Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৪

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৪

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৪
মেহজাবিন নাদিয়া

আরিশান মৃধা প্রথমে থতমত খেলেন জেবার কথা শুনে। পরক্ষণেই কী যেন ভেবে সামান্য হাসলেন। জেবা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লোকটা তার কথা শুনে হাসলো কেন?আরিশান মৃধা হালকাভাবে জেবার কপালে দুটো টোকা দিলেন। বললেন,
“তুমি এখনো খুব ছোট মেয়ে। সেজন্য এমন ছেলেমানুষি কথা বলছো। তোমাকে নিয়ে জেলাস হওয়ার আমার কোনো দরকার নেই। আমি জাস্ট এমনিতেই ইনসিকিউরিটি থেকে বললাম। তোমার সাথে সাথে আমার অস্তিত্ব বেড়ে উঠছে। আশা করি কী বলছি বুঝতে পেরেছো।”

জেবা হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলো, “আমাকে ভালোবাসেন, হানি?”
আরিশান মৃধা জেবার করা প্রশ্নে থমকে গেলেন। দুচোখ মেয়েটার চোখে নিবদ্ধ হয়ে গেল। বুকের ভিতর হৃদস্পন্দন ক্রমশ বাড়তে লাগলো। অনুভূতিগুলো হঠাৎ কেমন দোলাচলে উঠলো। হয়তো এখনো ভাবছেন আসলেই কি তিনি সামনে বসে থাকা মেয়েটাকে ভালোবাসতে পেরেছেন কিনা? হয়তো হৃদয় তখনই উত্তর দিয়ে দিয়েছে তাকে। তবে হৃদয় কী বলেছে সেটা প্রকাশ করতে চাইলো না লোকটা। জেবা একদৃষ্টে উৎসুক চোখে চেয়ে আছে উত্তরের আশায়। তবে তাকে হতাশ করে দিয়ে আরিশান মৃধা তেমন কিছুই বলল না। তবুও যেন না বলার মাঝে একটা কথা তিনি প্রকাশ করে দিলেন।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি না, জেবা। কখনো বাসতেও চাই না। কিন্তু…”
মন খারাপের মাঝেও জেবা হঠাৎ যেন একটু আশার আলো খুঁজে পেল। লোকটার বলা এই ‘কিন্তু’ টা কী, সেটা শোনার জন্য।আরিশান মৃধা পুনরায় জেবার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোমার ক্ষেত্রে আমার হার্ট খুব দুর্বল, মেয়ে। আমাকে কখনো এমন কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন করো না, যার জন্য এটার হৃদস্পন্দন থমকে যায়।”

জেবা একরাশ বিস্ময় আর অনুভূতি নিয়ে শুধু চেয়ে রইল আরিশান মৃধার চোখের দিকে। লোকটা মুখে ভালোবাসি না বললেও, মাত্র বলা কথাগুলোতে যেন অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়েছে। জেবা আর কখনো জিজ্ঞেস করবে না লোকটাকে যে সে জেবাকে ভালোবাসে কি না। কারণ জেবা তার উত্তর পেয়ে গেছে।হঠাৎ জেবা আরিশান মৃধার চোখে চোখ রেখেই মিষ্টি একটা হাসি দিলো। ডান হাত বাড়িয়ে আরিশান মৃধার কনিষ্ঠ আঙুলে নিজের আঙুল দিয়ে স্পর্শ করালো। আরিশান মৃধার কী হলো কে জানে! লোকটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো। মেয়েটার সামান্য স্পর্শ ওনার শরীরে এক অন্যরকম অনুভূতির শিহরণ বয়ে নিয়ে গেল। মুহূর্তটা যেন সেখানেই থমকে গেল দুজনের। একজন আরেকজনের চোখে চোখ রেখেই যেন সব ভাষা পড়ে ফেলছে।
কে বলেছে ভালোবাসতে বয়স লাগে? কিছু ভালোবাসা বাহ্যিক রূপ দেখে হয় না। দুজনের মনের গভীর থেকে গভীরত্বে সৃষ্ট অদৃশ্য টান থেকে তৈরি হয়। যার উদাহরণ জেবা নিজেই। একসময় যার কাছে নিজেকে সবচেয়ে বেশি কম্ফোর্ট ফিল করতো। যাকে ছাড়া জীবনটা বেরঙিন লাগতো। যাকে রূপ দেখে নয়, আগলে রাখাকে ভালোবেসেছিল। আজ সেই আগলে রাখার মানুষটি সম্পূর্ণ জেবার একান্ত ব্যক্তিগত। যদিও সে জানে বাকি আট-দশটা দাম্পত্যের মতো তাদের সফর লম্বা হবে না। তবুও জেবা যেইটুকু সময় আছে, সেটাকেই স্মৃতির গহ্বরে জমিয়ে রাখতে চায়।

বিকেলের দিকে পাহাড়ের পর্বতমালার উপর খোলা আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘের আনাগোনা। বোধহয় রাতে বৃষ্টি হবে। এই সময়টাতে চারদিকের আবহাওয়া বেশ মনোমুগ্ধকর। সাঁই সাঁই করে বাতাস বয়ে চলছে চারদিকে।
সারিম অরিকে নিয়ে উঠে এসেছে একটা পাহাড়ের কিনারায়। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে অরির প্রিয় জলপ্রপাত। ঝরনা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে নিচে। অরি সেসব মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
সারিম অরির পাশে দাঁড়িয়ে এক হাতে ওর কোমরটা শক্ত করে ধরে রেখেছে, যেন অরি অসাবধানতাবশত পড়ে না যায়। অরি দুহাত মেলে উপভোগ করছে বয়ে চলা বাতাসে ভেসে আসা বিভিন্ন ফুলের সুঘ্রাণ। রিসোর্ট এখান থেকে অনেকটাই দূরে।
সারিম এভাবে অনেকক্ষণ বউকে নিজের মতো উপভোগ করতে দিলো। তবে এবার ফেরার সময় হয়েছে। বেশি দেরি করলে পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে। তাছাড়া আশেপাশে মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। পাহাড়ি এলাকায় বিপদ বলে কয়ে আসে না।
সারিম এবার হাতের সাহায্যে অরিকে টেনে কিছুটা মধ্যভাগে নিয়ে এলো। হঠাৎ ধ্যান ভাঙায় অরি বিরক্ত হলো। বলল,

