আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৫ (২)
সাবিলা সাবি
হিয়াকে ঘিরে থাকা CID-এর সদস্যরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। দুই পাশ থেকে স্পিডবোটগুলো তাদের ঘিরে রেখেছে, আর ওপরে হেলিকপ্টারগুলো এখনও জাহাজের চারপাশে চক্কর দিয়ে যাচ্ছে। পানিতে থাকা কয়েকজন অফিসার সতর্ক অবস্থানে দাঁড়িয়ে রইল, বাকিরা হিয়াকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। হিয়ার দুই হাত তখন পেছনে হ্যান্ডকাফে বাঁধা। ঠিক তার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল লিওন। কিছুক্ষণ আগেও পানির নিচে যে মানুষটাকে সে মৃ/ত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে, সেই মানুষটিই এখন তাকে গ্রে*প্তার করেছে।
একজন অফিসার এগিয়ে এসে বলল, “স্যার, টার্গেট সিকিউরড। বোট প্রস্তুত আছে।”
লিওন হিয়ার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই সংক্ষিপ্তভাবে বলল, “ওকে নিয়ে চলো।”
একজন অফিসার হিয়াকে স্পিডবোটের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করল। হিয়া কোনো প্রকার বাধা দিল না। এতক্ষণ ধরে পালানোর জন্য অসম্ভব সব পথ বেছে নেওয়া এই নারীটিই এবার কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই CID এর সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। স্পিডবোটে ওঠার আগে হিয়া একবার পেছনে তাকাল। তার চোখ গিয়ে থামল নদীর পানিতে।
কয়েক মুহূর্ত আগেও এই পানির নিচেই তার আর আয়মানের শেষ হিসাব হয়ে গেছে। সাত বছর আগে যে মানুষটা তার ছোট ভাই অয়নকে হাত পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়েছিল, আজ সেই আয়মানও একই পানির নিচে নিজের শেষ পরিণতি পেয়েছে। হিয়ার চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না। সাত বছর ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা প্রতিশোধের একটা অধ্যায় আজ সত্যিই শেষ হয়েছে।
সে আর পেছনে তাকাল না।
স্পিডবোটে উঠে বসতেই দুই পাশে সশস্ত্র CID সদস্যরা অবস্থান নিল। লিওনও তার বিপরীতে এসে বসল। কিছুক্ষণ আগের পানির নিচের ঘটনাটা নিয়ে দুজনের কেউ কোনো কথা বলল না। লিওনের চোখ ছিল হিয়ার ওপর, অথচ হিয়া জানালার বাইরে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর স্পিডবোটের ইঞ্জিনের শব্দ আরও বেড়ে গেল। নদীর পানি পেছনে ফেলে তারা দ্রুত CID হেডকোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে চলল। হিয়া জানত, এবার তাকে জেরা করা হবে। তার আসল পরিচয়, গত সাত বছর সে কোথায় ছিল, কীভাবে ভাইপার হয়ে উঠল, এতগুলো অপরাধের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে পড়ল—সবকিছুর উত্তর জানতে চাইবে CID।
তবে এসব প্রশ্নের মধ্যে একটি নামই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দানিয়েল।
হিয়া ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। দানিয়েল সম্পর্কে সে কোনো তথ্য দেবে না। CID যতই জেরা করুক, যতই চাপ সৃষ্টি করুক, তার মুখ থেকে ওই নামের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো তথ্য বের করতে পারবে না।
কারণ ভাইপার ধরা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তার সাম্রাজ্যের দরজা এখনো পুরোপুরি খোলেনি।
আর সেই দরজার চাবি হিয়ার কাছেই।
এদিকে তাদের অভিযান শেষ হওয়ার আগেই খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের অন্যতম রহস্যময় এবং ভয়ংকর অপরাধী Viper অবশেষে CID এর হাতে ধরা পড়েছে—এই খবর মুহূর্তের মধ্যেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু কেউ তখনও জানত না, বহু বছর আগে মৃ/ত বলে ধরে নেওয়া একটি মেয়েই আসলে সেই ভয়ংকর অপরাধী।
ভাইপার ওরফে নূজহাত হিয়া।
CID-এর স্পিডবোটগুলো যখন হেডকোয়ার্টারের নির্ধারিত জেটির কাছে পৌঁছাল, ততক্ষণে সেখানে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। কয়েক মিনিট আগেও অভিযানের খবর শুধু CID-এর সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু ভাইপারের গ্রেপ্তারের খবর এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। জেটির বাইরে একের পর এক নিউজ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে, সাংবাদিক ও ক্যামেরাপারসনদের ভিড়ে পুরো এলাকা ঘিরে গেছে। বিভিন্ন চ্যানেলের সাংবাদিকরা লাইভে দাঁড়িয়ে রিপোর্ট করছেন, কেউ কেউ আবার দূর থেকে CID এর জেটির দিকে ক্যামেরা তাক করে অপেক্ষা করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের অন্যতম রহস্যময় ও ভয়ংকর অপরাধী ভাইপার অবশেষে CID-এর হাতে ধরা পড়েছে—এই খবর ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজে পরিণত হয়েছে।
স্পিডবোটটি জেটিতে থামতেই কয়েকজন সশস্ত্র CID সদস্য দ্রুত নেমে চারপাশ নিরাপদ করে নিল। এরপর লিওন উঠে দাঁড়িয়ে হিয়ার দিকে তাকাল। হিয়ার দুই হাত তখনও পেছনে হ্যান্ডকাফে বাঁধা। নদীর পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে তার চুল ও পোশাক ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে, অথচ তার মুখে ক্লান্তি বা ভয়ের কোনো ছাপ নেই। যেন কয়েক মিনিট আগে সে গ্রেপ্তার হয়েছে এই সত্যিটাই তার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
একজন অফিসার এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল, “স্যার, মিডিয়া পুরো জেটি ঘিরে ফেলেছে। ওকে সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া নিরাপদ হবে না।”
লিওন চারপাশে একবার তাকিয়ে বলল, “সার্ভিস করিডোর দিয়ে নিয়ে চলো। মিডিয়ার সামনে ওকে থামানো যাবে না।”
দুইজন অফিসার হিয়াকে মাঝখানে রেখে এগিয়ে গেল। তারা যতই দ্রুত তাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুক, বাইরে থেকে সাংবাদিকদের প্রশ্ন একের পর এক ভেসে আসছিল—“ভাইপারকে কি সত্যিই গ্রেপ্তার করা হয়েছে? তার আসল পরিচয় কি CID নিশ্চিত করেছে? সে কি সত্যি ভাইপার? সিআইডি কি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য পেয়েছে?”
