এক দেখায় পর্ব ১৩
সুরভী আক্তার
নতুন একটা সকাল । আজকের সকালটা একটু অন্যরকম । ঘড়িতে ১০ টা বেজে গেছে । সুর্যও উঠেছে হয়তো , তবে তা বোঝা যাচ্ছে না । চারদিক পাতলা সাদা কুয়াশার নরম চাদরে ঢেকে আছে । দেখে মনে হচ্ছে আকাশ যেন নিজেই মাটিকে ছুঁয়ে দিচ্ছে । দুরের কোন কিছু ভালো ভাবে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না । ঠোঁট কাঁপিয়ে বের হওয়া গরম নিঃশ্বাস ধোঁয়ার মতো মেঘ হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায় ।
মিহি ধোঁয়া ওঠা কফির মগ হাতে রুহির ঘরের ব্যালকনিতে পায়ের উপর পা তুলে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে । পড়নে ভারী সোয়েটার, তার উপর আবার চাদর । নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছে পুরোটা । পাশেই আরো একটা ধোঁয়া ওঠা কফির মগ । সেটা রুহির । সে কফি রেখে নিচে কোন একটা কাজে গেছে ।
মিহি তাকিয়ে দেখছে চারপাশটা । এখনো কুয়াশা পড়ছে । ব্যালকনির পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছটা ভিজে গেছে শীতে । পাতার উপর শিশির বিন্দু মুক্ত দানার মতো চকচক করছে । নিচ থেকে সোরগোল শোনা যাচ্ছে খুব । মিহি ধীরে ধীরে কফির মগে অত্যন্ত নরম আবেশে চুমক দিচ্ছে । অতিথি পাখিদের মৃদু কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে ।
সেই কখন নিচে গেছে রুহি,, এখনো ফিরছে না । ওর রেখে যাওয়া কফির মগটা থেকে ধোঁয়া ওঠা কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে । মিহি চোখের পলক না ফেলে মগ থেকে ওঠা উষ্ণ ধোয়ার দিকে তাকিয়ে আছে আবেশিত নয়নে । কি সুন্দর এঁকে বেঁকে নরম বেগে ঢেউ খাচ্ছে ধোঁয়া গুলো । একটু উপরে উঠতেই মিলিয়ে যাচ্ছে । মিহি এক ধ্যানে মনযোগ সহকারে তাকিয়ে আছে,, মাঝে মাঝে এমন অদ্ভুত কাজ করতে ভালো লাগে ওর ।
হঠাৎ কোথাও থেকে কারোর গলা খাঁকারির শব্দ ভেসে আসে । যেন কেউ তার আগমন সম্পর্কে জানান দিচ্ছে । মিহি আশেপাশে নজর ঘোরাতেই চোখ পড়ে রাফির ব্যালকনির দিকে । রাফি রেলিং ঘেসে দাঁড়িয়ে আছে । কালো ডেনিম জ্যাকেট পড়নে,, এক হাত পকেটে আর অন্য হাতে ধোঁয়া ওঠা স্টিলের মগ ।
মিহি আলতো হেসে শীতল কন্ঠে বলল..
” Good Morning…..
রাফি দাঁতে দাঁত চেপে একটু হেসে জবাব দেয়…
” Good Morning…..
মিহি চাদর টেনে বসা থেকে উঠে গিয়ে রাফির পাশাপাশি ব্যালকনির কোনায় রেলিং ঘেসে দাঁড়ায়,, দুহাতের ভাঁজে কফির মগ । দুজনেই দুই ব্যালকনির কোনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে । মাঝখানে কয়েক সেন্টিমিটারের দুরত্ব । স্নিগ্ধ শিতল দু’জনেই । মিহি বলে…..
” আজকের সকালটা অনেক সুন্দর,,তাই না…?
মিহির কন্ঠ শীতের স্নিগ্ধতার মতোই অদ্ভুত প্রশান্ত । রাফি মিহির দিকে এক পলক তাকায়,, তারপর চোখ সরিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কুয়াশা ঘেরা অদুরে ।
” হুম… আজকের সকালটা একটু বেশি সুন্দর..! তার সাথে একটু বিশেষ ও বটে….
” বিশেষ কেনো …?
” কারন আপনি পাশে আছেন,,তাই .. ।
ঠোঁট বাঁকিয়ে কথাটা বলে রাফি । রাফির কথাটা মজার ছলে নেয়
মিহি । মিহি একটু হেসে বলে…
” মজা করছেন..?
” আমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমি মজা করছি..?
” জানেন,, আপনি মানুষটা ঠিক কেমন,,তা আপনাকে দেখে একদমই বোঝা যায় না ।
” আমি কেমন..সেটা কি একেবারেই বোঝেন না আপনি..?
মিহি তাকায় রাফির দিকে । রাফি আগে থেকেই তাকিয়ে ছিল । রাফির চোখে অদ্ভুত গভীরতা । মিহি চোখ সরিয়ে নেয় রাফির থেকে । কফির মগে চুমুক দিয়ে বলে….
” আপনি ঐ কুয়াশায় মতোন,, স্পষ্ট নন বরং বড্ড ঝাঁপসা ।
” আরে বাহ্,,, উপমা দিচ্ছেন ? কবি হয়ে গেলেন নাকি..? শুনেছি প্রেমে পড়লে নাকি মানুষ কবি হয়ে যায়.. তা ,, আপনি আবার আমার প্রেমে-টেমে পড়ে গেলেন নাকি , ম্যাডাম ..?
” প্রেম..? আর আমি..? প্রেমে পড়লে মানুষ কবি হয় বুঝি..? জানতাম না তো । তবে এই ক্ষুদ্র জীবনে ইচ্ছে আছে কারোর প্রেমে পড়ার… একদিন খুব করে তীব্র ভাবে কারোর প্রেমে পড়বো ।
” তাহলে আমার প্রেমে পড়ে যান । চলুন প্রেমটা শুরু করে দেই । জানেন,, বোনের বান্ধবীর সাথে প্রেম করার আমার অনেক আগের ইচ্ছে । আপনার সাথে প্রেম করলে খারাপ হবে না…..কি বলেন…?
মিহি জানে রাফি মজা করছে । রাফির তালে তালে মিহিও রাফির দিকে ঘুরে নাটকীয় স্বরে হাত নেড়ে বলে….
