আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৬
সাবিলা সাবি
লন্ডনের মাটিতে পা রাখার পর দানিয়েল আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না।
হিয়ার গ্রেপ্তারের খবর ইতিমধ্যেই পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এখন একটাই আলোচনা, বহু বছর ধরে রহস্য হয়ে থাকা ভাইপার অবশেষে ধরা পড়েছে। আর সবচেয়ে বড় চমক, ভাইপার কোনো পুরুষ নয়; সে একজন নারী। যার আসল নাম ‘নূজহাত হিয়া’।
দানিয়েল এসব কোনো কিছুর প্রতিক্রিয়াই দেখাল না।
তার গাড়ি সরাসরি শহরের একটি সুরক্ষিত অফিস ভবনের সামনে এসে থামল। কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী দ্রুত এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিল।
দানিয়েল ভেতরে ঢুকতেই তার ব্যক্তিগত আইনজীবী উঠে দাঁড়ালেন। টেবিলের ওপর ইতিমধ্যে কয়েকটি ফাইল ছড়িয়ে রাখা হয়েছে।
দানিয়েল বসার আগেই প্রশ্ন করল,
“কী অবস্থা?”
আইনজীবী গম্ভীর মুখে বললেন,
“ভাইপারকে এখনো কাস্টডিতে রাখা হয়েছে। CID খুব দ্রুত তার বিরুদ্ধে কঠোর মামলা সাজানোর চেষ্টা করছে।”
দানিয়েল চেয়ারে বসে শান্তভাবে বলল,
“কী কী অভিযোগ?”
আইনজীবী সামনে থাকা ফাইলটা খুললেন।
“আন্তর্জাতিক অ*স্ত্র ব্যবসা, মা*দক পাচার, হ*ত্যা, অ*পহরণ, চো*রাচালান, অ*বৈধ অর্থের লেনদেন—অভিযোগের তালিকা ছোট নয়।”
দানিয়েল নির্লিপ্তভাবে বলল,
“প্রমাণ?”
আইনজীবী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।”
তিনি কয়েকটি কাগজ আলাদা করে সামনে রাখলেন।
“ভাইপার যেভাবে কাজ করত, তার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ সংগ্রহ করা খুব কঠিন। সে কখনো নিজের কাজের পেছনে এমন কোনো প্রমাণ রেখে যায়নি, যেটা সরাসরি তার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। অনেক ঘটনা নিয়ে গোয়েন্দা রিপোর্ট আছে, সন্দেহ আছে, সাক্ষ্য আছে; কিন্তু আদালতে দাঁড় করানোর মতো প্রত্যেকটি অপরাধের শক্ত প্রমাণ নেই।”
দানিয়েলের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটিয়ে বললো
“ভাইপার এইভাবেই কাজ করে।”
আইনজীবী মাথা নেড়ে তারপর বললেন “কিন্তু একটা সমস্যা আছে।”
দানিয়েলের হাসিটা খানিকটা মিলিয়ে গেল।
“আয়মান খান।”
কক্ষের পরিবেশটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল আইনজীবী ফাইলের আরেকটি অংশ খুলে বললেন,
“আয়মান খানের লা/শ উদ্ধার হয়েছে নদী থেকে। ফরেনসিকেও পাঠানো হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, CID এর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। তারা ভাইপারের আয়মানের সঙ্গে সংঘর্ষ দেখেছে। শেষ পর্যন্ত আয়মানকে গু/লি করেছে ভাইপারই।”
দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
আইনজীবী আরো বললেন, “এই ঘটনাটা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। CID এর কাছে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের তথ্য আছে। তাই শুধু ‘ভাইপারের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই’ বললে কাজ হবে না।”
দানিয়েল এবার ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকল তারপর ভারী কন্ঠে প্রশ্ন করলো “আয়মান সেদিন ওই জাহাজে কী করছিল?”
আইনজীবী ফাইলের দিকে তাকিয়ে বললেন “প্রাথমিক তদন্তে জাহাজে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের চালানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।”
দানিয়েলের চোখে এবার ঠান্ডা একটা দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
“তাহলে সেখান থেকেই শুরু করুন।”
আইনজীবী কিছুটা বিস্মিত হয়ে তাকালেন দানিয়েলের দিকে। তারপর প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন “কীভাবে?”
দানিয়েল শান্ত গলায় বলল, “ফাইলটা এমনভাবে সাজান, যাতে পুরো ঘটনাটা শুধু ‘ভাইপার আয়মানকে হ/ত্যা করেছে’ হিসেবে না দাঁড়ায়।”
সে টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলল,
“আয়মান খান লন্ডন থেকে বাংলাদেশে অ/স্ত্র আর মাদকের চালান নিয়ে যাচ্ছিল।ভাইপার সেই চালানের খবর পেয়ে তাকে আটকাতে জাহাজে ওঠে।”
আইনজীবী মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।
দানিয়েল এবার আরো বলল, “তারপর দুজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আয়মান প্রথমে আ/ক্রমণ করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে নিজের জীবন বাঁচাতে ভাইপার তাকে গু/লি করতে বাধ্য হতে হয়।”
আইনজীবী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “অর্থাৎ আমরা ঘটনাটাকে আত্মরক্ষার পরিস্থিতি হিসেবে উপস্থাপন করব?”
“শুধু উপস্থাপন নয়।”
দানিয়েলের কণ্ঠ এবার আরও দৃঢ় হলো। “জাহাজের প্রতিটি তথ্য বের করুন। সেখানে কী ছিল, কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল, আয়মান কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, চালানের গন্তব্য কোথায় ছিল সবটা।”
আইনজীবী নোট নিতে শুরু করলেন।
দানিয়েল আবার বলল,“ফরেনসিক রিপোর্টও গুরুত্বপূর্ণ হবে। গু/লির দিক, দূরত্ব, আয়মানের অবস্থান সবকিছু খতিয়ে দেখুন। যদি প্রমাণ করা যায় যে ঘটনাটা পূর্বপরিকল্পিত হ/ত্যাকাণ্ড নয়, বরং সংঘর্ষের মধ্যে ঘটেছে, তাহলে CID এর গল্পটাই দুর্বল হয়ে যাবে।”
আইনজীবী ধীরে মাথা নাড়লেন “বুঝেছি।”
কিছুক্ষণ পর তিনি আবার বললেন, “তবে একটা বিষয় আছে। ভাইপারই যে ইশতিয়াক খানের মেয়ে নূজহাত হিয়া, সেটা এখন আর গোপন নেই। এত বছর ধরে ভাইপার আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের অন্যতম পরিচিত নাম। অ*স্ত্র, মা*দক, হ*ত্যা অসংখ্য অপরাধের সঙ্গে এই নাম জড়িয়ে আছে। এতদিন শুধু কেউ জানত না ভাইপার আসলে কে। এখন যখন প্রমাণ হয়েছে নূজহাত হিয়াই ভাইপার, আদালত স্বাভাবিকভাবেই তার অতীতের দিকে তাকাবে।”
দানিয়েল এবার চেয়ারে হেলান দিল। তারপর মৃদু ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো “আদালত তাকাবেই। তাকানো আর প্রমাণ করা এক জিনিস নয়।”
আইনজীবী চুপ করে রইলেন।
দানিয়েল ধীরে ধীরে বলল, “পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড জানে ভাইপার একজন আন্তর্জাতিক অপরাধী। CID ও জানে। এখন সবাই জানে হিয়াই সেই ভাইপার। কিন্তু আদালতে শুধু তার পরিচয় দেখিয়ে তাকে প্রতিটি অপরাধে দোষী বানানো যাবে না।”
