Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ২৬

এই অবেলায় পর্ব ২৬

এই অবেলায় পর্ব ২৬
সুমনা সাথী

মেঝেতে পা ছড়িয়ে আয়েশ করে বসেছে কলরব। কোলে দিয়া। কলরবের হাতে ধরা তার গিটার। নিযানা পাশে বসে মুগ্ধ হয়ে দেখছে ওদের খুনসুটি। কলরব যখনই দিয়ার ছোট্ট হাতটা ধরে গিটারের তারে মৃদু টোকা দিচ্ছে, অমনি ঝংকারে কেঁপে উঠছে চারপাশ। সেই সুরের মূর্ছনায় দিয়া কী যে খুশি! সে খিলখিল করে হেসে উঠছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে পা রাখল দিব্য। মাত্রই বাড়ি ফিরেছে ওরা। মৌনিতা আর কায়েফের কাছ থেকে দিয়ার অভিমানের কথা শুনেই বুকটা দুরুদুরু করছিল ওর। কিন্তু ঘরের ভেতরের এই নির্মল দৃশ্য একরাশ স্বস্তি নেমে এল তার হৃদয়ে। নিযানাই প্রথম দিব্যকে দেখতে পেল। সে দিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
‘ওই তো তোমার পাপ্পা চলে এসেছে! দেখলে তো? এতক্ষণ মিছিমিছি কত কান্না করলে তুমি।’
দিব্যকে দেখামাত্রই দিয়ার হাসিমাখা মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা হয়ে গেল। অভিমানী মেয়েটি গাল ফুলিয়ে বুক বরাবর হাত ভাঁজ করে বসে রইল। দিয়ার এমন গাম্ভীর্য দেখে কলরব ঠোঁট টিপে হাসছে। দিব্য নিজেকে বড্ড অসহায় বোধ করল। কলরব টিপ্পনী কেটে বলল,

‘এই নাও তোমার জীবন্ত বোমা! এতক্ষণ কোনোমতে সামলে রেখেছিলাম। এবার যদি ব্লাস্ট হয় তবে আমার কোনো দায় নেই।’
দিব্য দিয়ার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। দিয়া ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। দিব্য আদুরে স্বরে বলল,
‘কী হয়েছে আমার সোনা মাম্মাটার? মন খারাপ করেছিলো বুঝি? কান্না করছিলে? মুখটা কেমন শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে!’
দিব্য ওকে কোলে তুলে নিতে হাত বাড়াতেই দিয়া বসা থেকে উঠে পড়ল। বেশ খানিকটা দূরে সরে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালো। কলরব তখন গিটার হাতে উঠে দাঁড়িয়েছে। দিব্যর নজর গিটারটার দিকে পড়তেই অবাক হয়ে বলল,
‘তুই আবার গিটার কিনেছিস? কবে কিনলি? আব্বু যদি কোনোভাবে জানতে পারে তবে কী হবে একবার ভেবে দেখেছিস?’
কলরব কোনো কথা না বলে গিটারটা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আলমারির আড়ালে লুকিয়ে রাখল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

