এই অবেলায় পর্ব ৩
সুমনা সাথী
দিয়ার ঘরে পা রাখতেই নবনী বুঝতে পারল, তাকে যে ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছে সেটি আসলে অন্য কোনো ঘর। এটিই মূলত অবনী আর দিব্যর ঘর। দিব্যকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত মনে হলো; সে নিজের গায়ে থাকা কোটটা খুলে রেখে দিয়াকে দুহাতে উঁচু করে তুলে খাটের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। মেয়ের মাথা থেকে হেয়ার ব্যান্ড আর ক্লিপগুলো খুলে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল সে। নবনী দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। এই ঘরে তার আদতে আসা উচিত কিনা তা নিয়ে সে দ্বিধাগ্রস্ত। ঠিক তখনই দিয়া ছোট্ট হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। নবনী হাসিমুখে মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
‘কী হয়েছে মাম্মা? কিছু বলবে?’
দিয়া তার ছোট্ট হাতের তালুটা নবনীর বাম গালে রেখে গভীর কোনো ভাবনায় নিমগ্ন হলো। সেই দৃশ্য দেখে নবনীর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। তার মনে পড়ে গেল পুরোনো দিনগুলোর কথা। অবনী আর নবনী ছিল পিঠোপিঠি বোন। কিন্তু নিয়তি তাদের খুব একটা কাছাকাছি থাকতে দেয়নি। নবনীর পরেই ছোট বোন নৌশির জন্ম হলে দুজনকে একসাথে সামলানো মায়ের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। অবনী তখন কিছুটা বড় মায়ের কাজে সাহায্য করতে পারে। তাই তাকে রেখে নবনীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল নানাবাড়িতে। সেখানেই নানা-নানির স্নেহে বড় হয়েছে সে। আশ্চর্যের বিষয় হলো দিয়াকে দেখলেই নবনীর বারবার অবনীর প্রতিচ্ছবি চোখে পড়ছে। বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠছে। এটা কি কেবলই রক্তের টান, নাকি মৃত বোনের প্রতি জমিয়ে রাখা একরাশ অব্যক্ত ভালোবাসা তা নবনী জানে না। তবে বোনকে যে সে কতটা ভালোবাসত, তা আজ তার অনুপস্থিতিতে হাড়ভাঙা যন্ত্রণায় টের পাচ্ছে সে। দিব্য কয়েক পা এগিয়ে এসেও মাঝপথে থমকে দাঁড়াল। দুজনের মাঝখানে এক অদ্ভুত নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে দিয়া তার আধো-আধো কণ্ঠে আবদার করে বসল,
‘তুমি কি আমাকে ড্রেস চেঞ্জ করিয়ে দেবে? তাহলে আমার খুব ভালো লাগবে।’
নবনী ধীরস্থিরভাবে মাথা নেড়ে সায় দিল। কিন্তু দিব্য কিছুটা এগিয়ে এসে বাধা দেওয়ার স্বরে বলল,
‘আমিই তো দিচ্ছি মা। আমি দিলে সমস্যা কোথায়?’
নবনী এবার মাথা তুলে সরাসরি দিব্যর পানে চাইলো। দিব্যও স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল বিধায় মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। নবনী চট করে চোখ সরিয়ে নিলো। লোকটার চোখ দুটো অদ্ভুত রকম সুন্দর! পরক্ষণেই নিজের ওপর বিরক্ত হলো সে। এই পরিস্থিতিতে চোখের সৌন্দর্য বিচার করাটা তার কাছে অর্থহীন মনে হলো। কিন্তু মূল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। দিব্যর আচরণের দ্বিমুখী ভাবটা নবনী ধরতে পারছে না। মেয়ের ভবিষ্যতের জন্যই যদি এই বিয়ে তবে মেয়েকে আগলে রাখার সুযোগ থেকে তাকে কেন বঞ্চিত করা হচ্ছে? নবনী এবার সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেলল,
‘আমি দিয়াকে চেঞ্জ করিয়ে দিলে সমস্যাটা কোথায়? তাছাড়া আপনি তো কাল রাতেই বললেন যে মেয়ের জন্যই এই বিয়েটা করেছেন। তবে কেন বারবার আমাকে ওর কাছে আসতে বাধা দিচ্ছেন?’