দানিয়েলের চোখে এবার কঠিন আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠলো “প্রতিটি অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণ লাগবে। কোন অপরাধ, কখন, কোথায় এবং কীভাবে ভাইপার করেছে সেটা প্রমাণ করতে তো হবে।”
আইনজীবী এবার বললেন, “আর যেসব অপরাধের সরাসরি প্রমাণ নেই, সেগুলো নিয়ে CID কে চাপের মধ্যে ফেলতে পারব।”
“ঠিক।”
দানিয়েল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর বলল,
“আর একটা বিষয় মনে রাখবেন।”
আইনজীবী চোখ তুলে তাকালেন।
“ভাইপারকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে না।”
আইনজীবী একটু অবাক হলেন।
দানিয়েল শান্ত গলায় বলল, “আমাদের শুধু প্রমাণ করতে হবে, তাকে আটকে রাখার মতো যথেষ্ট শক্ত মামলা এখনো তাদের হাতে নেই।”
কক্ষের ভেতর কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।
আইনজীবী ধীরে ধীরে ফাইলগুলো গুছিয়ে নিলেন।
“তাহলে প্রথমে আমরা আয়মান খানের ঘটনাটা ধরছি। পাশাপাশি ভাইপারের বিরুদ্ধে থাকা বাকি অভিযোগগুলোর প্রমাণগুলো যাচাই করব।”
দানিয়েল মাথা নাড়ল “আর কোর্টে আবেদন করুন।”
“হিয়ার জামিনের জন্য?” আইনজীবী প্রশ্ন করলেন।
দানিয়েল সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো
“না। প্রথমে তার বিরুদ্ধে CID-এর কাছে থাকা অভিযোগ ও প্রমাণ আদালতের সামনে আনুন। তারপর কোর্টে বলুন একজন সন্দেহভাজন আন্তর্জাতিক অপরাধী হওয়া আর নির্দিষ্ট অপরাধে দোষী প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।”
আইনজীবী উঠে দাঁড়ালেন। “আমি এখনই কাজ শুরু করছি।”
দানিয়েলও উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল সে তারপর সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে বললো
“আর ভাইপারকে বেশি সময় কাস্টডিতে রাখার সুযোগ তাদের দেবেন না।”
আইনজীবী মাথা নাড়লেন। দানিয়েল ধীরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। তার চোখে তখন একটাই লক্ষ্য—
হিয়াকে CID-এর হাত থেকে বের করে আনা। আর তার প্রথম চাল ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
আধা ঘণ্টার মধ্যেই সেই চালের ফল হিসেবে একটি লিগ্যাল নোটিশ প্রস্তুত হতে শুরু করল। হিয়াকে নিয়ে CID হেডকোয়ার্টারে তখনও কেউ জানত না, বাইরে থেকে তার বিরুদ্ধে যে আইনি চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটা আর সাধারণ কোনো আইনজীবীর পাঠানো নোটিশ নয়।কারণ এর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন মানুষ—যার নাম প্রকাশ্যে খুব কম মানুষ জানে, কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধজগতে যার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস খুব কম লোকেরই আছে।
দানিয়েল।
প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে।
হিয়াকে মেডিকেল ইউনিটের একটি সুরক্ষিত কক্ষে রাখা হয়েছে। চিকিৎসা শেষ করে মেডিকেল টিম তার প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পন্ন করেছে। কিছুক্ষণ আগের অচেতন অবস্থার তুলনায় এখন তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক। চোখও খুলেছে সে। চিকিৎসক হিয়ার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে বললেন,
“এখন স্থিতিশীল। কিছুক্ষণ সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। আপাতত পেশেন্টকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না।”
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অফিসার মাথা নাড়ল।
“স্যার, তাহলে কোর্টে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করব?”
এসিপি সংক্ষিপ্তভাবে বললেন, “হ্যাঁ। মেডিকেল রিপোর্টটা প্রস্তুত করো। কোর্টে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।”
কয়েকজন অফিসার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে শুরু করল। হিয়াকে এখনো কাস্টডিতে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সবাই ধরে নিয়েছিল, পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে আদালতে তোলা হবে এবং CID তার রিমান্ড ও অন্যান্য অভিযোগের ভিত্তিতে হেফাজত বাড়ানোর আবেদন করবে। ঠিক তখনই হেডকোয়ার্টারের মূল দরজা দিয়ে একজন আইন কর্মকর্তা দ্রুত ভেতরে ঢুকলেন। তার হাতে একটি সিল করা খাম।তিনি সরাসরি এসিপির কাছে গিয়ে খামটি এগিয়ে দিলেন।
“স্যার, জরুরি লিগ্যাল নোটিশ।”
এসিপি ভ্রু কুঁচকে খামটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো
“কার কাছ থেকে?”
“ভাইপারের পক্ষের আইনজীবীর কাছ থেকে।”
কক্ষে থাকা কয়েকজন অফিসার একে অপরের দিকে তাকাল। এসিপি খামটি খুলে কাগজগুলো বের করলেন। প্রথম পৃষ্ঠাটা পড়তেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
“এটা কী…?”
পাশের একজন অফিসার এগিয়ে এসে বলল,
“স্যার কি হয়েছে?”
এসিপি ধীরে ধীরে পুরো নোটিশটা পড়তে লাগলেন।
তারপর নিচু গলায় বললেন, “ওরা ভাইপারকে কাস্টডিতে রাখার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।”
একজন অফিসার বিস্মিত হয়ে বলল, “কিন্তু আমাদের কাছে তো একাধিক অভিযোগ আছে!”
এসিপি কাগজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অভিযোগ আছে। কিন্তু অভিযোগ আর আদালতে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের প্রত্যক্ষ প্রমাণ এক জিনিস নয়।”
কক্ষের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল। আরেকজন অফিসার নোটিশটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল।
তার চোখ বড় হয়ে গেল।
“স্যার… ওরা আয়মান খানের ঘটনাটাও উল্লেখ করেছে।”
এসিপি মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ।”
“ওরা বলছে, আয়মানের জাহাজে অ/বৈধ অ/স্ত্র ও মাদ/কের চালান ছিল। যেটা আত্মরক্ষা হিসেবে পেশ করা হচ্ছে আর ভাইপারের গু/লির ঘটনাকে সরাসরি পূর্বপরিকল্পিত হ/ত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণ করার মতো চূড়ান্ত ফরেনসিক রিপোর্ট এখনও আমাদের হাতে নেই।”
কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই বুঝতে পারছিল, নোটিশটা সাধারণ কোনো আইনি চিঠি নয়। এটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে CID চাইলেও এই মুহূর্তে নিজের ইচ্ছেমতো হিয়াকে আটকে রাখতে না পারে। এসিপি ধীরে চেয়ারে হেলান দিলেন।
“ওরা খুব দ্রুত কাজ করেছে।”
পাশ থেকে একজন অফিসার বলল, “স্যার, তাহলে কি ভাইপারকে ছেড়ে দিতে হবে?”