‘উনার সমস্যাটা ঠিক কোথায়? আমি কি ওনার টাকা দিয়ে গিটার কিনেছি? সবসময় এই ফালতু ঝামেলাগুলো কেন করেন জানি না। আর কতদিন নিজের সিদ্ধান্তগুলো আমার ওপর চাপিয়ে দেবেন তিনি?’
দিব্য ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে শুধু ভাবল। এই ছেলেটাকে নিয়ে সে কী করবে! এই নিয়ে পাঁচ নম্বর গিটার এটা। আগের চারটে গিটার আরশাদ তালুকদার নিজ হাতে ভেঙে চুরমার করেছেন। তবুও কলরবের জেদ কমে না। কোথা থেকে যেন টাকা জোগাড় করে আবারও একটা নতুন যন্ত্র নিয়ে হাজির হয়। তারপর আবার ধরা পড়ে। দিব্য কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘টাকা পেলি কোথায়? এবার কী বিক্রি করে এটা কিনেছিস?’
কলরব নিস্পৃহ ভঙ্গিতে জবাব দিল, ‘আমার একটা কিডনি।’
কলরবের কণ্ঠে লেশমাত্র অনুশোচনা নেই, বরং এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। তার উত্তর শুনে নিযানা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। দিব্যর ধৈর্যের বাঁধ এবার আলগা হতে শুরু করেছে। কিন্তু মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সে তর্কে জড়িয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরে প্রবেশ করল নবনী। ঘরের থমথমে পরিবেশ দেখে তার কপালে সামান্য চিন্তার ভাঁজ পড়ল। দিব্য নিজেকে সংবরণ করে কঠিন গলায় বলল,

‘তোর সাথে অযথা বাক্যবিনিময় করার সময় এখন আমার নেই। তবে একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ কলরব, তুই যথেষ্ট বড় হয়েছিস। এই ছেলেমানুষি আর উড়নচণ্ডী স্বভাব এখন আর তোকে মানায় না। এসব গিটার বাজানো আর গান-বাজনা দিয়ে কখনো জীবন চলে না। এটা কোনো ক্যারিয়ার হতে পারে না।’
কলরব দ্রুত মাথা নেড়ে সায় দিল। যেন সে দিব্যর প্রতিটি শব্দের সাথে একমত। অথচ তার চাউনি বলে দিচ্ছে দিব্যর উপদেশগুলো তার এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে অনায়াসে বেরিয়ে যাচ্ছে। দিব্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল; এই ছেলেকে বশ করা বা বোঝানো কার সাধ্য! শত শত বার একই কথা বলেও যেখানে কোনো লাভ হয়নি; সেখানে নতুন করে আশা করাটাও বৃথা। যে নিজে থেকে বুঝতে চায় না, তাকে পৃথিবী উল্টে দিলেও বোঝানো সম্ভব নয়। পরিস্থিতি দেখে নবনীর মনে হলো ছোটখাটো কোনো ঝড় বয়ে গেছে। সে কোমল স্বরে শুধাল,
‘আপনি ওর সাথে এভাবে কথা বলছেন কেন? ভাইয়া, তুমি আবার কী করেছো?’
দিব্য বিরক্ত হলো। তপ্ত গলায় বলল, ‘এসে গেছে ভাইয়ার মায়ের পেটের ভাবি! আগে তো কেবল আম্মুই ওকে মাথায় তুলে রাখত, তারপর মৌনিতা যুক্ত হলো। এখন আবার তুমিও শুরু করলে! তোমাদের সমস্যাটা কী বলো তো? তোমরা কি ওকে কোনোদিন মানুষ হতে দেবে না?’

নবনী হতবাক হয়ে রইল। সে কেবল সাধারণ একটা প্রশ্নই তো করেছিল। তাতে এতটা চটে যাওয়ার কী আছে? তার মতে সবসময় শাসন আর রক্তচক্ষু দিয়ে মানুষকে সঠিক পথে আনা যায় না। তবুও তর্কের খাতিরে সে আর কোনো কথা বাড়াল না। চুপচাপ সরে গিয়ে দিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দিয়া তখনো গাল ফুলিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। নবনী অত্যন্ত মায়াবী গলায় ডাকল,
‘দিয়া… সোনা আমার! কী হয়েছে মাম্মা? তুমি কি মাম্মার সাথেও কথা বলবে না?’
দিয়ার মন খারাপ কাটতেই চাইছে না। সে ছোট ছোট হাত দুটো বুকের ওপর শক্ত করে ভাঁজ করে বলল,
‘নো, নেভার! দিয়া এখন অনেক এংরি।’
নবনী অসহায় চোখে দিব্যর দিকে তাকাল। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিব্য কাছে গিয়ে নরম স্বরে বলল,
‘পাপ্পা বুঝতে পারছে দিয়া অনেক রেগে আছে। কিন্তু দিয়া কি জানে, পাপ্পা তার জন্য এক চকলেট আর সুন্দর সব খেলনা নিয়ে এসেছে?’
দিয়া তাতেও টলল না। মুখটা আরও একটু কুঁচকে বলল,