কথাটা শুনে দিব্যর মেজাজ হঠাৎ চড়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল, এই মেয়েটিই বিয়ে করবে না বলে বিয়ের আগে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল। বিয়ের আগে অবনী জীবিত থাকতেও নবনী কোনোদিন তাদের বাড়িতে পা রাখেনি কেবল দিব্যকে পছন্দ ছিল না বলে। এই রূঢ় সত্যটা দিব্য একবার আড়ালে শুনে ফেলেছিল। সে চায় না তার মাতৃহীন মেয়ের দায়িত্ব এমন কারো ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে, যার মনে এই পরিবারের প্রতি কোনো টান নেই। গত দুটো বছর সে একাই দিয়াকে সামলেছে। আগামী দিনগুলোতেও সে একাই পারবে। সে নিজের গাম্ভীর্য ধরে রেখে সংক্ষেপে উত্তর দিল,
‘ঠিক আছে, ওকে তৈরি করে দাও জলদি। অনেক বেলা হয়েছে। ওর নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে।’
নবনীর বুকের ভেতর থেকে একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। দিয়া বাবার অনুমতি পেয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। মেয়ের সেই অনাবিল হাসিতে দিব্যর গম্ভীর মুখেও এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। নবনী দিয়ার পোশাক বদলে দিতেই চঞ্চল মেয়েটা খাট থেকে নামার ইশারা করল। মেঝেতে পা রাখা মাত্রই দিয়া দরজার দিকে এক দৌড় লাগাল। নবনী আঁতকে উঠে বলল,
‘দিয়া সাবধানে! ওভাবে ছুটছ কেন? পড়ে গেলে ব্যথা পাবে তো সোনা!’
দিয়াকে ধরার জন্য নবনী যেই না পা বাড়াল, অমনি এক জোরালো টানে সে থমকে গেল। নিজের বাঁ হাতের কব্জিতে এক শক্ত হাতের স্পর্শ অনুভব করল সে। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল দিব্য তার হাত ধরে রেখেছে। মুহূর্তের জন্য নবনীর মস্তিষ্ক যেন অসাড় হয়ে গেল। পরক্ষণেই দিব্য হাতটা ছেড়ে দিয়ে এক অদ্ভুত শীতল চোখে তার দিকে তাকাল। দিব্যর কণ্ঠে ঝরে পড়ল কাঠিন্য,
‘দেখো নবনী, দিয়া আমার মেয়ে। আমি এতদিন ওকে একা সামলাতে পেরেছি; বাকি দিনগুলোও পারব। তোমার জোর করে ওর দায়িত্ব নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি এই বাড়ির বড় বউ, কেবল সেই দায়িত্বটাই পালন করো। শাশুড়ির সাথে রান্নাঘরে সময় দাও। অসুস্থ শ্বশুরের সেবা করো। আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন করো। আমি তোমাকে কোনোদিন অসম্মান করব না। স্বামী হিসেবে তোমার বৈষয়িক সব দায়িত্বও পালন করব। কিন্তু আমার মেয়ের ব্যাপারে তোমার কোনো মাথা ব্যথার দরকার নেই।’
একটু থেমে দিব্য আরও তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, ‘আর তুমি একজন শিক্ষিত বুঝদার মেয়ে হয়েও কেন এমন ননসেন্সের মতো কথা বললে তা আমার বোধগম্য নয়।’
নবনী ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। দিব্যর প্রতিটি শব্দ যেন চাবুকের মতো তার আত্মসম্মানে আঘাত করল। কী বলছে লোকটা? কেন বলছে? হুট করে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল নবনীর কাছে। অভিমানে আর অপমানে তার চোখদুটো ছলছল করে উঠল। বুক ফেটে কান্না আসতে চাইলেও সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। শুধু দিব্যর শেষ কথাটার রেশ ধরে কাঁপাকাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,
‘আমি… আমি ননসেন্সের মতো ব্যবহার করেছি?’
দিব্য তখন বিছানায় অগোছালো হয়ে পড়ে থাকা দিয়ার স্কুল ড্রেসগুলো তুলে নিচ্ছিল। নবনীর কাঁপাকাঁপা কণ্ঠের প্রশ্নের পিঠে সে ফিরে না তাকিয়েই নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
‘তুমি একটা অবুঝ বাচ্চার সামনে কী ধরনের কথা বলছিলে; সেটা কি একবারও ভেবে দেখেছ? কাল রাতে আমি তোমাকে যা যা বলেছি সেগুলো কি দিয়ার কানে যাওয়ার মতো কথা?’
