Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫১

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫১

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫১
মেহজাবিন নাদিয়া

আনতারা মৃধাকে ধরাধরি করে রুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অনেক আগেই। আরিশান মৃধা নিঃশব্দে একপাশে দাঁড়িয়ে সব পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ডাক্তার এসে আনতারা মৃধাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন। ভাগ্য ভালো যে পুরো বাড়িতে কার্পেট বিছানো ছিল, তাই বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি; শুধু নাক-মুখ ফেটে রক্ত বেরিয়েছে আর মাথায় সামান্য চোট লেগেছে। আঘাতটা মারাত্মক কিছু নয়।ডাক্তার মেডিসিন দিয়েই চলে গেছে।
অপরদিকে, জেবা রুমে একা গুটিসুটি মেরে বসে আছে। তার মনে প্রচণ্ড ভয় আর আতঙ্ক।ভাবছে, সারিমের মতো হয়তো আরিশান মৃধাও তাকে ভুল বুঝবে।সেতো আর ইচ্ছে করে আনতারা মৃধাকে ধাক্কা দেয়নি; নিজের গর্ভের অনাগত সন্তানকে বাঁচাতেই তাকে এই চরম পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। জেবা দুই হাতে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কেন সবাই তাকেই বারবার ভুল বোঝে? তার সত্যটা কেন কেউ দেখতে পায় না?

কান্নার মাঝেই জেবা অনুভব করল, কেউ একজন তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছে। চমকে উঠে তাকাতেই সামনে আরিশান মৃধাকে দেখে তার ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল।
আরিশান মৃধা জেবার ভয়টা লক্ষ্য করলেন, তবে মুখে কিছু বললেন না। তাঁর গম্ভীর অবয়ব দেখে জেবা ভয়ে আরও কিছুটা পিছিয়ে গেল। এখন নিজের সাফাই দেওয়ার মতো মানসিক শক্তি তার নেই। তা ছাড়া সে তো জানে, আনতারা মৃধাকে আরিশান মৃধা কতটা ভালোবাসে। মুখে অস্বীকার করলেও মনে মনে যে এখনও দুর্বলতা আছে-সেটাই ভাবছিল জেবা।
তার ভাবনায় ছেদ টেনে, জেবাকে অবাক করে দিয়ে আরিশান মৃধা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। আকস্মিক এই কাণ্ড দেখে জেবা একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু আরিশান মৃধা তাকে কোনো কিছু ভাবার বা বলার সুযোগ দিলেন না। জেবার ঘাড়ে হালকা চাপ দিতেই শারীরিক ও মানসিক চাপে ক্লান্ত মেয়েটি মুহূর্তের মধ্যে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ল।

আরিশান মৃধা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে জেবাকে বেডে শুইয়ে দিলেন। ঘর ছেড়ে যাওয়ার আগে একবার ভালোবাসাময় দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকালেন। অনেক হয়েছে এসব নাটক! আর নয়। এবার প্রতিপক্ষকে তাদের পাপের চূড়ান্ত ফল বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।তিনি গটগট পায়ে ঘর থেকে বের হলেন। যাওয়ার সময় বাইরের দিক থেকে দরজাটা চাবি দিয়ে লক করে দিলেন।
করিডোর পেরিয়ে আরিশান মৃধা সোজা প্রবেশ করলেন আনতারা মৃধার ঘরে। গিয়ে দেখলেন, তিনি অনেকটাই সুস্থ। আরিশান মৃধা কে রুমে ঢুকতে দেখেই আনতারা মৃধা আবার তীব্র ব্যথার অভিনয় শুরু করলেন।আরিশান মৃধা তার কাছে এগিয়ে এলেন। অত্যন্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে আনতারা মৃধাকে পরখ করলেন। একসময় এই রমণীর পায়ের কাছে তিনি হাত জোড় করে পড়ে থাকতেন একটু ভালোবাসার জন্য! ভাবতে আজ নিজের ওপরই ভীষণ করুণা ও হাসি পাচ্ছে তাঁর।
আনতারা মৃধা আরিশান মৃধাকে দেখে করুণ স্বরে বলে উঠলেন,
“আরিশান! থ্যাঙ্ক গড তুমি সঠিক সময়ে চলে এসেছিলে। নয়তো আজ ওই বেয়াদপ মেয়েটা আমাকে মেরেই ফেলত!”