‘চায় না! দিয়ার কিচ্ছু চাই না। ও কিচ্ছু নেবে না।’
অগত্যা দিব্য দিয়ার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। মেয়ের ছোট্ট একটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে তালুর ওপর আলতো করে চুমু খেল। তারপর অনুতপ্ত কণ্ঠে বলল,
‘আচ্ছা মা, পাপ্পা খুব বড় ভুল করে ফেলেছে। পাপ্পা মন থেকে স্যরি বলছে। দিয়া কি এবারের মতো পাপ্পাকে একটুও ক্ষমা করবে না? বিনিময়ে দিয়া যা পানিশমেন্ট দেবে, পাপ্পা মাথা পেতে নেবে।’
দিয়া কিছুক্ষণ বড় বড় চোখে দিব্য আর নবনীকে পরখ করল। তারপর গালে হাত দিয়ে খুব গুরুত্বের সাথে কিছু একটা ভাবল। খানিক বাদে সে গম্ভীর মুখে বলল,
‘আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে পাপ্পা কান ধরো। মাম্মা, তুমিও ধরো! তুমিও খুব দুষ্টু হয়ে গেছো। দিয়া আজ তোমাদের দুজনকেই পানিশমেন্ট দেবে।’
উপস্থিত কলরব এই দৃশ্য দেখে শব্দহীন হাসলো। নবনী কিছুটা দ্বিধা নিয়ে দিব্যর দিকে তাকাতেই দেখল, দিব্যর মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই; সে ইতিমধ্যেই নিজের দুই কানে হাত দিয়ে অপরাধী সেজে বসে আছে। নবনীও তার দেখাদেখি নিজের কান ছুঁল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিযানার খুব হাসি পেল কিন্তু সে অতি কষ্টে হাসি চেপে রাখল। দিয়া বলল,

‘পাপ্পা, এবার ওঠবস করো। আর মাম্মা, তুমি বলো ‘স্যরি। আর কখনো এমন হবে না।’
নবনী অসহায় চোখে দিব্যর দিকে চাইল। মানুষটা কি সত্যিই এখন কান ধরে ওঠবস করবে? কলরব শব্দ করে হেঁসে ফেলল। দিব্য সেদিকে একবার চেয়ে বলল,
‘মাম্মা, চলো না আমরা নিজের ঘরে গিয়ে পানিশমেন্টটা শেষ করি? এটা তো চাচ্চুর ঘর। অন্যের ঘরে বেশিক্ষণ থাকা মোটেও ঠিক না।’
নবনী বলল, ‘স্যরি সোনা, আর এমন হবে না। চলো এবার ঘরে যাই?’
কলরব ফোড়ন কাটল, ‘কেন? ঘরে কেন? যা হওয়ার এখানেই হোক। আমরাও একটু দেখি!’
দিব্য কলরবের দিকে আগুন দৃষ্টিতে তাকাতেই সে হাসলো। নবনী দ্রুত দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরের বাইরে পা বাড়াল। দিব্যও আর কথা না বাড়িয়ে তাদের অনুসরণ করল।
নিযানা কুঞ্চিত ভ্রুতে কলরবকে দেখছিল। কলরব ভ্রু নাচিয়ে তাকে বিদ্রূপ করল। নিযানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারির দিকে এগুলো; এখনো তার গোসল করা হয়ে ওঠেনি। বেশ কিছুক্ষণ পর সে যখন ওয়াশরুম থেকে বের হলো। দেখল কলরব ফোনে কারোর সাথে জোরালো গলায় কথা বলছে। তার কণ্ঠস্বর রাগান্বিত। নিযানা কেবল শেষ বাক্যটি শুনতে পেল,