নবনীর ভেতরের তপ্ত প্রতিবাদ মুহূর্তেই যেন তুষারের মতো জমে গেল। সে আসলেই এত কিছু ভাবেনি। দিয়ার প্রতি মায়ার টানে কথাগুলো বলে ফেললেও, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ পায়নি সে। তবে এইটুকু সে পরিষ্কার বুঝল যে, দিব্য তালুকদার অত্যন্ত চাপা স্বভাবের এবং অসম্ভব অহংকারী একজন মানুষ। কাল রাতে লোকটার ভদ্র ব্যবহারে যতটুকু মুগ্ধতা জেগেছিল; আজ তার দ্বিগুণ তিক্ততা নবনীকে গ্রাস করল। সে মাথা নিচু করে খুব ধীরে বলল,
‘দুঃখিত। আমি না ভেবেই কথাগুলো বলে ফেলেছি। তবে আমি ভুল কিছু বলিনি। আপনি এই বিয়েটা কেন করেছেন জানি না কিন্তু আমি দিয়ার জন্যই এই বিয়েটা করতে রাজি হয়েছি। তাই আপনি চাইলেই ওর থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন না।’
দিব্য এবার সামান্য হাসল। সেই হাসিতে ছিল কেবল তীব্র তাচ্ছিল্য। নবনী বুঝতে পারল না এই কথার মধ্যে হাসির মতো কী ছিল। দিব্যর মনে হলো, এই মেয়েটা অবনীর বোন হলেও স্বভাবে দুজনেই দুই মেরুর বাসিন্দা। সে আর তর্কে জড়াতে চাইল না। দিয়ার কাপড়গুলো নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে গিয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।
‘ও হ্যাঁ, তোমার লাগেজ নিয়ে আজই এই ঘরে চলে এসো। কাল মা চেয়েছিলেন আমরা আলাদা ঘরে থাকি কিন্তু দিয়াকে ছাড়া আমার থাকার অভ্যাস নেই বলেই আমি রাতে চলে এসেছিলাম। তাছাড়া, তুমি সারারাত দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়েছিলে কেন?’
নবনীর কাছে এতক্ষণে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো। লোকটা কতখানি ধুরন্ধর আর হিসেবী! সবার সামনে সবটা কীভাবে সামলে নিলো। আবার সকালে সবার ওঠার আগেই আগের ঘরে ফিরে গেছে যাতে কেউ কোনো সন্দেহ করতে না পারে। আড়ালে সবটুকু দূরত্ব বজায় রেখেও লোকটা বাইরের জগতের কাছে নিখুঁত অভিনয়ের চাদর বিছিয়ে রেখেছে। নবনী শুকনো গলায় বলল,
‘আমি কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। আমি নিয়ে আসবো সব।’
দিব্য আর কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করল না। টান পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। নবনীও একরাশ গুমোট অনুভূতি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
পথিমধ্যে নবনী দেখল দুটো ছোট ছেলে তুমুলভাবে ঝগড়া করছে। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছোট্ট দিয়া আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঝগড়া থামাতে। দৃশ্যটা দেখে নবনী দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে দুই পক্ষকে আলাদা করে দিল। জিজ্ঞেস করল,
‘কী করছো তোমরা? এভাবে ঝগড়া করছো কেন?’
নবনী খেয়াল করল বাচ্চা দুটো হুবহু একই রকম দেখতে। নিশ্চয়ই যমজ। তাদের বয়স দিয়ার কাছাকাছিই হবে। তবে এই বাড়িতে দিয়া ছাড়া আরও বাচ্চা আছে সেটা নবনীর জানা ছিল না। ঠিক তখনই ওদিক থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল মৌনিতা। তাদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করল,
‘তোমরা দুইজন কি আবার ঝগড়া শুরু করেছো? আজকের ঝগড়াটা কী নিয়ে শুনি?’
