তো আমাকে স্বামী হিসেবে মানো না!তাহলে আমার অবদান রেখে কি লাভ?”
সারিমের কথা শুনে অরি এবার সত্যি সত্যি মনে মনে বেশ ভয় পেয়ে গেল। ও বুঝতে পারল, এই পুরুষের সাথে গায়ের জোরে বা তর্কের জোরে জেতা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর সে যদি এখন বেশি ছটফট করে, তবে সারিম হয়তো এমন কিছু করে বসবে ।যেটা ওর সহ্যের বাহিরে চলে যাবে। অগত্যা পরিস্থিতি সামলাতে অরি,সারিম যা করতে চাচ্ছে, তাতে আর বাধা না দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিল সারিমের উপর।অরি নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল।
সারিম অরিকে শান্ত হতে দেখে একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল।এরপর অত্যন্ত ধীর হাতে অরির শার্টের ওপরের কয়েকটা বোতাম আলতো করে খুলে ফেলল। ফর্সা উন্মুক্ত বুকটা ঘরের আবছা আলোয় যেন এক স্বর্গীয় আভা ছড়াচ্ছিল। সারিম কোনো রকম দ্বিধা না করে অরির ভেতরের অন্তর্বাসটাকে এক হাত দিয়ে সামান্য সরিয়ে নিজের মুখটা গভীর আবেশে তীব্র কামনায় ডুবিয়ে দিল অরির সেই নরম ও তপ্ত বুকের ঠিক মাঝখানে।
বেচারি অরির অবস্থা এখন শোচনীয়।সে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিজেকে একটা গাভীর জায়গায় ফিল করছিল,আর সারিমকে ওর মনে হচ্ছিল একটা ছোট্ট ক্ষুধার্ত বাছুর!সারিমের এসব কাণ্ডকারখানা অরির ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হচ্ছিল। এতো বড় একটা লম্বা-চওড়া পুরুষ, দেশের শিক্ষামন্ত্রী, অথচ লোকটা নিভৃতে অরির সামনে এমন সব কাজ করে, যেন সে মাত্র চার-পাঁচ বছরের একটা অবুঝ, ছোট বাচ্চা! যে কেবল নিজের মায়ের আঁচলের তলায় বা নিজের প্রিয় জিনিসের কাছে এসে সমস্ত জেদ আর আবদার উগরে দেয়। অরি নিজের অজান্তেই সারিমের ঘন চুলে নিজের আঙুলগুলো গলিয়ে দিল, এক অদ্ভুত মায়া আর সমর্পণের চাদরে যেন ঘরটা নিমেষেই মুড়ে গেল।
সারিমের ঘর থেকে বেরিয়ে জেবা যখন আরিশান মৃধার রুমের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ওর বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছিল। দরজাটা খোলাই ছিল। ভেতরে পা রাখতেই ও দেখল, আরিশান মৃধা বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। ওনার চওড়া পিঠ আর গম্ভীর অবয়ব দেখেই জেবার কেমন যেন একটা জড়তা কাজ করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও যখন লোকটা ওকে খেয়াল করলেন না, তখন জেবা নিজেই আগ বাড়িয়ে একটু গলা খাকারি দিয়ে বলল,
_“আসতে পারি?”
আরিশান মৃধা চমকে পেছনে ঘুরলেন। চশমার পেছনের চোখ দুটো সরু করে, ভ্রু জোড়া সামান্য উঁচিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
_“তুমি এখানে? এই কী দরকার?”