‘আমি বললাম না ও জাহান্নামে যাক! আমি ওর ছায়াও মাড়াতে চাই না। মুখ দেখাতো দূরের কথা! তুই আর কিছু বললে তোর মুখ ও দেখবো না।’
ফোনটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে কলরব পেছন ফিরতেই দেখল নিযানা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল মুছছে। নিযানা আড়চোখে কলরবকে দেখল। সবার সাথেই এমন রুক্ষ আচরণ করে? আগে তো এমনটা ছিল না; কিছুটা উগ্র মেজাজের হলেও প্রাণখোলা ছিল। ঠাট্টা-তামাশা করতে ভালোবাসত। কাউকে ভালোবেসে না পাওয়ার যন্ত্রণা কি মানুষকে হাসতে ভুলিয়ে দেয়? নিযানা এসব সাত-পাঁচ ভেবে হেয়ার ড্রায়ারটা চালু করার চেষ্টা করল। কিন্তু যন্ত্রটা এক চালু হলোনা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কয়েকবার পরখ করে কাজ না হওয়ায় মেজাজ হারিয়ে ড্রায়ারটার ওপর সজোরে একটা চড় বসাল সে। কলরব পাশ থেকে ধমক দিয়ে উঠল,
‘ওটাকে কি তোর টিভির রিমোট মনে হয়েছে? যে একটা চড় মারলেই ঠিক হয়ে যাবে? অবশ্য তোরা ও কি আমাদের মতো গরীবী কাজ করিস নাকি! তোর বাপ তো…।’
কলরবের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিযানা তর্জনি উঁচিয়ে শাসাল,
‘খবরদার! আমার আব্বুকে নিয়ে একটা বাজে কথা বলবে না। এটা কাজ করছে না তো আমি কী করব? তোমার জিনিস তোমার মতোই জঘন্য!’

কলরব তড়িৎবেগে এগিয়ে এসে ড্রায়ারটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
‘দে, আমার জিনিস আমাকে ফেরত দে! একদম ছুঁবি না এটা।’
নিযানা হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘দেব না! কী করবে তুমি?’
শুরু হলো দুজনের মধ্যে টানাটানি। কলরব একহাতে নিযানার একটা হাতের কব্জি তার পিঠের দিকে মুচড়ে ধরে অন্য হাতে ড্রায়ারটা নেওয়ার চেষ্টা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে হুট করে ড্রায়ারটা চালু হয়ে গেল। বাতাসের ঝাপটা নিযানার মুখে লাগতেই সে ভীষণ চমকে উঠল। আতঙ্কে হাত থেকে ড্রায়ারটা ছেড়ে দিয়ে সে টাল সামলাতে না পেরে সরাসরি কলরবের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। ভয়ে এক হাতে কলরবের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। অপ্রত্যাশিত এই ধাক্কায় কলরব দু-পা পিছিয়ে গেল। মুহূর্তেই এক অদ্ভুত অনুভূতি তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল; বুকের ভেতরটা অজানা এক স্পন্দনে ধক করে উঠল। নিযানা তখনো চোখ বন্ধ করে কলরবের বুকে মুখ গুঁজে আছে। তার তপ্ত নিশ্বাসের ছোঁয়া কলরব স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। হেয়ার ড্রায়ারটা কলরব একহাতে ধরে নিয়েছে। নিজেকে সামলে নিয়ে কণ্ঠস্বরে কিছুটা ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলল,