ইভান কান্নাভেজা গলায় অভিযোগের সুরে বলল,
‘দেখো না মাম্মি, সব দোষ এই ইহানের। ও আমাকে আগে মেরেছে। তোমার বিশ্বাস না হলে দিয়াকে জিজ্ঞেস করে দেখো।’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়া সাথে সাথে সায় দিয়ে বলল,
‘হ্যাঁ ছোট চাচি, ইভান একদম ঠিক বলেছে।’
ইহান কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র নয়। দিয়া যে ইভানের পক্ষ নেবে, সেটা তার কাছে নতুন কিছু নয়। এই বাড়িতে দিয়া আর ইভান সবসময়ই এক দলে থাকে। যদিও ইহান জানে সে-ই আগে হাত তুলেছে তবুও নিজের দোষ ঢাকতে সে নিরীহ মুখ করে বলল,
‘দিয়া মিথ্যা বলছে মাম্মি। তুমি তো জানো ওরা দুজন ফ্রেন্ড। তাই মিলেমিশে আমাকে ফাঁসাতে চাইছে।’
মৌনিতা এবার ধমকে উঠল, ‘একদম মিথ্যা বলবে না ইহান। তোমাকে কতবার বারণ করেছি বড় ভাইয়ের গায়ে হাত তুলবে না? তবুও তুমি ওকে মেরেছো!’
ইহান তড়াক করে উত্তর দিল, ‘মাত্র পাঁচ মিনিটের বড়! এটা আবার বড় হওয়া নাকি? আমি ওসব মানি না।’
ছেলের যুক্তির কাছে মৌনিতা হার মেনে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মৌনিতাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ইহান উল্কার বেগে ওখান থেকে পালিয়ে গেল। মৌনিতা চেঁচিয়ে বলল,
‘একবার ধরতে পারি তারপর মজা বোঝাবো!বদমাইশ কোথাকার।’
বাচ্চাদের এই খুনসুটি দেখে নবনীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। মৌনিতা অসহায় মুখে বলল,
‘তুমি হাসছো নবনী? এই ছেলেটা যে কী পরিমাণ দুষ্টু হয়েছে বলে বোঝাতে পারবো না। এদের দুজনকে সামলাতে গিয়ে আমার পাগল হওয়ার উপক্রম!’
নবনী বলল, ‘বাচ্চারা তো একটু দুষ্টুমি করবেই। কিন্তু আমি ওদের আগে দেখিনি কেন?’
মৌনিতা মৃদু হেসে উত্তর দিল, ‘আসলে তুমি তো কাল অনেক রাতে এলে, ওরা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর আজ সকালে তুমি ওঠার আগেই ওরা স্কুলে চলে গিয়েছিল। ওরা যমজ । ইহান আর ইভান। দিয়ার থেকে এক বছরের বড়। ভালো কথা নবনী, চলো নিচে চলো। সবার খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।’
নবনী মাথা নেড়ে সায় দিল, ‘আমি নিচেই যাচ্ছিলাম। চলুন।’
মৌনিতা একটু ইতস্তত করে হেসে বলল, ‘তুমি আমাকে তুমি করেই বলো। মৌনিতা ডাকলেই হবে।’
নবনী সহজভাবে মাথা নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা। চলো মৌনিতা।’
দুপুরের রোদ জানালার কাঁচ ছুঁয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপর পড়ছে। আজ এই টেবিলের দৃশ্যটা অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। সচরাচর দুপুরে বাড়ির পুরুষরা কেউ থাকেন না। কিন্তু আজ অলেখা বেগমের কড়া নির্দেশ ছিল, নতুন বউয়ের হাতের প্রথম রান্না খেতে যেন সবাই উপস্থিত থাকে। নবনী নিজের হাতে ভুনা খিচুড়ি, মুচমুচে বেগুন ভাজি আর ডিম ভাজি করেছে। সেই সাথে অলেখা আর মৌনিতার রান্না করা হাঁসের মাংসের ভুনা। দিব্য এসে চেয়ারে বসতেই অলেখা বললেন,
‘নবনী, যাও মা তোমার হাতের রান্না নিজ হাতে সবাইকে পরিবেশন করো।’
নবনী ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। আড়ষ্ট হাতে একে একে সবার পাতে খাবার তুলে দিল সে। দিব্য আজ দিয়াকে নিজের পাশের চেয়ারে বসিয়ে নিয়েছে। সাধারণত দুপুরে অলেখাই দিয়াকে খাইয়ে দেন কিন্তু আজ বাড়িতে থাকায় দিব্য নিজেই মেয়ের দায়িত্ব নিল। কলরব বেশ উশখুশ করছে তখন থেকে। তার ভেতরে যেন কোনো অস্থির আগ্নেয়গিরি ফুটছে। কয়েকবার গলা পরিষ্কার করেও সে কথা বলতে পারল না। অবশেষে এক বুক সাহস সঞ্চয় করে সে হঠাৎ বলেই ফেলল,