” তা প্রেম কি করে করতে হয়,, জানেন তো ? দেখুন ,, ওইসব বিষয়ে কিন্তু আমার কোন experience নেই ।
মিহির কথায় রাফি হেসে ফেলে । মিহির মুখের দিকে ঘুরে চোখে চোখ রেখে হাস্কি স্বরে বলে…
” সমস্যা নেই, আমি আছি তো । প্রেম কি করে করতে হয় শিখবেন..? শেখাবো..?
রাফির কথায় লজ্জা পায় মিহি । খুনশুটির মাত্রা বেশি হয়ে গেছে । রাফি এখনো একই ভাবে তাকিয়ে আছে । লজ্জায় মাথা নিচু করে নেয় মিহি । ঘন পলক ফেলে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করতে করতে বলে…
” এবার একটু বেশি বেশি হয়ে গেলো না..? আমাদের মাঝে বোধহয় এ ধরনের কথা বলা শোভা পায় না । আ..আমি এখন যাই….
বলেই তড়িৎ গতিতে পা বাড়াতে নিলে রাফির কন্ঠ ভেসে আসে…
” উহুমমম.. শুনুন….
মিহি ফিরে তাকায় । রাফি বলে..
” wait.. wait…চোখ বন্ধ করুন…..
” কে.. কেনো…?
” কিছু একটা আছে আপনার চোখে….
রাফির কথায় মিহি নড়েচড়ে ওঠে । ঘন ঘন পলক ফেলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে….
” চোখে..? কি..কি আছে চোখে….?
” একদম নড়বেন না । এদিকে আসুন ।
স্ট্যাচুর মতো এগিয়ে যায় মিহি । রাফি হাতে থাকা কফির মগটা পাশে রেখে বলে…
” চোখ বন্ধ করুন…
তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ করে নেয় মিহি । রাফি ঠোঁট টিপে একটু হেসে মিহির মুখের দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে । মিহির ঘন চোখের পাপড়িতে বিন্দু বিন্দু শিশির কণা জমেছে । অতি ক্ষুদ্র শিশির কণা । কালো পাপড়িতে বিন্দু বিন্দু শিশির কণা মুক্তোর মত ঝিকঝিক করছে । রাফি নিজের শাহাদাৎ আঙুল দিয়ে ছুঁইয়ে দেয় মিহির চোখের পাপড়ি । এতে শীতল শিশিরে ভেজা পাপড়ি দুটো কেঁপে ওঠে । সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে ওঠে সপ্তদশীর হৃদয় । দম আটকে চোখ খিচে নেয় মিহি । রাফি এই প্রথম খুব কাছ থেকে গভীরভাবে তাকিয়ে দেখে মিহির উজ্জ্বল শ্যামলা মুখের প্রতিটি রেখা । এভাবেই কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে রাফি । মিহি পিটপিট করে চোখ খুলতেই রাফি পিছিয়ে যায় । শাহাদাৎ আঙুলটা এগিয়ে দেয় মিহির দিকে । আঙ্গুলের ডগায় পাপড়ি থেকে সংগ্রহ করা ক্ষুদ্র শিশির বিন্দু । সেদিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে মিহির ।
কুয়াশা মুছে যাচ্ছে । একটু একটু আলোকিত হচ্ছে চারপাশ । কৃষ্ণচূড়ার চিরল পাতার ফাঁক গলিয়ে এক টুকরো রোদের ঝিলিক এসে পড়ে মিহির মুখের উপর । যা মিহির হাসিকে আরো বেশি আলোকিত করে তোলে ।
নিচে হইচই শোনা যাচ্ছে । পার্লারের লোক এসেছে । মেহজাবিনের মেকআপ, ফেসিয়াল, ম্যানিকিওর-পেডিকিওর,সব বাড়িতেই হবে । আটজন এসেছে পার্লার থেকে । ফেসিয়ালের জন্য সিরিয়াল লেগেছে সবার । মেহজাবিনের মামি অর্থাৎ লিনার মা ‘লতা বেগম’ সবার আগে বসে পড়েছেন ফেসিয়ালের জন্য । বয়স বেড়েছে,, তবে ছেলেমানুষি এখনো যায়নি তার । মেহজাবিনকে চোখে শশা আর মুখে প্যাক লাগিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে । মেহজাবিনের দুই বান্ধবীকে ফেসিয়াল করানো হচ্ছে এখন । মিহি আর রুহি দুরে সোফায় বসে দেখছে সবার কান্ড । লিনা দাঁড়িয়ে আছে মায়ের পাশে । এমন সময় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘরে ঢোকেন আফসানা বেগম । আফসানা বেগমকে ঘরে ঢুকতে দেখে রুহি এগিয়ে যায় ।
” ফুফি,,ঠিক আছো তুমি..? তুমি আবার এই পা নিয়ে উপরে উঠতে গেলে কেনো..?
” আমি ঠিক আছি মা । পায়ে টান ধরেছিল,তাই একটু হাঁটাহাঁটি করতে করতে দেখতে এলাম তোদের সাজগোজ ।
রুহি আফসানা বেগমের হাত ধরে দরজার পাশে অন্য একটা সোফায় বসায় । সোফায় বসে আফসানা বেগম লতা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলেন….
” বাচ্চাদের সাথে তুমিও মিশে গেছো লতা..? আমাদের কি আর এসব করার বয়স আছে এখন ..!
লতা বেগম হাত উঁচিয়ে কিছু একটা বোঝালেন আফসানা বেগমকে । মায়ের পাশ থেকে লিনা বোঝানোর স্বরে বলল…
” আম্মু এখন মুখে প্যাক লাগিয়েছে আন্টি । কথা বললে কুঁচকে যাবে , ট্যান পড়বে মুখে ।
আফসানা বেগম হেসে দিলেন লিনার কথায় । তারপর লিনাকে উদ্দেশ্যে করে মোলায়েম কন্ঠে বললেন…
” তুমি এসব প্যাক-ট্যাক লাগাবে না মা..? সবাই তো লাগিয়েছে ,, তুমিও লাগাও । এমনিতেই তুমি সুন্দর,,দেখবে আরো বেশি সুন্দর লাগবে তোমাকে ।
আফসানা বেগমের কথায় রুহির হাসি হাসি মুখটা চুপসে যায় । আফসানা বেগমের পাশ থেকে ধীর পায়ে মিহির পাশে গিয়ে বসে । রুহি বসতেই মিহি রুহিকে কনুই দিয়ে খুঁচিয়ে মিটিমিটি হেসে বলে…
” কি ব্যাপার..? এখন থেকেই শাশুড়ির এত যত্ন করা হচ্ছে…। বিয়ের পর আরো কতো কি করবি..? তোর শাশুড়ির ভাগ্য ভালো আছে বলতে হবে…..