‘দুনিয়াটা এখনো উল্টে যায়নি আর তুইও বেঁচে আছিস। সমস্যাটা কী তোমার, বেইবি?’
শেষের শব্দটি সে ঠিক আনতাসার ঢঙে টেনে উচ্চারণ করল। নিযানা তড়িঘড়ি করে মাথা তুলে তাকাল। কলরব কুঞ্চিত ভ্রু’তে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিযানা চরম বিরক্তিতে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
‘হাত ছাড়ো, বাঁদর কোথাকার! আর খবরদার! ওই নামে আমাকে কখনো ডাকবে না!’
কলরব ওর হাতটা ছেড়ে দেয় না বরং হাতের কব্জিটা এবার আরও শক্ত করে চেপে ধরে। নিযানা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলো। কলরব দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় শুধাল,
‘বাঁদর বললি আমাকে? আমি বাঁদড়?’
‘বেশ করেছি বলেছি। হাজার বার বলব। ব্যথা পাচ্ছি আমি! হাত ছাড়ো কলরব।’
‘তাতে আমার কী? আগে ‘স্যরি’ বল। তবেই ছাড়া পাবি।’
‘নিষ্ঠুরতারও একটা সীমা থাকা উচিত।’
‘ত্যাড়ামিরও!’
‘আমাকে ত্যাড়া বলছো?’

নিযানা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করল। মুহূর্তেই দুজনের চাউনি একে অপরের ওপর স্থির হলো। নিযানা আজ নেভি ব্লু রঙের একটা শর্ট কুর্তি পরেছে। ওড়না সে সচারাচর পরেনা। গায়ের উজ্জ্বল ফর্সা রঙে গাঢ় নীলটা যেন অদ্ভুত এক দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সদ্য ধোয়া ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে কুর্তির কাঁধে। গলার ভাঁজে জমে থাকা পানির কণাগুলো চিকচিক করছে। চশমাটা না থাকায় অন্যরকম লাগছে। মুখশ্রীতে এক স্নিগ্ধ শুভ্রতা ভর করেছে; রাগ কিংবা যন্ত্রণায় ফর্সা মুখটা হালকা রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কলরব হঠাৎ করেই ঝটকা দিয়ে হাতটা ছেড়ে দিল। হেয়ার ড্রায়ারটা একপ্রকার নিযানার হাতে গুঁজে দিয়েই সে আলমারি থেকে নিজের পোশাক বের করে তড়িঘড়ি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। নিযানা সেখানে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কলরবের আচমকা এইভাবে চলে যাওয়া সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। হাতের কব্জিটার দিকে তাকাতেই দেখল আঙুলের চাপে জায়গাটা টকটকে লাল হয়ে আছে। ব্যথার জায়গাটা আলতো করে ছুঁয়ে তার মেজাজ আরও খারাপ হলো। জঘন্য ছেলেটা। একটা আস্ত শয়তান।’

দিব্য তালুকদারকে কান ওঠবস করতে দেখবে এটা নবনী বিশ্বাসী করতে পারছে না৷ সাথে দিব্যর চুপসে যাওয়া মুখটা দেখে মায়া হচ্ছে। দিয়া খাটের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। দিব্য ওর সামনে দাঁড়ানো। ঘরে আসার পর দিয়াকে সে বোঝানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু সম্ভব হচ্ছেনা। নবনীর কেমন যেন লজ্জা লাগছে। ঘর থেকে চলে যেতে মন চাইছে। ওর কি চলে যাওয়া ঠিক হবে। নিশ্চয়ই এটায় ঠিক হবে। নয়তো পরে দেখা যাবে লোকটা বলবে, নবনী তোমার ম্যানার্স কোথায়? আমি কান ওঠবস করছি আর তুমি দেখছো? তোমার কি চলে যাওয়া উচিত ছিলো না? কথাটা ভাবতেই নবনী আনমনে ফিক করে হেঁসে ফেলল। পরক্ষণেই দিব্যর তীক্ষ্ণ চোখে চোখ পড়তেই পিলে চমকে উঠলো ওর। ছিঃ এটা সে কি করলো। দিব্য শান্ত মুখে বলল,
‘দিয়ার মাম্মা ও খুব মজা পাচ্ছে নাকি? সে ও কি চাই এই সুন্দর, মনোরম দৃশ্য দেখতে।’
নবনী আড়ষ্টতায় নুয়িয়ে গেছে আগেই। গোমড়া মুখে তড়িৎ দুপাশে মাথা নাড়লো। দিয়া বলল,
‘ঠিকআছে। দিয়া তোমার পানিশমেন্ট মাপ করে দেবে। কিন্তু যদি তুমি আমাকে ও মাম্মার মতো বেড়াতে নিয়ে যাও।’
দিব্য মৃদু হাসলো। দিয়ার গালে চুমু খেয়ে বলল,