কিন্তু হিয়া কারও দিকে তাকাল না। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে বাইরে পুরো পৃথিবী তাকে নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে।
লিওন কিছুটা দূর থেকে হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। এই নারীকে সে যতটা চিনেছে বলে মনে করেছিল, আজকের পর তার সেই ধারণার প্রতিটি অংশই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সাত বছর আগে মৃ,ত বলে ধরে নেওয়া একটি মেয়ে কীভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের অন্যতম ভয়ংকর অপরাধী হয়ে উঠল, কোথায় ছিল এতগুলো বছর, কার সঙ্গে ছিল এবং কীভাবে ভাইপার নামে পুরো একটা অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তরই এখনো তার কাছে নেই। তবে সে এটুকু জানে, হিয়া নিজের ইচ্ছায় কোনো উত্তর দেবে না।
কিছুক্ষণ পর হিয়াকে CID হেডকোয়ার্টারের ভেতরের একটি সুরক্ষিত কাস্টডি রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। কক্ষটির বাইরে দুজন সশস্ত্র অফিসার পাহারায় দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে ঢোকার পর একজন অফিসার তার হ্যান্ডকাফ পরীক্ষা করে তাকে একটি চেয়ারে বসিয়ে দিল। ঘরের একপাশে থাকা ক্যামেরাটি পুরো সময় তাদের ওপর নজর রাখছিল। হিয়া চুপচাপ বসে রইল, আর কয়েক মিনিট পর দরজা খুলে তিনজন CID অফিসার ভেতরে ঢুকল।
তাদের মধ্যে মাঝবয়সি একজন অফিসার টেবিলের ওপর একটি মোটা ফাইল রেখে হিয়ার বিপরীতে বসে ফাইলটি খুলল। কয়েক সেকেন্ড হিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে বলল,
“নূজহাত হিয়া। সাত বছর আগে তোমার পুরো পরিবারকে মৃ/ত ঘোষণা করা হয়েছিল। সরকারি নথিতে তোমার নামও মৃ/তদের তালিকায় ছিল। অথচ আজ তুমি আমাদের সামনে ভাইপার হিসেবে বসে আছো। গত সাত বছর তুমি কোথায় ছিলে?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।
অফিসার আবার প্রশ্ন করল, “কার সঙ্গে ছিলে? কীভাবে এতগুলো বছর পুলিশের চোখের আড়ালে ছিলে? আর কীভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের এত বড় একটা নেটওয়ার্ক তোমার নিয়ন্ত্রণে চলে গেল?”
হিয়া এবারও চুপ করে রইল। অফিসার ফাইলের কয়েকটি পৃষ্ঠা উল্টে বলল,
“তোমার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। অস্ত্র পাচার, অবৈধ অর্থের লেনদেন, অপহরণ, হ/ত্যাকাণ্ড এবং বিভিন্ন আন্ডারওয়ার্ল্ড সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। কিন্তু আমরা শুধু এসব অপরাধের ব্যাপারে জানতে চাই না। আমরা জানতে চাই, এই পুরো নেটওয়ার্কের পেছনে আসলে কারা আছে।”
হিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
অফিসার কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে এবার বলল,
“দানিয়েল।”
নামটা উচ্চারণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিয়ার চোখে এক মুহূর্তের জন্য সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল। কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখ আবার আগের মতো নির্লিপ্ত হয়ে গেল।
অফিসার সেই ক্ষীণ প্রতিক্রিয়াটাও লক্ষ্য করল। তারপর সে সামান্য সামনে ঝুঁকে বলল, “দানিয়েল আসলে কে?”
হিয়া কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল, “আমি জানি না।”
অফিসারের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। সে ফাইলটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল।
“তুমি ভাইপার। তোমার মুখ থেকে জানি না শুনে আমরা বিশ্বাস করব?”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটে উঠল।
“বিশ্বাস করা না করা আপনাদের ব্যাপার।”
কক্ষের ভেতর কয়েক মুহূর্তের জন্য কেউ কোনো কথা বলল না। অফিসার বুঝতে পারল, সাধারণ জেরা করে এই নারীকে ভাঙা যাবে না।
অফিসারটি কিছুক্ষণ হিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে ফাইলটা আবার খুলল। তার কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠল।
“তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কাছে যতগুলো অভিযোগ আছে, সেগুলোর একটাও ছোট নয়। কিন্তু তুমি এখানে বসে এমনভাবে আচরণ করছ, যেন কিছুই ঘটেনি। তাই শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি—দানিয়েল কোথায় তার আসল পরিচয় কি?”
হিয়া চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। তার চোখে কোনো আতঙ্ক দেখা গেল না। বরং প্রশ্নটা শুনে সে শান্তভাবেই বলল, “বললাম তো আমি জানি না এক কাথা বারবার আমি রিপিট করিনা।”
অফিসার টেবিলে হাত চাপড়ে উঠল। “মিথ্যা বলবে না!”
হিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। “আপনারা আমাকে গ্রে*প্তার করেছেন। জেরা করছেন। যা জানতে চান জিজ্ঞেস করুন। কিন্তু এমন কোনো প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না, যার উত্তর আমি দিতে ইচ্ছুক না।”
“তুমি বুঝতে পারছ তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ?” অফিসার রেগে জিজ্ঞেস করলো।
“অবশ্যই।” হিয়া সংক্ষিপ্ত ভাবে জবাব দিলো।
“তাহলে এটাও বুঝে রাখো, মুখ না খুললে পরিস্থিতি তোমার জন্য আরও কঠিন হবে।”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বলল, “আমার পরিস্থিতি এর চেয়ে কঠিন করার মতো আর কী আছে?”