এসিপি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“আইন অনুযায়ী নোটিশটা এখনই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আমাদের আইন বিভাগকে বিষয়টা দেখতে হবে।”
ঠিক তখনই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লিওন এগিয়ে এল। এতক্ষণ সে নীরবে সব শুনছিল।তার চোখে ছিল স্পষ্ট অস্বস্তি।
“আমি এটা মানব না।”
কক্ষে উপস্থিত সবাই তার দিকে তাকাল।এসিপি ভ্রু কুঁচকে বললেন, “লিওন।”
লিওন টেবিলের ওপর রাখা নোটিশটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি বলছি, এই নোটিশের ভিত্তিতে এখনই হিয়াকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।”
একজন অফিসার শান্ত গলায় বলল,“কিন্তু স্যার, আইনগত নির্দেশনা—”
লিওন তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো। “আমার কাছে হিয়ার জবানবন্দি আছে।”
এসিপি এবার সম্পূর্ণভাবে তার দিকে তাকালেন। লিওন টেবিলের ওপর থাকা নিজের নোটপ্যাডটা তুলে ধরল।
“সে নিজের মুখে একাধিক গুরুতর অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। হ/ত্যা, অ/স্ত্রের চালান, মা/দক ব্যবসা, চোরাচালান সবকিছুর ব্যাপারে আমি তার বক্তব্য লিখে রেখেছি।”
সে নোটপ্যাডটা শক্ত করে ধরে বলল, “এই জবানবন্দি থাকা অবস্থায় শুধু একটা লিগ্যাল নোটিশ এসে তাকে এখান থেকে নিয়ে যাবে আমি সেটা মেনে নিতে পারি না।”
এসিপি কিছুক্ষণ চুপ করে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর শান্ত গলায় বললেন, “তুমি ভুলে যাচ্ছ, লিওন। তুমি একজন CID অফিসার। তোমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস দিয়ে আইন চলে না।”
লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল “আমি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কথা বলছি না, স্যার। আমি প্রমাণের কথা বলছি।”
সে এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল “হিয়া নিজে তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। সে শুধু ভাইপারের পরিচয় অস্বীকার করেনি, নিজের অপরাধের তালিকাও আমার সামনে বলেছে। আমি সব লিখে রেখেছি যা তদন্ত করলেই সব বেরিয়ে আসবে মোক্ষম প্রমান।”
এসিপি এবার নোটপ্যাডটার দিকে তাকালেন। তারপর লিওনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “নোটটা আমাকে দাও। আগে দেখি ভাইপার ঠিক কী কী তথ্য দিয়েছে।”
লিওন নোটপ্যাডটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে শুরু করল। একের পর এক পৃষ্ঠা পার হয়ে গেল, কিন্তু হিয়ার নিজের মুখে বলা অপরাধগুলোর বিবরণ যেখানে লিখেছিল, সেই পাতায় এসে তার হাত হঠাৎ থেমে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড পৃষ্ঠাটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর আবার আগের পাতাটা উল্টে দেখল এবং পরের পাতাটাও দেখল। কোথাও কিছুই নেই। যে পাতায় হিয়ার স্বীকারোক্তিগুলো লেখা ছিল, সেটি সম্পূর্ণভাবে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে।
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে আবার নোটপ্যাডটা উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল, যেন পাতাটা ভুল করে অন্য কোথাও চলে গেছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই তার মনে হলো, এটা কোনো ভুল নয়। কেউ ইচ্ছা করেই পাতাটা ছিঁড়েছে।
এসিপি তার মুখের পরিবর্তন দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”
লিওন ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার কণ্ঠে এবার অবিশ্বাস স্পষ্ট।
“যে পাতায় হিয়ার নিজের মুখে বলা সব অপরাধ লিখেছিলাম, সেই পাতাটা নেই।”
কথাটা শুনে এসিপিসহ আশপাশে থাকা অফিসাররা একে অপরের দিকে তাকাল। লিওনের মাথায় তখন একটাই নাম ঘুরছিল—হিয়া।
সে আর কোনো কথা না বলে নোটপ্যাডটা হাতে নিয়েই দ্রুত মেডিকেল ইউনিটের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটাকে অচেতন অবস্থায় তার কোলে করে নিয়ে যেতে হয়েছিল, তাকে এখন কেমন আছে সেটা দেখার পাশাপাশি পাতাটা কীভাবে তার কাছ থেকে অদৃশ্য হলো, সেটাও জানতে হবে।
মেডিকেল রুমের দরজা খুলতেই লিওনের পা থেমে গেল। হিয়া এখন বিছানায় বসে আছে। চিকিৎসার পর তার অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটা স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। মুখে এখনো রিমান্ডের আঘাতের দাগ রয়েছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর পড়ে আছে, কিন্তু চোখে আর আগের ক্লান্তি নেই। বরং লিওনকে দেখেই তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত কোমল হাসিটা ফুটে উঠল।
তবে লিওনের দৃষ্টি আটকে গেল তার হাতে থাকা জিনিসটার দিকে।
একটা কাগজ।
কাগজটা শক্ত করে মুঠোর মধ্যে মুচড়ে রেখেছে হিয়া।
লিওন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার আর বুঝতে বাকি রইল না, ওটা কোন কাগজ। এই পাতাটা হিয়ার হাতে এল কীভাবে, কখন সে সেটা ছিঁড়ে নিল, এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল কোনো প্রশ্নের উত্তরই লিওনের কাছে নেই।
সে ধীরে ধীরে হিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “হিয়া, কাগজটা আমাকে দাও। রাইট নাও।”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। শুধু শান্ত চোখে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল।
লিওন এবার হাত বাড়িয়ে বলল, “আমি জানি তুমি ওই কাগজটা ছিড়ে নিয়েছো। কাগজটা আমাকে দাও।”
হিয়া এবার কাগজটার দিকে তাকাল। তারপর লিওনের চোখের সামনেই সেটাকে আরও শক্ত করে মুচড়ে ফেলল। লিওন কিছু বুঝে ওঠার আগেই হিয়া কাগজটা মুখে পুরে চিবিয়ে ফেলল।
লিওন বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“হিয়া!”
হিয়া তার কোনো কথাই শুনল না। পাশে রাখা এক গ্লাস পানি হাতে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে পুরোটা পান করল। তারপর স্বাভাবিকভাবেই গ্লাসটা নামিয়ে লিওনের দিকে তাকাল, ভাবটা এমন করলো যে কয়েক সেকেন্ড আগে সে কী করেছে সেটা কোনো বড় ব্যাপারই নয়।
লিওন কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাসের সুরে বলল, “Are you psycho or something?”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে আবার হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে শান্তভাবে বলল, “সরি, দিলবার। আমি আগেই বলেছিলাম, সব আমি তোমাকে বলব, তোমার কাছে আমার সবকিছু স্বীকার করব। কিন্তু পৃথিবীর কাছে নয়।”
লিওন তার দিকে তাকিয়ে রইল। হিয়ার কথার মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অনুশোচনাও নেই। সে নিজের অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করে ফেলেছে, অথচ কয়েক মুহূর্ত আগেই লিওনের কাছে নিজের জীবনের প্রায় সবকিছু স্বীকার করে গেছে। এই মেয়েটার যুক্তি কোনোভাবেই তার মাথায় ঢুকছিল না।
শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে লিওন মাথা নেড়ে বলল, “Damn the psycho girl. You’re insane.”
কথাটা বলেই সে আর সেখানে দাঁড়াল না। ঘুরে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
করিডোরে এসে কয়েক পা এগোনোর পরও লিওনের মাথা থেকে ঘটনাটা যাচ্ছিল না। হিয়া কীভাবে তার চোখের আড়ালে সেই পাতাটা ছিঁড়ে ফেলল, কখন নিজের কাছে রাখল, আর কীভাবে এতটা স্বাভাবিকভাবে সেটা চিবিয়ে গিলে ফেলল কিছুই সে বুঝতে পারছে না। সবচেয়ে বেশি তাকে ভাবাচ্ছিল অন্য একটা বিষয়; হিয়া চাইলে তার নিজের অপরাধের কোনো কথাই লিওনকে বলতে হতো না, কিন্তু সে নিজের ইচ্ছায় সবকিছু স্বীকার করেছে। শুধু পৃথিবীর সামনে সেই স্বীকারোক্তির কোনো অস্তিত্ব রাখতে চায়নি।
লিওন তখনও এসব ভাবছিল, ঠিক সেই সময় কয়েকজন অফিসার দ্রুত তার দিকে এগিয়ে এলো। তাদের একজন স্যালুট করে বলল, “স্যার, বাইরে কেউ একজন এসেছে।”
লিওন থেমে অফিসারটির দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত আগের বিরক্তি তখনও তার মুখে স্পষ্ট “কে এসেছে?”
