Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ১৩

উন্মাদনা পর্ব ১৩

উন্মাদনা পর্ব ১৩
কায়নাত খান কবিতা

__কাম’ড় দে বা’ন্দী।”
নিজে গলার একটু ফাঁকা অংশ বের করে তাতে কামড় দেওয়ার জন্য অভী আদেশ করে আনন্দীকে।তবে আনন্দী তো আনন্দীই।সে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,__ওকটা ছুড়ি দে৷ তোর গ’লা কে’টে জন্মের মতো দাগ করে দিচ্ছি।”
__আরে বাপ রে বাপ। ডরাইছি।”

হাতে থাকা স্মার্ট ফোনটি বের করে ভিডিও অপশন গিয়ে আনন্দীর সামনে তাদের কিছু ক্ষণ আগের ইন্টি’মেট হওয়ার ভিডিওটি প্লে করে অভী।বার বার নিজের শ্রী’লতা হানির ভিডিও এবং আর্তচিৎকার শুনতে শুনতে কেমন একটা বিষাদ সৃষ্টি হয় আনন্দীর মাঝে।সে খপ করে অভীর ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।কিন্তু বাজপাখীর মতো অভীর পেশিবহুল হাতটি এসে আনন্দীর হাত থামিয়ে দেয়।এক পর্যায়ে ধস্তাধস্তি চলে সেই জীপের উপরে। আনন্দী যে করেই হোক ফোনটি নেওয়ার অদম্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। অপরপ্রান্তে অভী তার বলিষ্ঠ হাত দুটো দিয়ে আনন্দীকে থামানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়।
অভীর শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে আনন্দী খুব জোড়ে চিৎকার করে ওঠে। অভীর মুখ বরাবর থুথু নিক্ষেপ করে সে। মানুষ যখন অধিক শোকে কাতর হয়ে পাগলামো শুরু করে। নিজের বিবেক বুদ্ধি লোপ পাইয়ে দেয়। আনন্দী ঠিক সেই পর্যায়ে রয়েছে। সে ও নিজের বিবেক বুদ্ধি লোপ পাইয়েছে। খানিকটা পাগলের মতো পাগলামি শুরু করে দিয়েছে সে।

অভী শক্ত হাতে আনন্দীকে জাপ্টে ধরে। এবং চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। তাার মুখে এখনো ও আনন্দীর থুথু অবস্থিত রয়েছে। তবু ও কোনো প্রকারের প্রতিক্রিয়া দেখায় না সে। খুব শান্ত কন্ঠে অভী আনন্দীকে বললো,__ভিডিওটা তোর বাপের কাছে পাঠাই?”
অভীর এমন ঠান্ডা কন্ঠে ভয়ংকর বানি শুনে রূহ অব্দি কেঁপে ওঠে আনন্দীর। সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে অভীর দিকে তাকায় সে। মুখে কেবলমাত্র অসহায়ত্বের ছায়া।
আচ্ছা একবার ভেবে দেখুন তো। কিছু ক্ষণ আগে আপনার সম্মান হানি হলো। সহজ ভাষায় বলতে গেলে ধ’র্ষণ। এবং সেই ধ’র্ষণ কারী আপনার সামনে সুস্থ সবল ভাবে বসে রয়েছে। আপনাকে ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাক মেইল করছে। তাহলে আপনার অনুভূতিটা কী হতো? রাখতে পারতেন নিজেকে ঠিক? মনে হতো না পুলিশে যায়? মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেই? কিন্তু না। আনন্দীর মতো কম বয়সী মেয়েরা সম্মান এবং পরিবারের ভয়ে পু’লিশে যায় না। যার ফলে অভীর মতো ছেলেরা। রেড ফ্ল্যাগ গুলো ফ্রী ভাবে ঘোরাফেরা করে।এবং আনন্দীর মতো মেয়েরা দিনের পর দিন এসবের স্বীকার হয়ে থাকে। তার উপরে যদি বলা হয় পরিবারকে ভিডিও দেখাবে। তখন তো পায়ের নিচের মাটি ও সরে দাড়ায় । একবার ভাবুন তো আপনার বাবা আপনার সম্মান হানির ভিডিও দেখছে। লজ্জায় তার মুখ এবং চোখ মাটির দিকে। তখন?
আনন্দীর এমন অসহায়ত্বে ভরা মুখশ্রী দেখে অভীর মুখে দুষ্টু হাসি খেলে গেলো। সে আনন্দীর ঠোঁট স্লাইড করতে করতে বলে, __আমার যখনই মাথা গরম হইবো।তোরেই লাগবো। চুপচাপ চলে আসবি। না-হলে নেটে তোর সাউন্ড সহ ভিডিও পোস্ট হবে।”