“কী সমস্যা আপনার? টানলেন কেন? আমাকে দেখতে দিন।”
সারিম অরির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আকাশে মেঘ ডাকছে চন্দ্রিমা। যেকোনো সময় বৃষ্টি হবে। চলো, আজকের মতো রিসোর্টে ফিরে যাই। আগামীকাল আবার নিয়ে আসব।”
অরির যেতে একটুও মন সায় দিচ্ছে না। এমনিতেই সারাদিন প্রেগন্যান্সির ধকলে মেয়েটা বেশ কাহিল ছিল। এর মাঝে একটু সুস্থ হতেই সারিম তাকে এখানে ঘুরতে নিয়ে এসেছে। এখানে এসে শরীরটা আগে থেকে বেশ ভালো লাগছিল। প্রকৃতির মাঝে ডুবে থেকে অন্যরকম এক প্রশান্তি খুঁজে নিচ্ছিল।
আরেকটু থাকার ইচ্ছে জাগলো মেয়েটার। মানা করে বলল সারিমকে,

“সারিম, প্লিজ আরেকটু থাকি। বেশি না, আর একটু। আমার রিসোর্টে ফিরতে ইচ্ছে করছে না একদম।মন চাচ্ছে আপনি আর আমি মিলে বাকি জীবনটা এখানেই পার করে দেই।”
সারিম বুঝলো এভাবে কাজ হবে না। মেয়েটা তার কথা মানবে না। সে কারণে সারিম আচমকাই অরিকে দুহাতে পাঁজাকোল করে তুলে নিলো। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটেছে যে অরির কিছু বুঝে ওঠার আগেই সারিম তাকে কোলে উঠিয়ে হাঁটা ধরা শুরু করেছে। অরি সারিমের বুকে ধাক্কা দিতে দিতে বলল,
“সারিম, প্লিজ থামেন বলছি।”
“না! এখন আর কোনো থামাথামি নেই। কাল আবার আসবো, জান।”

অরি বুঝলো সারিম এভাবে মানবে না। সে কারণে সারিমের গালে আচমকা মুখ এগিয়ে নিয়ে কামড় বসিয়ে দিলো। হঠাৎ অরির করা আক্রমণে সারিম পাহাড়ি উঁচু-নিচু রাস্তায় তাল সামলাতে না পেরে অরিকে নামাতে বাধ্য হলো।সারিমের কোল থেকে নামতেই অরি খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। তবে তা পরক্ষণেই হাওয়া হয়ে গেল সারিমের রাগী চেহারা দেখে। অরি ভয়ে কিছুটা চুপসে গেল। সারিম অরির ডানহাত শক্ত করে ধরে বলল,
“ফাজিল মেয়ে! আরেকবার বাদরামি করলে রুমে নিয়ে লক করে রাখবো। আর ঘুরতে নিয়ে আসবো না।”
সারিমের কথা শুনে অরির মুখটা ছোট হয়ে গেল। সে ভোঁতা মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। সারিম হাতে টান দিলেও অরি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো, নড়লোই না। শেষমেশ বিরক্ত হলো সারিম। জিজ্ঞেস করলো,
“কী সমস্যা তোমার? মার খাওয়ার শখ জেগেছে?”
অরি মুখটা ছোট করে জবাব দিলো,

“আপনি আগেই ভালো ছিলেন, সারিম। আমার সব কথা শুনতেন। আর এখন নিজের যা ভালো মনে হয় তাই করেন, আমার কথার আর কোনো দাম নেই আপনার কাছে।”
সারিম বুঝলো মেয়েটা তাকে নিজের ফাঁদে আটকাতে এমন কৌশল ইউজ করছে। অরি খুব ভালো করেই জানে ইমোশনালি কথা বললে সারিম গলে যাবে। তবে সারিম ততটাও গলো না আজকে। শুধু বউয়ের মন রক্ষার্থে বলল, “দেখো, হাতে সময় খুব কম। কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা নামবে। তুমি ঠিক কী চাচ্ছো, দ্রুত বলো আমাকে।”
অরি গায়ে থাকা শাড়িটা একবার ভালোভাবে নজর বুলালো। সবকিছু ঠিকঠাক আছে দেখে সারিমের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,

“বেশি কিছু না। আপনি জাস্ট আমার কয়েকটা ছবি তুলে দিন এখানে। আমি পোজ দিচ্ছি, দাঁড়ান।”
অরির কথাতে সারিম বিরক্তে “চ” শব্দ উচ্চারণ করলো। ছবি তুলবে, তাও আবার সারিম। জীবনেও ভালো ছবি তুলতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। তার উপর মেয়ে মানুষের ছবি তোলা নিয়ে সারিমের আগে থেকেই ধারণা আছে। নিশ্চয়ই এখন তার চৌদ্দটা বাজাবে এই মেয়ে ছবি তোলার নাম করে। তবুও বউয়ের মন রক্ষার্থে সারিম রাজি হলো। তবে সমস্যা হচ্ছে তার কাছে ক্যামেরা নেই। অরি সারিমকে ভাবনা-চিন্তা করতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“কী হলো আবার আপনার?”
“ক্যামেরা আনিনি সাথে। ছবি তোলা হবে না আজ।”
“ফোন তো আছে। ওইটার ক্যামেরা হলেই হবে।”
অগত্যা সারিম অরির কথা মতো ফোনটা বের করলো। ক্যামেরা অন করতেই অরি নান অঙ্গভঙ্গি দিতে শুরু করলো। যা দেখে বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছালো সারিম। ছবি তুলুক ভালো কথা। তাই বলে শরীরকে এভাবে মাগুর মাছের মতো বাঁকানোর কী আছে?সারিমের ভাবনার মাঝেই অরি দৌড়ে এলো সারিমের নিকট। তা দেখে সারিম সাথে থামালো,