কথাটা শুনে কক্ষের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল। অফিসারটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর ফাইলের একটা ছবি বের করে হিয়ার সামনে রাখল। ছবিটা ছিল একটি অপরাধস্থলের। হিয়া একবার ছবিটার দিকে তাকিয়েই আবার চোখ সরিয়ে নিল।
“এটা তোমার লোকজনের কাজ।”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।
“তুমি নির্দেশ দিয়েছিলে। অফিসার পুনরায় প্রশ্ন করলো।
হিয়া তখনও নীরব হয়ে বসে থাকলো মাথা উঁচু করে।
অফিসার আরো একবার প্রশ্ন করলো। “দানিয়েলের সঙ্গে তোমার যোগাযোগের প্রমাণও আমাদের কাছে আছে।”
এবার হিয়া ধীরে ধীরে ছবিটার দিকে তাকাল। “প্রমাণ থাকলে আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
অফিসার কিছু বলার আগেই পাশের একজন অফিসার উত্তেজিত হয়ে উঠল। “তুমি নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবছ, তাই না?”
হিয়া তার দিকে তাকিয়ে বললো “না। আমি শুধু জানি, কখন কথা বলতে হয় আর কখন চুপ থাকতে হয়।”
অফিসারটি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে চেয়ার থেকে উঠে হিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। “তোমার এই অহংকার বেশিক্ষণ থাকবে না।”
হিয়া এবারও একটুও নড়ল না। শুধু জবাব দিলো “দেখা যাবে।”
জেরার কক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি চললেও হিয়ার কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য বের করা গেল না। দানিয়েলের নাম বারবার সামনে আনা হয়েছে, তার অতীতের বিভিন্ন অপরাধের প্রমাণ দেখানো হয়েছে, এমনকি গত সাত বছর কোথায় ছিল সে সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর হিয়া একইভাবে এড়িয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত উপস্থিত CID অফিসাররা বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে আর কোনো লাভ হচ্ছে না। তারা ফাইলগুলো গুছিয়ে নিয়ে একে একে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে একজন অফিসার কাস্টডিতে থাকা পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দিয়ে গেল, “ওর ওপর নজর রাখবেন। কোনোভাবেই যেন বাইরে যোগাযোগ করতে না পারে।”
দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কক্ষের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। হিয়া চেয়ারে বসে রইল। দুই হাত এবার সামনে থেকে হ্যান্ডকাফে বাঁধা, তবুও তার মুখে কোনো অসহায়ত্বের ছাপ নেই। সামনে থাকা পুলিশ সদস্যদের দিকে সে একবার তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর একজন পুলিশ অফিসার হিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। এতক্ষণ ধরে CID অফিসারদের সামনে চুপচাপ থাকা লোকটার মুখে এবার অন্যরকম একটা তাচ্ছিল্য ফুটে উঠল। সে ঠান্ডা গলায় বলল, “তোর বাবা তো একটা টেরোরিস্ট ছিল।”
হিয়ার চোখ ধীরে ধীরে তার দিকে উঠল।
লোকটা থামল না। বরং আরও বিদ্রূপের সঙ্গে বলল, “আর তুই তারই মেয়ে। শেষ পর্যন্ত সেটাই প্রমাণ করলি।”
হিয়ার মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে গেল।
“সিআইডি অফিসার হয়েও আইনের সঙ্গে বেইমানি করেছে তোর বাবা। আর তুই তো তার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে গেছিস।”
হিয়া এবার সম্পূর্ণভাবে তার দিকে তাকাল। এতক্ষণ যে মেয়েটা কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, তার চোখের সেই নীরবতা মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।
পুলিশ অফিসারটা হেসে বলল, “বাপ যেমন, মেয়েও তেমন। শালা—”
বাকিটা শেষ করার আগেই হিয়া চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। হ্যান্ডকাফে বাঁধা দুই হাত থাকা সত্ত্বেও তার শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হলো না। পরের মুহূর্তে সে পা তুলে সজোরে অফিসারটির বুকে লাথি মারল। লোকটা কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।
“তুই—!”
সে উঠে দাঁড়ানোর আগেই হিয়া তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। হ্যান্ডকাফে বাঁধা হাত দুটো ব্যবহার করে অফিসারের গলার চারপাশে পেঁচিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। লোকটা হঠাৎ শ্বাস নিতে না পেরে ছটফট করতে শুরু করল।
“ছাড় ওকে!”
অন্য পুলিশ সদস্যরা দ্রুত এগিয়ে এলো। কিন্তু হিয়া তাকে ছাড়ল না। তার চোখে তখন কোনো দ্বিধা নেই। যে মানুষটা কয়েক সেকেন্ড আগে তার বাবাকে অপমান করেছে, তার প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতিও তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই।
দুজন পুলিশ একসঙ্গে হিয়াকে সরানোর চেষ্টা করতেই সে শরীর ঘুরিয়ে একজনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। আরেকজন তাকে ধরে ফেলতে এগিয়ে আসতেই হিয়া মাথা দিয়ে তাকে আঘাত করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কাস্টডি রুমের পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল।
“ওকে থামাও!”