অফিসারটি আর কিছু বলার আগেই হেডকোয়ার্টারের বাইরের দিক থেকে একসঙ্গে কয়েকটি গাড়ির শব্দ শোনা গেল। কাচঘেরা করিডোর দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখা গেল, CID হেডকোয়ার্টারের সামনে একের পর এক বিলাসবহুল কালো গাড়ি এসে থামছে। পুরো রাস্তা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিরাপত্তারক্ষী ও গাড়িতে ভরে গেল। তার ওপরে আকাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাস্টমাইজড কালো প্রাইভেট চপারটির রোটরের শব্দে আশপাশের বাতাস কেঁপে উঠছিল।
চপারের দরজা খুলতেই নিচে থাকা গার্ডরা দ্রুত চারপাশে অবস্থান নিল। এরপর একে একে পাঁচজন সশস্ত্র গার্ড চপারের কাছ থেকে নেমে এসে প্রবেশপথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে গেল। তাদের সঙ্গে থাকা একজন ব্যক্তি সাদা শার্ট নিখুঁতভাবে পরিহিত আর তার ওপর লম্বা কালো ওভারকোট পরে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। চোখে কালো চশমা, মুখের বেশিরভাগ অংশ মাস্কে ঢাকা। তার হাঁটার ভঙ্গিতে এমন এক ধরনের নিশ্চিন্ত কর্তৃত্ব ছিল যা দেখে মনে হলো এই জায়গায় প্রবেশ করার জন্য কারও অনুমতির প্রয়োজন তার নেই।
তার ঠিক পাশে হাঁটছিলেন লন্ডনের অন্যতম প্রভাবশালী একজন আইনজীবী। পেছনে আরও কয়েকজন আইনজীবী ও নিরাপত্তাকর্মী তাদের ঘিরে এগিয়ে আসছিল।
হেডকোয়ার্টারের ভেতরে থাকা অফিসাররা কাচের দরজার ওপাশের দৃশ্য দেখে একে অপরের দিকে তাকাল। বাইরে ইতিমধ্যেই সাংবাদিকদের ভিড় জমে গেছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ক্যামেরাগুলো সেই কালো গাড়ি আর চপারটির দিকে ঘুরে গেল। কেউ এখনো নিশ্চিতভাবে জানে না, কে এসেছে। কিন্তু তার আগমন যে সাধারণ কারও নয়, সেটা বোঝার জন্য তার সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাবেষ্টনীই যথেষ্ট।
লোকটি হেডকোয়ার্টারের মূল প্রবেশপথে পৌঁছাতেই গার্ডরা দুই পাশে সরে দাঁড়াল। সে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকল। প্রবেশপথের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অফিসার তাকে থামিয়ে বলল, “স্যার, আপনি কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?”
লোকটি কোনো উত্তর দিল না। শুধু চোখের চশমাটা খুলে ফেলল। মুখের মাস্কটি সে খুলল না। চশমাটা নিজের গার্ডের হাতে দিয়ে সরাসরি সামনে তাকিয়ে বলল, “এসিপি কোথায়?” কণ্ঠটা শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতর এমন দৃঢ়তা ছিল যে আশপাশের কয়েকজন অফিসার স্বাভাবিকভাবেই চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর এসিপি নিজেই এগিয়ে এলেন।
“আমি এখানে।”
লোকটি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইপার কোথায়?”
এসিপি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। “আপনি কে?”
পাশ থেকে আইনজীবী এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললেন, “উনি হচ্ছেন দানিয়েল।”
এক মুহূর্তে পুরো করিডোরের পরিবেশ বদলে গেল।
কেউ কথা বলল না। যে নামটা এতক্ষণ ধরে হিয়ার জেরার প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে ছিল, যে মানুষটাকে খুঁজে বের করার জন্য CID ভাইপারকে রিমান্ডে নিয়েছে, সেই দানিয়েল নিজেই তাদের হেডকোয়ার্টারে এসে দাঁড়িয়েছে।
এসিপির চোখে বিস্ময় স্পষ্ট হয়ে উঠল। আশপাশে থাকা অফিসারদের মধ্যেও চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
কেউ তাকে কখনো সরাসরি দেখেনি। আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের সঙ্গে তার নাম বছরের পর বছর ধরে জড়িয়ে থাকলেও তার আসল পরিচয় নিয়ে ছিল অসংখ্য রহস্য। অথচ আজ সেই মানুষটিই নিজের নিরাপত্তাবেষ্টনী নিয়ে CID হেডকোয়ার্টারের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে। দানিয়েল চারপাশের কারও দিকে না তাকিয়ে আবার বলল, “ভাইপার কোথায়?”
এসিপি কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন, “ভাইপার বর্তমানে মেডিকেল ইউনিটে আছে। চিকিৎসা চলছে।”
দানিয়েলের কণ্ঠে কোনো পরিবর্তন হলো না।
“তাকে নিয়ে আসুন।”
এসিপি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। “দুঃখিত?”
আইনজীবী এবার সামনে এগিয়ে এলেন। তার হাতে থাকা ফাইলটি খুলে একটি নোটিশ বের করে এসিপির দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“ভাইপারের বিরুদ্ধে বর্তমানে যে অভিযোগগুলো রয়েছে, সেগুলোর আইনি ভিত্তি এবং কাস্টডি বাড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই নোটিশ অনুযায়ী তাকে আর এই মুহূর্তে আপনারা ইচ্ছেমতো কাস্টডিতে রাখতে পারবেন না।”
এসিপি নোটিশটির দিকে তাকালেন। “আপনারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি এগিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু এখানে এসে সরাসরি একজন বন্দিকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ—”
দানিয়েল এবার শান্তভাবে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো
“আমি নির্দেশ দিচ্ছি না। আমি জানাচ্ছি, তাকে ছেড়ে দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।”
এসিপি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই করিডোরের অন্য প্রান্ত থেকে লিওন এগিয়ে এলো।
তার চোখ প্রথমেই গিয়ে থামল দানিয়েলের ওপর।
কয়েক সেকেন্ড দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।
লিওন দানিয়েলকে দেখছিল এমন একজন মানুষকে দেখার মতো, যার সন্ধান পেতে সে এতক্ষণ ধরে একের পর এক দরজা খুলেছে, অথচ সেই মানুষটিই এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর দানিয়েলও স্থির চোখে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল।
লিওন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে এসিপির পাশে দাঁড়াল।
“তাহলে আপনিই দানিয়েল।”
দানিয়েলের ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটল।
“আর আপনিই অফিসার লিওন।”
লিওনের চোখ সরু হয়ে গেল “আমার নামও জানেন?”
“আপনার নাম জানার জন্য খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয় না।” দানিয়েল সরাসরি উত্তর দিলো।
লিওনের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল “হিয়াকে আপনি এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবেন না।”
আইনজীবী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “অফিসার, আইনি নোটিশের বিষয়টি—”
লিওন তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “আমি জানি নোটিশে কী লেখা আছে।”
তারপর দানিয়েলের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আপনি যাকে নিয়ে যেতে এসেছেন, সে একজন আন্তর্জাতিক অপরাধী। তার বিরুদ্ধে শুধু সন্দেহ নেই, আমাদের তদন্তে বহু গুরুতর অপরাধের তথ্য উঠে এসেছে।”
দানিয়েল শান্তভাবে জবাব দিল, “তথ্য আর প্রমাণের পার্থক্যটা আপনি নিশ্চয়ই জানেন, অফিসার লিওন।”
লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল “আমি এটাও জানি, হিয়া আমার সামনে নিজের মুখে তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছে।”
দানিয়েলের চোখে এবার সামান্য আগ্রহ দেখা গেল।
“তাই?”