“আস্তে বউ, আস্তে। তোমার এই অত্যাচারে আমার ছাপাপোনাগুলোর বারোটা বেজে যাচ্ছে।”
সারিম নিজেই এগিয়ে এলো অরির নিকট। অরি সারিমের কাছ থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে দেখতে থাকলো। তবে তার একটা ছবিও পছন্দ হলো না। ছবির ভিতরে কোনো না কোনো খুঁত সে ঠিকই খুঁজে বের করলো।
“আপনার একটা ছবিও সুন্দর অ্যাঙ্গেল থেকে তোলা হয়নি, সারিম। এসব কী তুলেছেন? আবার তুলুন, ভালো করে।”
সারিম তাকালো ছবিগুলোর দিকে, বলল,
“কই, ঠিকই তো আছে, বউ। খারাপ কী? সুন্দর ছবিই তো উঠেছে। আর তোলার দরকার নেই।”
অরি চোখ রাঙালো সারিমের দিকে তাকিয়ে। সারিম ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়লো। অরি ধমকে বলল,
“যান, আবার তুলুন। হয়নি, এগুলো সবকটা বাজে ছবি উঠেছে।”
সারিম এরপর আবার গেল ছবি তুলতে। এবার অরি আরও নান ভঙ্গিতে পোজ দিতে থাকলো। প্রতিবারই একটা ছবির জন্য সারিমকে দশ-পনেরোটার মতো ক্লিক করতে হচ্ছে। প্রায় শখানেক ছবি তোলা শেষে সারিম যখন দেখলো সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। আকাশে কালো মেঘ ডাকছে। অথচ তার বউ এখনো বেহুঁশে ছবি তোলায় ব্যস্ত। সারিম ছবি তোলা বন্ধ করে এগিয়ে গেল অরির দিকে, বলল,
“চন্দ্রিমা, আর না। রাত হতে বেশি দেরি নেই। আমাদের এখন রিসোর্টে ফিরতে হবে। ছবি কালকে তোলো। আজ অনেক তুলেছি, আর তোলা লাগবে না।”

অরি সারিমের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ততক্ষণে ছবি দেখায় ব্যস্ত, বলল,
“এসব কী তুলেছেন আপনি? এগুলো আদৌ ছবি বলা হয়? ছিহ! আবার তুলুন।”
সারিম এবার আর পারলো না। মাথায় রাগ চড়ে বসেছে তার। রেগে বলল,
“বেয়াদব মেয়েজাতী কোথাকার! একই ভঙ্গিমায় তিনশোরো ও অধিক ছবি তুলেছি। অথচ ওনার নাকি একটাও পছন্দ হচ্ছে না। বালের ছবি আর তুলবোই না। তোর ছবি তুই তোল গিয়ে।”
সারিমের কথার উল্টো পিঠে অরি রাগে ফুঁসে উঠলো। চোখ-মুখ লাল করে বলল,
“ফটোগ্রাফি করতে পারেন না, ভালো কথা। সেটা বলে দিলেই তো হয়। এভাবে নাটক করার কী দরকার? ডিসগাস্টিং ফটোগ্রাফার। দিন, ফোনের ক্যামেরা দিন। আমি অন্য কাউকে দিয়ে তুলে নিচ্ছি।”
অরির মুখ থেকে একের পর এক অপমানজনক কথা ছুটে আসতেই সারিমের ভিতরের সমস্ত ধৈর্য যেন ছিঁড়ে গেল। রাগে তার কপালের রগ দপদপ করছে। সে আর পিছন ফিরে তাকালো না। শক্ত গলায় বলল,
“যা ইচ্ছে কর গিয়ে। আমার সামনে থেকে দূর হ, অরি। তোকে দেখে এখন প্রচুর রাগ উঠছে আমার।”
অরিও কম যায় না। সেও সমান তেজে জবাব দিলো,

“আপনার সামনে আমারও থাকার কোনো ইচ্ছে নেই। বেয়াদব পুরুষ। যত রাগ, যত জেদ সব শুধু আমার উপরেই। এর চেয়ে ভালো আমি অন্য কাউকে দিয়ে ছবি তুলিয়ে নিবো।”
কথাটা বলেই অরি ত্যাড়ামি করে পিছন ঘুরলো। পায়ের নিচের শুকনো পাতা মাড়িয়ে হনহন করে হাঁটা ধরলো। রাগের মাথায় সারিমের ফোনটাও হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে।সারিম পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো,
“যাও, যাও। তোমার খালু লাগে তো সবাই। যাকে বলবে সেই-ই তোমার ছবি তুলতে দৌড়ে আসবে।”
এই কথাটা অরির গায়ে আগুনের মতো লাগলো। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। রাগে, অভিমানে অন্ধ হয়ে সামনের পথ ধরলো। কোথায় যাচ্ছে, সামনে কী আছে, কিচ্ছু ভাবছে না মেয়েটা।এদিকে প্রকৃতিও যেন ওদের ঝগড়ায় সায় দিচ্ছে। সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুও পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। আকাশের বুক চিরে মেঘেরা দল বেঁধে ছুটছে। থেকে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে ডাকছে। বিজলির আলো মাঝে মাঝে চারপাশটা সাদা করে দিয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডা বাতাসের সাথে মাটির সোঁদা গন্ধ নাকে লাগছে। যেকোনো মুহূর্তে মুষলধারে বৃষ্টি নামবে।
এতক্ষণ রাগে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা সারিমের হঠাৎ হুঁশ ফিরলো। চারপাশের নীরবতা আর অন্ধকার ওকে কামড়ে ধরলো। মাথায় বিদ্যুতের মতো খেলে গেল,

“অরি কোথায়?”
এক মুহূর্ত দেরি না করে আশেপাশে তাকালো। ফাঁকা। শুধু হু হু বাতাস আর পাতার শব্দ।সারিমের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। পাহাড়ি এলাকা, চারপাশে ঘন জঙ্গল, তার উপর প্রেগন্যান্ট বউ। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই চারদিক অন্ধকার হয়ে যাবে।
“চন্দ্রিমা! কোথায় তুমি?”
নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কানেই অচেনা লাগছে সারিমের। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে সে। আবছা অন্ধকারে, বিজলির আলোয় জঙ্গলের ভিতর অরিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে পাগলের মতো।
কিন্তু উত্তর আসছে না। শুধু ফিরে ফিরে আসছে নিজের প্রতিধ্বনি আর দূরের ঝরনার শব্দ।অরির কোনো সাড়াশব্দ নেই।

