উন্মাদনা পর্ব ২১
কায়নাত খান কবিতা
“ তাতে আমার বা:ল ছিঁড়ে গেলো।”
প্রচণ্ড ভয় পেয়ে কানে হাত চেপে চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়ে আনন্দী। আতঙ্কে তার পুরো শরীর কাঁপছে। নিঃশ্বাস যেন গলায় আটকে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ মাটিতে বসে থাকার পর হঠাৎই পিছন থেকে কেউ তাকে ধরে।
আনন্দী চমকে উঠে পিছনে তাকায়। সামনে তার বাবা দাঁড়িয়ে। আশেপাশে কোথাও অভীর কোনো অস্তিত্ব নেই। মুহূর্তেই বুকের ভিতরটা ধক করে ওঠে তার। তাহলে কি এতক্ষণ সে সবকিছু হ্যালুসিনেট করছিলো?
আকরাম শেখ উদ্বিগ্ন গলায় বলে ওঠেন,
“কীরে আন্দু মা? হাতে লাগলো কীভাবে?”
আনন্দী কোনো উত্তর দেয় না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখেমুখে এখনো ভয় স্পষ্ট।কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে তার মা। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে আনন্দীকে ধরে ভিতরে নিয়ে যান। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে চিন্তিত গলায় বলেন,
“তুই কি আন্দোলনে গেছিলি আনন্দী?”
আনন্দী ধীরে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝায়। সত্যিই সে আন্দোলনে গিয়েছিলো।
মা আহত হাতটার দিকে তাকিয়ে আফসোসের সুরে বলেন,
“ইস! কতটা লেগেছে। কেন গেলি বলতো? সারাবছর তো পড়াশোনা করিস, তাহলে আন্দোলনে যাওয়ার কী দরকার ছিলো? তোরা ও না…”
মেয়ের এমন অবস্থা দেখে মায়ের মাথা ঠিক নেই। তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন আনন্দীকে নিয়ে। আর বাবা কোনো দেরি না করে আনন্দীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ডাক্তার হাতটা দেখে ওষুধ লিখে দেন।
ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় আনন্দী। গত কয়েকদিনের মানসিক চাপ, ভয় আর শারীরিক ক্লান্তি যেন একসাথে এসে তাকে পুরোপুরি অবসন্ন করে ফেলেছিলো।
এদিকে আন্দোলনের কারণে পরীক্ষাও কিছুদিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। খবরটা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আনন্দী।
অন্তত কিছুটা সময় সে পেলো নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য। তবে পরীক্ষা ঠিক কবে হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট খবর নেই।
দিনগুলো ধীরে ধীরে কাটতে থাকে। বেশিরভাগ সময়ই বাড়িতেই থাকে আনন্দী। মা নিয়ম করে ওষুধ খাওয়ান, বাবা খোঁজ নেন বারবার। পরিবারের যত্ন আর বিশ্রামে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে সে। হাতের ব্যথাও আগের তুলনায় অনেকটাই কমে আসে।
তবু মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় আনন্দীর। অকারণে বুক ধড়ফড় করে ওঠে। মনে হয়, সেই ভয়ংকর মুহূর্তগুলো এখনো তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
এর মাঝে সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় ছিল একটাই,অভী আর কোনোভাবে আনন্দীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। না কোনো টেক্সট, না কোনো কল। এমনকি নিজের কাছে আসতেও বলেনি তাকে।
অভীর এভাবে হঠাৎ করেই জীবন থেকে গায়েব হয়ে যাওয়াটা অদ্ভুত এক শান্তি এনে দেয় আনন্দীর মনে। ধীরে ধীরে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, হয়তো সত্যিই সব কিছু শেষ হয়ে গেছে।
যে মানুষটার উপস্থিতি একসময় তার নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভারী করে তুলতো, সেই মানুষটার অনুপস্থিতি এখন তাকে হালকা লাগায়। বহুদিন পর নিজের ঘরে, নিজের মতো করে একটু স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারে আনন্দী।
তার মনে হতে থাকে, অবশেষে সেই ভয়ংকর কালো ছায়াটা তার জীবন থেকে সরে গেছে। এখন আর কেউ তাকে আতঙ্কিত করবে না, অদ্ভুতভাবে নজরদারি করবে না, কিংবা হঠাৎ করে সামনে এসে দাঁড়াবে না।
কিন্তু ভাগ্য হয়তো এত সহজে কাউকে মুক্তি দেয় না। মাঝে মাঝে অকারণেই আনন্দীর বুক কেঁপে ওঠে,যেন ঝড় থেমে গেলেও বাতাসে এখনো তার শব্দ রয়ে গেছে।
পড়ন্ত বিকেলে ছাদের এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল আনন্দী। খোলা চুলগুলো হালকা বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়ছিল। চারপাশে শীতল আবহওয়া, আকাশে ফিকে রোদ— সবটা মিলিয়ে মনটা অনেকদিন পরে একটু হালকা লাগছিল তার।
হঠাৎ ফোনে টেক্সটের শব্দ হতেই চমকে ওঠে আনন্দী। স্ক্রিনে নামটা দেখেই বুক ধক করে ওঠে, অভী।
এতদিন পর অভীর মেসেজ দেখে অস্বস্তি আর কৌতূহল একসাথে ভর করে তার মনে। আবার কী চায় সে? কেন হঠাৎ ফিরে এলো? নানা প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে ঘুরতেই টেক্সট খুলে দেখে একটি ছবি।
ছবিটা আজকের, এই ছাদেই বসে থাকা আনন্দীর। ছবির এক জায়গায় গোল চিহ্ন দেওয়া। নিচে ছোট্ট করে লেখা,
“শরীর ঢাক, বোকাচন্দ্র!”
কপাল কুঁচকে যায় আনন্দীর। খেয়াল করতেই দেখে, তার ওড়নাটা কাঁধ থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছিল। তাড়াহুড়ো করে ওড়না ঠিক করে নেয় সে, সঙ্গে চাদরটাও ভালোভাবে জড়িয়ে ফেলে।
কিন্তু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েও আচমকা থমকে যায়।
এই ছবিটা অভী পেল কোথা থেকে?এটা তো একদম এই মুহূর্তের ছবি!মুহূর্তেই অস্বস্তি আবার ফিরে আসে। তড়িঘড়ি চারপাশে তাকায় আনন্দী। ছাদের একপাশ, সিঁড়ির মুখ, পাশের বিল্ডিং,কোথাও অভীকে দেখা যায় না।
ঠিক তখনই আবার ফোনে নতুন মেসেজ আসে।
“ বাল_ইকা! তোমায় দেখলে মনে হয়.. তোমার পেটে আমার বাচ্চা..আব্বা.. আব্বা..কয়..ওগো আব্বা..আব্বা..কয়!”
মেসেজের ভাষা দেখে আনন্দীর মুখ গরম হয়ে ওঠে বিরক্তি আর রাগে। কথাগুলো ইচ্ছে করেই তাকে বিব্রত করার মতো, ঠাট্টা-মশকরায় ভরা।
আবার চারপাশে তাকায় সে। বাতাস বইছে, ছাদ ফাঁকা, অথচ মনে হচ্ছে কেউ যেন তাকে দেখছে। অভী কোথাও নেই।কিন্তু তার উপস্থিতিটা যেন অদৃশ্য ছায়ার মতো চারপাশে লেগে আছে।
আনন্দী আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না। দ্রুত উঠে দাঁড়ায় সে। বুকের ভিতরটা অদ্ভুত আতঙ্কে ধুকপুক করছে।
অভী যদি তাকে দেখতে পেয়ে থাকে, তাহলে সে আশেপাশেই কোথাও আছে। হয়তো খুব কাছেই। এই ভাবনাটাই গা শিউরে ওঠার জন্য যথেষ্ট।
তাড়াহুড়ো করে চাদরটা ভালোভাবে জড়িয়ে নেয় আনন্দী। তারপর একবার চারপাশে তাকায়। ছাদটা এখন অস্বাভাবিক রকম নিরব লাগছে। ঠান্ডা বাতাস বইছে, কিন্তু সেই বাতাসেও যেন অদৃশ্য কারও উপস্থিতি মিশে আছে।
মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, কেউ একজন তাকে গভীরভাবে লক্ষ্য করছে। কোথাও লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভয়টা আরও চেপে বসতেই দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায় আনন্দী। এখন আর এক মুহূর্তও এখানে থাকা নিরাপদ মনে হচ্ছে না তার।
দরজা খুলে সিঁড়িতে প্রথম পা রাখতেই আচমকা কেউ পিছন থেকে শক্ত করে আনন্দীর কোমর জাপ্টে ধরে। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে কিছু বোঝার আগেই তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় চিলেকোঠার অন্ধকার কোণের দিকে।
আতঙ্কে চিৎকার করতে যায় আনন্দী, কিন্তু তার আগেই এক শক্ত হাত এসে মুখ চেপে ধরে। শব্দগুলো গলার মাঝেই আটকে যায়।
উন্মাদনা পর্ব ২০
মুহূর্তেই পুরো শরীর জমে যায় তার। বুকের ভিতর ধকধক শব্দ যেন কানে বাজতে থাকে। ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে আনন্দী, কিন্তু লোকটার শক্তির কাছে সে একদম অসহায়।
চারপাশ অন্ধকার আর নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও হালকা বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
আর ঠিক তখনই তার কানের কাছে ঝুঁকে পরিচিত একটা গলা ফিসফিস করে ওঠে,
“এত ভয় পাস কেন, বোকাচন্দ্র?”