‘খাবার আগে আমি সবাইকে একটা কথা বলতে চাই।’
কথাটা শোনামাত্র দিব্যসহ বড়রা সবাই কলরবের দিকে তাকাল। কলরবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। নার্ভাস হওয়াটাই স্বাভাবিক; সবেমাত্র এইচএসসি শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা এক তরুণের পক্ষে নিজের বিয়ের প্রস্তাব নিজেই তোলা মোটেও সহজ কাজ নয়। তবে ভালোবাসার মানুষের প্রতি টানটা তার সাহসের চেয়েও বড়। অনেক কথা সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখস্থ করেছিল কিন্তু সামনে বাবা, চাচা আর ভাইকে দেখে সব যেন গোলমাল হয়ে গেল। তার চুপ করে থাকা দেখে কাব্য তাড়া দিয়ে উঠল,
‘কী রে, প্যাঁচ না মেরে চটপট বল তো! তোর জন্য সবাই খাওয়া থামিয়ে বসে আছে। সামনে আমার প্রিয় খাবার রাখা বেশি অপেক্ষা কিন্তু করতে পারব না।’
পুরো টেবিল জুড়ে এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল। অলেখা বেগম উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইলেন ছোট ছেলের দিকে। কলরব অনেকটা কসরত করে প্রায় রুদ্ধকণ্ঠে উচ্চারণ করল,
‘আমি বিয়ে করতে চাই।’
কথাটা বলেই সে লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় মাথা নিচু করে ফেলল। খাবার টেবিলের প্রতিটি মানুষ তখন একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কলরব যদি বলত সে কাউকে খুন করে এসেছে; তবে হয়তো সবাই সেটা অনায়াসে বিশ্বাস করে নিত। কিন্তু তার মুখে বিয়ের কথা যেন এক অসম্ভব বিষয়। যে ছেলেটা কোনোদিন নিজের রুমটাই গুছিয়ে রাখেনি সে আজ সংসার পাততে চায়! কলরবের কথা শুনে খাবার টেবিলে যে নিস্তব্ধতা নেমে এল। তাকে আক্ষরিক অর্থেই ‘বজ্রপাত’ বলা চলে। উপস্থিত সবাই যে খুব আগ্রহ নিয়ে তার কথা শুনছিল তা নয়; কারণ কলরব এই বাড়ির সবচেয়ে ‘ছন্নছাড়া’ ছেলে। সারাদিন বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা, মারামারি আর মাঝেমধ্যেই বাড়িতে বিচার নিয়ে আসা এই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন। তার মতো একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলের মুখে এমন সিরিয়াস কথা কেউ কল্পনাও করেনি। কেউ কেউ হয়তো ভেবেছিল সে আবার কোনো নতুন ঝামেলা পাকিয়ে এসেছে কিন্তু তার গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে এবার সবাই একটু নড়েচড়ে বসল। নীরবতা ভাঙল কাব্যর বিস্ময়মাখা কণ্ঠে,
‘কী? কী বললি তুই? ভাই, তুই আসলেই কী করতে চাস?’
কলরব নিচু স্বরেই একটু ঝাঁঝালো গলায় বলল,
‘বললাম তো বিয়ে করব। তুই কি বধির হয়ে গেলি?’
কাব্য হতভম্ব হয়ে মাথা নাড়ল। এই পরিস্থিতিতে কী বলা উচিত তা তার জানা নেই। টেবিলের একপাশে বসে ছিলেন আরশাদ তালুকদার। কয়েকদিন আগের এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তিনি মাথায় ও পায়ে গুরুতর চোট পেয়েছেন। তাই সাধারণত নিজের ঘরেই বিশ্রাম নেন। আজ নবনীর প্রথম রান্না বলে অলেখা বেগম তাকে জোর করে ডাইনিংয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে ছেলের দিকে একরাশ বিদ্রূপ ছুঁড়ে দিলেন,
‘তা হঠাৎ দুনিয়ার সব কাজ ছেড়ে বিয়ে করার শখ জাগল কেন?’