সারিমের মাথাটা ততক্ষণে ভনভন করছে। অরি গেল কোথায়, কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছে না সে।ভিনদেশ, অচেনা জায়গা।তার উপর চারপাশটা এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাতের কাছে একটা ফোনও নেই যে ফ্ল্যাশ জ্বেলে খুঁজবে। ফোনটা তো অরির কাছেই রয়ে গেছে।
কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। টেনশন আর ভয়ে মাথার ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। একটু আগের রাগী ব্যবহারটার জন্য নিজের উপরেই এখন প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে তার।ওভাবে বলা মোটেও ঠিক হয়নি তার অরিকে।এরই মধ্যে চারদিক নিকষ কালো হয়ে এলো। বাতাসের বেগও হঠাৎ বেড়ে গেল। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় ঝড় উঠবে।
সারিম অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে শুধু অরির নাম ধরে ডাকছে।কতবার যে গাছের শেকড়ে, লতাপাতায় হোঁচট খেয়েছে তার হিসাব নেই। পাগলের মতো খুঁজছে।
অনেকক্ষণ ধরে খোঁজার পরও অরির কোনো চিহ্ন নেই। চারপাশে শুধু বিশাল গাছপালা আর ঝোপঝাড়। কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। নিজে কোথায় আছে সেটাও বুঝতে পারছে না। রাস্তা যে হারিয়ে ফেলেছে তা নিশ্চিত।
এত বড় জঙ্গলে অরি কোথায় থাকতে পারে ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে। মাথার মধ্যে একটার পর একটা দুশ্চিন্তা – মেয়েটার আবার কোনো বিপদ হলো না তো?

পাহাড়ি বাতাসে ঠাণ্ডার তীব্রতা এক লহমায় দ্বিগুণ হয়ে গেল। আঁধার গিলে খাচ্ছে গোটা পথঘাটকে। মাথার ওপর মেঘের বিকট গর্জনে পুরো জঙ্গল যেন কেঁপে উঠছে। সারিম এখন আর স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। বুকে ধড়ফড়ানি, গলায় শুষ্কতা,চোখে তার অপরাধবোধ। কেন ও অরিকে ওভাবে একা ছেড়ে দিল? কেন ওই রাগটা সামলাতে পারলো না? মেয়েটা তো অন্তঃসত্ত্বা, ওর একটু খামখেয়ালি করা তো স্বাভাবিক ছিল।
“চন্দ্রিমা! কোথায় তুমি? প্লিজ একটা সাড়া দাও!”

সারিম গলা ফাটিয়ে ডেকেই চলেছে। প্রতিটা পায়ের চাপে ভেজা মাটি আর শুকনো পাতার খশখশ শব্দ ছাড়া আর কোনো উত্তর আসছে না। চোখের সামনে হাত বাড়ালেও স্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছে না। বিজলির তীব্র আলো যখনই আকাশ চিরে নেমে আসছে, সেই সামান্য আলোটুকুতেই সারিম পাগলপারা হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।হঠাৎই ওপর থেকে ঝুমঝুম করে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে এলো। পাহাড়ি বৃষ্টি মানেই মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ পিছল আর বিপদজনক হয়ে ওঠা। সারিম পায়ের নিচে কোনো ভারসাম্য রাখতে পারছে না।
কয়েকবার পড়তে নিয়েও নিজেকে সামলেছে।মাথায় এখন একটাই চিন্তা-অরিকে অক্ষত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া।হাঁটতে হাঁটতে সারিম ঝরনার থেকে নেমে আসা এক পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর পাড়ে চলে এলো। নদীর পানির গর্জন আর বৃষ্টির শব্দ মিলে চারপাশটা ভয়ানক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
ঠিক তখনই, বিজলির এক ঝলক আলোয় সারিমের চোখ আটকে গেল নদীর পাড়ের ঢালু খাদটার দিকে। খাদটি একদম গভীর নদীর পানির সাথে গিয়ে মিশেছে।

সেই পিচ্ছিল খাদের একেবারে কিনারায়,একটা মাঝারি সাইজের গাছের গুঁড়ি ধরে কোনোমতে ঝুলন্ত অবস্থায় আটকে আছে অরি! বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছে মেয়েটা। ভয়ে, ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ওর হাত দুটো কেঁপে উঠে বারবার পিছলে যাচ্ছে। নিচে ফেনা তোলা খরস্রোতা নদীর গর্জন! আর কয়েক সেকেন্ড পিছলে গেলেই সোজাসুজি তলিয়ে যাবে পাহাড়ি সেই ভয়াল নদীতে।
“আমি এতো তাড়াতাড়ি মরতে চাইনা। সারিম প্লিজ আপনি এসে আমাকে বাচিঁয়ে নিন।”
বৃষ্টির শব্দের ভেতর অরির সেই আর্তচিৎকার সারিমের বুকে গিয়ে তীরের মতো বিঁধল। সারিমের পায়ের রক্ত যেন এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। সে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে খাদের দিকে দৌড়ে গেল।
পাহাড়ের সেই অংশটা বৃষ্টির পানিতে ভীষণ পিছল হয়ে ছিল। অরির কাছে পৌঁছানোর আগেই সারিমের নিজের পা পিছলে গেল। ভারসাম্য সামলাতে না পেরে সারিম গড়িয়ে নিচে পড়ে গেল। ছিটকে গিয়ে পড়ল নদীর ঠাণ্ডা, খরস্রোতা পানিতে!এমন সময় হঠাৎ করে বিকট শব্দে বিজলি চমকালো। বিজলির ক্ষীণ আলোতে অরি উপর থেকে সারিমকে দেখে চিৎকার করে উঠল।

“সারিম।”
নদীর স্রোত অত্যন্ত তীব্র। পানির নিচে বড় বড় পাথর। সারিম এক মুহূর্তের জন্য দম আটকে তলিয়ে যাচ্ছিল। হাবুডুবু খেতে খেতে কোনোমতে পানির ওপর ভেসে উঠে সে।একটা শক্ত পাথরের খাঁজ আঁকড়ে ধরল। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল। নিজের জীবন নিয়ে তার বিন্দুমাত্র ভয় নেই, তার সব ভয় খাদে ঝুলে থাকা অরিকে নিয়ে।
নদীর বুক থেকে কোনোমতে পাথরে ভর দিয়ে সারিম তীব্র স্রোতের সাথে লড়াই করে পাড়ে উঠে এলো। গায়ের জামাকাপড় পানিতে ভারী হয়ে গেছে, শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকে বের হওয়া রক্ত আর বৃষ্টির পানি একসাথে মিশে একাকার। কিন্তু ওসবের তোয়াক্কা না করে সারিম হামাগুড়ি দিয়ে একপ্রকার উঁচুতে খাদের পাড়ে উঠে এলো।অরির হাতের মুঠো ততক্ষণে আলগা হয়ে আসছে।
“আমার হাত ধরো, চন্দ্রিমা! প্যানিক কোরো না,শক্ত করে আমার হাত ধরো!”