মিহির কথায় রুহি ঠোঁট উল্টে তাকায় মিহির দিকে । রুহির মুখে হাসি নেই । চোখ দুটো ছলছল করছে । রুহিকে দেখে মিহির মুখের হাসিও উধাও হয়ে যায় । রুহির বাহু ঝাঁকিয়ে মিহি বলে….
” কি হয়েছে Pakhi ..? হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেল কেন তোর..? আমি কি ভুল কিছু বললাম..?
” Heyy Everyone…কি হচ্ছে এখানে..?
শান্তর কথায় সবাই তাকায় দরজার দিকে । শান্ত ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে….
” আরে বাহ্….সবাই দেখি স্কিন কেয়ারে ব্যাস্ত । আমার স্কিন’টাও আজকাল একটু রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে ।
তারপর আড়চোখে রুহির দিকে তাকিয়ে বলে… বউয়ের আদর না পেলে যা হয় আর কি……
বলতে বলতেই শান্তর নজর যায় আফসানা বেগমের দিকে । আফসানা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে শান্তর দিকে । শান্ত থতমত খেয়ে চুপসে যায় অমনি,, মিনমিনিয়ে বলে…
” আরে আম্মু… তুমি এখানে…..? তুমিও ফেসিয়াল করবে নাকি….?
” আমার ওসব করতে হবে না । তুই বরং একটু নিজের যত্ন নে । দিন দিন চেহারার কি হাল বানাচ্ছিস,,কে বিয়ে করবে তোকে…? আমার বউ’মার যোগ্য হ আগে,, তারপর বিয়ে…!
আফসানা বেগমের কথায় মুখ চেপে হাসছে লিনা । শান্ত একবার নিজের দিকে , আর একবার তাকায় রুহির দিকে । তারপর একটু ভাবুক ভঙ্গিতে বলে..
” ঠিক বলেছ আম্মু । তোমার বউমার যোগ্য হতে হবে…..
এরপর লিনার দিকে ঘুরে আদেশের স্বরে বলে…
” এই মিস লিনা,,,যান তো , একটা চেয়ার নিয়ে আসুন । আমিও ফেসিয়াল করবো ।
শান্তর কথায় বাধ্য মেয়ের মত লিনা চলে যায় চেয়ার আনতে । আফসানা বেগম লিনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসেন । রুহি একবার আফসানা বেগম আর একবার শান্তকে দেখে সোফা থেকে উঠে ধপ ধপ পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । মিহি কিছু বুঝতে না পেরে ,, এক মুহুর্ত পর রুহির পিছু পিছু হন্তদন্ত হয়ে সেও বেরিয়ে আসে ।
রুহিকে এভাবে বেরিয়ে আসতে দেখে শান্ত জিভ কামড়ে কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করে বলে….
” খেয়েছে রে….. এবার ঠেলা সামলাও ।
বলেই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে । আফসানা বেগম পিছন থেকে ছেলেকে ডাকতে ডাকতে বলেন…
” কি রে, কোথায় যাচ্ছিস ? মেয়েটাকে চেয়ার আনতে পাঠালি,,, এখন আবার কোথায় যাচ্ছিস..? ফেসিয়াল করবি না…?
মায়ের কথায় শান্ত বাইরে বেরিয়ে বিড়বিড় করে বলে….
” আজ আমার কপালে দুঃখ আছে মা । আগে বউ সামলাই, তারপর বউয়ের যোগ্য হবো ।
এদিকে ঘরে এসে খাটের একপাশে বসে নাক টেনে টেনে কাঁদছে রুহি । মিহি রুহির পাশে বসে রুহিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ব্যাস্ত স্বরে বলে….
” কি হলো Pakhi … ? কাঁদছিস কেনো ? কি হয়েছে ?
মিহির কথায় রুহির কান্নার বেগ আরো বেড়ে যায় । মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে ফুঁপিয়ে ওঠে রুহি । মিহি রুহির গালে হাত রেখে বলে…
” আরে পাগলী, কাঁদছিস কেনো..? হঠাৎ কি হলো তোর..? একটু আগেও তো ঠিক ছিলি । এখন এভাবে কাঁদছিস কেনো..বলবি তো ..?
রুহি ক্রন্দনরত কন্ঠে কেঁপে কেঁপে বলে….
” আমি ওনাকে ছাড়া বাঁচবো না Pakhi । ফুফি আমাদের সম্পর্কটা কখনো মেনে নেবে না ।
এইটুকু বলেই আবারো ফুঁপিয়ে ওঠে রুহি । মিহি বলে…
” কেনো মেনে নেবে না শুনি ?
” ফুফি তো ঐ লিনা আপুকে পছন্দ করে । লিনা আপুকে নিজের ছেলের বউ বানাতে চায় ।
” এই কথাটা তোকে কে বলেছে ..?
” আমি নিজেই শুনেছি । ফুফি অনেক আগে থেকেই লিনা আপুকে পছন্দ করতো । এই বাড়ির সবাই জানে,, ফুফি নিজেই লিনা আপুর সাথে ওনার ছেলের বিয়ে দিতে চান , সবাই রাজি এই বিয়েতে । দেখলি না,, ফুফি কিভাবে লিনা আপুর প্রশংসা করছিল ।
মিহি তপ্ত শ্বাস ফেলে । স্বাভাবিক কন্ঠে বলে…
” তাহলে এই কারণেই তুই লিনা আপুকে প্রথম থেকেই এড়িয়ে চলতি ? লক্ষ্য করেছি আমি । আচ্ছা এই বিষয়ে শান্ত ভাইয়া জানে…?
” হুম….
” আর লিনা আপু..? লিনা আপু জানে..?
” না….
” লিনা আপু কি শান্ত ভাইয়াকে পছন্দ করে..?
” না….. কিন্তু…..
” কিন্তু কি …?
” লিনা আপু ভাইয়াকে পছন্দ করে…
রুহি মিহির চোখের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে । রুহির কথায় মিহির মুখের ভঙ্গিমা বদলে যায় খানিকটা । এক মুহুর্তের জন্য স্থির হয়ে যায় মিহি । বুকটা খানিক চিনচিন করে ওঠে … কেনো,তা জানা নেই মিহির । রুহি মিহির মুখের ভঙ্গিমা সুক্ষ্ম নেত্রে পর্যবেক্ষণ করে । কয়েক মুহূর্ত পর মিহি শুকনো ঢোক গিলে জোরপূর্বক একটু হেসে বলে…
” তাহলে তুই এতো ভাবছিস কেনো…? শান্ত ভাইয়া তো তোকে অনেক ভালবাসে ,, আর তুই শান্ত ভাইয়াকে ভালোবাসিস । তোরা মিঞা-বিবি রাজি,তো কেয়া কারেগা কাজি…?