কারণটা আসলে কলরবের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মতো। সে তার সহপাঠি ইরাকে ভালোবাসে। কিন্তু ইরার বাবা-মায়ের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়; তাই আর পড়াশোনা করাতে চাননা। তারা এখন ইরার বিয়ে অন্য কোথাও ঠিক করে ফেলেছেন। কলরব ইরাকে হারাতে চাইনা। তাই নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে হলেও তাকে এই প্রস্তাবটা আজ তুলতেই হতো। সে অপরাধীর মতো মুখ করে আবারও বলল,
‘পাপ্পা, আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসি। ওর নাম ইরা। আমরা একই ক্লাসে পড়ি। ওর বাবা-মা ওর বিয়ে অন্য কোথাও ঠিক করে ফেলেছে। ইরাকে পাওয়ার জন্য বিয়ে করা ছাড়া আমার কাছে আর কোনো পথ খোলা নেই।’
আরশাদ তালুকদারের কণ্ঠে তখন বিদ্রূপের ধার আরও বাড়ল। তিনি একইভাবে প্রশ্ন করলেন,
‘তা এখন তুমি কী চাও? আমাদের ঠিক কী করতে হবে শুনি?’
কলরবের মনে হলো এই মুহূর্তের চেয়ে মাটির নিচে মিশে যাওয়াও ঢের ভালো। তবুও কাঁপা গলায় সে উত্তর দিল,
‘আমি চাই তোমরা ওদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাও। আমি ওকেই বিয়ে করতে চাই। আমি ওকে ভীষণ ভালোবাসি।’
এতক্ষণ শান্ত থাকা আরশাদ তালুকদার যেন হঠাৎ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠলেন। প্রচণ্ড এক ধমক দিয়ে তিনি বললেন,
‘অসভ্য ছেলে! লজ্জা করছে না তোর? বাপ-চাচার সামনে নিজে মুখে নির্লজ্জের মতো প্রেম-ভালোবাসা আবার বিয়ের কথা বলছিস? বিয়ে করবি তুই?’
আফতাব তালুকদার ভাইয়াকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন,
‘ভাইয়া, তুমি অসুস্থ। শরীরটা খারাপ করবে। শান্ত হও।’
আরশাদ তালুকদার তখন রাগে কাঁপছেন। তিনি চেঁচিয়ে বললেন,
‘না, তুই ওকে জিজ্ঞেস কর বিয়ে করবে ও? কত টাকা রোজগার করে? কী যোগ্যতা আছে ওর? নিজে এখনো বাপ-ভাইয়ের ঘাড়ে বসে সারাদিন বাঁদড়ামি করে বেড়ায়। সে নাকি আবার বিয়ে করবে! বড় বড় কথা বলছে। ন্যূনতম লজ্জা-শরমও কি নেই?’
কলরব ঝাঁঝালো গলায় বলল, ‘আমাদের বাড়িতে কি ভাতের এত অভাব পড়েছে যে আর একজন মানুষ এলে টানাটানি শুরু হবে? আমি কথা দিচ্ছি, বিয়ের পর আমিও কোম্পানিতে জয়েন করব। বড় ভাইয়াদের সাথে থেকে কাজ শেখার চেষ্টা করব। আমি মন দিয়ে কাজ করব।’
‘আবার মুখে মুখে তর্ক করছিস?’
এতক্ষণ নিঃশব্দে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা দিব্য এবার মুখ খুলল। গম্ভীর গলায় বলল,
‘শান্ত হও আব্বু। আমরা এই বিষয়ে পরে সময় নিয়ে কথা বলব। তুমি অসুস্থ, তুমি বরং খেয়ে নাও। আর কলরব, তুইও আর একটাও কথা বলিস না। চুপচাপ নিজের খাওয়া শেষ কর।’
আরশাদ তালুকদার রাগে ফুঁসছিলেন ঠিকই কিন্তু বড় ছেলের কথা তিনি সহজে অমান্য করেন না। তাছাড়া খাওয়ার টেবিলে বিশেষ করে নতুন বউয়ের সামনে এমন বিশ্রী পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটা তাঁর নিজেরও ভালো লাগছিল না। তিনি গুমোট মুখে চুপ করে গেলেন। অলেখা বেগম এতক্ষণ আষ্টেপৃষ্ঠে একরাশ ভয় নিয়ে বসে ছিলেন। এবার তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। আসলে কলরব বিষয়টা আগেই তাকে জানিয়েছিল কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন আরশাদ সুস্থ হলে সুযোগ বুঝে নিজে কথাটি পাড়বেন। ছেলেটা যে আজই এভাবে সবার সামনে বোমা ফাটিয়ে দেবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। আরশাদ অসুস্থ না থাকলে আজ হয়তো কলরবের হাড়গোড় আস্ত থাকত না। পরিবেশটা সামাল দিতে অলেখা বেগম সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
‘দিব্য ঠিকই বলেছে। এই বিষয়ে এখন আর কোনো কথা নয়। সবাই খাওয়া শুরু করো।’
কলরব কেবল ওঠার উপক্রম করছিল। গলায় দলা পাকানো অভিমান নিয়ে এই মুহূর্তে তার খাওয়ার রুচি একদমই নেই। নবনী বিষয়টি লক্ষ্য করল। সে চট করে কলরবের পাতে এক টুকরো মাংস তুলে দিল। কলরব বিস্ময়ে চোখ তুলে তাকাল। নবনী তার দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বলল,