সারিম খাদের ভেজা মাটিতে পেটের ওপর ভর দিয়ে শুয়ে পড়ল। নিজের একটা হাত গাছের সাথে পেঁচিয়ে ধরে অন্য শক্ত হাতটা বাড়িয়ে দিল অরির দিকে।অরি কাঁদতে কাঁদতে নিজের শেষ শক্তিতে সারিমের হাতটা আঁকড়ে ধরল। অরির ঠাণ্ডা হাতটা সারিমের হাতের মুঠোয় আসতেই সারিম আর বিন্দুমাত্র দেরি করল না। নিজের সমস্ত শক্তি এক করে অরিকে এক হ্যাঁচকা টানে খাদের উপর টেনে তুলে আনলো।
উপরে উঠেই অরি ভয়ে সারিমের শক্ত বুকের ভেতর মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সারিমও অরিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে মাটির ওপর বসে পড়ল। দুজনেই হাঁপাচ্ছে। অরির শরীর ঠাণ্ডায় রি রি করে কাঁপছে।সারিম নিজের মাথাটা অরির ভেজা চুলে ঠেকিয়ে ঘন ঘন শ্বাস ফেলল। অরির পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত গলায় বলল,
“শান্ত হও,চন্দ্রিমা। কিছু হয়নি। আমি আছি তো, কিচ্ছু হয়নি তোমার।”
অরি কাঁদতে কাঁদতেই বলল, “আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, সারিম। ভাবছিলাম আর আপনাকে দেখতে পাবো না। আমার খুব ভুল হয়ে গেছে।”

সারিম অরির মাথায় আলতো করে চুমু এঁকে দিল। নিজের রাগের জন্য এখন ওর নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছে। ও হাত দিয়ে অরির গাল থেকে জমে থাকা পানি আর চোখের জল মুছে দিল।
“আর একটা কথাও নয়। ভুল আমার ছিল, আমি তোমাকে একা যেতে দিয়েছি। এখন আর কাঁদে না,বউ। আমাদের এখন এখান থেকে নিরাপদে ফিরতে হবে। পারবে উঠতে?”
অরি মাথা নেড়ে সায় দিল। সারিম সাবধানে অরিকে ধরে দাঁড় করাল।অরি দাঁড়ানোর সাথে সাথে হঠাৎ ওর পুরো শরীরটা তীব্র কাঁপুনিতে কেঁপে উঠল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভারসাম্য হারিয়ে সে সারিমের গায়ে ঢলে পড়ল।সারিম তড়িঘড়ি করে অরিকে শক্ত করে ধরে দুই বাহুতে পাঁজাকোল করে তুলে নিল। কোলে নিতেই সারিম অনুভব করল, অরির পুরো শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে। মেয়েটা তীব্র কাঁপুনিতে টু শব্দটিও করতে পারছে না।

এদিকে বৃষ্টি কমার কোনো নামগন্ধ নেই, উল্টো যেন তার বেগ অনবরত বেড়েই চলেছে। সারিম সেই ঘোর অন্ধকারের মাঝেই অরিকে বুকে জড়িয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করল। এখন যেকোনো মূল্যে অরিকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে হবে। গর্ভাবস্থায় মেয়েটা যে এমন একটা বিপদে পড়বে, তা সারিমের কল্পনারও বাইরে ছিল।পিচঢালা ভেজা পথ ধরে সারিম হেঁটে চলল। বৃষ্টিতে পথঘাট ভীষণ পিছল হয়ে ছিল; হাঁটতে গিয়ে কয়েকবার পা পিছলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও সারিম নিজেকে আর কোলজুড়ে থাকা অরিকে সামলে নিল। ভেজা কাপড়ে বাতাসে সারিমের নিজের শরীরও ঠান্ডায় অবশ হয়ে আসছে।এভাবে বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর সারিম অরিকে নিয়ে একটি নিরিবিলি পাহাড়ি চূড়ায় এসে পৌঁছাল। বৃষ্টির বেগ না কমলেও এই অঞ্চলটি চারপাশের অন্য জায়গাগুলোর চেয়ে বেশ ঢালু। সারিম কালবিলম্ব না করে এই পথ ধরেই অরিকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলল।
অরি অনবরত কিছুক্ষণ পর পর ঠান্ডায় সারিমের বুকে কেঁপে উঠছে। অরির এই অবস্থা দেখে সারিম তাকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল। এই মুহূর্তে মেয়েটার তীব্র উষ্ণতার প্রয়োজন।আরও কিছুটা দূর হাঁটার পর সারিমের নজরে এলো হালকা একটা লণ্ঠনের আলো। দূর থেকে আলোর উৎস ঘেঁষে একটা ছোট মাটির ঘর মতো দেখা যাচ্ছে। সারিম বুঝল, তারা সম্ভবত পাহাড়ি আদিবাসীদের কোনো বাসস্থানে এসে পৌঁছেছে। সামান্য আশ্রয়ের আশায় সে তড়িঘড়ি করে বাড়িটির দিকে এগিয়ে গেল।