ভ্রু নাচিয়ে শেষ কথাটা বলে মিহি । মিহির কথা শেষ হতেই পিছন থেকে শান্তর কন্ঠ ভেসে আসে ।
” তোমার Pakhi কে একটু বোঝাও । সে তো আমার কথা কিছুতেই বুঝতে চায় না ।
শান্তকে দেখে রুহি মুখ ফিরিয়ে নেয় । মিহি বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় খাটের পাশে । শান্ত এগিয়ে এসে রুহির পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে । রুহি অন্যদিকে মুখ করে রুক্ষ কন্ঠে বলে…
” এখানে আসলেন কেনো আপনি..? চলে যান এখান থেকে । আপনার হবু বউ আপনার জন্য চেয়ার এনে দিয়েছে,, যান, গিয়ে চেয়ারে বসে ফেসিয়াল করুন । স্ক্রিনের যত্ন নিন,,হবু বউয়ের যোগ্য হতে হবে তো নাকি..?
” আমি কি তোমার যোগ্য নোই…?
” আমি কে আপনার..? আমার যোগ্য হতে যাবেন কেন আপনি…? আমি মামাতো বোন ছাড়া আর কি হোই আপনার….
” তুমি আমার মামাতো বোন নও হে…। তুমি আমার কে জানো ?
কথাটা বলে শান্ত বাঁকা হেসে খানিক সুর দিয়ে দু লাইন গেয়ে ওঠে…..
Darling তুই আমার Darling
Oooo আমার Darling
Oooo আমার Darling
Hello… how are…….? 😘
শান্তর কথায় মুখ চেপে ফিক করে হেসে দেয় মিহি । না চাইতেও রুহিও মুখ ঘুরিয়ে হেসে দেয় । মিহি ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পা বাড়ায় । এখানে থাকা ঠিক হবে না ওর । ঘর থেকে বেরিয়ে আলতো করে দরজাটা চাপিয়ে দেয় বাইরে থেকে । পিছন ঘুরতেই মুখোমুখি হয় রাফির । থতমত খেয়ে যায় মিহি । পরমুহূর্তে রাফি কে দেখে লিনা’র কথা মনে পড়ে যায় মিহির । মিহি চোখ নামিয়ে পাশ কাটাতে গেলে রাফি বলে….
” কি হয়েছে…?
মিহি রাফির দিকে না তাকিয়েই ছোট্ট করে জবাব দেয়…
” কোই .. কিছু না তো ।
রাফি ভ্রু কুঁচকে তাকায় মিহির দিকে । বরাবরের মতো মিহির মুখে সেই চিরচেনা হাসি নেই । আজকের সকালের কোন কথা বা ঘটনা কি মিহির খারাপ লেগেছে..? মিহির অসস্থি বুঝতে পেরে রাফি কথা ঘুরিয়ে বলে…
” Sissy কোথায়..? ঘরে আছে..?
” হুম….
মিহির ক্ষীণ কন্ঠ । রাফি ঘরের দরজা খোলার জন্য হাত বাড়াতেই আচমকা উচ্চস্বরে ‘ নাহ…..’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে মিহি । রাফির বাড়ানো হাত থেমে যায় । চট করে মিহির দিকে তাকায় রাফি । কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে…
” কি হলো….
” কিছু না তো । এমনি… ভেতরে যাবেন না ।
” কেনো..?
” ভে.. ভেতরে কেউ নেই…
চোখ সরু করে তাকায় রাফি…তীক্ষ্ণ স্বরে বলে…
” একটু আগেই তো বললেন রুহি ঘরে আছে ।
” বললাম বুঝি..? কখন বললাম…?
মিহির বোকা বোকা কথায় বুকে হাত গুটিয়ে মিহির দিকে সরু চোখে তাকায় রাফি । মিহি অপ্রস্তুত ভ্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে বলে….
” চলুন নিচে যাই ।
সন্ধ্যা হতেই পুরো বাড়ি রং বেরঙের আলোক সজ্জায় আলোকিত । বাল্ব , ফেয়ারিলাইট , সহ রঙিন সাজসজ্জায় সজ্জিত বাড়ির প্রতিটি কোণা । চৌধুরী বাড়ি যেন রাজপ্রাসাদের রুপ নিয়েছে আজকে । আলোতে আলোতে ঝিকমিক করছে চারপাশ । ঠান্ডা শীতল আবহাওয়া । বিশাল গার্ডেনের পুরো স্পেস জুড়ে আয়োজন ।
একপাশে স্টেজ করা হয়েছে । বিভিন্ন ফুলের সমারোহে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে সাজানো হয়েছে মঞ্চটা । কাঁচা ফুলের গন্ধে চারদিক মুখরিত । আত্মীয়-স্বজন, বন্ধ-বান্ধব, ছোট-বড় , সবাই মিলিত হয়েছে গার্ডেনে । নতুন সাজসজ্জায় আবৃত সবাই । স্টেজের মাঝখানে সোফায় বসে আছে মেহজাবিন ,, ক্যামেরা ম্যান বিভিন্ন পোজে ছবি তুলছে ওর । পাশেই আছে ওর দুই বান্ধবী । স্টেজের ডান পাশে পিছনের দিকে ,, সাউন্ড মিক্সার আর Dj ব্যস্ত গান বাজাতে । আধুনিক সংগীতের রিমিক্স বাজানো হচ্ছে । হইহুল্লোড় চলছে সবার মাঝে । মাহিমের পরিবার থেকে মাহিম’সহ ওর বন্ধুবান্ধবদের আসার কথা ছিল । তবে ওদের আসার সময় ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট ঘটে । কারোর তেমন কোন ক্ষতি না হলেও,, ওদের আসার প্লান ক্যান্সেল হয়ে যায় ।
সংগীতের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে অনেক আগে । মিহি, রুহি কেউ এখনো নিচে নামেনি । বিকেলে মিরা এসেছে । এসে থেকেই সাজগোজে লেগে পরেছে সে । নাদিয়ার আসার কথা থাকলেও সে আসে নি । হেনা বেগম দু-দুইবার ডাকার পর অবশেষে মিহি, রুহি আর মিরা – তিন বান্ধবী বাইরে আসে । মিহির পড়নে গোলাপি রঙের গর্জিয়াস গাউন , ওরনাটা ঘাড়ের একপাশ দিয়ে নেওয়া , কার্ল করা চুল গুলোতে রজনীগন্ধার গাজরা দিয়ে খুলে রাখা,, চোখে ঘন কাজল , মুখে হালকা সাজগোজ । রুহি আর মিহি একই রকম সেজেছে বলা চলে । বাইরে আসতেই মিরার নজর যায় ক্যামেরা ম্যান এর দিকে,, সুন্দর একটা স্মার্ট ছেলে ক্যামেরা হাতে ভিডিও করছে । মিরা কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থেকে রুহি আর মিহির বাহু ঝাঁকিয়ে বলে…
” দেখ ছেলেটা কি হ্যান্ডসাম । তোরা থাক আমি যাই…কয়েকটা ছবি তুলে আসি ।
মিরা চলে যেতেই দুদিকে মাথা নেড়ে তপ্ত শ্বাস নেয় মিহি । স্টেজে মেহজাবিনের কাছে এগোতে যাবে এমন সময় কোথা থেকে যেন ছুটে আসে লিনা । একটু ভাব নিয়ে বলে….