আরও কয়েকজন পুলিশ ছুটে এসে হিয়াকে পেছন থেকে চেপে ধরল। হিয়া তবুও ছটফট করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত একাধিক পুলিশ মিলে তাকে মাটিতে নামিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলো।
কয়েক মুহূর্ত পর কক্ষটা আবার শান্ত হলো। একজন অফিসার মেঝেতে পড়ে কাশছে, আর দুজন আহত অবস্থায় নিজেদের সামলানোর চেষ্টা করছে। হিয়া তখনও কয়েকজন পুলিশের হাতে আটকে আছে। তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে, কিন্তু চোখে সেই একই কঠিন দৃষ্টি।
ঘটনাটা সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হলো। কিছুক্ষণ পর কাস্টডি রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হলো।
“সাধারণ কাস্টডিতে ওকে রাখা যাবে না।”
“জেরার সময়ও কোনো সহযোগিতা করছে না।”
“উল্টো অফিসারদের ওপর হা/মলা করেছে।”
একজন কর্মকর্তা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “রিমান্ডের আবেদন করতে হবে।”
আরেকজন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। ওর কাছ থেকে তথ্য বের করতে হলে কাস্টডি রিমান্ডই এখন একমাত্র উপায়।”
সেই সময়েও হিয়াকে নিয়ে বাইরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। কারণ CID এর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার খবর ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে যার কোনো নিশ্চিত ছবি, আসল পরিচয় কিংবা চেহারা কেউ প্রকাশ্যে দেখেনি, সেই রহস্যময় ভাইপার অবশেষে ক্যামেরার সামনে। আর এই গ্রেপ্তারের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে একজন মানুষ—
সিআইডি অফিসার লিওনার্দো হায়াস।
কাস্টডি রুমের ঘটনাটা সঙ্গে সঙ্গে সিআইডির এসিপিকে জানানো হলো। আহত পুলিশ সদস্যদের অবস্থা এবং হিয়ার আচরণের পুরো ঘটনা শোনার পর এসিপি আর দেরি করলেন না। তিনি হিয়াকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করলেন।
আবেদনের প্রক্রিয়া শেষ হতে খুব বেশি সময় লাগল না। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই হিয়ার রিমান্ড কার্যকর হলো। কাস্টডি থেকে তাকে বের করে রিমান্ডের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। হিয়ার মুখে তখনও কোনো ভয় নেই, কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ইচ্ছাও নেই। সে জানে, সামনে আরও জেরা অপেক্ষা করছে। কিন্তু দানিয়েলের ব্যাপারে তার মুখ থেকে একটি শব্দও বের করা যাবে না।
অন্যদিকে, লিওন তখনও জানে না হিয়াকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
সিআইডির অভিযানের পর মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে সে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধী ভাইপারকে গ্রেপ্তার করার অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ায় ইতিমধ্যেই পুরো মিডিয়াজুড়ে লিওনের প্রশংসা শুরু হয়ে গেছে।
সাংবাদিকরা একের পর এক প্রশ্ন করছিলেন—
“অফিসার লিওন, কীভাবে আপনি ভাইপারের অবস্থান শনাক্ত করলেন?”
“এত বছর ধরে যাকে কেউ ধরতে পারেনি, তাকে গ্রেপ্তার করার পেছনে আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?”
লিওন শান্তভাবেই তাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল।
টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি সেই ইন্টারভিউ দেখানো হচ্ছিল। আর সেই পর্দার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল দানিয়েল।
লিওনের মুখটা টেলিভিশনের পর্দায় দেখার সঙ্গে সঙ্গে দানিয়েলের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা না বলে পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ পাশের ফুলদানিটা তুলে পুরো শক্তি দিয়ে টেলিভিশনের ওপর ছুড়ে মারল। ঝনঝন করে কাঁচ ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত ভাঙা টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
“ড্যাম ইট।”
সে ঘুরে দাঁড়াল।
“আমার প্রাইভেট জেট রেডি করো।”
একজধ গার্ড সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
দানিয়েল আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। তার গন্তব্য এবার একটাই—লন্ডন।
হিয়াকে ঠান্ডা, ঘুটঘুটে অন্ধকার কংক্রিটের চার দেওয়ালের সেই প্রিজন কাস্টাডি সেলে নিয়ে আসার পর প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই ইন্টেরোগেশন বা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। রুমের একপাশে মেটাল টেবিল আর ফ্লাডলাইটের তীব্র আলো সরাসরি হিয়ার মুখের ওপর ফেলা হয়েছে।
“দানিয়েল এখন কোথায়?”—সামনে বসা অফিসারের গম্ভীর গলাটা প্রতিধ্বনিত হলো।
হিয়া নির্বিকার মুখে চুপচাপ বসে রইল।
“তার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করো?”
কোনো উত্তর নেই। হিয়ার চোখ দুটো তখনো স্থির।
“ওর পরবর্তী টার্গেট কি?”
হিয়া এবারও সম্পূর্ণ নীরব।
কর্মকর্তা কয়েক মুহূর্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় বললেন, “শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি দানিয়েল কোথায় তার আসল পরিচয় কি?”