অভীর কথা গুলো আনন্দীর কান অব্দি তো গেলো।তবে সে যেন কিছুই শুনতে পেলো না। চোখের সামনে সব কিছু আবছা আবছা হতে শুরু করলো। ঢোলে পড়লো আনন্দী অভীর প্রশস্ত বুকটির মধ্যে। আনন্দীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অভী বলে,__জুতার মালা গলায় ছিলো আমার। নিউজের প্রথম পেজে ছবি। সেইটার সামনে তোর এই অবস্থা কিছুই না বান্দী। দিন যাক দেখবি আরো কত কী করি তোর সাথে।”
অভীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০২২ সালের সেই দিনটির কথা। তার গলায় ছিলো জুতোর মালা। পুরো হসপিটাল ভর্তি ভীর।মুখে কালির ছাপ। পুলিশের ভ্যান। ছুটে আসা চ’ড় থাপ্প’ড়। লোকদের গা’লি। সাংবাদিকদের ঘেরাও। নিউরোলজি বিভাগের সেই সেরা ছাত্রটি তো সেই দিনই হারিয়ে যায়। এতো কিছুর মাঝে ও অভীর চোখ শুধু আনন্দীকে দেখতে থাকে। তার মুখে কোনো ভয় ভীতির ছাপ ছিলো না। শুধু ছিলো আনন্দীর দিকে এক তৃর্যীক হাসি দিয়ে তাকিয়ে থাকা। ভয়ে আনন্দী তার মাকে জড়িয়ে ধরে। সেই দিন রাতেই অবশ্য অভী ছাড়া পেয়ে যায়। কিন্তু তারপর থেকে শুরু হয় আনন্দীর উপরে অত্যাচার।
পানির ঝাপটা চোখে মুখে পড়তেই নিভু নিভু করে চোখ খুলতে থাকে আনন্দী। হুট করে আলোর রশ্মি গুলো চোখে পড়তেই চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। কোলাহল কানে আসছিলো ঠিকই।কিন্তু সম্পূর্ণ চোখ খুলে তা দেখার মতো শক্তি তখন ও সঞ্চয় আনন্দীর। চোখ কচলিয়ে একটু একটু করে তাকায় আনন্দী। সামনে বাবা মা এবং কলেনির কয়েকজন আন্টি-কাকিমারা রয়েছে। প্রত্যেকের আর্কষণের কেন্দ্র বিন্দু এখন স্রেফ মাত্র আনন্দী।

নিজেকে নিজের সয়ং কক্ষে আবিষ্কার করে পুরো পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা চালিয়ে যায় সে। কিন্তু মনের মধ্যে একটি ভয় এবং শঙ্কা তখন ও বিদ্যমান। তার বাবা কী সব জেনে গেলো? কীভাবে মুখ দেখাবে সে তার বাবাকে? আর বাবাই বা কীভাবে সমাজে মুখ দেখাবে? শত প্রশ্ন এবং শঙ্কার মাঝেই আনন্দীর মা বলে ওঠে,__শরীর কী ভালো লাগছে আনন্দী?”
আনন্দী কোনো উত্তর দিলো না।বরং মাথা নেড়ে দু-বার উপর নিচ ঝাকালো।তারপর মা আবার ও বললো,__এভাবে না খেয়ে আর চলাচল করবি না। আজ স্নেহা না থাকলে কী হতো বলতো? রাস্তায় পড়ে থাকতি তো।” স্নেহার নাম শুনতেই শরীরে অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেলে আনন্দীর। এই একটি নাম-ই তার জীবনের অশুভ ছায়া। তার জন্যই অভী এসেছে তার জীবনে। কিন্তু স্নেহাকে অভী ছেড়ে দিলো।মাঝ থেকে জীবনটা বিষদময় হয়ে গেলো আনন্দীর।

পাশ থেকে আনন্দীর বাবা বলে,__ওকে রেস্ট নিতে দাও। সামনে পরীক্ষা। এতো চাপ দেওয়া যাবে না।” বাবার স্নেহাতুল্য কথাগুলো ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল আনন্দীকে। এই লোকটা কত কী সহ্য করেছে তার জন্য। কত অপমান। কত লাঞ্ছনা।কত অসম্মান। আপনাআপনি চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়েপড়ে আনন্দীর। বাবা পরম যত্নে চোখের পানি মুছে দিয়ে তাকে রেস্ট নিতে বলে।আনন্দী ও মাথা নাড়ে।
পরিবার পরিজন কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলে আনন্দী নিজের মুখ চেপে ধরে কান্না শুরু করে। শব্দ না বের হলে ও শরীরের বেগতিক কম্পন বলে দিচ্ছে তার মনের ক্ষতটি ঠিক কতটুকু। উঠে বসে ওয়াশরুমে চলে যায় আনন্দী। সে তো অপবিত্র। গোসল ছাড়া পবিত্র হবে কীরে? শরীরের পবিত্র না আসলে ও কাপড়ের পবিত্রতা তো আসবেই।