” তোমরা এখান আসলে … অনুষ্ঠান কখন শুরু হয়ে গেছে । আচ্ছা দেখো তো আমাকে কেমন লাগছে..?
গর্জিয়াস সাজে সেজেছে লিনা । সে এমনিতেই সুন্দর,,সাজার কারনে আরো বেশি সুন্দর লাগছে । যে কোন ছেলে ফিদা হয়ে যাবে ওকে দেখে । এদিকে লিনার কথায় একটু বিরক্ত হয় রুহি । তবে মুখে তা প্রকাশ করে না । রুহির অবস্থা বুঝে মিহি একটু হেসে বলে…
” তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে আপু । কারোর যেন নজর না লাগে । ছেলেরা দেখলে কিন্তু পুরো দিওয়ানা হয়ে যাবে তোমার উপর ।
লিনা খানিক লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে লাজুক হেসে মিনমিন স্বরে বলে….
” সবার দিওয়ানা হওয়ার দরকার নেই । যার দিওয়ানা হওয়ার দরকার শুধু সে হলেই চলবে ।
লিনার কথা বুঝতে অসুবিধা হয় না মিহির । অমনি মিহির হাসি হাসি মুখটা চুপসে যায় । চারদিকে তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে থাকে । তবে কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিকে খুঁজে পায় না মিহির চোখ ।
অনেকক্ষণ হয়ে গেছে ।
অনুষ্ঠানের প্রায় মাঝামাঝি সময়ে আগমন ঘটে রাফি আর শান্তর । দুজনের পড়নেই কালো নিল পাঞ্জাবি । গলায় ঝোলানো ওরনার মতো সরু একটা শাল । দুর থেকে মিহিকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় রাফি । উচ্ছাসিত হাসি নিয়ে গানের তালে তালে হাততালি দিচ্ছে মিহি । শহরের বড় বড় নৃত্যশিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করছে সামনে । রাফির দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় মিহির পানে । অদ্ভুত ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিহির দিকে । শুকনো ঢোক গেলে সে । চোখের পলক অবধি পড়ছে না ওর । রাফিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শান্ত ওর ঘাড়ে হাত রেখে বলে….
” তুই ওর দিকে সবসময় এমন ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে থাকিস কেনো বলতো..? এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে না দেখে ডিরেক্ট বিয়ে করে নে,, তারপর সারাদিন সামনে বসিয়ে রেখে দেখবি । প্রেমে পড়েছিস সেটা প্রকাশ করলেই তো হয়।
রাফি মিহির দিকে তাকিয়েই ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে গম্ভীর গলায় বলে…
” লুকিয়ে লুকিয়ে তাকিয়ে দেখার মাঝে যে নীরব প্রেম গাঁথা থাকে ,,তা হাজারো শব্দে প্রকাশ করা যায় না ।
” হায়য়য়য়য়….বুঝি বুঝি,,, আমি সব বুঝি । আমিও তো প্রেম করি নাকি ? আমাকে ওসব বোঝাতে আসিস না ।
এদিকে হঠাৎ মিহির নজর পড়ে রাফির দিকে । ততক্ষণে চোখ সরিয়ে নিয়েছে রাফি । রাফির পাশে লিনা’কে দেখে হাত থমকে যায় মিহির । লিনা কথা বলছে রাফির সাথে । রাফিও বেশ হেসে হেসে কথা বলছে । একটু আগে “Param Sundari” গানে Perform করেছে লিনা । তখন রাফি ছিল না,,মুলত রাফিকে দেখানোর উদ্দেশ্যেই Perform করেছিল সে । লিনার Performance শেষ হতেই রাফির আগমন ঘটে । লিনা সোজা চলে যায় সেদিকে । রাফির সাথে লিনা কি বিষয়ে কথা বলছে তা জানে না মিহি । মিহি নিজেকে ধাতস্থ করে মুখে হাসি ফুটিয়ে ওদের দিক থেকে চোখ ফেরায় । রুহি আর মিহি দুজনের একসাথে একটা Performance করার কথা । মিহি প্রথমে Performance করতে রাজি না হলেও পরে রুহির জোরাজুরিতে রাজি হতে বাধ্য হয়েছে । এবার রুহি আর মিহির নাচের পালা । অসস্থি আর নার্ভাসনেসে এক হাত দিয়ে অন্য হাতের তালু চুলকাচ্ছে মিহি । রুহি পাশ থেকে মিহির হাত ধরে চোখের ইশারায় শান্তনা দেয় । মেহজাবিনের বান্ধবী তানিয়া স্টেজে উঠে নাচের জন্য রুহি আর মিহির নাম announce করতেই একটা নিল লাইটের আলো পড়ে মিহি আর রুহির উপর । Announcement শুনে চমকে তাকায় রাফি । হঠাৎ আলো পড়ায় মিহি চোখ বন্ধ করে মুখের উপর হাত দিয়ে আলো ঠেকানোর চেষ্টা করছে । একটু সময় নিয়ে মুখের উপর থেকে হাতটা সরায় মিহি । সবার নজর এখন ওদের দিকে । রাফি এখনো দুরে দাঁড়িয়ে থেকে সুক্ষ্ম নেত্রে পর্যবেক্ষণ করছে ওদের ।
মিহি আর রুহি দু’জনে কয়েক পা এগোতেই কোথা থেকে জেনি দৌড়ে আসে, রাফির কাছে এসে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে । পেছন থেকে হেনা বেগম হন্তদন্ত পায়ে রাফির কাছে এসে কিছু একটা বলতেই রাফির মুখশ্রী পাল্টে যায় । দৌড়ে ছুট লাগায় বাড়ির ভেতরের দিকে । দুর থেকে মেহজাবিন এসব দেখে কিছু একটা বুঝতে পেরে রাফির পেছন পেছন দৌড়ে যায় সেও । একে একে বাড়ির সবাই চলে যায় একই দিকে । মিহি আর রুহি একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ওরাও দৌড়ে যায় ।
ভেতরে আসতেই নজর যায় উপরে । রাবেয়া চৌধুরীর ঘরের বাইরে ভীর জমেছে সবার । মিহি দুহাতে গাউন সামলে উপরে উঠে ঘরের সামনে যায় । ঘরের ভেতরটা পুরো এলোমেলো । বিছানা-বালিশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারদিকে । কাঁচের টুকরো পুরো মেঝেতে । ফুলদানি ভেঙে পড়ে আছে এদিক ওদিক । রাবেয়া চৌধুরী রাফিকে জড়িয়ে ওর বুকে মুখ গুজে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন । নিচের গান বাজনা হট্টগোলের মধ্যে রাবেয়া চৌধুরীর খেয়াল ছিল না কারোর মাথায় । নিচ থেকে আসা উচ্চস্বরে গান বাজনা আর হইহুল্লোড়ে ভয় পেয়ে যান তিনি । ঘরের দরজা বাইরে থেকে লাগানো ছিল । গান বাজনার কারণে অনেক চেঁচামেচির পরেও তার কন্ঠ কেউ শুনতে পায়নি । অতিরিক্ত ভয় পেয়ে হাতের সামনে যা পেয়েছে তাই দিয়ে দরজা খোলার জন্য দরজায় আঘাত করেছেন রাবেয়া চৌধুরী । জেনি কোন কারনে বাড়িতে আসার পর উপর থেকে কিছু ভাঙ্গার আওয়াজ শুনে হেনা বেগমের কাছে জানায় । হেনা বেগমের পক্ষে রাবেয়া চৌধুরীকে সামলানো সম্ভব ছিল না ।