হিয়া ধীরে ধীরে চোখ তুলল। তার শুকনো ঠোঁটের কোণে সামান্য এক ফালি ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটল।
“জানি না।”
আর ঠিক এর পরেই শুরু হলো লন্ডনের প্রটোকল মেনে চলা সেই একটানা, সুশৃঙ্খল অথচ নিষ্ঠুর রিমান্ডের মারধর ও মানসিক শারীরিক যন্ত্রণার এক ঘণ্টার দীর্ঘ অধ্যায়।
লন্ডনের অফিশিয়াল প্রিজনে সরাসরি ক্যাজুয়াল থার্ড ডিগ্রি বা বর্বরোচিত মা/রধর হয়তো সরাসরি ক্যামেরার সামনে করা হয় না, কিন্তু সেখানে এমন কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় যা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। রিমান্ডের সেই নিয়মতান্ত্রিক নিয়মের অংশ হিসেবে প্রথমে তাকে ফ্লাডলাইটের নিচে একটানা দাঁড়িয়ে রাখার শাস্তি দেওয়া হলো। দীর্ঘক্ষণ হাতকড়া দিয়ে মেটালের ফিক্সড চেয়ারের সঙ্গে তাকে এমনভাবে আটকে রাখা হলো, যাতে মাংসপেশিতে অবশ ভাব ধরে যায়।
এরপর শুরু হলো সাইকোলজিক্যাল প্রেশার এবং প্রিসাইজ ফিজিক্যাল ট/র্চার।
একজন অফিসার এসে টেবিলের ওপর ভারী ফাইল সজোরে আছড়ে ফেলল। অন্যজন এসে হিয়ার কানের কাছে প্রচণ্ড জোরে বাঁশি যেটা অ্যালার্মের মতো তীব্র শব্দ বাজাতে লাগল, যাতে তার ব্রেন সেন্স কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তারপর শুরু হলো দীর্ঘ টানটান জেরা—একটার পর একটা তীক্ষ্ণ প্রশ্ন, সাথে প্রচন্ড ধমক, কলার ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়া।
শরীরের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে প্রফেশনাল ইন্টেরোগেশন মেথডে এমন নিখুঁত চাপ সৃষ্টি করা হলো যা বাইরের কোনো বড় জখম রাখে না, কিন্তু হাড়ের সংযোগস্থল ও স্নায়ুতে তীব্র যন্ত্রণা তৈরি করে। হিয়ার দুই হাতের কবজিতে মেটালের হাতকড়া আরও শক্ত করে চেপে বসিয়ে দেওয়া হলো, যার ফলে চামড়া লাল হয়ে রক্ত জমে যাওয়ার উপক্রম হলো। পেটে ও পাঁজরে কোনো দৃশ্যমান ভারী আঘাত বা দাগ না রেখেও এমন সুনির্দিষ্ট প্রেশার পয়েন্টে আঘাত করা হলো, যাতে প্রতিটা শ্বাসে তার বুক চিরে তীব্র যন্ত্রণা বয়ে যায়।
একটানা এক ঘণ্টা ধরে চলল এই চাপ প্রয়োগ, স্লিপলেস জেরা আর শরীরের সহ্যক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা।
এত কিছুর পরও হিয়ার মুখ থেকে একটি শব্দও বের হলো না। তাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলার এই নিয়মতান্ত্রিক চেষ্টা চলল টানা ষাট মিনিট ধরে, কিন্তু সে নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়ল না।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এই ক্লান্তিকর ও নিষ্ঠুর রিমা/ন্ডের পরও দেখা গেল পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।
হিয়া মাথা নিচু করে বিধ্বস্ত অবস্থায় স্টিলের চেয়ারে বসে রইল; তার চুলগুলো এলোমেলো, ঠোঁটের কোণ সামান্য কাটা ও শুকিয়ে যাওয়া রক্ত, চোখে ক্লান্তির ছাপ অথচ দৃষ্টি এখনও আগের মতোই ইস্পাতকঠিন।
অফিসার ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন,“তোকে যতই জিজ্ঞেস করি, তুই কিছু বলবি না?”
হিয়া ধীরে মাথা তুলল। তার ফ্যাকাশে ঠোঁটে আবারও সেই পরিচিত অবাধ্য হাসি ফুটে উঠল। সে খুব স্পষ্ট ও দৃঢ় গলায় বলল, “মেরে ফেললেও একটা কথাও বলব না।”
রুমটা কয়েক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ফ্লাডলাইটের আলোয় অফিসারদের চোখে স্পষ্ট ভীতি আর বিস্ময় ফুটে উঠল কারণ তারা বুঝতে পেরে গেল, লন্ডনের এই কঠোরতম কাস্টাডির রিমান্ড আর নিয়মতান্ত্রিক নি*র্যাতনও হিয়াকে ভয় দেখিয়ে বা ভেঙে দানিয়েলের তথ্য বের করার জন্য যথেষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত তাকে আবার কাস্টডিতে ফিরিয়ে আনা হলো।
অন্যদিকে, লিওন তখনও মিডিয়ার সামনে ব্যস্ত। ভাইপারকে গ্রে/প্তারের পর পুরো লন্ডনের সংবাদমাধ্যমে তাকে ঘিরে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। এত বছর ধরে যার পরিচয় কেউ জানতে পারেনি, সেই নূজহাত হিয়া অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে—এটাই তখন প্রধান খবর।
কিছুক্ষণ পর হিয়াকে ইন্টারভিউ রুমে নিয়ে আসা হলো। রুমের ভেতরে কয়েকজন CID কর্মকর্তা আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। হিয়ার দুই হাত তখনও হ্যান্ডকাফে বাঁধা। তাকে চেয়ারে বসানো হলো।
একজন অফিসার ফাইল খুলে সামনে রাখলেন।
“দানিয়েল সম্পর্কে তুমি যা জানো, সেটা আমাদের বলবে।”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।
অফিসার আবার প্রশ্ন করলেন, “রিমান্ডেও তুমি একটা কথাও বলোনি। এখনো কি একই সিদ্ধান্ত?”
হিয়া ধীরে চোখ তুলল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো “হ্যাঁ।”
এরপর অফিসার নোভা টেবিলের ওপর রাখা পানির বোতলটা নিয়ে হিয়ার দিকে এগিয়ে দিল।
“পানি খেয়ে ভালোই ভালোই উত্তর দাও।”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড বোতলটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ সেটি নিয়ে পুরো পানিটা নোভার মুখের ওপর ছুড়ে মারল। রুমের সবাই চমকে উঠল।
নোভা চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মুখ মুছে হিয়ার দিকে তাকাল। হিয়ার চোখে তখন তীব্র বিদ্রূপ। নোভাকে সে চিনেছে। কয়েকদিন আগের সেই দৃশ্যটা তার মনে পড়ে গেল লিওনের পাশে বসে নোভার হাসতে হাসতে কথা বলা। সেই দৃশ্যটা তখন থেকেই হিয়ার মনে তীব্র জেলাসির একটা কারণ হয়ে ছিল।
নোভা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে এগিয়ে এসে হিয়ার গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। হিয়ার মুখটা একপাশে ঘুরে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর সে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিল। হিয়ার চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। একে একে রুমে থাকা প্রত্যেকের দিকে তাকাল সে।
এদিকে হিয়াকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিলো সেই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লিওন দ্রুত সিআইডি হেডকোয়ার্টারে ফিরে এল। সরাসরি এসিপির কক্ষে ঢুকে উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করল,— “ওকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিলো?”
এসিপি শান্তভাবে বললেন, “হ্যাঁ। জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন অফিসারকে গুরুতরভাবে আহত করেছে। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে আরও কয়েকজন অফিসারও আহ/ত হয়েছে। তাই রিমান্ডে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।”
লিওনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “কিন্তু আমাকে জানানো হলো না কেন?”