‘ভাইয়া, খেয়ে অন্তত বলো তো কেমন হয়েছে? মাংস অবশ্য আমি রান্না করিনি।’
নবনী যেভাবে সহজভাবে কথাটি বলল তাতে কলরব আর না খেয়ে উঠতে পারল না। সে চুপচাপ মাথা নিচু করে আবার খাওয়া শুরু করল। মৌনিতা পরিস্থিতি হালকা করতে বলে উঠল,
‘নবনী আজ চমৎকার খিচুড়ি রান্না করেছে। খিচুড়িটা খেয়ে অন্তত বলো কেমন হয়েছে।’
‘নবনী খিচুড়ি রান্না করেছে’ এই কটি শব্দ দিব্যর কানে পৌঁছানোমাত্রই তার শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল। মুহূর্তেই তার স্মৃতি ফিরে গেল কয়েক বছর আগের এক দুপুরে। অবনীকে যখন এই বাড়িতে প্রথমবার রান্না করতে বলা হয়েছিল। সেও ঠিক এই ভুনা খিচুড়িই রান্না করেছিল। সাথে ছিল হাঁসের মাংস। দিব্য টেবিলের ওপর রাখা খাবারগুলোর দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। আজ সবকিছুর এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। অলেখা বেগমও মিলটা খেয়াল করেছিলেন, তাই তিনি অবনীর স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই আজ নিজে থেকে হাঁসের মাংসটা রান্না করেছিলেন। দিব্যর চোখ দুটো হঠাৎ জ্বালা করে উঠল। অবনীর সাথে কাটানো সেই প্রথম দিনগুলোর স্মৃতি তার মস্তিষ্কে যেন ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে দিল। স্মৃতিরা এখন আর সুখ দেয় না বরং বিষাক্ত কাঁটা হয়ে বিঁধতে থাকে বুকের পাঁজরে। নিজেকে সংযত করার আপ্রাণ চেষ্টা করল সে। যান্ত্রিকভাবে দিয়াকে খাইয়ে দিল কিন্তু নিজের থালাটা আগের মতোই পড়ে রইল। দিয়ার খাওয়া শেষ হওয়া মাত্রই দিব্য নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে নিজের খাবারে হাতটুকুও ছোঁয়ায়নি। অলেখা বেগম ছেলের এই অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে উৎকণ্ঠিত স্বরে বললেন,
‘কী রে দিব্য, তুই তো কিছুই খেলি না। থালায় হাতই লাগালি না। উঠে পড়লি যে!’
নবনী সচকিত হয়ে দিব্যর দিকে তাকাল। দিব্যর মুখাবয়ব এখন পাথরের মতো কঠোর। দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ। সে শীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
‘আমার এখন খিদে নেই আম্মু। আমাকে এখনই অফিসে ফিরতে হবে। তিনটের সময় জরুরি মিটিং আছে। তুমি আসতে বলেছিলে বলে এসেছিলাম। আমি আসছি।’
কথাটা শেষ করেই দিব্য এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে লম্বা পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। দিব্যর প্রস্থানে অলেখা বেগম যেন পাথর হয়ে গেলেন। তিনি ভেবেছিলেন স্মৃতিরা দিব্যকে আনন্দ দেবে কিন্তু হিতে যে বিপরীত হবে তা তিনি ভাবেননি। নবনীর মনেহলো সে কিছু ভুল করেছে। কিন্তু আসলে সেটা কি তা বুঝেই অপরাধবোধে কুঁকড়ে যেতে লাগলো সে। সেটা দেখে তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে জোরপূর্বক একটু হাসলেন। বললেন,
‘এসো নবনী, এবার আমরা খেতে বসি।’
আরশাদ তালুকদার গম্ভীর ডেকে বললেন, ‘নবনী, এদিকে একটু এসো তো মা।’
অলেখা চোখের ইশারায় তাকে যেতে বললেন। নবনী আরশাদ তালুকদারের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তিনি পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটি ছোট মখমলের বাক্স বের করে নবনীর হাতে দিলেন। শান্ত স্বরে বললেন,
‘এটা তোমার উপহার।’
উপহারটি দিয়ে তিনি ধীর পায়ে লাঠিতে ভর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। নবনীর অবাক হওয়ার ঘোর কাটানোর জন্য আফতাব তালুকদার হাসিমুখে বললেন,
‘এটা আমাদের বাড়ির নিয়ম। নতুন বউয়ের হাতের প্রথম অন্ন খাওয়ার পর গুরুজনেরা তাকে দোয়া আর উপহার দেন। কই, এবার আমার কাছে এসো তো।’
নবনী বিনীতভাবে এগিয়ে যেতেই তিনিও একটি সুদৃশ্য বাক্স তার হাতে তুলে দিলেন। নবনী মৃদু হেসে বলল,
‘ধন্যবাদ আংকেল।’
আফতাব তালুকদার নবনীর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে প্রস্থান করলেন। কথা উৎসাহ সামলাতে না পেরে বলে উঠল,
‘ভাবি, বাক্সগুলো খোলো না! দেখি কী গিফট পেলে। আর আম্মু, ছোট মা তোমরা কিছু দেবে না?’
মাজহা বেগম হেসে বললেন, ‘দেবো না মানে?অবশ্যই দেবো।’
তিনি নবনীর হাত থেকে বাক্সগুলো নিয়ে খুললেন। দেখা গেল আরশাদ তালুকদার দিয়েছেন একটি চমৎকার সোনার চেইন এবং আফতাব তালুকদার দিয়েছেন একজোড়া কারুকাজ করা সোনার দুল। মাজহা বেগম নিজেও একটি আংটি নবনীকে পরিয়ে দিলেন। আর অলেখা বেগম নবনীর হাতে দিলেন সোনার দুটি রুলি। কাব্য খাওয়া শেষ করে উঠে টেবিলের ওপর একটি ছোট বাক্স রাখল। সে বেশ মার্জিত স্বরে বলল,
‘সম্পর্কে আমি তোমার ছোট হলেও বড় ভাইয়ের সম্মানে আমি আর মৌনিতা মিলে এই ছোট উপহারটুকু তোমার জন্য এনেছি। গ্রহণ করলে খুশি হবো। আসলে বিয়েটা তো হঠাৎ করেই হলো, নয়তো আরও বড় আয়োজনের ইচ্ছা ছিল।’
নবনী খুলে দেখল ভেতরে একটি ঝকঝকে আংটি। ঠিক তখনই কলরব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে কুণ্ঠিত কন্ঠে বলল,
‘সরি ভাবি, আমি কিছু দিতে পারলাম না। আসলে আমি তো বেকার! আমার গিফটটা আপাতত বাকি রইল। নিজের টাকায় যেদিন রোজগার করব সেদিন দেব। তবে গিফট দিইনি বলে ভাইয়ের ওপর ভালোবাসা কিন্তু কমিয়ে দিও না। মাংসটা কিন্তু সবসময় এভাবেই নিজ দায়িত্বে পাতে তুলে দেবে। আর তোমার খিচুড়ি রান্না? এককথায় দারুণ হয়েছে!’
নবনী স্নিগ্ধ হেসে মাথা নাড়ল। কাব্য এই সুযোগে একটু টিপ্পনী কাটল,
‘হ্যাঁ রে, ভাই তো আমার বড় হয়ে গেছে! বিয়ে করবে বলে কথা। এখন তো কামাই তাকে করতেই হবে। তলে তলে তুই এত দূর চলে গেছিস ভাই? তোর সাহস দেখে আমি রীতিমতো হতভম্ব!’
কলরব বিরক্ত হয়ে বলল, ‘চুপ কর তো তুই!’
এই অবেলায় পর্ব ২
কাব্যর অট্টহাসিতে ড্রয়িং রুমের গুমোট ভাবটা কেটে গেল। কথা আর মৌনিতাও হাসিতে যোগ দিল। সবার হাসাহাসি দেখে কলরব দারুণ লজ্জা পেল। আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। নবনী অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। এই তালুকদার পরিবার একেবারেই আলাদা। এই মানুষগুলোর আন্তরিকতা আর স্নেহ নবনীকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলিয়ে দিল যে সে এই বাড়িতে কোনো এক শূন্যস্থান পূরণ করতে এসেছে। তার মনে হলো মানুষগুলো সত্যিই অসাধারণ।