‘মেরেই ফেলত’ শুনে আরিশান মৃধা মনে মনে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। তবে তাঁর চেহারায় রইল চরম কঠোরতা।
আনতারা মৃধা আরও নাটকীয় কণ্ঠে বললেন,
“আহ্! আমার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে… প্লিজ একটু সাহায্য করো, আরিশান!”
আরিশান মৃধা এবারও চুপ করে রইলেন। তাঁর এই নীরবতা দেখে আনতারা মৃধা একটু অবাক হলেন। দু-দুবার ডাকার পরও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই কেন?
“কী হয়েছে তোমার, আরিশান? আমার কথা কি তোমার কানে যাচ্ছে না?”
আরিশান মৃধা এবারও কোনো জবাব না দিয়ে পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বসলেন। দু-হাত ভাজ করে, পায়ের ওপর পা তুলে নিজের স্বাভাবিক গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে রইলেন।
আনতারা মৃধা তাঁর দিকে তাকিয়ে আসল মতলব বোঝার চেষ্টা করছেন। অবশেষে বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করলেন,

“কিছু বলবে? এভাবে তাকিয়ে থাকার মানে কী?”
আরিশান মৃধা এবার হালকা মুচকি হাসলেন। মাথাটা সামান্য নেড়ে বললেন,
“বলার তো অনেক কিছুই আছে। তবে সেসব তোমার মুখ থেকে শোনার আর ইচ্ছে নেই।”
“মানে কী বলতে চাচ্ছ? পরিষ্কার করে বলো!”
আরিশান মৃধা সোজা চোখে তাকিয়ে বললেন,
“আগে বলো, অদ্রিজার ক্ষতি কেন করতে চেয়েছিলে তুমি?”
আনতারা মৃধা একটু চমকে উঠলেন। আরিশান কি তবে তাঁর পরিকল্পনার কথা আঁচ করতে পেরেছেন? কিন্তু মুখাবয়ব স্বাভাবিক রেখে বললেন,
“আমি ক্ষতি করতে চেয়েছি মানে? আমি কেন ওর ক্ষতি করতে যাব? ওর সাথে আমার কিসের শত্রুতা?”
“সেটাই তো আমি জানতে চাচ্ছি, আনতারা! অদ্রিজার সাথে তোমার কিসের শত্রুতা?”
আনতারা মৃধা রেগে গিয়ে বললেন,

“আরিশান, ব্যাস! অনেক হয়েছে! তোমার বাড়িতে থাকি বলে তুমি আমাকে মিথ্যা অপবাদ দেবে?আর আমি তা চুপচাপ সহ্য করে নিবো। নো নেভার,কখনোই না। গিয়ে দেখো, ওই মেয়ে কোন ছেলের হাত ধরে পালিয়ে গেছে!”
আরিশান মৃধা ধমকে উঠলেন,
“স্টপ ইট রাবিশ! এনাফ ইজ এনাফ! আর একটাও মিথ্যা নয়! আমার ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে তোমাকে শেষ করে দিতে। কিন্তু আমি নিরুপায়, কারণ আমি তোমার মতো জঘন্য নই! যে হাত দিয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কথা ছিল, সেই হাত দিয়ে তুমি অকাতরে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার করেছ! কীভাবে পারো মানুষের শরীর থেকে অঙ্গ কেটে বের করে আনতে? একটুও বুক কাঁপে না এসব করতে? আল্লাহর ভয় নেই তোমার মনে? ইউ ব্লাডি ওম্যান!”
আনতারা মৃধা আরিশান মৃধার কথা শুনে প্রথমে অবাক হলেন ভিষশন।পরক্ষনেই বুঝে গেলেন, আরিশান তাঁর আসল রূপ চিনে ফেলেছে। তাই আর ভান করার প্রয়োজন মনে করলেন না। হুট করে বিকট শব্দে হেসে উঠলেন তিনি। এতক্ষণ যে মহিলা অসুস্থতার নাটক করছিলেন, মুহূর্তে তাঁর ভেতর থেকে এক হিংস্র চেহারা বেরিয়ে এল।
আরিশান মৃধা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,