ঝর্নায় পানি ছেড়ে দিয়ে অভীর স্পর্শ গুলো ধুতে ব্যস্ত হয়ে পরে আনন্দী। হুট করে সামনে থাকা মিরের দিকে চোখ চলে যায় তার।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আনন্দী সেই আয়নাতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলো না। বরণ তার সাথে হয়ে যাওয়া ঘটনা গুলো বারবার চোখের সামনে রিপিট হতে লাগলো। অভীর নিঃশ্বাসের সাউন্ড। হাঁপিয়ে ওঠা তার শরীর।আনন্দীকে শক্ত করে পিষে ধরা সব কিছুই চলচিত্রের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। অভীর রাশ ভারি নিঃশ্বাস টুকু ও। শেষ মুহুর্তে অভী কেমন যেন ছটফট করছিলো।সে সমস্ত জিনিস বার বার আনন্দীর কানে ভেসে উঠতে লাগলো।
দু-কানে হাত দিয়ে বসে পরে আনন্দী। শরীর ও থরথর করে কাঁপতে থাকে তার। উঠে তড়িঘড়ি করে লোফাতে বডি ওয়াশ লাগিয়ে শরীর ঘোষতে থাকে আনন্দী। যেন ঘোঘলেই সমস্ত ক্ষত সমস্ত চিহ্ন মুছে যাবে।
শরীরের ক্ষত একসময় মুছে গেলে ও।মনের ক্ষত কী-রে মুছে যাবে?
ফর্সা শরীর ঘসে লাল করে ফেলে আনন্দী। তবু ও অভীর গভীর স্পর্শ গুলো যেন শরীর থেকে যাচ্ছেই না তার।

একটা লম্বা সাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে আনন্দী। চোখ মুখ শরীর সব একদম লাল টুকটুকে হয়ে গেছে তার। আয়নার সামনে দাড়ানোর মতো সাহস ও পাচ্ছে না সে। বিছানায় বসে চুল গুলো মুছতে মুছতে ঘড়ির দিকে তাকায় আনন্দী। রাত ৯ টা বেজেছে। হয়তো মা রান্না শেষ করে খাবার দিয়ে ও দিয়েছে। কিন্তু আনন্দী সবার চোখে চোখ রাখবে কী করে? হাজারটি প্রশ্ন নিয়ে বিছানায় যখন চুপচাপ বসেছিলো আনন্দী।ঠিক তখনই তার ফোনে অভীর কল আসে। তাও ভিডিও কল। যেটা দেখার সাথে সাথে আনন্দীর মুখের আদল পরিবর্তন হয়ে যায়।

কিছু ক্ষণ ফোন বেজে কেটে যায়। কিন্তু আনন্দী কলটি রিসিভ করার মতো সাহস জুগিয়ে উঠতে পারে না। এভাবে তিন-চার বার কল বাজতেই থাকে।কিন্তু আনন্দী কলটি ধরে না। শেষ বার কল কেটে যেতেই wp তে একটি ভিডিও সেন্ড হয়। নোটিফিকেশন আসার সাথে সাথেই আনন্দী অপেন করে দেখে তার ভিডিও। জ্ঞজ্ঞান হীন আনন্দীকে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে তুলছে অভী। তার হাতের অস্পর্শ গুলো ও আনন্দীর স্পর্শ কাতর স্থানে। মুহুর্তেই নিজেকে দু-পয়সার মেয়ে মানুষ মনে হতে থাকে আনন্দীর।
ভিডিওটা সম্পূর্ণ শেষ হতে না হতেই অভী আবার ও কল দেয়। আনন্দী দেরি না করে কলটি রিসিভ করে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে সামনের দিকে।

উন্মাদনা পর্ব ১২

অভীর চোখ মুখ স্পষ্ট লাল। দেখে মনে হচ্ছে নে’শা করেছে সে। আনন্দী কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে অভীর দিকে। অভী কোনো কথা না বলে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে আনন্দীর দিকে। এভাবেই কথোপকথন বিহীন কিছু ক্ষণ চলে যায়। অভী আড়মোড়া দিয়ে বলে,__ ড্রে’স খুলে আমার সামনে দাড়া।”

উন্মাদনা পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here