বাড়িটির সামনে পৌঁছাতেই সারিম দেখল, পুরো বাড়িটি একদম ফাঁকা। আশেপাশে মানুষের কোনো আনাগোনা নেই। সারিম থমকে দাঁড়িয়ে চারপাশটা ভালো করে লক্ষ্য করল। কিন্তু কারোই উপস্থিত পাওয়া গেলো না।
বৃষ্টির ঝাপটার সাথে পাহাড়ি বাতাসের তেজ যেন আরও বেড়ে গেল। সারিম আর এক মুহূর্তও বাইরে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না। মাটির ঘরটির কাঠের দরজায় সামান্য ধাক্কা দিতেই তা কাসাস করে শব্দ করে খুলে গেল। ঘরটি ছোট, তবে বেশ সুরক্ষিত। ঘরের এক কোণে একটা পুরোনো কাঠের তাক, একটা নিভু নিভু লণ্ঠন আর বেশ কিছু পাহাড়ি শুকনো কাঠ গুছিয়ে রাখা আছে। বোঝাই যাচ্ছে এটি কোনো পাহাড়ির সাময়িক থাকার জায়গা বা কাঠুরেদের বিশ্রামাগার, যা এই মুহূর্তে একদম ফাঁকা।

সারিম সাবধানে অরিকে মাটির ওপর থাকা একখণ্ড পরিষ্কার পাটির ওপর শুইয়ে দিল। অরির শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ঠোঁট দুটো নীলচে হয়ে কাঁপছে।চোখ দুটো আধবোজা। অচেতন আর চেতনের মাঝামাঝি এক ঝুলন্ত অবস্থায় আছে সে।সারিম দ্রুত গিয়ে দরজার খিলটা শক্ত করে আটকে দিল, যাতে বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস আর বৃষ্টির ছিটে ভেতরে না আসতে পারে। তারপর ঘরের কোণে জমে থাকা শুকনো কাঠ আর শুকনো লতাপাতা দিয়ে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করতে লাগল।

সৌভাগ্যবশত, তাকের ওপর একটা দিয়াশলাই রাখা ছিল। কয়েকবার চেষ্টা করার পর অবশেষে আগুন জ্বলে উঠল। আগুনের লালচে আলো। সাথে মিষ্টি ওম ধীরে ধীরে ছোট ঘরটির ভেতর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।সারিম অরির পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। অরির গায়ের ভেজা শাড়িটা পানির ওজনে ভারী হয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। এই ভেজা কাপড় গায়ে থাকলে অরির ঠাণ্ডা আরও বেড়ে যাবে, যা তার এই গর্ভাবস্থায় অত্যন্ত বিপজ্জনক। সারিমের নিজের শরীরও ভিজে একাকার, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তার সব চিন্তা এখন অরিকে নিয়ে।
ঘরের চারপাশে চোখ বোলাতেই সারিম কোণার দিকে একটা পরিষ্কার, শুকনো সুতি চাদর গুটিয়ে রাখা দেখতে পেল। আদিবাসীদের হাতে বোনা বেশ গরম একটা চাদর। সারিম কালবিলম্ব না করে চাদরটা নিয়ে এলো।এখন অরির গায়ের এই ভেজা শাড়িটা ছাড়ানো খুব জরুরি। সারিম প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও।অরির শারীরিক সাস্থের কথা চিন্তা করে।অত্যন্ত নিখাদ ভাবে সে অরির ভেজা শাড়ির আঁচলটা গা থেকে সরিয়ে আনল। অরি অর্ধচেতন অবস্থায় হালকা কেঁপে উঠে সারিমের একটা হাত চেপে ধরার চেষ্টা করল। সারিমের স্পর্শ পেতেই যেন অরির অবচেতন মন কিছুটা আস্বস্ত হলো। বিড়বিড় করে আধো আধো গলায় বলল,

“ঠাণ্ডা… সারিম… খুব ঠাণ্ডা লাগছে…”
সারিম আলতো করে অরির কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। কপালটা বড্ড ঠাণ্ডা। সারিম ফিসফিস করে বলল,
“আমি আছি, চন্দ্রিমা। ভয় পেয়ো না। আমি তোমার ঠাণ্ডা দূর করে দিচ্ছি।”
অত্যন্ত সাবধানে সারিম অরির গা থেকে ভেজা শাড়ি আর ভেজা ব্লাউজটি আলগা করে দিল। অরির উন্মুক্ত, শীতে কাঁপা শরীরটাকে মুহূর্তের মধ্যেই সেই শুকনো, গরম চাদরটা দিয়ে মুড়িয়ে দিল। সারিম চাদরটা এমনভাবে অরির শরীরে পেঁচিয়ে দিল যাতে ভেতরের উত্তাপ বাইরে না বের হতে পারে।
চাদরের উষ্ণতা পেতেই অরি অবচেতনভাবেই সারিমের কাছাকাছি সরে এলো। কুণ্ডলী পাকিয়ে সারিমের উরুর ওপর নিজের মাথাটা রেখে দিল। সারিমের এক হাত অরির ভিজে থাকা চুলের ভেতর বিলি কেটে দিতে লাগল, আর অন্য হাত দিয়ে চাদরের ওপর থেকেই ওকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রইল।আগুনটা এখন বেশ ভালোভাবে জ্বলছে। আগুনের আলোয় অরির ফ্যাকাশে মুখটা লালচে দেখাতে লাগল। সারিম আগুনের পাশে বসে অরির দুটো বরফের মতো ঠাণ্ডা হাত নিজের দু হাতের তালুর ভেতর নিয়ে ঘষতে শুরু করল। ঘষে ঘষে নিজের হাতের উত্তাপ অরির হাতের তালুতে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করল।

অরি চোখ না খুলেই সারিমের হাতের উষ্ণতা অনুভব করার চেষ্টা করল। ধীরগতিতে নিজের কনিষ্ঠ আঙুলটা দিয়ে সারিমের হাতের তালু আঁকড়ে ধরল। সারিম অরির হাতের পিঠে গভীর এক চুমু খেল।আলতো করে চাদরের ওপর দিয়ে অরির তলপেটে নিজের বড় হাতটা রাখল। সেখান থেকে যেন এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হলো। সারিম ঝুঁকিয়ে এসে অরির পেটের ওপর আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। বলল,
“বেবিরা, মাকে একটু সহ্য করার ক্ষমতা দাও।তোমাদের মা খুব দুষ্টু!”
অরি আধোঘুমে থাকা অবস্থাতেই হালকা হেসে ফেলল। সেই হাসিতে যেন সারিমের সব ক্লান্তি এক লহমায় ধুয়ে মুছে গেল।