“দেখিয়ে দিলে তো নিজের আসল রূপ!”
“সব যখন জেনেই গেছ, তখন আর লুকিয়ে রেখে লাভ কী?” আনতারা মৃধা সোজা হয়ে বসে বললেন,
“তা আমার সব রহস্য উদ্ধার করতে নিশ্চয়ই তুমি একা নও, তোমার গুণধর ছেলেও সাথে ছিল?”
আরিশান মৃধা মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বললেন,
“সি! ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড! আই অ্যাম ইমপ্রেসড!”
“আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, তোমরা বাপ-বেটা মিলে এতসব তথ্য কীভাবে বের করলে? আই মিন, আমি তো কোনো ক্লু রেখে যাইনি!”
আরিশান মৃধা একটু ভেবে বলতে শুরু করলেন,

“তোমার ওপর সন্দেহ সেদিনই হয়েছিল, যেদিন তুমি ফিরে এসে আমাদের সেই মিথ্যা আংটির গল্প শোনালে। ট্রাস্ট মি, তোমার যুক্তিতে আমার খুব হাসি পেয়েছিল! যে আংটির জোগান এত বিরল, সেটার জন্য তোমাকে কেউ আগুনে পুড়িয়ে মারবে? হাউ জোকারস! এরপর আর বেশি কিছু না, তোমার পেছনে চার-পাঁচটা দক্ষ ডিটেক্টিভ টিম লাগিয়ে দিই। সেখান থেকে এমন কিছু তথ্য উঠে আসে, যেগুলো ১৪ বছর আগের আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচার কেসের সাথে হুবহু মিলে যায়। এরপর তোমার ওপর কড়া নজর রাখার জন্য গোপনে হিডেন ক্যামেরা বসিয়ে দেওয়া হয়।”
কথাটি বলেই আরিশান মৃধা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আনতারা মৃধা চমকে উঠতেই আরিশান তাঁর খুব কাছে এগিয়ে এলেন। দু-পাশে হাত দিয়ে তাঁকে একরকম আটকে ফেললেন। আরিশান মৃধার উত্তপ্ত শ্বাস মুখে লাগতেই আনতারা মৃধা চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিলেন।
আরিশান মৃধা বাঁকা হেসে এক হাত বাড়িয়ে আনতারা মৃধার পোশাকের ভাঁজে সুক্ষ্মভাবে লুকিয়ে রাখা একটি অত্যন্ত ছোট হিডেন ক্যামেরা খুলে নিলেন। তারপর আবার গিয়ে নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন।

আনতারা মৃধা চোখ খুলে দেখে আরিশানের হাতে একটা পিঁচকে ক্যামেরাটা। তিনি ভাবতেও পারেননি আরিশান মৃধা এতটা চতুর হতে পারেন! তিনি খাট থেকে উঠে সেটা কেড়ে নেওয়ার জন্য এগোতেই,আরিশান মৃধা তাঁকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন।
“উহু! ওখানেই বোসো! আমার কথা এখনও শেষ হয়নি।”
অগত্যা আনতারা মৃধা চোখ-মুখ শক্ত করে আবার বসলেন। আরিশান মৃধা ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বললেন,
“প্রথমে জিপিএস ট্র্যাকার লাগিয়েছিলাম, কিন্তু তোমার সঙ্গীরা বড্ড চতুর। তোমাদের একসাথে দেখা যাওয়াটা বেশ কঠিন ছিল। সে কারণেই এই ক্যামেরার কৌশল। এখন তোমার সব সঙ্গীর পরিচয় ও স্কেচ আমাদের কাছে একদম স্পষ্ট।”
আনতারা কুটিল হেসে বললেন,
“কিছুই করতে পারবে না তোমরা আমাদের! তোমার কি মনে হয় আমি তোমার এসব কথা শুনে ভয় পেয়েছি?”