“হ্যাঁ। আর সেই জবানবন্দি আমি নথিভুক্ত করেছি।”
দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তাহলে আদালতে উপস্থাপন করুন।”
লিওন এক পা এগিয়ে এল। “করব।”
লিওন আরো এক পা এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠ এবার আরও দৃঢ় হলো।
“আজ হয়তো আইনের কারণে আপনাদের ভাইপারকে নিয়ে যেতে দিতে হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখবেন, দানিয়েল এটা শেষ নয়।”
চারপাশের সবাই নীরবে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
লিওন চোখ না সরিয়ে বলল, “আপনি হয়তো আজ ভাইপারকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন ভবিষ্যতে আমার জেরার টেবিলে শুধু ভাইপার নয়, আপনিও আমার সামনে বসবেন।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
দানিয়েল স্থির চোখে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে লিওনের দিকে এক পা এগিয়ে এসে শান্ত, আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, “You’re quite handsome, and you’ve got brave eyes. I’d love to sit across from you at the interrogation table. (তুমি বেশ সুদর্শন, আর তোমার চোখে সাহস আছে। তোমার জেরার টেবিলের ওপাশে বসতে আমার বেশ ভালোই লাগবে।)
লিওনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল। দানিয়েল যেন ইচ্ছা করেই তাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
তারপর দানিয়েল ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও স্পষ্ট করে বলল, “Keep trying.(চেষ্টা চালিয়ে যাও।)
লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে মনে মনে বিরক্ত হয়ে ভাবল, “This whole team is psycho.(এই টিমের পুরো দলটাই সাইকো।)
হিয়া নিজের অপরাধের প্রমাণ চিবিয়ে গিলে ফেলেছে, আর এখন তার তথাকথিত বস কয়েকজন গার্ড আর আইনজীবী নিয়ে CID হেডকোয়ার্টারে ঢুকে এমনভাবে কথা বলছে, যেন পুরো ব্যাপারটাই তার নিয়ন্ত্রণে। তার ওপর জেরার টেবিলে বসার হুমকিকেও দানিয়েল এমনভাবে নিচ্ছে, যেন সেটা কোনো হুমকি নয়—
বরং তার জন্যে এন্টারটেইনমেন্ট।
কিন্তু দানিয়েলকে সে যেতে দেবে এই অর্থে নয় যে লড়াই শেষ হয়ে গেছে। বরং তার মনে হলো, আসল খেলাটা এখন থেকেই শুরু।
দানিয়েল আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ সবাইকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। তার পাশের আইনজীবী এবং পেছনে পাঁচজন গার্ড এগিয়ে গেলো এসিপির দিকে।
এসিপি কয়েক মুহূর্ত তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে একজন অফিসারকে বললেন, “মেডিকেল ইউনিটে যান। ভাইপারকে রিলিজের জন্য প্রস্তুত করুন।”
লিওন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার চোখ তখনও দানিয়েলের ওপর। মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরছিল “আজ তোমাকে যেতে দিলাম, দানিয়েল। কিন্তু পরেরবার তোমাকে আমার সামনে বসতেই হবে।”
মেডিকেল ইউনিটের দরজা খুলে হিয়া বাইরে বেরিয়ে আসতেই করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসারদের চোখ একসঙ্গে তার দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটাকে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে অচেতন অবস্থায় রাখা হয়েছিল, তাকে এখন দেখে একবারও মনে হচ্ছিল না সে কোনো বন্দি; বরং তার হাঁটার ভঙ্গি, স্থির চোখ আর মুখের সেই পরিচিত আত্মবিশ্বাসটা স্পষ্ট করে দিচ্ছিল, এতকিছুর পরেও পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ সে নিজের হাতেই রেখেছে।
করিডোরের শেষ প্রান্তে দানিয়েল তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। তার চারপাশে পাঁচজন গার্ড এমনভাবে অবস্থান নিয়ে রেখেছিল যে তাদের নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে কারও পক্ষে দানিয়েলের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টি ছিল চারপাশে ঘুরছে, আর দানিয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান আইনজীবীর হাতে ছিল একটি কালো লেদারের ফাইল, যার পেছনে আরও দুজন আইনজীবী অপেক্ষা করছিলেন।
হিয়াকে সামনে আসতে দেখেই দানিয়েল কোনো প্রশ্ন না করে নিজের গায়ের কালো ওভারকোটটি খুলে তার দিকে ছুড়ে দিল। হিয়া অনায়াসে সেটি ধরে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিল এবং কোটের কলারটা ঠিক করতে করতে দানিয়েলের পাশে এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে থামল কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লিওনের ওপর।
দুজনের চোখাচোখি হতেই হিয়ার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু একটা হাসি ফুটে উঠল। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লিওনের দিকে একবার চোখ টিপে দিল, তারপর ঠোঁট দুটো সামান্য গোল করে দূর থেকেই তাকে চুমু ছুড়ে দেয়ার ভঙ্গি করল। পুরো ব্যাপারটা এত দ্রুত এবং সূক্ষ্মভাবে ঘটল যে আশপাশে থাকা কেউ বিষয়টা বুঝতেই পারল না, কিন্তু লিওনের চোখ এড়াল না কিছুই।
লিওনের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড হিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে শুধু ভাবল, এই মেয়েটা আসলেই তাকে বিভ্রান্ত করতে দক্ষ।
দানিয়েল শুধু একবার হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “লেটস গো।”
তারপর পুরো টিমটা একসঙ্গে হেডকোয়ার্টারের মূল গেটের দিকে এগিয়ে গেল। মাঝখানে দানিয়েল ও হিয়া, তাদের চারপাশে পাঁচজন গার্ড, এক পাশে প্রধান আইনজীবী এবং তার সঙ্গে আরও দুজন আইনজীবী—তাদের প্রত্যেকের চলাফেরায় এমন সমন্বয় ছিল যে পুরো দলটাকে দেখে মনে হচ্ছিল তারা কোনো বন্দিকে নিতে আসেনি; বরং লন্ডনের সবচেয়ে শক্তিশালী কোনো ব্যক্তিকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত অপারেশন পরিচালনা করছে।
গেটের কাছে পৌঁছাতেই বাইরে অপেক্ষা করা সাংবাদিকদের মধ্যে হঠাৎ তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। একের পর এক ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল, সাংবাদিকরা ব্যারিকেডের সামনে থেকে মাইক্রোফোন বাড়িয়ে একসঙ্গে প্রশ্ন ছুড়ে দিতে শুরু করল,
“আপনিই তাহলে দানিয়েল? আপনি কি সত্যিই ভাইপারকে নিয়ে যাচ্ছেন?
“ভাইপার কি আয়মান খানের হ/ত্যার জন্য দায়ী?”,
“CID কি তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে?”
“দানিয়েল, ভাইপারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?”
সাংবাদিকদের চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকলেও দানিয়েলের গতি একটুও কমল না। তার পাঁচজন গার্ড সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে অবস্থান বদলে এমন একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করল, যার ভেতরে দানিয়েল ও হিয়াকে রেখে তারা ধীরে ধীরে চপারের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক কালো বিলাসবহুল গাড়ির ইঞ্জিন তখনও চালু ছিল, আর কিছুটা দূরে আকাশে তাদের কাস্টমাইজড কালো চপারটি প্রস্তুত অবস্থায় অপেক্ষা করছিল।
এই দৃশ্য দেখে CID-এর ভেতরে থাকা প্রায় পুরো টিমই বাইরে চলে এলো, আর সাংবাদিকরা সঙ্গে সঙ্গে দানিয়েলদের ঘিরে থাকা ভিড় থেকে সরে এসে লিওনসহ CID অফিসারদের চারপাশে জড়ো হয়ে গেল। একসঙ্গে এতগুলো মাইক্রোফোন তার সামনে এগিয়ে এলো যে লিওনকে হাত তুলে সবাইকে শান্ত করতে হলো।
“একসঙ্গে প্রশ্ন করবেন না। তদন্ত চলমান রয়েছে, তাই এই মুহূর্তে এর বেশি কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।”
কিন্তু সাংবাদিকদের প্রশ্ন থামল না। কেউ জানতে চাইছে কেন ভাইপারকে ছেড়ে দেওয়া হলো, কেউ জানতে চাইছে CID কি দানিয়েলের চাপে সিদ্ধান্ত বদলেছে, আবার কেউ সরাসরি জানতে চাইছে দানিয়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হবে কি না।
লিওন তাদের সামলানোর চেষ্টা করলেও তার মনোযোগ পুরোপুরি সেখানে ছিল না। সাংবাদিকদের ভিড়ের মাঝেও তার চোখ বারবার গেটের দিকে চলে যাচ্ছিল, যেখানে দানিয়েল তখন হিয়াকে নিয়ে চপারের কাছে পৌঁছে গেছে।
ঠিক চপারের ওঠার আগে হিয়া হঠাৎ থেমে আকাশের দিকে তাকাল।
দূর আকাশে প্রথমে একটা কালো বিন্দু দেখা গেল, তারপর সেটি দ্রুত বড় হতে হতে বিশাল এক ঈগলের রূপ নিল। শক্তিশালী ডানার বাতাসে নিচের কয়েকজনের পোশাক ও চুল উড়ে উঠল, আর পরের মুহূর্তেই ঈগলটি নিখুঁতভাবে নিচে নেমে এসে হিয়ার কাঁধে বসে পড়ল।
শ্যাডো।
হিয়া তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। বিশাল ঈগলটি তার ধারালো চোখে চারপাশের মানুষগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল, যেন এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও তার একমাত্র দায়িত্ব হিয়াকে নিরাপদ রাখা। দৃশ্যটা দেখে কয়েকজন সাংবাদিক পর্যন্ত মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
“অফিসার লিওন, আপনারা কেন ভাইপারকে ছেড়ে দিলেন?”