মিহি ঘরের সামনে গিয়ে দেখে রাফি রাবেয়া চৌধুরীকে বুকে আগলে মাথায় হাত রেখে শীতল কন্ঠে শান্তনা দিচ্ছে….
” কি হয়েছে মামনি ? ভয় পেয়েছিলে ? এই দেখো আমি এসেছি । কিচ্ছু হবে না । শান্ত হও একটু,, কিচ্ছু হয়নি দেখো ।
রাবেয়া চৌধুরীর চোখের নিচে পানি । মাথার চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে । গুটিসুটি হয়ে লুকিয়ে আছে রাফির বুকে । দেখে বোঝাই যাচ্ছে অনেক ভয় পেয়েছেন তিনি । মিহি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রাফির দিকে । রাফি কি সুন্দর করে শান্তনা দিচ্ছে রাবেয়া চৌধুরীকে । অনুষ্ঠানের প্রায় সব আত্নীয় স্বজনই ভীর জমিয়েছে ঘরের বাইরে । রাবেয়া চৌধুরীর সম্পর্কে কেউ অজানা নয় । মেহজাবিন দরজায় মাথা ঠেকিয়ে নিস্তেজ হয়ে চোখের পানি ফেলছে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী ওর মাথায় হাত রেখে ওকে নিয়ে সবার সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে বলেন…
” আপনারা তো বুঝতেই পারছেন এখন কি অবস্থা । ক্ষমা করবেন,, আজকে আর কোন Program হবে না । আপনারা গিয়ে ফ্রেশ হয়ে
নিন । রাতও হয়েছে অনেক, সবার বিশ্রাম প্রয়োজন ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরীর কন্ঠ ক্লান্ত ও ধীর । তার কথায় বাকিরা একে একে ঘরের বাইরে থেকে ভীর কমায় । কারোরই অজানা নয় রাবেয়া চৌধুরীর ব্যপারটা । সবাই বুঝতে পারছে সবটা ।
রাত বারোটা পেরিয়েছে । রুহির ঘরের ছোট্ট খাট’টায় মিরা, রুহি আর মিহি একসাথে শুয়েছে তিনজনে । মিহি মাঝখানে,, মিরা আর রুহি মিহির দুপাশে শুয়েছে । রুহির ছোট্ট খাট’টায় মোটামুটি দুজন আরামছে ঘুমোতে পারে,, তবে তিনজনের ঘুমানোর জন্য আরামদায়ক নয় । মাঝখানে থাকার দরুন বেশ ঠাসাঠাসিতে পড়েছে মিহি । তারউপর আবার রুহি মিহিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে । মিরা আর রুহি গল্প করতে করতে কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে গেছে । তবে মিহির চোখে ঘুম নেই । চারদিকে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস মিহির । এভাবে ঠাসাঠাসিতে কিছুতেই ঘুম আসছে না ওর । নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে । এভাবে আরো কিছুক্ষণ থাকলে দম বন্ধ হয়ে যাবে । মিহি আলগোছে রুহিকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে উঠে বসে । দীর্ঘ শ্বাস ফেলে দুদিকে তাকিয়ে দু’জনকে দেখে নেয় । ব্যালকনি থেকে বাইরের মৃদু লাইটের আলো দেখা যাচ্ছে । মিহি সতর্কতার সহিত রুহিকে পাশ কাটিয়ে খাট থেকে নেমে পা টিপে টিপে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় । দাঁড়াতেই এক ফালি দমকা হাওয়া ছুঁয়ে দেয় মিহিকে । মুক্ত বাতাসে চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস নেয় মিহি । নিচে গার্ডেনে আলো জ্বলছে এখনো । কিছু আলো নেভানো । মিহি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে রুপোর থালার মত চাঁদ উঠেছে ,, সাথে কোটি কোটি তাঁরার মেলা । বরাবরই জোৎস্না বিলাস পছন্দ মিহির । মিহির ইচ্ছে হয় ছাঁদে যাওয়ার,, আরো কাছ থেকে চাঁদটাকে অনুভব করার ইচ্ছে জাগে । কিন্তু এত রাতে কি ছাদে যাওয়া ঠিক হবে..? এটা ভেবেই নিজের মনকে বারন করে মিহি । তবে মন মিহির কথা শুনলো না । ব্যালকনিতে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে ছাদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় মিহি । যেই ভাবা সেই কাজ,, ব্যালকনি থেকে বেরিয়ে আলতো করে ঘরের দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে ছাদের দিকে পা বাড়ায় মিহি । ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিজের চাদরটা চেয়ারের উপর রেখে দেয়,,বেনি করা চুল গুলো এলোমেলো করে খুলে দেয় । নিজেকে একবার আয়নায় দেখে বেরিয়ে পড়ে ।
ছাদের দরজার কাছে আসতেই পা থমকে যায় মিহির । বিয়ে উপলক্ষে ছাদেও লাইটিং করা হয়েছিল তবে এখন সব আলো নেভানো । উত্তর দিকের এক কোনায় টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে । চাঁদের আলোয় পুরো ছাদ আলোকিত । ছাদের দরজা বরাবর ঠিক সামনে রেলিংয়ের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে কেউ । পেছনের দিকটা দেখা যাচ্ছে শুধু । তবে পেছন থেকে তাকে দেখে চিনতে অসুবিধা হয় না মিহির । তাকে দেখে আপনা আপনি মিহির শিথিল ভ্রু যুগল জড়ো হয়ে যায় । রাফি রেলিংয়ের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে । আকাশের দিকে মুখ করে এক ধ্যানে মগ্ন হয়ে আছে । রাফি এতো রাতে ছাদে ? তাও আবার একা..? মিহির মনে প্রশ্ন জাগলেও সামনে এগোয় না সে । ঠিক যেভাবে এসেছিল সেভাবেই নিঃশব্দে পিছন ফিরে পা বাড়ায় ঘরে আসার জন্য । তবে বাড়ানো পা মাটিতে পড়ার আগেই রাফির শিতল কন্ঠ ভেসে আসে….