“আমি কখন বললাম যে তুমি ভয় পেয়েছ? আমি তো শুধু তোমার সাথীদের কথা তুললাম। এনিওয়ে, যে জিনিসটার খোঁজে তুমি এই বাড়িতে পড়ে ছিলে-”
আরিশান মৃধা পকেট থেকে একটি লকেট বের করে আঙুলের সাহায্যে ঘোরাতে লাগলেন। লকেটটি চিনতে আনতারা মৃধার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না! তিনি এক ছোঁ মেরে আরিশান মৃধার হাত থেকে লকেটটি কেড়ে নিলেন।
“থ্যাঙ্ক ইউ আরিশান! সবকিছু জানা সত্ত্বেও আমার কাজটা তুমি ভীষণ সহজ করে দিলে! এখন আমি এখান থেকে চলেও যাব, তবে তোমার লাশের ওপর দিয়ে!”
আরিশান মৃধা ভাবলেশহীন কণ্ঠে জবাব দিলেন,
“ট্রাই করে দেখতে পারো। তবে ফলাফল শূন্য!”
“কী বোঝাতে চাচ্ছ তুমি?”
আরিশান মৃধা হেসে বললেন,

“এতক্ষণে তোমার লুকিয়ে রাখা সব অর্গান পুলিশের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আর সেগুলো দিয়ে এখন সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অসহায় মানুষদের বিনামূল্যে অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হবে। এতে যদি তোমার পাপের বোঝা সামান্য হলেও কমে!”
আনতারা মৃধা বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন! সরকারের হাতে সব অঙ্গ চলে গেছে? এর মানে ‘লুকা’ তাঁদের ছেড়ে কথা বলবে না! কিন্তু এই বিষয়ে দেলোয়ার তাঁকে এখনও কিছু জানায়নি কেন?তাঁর মনের কথা বুঝতে পেরে আরিশান মৃধা বললেন,
“ওহ! তোমাদের মূল হোতা লুকাকে নিয়ে ভাবছ? ডোন্ট ওয়ারি! লুকা তোমাকে মারার সুযোগ পাবে না, কারণ নিজের দেশ থেকেই তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তার ফাঁসি হবে বলা চলে!তবে তোমারটা খুব নিশ্চিত।”
আনতারা মৃধা তীব্র রাগে আরিশান মৃধার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। এত বছরের পরিশ্রম এই লোকটা কয়েক দিনে জল করে দিল! তিনি তেড়ে গিয়ে আরিশান মৃধার কলার চেপে ধরলেন।
“তোমার নাটক বন্ধ করো! এসব কিছুই হয়নি! সব মিথ্যা! তুমি আমাকে বোকা বানাতে চাচ্ছ, তাই না?”

আরিশান মৃধা এক ধাক্কায় আনতারা মৃধার হাত কলার থেকে ছাড়িয়ে দিলেন। আনতারা মৃধা ছিটকে গিয়ে কিছুটা দূরে পড়লেন।
আরিশান মৃধা রিমোট নিয়ে দেয়ালের টিভিটা অন করে দিলেন। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ব্রেকিং নিউজ-দেলোয়ার ও অনুপমাকে পুলিশ গাড়িতে তুলছে। নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা শিরোনাম।
‘আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচার চক্রের পর্দাফাঁস! দীর্ঘদিন মৃত সেজে থাকা সেনাবাহিনীর প্রাক্তন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন এবং সাবেক এমপি রাজন খন্দকারের স্ত্রী অনুপমা শিকদার গ্রেপ্তার। এই চক্রের সাথে জড়িত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রাক্তন স্ত্রী আনতারা মৃধাও।পাবলিক গাড়িতে তোলার সময় তাঁদের দিকে জুতো ছুড়ে মারছে। দৃশ্যটা দেখে শিউরে উঠলেন আনতারা মৃধা। তাঁকেও এভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে ভেবে আতঙ্কে কেঁপে উঠলেন তিনি।
হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল অরির কথা। দেলোয়ার তো বলেছিল অরিকে যেন কোনোভাবে ঘর থেকে বের করা হয়! অরিকে কিডন্যাপ করতে পারলে জেবাকে বিপদে ফেলে লকেটটা সহজে আদায় করা যেত। সে কারণেই তারা আরাফকে টাকা খাইয়ে শাহীনের সাথে হাত মিলিয়েছিল, যাতে জেবাকে সবাই দোষী ভাবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে লকেট তো জেবার কাছে ছিলই না, ছিল আরিশান মৃধার কাছে! তাহলে অরি এখন কোথায়? আর সারিমকে যে মেসেজ ও ভিডিও পাঠানো হয়েছিল, সেটার কী হলো?
আরিশান মৃধা তাঁর মনের ভাব বুঝতে পেরে বললেন,