“ভাইপারের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকার পরও তাকে মুক্তি দেওয়ার কারণ কী?”
“ভাইপারকে আবার গ্রেপ্তার করা হবে কি?”
প্রশ্নের পর প্রশ্ন আসতে থাকলেও একটা প্রশ্নও লিওনের ঠিকমতো কানে ঢুকছিল না। সে সামনে তাকিয়ে থাকলেও তার দৃষ্টি বারবার সাংবাদিকদের মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল হেডকোয়ার্টারের গেটের দিকে।
কারণ সেখানে তখন অন্য একটা দৃশ্য তৈরি হয়েছে।
চপারের পাশে দাঁড়িয়ে দানিয়েল হিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
হিয়া এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা নিজের হাতে নিল। দানিয়েল শক্ত করে তার হাত ধরে তাকে চপারে উঠতে সাহায্য করল। হিয়া ওপরে উঠে দাঁড়ানোর পরও কয়েক সেকেন্ড তাদের হাত আলাদা হলো না। তারপর দানিয়েল নিজেও উঠে গেল এবং চপারের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই বিশাল চপারের রোটর ঘুরে উঠল।
চারপাশের বাতাস তীব্রভাবে কেঁপে উঠল,
সাংবাদিকদের কাগজপত্র উড়ে গেল, কয়েকজনকে চোখ ঢেকে দাঁড়াতে হলো। ধীরে ধীরে চপারটি মাটি ছেড়ে আকাশের দিকে উঠতে শুরু করল।
লিওন স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। সে জানে, হিয়া একজন বিপজ্জনক অপরাধী। জানে, তাকে আবারও আইনের সামনে দাঁড় করানো দরকার। জানে, আজ তাকে ছেড়ে দেওয়াটা তার তদন্তের জন্য একটা বড় ধাক্কা।
তবুও বুকের ভেতর যে অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে জমে উঠছে, তার কারণটা সে নিজেই বুঝতে পারছে না।
হিয়ার মতো ক্রিমিনাল ছাড়া পেয়ে চলে যাচ্ছে এটা কি তাকে রাগিয়ে দিচ্ছে?
নাকি—হিয়া দানিয়েলের ওভারকোট গায়ে দিয়ে তার হাত ধরে সেই চপারে উঠে গেল, আর দানিয়েল তাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে চলে যাচ্ছে এই দৃশ্যটাই তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে?
লিওন নিজের অজান্তেই চোয়াল শক্ত করে ফেলল।
সাংবাদিকরা তখনও একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে, কিন্তু তার চোখ শুধু আকাশের দিকে, যেখানে চপারটি ক্রমশ ছোট হয়ে দূরে সরে যাচ্ছে।
আর সেই মুহূর্তে হঠাৎ লিওনের নিজের মনেই প্রশ্নটা উঠল “আমি আসলে রাগ করছি কিসের জন্য?”
হিয়ার মতো একজন ক্রিমিনাল তার হাতছাড়া হয়ে গেল বলে?
নাকি অন্য কোনো কারণে?
লিওন নিজেও উত্তরটা জানে না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছে, বুকের ভেতর অস্বস্তিটা হিয়ার দানিয়েলের সাথে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমার বদলে আরও বাড়ছে।
এদিকে শহরের অন্য প্রান্তে, টেলিভিশনের সামনে বসে পুরো ঘটনাটা দেখছিল রুদ্রনীল।
পর্দায় তখন হিয়াকে দেখা যাচ্ছে। CID হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে এসে সে দানিয়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে সশস্ত্র গার্ড, আইনজীবীদের দল আর বাইরে সাংবাদিকদের ভিড়। কিছুক্ষণ পর দানিয়েল তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, আর হিয়া স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সেই হাত ধরে চপারের দিকে এগিয়ে গেল।
রুদ্রনীলের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ইতিমধ্যে জেনেছে—হিয়াই ভাইপার।
কিন্তু এই দৃশ্যটা দেখার পরও তার মাথায় সাত বছর আগের সেই দিনটা বারবার ফিরে আসছিল।
সাত বছর আগে হিয়াতো তার পরিবারের সঙ্গে মারা গিয়েছিল।
দাফন করার সময় রুদ্রনীল নিজে সেখানে ছিল। নিজের চোখে হিয়ার লা/শ দেখেছিল। তার পরিবারের লা/শের পাশেই পড়ে ছিল হিয়ার নিথর দেহ। সেই দিনের পর হিয়ার বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনাই সে রাখেনি।
তার কাছে বিষয়টা ছিল সম্পূর্ণ নিশ্চিত।
হিয়া মা/রা গেছে।
সাত বছর আগে।
চিরতরে।
তাহলে আজ টেলিভিশনের পর্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা কীভাবে হিয়া হবে?
রুদ্রনীল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ পর্দা থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরল না।
হিয়ার মুখে কোনো আতঙ্ক নেই। কোনো অস্বস্তি নেই। যেন সাত বছর আগে তার মৃ/ত্যু ঘটেনি, মনে হলো এতগুলো বছর সে কোথাও হারিয়ে যায়নি। বরং আজও সে আগের মতোই শান্ত, আত্মবিশ্বাসী শুধু তার চোখের গভীরে এমন একটা অন্ধকার আছে, যেটা সাত বছর আগের সেই মেয়েটার মধ্যে ছিল কি না, রুদ্রনীল এখন আর মনে করতে পারছে না।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হলো।
হিয়ার মতো দেখতে একটা মেয়ে ভাইপার এটা নিজেই ভয়ংকর।
কিন্তু যদি সত্যিই এই হিয়াই সেই হিয়া হয়, যাকে সে সাত বছর আগে নিজের চোখের সামনে মৃ/ত দেখেছিল?
তাহলে সাত বছর ধরে সে কোথায় ছিল? কীভাবে বেঁচে ছিল? আর কীভাবে এমন একজন মানুষে পরিণত হলো, যে আসাদ খান আর আয়মান খানকে হ/ত্যা করার পরও এতটা স্বাভাবিকভাবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?
রুদ্রনীলের আঙুলের মুঠো শক্ত হয়ে গেল। পর্দায় তখন চপারটির রোটর ঘুরতে শুরু করেছে। হিয়া দানিয়েলের হাত ধরে ভেতরে উঠে গেল।চপারটি ধীরে ধীরে মাটি ছাড়তে শুরু করল। রুদ্রনীল স্থির চোখে সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
“সাত বছর আগে যে মেয়েটার লা/শ আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম… সে আজ কীভাবে ভাইপার হয়ে আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে?”
চপারটি আকাশে মিলিয়ে গেল।কিন্তু রুদ্রনীলের অস্বস্তিটা রয়ে গেল। বরং এখন তার মনে হচ্ছে—হিয়ার ফিরে আসার রহস্যের চেয়েও ভয়ংকর হলো, সাত বছর আগে যে হিয়া মারা গিয়েছিল, তার জায়গায় আজ যে হিয়া ফিরে এসেছে, সে আসলে কে?
রুদ্রনীল টেলিভিশনের পর্দা থেকে চোখ সরাল না। চপারটি ততক্ষণে আকাশের আলোয় মিলিয়ে গেছে। কয়েক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠল।
“যাই হোক…ও হিয়া হোক আর ভাইপার, আমাকে ধরা এত সহজ হবে না।”
সে ধীরে ধীরে সোফায় ফিরে বসল। চোখের সামনে তখনও হিয়ার মুখটা ভাসছে। “তবে আমিও দেখব, তুমি আসলে কে।”
তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল। “তুমি যদি সত্যিই হিয়া হও… তাহলে তোমাকে আবার শেষ করব। আর যদি তুমি হিয়া না হও, তাহলে তোমাকে বুঝতে হবে কার ছদ্মবেশ নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়েছ।”
কয়েক সেকেন্ড থেমে সে ঠান্ডা গলায় বলল, “কারণ এবার আর ভুলের কোনো সুযোগ নেই।”
চোখে হঠাৎ কঠিন দৃষ্টি ফুটে উঠল তার।
“আয়মান আর আসাদের মতো আমাকেও যদি শেষ করে দিতে চাও… তাহলে তার আগেই তোমাকে থামাতে হবে।”
রুদ্রনীল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “কিন্তু শক্তি দিয়ে নয়।”
তার ঠোঁটের হাসিটা আরও স্পষ্ট হলো। “তোমার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে হবে।”
সে আঙুল দিয়ে টেবিলের ওপর ধীরে ধীরে টোকা দিতে লাগল। “কী তোমাকে ভেঙে দেয়? কী তোমার মাথা ঠান্ডা রাখতে দেয় না? কোন মানুষ, কোন স্মৃতি, কোন জায়গা… কোন বিষয়টা তোমাকে দুর্বল করে দেয়?”
তার চোখ সরু হয়ে এল। “সেটা আমাকে জানতে হবে।”
এক মুহূর্ত থেমে সে ফিসফিস করে বলল, “কারণ তোমাকে হারাতে হলে তোমার শক্তির সঙ্গে লড়াই করার দরকার নেই… তোমার দুর্বলতাটাকেই আমার অ/স্ত্র বানাতে হবে।”
রুদ্রনীল আবার টেলিভিশনের কালো হয়ে যাওয়া পর্দার দিকে তাকাল।“দেখি, হিয়া… তুমি আসলে কে।”
রাত অনেকটাই গড়িয়ে গেছে।
লিওন বাড়িতে ফিরতেই দরজার কাছে তার বাবা-মা ছুটে এলেন। সারাদিনের উত্তেজনা, হিয়াকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া আর দানিয়েলের হঠাৎ আগমনের পুরো ঘটনাটা এখনো তার মাথার ভেতর ঘুরছিল। তার মুখের দিকে তাকিয়েই বোঝা যাচ্ছিল, সে মানসিকভাবে ভীষণ অস্থির।
তার মা এগিয়ে এসে বললেন, “লিওন, যা হয়েছে হয়ে গেছে। সবকিছু সবসময় আমাদের ইচ্ছেমতো হয় না। তুমি ধৈর্য ধরো। সময় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
লিওন কোনো উত্তর দিল না। ধীরে ধীরে সোফায় বসে মাথাটা পেছনে ঠেকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে রাখল।
তারপর হঠাৎ চোখ খুলে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ড্যাড, আমার পুরো ক্যারিয়ারে এই প্রথম কোনো কেস এভাবে আমার হাতের বাইরে চলে গেল।”
আর্থার হায়াস চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
লিওনের কণ্ঠে হতাশার চেয়ে আঘাতটাই বেশি স্পষ্ট ছিল “আমি আজ পর্যন্ত কোনো কেসে হারিনি। যত কঠিন কেসই হোক, শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে সত্যিটা বের করেছি। কিন্তু আজ…”
সে কিছুক্ষণ থেমে ধীরে বলল, “আজ মনে হচ্ছে, ওরা আমার এক ধাপ আগেই সবকিছু ভেবে রেখেছিল।”
আর্থার হায়াস শান্ত গলায় বললেন,
“একটা কেসে এমন হয়েছে বলে তুমি হেরে গেছ, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তুমি একজন অফিসার। তোমার কাজ হলো আবার উঠে দাঁড়ানো।”
ঠিক তখনই পাশে হুইলচেয়ারে বসে থাকা মায়া ধীরে ধীরে বলল, “লিও ভাইয়া… আমি জানি তুমি ব্রেভ। আর তুমি CID তে আছো বলেই হয়তো বিপদকে ভয় পাও না। কিন্তু প্লিজ, নিজের লাইফ রিস্ক নিয়ে কিছু করো না।”
লিওন তার দিকে তাকাল। মায়ার চোখে এবার স্পষ্ট উদ্বেগ।
“আজ ওদের যেভাবে দেখলাম নিউজে, ওরা সাধারণ কেউ নয়। এত গার্ড, এত ক্ষমতা, এত প্রভাব… ওরা খুব বড় কিছু। তুমি যদি ওদের বিরুদ্ধে একা একা কিছু করতে যাও, ওরা তোমার ক্ষ/তি করতে পারে।”
লিওন কিছু বলল না। মায়া এবার আরও কাছে এসে তার হাতটা ধরল।
“তোমার কিছু হলে মামা-মামিমার কী হবে? আমার কী হবে, লিও ভাইয়া?”
শেষ কথাটার সঙ্গে তার কণ্ঠটা কেঁপে উঠল।
লিওন কয়েক সেকেন্ড মায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
“আমার কিছু হবে না, মায়া।”
মায়া মাথা নাড়ল। “তুমি সবসময় এটাই বলো। কিন্তু আজ তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে, তুমি এই কেসটা ছাড়বে না।”
লিওনের মুখে খুব সামান্য হাসি ফুটল।
“পুরো সিআইডি টিম এই কেস ছেঁড়ে দিলেও আমি ছাড়বো না।”
তারপর সে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখে তখন আগের হতাশা নেই। তার জায়গায় ফিরে এসেছে সেই পরিচিত দৃঢ়তা।
“কারণ এটা শুধু একটা কেস নয়। আমি জানি না ভাইপার আসলে কী, জানি না দানিয়েল কতটা গভীরে জড়িত…কিন্তু একটা কথা জানি—ওরা যত বড়ই হোক, আমার আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
তার বাবা গভীরভাবে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আর মায়া নিঃশব্দে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল।
লিওনের মনে তখন শুধু একটাই দৃশ্য—হিয়া দানিয়েলের হাত ধরে চপারে উঠে যাচ্ছে। আর সেই দৃশ্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে হিয়ার সেই দুষ্টু হাসি।সে নিজের অজান্তেই মুঠো শক্ত করল। এই কেস সে হারেনি। শুধু খেলাটা এবার তার পরিচিত নিয়মে হচ্ছে না।।।
অ্যামেলিয়া এতক্ষণ চুপচাপ সবার কথা শুনছিলেন। এবার তিনি ধীরে ধীরে মায়ার পাশে এসে দাঁড়িয়ে লিওনের দিকে তাকালেন।
“মায়া ঠিকই বলছে, লিওন। হয়তো ওরা সরাসরি তোর কিছু করতে পারবে না, কিন্তু তোর পরিবারকে তো টার্গেট করতে পারে। অপরাধীরা যখন কাউকে সরাসরি আঘাত করতে পারে না, তখন তার কাছের মানুষগুলোই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য।”
লিওনের মুখটা কঠিন হয়ে গেল। সে কয়েক মুহূর্ত মায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি আমার ফ্যামিলিকে প্রটেক্ট করতে জানি, আপু। আমি থাকতে কেউ আমার ফ্যামিলিকে টাচ করতে পারবে না।”
অ্যামেলিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু লিওন এবার নিজেই মায়ার দিকে তাকাল।তার চোখের কঠোরতা কিছুটা নরম হয়ে এলো।
“আর মায়ার জীবনে যা হয়েছে… আমি সেটা অস্বীকার করছি না। সেখানে আমার গাফিলতি ছিল। আমি ওর প্রতি যথেষ্ট কেয়ার দিইনি, ওকে যেভাবে প্রটেক্ট করা উচিত ছিল, সেভাবে করতে পারিনি।”
মায়া চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। লিওন ধীরে শ্বাস নিয়ে বলল,“কিন্তু এখন থেকে আর না।”
তার কণ্ঠে এবার দৃঢ়তার সঙ্গে একটা গভীর অনুশোচনাও মিশে গেল।
“আমি আর কেয়ারলেস হবো না। মায়ার ব্যাপারে না, কারও ব্যাপারেই না। আমার কারণে আমার ফ্যামিলির কাউকে আর কোনো বিপদের মধ্যে পড়তে দেব না।”
অ্যামেলিয়া ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। লিওনের মুখে তখন এমন এক দৃঢ়তা, যা দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে শুধু কথাটা বলছে না, নিজের কাছেই একটা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
মায়া ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেলল। লিওন তার দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বলল,
“এবার থেকে তোর নিরাপত্তার ব্যাপারে আমি একটুও অসতর্ক থাকব না। এটা আমার দায়িত্ব।”
এদিকে ক্রমশ রাত গভীর হয়ে গেছে।
টাউন হাউসের বিশাল কনফারেন্স রুমে তখন দানিয়েল, হিয়া এবং তার টিমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ইভানা, মার্ক আর জ্যাক উপস্থিত। ঘরের মাঝখানে লম্বা টেবিল, তার ওপর ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি ফাইল আর নথিপত্র। সবাই চুপচাপ বসে থাকলেও দানিয়েলের মুখের কঠোরতা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, আজকের মিটিংটা সাধারণ কোনো মিটিং নয়।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর দানিয়েল সরাসরি হিয়ার দিকে তাকাল “রিমান্ডে নেওয়ার পর ওরা তোমাকে এত প্রশ্ন করেছে। এত তথ্য জানতে চেয়েছে। তুমি কেন কোনো তথ্য দিলে না?”
হিয়া চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
দানিয়েলের কণ্ঠ এবার আরও কঠিন হলো।
“আমার পরিচয়ও কেন বলোনি?”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটল।
“আমিযে কোনো অবস্থাতেই আপনার কোনো ইনফরমেশন দেবোনা।এটা আপনি আমার চেয়ে ভালো জানেন আমাকে।”
দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তুমি নিজেও জানতে, ইনফরমেশন দিলেও ওরা আমার কিছুই করতে পারত না। তাহলে এতটা টর্চার সহ্য করার কী দরকার ছিল?”
রুমে থাকা সবাই চুপচাপ শুনছিলো কারন দানিয়েল আর ভাইপার কথা বলার সময় তারা সহজে মাঝখানে কথা বলেনা।
হিয়া এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“তাহলে কী করতাম? প্রথমে মুখ বন্ধ রাখতাম, ওদের জেরার সামনে সব সহ্য করতাম, আর শেষে দুর্বল হয়ে তথ্য দিয়ে দিতাম?”
সে সামান্য থেমে দানিয়েলের চোখের দিকে তাকাল।
“তাহলে তো ওদের কাছে হেরে যাওয়া হতো, তাই না?”
দানিয়েল কোনো উত্তর দিল না। হিয়া এবার ধীরে ধীরে বলল, “অ্যারেস্ট হলে রিমান্ড দেবে, এটা আইনের কাজ। আর সেই রিমান্ড সাদরে গ্রহণ করে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসা একজন মোস্ট পাওয়ারফুল ক্রিমিনালের কাজ।”
তার চোখে তখন আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট রয়েছে।
“এই আন্ডারওয়ার্ল্ডে এমন শত শত আঘাত সহ্য করার মতো ট্রেনিং আমার হয়েছে। হয়তো আজ প্রথমবার রিমান্ডে গিয়েছি তবে আহত প্রথমবার হয়েছি এমন তো নয়।”
দানিয়েল স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
হিয়া এবার ভ্রু সামান্য উঁচু করে বলল, “আর আপনি আজ আমার রিমান্ড নিয়ে এতটা কেয়ার করছেন কেন?”
রুমে মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো। হিয়া চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“এই বিষয়ে কেয়ার করা আপনাকে মানায় না, বস।”
কথাটা বলেই সে আর কোনো উত্তর অপেক্ষা না করে ঘুরে দাঁড়াল। কনফারেন্স রুমের দরজা খুলে হিয়া বাইরে চলে গেল। দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
দানিয়েল তখনও একই জায়গায় বসে রইল। তার চোখ স্থির হয়ে আছে বন্ধ দরজার দিকে।
হিয়া ঠিকই বলেছে।
রি/মান্ড, জেরা, ট/র্চার এসব নিয়ে দানিয়েলের কেয়ার করার কথা নয়। এই পৃথিবীতে এমন শত শত ঘটনা সে দেখেছে, যেখানে তার নিজের টিম এবং পরিবারও বিপদের মুখে পড়েছে। অথচ আজ হিয়ার ১ ঘণ্টার রিমা/ন্ড তাকে অস্বাভাবিকভাবে অস্থির করে তুলেছিল।
সে জানে, এটা তার স্বভাব নয়। এটা তার দুর্বলতাও হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সমস্যাটা ঠিক সেখানেই।
বিষয়টা রিমান্ড নিয়ে কেয়ার নয়। বিষয়টা হিয়াকে নিয়ে কেয়ার।
এদিকে হিয়া নিজের কক্ষে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল।
কক্ষ তখন পুরোপুরি নীরব। আলো জ্বালানোরও প্রয়োজন বোধ করল না সে। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে টেবিলের ওপর রাখা রিমোটটা হাতে নিল। পরের মুহূর্তেই সামনের বড় প্রজেক্টর স্ক্রিনে লিওনের একটি ছবি ভেসে উঠল।
হিয়া ধীরে ধীরে চেয়ারে গিয়ে বসল। মাথাটা চেয়ারের পেছনে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ শুধু ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে খুলল।
কয়েকটি ক্লিক করতেই একের পর এক ভিডিও সামনে আসতে শুরু করল প্রেসের সামনে দাঁড়িয়ে লিওনের বক্তব্য, সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর, বিভিন্ন তদন্ত নিয়ে তার সাক্ষাৎকার। হিয়া প্রতিটা ভিডিও মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল।
কখনো লিওনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকছে, কখনো তার কণ্ঠ শুনছে, আবার কখনো শুধু তার ঠোঁটের নড়াচড়া লক্ষ্য করছে।
বিশেষ করে যখন লিওন তার নাম উচ্চারণ করছিল, হিয়ার দৃষ্টি তখন আর স্ক্রিন থেকে সরছিল না।
তার মনে পড়ে গেল সেই দুটো মুহূর্ত। লিওনের ঠোঁটে তার দেওয়া সেই চুমু। অদ্ভুতভাবে সেই স্মৃতিটা এখন তার মাথায় ঘুরছে।
তার আবার লিওনকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।
শুধু ইচ্ছে নয় এক ধরনের তীব্র ক্রেভিংস ধীরে ধীরে তাকে অস্থির করে তুলেছে।
হিয়া নিজের ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে মৃদু হেসে ফেলল।
“বাজপাখি…”
নিজের অজান্তেই নামটা ঠোঁট থেকে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে ড্রয়ার খুলে একটি লেমন-ফ্লেভার সিগারেট বের করল। লিওনের চুমুর স্বাদটা হিয়ার কাছে লেমন টোব্যাকোর (তামাক) মতোই লেগেছিল। সেই স্বাদটা বারবার মনে পড়ার পর থেকেই সে এই ফ্লেভারের কয়েক প্যাকেট সিগারেট এনে রেখেছে।
সিগারেটটায় আগুন ধরিয়ে ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছাড়ল।
একটা শেষ হওয়ার পর আরেকটা। তারপর আরেকটা।
রাত যত গভীর হতে লাগল, ল্যাপটপের স্ক্রিনে লিওনের সাক্ষাৎকার চলতেই থাকল, আর হিয়ার সামনে একের পর এক সিগারেটের অবশিষ্টাংশ জমতে লাগল।
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৫ (২)
একসময় তার মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করল অতিরিক্ত সিগারেট টানার কারনে। তার চোখ ভার হয়ে আসছিল, তবু লিওনের ভিডিও বন্ধ করার ইচ্ছা হচ্ছিল না।
শেষ পর্যন্ত ত্রিশটি সিগারেটের পর হিয়া আর নিজেকে জাগিয়ে রাখতে পারল না। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তখনও লিওনের মুখ দেখা যাচ্ছিল। হিয়া চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। কয়েক মুহূর্ত পরেই গভীর ঘুম তাকে গ্রাস করল।