বৃষ্টির শব্দ বাইরে আরও ঘন হয়ে আসছে। কাঠের আগুনে মধ্যে থেকে মাঝে মাঝে ‘চটচট’ শব্দ হচ্ছে। ঘরের ভেতরে শুধু আগুনের উষ্ণতা আর দুজন মানুষের ঘন হয়ে আসা নিঃশ্বাসের শব্দ।
সারিমের গায়ের শার্টটাও একদম ভেজা ছিল। অরিকে উত্তাপ দিতে হলে নিজের শরীরের গরমও দরকার। তাই সারিম নিজের ভেজা শার্টটা খুলে এক পাশে রেখে দিল। তারপর অরিকে চাদরসহ নিজের খালি বুকের ওপর টেনে তুলে নিল।ত্বকের সাথে ত্বকের স্পর্শ লাগতেই অরি শিউরে উঠল।অবচেতন ভাবেই সে সারিমের বুকে মুখ গুঁজল। সারিমের খালি বুকের ওম আর পরিচিত সুবাস অরিকে এক অদ্ভুত শান্তির সাগরে ভাসিয়ে দিল। অরির শীতল শরীরটা ধীরে ধীরে সারিমের শরীরের উষ্ণতায় গরম হতে শুরু করল। অরি সারিমের গলায় নিজের দুটো হাত জড়িয়ে ধরে আরও শক্ত করে চেপে ধরল, যেন এই বুকের ভেতরটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
সারিম অরির পিঠে, চাদরের ওপর দিয়ে নিজের হাত বুলাতে লাগল। অরির প্রতিটা নিঃশ্বাস এখন সারিমের বুকের ওপর এসে পড়ছে। ঘন, উষ্ণ নিঃশ্বাস। সারিম নিজের থুতনিটা অরির মাথার ভেজা চুলে ঠেকিয়ে চোখ দুটো বুজে রইল।

“সারিম?” অরি বিড়বিড় করে ডাকল।
“বলো, চন্দ্রিমা।”
“আমার খুব ঘুম পাচ্ছে… কিন্তু ভয়ও করছে.”
“কিসের ভয়, জান?”
“যদি চোখ খুললে দেখি আপনি নেই।যদি এই বৃষ্টিটা আমাদের আলাদা করে দেয়…”
সারিম অরির চিবুক ধরে মুখটা একটু উঁচুতে তুলল। আধবোজা চোখের অরির দিকে তাকিয়ে সারিমের হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল। ঝুঁকে এসে অরির ভিজে থাকা নরম ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডোবালো।
খুব ধীরে, খুব মায়ায় সারিম অরিকে চুম্বন করতে লাগল। কোনো তাড়া ছিল না এতে, ছিল শুধু এক অপার আগলে রাখার বহিঃপ্রকাশ। অরিও অবচেতনভাবে সারিমের সাড়ায় নিজের ভেজা ঠোঁট দুটো হালকা নাড়িয়ে উত্তর দিল।দুজনের মিষ্টি চুম্বনে পাহাড়ি ঠাণ্ডা যেন এক নিমিষে উবে গেল। চারপাশের সবকিছু থমকে গেল, শুধু রয়ে গেল তাদের হৃদয়ের ধুকপুকানি।
ঠোঁট আলগা করে সারিম অরির কপালে কপাল ঠেকাল। দুজনের উষ্ণ নিঃশ্বাস এক হয়ে মিশে যাচ্ছে। সারিম ফিসফিস করে বলল,

“পুরো আকাশ ভেঙে পড়লেও আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না, চন্দ্রিমা।এইটুকু ভরসা আমাকে করতে পারো।”
অরি সারিমের বুকের ভেতর আরও একটু সেঁধিয়ে গেল। সারিমের কথাগুলো যেন তার অবচেতন মনে তৃপ্তি এনে দিল। ভয়ের মেঘ কেটে গিয়ে অরির মনে এখন শুধুই ভালোবাসার রোদ।আগুনের তাপ বাড়ার সাথে সাথে ঘরের ভেতরটা বেশ আরামদায়ক হয়ে উঠল। সারিম চাদরটা ভালো করে অরির গায়ে জড়িয়ে দিয়ে ওকে নিজের কোলের ওপর শুইয়ে রেখে হেলান দিয়ে বসল কাঠের দেয়ালটাতে। অরি এখন আর আগের মতো কাঁপছে না। তার শরীর স্বাভাবিক উত্তাপে ফিরে এসেছে। ফ্যাকাশে ভাবটা কেটে গিয়ে গালে আবার সেই মিষ্টি গোলাপি আভা ফুটে উঠেছে।
অরি ঘুমের ঘোরে সারিমের পেটের ওপর এক হাত রেখে সারিমের বুকের উষ্মতায় শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। সারিম অরির মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল। কত নিষ্পাপ দেখাচ্ছে মেয়েটাকে! কিছুক্ষণ আগের সেই পাহাড়ি ভয়াবহতা।সব যেন এক স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। সারিমের মনে হলো, আজকের এই রাতটা যদি না আসত, তবে হয়তো সে কোনোদিনই বুঝতে পারত না অরি তার জীবনের কতটা গভীরে ছড়িয়ে আছে।
সারিম অরির কপালে জমে থাকা কয়েকটা চুল সরিয়ে পেছনে গুঁজে দিল। তারপর আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় অরির কানের লতি, গাল আর ঠোঁটের কোণ স্পর্শ করল। অরি ঘুমের মধ্যেই মিষ্টি একটা হাসি দিল, যেন স্বপ্নেও সে সারিমের স্পর্শ চিনতে পারছে।

বাইরে বৃষ্টির বেগ এবার কিছুটা কমে এসেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর আগুনের চটচট শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙছে।সারিম অরিকে জড়িয়ে ধরে রাখা হাত দুটো আরও একটু শক্ত করল। অরির কপালে শেষবারের মতো একটা গভীর চুমু দিয়ে নিজের চোখ দুটো বুজল। বাইরে ঝড় থামুক বা না থামুক, সারিমের বুকের ভেতর এখন এক শান্ত, সুশীতল সমুদ্র ভেসে চলেছে, যার একমাত্র কূল তার চন্দ্রিমা।