“তুমি তখন মিডিয়ার সামনে ছিলে। পরিস্থিতি খুব দ্রুত খারাপ হয়ে গিয়েছিল, তাই তোমাকে জানানোর সুযোগ পাওয়া যায়নি।”
লিওন আর কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত এসিপির দিকে তাকিয়ে থেকে ঘুরে বেরিয়ে গেল। তার পায়ের গতি তখন আগের চেয়ে দ্রুত হলো। ইন্টারভিউ রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ গিয়ে থামল হিয়ার ওপর।
মেটাল চেয়ারে বসে আছে হিয়া। রিমান্ডের আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে আছে তার মুখে। এলোমেলো চুলের ফাঁকে কপালে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ, ঠোঁটের একপাশেও আঘাতের চিহ্ন। তার চোখেমুখে তখনও তীব্র রাগ। নোভার দিকে তাকিয়ে থাকা দৃষ্টিতে ছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ।
ঠিক তখনই দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা লিওনের দিকে তার নজর পড়লো। লিওনকে দেখতেই হিয়ার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। কয়েক মুহূর্ত আগেও রাগে কঠিন হয়ে থাকা চোখ দুটো মুহূর্তেই কোমল হয়ে এলো। সেখানে ফুটে উঠল তীব্র ভালোবাসা, গভীর টান আর অবসেশন। মুখের কঠোরতাও মিলিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল মৃদু হাসি।
হিয়া একদৃষ্টিতে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ আগের রাগের কোনো চিহ্ন তখন তার মুখে নেই। লিওনকে দেখার পর তার চোখে শুধু ভালোবাসা আর কোমলতা।
লিওনও কয়েক মুহূর্ত হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। রিমান্ডের পর তার এমন আহত মুখটা দেখে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। হিয়াকে এই অবস্থায় দেখার পর তার ভালো লাগছিল না। কিন্তু এই অনুভূতিটা কেন হচ্ছে, তার কোনো উত্তর লিওনের নিজের কাছেও ছিল না। একজন সিআইডি অফিসার হিসেবে একজন অভিযুক্তের জন্য এমন কষ্ট অনুভব করার কথা নয় মোটেও। তবুও হিয়ার মুখের আঘাতের দাগগুলো থেকে চোখ সরাতে পারছিল না সে।
কোনো কথা না বলে লিওন টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল। পানির বোতলটা হাতে নিয়ে একটা গ্লাসে পানি ঢেলে হিয়ার সামনে রাখল।
হিয়া কয়েক মুহূর্ত গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে লিওনের দিকে তাকাল। চোখে তখনও সেই কোমলতা। সে গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে পুরো পানিটা খেয়ে ফেলল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নোভা অবাক হয়ে হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। একটু আগেই নোভা পানি এগিয়ে দিলে হিয়া কোনো কথা না বলে সেই পানি তার মুখে ছুড়ে মেরেছিল। অথচ লিওন পানি দিতেই হিয়া এক মুহূর্তও আপত্তি করল না।
নোভার মুখের বিরক্তি এবার আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। হিয়ার এই আচরণ তার মোটেও ভালো লাগল না। সে কয়েক মুহূর্ত হিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বিরক্ত গলায় বলল,
“ওকে পানি দিচ্ছেন কেন, স্যার?”
লিওন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কেন দেব না?”
নোভা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি যখন পানি দিয়েছিলাম, তখন ও আমার মুখে ছুড়ে মেরেছে।”
লিওন কিছুক্ষণ নোভার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হিয়ার দিকে চোখ ফেরাল। হিয়া তখনও তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই চোখে রাগের কোনো চিহ্ন নেই; বরং লিওনকে দেখার পর তার পুরো আচরণটাই যেন বদলে গেছে।
লিওন ধীরে ধীরে বলল,“সবাই বাইরে যাও।”
রুমের কয়েকজন অফিসার একে অপরের দিকে তাকাল।নোভা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু লিওন এবার আরও দৃঢ় গলায় বলল, “আমি ওর সঙ্গে একা কথা বলতে চাই। জিজ্ঞাসাবাদটা আমি একাই করব।”
কেউ আর আপত্তি করল না। একে একে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে গেল। নোভাও শেষবারের মতো হিয়ার দিকে তাকিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার পর ইন্টারভিউ রুমে শুধু লিওন আর হিয়া রয়ে গেল। হিয়া তখনও তাকিয়ে আছে লিওনের দিকে। তার মুখে সেই কোমল হাসিটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
হিয়া তখনও চেয়ারে বসে ছিল। লিওন ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত হিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সে টেবিলের দিকে একটু ঝুঁকে নিচু গলায় বলল, “এত মার খাওয়ার পরও তথ্য দিচ্ছো না কেন?”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে আবার সেই মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
“কারণ আমি আমার বসের প্রতি লয়াল।”
লিওন সোজা হয়ে দাঁড়াল তারপর বললো “আমি যা যা প্রশ্ন করব, সবকিছুর উত্তর দেবে।”
হিয়া মাথা নেড়ে উত্তর দিলো “আমার বিষয়ে যা যা জানতে চাইবে, সব উত্তর দেব। কিন্তু দানিয়েলের বিষয়ে আমি একটা কথাও বলব না।”
লিওন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা খুলে কয়েকটি কাগজ বের করল।
“তুমি এখন পর্যন্ত পনেরো জনকে হ/ত্যা করেছ।”
হিয়া কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
লিওন ফাইলের পাতায় চোখ রেখে বলল,
“তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা এতটাই নৃ/শংস ছিল যে চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কারও শরীরের অংশও পাওয়া যায়নি। আরও কয়েকজনের কোনো সন্ধানই এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।”
সে এবার সরাসরি হিয়ার চোখের দিকে তাকাল।
“তাদের এভাবে হ/ত্যা করেছ কেন?”
হিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “কারণ তারা রে/পিস্ট ছিল।”
লিওনের চোখে কঠোরতা ফুটে উঠল।
হিয়া ধীরে পুনরায় বললো,
— “একজন ধ*র্ষকের জন্য এর চেয়ে ভালো শাস্তি আর কী হতে পারে?”
লিওন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে ফাইলের আরেকটি পাতা উল্টাল।
“তুমি সাত বছর আগে কীভাবে বেঁচে ফিরেছিলে?”
হিয়ার চোখের দৃষ্টি কয়েক মুহূর্তের জন্য বদলে গেল। তারপর সে শান্ত গলায় বলল, “আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন।”
একটু থেমে সে যোগ করল,
“আসাদ খান আর আয়মানকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। আমার পরিবারকে যারা আমার চোখের সামনে শেষ করে দিয়েছিল, তাদের কাছ থেকে হিসাব নেওয়ার জন্য।”
লিওন এবার ফাইলটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল।
“কিন্তু তোমার বাবা তো নিজেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার কারণেই তো তোমাদের পরিবারের—”
বাক্যটা সম্পুর্ন করার আগেই হিয়া তাকে থামিয়ে দিল।
“ভুল।”
লিওন থেমে গেল।
হিয়ার কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে দৃঢ় হলো।
“আমার বাবা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি সেখানে ডিটেকটিভ হিসেবে ছিলেন। আসাদ খান আমার আপন চাচা হন। আর আয়মান আমার চাচাতো ভাই।”
লিওন চুপ করে শুনছিল সবটা।
হিয়া ধীরে ধীরে কাহিনী তো বলল, “ওরা আমার বাবার সঙ্গে ষ/ড়যন্ত্র করেছিল। আমার পরিবারকে আমার চোখের সামনে হ/ত্যা করেছে। আমাকেও হ/ত্যা করার চেষ্টা করেছিল।”
তার গলা সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু চোখের দৃষ্টি নড়ল না। “ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে গিয়েছিলাম।”
লিওন আর কোনো কথা বলল না। সে শুধু হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটাকে সে যতটুকু দেখেছে, ততটুকুতে একটা বিষয় পরিষ্কার হিয়া কাউকে ভয় পায় না। এমনকি নিজের বিরুদ্ধে থাকা প্রমাণের মুখোমুখি হয়েও তার আচরণে ভয়ের ছাপ নেই। আর মিথ্যা বলারও কোনো কারণ সে এখনো খুঁজে পায়নি।
কিন্তু আজ হিয়ার মুখ থেকে শোনা কথাগুলো তার মাথার ভেতর একটার পর একটা প্রশ্ন তৈরি করে দিল।
তাহলে সাত বছর আগে আসলে কী ঘটেছিল?
হিয়া এবার নিজের অপরাধের হিসাব বলতে শুরু করল নিজে থেকেই।শুধু কয়েকটি হ/ত্যাকাণ্ড নয়—তার অপরাধের তালিকা ছিল অনেক দীর্ঘ। হ/ত্যা, ক্যাসিনো পরিচালনা ও জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকা, অ/বৈধ অস্ত্রের চালান, মা/দক ব্যবসা, চো/রাচালান একটার পর একটা সবকিছুর কথাই সে লিওনের সামনে স্বীকার করে গেল। এই পৃথিবীর অপরাধজগতের এমন খুব কম অপরাধই ছিল, যার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে হিয়ার নাম জড়ায়নি।
লিওন কোনো কথা বলল না। সামনে রাখা নোটপ্যাডে হিয়ার প্রতিটি স্বীকারোক্তি লিখে যেতে লাগল। মাঝে মাঝে কোনো ঘটনার সময়, স্থান কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম জানতে চাইলে হিয়া সেগুলোরও উত্তর দিল। কোথাও থামল না, কোনো তথ্য লুকানোর চেষ্টা করল না।
হিয়া শেষ পর্যন্ত নিজের সব অপরাধের কথা বলে চুপ করে গেল। লিওন ধীরে ধীরে কলমটা নামিয়ে তার দিকে তাকাল। এতগুলো অপরাধ নিজের মুখে স্বীকার করার পরও হিয়ার চোখে কোনো ভয় নেই।
লিওন নিচু গলায় বলল,
“তুমি জানো, নিজের মুখে এগুলো স্বীকার করলে তোমার বিরুদ্ধে কতগুলো মা/মলা দাঁড়াবে?”
হিয়া কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।
“জানি।”
লিওন হালকা হেসে তারপর বলল,
“নিজের বিরুদ্ধে এতগুলো অপরাধের কথা তুমি এত সহজে বলে দিলে?”