‘অবশ্যই। ধন্যবাদ রাজকুমারী দিয়া। এই অধম আপনাকে এবং আপনার মাম্মাকে নিশ্চয়ই, অবশ্যই বেড়াতে নিয়ে যাবে। আমরা পুরো একদিন বাহিরে ঘুরবো কেমন?’
দিয়া হাত তালি দিয়ে খিলখিল করে হাসলো। বলল,
‘পাপ্পা, বেস্ট পাপ্পা। আই লাভ ইউ পাপ্পা।’
‘পাপ্পা, লাভ ইউ ইনফিনিটি মাম্মা। আদর দাও।’
দিব্য গাল বাড়িয়ে দিলো। দিয়া ওর ডান গালে চুমু দিলো। পরক্ষণেই দিব্য বা গাল বাড়ালো। দিয়া সেখানেও ঠোঁট ছুঁইয়ে আদর করলো। আবার কপালে ও আদর দিলো৷ তারপর একবার গলা জড়িয়ে ধরলো৷ নবনী এগিয়ে এসে বলল,

‘সব আদর পাপ্পা পাবে? মাম্মা কিছুই পাবে না?’
দিয়া মুখে হাত দিয়ে খিলখিল করে হাসলো। পরক্ষণেই হাত বাড়িয়ে দিয়ে নবনীর কোলে ঝাপিয়ে পড়লো৷ দিব্যর মতো একইভাবে নবনীকে ও আদর করলো। নবনী ও ওকে আদর করলো। অতঃপর বলল,
‘এবার চলো খেতে হবে। দিয়ার নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে। পাপ্পা খুব ক্লান্ত। উনাকে আমরা ফ্রেশ হতে দিই।’
দিয়া মাথা নাড়লো। নবনীর কোল থেকে নেমে দরজার দিকে দৌড় দিলো। নবনী দৌড়াতে বারন করলো। ওর পেছনে যেতে গিয়েও থামতে হলো ওকে।কোনোকিছুতে শাড়ির আঁচল আটকেছে মনেহলো। উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখলো স্বয়ং দিব্য তালুকদারের হাতের মুঠোয় পিষ্ট হচ্ছে সেটি। এর মানে কি? কিছু বলছে ও না। নবনী কিছুটা এগিয়ে গেল জড়তা নিয়ে। দিব্য শান্ত গলায় বলল,
‘ফোন করেছিলে তখন?’