” আসতে পারেন…..
মিহি চমকে তাকায় পেছনে । রাফি ঠিক আগের মতো একই ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছে । এক চুলও নড়েনি । পিছন ফিরে তাকায় নি পর্যন্ত । তাহলে কি করে বুঝলো মিহি এখানে এসেছে…? মিহি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে রাফির দিকে । রাফি কি ওকেই কথাটা বলল..? মিহি কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল । রাফির শীতল কন্ঠে আবারো বলে….
” দাঁড়িয়ে থাকবেন..? নাকি আসবেন…?
মিহি অসংশয়িত হয়ে এগিয়ে যায় ছাদে । ধীর পায়ে রাফির থেকে অনেকটা দুরত্ব বজায় রেখে রেলিং ঘেসে দাঁড়ায় । রাফি দৃষ্টি এখনো আকাশের দিকে । রাফির দৃষ্টি অনুসরণ করে মিহি একবার চাঁদকে দেখে নেয় । তারপর রাফির দিকে তাকিয়ে অবুঝ স্বরে জিজ্ঞেস করে…
” আপনি কি করে বুঝলেন আমি এসেছি..? আপনি তো তখন থেকে সেই একই ভাবে বসে আছেন । একবারও তাকান নি । তাহলে কি করে বুঝলেন…?
মিহির কথায় রাফির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে । তবে সেই হাসি চোখে পড়ে না মিহির । রাফি চাঁদের দিকে তাকিয়েই মনে মনে বলে….
” জানিনা কেনো আমি আপনাকে অনেক দূর থেকেও অনুভব করতে পারি । আপনি এমন একজন মানুষ যাকে আমি স্পর্শ ছাড়াও অনুভব করি । আপনার নিঃশব্দ উপস্থিতিও আমার মস্তিষ্ককে নাড়িয়ে তোলে । আপনার শরীরের ঘ্রাণ অনেক দূর থেকেই আমাকে আপনার উপস্থিতির কথা জানান দেয় । আপনি আমার থেকে কয়েক মিটার দুরত্বে থাকলেও আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় । যা জানান দেয় আপনি আমার আশেপাশেই আছেন । খুব কাছে আছেন । খুব অল্প দিনের মধ্যেই আপনি আপনার অস্তিত্বকে আমার মাঝে মিশিয়ে দিয়েছেন ম্যাডাম। ফেসে গেছি আমি আপনার মায়ার জালে ।
রাফি মনের কথা মনে রেখে এবার তাকায় মিহির দিকে । মিহি অবুঝের মতো ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আছে রাফির দিকে । এতে হাসি পায় রাফির । রাফি বসা থেকে ছাদে নেমে গাঁ ঝেড়ে বুকে হাত গুজে বলে…..
” সিক্স সেন্স… ম্যাডাম । আমার সিক্স সেন্স বড্ড প্রখর ।
” তাই..? তা আপনার সিক্স সেন্স আর কি কি বোঝে.. শুনি ?
রাফি চোখ সরু করে এক হাত দিয়ে থুতনি চুলকে ভাবুক ভঙ্গিতে বলে….
” আমার সিক্স সেন্স বলছে… আপনি আমাকে ফলো করতে করতে এখানে চলে এসেছেন । কি তাইতো..? ফলো করছিলেন আমায়.. ম্যাডাম ?
” একদম…. ভুল বললেন স্যার । আপনার সিক্স সেন্স বড্ড বাজে ।
মিহির মুখে ‘স্যার’ সম্বোধন শুনে রাফির বুকটা কেঁপে ওঠে । নিমিষেই উথাল পাথাল শুরু হয়ে যায় রাফির মনে । রাফি বলে….
” কি বললেন..?
” বললাম, আপনার সিক্স সেন্স বড্ড বাজে ।
” তার আগে কি বললেন..?
মিহি নিজের অজান্তেই কখন কি বলেছে তা সে নিজেও জানে না । মিহি অবুঝের মতো বলে…
” আর কি বললাম…?
” আজকাল কি ভুলে যাওয়ার রোগে ধরেছে নাকি আপনাকে ? সবকিছু ভুলে যান শুধু ।
মিহি মাথা চুলকে বলে…
” কি জানি,,,কি যে হয়েছে….
দুজনেই তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে । চাঁদের রুপালি আলোয় মিহির শ্যামলা মুখশ্রী জ্বলজ্বল করছে । রাফি মাঝে মাঝেই আড়চোখে দেখছে মিহিকে । ঠান্ডা বাতাস বইছে । মিহির পড়নে না আছে চাদর,আর না আছে সোয়েটার । একটা খয়েরী রঙের থ্রি পিস পড়ে আছে সে । চুলগুলো বাতাসের তালে তালে ঢেউ খাচ্ছে । ঠান্ডায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা মিহির । দুহাতে ঠান্ডা নিবারনের চেষ্টা করছে সে ।
রাফি আড়চোখে মিহির কান্ড দেখে রসিকতার সুরে বলে….
” ঠান্ডা লাগছে নিশ্চয়ই ? এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন আমি আমার পড়নের জ্যাকেটটা খুলে আপনাকে দেব ? ঐ সিনেমার হিরোদের মতো… কিন্তু দেখুন – আমি নিজেই জ্যাকেট পড়িনি । ঠান্ডা কিন্তু আমারও লাগছে ।
মিহি ভ্রু কুঁচকে তাকায় রাফির দিকে । মাথা একটু বাঁকিয়ে বলে….
” আপনাকে কে বলল আমি এসব ভাবছি..?
” ঐ … আমার সিক্স সেন্স….
” আপনার সিক্স সেন্সের তারিফ করতে ইচ্ছে করছে… কিন্তু এখন করতে পারছি না । কারন, আপনার সিক্স সেন্স এবারো ভুল….
” তাই..? তাহলে শুনি,, এভাবে ভারী কাপড় না পড়ে এই ঠান্ডায় ছাদে আসার কারণ কি ..?
” ঘুম আসছিল না,,ব্যালকনি থেকে দেখলাম বাইরে চাঁদ উঠেছে, অনেক সুন্দর জোৎস্না ছড়িয়েছে । তাই ভাবলাম চাঁদটাকে আরো কাছ থেকে অনুভব করি । আর চাদরটা আসার সময় রেখে এসেছি,, যাতে জোৎস্না বিলাস আর ঠান্ডা বিলাস একসাথে এনজয় করতে পারি । ঠান্ডার মধ্যে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভব না হলে কি আর ঠান্ডা বিলাস করা যায় ?
” জোৎস্না বিলাস পছন্দ…?
” ভীষণ… দেখুন চাঁদের মাঝে কতটা সৌন্দর্য আছে ।
মিহির কথায় রাফি মৃদু হেসে মনে মনে বলে…
” আপনার থেকে কম ।
মিহি একটু থেমে নিরবতা ভেঙ্গে বিষন্ন কন্ঠে বলে….
” জানেন,, চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকলে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় । কিছুক্ষণ চাঁদ দেখলে অনেক ভালো লাগে, আবার অনেকক্ষণ চাঁদ দেখলে নিজেকে অসহায় লাগে । অসহায় লাগার কোনো কারণ নেই, তবুও লাগে । কেন এমন হয়..? হয়তো চাঁদ একা বলেই আমাদের মধ্যের একাকিত্বটাকে জাগিয়ে তোলে..তাই না..?
” কে বলেছে চাঁদ একা ? দেখুন কোটি কোটি তাঁরা আছে চাঁদকে ঘিরে । তাঁরার মেলা বসেছে চাঁদের পাশে ।
” পাশে থাকলেই কি হৃদয়ের অনূভুতি গুলো বোঝা যায় ? পাশে থাকলেই কি কাছে থাকা যায় ? চাঁদের পাশেও তো অসংখ্য তারা আছে, কিন্তু তবুও তো সে একা । তাঁরারা কি কখনো চাঁদকে উষ্ণতা দিতে পারে ? চাঁদকে ছুঁতে পারে..?
মুহূর্তেই দুজনের মাঝে বিষন্নতা সৃষ্টি হয় । দুজনেই নীরবে তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে । ওদের তাকানোতে যেন চাঁদও লজ্জা পাচ্ছে । নিজেকে মাঝে মাঝে আড়াল করছে মেঘের আবডালে । রাত বাড়ছে । এমন সময় একটা তারা খসে পড়ে । মিহি তৎক্ষণাৎ নিজের হাত বুকে রেখে চোখ বন্ধ করে কিছু একটা wish করে । রাফি মিহির দিকে তাকিয়ে বলে….
” এটা কি করলেন…?
” শুনেছি খসে পড়া তাঁরার কাছে কিছু wish করলে সেই wish টা পূরন হয় । কিছু একটা চাইলাম । জানি এসব সত্যি নয় ,, তবে কিছু চাইতে তো কোনো বারন বা দ্বিধা নেই – তাই না..?
” তা কি চাইলেন…?
” নিজের wish list এর কথা কাউকে বলতে নেই । আপনিও চোখ বন্ধ করে কিছু একটা চেয়ে দেখুন ,,পেলেও পেতে পারেন ।
আমি এখন যাই ? অনেক রাত হয়েছে ,, একটু ঘুমোতে হবে । আপনি যাবেন না ? অনেক রাত হয়েছে তো ।
রাফি মনে মনে কিছু একটা ভেবে একটু হেসে বলে…
” আপনি যান । গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন । আমি একটু পর আসছি ।
” এখন, এখানে একা একা কি করবেন ?
” ঐ যে বললেন wish করার জন্য । সেটাই করবো ।
” কি wish করবেন শুনি…?
” নিজের wish list এর কথা কাউকে বলতে নেই ম্যাডাম । যদি কখনো wish টা পূরন হয় তাহলে নিজেই দেখতে পারবেন ।
” আমার কথা আমাকেই শোনালেন । আচ্ছা থাকেন আপনি ,, wish করুন । আমি যাই । Good night….
” হুম… Good night…..
মিহি গুটি গুটি পায়ে ছাদ থেকে নেমে পড়ে । মিহি চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত রাফি তাকিয়ে থাকে সেদিকে । চোখের আড়াল হতেই আকাশের দিকে তাকায় রাফি । বুকে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে শ্বাস নেয় । চোখের সামনে ভাসতে থাকে সেই রাতের কথা – যেদিন রাফি প্রথম মিহিকে দেখেছিল । অচিরেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে রাফির । রাফি চোখ বন্ধ রেখেই মৃদু সুরে গায়….
এক দেখায় পর্ব ১২
Pehli Jab Dikha Tha Tujhko
Raat Bhi Yoo Yaad Hai Mujhko
Taare Ginte Ginte Sooo Gaya
Dil Mera Dharka Tha Kaske
Kuch Kaha Tha Tune Hanske
Main Usi Pal Tera Hoo Geya
Asman O Tejh Khuda Hay
Usehe Meri Yehi Dua Hay
Chand A Her Roj May Dekhu
Tere Sath Main Aaaaa….
Uthi Mohabbat Ne
Aangdayi Li , Dil Ka Souda Huaa
Chandni Raat Main…..
Hoo Teri Nazron Ne Kuch Aisa
Jaadu Kiya , Lut Gaye Hum too
Pehli Mulakaat Mein…..