হিয়ার ঠোঁটের কোণেও মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে লিওনের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“তোমার কাছে আমার কোনো বিষয় আমি সিক্রেট রাখতে চাই না, বাজপাখি।”
লিওন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। হিয়ার বলা শেষ কথাগুলো নোট করার পর ফাইলটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে দানিয়েলের ব্যাপারে বলো। ওর আসল পরিচয় কী? কোথায় থাকে, কীভাবে যোগাযোগ করো ওর সাথে, ওর সম্পর্কে যা যা জানো সব বলো।”
হিয়ার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে শান্তভাবে মাথা নাড়ল।
“না।”
লিওনের চোখ সরু হয়ে এলো।
“তুমি বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো। অথচ আমার কাছে দানিয়েলের একটা তথ্যও দিতে পারছ না?”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে আবার সেই আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল।
“তুমি চাইলে এই মুহূর্তে আমাকে খেয়েও ফেলতে পারো। কিন্তু আমার দানিয়েলের প্রতি আমার লয়ালিটি ভাঙতে পারবে না।”
লিওন ভ্রু কুঁচকে ফেলল। “আবার অসভ্যের মতো কথা বলছ।”
হিয়া এবার সামান্য সামনে ঝুঁকে তার চোখের দিকে তাকাল।
“অফিসার লিওন, আপনি প্রফেশনালি প্রশ্ন না করে হঠাৎ পার্সোনাল কথা বললেন। আমি আপনাকে ভালোবাসি কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করে আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলও করলেন। তাই আমিও অসভ্যের মতো উত্তর দিলাম।”
তার চোখের দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
“দরকার পড়লে অসভ্যতাও করব।”
কথা বলতে বলতে হিয়ার চোখের পাতা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছিল। এক ঘণ্টার রিমান্ডের ধকল তার শরীরকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। এতক্ষণ শুধু নিজের জেদ আর মানসিক শক্তি দিয়ে সে নিজেকে ধরে রেখেছিল, কিন্তু এবার সেই শক্তিটুকুও শেষ হয়ে আসলো।
লিওন আরও কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য মুখ খুলতেই হিয়ার চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই তার শরীরটা মেটাল চেয়ার থেকে একদিকে হেলে পড়ল।
লিওন দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলল। হিয়ার মাথাটা এসে ঠেকল তার বুকে। কোনো সাড়া না পেয়ে সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। হিয়াকে কোলে তুলে নিল। তারপর ইন্টারভিউ রুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো।
বাইরে থাকা অফিসারদের কথাবার্তা মুহূর্তেই থেমে গেল। সবাই একসঙ্গে লিওনের দিকে তাকাল। তার কোলে অচেতন হিয়া।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেউ যেন বুঝতেই পারল না, তারা কী দেখছে। যাকে কয়েক ঘণ্টা আগেও একজন বিপজ্জনক আন্তর্জাতিক অপরাধী হিসেবে গ্রেপ্তার করে আনা হয়েছে, সেই হিয়াকেই লিওন নিজের কোলে করে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।
একজন নারী সিআইডি অফিসার দ্রুত এগিয়ে এসে বলল, “স্যার, ওকে আমাদের কাছে দিন। আমরা মেডিকেল টিমের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”
লিওন থামল না। উল্টো গম্ভীর স্বরে বললো
“Move.”
নোভাও দ্রুত এগিয়ে এসে বলল, “স্যার, আমাদের কাছে দিন। আমরা নিয়ে যাচ্ছি।”
লিওন এবার নোভার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল “I said, move.”
নোভা আর কোনো কথা বলল না।
লিওন হিয়াকে কোলে নিয়েই করিডোর ধরে এগিয়ে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসাররা কেউ কথা বলল না। সবাই শুধু অবাক হয়ে তার চলে যাওয়া দেখল।
কারণ একজন সিআইডি অফিসার হিসেবে একজন অভিযুক্তকে এভাবে নিজের কোলে তুলে নিয়ে মেডিকেল টিমের কাছে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য তাদের কাছে স্বাভাবিক ছিল না।
আর লিওন নিজেও তখন বুঝতে পারছিল না, হিয়ার এই অবস্থাটা দেখে তার ভেতরে এতটা অস্থিরতা কেন তৈরি হয়েছে।
এদিকে লন্ডনের অন্য প্রান্তে, একটি প্রাইভেট জেট ধীরে ধীরে রানওয়েতে অবতরণ করল। দরজা খুলতেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল দানিয়েল। এরই মধ্যে হিয়ার গ্রেপ্তারের খবর পুরো লন্ডনে ছড়িয়ে পড়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিটি চ্যানেলে এখন একই খবর—কুখ্যাত আন্তর্জাতিক অপরাধী ভাইপার গ্রেপ্তার হয়েছে। সাত বছর পর তার আসল পরিচয় প্রকাশ্যে এসেছে, আর সেই পরিচয় ঘিরে শুরু হয়েছে আরও বড় আলোচনা।
কেউ হিয়াকে নিয়ে কথা বলছে, কেউ তার বাবা ইশতিয়াক খানকে নিয়ে পুরোনো অভিযোগগুলো টেনে আনছে। আবার কেউ বলছে, এত বছর ধরে পুলিশের চোখের সামনে থেকেও কীভাবে একজন নারী এত বড় অপরাধজগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই আলোচনা।
“ভাইপার গ্রেপ্তার হয়েছে!”
“সাত বছর ধরে পুলিশ যাকে খুঁজছিল, সে আসলে ইশতিয়াক খানের মেয়ে!”
“অফিসার লিওন অবশেষে তাকে গ্রেপ্তার করেছে!”
টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে হিয়ার গ্রেপ্তারের খবরের পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় উঠে এলো একটি নাম—দানিয়েল।
সাংবাদিকরা তার পুরোনো অপরাধের তথ্য সামনে আনতে শুরু করল। তার কোনো নির্ভরযোগ্য ছবি নেই, পরিচয় নিয়ে রয়েছে অসংখ্য রহস্য, অথচ আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে বছরের পর বছর। একজন সংবাদ বিশ্লেষক বলল,
“কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই দানিয়েল আসলে কে? এত বছর ধরে যার নাম আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, অথচ যার মুখ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কেউ দেখেনি, তার পরিচয় এতটা রহস্যময় কেন?”
অন্য একটি চ্যানেলে আলোচনায় উঠে এলো আরও ভয়ংকর তথ্য।
“তাকে বলা হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাট। কিন্তু তার সাম্রাজ্য কোথায়, তার নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, কিংবা সে বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছে এমন প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনো কারও কাছে নেই।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হলো তুমুল আলোচনা।
“দানিয়েল আসলে কে?”
“ভাইপারের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?”
“একজন আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল এত বছর ধরে পুলিশের চোখ এড়িয়ে কীভাবে রয়ে গেল?”
কেউ লিখল,“ভাইপারকে নিয়ে যতটা জানা গেল, দানিয়েলকে নিয়ে তার এক শতাংশও জানা যায়নি।”
আরেকজন লিখল,
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৫
“লোকটার ছবি পর্যন্ত নেই, অথচ পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার নাম শুনলেই মানুষ ভয় পায় এটা কীভাবে সম্ভব?”
লন্ডনের মানুষ তখন শুধু প্রশ্ন করছিল—
দানিয়েল আসলে কে? কিন্তু কেউ জানত না, যে মানুষটাকে নিয়ে তারা টেলিভিশনের পর্দায় আলোচনা করছে, সেই মানুষটিই ইতিমধ্যে এই শহরে এসে পৌঁছেছে।