“অদ্রিজার কথা ভেবে অস্থির হচ্ছো তো?”
আনতারা মৃধা মাথা তুলে তাকালেন,
“তুমি কীভাবে বুঝলে?”
“তুমি কত বোকা, আনতারা! নয়তো আমাদের এই সাজানো ফাঁদে কীভাবে পা দিলে?”
ফাঁদের কথা শুনে আনতারা মৃধা আবার কেঁপে উঠলেন। আরিশান মৃধা শান্ত কণ্ঠে বুঝিয়ে বললেন,
“তোমার প্ল্যান সম্পর্কে আমরা আগে থেকেই অবগত ছিলাম। জানতাম তুমি ফিরে আসার পেছনে কোনো কুটিল উদ্দেশ্য আছে। সে কারণেই শাহীনকে আগে থেকেই বলে রাখা হয়েছিল তোমার সব কথা যেন সে মেনে নেয়। তোমার বিশ্বাস অর্জনের জন্য শাহীন তোমার সঙ্গ দিল। তুমি ওই আরাফ ছেলেটিকে টাকা খাইয়ে এনেছিলে, কিন্তু তোমার বোঝা উচিত ছিল অদ্রিজা আর জেবার সিকিউরিটি কতটা প্রখর! সারিম এসব আগে থেকেই জানত। সে ইচ্ছে করেই বাড়িতে এসে ভাঙচুর চালাল আর জেবার ওপর রাগ দেখাল, যাতে তুমি নিশ্চিত হয়ে যাও যে তোমার প্ল্যান সফল হয়েছে। আর তোমাকে এখানে ব্যস্ত রেখে, জিপিএস ট্র্যাকের মাধ্যমে তোমার সঙ্গীদের ধরে ফেলতে আমাদের বেশি সময় লাগেনি। কারণ তারা তো তোমার সংকেতের অপেক্ষায় এক জায়গাতেই বসে ছিল! এতক্ষণে অদ্রিজা আর সারিম নিরাপদে ট্রিপে চলে যাচ্ছে।”
আনতারা মৃধা হতবাক হয়ে শুনছিলেন। তাঁর নিখুঁত প্ল্যান এভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, তা ভাবতেও পারেননি।
আরিশান মৃধা আরও যোগ করলেন,

“তবে হ্যাঁ, সোলেমানকে খুন করার সময় তুমি যে ঘড়িটা ফেলে এসেছিলে-সেটাই আমাদের জন্য বড় অকাট্য প্রমাণ ছিল।”
আরিশান মৃধা পকেট থেকে সেই ঘড়ি বের করে আনতারা মৃধার চোখের সামনে ধরলেন। আনতারা মৃধা চিনতে পারলেন ঘড়িটি, এটি তাঁর হারিয়ে যাওয়া সেই ঘড়িই!
আরিশান মৃধা বলতে থাকলেন,
“সোলেমানকে যেখান থেকে বস্তায় ভরে,লাশ নদীতে ফালানো হয়েছিলো।সেখানে তল্লাশি চালাতে গিয়ে আবিরাম তোমাদের গোপন আস্তানার সন্ধান পায় আর ক্যামেরায় ছবি তোলে। কিন্তু তুমি সেটা যেনে যাও।আর তোমার লোকেরা তাকে ধরতে গেলে, ওর এক্সিডেন্ট হয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে সে বেঁচে গেলেও ক্যামেরাটা হারিয়ে যায়। পরে সে আমাদের সেই জায়গায় নিয়ে গেলে আমরা সোলেমানের একটি গোপন রেকর্ডার পাই। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে সে তোমাদের কথোপকথন রেকর্ড করে রেখেছিল। সেখান থেকেই আমরা সব সত্য জানতে পারি।”