জেবা একটু আমতা আমতা করে ওনার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
_“মানে… আপনিই তো আমাকে ডেকেছেন। সারিম ভাইয়া বলল।”
সারিমের নামটা শোনা মাত্রই আরিশান মৃধার শক্ত চোয়ালটা আরও শক্ত হয়ে উঠল। ওনার বুঝতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না যে ওনার ওই চরম বেয়াদব, জাউরা ছেলেটা আসলে কী চাল চেলেছে! অরির সাথে একা রাত কাটানোর জন্য,জেবাকে ওনার রুমে চালান করে দিয়েছে! ছেলের এই কাণ্ডজ্ঞানহীন আর বেহায়াপনা মতলব বুঝতে পেরে ওনার ভেতরের রাগটা চড়চড় করে মাথায় চড়ে গেল। তবে নিজের সেই ক্ষোভ তিনি জেবার সামনে প্রকাশ করলেন না। এক গভীর অবদমিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে বললেন,
_“আমি তোমাকে ডাকিনি। সারিম মিথ্যা বলেছে। তবে যেহেতু চলেই এসেছ, এই রাতে আর করিডোরে ঘোরার দরকার নেই। বাইরের পরিবেশ ভালো না। ওই চেয়ারটায় গিয়ে বসো।”
জেবা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বারান্দার এক কোণায় থাকা কাঠের আরামদায়ক চেয়ারটায় গিয়ে বসল। আরিশান মৃধাও ওর মুখোমুখি অন্য একটা চেয়ারে বসে ফোনের স্ক্রিনে মনোযোগ দিলেন। গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইমেইল স্ক্রোল করতে লাগলেন তিনি।
জেবা চুপচাপ বসে থেকে একঘেয়েমি কাটাতে ঘরের চারপাশটা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। বিশাল রাজকীয় ঘর, ভিক্টোরিয়ান আমলের খাট আর আসবাবপত্র—সবকিছুতেই একটা বনেদি আভিজাত্যের ছাপ। দেখতে দেখতেই ঘরের দেওয়ালের এক কোণায় একটা পুরোনো কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো ছবির ওপর ওর নজর গিয়ে আটকে গেল। ওটা আরিশান মৃধার কিশোর বয়সের একটা সাদাকালো ছবি। জেবা একদৃষ্টে সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল,
_‘বাব্বাহ! এই গম্ভীর লোকটা কিশোর বয়সে দেখতে এত সুন্দর ছিল! না জানি যুবক বয়সে কেমন ড্যাশিং ছিল! যদিও এখন এই বুড়ো বয়সেও দেখতে যা লাগে, কোনো যুবকের চেয়ে কম নয়।’
আরিশান মৃধা একটানা ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও ওনার মনোযোগের একটা অংশ জেবার দিকেই ছিল। মেয়েটা যে ওনার ছবির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, তা ওনি টের পাচ্ছিলেন।
হঠাৎ করেই জেবার সেই মনোযোগ ভেঙে যায়। ওর তলপেটের সেই হালকা মোচড় দেওয়া ব্যথাটা এবার অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করছে। এক নিমেষে মনে হলো পেটের ভেতরটা কেউ যেন লোহার খন্তি দিয়ে মুচড়ে দিচ্ছে।
জেবা তীব্র যন্ত্রণায় একটা অস্ফুট শব্দ করে দুই হাত দিয়ে নিজের পেটটা শক্ত করে চেপে ধরল। ব্যথার তীব্রতা সইতে না পেরে সে চেয়ারের ওপর নিজের দুই পা গুটিয়ে এনে, হাঁটুর সাথে মাথাটা ঠেকিয়ে একদম জড়সড় হয়ে বসে রইল। ওর কপাল বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম ঝরতে শুরু করল।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর আরিশান মৃধা ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ তুললেন। জেবাকে একই ভঙ্গিতে, গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে দেখে ওনার ভ্রু কুঁচকে গেল। ওনি ভাবলেন মেয়েটা হয়তো ওনার ঘুমের ভারে ওভাবে বসে আছে। ওনি চেয়ার থেকে না উঠে একটা ডাক দিলেন,
_“জেবা? এভাবে অদ্ভুতভাবে বসে আছ কেন? ঘুম পেলে বিছানায় গিয়ে ঘুমাও।”
জেবার কাছ থেকে কোনো রেসপন্স এলো না। সে যেমন ছিল, তেমনই নিথর হয়ে বসে রইল। আরিশান মৃধা এবার কিছুটা বিরক্ত ও অবাক হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার জরুরি কিছু কাজের জন্য নিচে যাওয়া দরকার ছিল। ওনি দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন,
_“আমি নিচে যাচ্ছি। তুমি চেয়ার ছেড়ে রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ো।”
তবুও জেবা কোনো নড়চড় করল না, কোনো উত্তরও দিল না। আরিশান মৃধা এবার সত্যিই বেশ চিন্তিত হলেন। ওনার মনে এক অদ্ভুত খটকা লাগল। ওনি পা বাড়িয়ে বারান্দায় জেবার ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালেন। একটু দ্বিধা আর সংকোচ নিয়ে জেবার একটা হাত ধরে আলতো করে টেনে তুলতে চাইলেন,
_“কী হয়েছে তোমার? কথা বলছ না কেন…”
কথাটা শেষ করতে পারলেন না ওনি। জেবাকে টেনে তুলতেই ওনার চোখ চড়কগাছ! জেবা মুখটা হাঁটুর কাছ থেকে তুলতেই দেখা গেল ও শব্দহীনভাবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ওর পুরো মুখটা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে, চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে।
_“জেবা! কী হয়েছে? কাঁদছ কেন? কোথাও লেগেছে?” আরিশান মৃধা বেশ বিচলিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
তখনি ওনার নজর হঠাৎ গিয়ে আটকালো কাঠের চেয়ারটার দিকে। চেয়ারের গদির এক পাশটা কিছুটা ভিজে এবং কালচে লাল রঙের দাগে ছেয়ে গেছে। আরিশান মৃধা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ওনি অত্যন্ত সংকোচ আর একরাশ লজ্জা নিয়ে জেবার পরনের নীল কামিজের পেছনের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলেন। ওনার আর বুঝতে বাকি রইল না যে আসল সমস্যাটা কী! মেয়েটার পিরিয়ডের ক্র্যাম্পের ব্যথায় সে এতক্ষণ ধরে এখানে এভাবে কাতরাচ্ছিল।
জেবা এবার আর নিজের কান্নার শব্দ চেপে রাখতে পারল না। আরিশান মৃধার হাতটা শক্ত করে ধরে তীব্র ব্যথায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল,
আরিশান মৃধা অত্যন্ত ঘাবড়ে গেলেন।মুহূর্তে চরম টেনশনে পড়ে গেলেন। ওনি জেবাকে আবার আলতো করে চেয়ারটাতে বসিয়ে দিয়ে কপালে হাত দিলেন। মনে মনে ভাবলেন, ‘এই মেয়েটার আর পিরিয়ড হওয়ার সময় পেল না! এমনিতেই এটা গ্রাম। এই মাঝরাতে ওনি কোথায় ফার্মেসি পাবেন? তার ওপর মেয়েটার পুরো ড্রেসটা নষ্ট হয়ে গেছে, জামাকাপড় বদলাতে হবে। ঢাকা থেকে তাড়াহুড়ো করে আসার কারণে ওনারা তো কোনো এক্সট্রা ড্রেসও সাথে আনেননি।’
ওনি ভাবলেন একবার রুবাব মৃধাকে ডেকে জানাবেন। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলেন, ভদ্রমহিলা ছোট ভাইয়ের শোকে সারাদিন কান্নাকাটি করে এইমাত্র ঘুমাতে গেছেন, এই মাঝরাতে ওনাকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না। ওনি জেবার মাথায় হাত রেখে বললেন,
_“তুমি এখানে একটু শান্ত হয়ে বসো। আমি দেখছি কী করা যায়।”
আরিশান মৃধা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে এলেন। চারপাশের আলো নেভানো, মেহমানেরা যে যার মতো বিভিন্ন ঘরে শুতে চলে গেছেন। পুরো বাড়ি একদম নিঝুম। ওনি ভাবলেন সারিমের ঘরে গিয়ে অরিকে ডেকে আনবেন, একজন মেয়ে হিসেবে সে হয়তো জেবাকে সাহায্য করতে পারবে। কিন্তু ওনার পা দুটো সারিমের ঘরের সামনে গিয়েও থমকে গেল। ওনার মনে হলো, অরি নিজেই সারিমের সঙ্গে এক কাপড়ে চলে এসেছে। সে আর কি সাহায্য বা করতে পারবে।তাছাড়া সারিম আর অরি এখন নিজেদের ব্যক্তিগত মুহূর্তে আছে, সেখানে নক করাটাও ওনার কেমন যেন শালীনতাবিরোধী মনে হলো।
সমস্ত দ্বিধা আর সংকোচ একপাশে সরিয়ে ওনি যখন সিঁড়ির দিকে যেতে নিলেন, ঠিক তখনই ওনার পথে দেখা হয়ে গেল ফুলের সাথে। ফুল নিচ তলা থেকে একটা কাঁচের জগে পানি নিয়ে ওপরের ঘরের দিকে আসছিল। আরিশান মৃধাকে এই মাঝরাতে করিডোরে এভাবে চিন্তিত মুখে পায়চারি করতে দেখে সে অবাক হয়ে এগিয়ে এলো,
_“মামা? আপনি এখনো ঘুমাননি? কিছু লাগবে আপনার? পানি দেব?”
আরিশান মৃধা নিজের ভেতরের চরম অস্বস্তি আর লজ্জাটা কোনোমতে চেপে রাখলেন। একজন মামা হয়ে ভাগ্নির সামনে এই বিষয়ে কথা বলা কতটা কঠিন, তা ওনার মুখের ফ্যাকাশে ভাবই বলে দিচ্ছিল। ওনি কিছুটা কাঁচুমাচু করে, গলার আওয়াজ নিচু করে বললেন,
_“ফুল… আসলে…জেবার একটা সমস্যা হয়েছে। ওর পরার মতো কোনো এক্সট্রা জামা আনেনি। তোমার কাছ থেকে ওকে এক সেট ড্রেস দিতে পারবে?”
ফুল বিষয়টার গুরুত্ব বুঝতে পারল। সে মাথা নেড়ে বলল,
_“অবশ্যই,আমি মামির জন্য কাপড় নিয়ে আসছি।”
ফুল চলে যেতে নিলেই আরিশান মৃধা পুনরায় ওকে ডাকলো। এবার ওনার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, গলার স্বর প্রায় বুজে এলো। ওনি অত্যন্ত চাপে পড়ে, কোনোমতে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
_“আরেকটা কথা ফুল… তোমার কাছে কি… মানে ওই… স্যানিটারি নেপকিন বা প্যাড আছে? থাকলে ওটাও একটু সাথে নিয়ে এসো।”
ভাগ্নির সামনে এই কথা উচ্চারণ করতে গিয়ে আরিশান মৃধা যেন নিমেষে মাটির সাথে মিশে গেল। ফুল মামার এই চরম অস্বস্তি দেখে মনে মনে একটু হাসলেও মুখে কিছু বলল না। সে অত্যন্ত ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে বলল,
_“আছে মামা। আপনি রুমে যান, আমি দু মিনিটের মধ্যে সবকিছু নিয়ে আসছি।”
আরিশান মৃধা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত নিজের রুমে ফিরে এলেন। ঘরে ঢুকতেই ওনার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। জেবা তখন ব্যথার চোটে চেয়ার থেকে নেমে মেঝের কার্পেটের ওপর শুয়ে পড়েছে। দুই হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে সে অনবরত গোঙাচ্ছে আর কাঁদছে। আরিশান মৃধা দ্রুত মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে জেবাকে আলতো করে টেনে ওনার চওড়া বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। ওনার একটা হাত জেবার মাথায় রেখে চুলগুলো বিলি কেটে দিতে দিতে অত্যন্ত নরম ও সান্ত্বনাসূচক গলায় বলতে লাগলেন,
_“একটু শান্ত হও জেবা… আর একটুখানি কষ্ট করো। ফুল আসছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। জাস্ট ব্রিদ…”
ঠিক তখনই ফুল দরজায় নক করে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। ওর হাতে একটা সুতির সালোয়ার-কামিজ আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। ঘরে ঢুকতেই আরিশান মৃধা জেবাকে আলতো করে মেঝেতে বসিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ফুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
_“ফুল,তুমি প্লিজ ওর ড্রেসটা একটু চেঞ্জ করিয়ে দাও আর সবকিছু ঠিকঠাক করে দাও। আমি বাইরে আছি।”
কথাটা বলেই আরিশান মৃধা এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ফুল দ্রুত জেবার পাশে গিয়ে বসল। অত্যন্ত মায়ায় জেবার চোখের জল মুছে দিয়ে তাকে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল। জেবার এই অসহায় অবস্থা দেখে ফুলের ভেতরের সমস্ত হিংসা যেন এক নিমেষে ধুয়ে মুছে গেল। সে অত্যন্ত যত্নের সাথে জেবার রক্তে ভেজা নষ্ট হয়ে যাওয়া জামাকাপড়গুলো বদলে নিজের একটা পরিষ্কার ড্রেস পরিয়ে দিল এবং নেপকিন সেট করে দিল।
সবকিছু ঠিকঠাক করে ফুল জেবাকে ধরে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল, তখনো জেবা ব্যথায় অনবরত কাতরাচ্ছিল। ফুল ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিশান মৃধা ওনার দিকে তাকালেন। ফুল বলল,
_“মামা, সব চেঞ্জ করিয়ে দিয়েছি”
ফুল চলে যেতেই আরিশান মৃধা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন। ঘরের আলোটা হালকা করে দিয়ে ওনি খাটের পাশে এসে দাঁড়ালেন। জেবা তখন বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে, ব্যথার ঘোরে ওর চোখ দুটো বন্ধ,বন্ধ চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছে। ওর ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে সে বিছানার চাদরটা খামচে ধরে আছে।
আরিশান মৃধা খাটের কিনারায় বসলেন। ওনার মনটা এক অজানা মায়ায় আর সমবেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। ওনি জেবার কপালে হাত দিয়ে ওর এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেন,
_“জেবা… একটু চোখ খোল। ব্যথা কি খুব বেশি হচ্ছে?”
জেবা কোনো উত্তর দিতে পারল না। কিন্তু আরিশান মৃধার গলার আওয়াজ আর হাতের স্পর্শ পেতেই সে ব্যথার ঘোরেই আরও একটু ওনার দিকে এগিয়ে এলো। আরিশান মৃধা আর কোনো উপায় না পেয়ে, নিজের সমস্ত সামাজিক নিয়ম আর বয়সের ব্যবধানের দেয়াল একপাশে সরিয়ে রেখে জেবাকে আলতো করে নিজের দুই বাহুডোরে টেনে নিলেন। ওনার চওড়া, নিরাপদ বুকে জেবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন ওনি।
জেবা ওনার বুকের ওম আর সুবাস পেতেই ব্যথার ঘোরে ওনার শার্টের কলার আর মাথার চুলগুলো নিজের ছোট ছোট আঙুল দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ওনার বুকের মধ্যে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে সে যেন এক পরম আশ্রয়ের সন্ধান পেল।
আরিশান মৃধার কেমন যেন একটা অদ্ভুত, অবাধ্য অনুভূতি হতে লাগল। ওনার বুকের ভেতরটা এক লহমায় কাঁপন দিয়ে উঠল। জেবা ব্যথার ঘোরে কী করছে না করছে, তার কোনো জ্ঞানই ওর ছিল না; কিন্তু আরিশান মৃধার মতো একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষের কাছে এই কচি মেয়েটার এমন তীব্র সমর্পণ আর স্পর্শ এক অন্যরকম ঝড়ের সৃষ্টি করছিল।
জেবাকে এভাবে শুইয়ে রাখলেও ওর ছটফটানি কমছিল না দেখে আরিশান মৃধা শেষমেশ খাটে বসে থাকা বৃথা মনে করলেন। ওনি অত্যন্ত আলতো করে,জেবাকে নিজের শক্ত দু-হাতে পাঁজকোলা করে কোলে তুলে নিলেন।
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৯
বিছানা ছেড়ে আরিশান মৃধার সেই চওড়া আর নিরাপদ কোলে উঠতেই জেবা এক অদ্ভুত আরাম পেল। ওনার শরীরের উষ্ণতা আর দোদুল্যমান গতিটা যেন জেবার পেটের সেই তীব্র কামড়ানিটাকে কিছুটা হলেও স্তিমিত করে আনল। জেবা আস্তে আস্তে ওনার বুকের সাথে আরও লেপ্টে গিয়ে নিজের কাঁপতে থাকা চোখ দুটো বুজে ফেলল। ওর গোঙানিটা ধীরে ধীরে কমে এলো।
আরিশান মৃধা জেবাকে সেইভাবেই নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, নিঝুম ঘরের ভেতর ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে, অবুঝ শিশুকে ঘুম পাড়ানোর মতো করে জেবাকে ঘুম পাড়াতে লাগলেন। বাইরের নিশুতি রাতের চাঁদের আলো ওনাদের উপর এসে লাগছে।