নবনী মুখ তুলে চাইলো। আবার সেই ফোনের প্রসঙ্গে চলেগেছে। এমন করছে যেন ফোন করে বিরাট অপরাধ করে ফেলেছে। মুখের উপরে তো আর নবনী বলতে পারে না। এমন স্বভাব তার কোনোকালেই নেই। বিশেষ করে এই লোকটার সামনে গলাবাজি করা তার সাধ্যের বাহিরে। দিব্য তখনো তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে। নবনী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উত্তর না দিলে তার নিস্তার নেই বেশ বুঝতে পারছে৷ নিচু গলায় বলল,
‘কেনো আমি আপনাকে ফোন করতে পারিনা?’
আচমকা হাতের মুঠোয় থাকা আঁচলটা নিজের দিকে টানল দিব্য। অপ্রস্তুত নবনী মুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে আছড়ে পড়লো প্রশস্ত, শক্তপোক্ত বুকে। তীব্র এক শিহরণে নবনীর সর্বাঙ্গ থরথর করে কেঁপে উঠল। দিব্যর বলিষ্ঠ একটি হাত ততক্ষণে লতার মতো জড়িয়ে নিয়েছে নবনীর পাতলা কোমর। কথা আদায়ের এই অদ্ভুত কৌশলটি দিব্য বেশ ভালোই রপ্ত করেছে। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
‘তা অবশ্যই পারো৷ কিন্তু আমি ভালো করেই জানি অকারণে তুমি ফোন করবেনা। বাজে স্বপ্নটা কি ছিলো? আমাকে নিয়ে ছিলো নাকি?’
নবনী বিস্মিত নয়নে মুখ তুলে চাইলো। দিব্য স্বাভাবিক ভাবেই চেয়ে আছে। নবনী মৃদু মাথা নাড়লো৷ দিব্য অবাক গলায় বলল,

‘তুমি আমাকে নিয়ে স্বপ্ন ও দেখো নাকি?’
নবনী আপাতত কথা খুঁজে পাচ্ছেনা। তার হৃৎপিণ্ড কাঁপছে অস্বাভাবিক। কথা গুলিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বড় কোনো অপরাধ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে৷ স্বপ্ন দেখা কি অপরাধের মধ্যে পড়ে? সে ভেবে পেলনা। আর স্বপ্নের উপর কারো নিয়ন্ত্রণ থাকে নাকি। দোষ হলে বরং যে স্বপ্নে আসে তার দোষ হওয়া উচিত।
‘আর একটু হলে তোমার স্বপ্ন সত্যি হয়ে যাচ্ছিলো। এখন থেকে একটু ভালো স্বপ্ন দেখবে ঠিকআছে।’
নবনী চট করে চাইলো। অবাক হয়ে বলল, ‘কি হয়েছিলো আপনার? আবার কোনো সমস্যা হয়েছে?’
‘তেমন কিছুনা। মজা করছি। আচ্ছা নবনী, তুমি কি জানো এই পৃথিবীতে আমি সবচেয়ে বেশি কাকে ভালোবাসি? দিয়াকে! কারণ এই স্বার্থপর পৃথিবীতে কেবল ওই আমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে জানে। সেটা ওর অবুঝপনা হোক কিংবা অবচেতনের টান। বাসে তো! আমি একটা নীতিতে বিশ্বাসী; কেউ যদি আমাকে সামান্য ভালোবাসে, আমি তাকে তিনগুণ ভালোবাসা ফিরিয়ে দিই। দেব না বলো?’
নবনী ফ্যালফ্যাল নয়নে চেয়ে দুপাশে মাথা নাড়লো শুধু। দিব্য একটু ঝুঁকে এলো নবনীর কানের নিকট। নিচুস্বরে বলল,

‘তোমাকে ইনভিটেশন দিচ্ছি নবনী, বুঝতে পারছো? তোমার কাছে মোক্ষম সুযোগ আছে কাজে লাগানোর। বাদ দাও, তুমি কি জানো আমরা স্বপ্ন কেনো দেখি বা স্বপ্নে অন্য কাউকে কেনো দেখি? যখন আমরা তাকে নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি বা ভাবতে থাকি। মানে বুঝতে পারছো?’
নবনী হেঁসে ফেলল। দিব্যর বুকের কাছের শার্টটা মুচড়ে ধরে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। ঠোঁট কামড়ে হাসি সংবরণ করে বলল,
‘দিয়া অপেক্ষা করছে। আমি কি যাব না?’
দিব্য দেখলো আরক্ত মুখী রমণীকে। কোথায় যেন পড়েছিলো হাসতে থাকা মেয়ের থেকে নাকি হাসি চেপে রাখা মেয়েকে সহস্রগুণ বেশি সুন্দর লাগে। কথাটা দিব্য আজ খুব করে উপলব্ধি করলো। তার সামনেই তো প্রমাণ।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে আরাশাদ তালুকদার ডেকেছে দিব্যকে। বাড়ির বাহিরে বা পাশে সুন্দর একটা বসার জায়গায় করা আছে। পাশে বিভিন্ন ধরনের ফুলগাছ। আরশাদ তালুকদার বসে আছেন সেখানে। তার সামনে কাব্য বসা। দিব্য যেতেই কাব্য সেদিকে চেয়ে বলল,
‘এই তো দিব্য চলে এসেছে।’
দিব্য বাবার গম্ভীর মুখটা লক্ষ করে বলল, ‘কি হয়েছে আব্বু? কোনো সমস্যা?’
আরশাদ তালুকদার বললেন, ‘বোসো।’
দিব্য চেয়ার টেনে বসলো। বসতেই কাব্য বিচলিত হয়ে বলল,
‘তোর নাকি গাড়ি এক্সিডেন্ট হয়েছিলো। কেউ নাকি ইচ্ছা করে তোকে মা রতে চেয়েছিলো, এসব সত্যি? তুই আমাদের কিছু জানাসনি কেনো?’
দিব্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যেটার ভয় পাচ্ছিলো তাই হয়েছে। এরা জেনেই ফেলেছে। আরশাদ তালুকদার ধমকে উঠলেন।

‘চুপ করে আছো কেনো? নিজেকে কি ভাবো তুমি? এত বড় একটা কথা কিভাবে লুকাতে পারো দিব্য? আমার নিজেরই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’
এক্সিডেন্টের পর দিব্য পুলিশে রিপোর্ট করেছিলো। ডাব ওয়ালাকে সহ বাকি যাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাদের ক্ষতিপূরণ ও দিয়েছে। পুলিশ অফিসার ওদের পরিচিত। ফলস্বরূপ আরশাদ তালুকদারকে জানিয়ে দিয়েছে। দিব্য অবশ্য একবার বারন করেছিলো কিন্তু না শোনাটায় স্বাভাবিক। তিনি দিব্যর থেকে আরশাদ তালুকদার ঘনিষ্ট বেশি। দিব্য শান্ত গলায় বলল,
‘এইজন্যই বলতে চাইনি আব্বু। শান্ত হও। আমি অফিসার কে ও বলেছিলাম তোমাকে না বলতে। হ্যাঁ ঘটনা সত্যি। আর গোডাউনে আগুন লাগার ঘটনা টাও আমার ধারনা কাকতালীয় নয়।’
আরশাদ তালুকদার অসহায়বোধ করলেন। চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে আর ছেলে তাকে শান্ত থাকতে বলছে। পুণরায় অস্থির হয়ে বললেন,

এই অবেলায় পর্ব ২৫

‘তাই বলে তুই এত বড় হয়েগেছিস যে এসব আমার থেকে লুকাবি। নিজে নিজে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে নিবি। তোর কিছু হয়েগেলে আমি কি করতাম? আমার ব্যবসা-সম্পত্তি গোল্লায় যাক দিব্য, তোমরা আমার কাছে সবকিছুর ঊর্ধে।’
‘আমি জানি আব্বু।’
কাব্য বলল, ‘পুলিশকে সবটা ঠিকভাবে বলেছিস তো? তোর কি ধারনা কার হাত থাকতে পারে?’
দিব্য একটু ভাবলো। সত্যি বলতে তার নিজের মাথাতে ও কিছু ঢুকছেনা। অনুমান করে বলল,
‘ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে কিছু শত্রু তো তৈরি হয়েছে কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না আমাকে প্রাণে মা রার মতো সিন্ধান্ত কে নিতে পারে। আমাকে মে রে তার বা তাদের কি লাভ হবে?’

এই অবেলায় পর্ব ২৭