“ওহ! তাহলে সবদিক থেকেই এগিয়ে ছিল দেখি ওই সোলেমান।বেরি ইন্টেলিজেন্ট মানতে হবে।”
আরিশান মৃধা মৃদু হাসলেন। আনতারা মৃধা এখন কি করবে কি বলবে ভেবে পেলেন না। শুধু বুঝলেন সব শেষ।কিছু নেই ওনার কাছে। নিজেকে বাঁচানোর সকল পথ বন্ধ।হঠাৎ করে বিকট ও উন্মাদ মার্কা হাসির শব্দ পাওয়া গেল। সব হারিয়ে তিনি পাগলের মতো হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়লেন। দু-চোখ তাঁর রক্তবর্ণ।
“সব শেষ… আমার সব শেষ…” বিড়বিড় করতে লাগলেন তিনি।
আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,

“আমি আগে খারাপ থাকলেও এবার যা করেছিলাম, বাধ্য হয়ে করেছিলাম! আগের বার ধোঁকা দিলেও, এবার আমি সত্যিই তোমার কাছে ফিরে এসেছিলাম, আরিশান! ভেবেছিলাম সবকিছু ঠিক করে তোমার বুকে মাথা রেখে শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটাব। কিন্তু তুমি আমার সেই আগের আরিশান নও, যে আমার ভুলগুলো ক্ষমা করে দিত! তুমি এখন অন্য এক আরিশান, যে কেবল আমার ভুল খোঁজে আর আমার থেকে পালানোর পথ খোঁজে! আর এসব কিছু তুমি করছ নিজের মেয়ের বয়সী একটা মেয়ের জন্য! যাকে একসময় তুমি নিজের মেয়ের মতো দেখতে, আজ তাকে বউ বানিয়ে, তাকে ঘিরে আমার সাথে এমনটা করেছো তাই না।তোমার আর আমার মাঝে একটাই বাধা-ওই জেবা! তুমি ওই মেয়েটার জন্য আজ আমাকে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করিয়েছ! কী আছে ওই মেয়ের মধ্যে, যা আমার মধ্যে ছিল না? দুদিন পর যখন তুমি বুড়ো হয়ে যাবে, তোমার কি মনে হয় ওই মেয়ে তোমাকে ভালোবেসে যাবে? ওর তো সবে জীবন শুরু, আর তুমি শেষের পথে!সামনের দিনগুলোর কথা তুমি একবারো ভাবোনি আরিশান। তুমি ঐ মেয়ের মোহে পড়ে সব ভুল করে বসে আছো।কিন্তু আমি তা সুধরে দিবোই।আমি না বাঁচলে তোমাকেও বাঁচতে দেব না!”
কথাগুলো শেষ হতেই আনতারা মৃধা নিজের পোশাকের আড়াল থেকে লুকিয়ে রাখা একটা লোডেড রিভলবার বের করে আচমকা তাক করলেন আরিশানের বুক বরাবর!আরিশান মৃধা সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালেন। তবে তাঁর মুখাবয়বে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই; একদম বুক টান করে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আনতারা মৃধা দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