সকালের সোনাঝুরি রোদ জানালার পর্দা চিরে সোজা বিছানার ওপর এসে পড়েছে, জেবার ঘুমটা আস্তে আস্তে ভাঙল। চোখ দুটো পিটপিট করে মেলেই সে পাশে হাতড়ে দেখল। কিন্তু পাশটা ফাঁকা, একদম খাঁ খাঁ করছে।জেবা এক বুক হতাশা নিয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। গাল দুটো ফুলিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“খাটাস লোক একটা! আজও আমাকে একা ফেলে অফিসে কেটে পড়েছে! প্রতিদিন একই নাটক। একটু যে সকালে বউয়ের পাশে বসে দুটো মিষ্টি কথা বলবে, সেই কপাল কি আমার আছে? হুটহাট প্রেমে ফেলার বুলি আওড়াবে, আর পরদিনই এমন ভাব দেখাবে যেন আমাকে চেনেই না!”
জেবার মনটা একদম খারাপ হয়ে গেল। বালিশে ঠেস দিয়ে আরও কিছুক্ষণ মুখ ভাড়ি করে বসে রইল।অগত্যা তারপর তোয়ালেটা নিয়ে ফ্রেশ হতে ওয়াসরুমে ঢুকে গেল জেবা। মিনিট পনেরো পর একটা আরামদায়ক সালোয়ার-কামিজ পরে, চুলগুলো আলতো করে খোঁপা বেঁধে ধীরপায়ে রুম থেকে বের হলো সে।
ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা তাকে আরও বেশি গ্রাস করল। পুরো বাড়ি একদম চুপচাপ। ফুলও নেই, অরিও নেই, আর বাড়ি দেখাশোনার শাহিন মিয়াও গ্রামে। একা একা এই বিশাল বাড়িতে থাকতে জেবার খুব বোরিং লাগছিল।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও জেবা পেটের ক্ষুধা মেটাতে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু ড্রয়িং রুম পার হয়ে ডাইনিংয়ের কাছাকাছি পৌঁছাতেই তার নাকে এলো এক অসাধারণ সুবাস!মাখনের মিষ্টি গন্ধ, সাথে যেন রসুনের সুন্দর ফোড়ন আর মসলার এক দারুণ ঘ্রাণ ভেসে আসছে।
জেবা ভ্রু কুঁচকাল। বাড়িতে তো কেউ নেই! তবে কি শাহিন মিয়া হুট করে চলে এলো? নাকি আরিশান মৃধা কোনো শেফ রেখে গেছেন তার জন্য?কৌতূহল সামলাতে না পেরে জেবা পা টিপে টিপে রান্নাঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরে দৃশ্যটি দেখে,জেবা! থমকে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ দুটো বিস্ময়ে একেবারে ছানাবড়া!
রান্নাঘরের কিচেন কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আরিশান মৃধা!ধবধবে সাদা শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। ওনার চওড়া বুকের ওপর ঝুলছে একটা গাঢ় নীল রঙের অ্যাপ্রন। চুলগুলো প্রতিদিনের মতো পারফেক্টভাবে সেট করা নেই, কপালে দু-একটা চুল আলতো করে এসে পড়েছে। হাতের মধ্যে একটা ধারালো ছুরি, আর লোকটা অত্যন্ত মনোযোগের সাথে ক্যাপসিকাম একদম বারিক করে কাটছে। ওনার কাটিং বোর্ডের ওপর ধারালো ছুরির ‘টক টক’ শব্দ আর চুলায় মৃদু আঁচে চাপানো প্যানের সুবাস পুরো রান্নাঘর মাতোয়ারা করে রেখেছে।

জেবা দরজার একপাশে হেলান দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে লাগল। একজন মন্ত্রী হয়ে লোকটাকে রান্নাঘরে এভাবে দেখা যে কত বড় একটা সারপ্রাইজ, তা জেবা বলে বোঝাতে পারবে না! সত্যি বলতে,লোকটাকে এই সাধারণ লুকেও ভীষণ হ্যান্ডসাম লাগছে।যদিও এটা সবার ক্ষেত্রে নয়,শুধু জেবার দৃষ্টিতে।
জেবা মুখে একটা মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে একদম নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল। পেছনে গিয়ে গুঁটিগুঁটি পায়ে আরিশান মৃধার একদম কাছাকাছি দাঁড়াল। কিন্তু আরিশান মৃধা বোধহয় আগেই টের পেয়েছিলেন জেবার উপস্থিতি। সে কারণে কাটাকাটি না থামিয়েই বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,
“হুট করে কারো পেছনে এভাবে গিয়ে দাঁড়ানো কিন্তু ভালো অভ্যাস নয়,জেবা। বিশেষ করে যখন তার হাতে চাকু থাকে।”

জেবা চমকে উঠে এক পা পিছিয়ে গেল, তারপর ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা ! আপনার পেছনে কি অতিরিক্ত দুটো চোখ বসানো আছে নাকি? বুঝলেন কীভাবে আমি এসেছি?”
আরিশান মৃধা কাটিং বোর্ডে কাটা ক্যাপসিকামগুলো একটা কাঁচের বাটিতে তুলতে তুলতে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“তোমার শরীরের স্মেল..”
জেবা পাশেই ক্যাবিনেটের উপরে উঠে বসলো। আরিশান মৃধা স্যালাড মেক করছিলেন। জেবা ওনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে।
“আপনি কি আমার জন্য ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছেন হানি?”
“না!দুজনের জন্যই বানাচ্ছি।নতুন শেফ লান্সে আসবে।”
“আপনি রান্না জানেন আগে কখনো বলেননি তো?”
“প্রয়োজন ছিলো না, তাই বলিনি।”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৩

জেবা ফুসঁ করে একটা শ্বাস ছাড়লো। আরিশান মৃধার দিকে আরেকটু এগিয়ে বসলো। জিজ্ঞেস করলো।
“আপনি সবসময় এমন গম্ভীর মুডে থাকেন কেন বলুন তো?আমার একদম অপছন্দ এটা।”
“তাহলে কি এডাল্ট মুডে থাকবো?”
বলেই আরিশান মৃধা। কাটা চামচের সাহায্যে জেবার মুখে কিছুটা স্যালাড পুরে দিলো। জেবা সেটা চিবুতে চিবুতেই চোখ বড় বড় করে আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে আছে। মাএই কানে ভুল শুনলো মনে হচ্ছে।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৫