“মরার খুব শখ, তাই না? ভয় হচ্ছে না? এখনই গুলি করে দেব তোমাকে!”
আরিশান মৃধা ঠান্ডা কণ্ঠে বললেন,
“তুমি পারবে না আমাকে মারতে।”
“পারব না?রেয়িলি।তবে দেখে নাও!”
আনতারা মৃধা বন্দুকের ট্রিগারে চাপ দিতে যাবেন, ঠিক তখনই তীরের গতিতে একটি গুলি এসে বিঁধল তাঁর হাতের তালুতে! যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠতেই বন্দুকটি হাত থেকে ছিটকে মেঝেতে গড়িয়ে গেল।
আনতারা মৃধা পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলেন, ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে অবিরাম এবং আয়ুশ। পেছনে একদল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী! কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবিরাম এগিয়ে এসে আনতারা মৃধার হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলো।
অবিরাম আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে সম্মান জানিয়ে বললেন,

“আমরা এখন একে কাস্টডিতে নিয়ে যাচ্ছি, স্যার।”
আরিশান মৃধা হাতের ইশারায় সম্মতি জানালেন। নারী কনস্টেবলরা যন্ত্রণায় কোঁকাতে থাকা আনতারা মৃধাকে চাদরাবৃত্তি করে টেনে-হিঁচড়ে ঘরের বাইরে নিয়ে যেতে লাগল। আনতারা মৃধা চিৎকার করে বলতে লাগলেন,
“আরিশান! তুমি আমার সাথে এটা করতে পারো না! আমি কাউকে ছাড়ব না! ছেড়ে দাও আমাকে!”
আনতারা মৃধাকে নিয়ে পুলিশ বাহিনী বেরিয়ে যেতেই ঘরে শান্ত পরিবেশ ফিরে এল। আরিশান মৃধা এগিয়ে এসে আয়ুশ ও আবিরামের সাথে হ্যান্ডশেক করলো।
“অনেক ধন্যবাদ তোমাদের। এই জটিল কেসটা সলভ করার পেছনে তোমাদের মতো যোগ্য অফিসারদের অবদান অপরিসীম।”

“ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম, স্যার!” সালাম জানিয়ে আয়ুশ ও আবিরাম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
সবাই চলে যাওয়ার পর আরিশান মৃধা পকেট থেকে ফোন বের করে সারিমকে কল করলেন।ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই সারিম বলল, “জ্বি বলো!”
আরিশান মৃধা জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথায় আছ তোমরা?”
“এয়ারপোর্টে। কোনো সমস্যা হয়েছে কি?”
“না, কোনো সমস্যা হয়নি। সব ঠিকঠাকভাবে সমাধান হয়ে গেছে। তুমি আর অদ্রিজা ট্রিপটা উপভোগ করো। আর হ্যাঁ, অদ্রিজাকে এসব ব্যাপারে কিছু বলার দরকার নেই। তার বাবা দেলোয়ার এখনো বেঁচে আছে। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একজন অপরাধী, এই সত্যটা সারাজীবন গোপনই থাক। আমি চাই না মেয়েটা কষ্ট পাক। তা ছাড়া ওর বাবা হিসেবে তো আমি আছিই, আর কিছুর প্রয়োজন নেই।অল দ্যা বেস্ট, ট্রিপের জন্য।”

সারিম বাবার কথায় সহমত জানালো। তারপর হালকা কণ্ঠে বলল,
“তাহলে জেবাকে আমার পক্ষ থেকে একটা ‘সরি’ বলে দিও! নয়তো দেখা যাবে তোমার বউ আবার আমার ওপর রাগ করে।আমার অনাগত ভাই বোনের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে!আর সেই দায়ে আমার একসাথে বাবা আর ভাই ডাকটা শুনা হলো না।”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫০

সারিমের কথা শুনে আরিশান মৃধার গম্ভীর মুখটা বিরক্তে কুচকে এলো। এই ছেলেটা একটু সুন্দর ভাবে কথা বললে কি এমন হয় তা ওনি বোঝেন না। ফোনটা কেটে দেন তিনি।ছেলের সাথে কথা বাড়ালেই এখন বিপদ। তাছাড়া জেবাকে ওনার সবকিছু এক্সপ্লেইন করা দরকার।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫২