Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ২৪

এক দেখায় পর্ব ২৪

এক দেখায় পর্ব ২৪
সুরভী আক্তার

” কি হইলো মামুনী’রা ? আইমু আমরা ?
আমরা আবার মাইয়াগো রাগ ভাঙাইতে ভালোয় জানি । কি বলিস তোরা…চল মামুনি’গো রাগ ভাঙায় আসি….
বলতে বলতে খিটখিট করে গাঁ দুলিয়ে হেসে উঠলো সবাই । মিহি আর রুহি কপাল কুঁচকালো । কোচিং থেকে সরু ছোট একটা গলি পেরিয়ে মেইন রোডে উঠতে হয় । এই গলিতে গাড়ি ঢোকে না । মাঝে মাঝে এখানে এই বখাটে টোকাই ছেলেদের আনাগোনা দেখা যায় । মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে ওরা । এটাই ওদের কাজ । কোচিং থেকে বের হওয়ার পর অনেক মেয়েরাই এদের পাল্লায় পড়ে । বাজে মন্তব্য আর খারাপ ইঙ্গিতের কারণে অনেকেই এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলো কোচিংয়ের পরিচালকের কাছে । পরিচালকের কঠিন শাসানোর ফলে কদিন বন্ধ ছিল এদের বখাটে পনা । গলিতে কদিন দেখা যায় নি এদের । তবে এখন আবার শুরু হয়েছে ।

মিহি আর রুহি কখনো এদের সামনে পড়ে নি । আর না ওরা মিহি আর রুহি কে বিরক্ত করেছে কখনো । কোচিং ছুটির পর ক্লাসের সবাই একসাথে বের হয় , রৌনক আর সোহেল থাকে ওদের সাথে । দলবদ্ধ হয়ে গলি পেরোয় সবাই ।ছেলেরা সাথে থাকে বলে কখনো সাহস পায় নি ইভটিজিং করার ।
তবে আজ মিহি আর রুহি একা । বাকিরা এগিয়ে গেছে ওদের থেকে । ওরা পিছিয়ে পড়েছে । রৌনক আসে নি আজকে । মিরাও বিয়ে বাড়িতে ছিল রাতে, তাই হয়তো আসতে পারে নি ।
গলি এখন পুরো ফাঁকা । ছেলেগুলোর সংখ্যা পাঁচ জনের মতো ।
মিহি রুহির দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলে….
” চল.. পাখি ,, এখানে থাকাটা ঠিক হবে না ।
বলেই রুহির হাত শক্ত করে ধরে দ্রুত গতিতে হাঁটা লাগায় মিহি । ছোট্ট গলি যেনো শেষ হতেই চাচ্ছে না আজকে । মিহি,রুহি একটু এগোতেই ছেলে গুলো সামনে গিয়ে পথ রোধ করে দাঁড়ায় ওদের । অমনি আঁতকে ওঠে মিহি আর রুহি । চঞ্চল পা থেমে যায় ওদের । একটা ছেলে চিবুকে হাত বোলাতে বোলাতে একটু এগিয়ে এসে অদ্ভুত স্বরে বলে….

” কোই যাও মামুনি ? রাগ কমলো এতো তাড়াতাড়ি ? আমরা আইলাম, আমাগোরে সুযোগ দিবা না একটা ?
মিহি রুহির হাত আরো শক্ত করে ধরে । পিছিয়ে যায় দু’পা । কাঁপা গলায় বলে…..
” দে…দেখুন…
সরুন.. যেতে দিন আমাদের । নয়তো ভালো হবে না বলে দিলাম ।
” উফফফ…
আমরা চাইতাছি খারাপ কিছু হোক । কি দেখাবা দেখাও !
মিহি আর রুহি ভড়কে যায় এবার । পাঁচ জনে ঘিরে ধরে ওদের । এখানে চিৎকার করেও কোন লাভ নেই, দুপাশের দেয়ালে ধ্বনিত হয়ে চিৎকার ফিরে আসবে নিজের কাছেই । বাইরে পৌঁছাবে না এই চিৎকার । পিছু হটার ও উপায় নেই । পিছনে তিন জন দাঁড়িয়ে আছে ।
রুহি বরবরই একটু ভীতু । রাগ , অভিমান, জেদ , ভয় সবকিছু সমান ভাবে আছে ওর মাঝে । ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে ওর । মিহির হাত শক্ত করে চেপে ধরে ও । মিহি জিভ দিয়ে অধর ভিজিয়ে চোখের ইশারায় শান্তনা দেয় ওকে । নিজেকে শক্ত করে গলা বাড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠে…

” দেখ… সরে যা সামনে থেকে । তোরা কিন্তু আমাদের চিনিস না । যেতে দে আমাদের….
সামনের জন ঘাড় চুলকে ঠোঁট কামড়ে অশ্লীল অঙ্গ ভঙ্গি করে বলে….
” চিনতেই তো চাই মামনি,, যেতে দেই কি করে বলতো..?
অনেক দিন পর খাঁচায় পাখি পড়ছে , এতো সহজে কি আর ছাড়া যায় ?
বলতে বলতে দাঁত চেপে হাত বাড়িয়ে দেয় মিহির দিকে । মিহি চোখ মুখ শক্ত করে দাঁত পিষে এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় ওর দিকে বাড়ানো হাতটা । আঙ্গুল উঁচিয়ে চোখ রাঙিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে….
” খবরদার ছোঁয়ার চেষ্টা করবি না ! নয়তো তোর হাত আর হাতের জায়গায় থাকবে না !
মিহির কথায় যেন রেগে গেল সবাই । একসাথে এগিয়ে আসলো মিহির দিকে । অনেক টা কাছাকাছি এসে পড়েছে ওরা । রুহি তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কারোর নাম্বারে ডায়াল করে ।
মিহি গতি বিধি হারিয়ে দুহাতে ধাক্কা দেয় সামনের ছেলেটা কে । তাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ছেলেটা । মিহির রুহির হাত খপ করে ধরে উত্তেজিত কন্ঠে চেঁচিয়ে ওঠে….

” পালা পাখি….
বলেই দৌড় লাগায় রুহির হাত ধরেই । ওদিকে ফোন রিসিভ হতেই রুহি দৌড়াতে দৌড়াতে আতঙ্কিত এলোমেলো স্বরে বলতে শুরু করে….
” ভাইয়া…
ভাইয়া আমাদের বাঁচাও ভাইয়া । ওরা পিছু নিয়েছে আমাদের….
রুহির কথা শেষ হওয়ার আগেই কোন কিছুতে পা আটকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মিহি । শক্ত ইটের খাজকাটা রাস্তায় পড়ে ব্যাথায় আহহ্ সূচক শব্দ করে কুকিয়ে ওঠে সে । রুহির হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায় অমনি । রুহি থেমে মিহিকে তোলার চেষ্টা করে….
” ওঠ পাখি…
তাড়াতাড়ি ওঠ…!
ছেলেগুলো পেছনে কাছাকাছি এসে গেছে । মিহি তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে অধিক ভয় আর আতংকের ফলে আবারো হুমড়ি খেয়ে পড়ে । জীবনে প্রথম বার এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে ওরা । মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আসছে ওদের । মতি গতি হারিয়ে ফেলেছে দু’জনে । হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে । মিহি তাড়া দেয় রুহিকে….
” তুই পালা রুহি..!
এসে গেছে ওরা ।
বলতে না বলতেই ছেলে গুলো এসে হাজির হয় ওদের কাছে । রুহির ব্যাগ, ফোন সব পড়ে আছে মাটিতে । ফোনের ওপাশে এখনো চিল্লিয়ে যাচ্ছে কেউ । মিহির ব্যাগটাও ছিটকে পড়েছে কোথাও ।

পাঁচ মিনিটের মাথায় কোচিংয়ের গলিতে এসে পৌঁছায় রাফি আর‌ শান্ত । মেইন রোডে গাড়ি থামিয়ে মুহুর্তেই নেমে পড়েছে ওরা ।
রাফি এলোপাথাড়ি ছুটে আসে গলির মাঝে । কোচিং অবধি ছুটে যায় । কোচিং বন্ধ হয়ে গেছে ।
রাফির গলা শুকিয়ে আসছে । পাগলের মতো এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে ও । জোরে জোরে ডাকতে থাকে মিহি আর রুহির নাম ধরে । এদিকে কেউ নেই, না কারোর সাঁড়া শব্দ আছে । রাফি ছুটে যায় রোডের দিকে । পিছু পিছু শান্ত ।
অনেকটা দুর পর্যন্ত গিয়ে আবারো ফিরে আসে ওরা । রুহির ফোনের লোকেশন গলিতেই দেখাচ্ছে । রাফি মাথার চুল খামচে ধরে পুরো গলি আবারো তন্য তন্য করে খুঁজেও কাউকে পায় না । গলিতে সারিবদ্ধ একাধিক বন্ধ গোডাউনের দরজা, সব দরজা ভেঙে ইতিমধ্যে খুঁজে ফেলেছে রুহি আর মিহি কে । ফোনের লোকেশন তবুও এখানেই দেখাচ্ছে । রাফি ভয় পাচ্ছে ভীষণ । ওর ভয়ের কারণ অজানা নয় শান্তর । এদিকে শান্তর দশাও বেহাল । ও রাফি কে সামলাবে নাকি মিহি , রুহি কে খুঁজবে । নিজের মনও অস্থির হয়ে পড়েছে ওর । বুক ধড়ফড় করছে অজানা আশঙ্কায় ।
রাফির হাত পা কাঁপছে ক্রমশ । চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে । শিরা উপশিরা ফেটে বেরিয়ে আসার উপক্রম । হাতের মুঠো শক্ত করে জোরে শ্বাস টানে রাফি । ঝড় বইছে ভেতরে । পাগলের মতো শান্ত কে দুহাতে আকড়ে ধরে রাফি । কম্পিত স্বরে বলে…

” আমার বোন আর মিহি কে খুঁজে দে শান্ত । ওরা বিপদে আছে ।
খুঁজে দে ওদের ।
একবার খালি জানতে পারি ওদের সাথে কি হয়েছে, আমি কাউকে ছাড়বো না । যদি ওদের গায়ে এক বিন্দু আঘাত ও লাগে, আমি আগুন লাগিয়ে দেবো সবকিছুতে , জ্বালিয়ে দেব সবকিছু । শপথ করছি আমি… ওদের গায়ে এক ফোটা আঁচড় লাগলেও কেটে ফেলবো সবাইকে ।
বলতে বলতে গর্জে ওঠে রাফি । ক্রোধে ফেটে পড়ছে ও । অস্থিরতা বাড়ছে ।
শান্তর নজর যায় দেয়ালের একপাশের কয়েকটা বালির বস্তার আড়ালে থাকা কোন কিছুর দিকে । শান্ত এগিয়ে যায়, বালির বস্তার ফাঁকে মিহি আর রুহির ব্যাগ আর মোবাইল পড়ে আছে ।
শান্ত সেগুলো নিয়ে রাফি কে দেখায় । ক্রোধ বাড়ে রাফির , চোখে অগ্নি জ্বলজ্বল করছে ।
আচমকা কিছু একটা ভেবে নিজের ফোন বের করে রাফি । তড়িঘড়ি কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনে কিছু একটা দেখেই চোয়াল আরো শক্ত হয়ে যায় ওর । আবারো ফোন পকেটে ঢুকিয়ে শান্ত কে বলে….
” চললল…..

একটা বন্ধ গোডাউন মিলে দুটো চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে মিহি আর রুহি কে । হাত , পা, মুখ বাঁধা ওদের । চোখ ভিজে জবজবে হয়ে গেছে । নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করছে ওরা । মুখে উমম উমম শব্দ ব্যাতীত আর কিছুই উচ্চারণ করতে পারছে । ভয়ে অজানা আশঙ্কায় আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেছে । গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ।
সামনে একটা চারকোনা টেবিলে পাঁচ জন ছেলে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে দেখছে ওদের । সবার হাতেই নেশা জাতীয় দ্রব্য । মদ্যপান করছে ওরা । মিহি আর রুহি কে চেয়ারে বেঁধেই নিজেদের আসরে মজেছে ওরা । নোংরা চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে মেয়ে দুটোকে । ওদের কুৎসিত চাহনিতে বিকৃত লাগছে নিজেদের । ওদের মধ্যকার লিডার দুলতে দুলতে এগিয়ে আসে মিহির কাছে । মিহির মুখোমুখি ঝুঁকে দুপাশে চেয়ারের হাতলে দুহাত রেখে অনেকটা কাছাকাছি আসে মিহির ।
মুখের দুর্গন্ধ আর ঘৃণায় চোখ মুখ খিচে নেয় মিহি, গাঁ গুলিয়ে ওঠে ।
ছেলেটা ফুঁ দেয় মিহির মুখে । বিচ্ছিরি গন্ধে আর ঘেন্নায় রি রি করে জ্বলে ওঠে মিহি । হিসহিসিয়ে ওঠে সে ।
ছেলেটা কুৎসিত নজর গলিয়ে দেখে নিচ্ছে মিহিকে ।
আচমকা খ্যাঁটখ্যাঁট করে হেসে ওঠে ও । মাতাল গলায় বলে….

” শালি, বাইন্ধা রাখছি তোরে , তেজ কমে নাই তবুও । আইজ দেখমু কতো ঝাঁঝ দেখাইতে পারোস তুই ।
বলেই মিহির দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় । করুন চোখে চেয়ে শুকনো ঢোক গেলে মিহি । সিটিয়ে যায় চেয়ারের সাথে । তবুও ছোটাছুটি করতে থাকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ।
পাশ থেকে দুদিকে মাথা নেড়ে হিসহিসিয়ে ওঠে রুহি । পেছনে ওদের করুন অবস্থা দেখে সবগুলো ছেলে গাঁ দুলিয়ে হেসে ওঠে ।
নোংরা স্পর্শ গায়ে পড়ার ভয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় মিহি । আঁতকে ওঠে মিহির নারী কোমল সত্তা । দুফোঁটা পানি গড়িয়ে গালে এসে আটকায় ।
আকস্মিক ছেলেটার চিৎকারে ঝট করে চোখ খোলে মিহি । সামনের দৃশ্য দেখে চোখ গোল গোল হয়ে যায় মিহির । ছেলেটা কে মাটিতে ফেলে একের পর ওর মুখে ঘুষি মেরে যাচ্ছে রাফি । প্রত্যেক টা ঘুষিতে শরীরের সমস্ত শক্তি উজাড় করছে সে । বজ্রপাতের মতো প্রত্যেকটা ঘুষি আছড়ে পড়ছে ওর মুখের উপর । রক্তাক্ত হয়ে গেছে পুরো মুখ । দাঁত ভেঙে ছিটকে পড়েছে মাটিতে । ছেলেটা গুঙ্গিয়ে উঠে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে । তবুও থামলো না রাফি । নিজের সবটুকু রাগ নিংড়ে নিলো ওর উপর । রক্তাক্ত হয়ে নেতিয়ে পড়েছে ছেলেটা । রাফি থামে, কলাড় ধরে উঠে বসায় ওকে । হিংস্র বাঘের মতো গর্জে ওঠে…..

” কুত্তার বাচ্চা….
তোর সাহস কি করে হয় ওকে ছোঁয়ার ? তুই ওকে ছুঁয়েছিস কেনো বল ? তুই জানিস ও কে….
She is My lady…. Only my….
ওকে ছোঁয়ার অধিকার শুধু আমার । শুধুই আমার ! ওর উপর কারো স্পর্শ তো দুরের কথা, ওর উপর কারো নজর ও সহ্য করবো না আমি । ওর দিকে অন্য কেউ চোখ তুলে তাকালেও জানে মেরে ফেলবো আমি তাকে । চোখ গেলে দেবো তার । আর তুই ওকে ছুঁয়েছিস..! কোন সাহসে ওকে ছুঁয়েছিস তুই ,, বল ? জানোয়ারের বাচ্চা….
যে হাতে ওকে ছুঁয়েছিস তুই, তোর সেই হাত আস্ত রাখবো না আমি,,,কেটে ফেলবো তোকে….পুতে ফেলবো তোকে আমি ..
বলেই এক ঝটকায় ছেলে টাকে মাটিতে আছড়ে ফেলে রাফি । রাগে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়ায় ও । রুহি শ্বাস আটকে নিরেট দৃষ্টিতে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে রাফি কে । এই প্রথম রাফির এতো রাগ দেখলো ও । রাফির পাগলামি, উন্মাদনা দেখলো । স্থির হয়ে অবাক লোচনে তাকিয়ে আছে রুহি । এদিকে মিহির কানে রাফির কথা গুলো পৌঁছালো কি না জানা নেই ? এতো গুলো রক্ত দেখে গাঁ শিউরে উঠেছে ওর । হৃৎপিণ্ড ওঠা নামা করছে চারগুণ গতিতে । সে মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত ছেলেটার দিক থেকে চোখ ফেরায় ।
জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে । দম আটকে আসছে ।
রাফি একটা লোহার রড তুলে নিয়েছে হাতে । সেটা নিয়ে এগিয়ে আসে ছেলেটার দিকে । ক্রোধ কমছে না ওর । যেই মার বসাতে যাবে সেই চোখ মুখ খিচে গুঙ্গিয়ে ওঠে মিহি । রুহিও চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় । মিহির গোঙানির শব্দে থেমে যায় রাফি । শান্ত ডেকে ওঠে….

” রাফি…
Bro… ছেড়ে দে । ভয় পাচ্ছে ওরা ।
রাফি মিহির দিকে তাকিয়ে লোহার রডটা ছুড়ে মারে অদুরে । মেঝেতে পড়ে শব্দ হয় । খন কাল নিস্তব্ধতা বিরাজ করে পুরো ঘরে । এতক্ষণ যেন রাফির হুংকারে তান্ডব চললো এখানে ।
শান্ত বাকি চার জনকে সামলে নিয়েছে । মাতাল ছিল ওরা , তাই বেশি ঘাটতে হয় নি । একেকটা অচেতন হয়ে পড়ে আছে মার খেয়ে ।
এদিকে চোখ মুখ খিচে চিবুক গলায় ঠেকিয়েছে মিহি । জোরে জোরে শ্বাস টানছে ।
রাফি ধীর পায়ে মিহির সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসে । হাতের বাঁধন খুলে দেয় । চোখ পিটপিট করে তাকায় মিহি । ছলছল করছে চোখ দুটো । মুহুর্তেই ঝরঝর করে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো । দুদিকে মাথা নাড়লো মিহি । রাফি নিষ্ক্রিয় চোখে চেয়ে হাত বাড়িয়ে মিহির মুখের বাঁধন খুলে দেয় ।
এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মেয়েটা ।
শান্ত রুহির বাঁধন খুলে দিয়ে ওর হাত ধরে তড়িঘড়ি করে গোডাউন থেকে বেরিয়ে আসে ।
মিহির চোখের পানি আবেশে মুছিয়ে দেয় রাফি । রাফির হাতে লেগে থাকা রক্ত লেগে যায় মিহির গালে । রাফি অনেকক্ষণ কম্পিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিহির দিকে, যতক্ষণ না নিজের চোখের তৃষ্ণা মেটে । এরপর মিহির দুচোখ মুছিয়ে দিয়ে বলে…

” এই পাগলি মেয়ে…
কাঁদছো কেনো ? কিচ্ছু হয় নি দেখো । একদম ঠিক আছো তুমি । আমি এসেছি তো… আমি থাকতে কোন দিন কিচ্ছু হবে না তোমার । তোমার কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না ।
আচমকা চেয়ার ছেড়ে হাঁটু ভেঙ্গে রাফির সামনাসামনি মাটিতে বসে মিহি । শব্দ করে ফুঁপিয়ে ওঠে ।
রাফি হাত বাড়িয়ে থেমে যায় । ছোঁয় না মিহিকে । মিহির খারাপ লাগতে পারে এই ভেবে সরিয়ে নেয় বাড়ানো হাত । একেই কাঁদছে মেয়েটা । সহ্য হচ্ছে না রাফির । ভেতর দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে । রাফি শান্ত গলায় বলে….
” কেঁদো না প্লিজ..!
তোমার ঐ চোখের বৃষ্টি সহ্য হয় না আমার ।
মিহি অকস্মাৎ একটু এগিয়ে কপাল ঠেকায় রাফির প্রশস্ত বুকে । দুহাতে খামচে ধরে রাফির মেদহীন পেটের শার্টের অংশ ।
এই মুহূর্তে কাউকে জড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ভীষণ ।
মিহির কান্ডে থমকে যায় রাফি ।‌ আশ্চর্য বনে যায় সে । মিহির অস্থিরতা বুঝতে পারছে ও । রাফি এক হাত রাখে মিহির মাথায় ‌। মিহি ক্রন্দনরত কন্ঠে কেঁপে কেঁপে নালিশের স্বরে বলে….

” ওরা খুব খারাপ….
খুব খারাপ । অনেক বাজে বাজে কথা বলেছে আমাদের । আমরা পালাতে চেয়েছিলাম বিশ্বাস করুন, ওরা পালাতে দেয় নি আমাদের ‌।
আপনি যদি না আসতেন তাহলে হয়তো….
” নাহ…
কিচ্ছু হতো না তোমাদের । আমি যতক্ষন আছি ততক্ষণ কিছু হবে না তোমাদের । এই পৃথিবীতে আমার শ্বাস যতদিন চলবে, আমি কথা দিচ্ছি আর কোন দিন কেউ একটা ফুলের টোকাও দিতে পারবে না তোমার শরীরে ।
অধিকার ব্যতীত কেউ কোন দিন স্পর্শ করবে না তোমায় । তোমাকে স্পর্শ করতে হলেও আমাকে ঠেকিয়ে অধিকার নামায় স্বাক্ষর করতে হবে তাকে । আজকের পর আর কেউ চোখ তুলেও তাকাবে না তোমার দিকে ।
রাফির শান্ত কথা গুলোর মানে বোঝার চেষ্টা করলো না মিহি । হেঁচকি উঠে গেছে কাঁদতে কাঁদতে । একই অবস্থায় শান্ত থাকলো কিছুক্ষণ । পিনপতন নীরবতা চলল কিছু সময় । নিজেকে ধাতস্থ করে রাফির বুক থেকে মাথা তুলে মিহি । হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে নেয় । রাফির পেছনে রক্তার ছেলেটার বিভৎস চেহারার দিকে নজর যেতেই আঁতকে ওঠে আবারো । সহসা চোখ সরিয়ে নেয় ।
রাফি কটমট করে তাকায় ছেলে টার দিকে । রক্তে ভিজে আছে ছেলেটার পুরো শরীর । নাক মুখ সাংঘাতিক ভাবে থেঁতলে গেছে । মিহির একটুও মায়া লাগলো না ওকে দেখে , বরং আবারো ঘৃণায় গাঁ গুলিয়ে উঠলো । রাফি উঠে দাঁড়ায় । হাত বাড়িয়ে দেয় মিহির দিকে । মিহি মাথা তুলে রাফির পানে তাকায় । একবার তাকায় বাড়ানো হাতের দিকে ।

মিহির দৃষ্টি বুঝে বাড়ানো হাত সরিয়ে নিতে চায় রাফি । এতোটাও অধিকার নেই ওর । মিহির অস্বস্তি হতে পারে রাফির এই বেগতিক আলগা কর্মকান্ডের কারণে ।
রাফি অন্য দিকে চোখ ফেরায়ে,, হাত সরিয়ে নেওয়ার আগেই মিহি ওর নরম হাত বাড়িয়ে শক্ত করে ধরে রাফির হাত । রাফি অকস্মাৎ চোখ ফেরায় মিহির পানে । রাফির হাতে ভর করে উঠে দাঁড়ায় মিহি । রাফি অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে আছে । মিহি খানিক ঠোঁট প্রসারিত করে মোলায়েম কন্ঠে বলে…
” এখান থেকে চলুন প্লিজ….
এখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার ।
রাফি মাথা দোলায়…
” হুম..?
চ.. চলুন ।
মিহি রাফির হাত ছেড়ে দেয় । এগোয় নিজ শক্তিতে । দু’পা এগোতেই রাফি লক্ষ্য করে খুঁড়িয়ে হাঁটছে মিহি । ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে রাফি শুধায়….

” খুঁড়িয়ে হাঁটছেন কেনো ?
কি হয়েছে পায়ে ?
মিহি অপ্রস্তুত উত্তর দিলো….
” প..পড়ে গেছিলাম, ব্যথা পেয়েছি ।
রাফি চোয়াল শক্ত করে নিরেট দৃষ্টিতে তাকালো মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে । ওর জন্যেই হয়েছে সবকিছু । রাফি কটমট করে সজোরে এক লাথি মারলো ছেলেটার পায়ে । কোন নড়চড় দেখা গেলো না ছেলেটার ।
মিহি খপ করে ধরলো রাফির বাহু ।
” ছেরে দিন প্লিজ ‌।
রাফি ফিরলো মিহির দিকে । তখন ফোনের ওপাশ থেকে মিহির পড়ে যাওয়ার আর্তনাদ শুনেছিল সে ।
” আর কোথায় লেগেছে,, দেখি ?
মিহি হাত কোঁকড়া করে কনুই দেখালো । ছিলে গেছে অনেকটা ‌। পায়েও ছিলে গেছে । রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে ‌ । একে তো পড়েছিল, তার উপর ছেলে গুলো টেনে হিচড়ে নিয়ে এসেছে এখানে । এতে চোটের উপর আরো বেশি চোট লেগেছে ।
রাফি কোমল কন্ঠে শুধালো…..

” খুব বেশি ব্যথা করছে ? হাঁটতে পারবেন ?
মিহি উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো । এই টুকুতে সমস্যা হবে না তেমন ।
কোন রকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আস্তে আস্তে গোডাউন থেকে বের হলো দুজনে ।
গাড়ির সামনে রুহিকে দেখে চটজলদি ছুটে গিয়ে ওকে আলতো জড়িয়ে ধরে রাফি ।
” তুই ঠিক আছিস sissy..?
ব্যাথা পেয়েছিস কোথাও ? সরি বোন… তোর ভাইয়া একটু দেরি করে এসেছে । আর কখনো এমন দেরি করবো না আমি ।
জানিস তোকে না পেয়ে কি অবস্থা হয়েছিল তোর ভাইয়ার ?
রুহি আলতো হেসে বলে….
” আমি ঠিক আছি ভাইয়া ! কিচ্ছু হয় নি আমার ।
পাখি….
রাফি কে পাশ কাটিয়ে মিহি কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রুহি ।
” ঠিক আছিস পাখি..!
” হুম…
আমি একদম ঠিক আছি জান ।
” পড়ে গেছিলি যে ,, ব্যাথা পেয়েছিস না ? হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে ? হাতটাও তো ছিলে গেছে ।
” একটু ব্যথা করছে । চাপ নিস না এতো , সেরে যাবে ।
মিহি নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো । দশটা থেকে বারোটা পর্যন্ত কোচিংয়ের সময় ছিল । এখন বাজে দুইটা ত্রিশ ।
আঁতকে ওঠে মিহি । আব্বু আম্মু নিশ্চয়ই অনেক টেনশন করছে । ঢোক গিলে রাফির দিকে তাকিয়ে বলে….

” আপনার ফোনটা একটু দেবেন ? আমার ফোনটা কোথাও পড়ে গেছে । আব্বু আম্মু কে জানাতে হবে এক্ষুনি । অনেক টেনশন করছে হয়তো ।
রাফি নিজের পকেট থেকে মিহির ফোনটা বের করে । গলিতে পেয়েছিল এটা । নিজের কাছেই রেখেছিল । মিহির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে…
” আপনার ফোন…
মিহি তড়িৎ বেগে ফোনটা হাতে নেয় । কিছু জিজ্ঞেস করে না । বন্ধ হয়ে গেছে ফোনটা । মিহি তড়িঘড়ি করে লক খুলে আব্বুর নাম্বারে ডায়াল করে । প্রথম বারেই রিসিভ হয় । মিহি ব্যস্ত কন্ঠে বলতে আড়ম্ভ করে…..
” আব্বু….
আমি সরি আব্বু । আমি একদম ঠিক আছি । ঐ ক্লাস শেষে লা..লাইব্রেরীতে গেছিলাম একটু । সেখানে তো ফোন সাইলেন্ট রাখতে হয় ।
কখন যে সুইচ অফ হয়ে গেছে, খেয়াল করি নি । সরি আব্বু, দেরি হয়ে গেছে, জানানো উচিত ছিল তোমাকে । আমি বাড়িতে ফিরছি এক্ষুনি । টেনশন করো না প্লিজ…..
ওপাশ থেকে সাফির কন্ঠ ভেসে আসে….

” মিহি…
কোথায় তুমি ? তুমি জানো কতটা টেনশনে ছিলাম আমরা । লাইব্রেরীতে গেছিলে তো একটা বার ফোন করে জানাবে না তুমি ?
তুমি জানো আঙ্কেল আন্টি কতটা টেনশনে ছিল ? অনেক কষ্টে সামলেছি ওদের ।
মিহি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকায়…
” আপনি..?
আব্বু কোথায় ? আব্বুর ফোন আপনার কাছে কেনো ?
মিহির হঠাৎ এমন কথা শুনে রাফি ভ্রু কুঁচকে তাকায় ওর দিকে । কার সাথে এমন করে কথা বলছে মিহি ? প্রশ্ন জাগে মনে ।
ফোনের ওপাশ থেকে সাফি বলে….
” আঙ্কেল আছেন । আর আমিও তোমাদের বাড়িতেই আছি । কোথায় আছো তুমি বলো, আমি নিতে আসছি তোমায় ?
মিহি কপাল কুঁচকে খানিক ভারী গলায় বলে….
” আপনাকে আসতে হবে না,, আমি আসতে পারবো । এখন রাখি.. আব্বু কে জানাবেন আমি ঠিক আছি । আমি আসছি এক্ষুনি….
বলেই ফোন কেটে দেয় মিহি । রাফি এখনো তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে । রুহিও কপাল কুঁচকে চেয়ে আছে । ভারী কন্ঠে শুধায় ও….

” কার সাথে কথা বললি ? আঙ্কেলের সাথে ?
রুহি এমনিতেই সাফিকে সহ্য করতে পারছে না কাল থেকে । ওর জন্যেই রেগে ছিলো ও ।
মিহি তবুও মিনমিন করে বলে….
” আব্বুর ফোনেই ফোন দিয়েছিলাম , কিন্তু ঐ উনি, মানে সাফি…..
সাফির নাম শুনতেই আবারো রাগ তিরতির করে ওঠে রাফির । এই একটা নাম, এই একজন কাল থেকে চেপে বসে আছে ঘাড়ের উপর । কে এই সাফি ? রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায় রাফির ।
রুহি ও তেঁতে ওঠলো…
” মিনমিন করছিস কেনো ? কে ঐ ছেলেটা ? কি সম্পর্ক ওর তোর সাথে ?
মিহি করুন চোখে চেয়ে বলে….
” কি আবার সম্পর্ক থাকবে ? কি সব বলছিস ? উনি তো আব্বুর পরিচিত । মাঝে মাঝেই আসেন আমাদের বাড়িতে । এর থেকে বেশি কিচ্ছু নয় ।
রাফি খট করে গাড়ির দরজা খুলে দ্বিগুণ গম্ভীর গলায় হাঁক ছাড়ে…..

” রুহি….
গাড়িতে এসে বস তাড়াতাড়ি ।
আর কেউ কথা বাড়ায় না । রুহি গাল ফুলিয়ে গাড়িতে উঠে বসে । মিহির জীবনে অন্য ছেলের আধিপত্য মোটেই সহ্য হচ্ছে না ওর । তাহলে রাফি কিভাবে সহ্য করবে ?
চোখ মুখ শক্ত করে চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রির সামনে গাড়ি নিয়ে এসে থামায় রাফি । এখানে নেমে পড়ে রুহি আর শান্ত । রাফি এখন পৌঁছে দেবে মিহি কে । রুহি আর একটাও কথা বললো না মিহির সাথে । মুখ ফিরিয়ে নেমে গেল গাড়ি থেকে । মিহি ঠোঁট উল্টে তাকালো । তবুও কাজ হলো না ।
সামনের সিটে গিয়ে বসলো সে । রাফিও আর একটা কথাও বলছে না । মিহি কয়েক বার তাকিয়েছে ওর দিকে । চোখ মুখ শক্ত করে গাড়ি চালাচ্ছে ও । কিছুক্ষণের মধ্যেই সেন্ট্রাল হসপিটালের সামনে এসে থামে গাড়ি । মিহি জিজ্ঞাসু নয়নে চেয়ে আগ বাড়িয়ে বলে….

” এখানে কেনো আসলাম আমরা ?
রাফি গাড়ি থেকে নেমে গম্ভীর স্বরে উত্তর দেয়…
” নেমে আসুন….
মিহি বাধ্যের মতো নেমে যায় ।
হসপিটালের নিচ তলায় একটা কেবিনের বেডের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে মিহি । সামনে ডক্টর । ডক্টরের পাশে রাফি । মিহির ক্ষতস্থান গুলোতে ঔষধ লাগিয়ে দেওয়া হবে এখন । এই জন্যই ওকে এখানে নিয়ে এসেছে রাফি ।
স্যানিটাইজার দেখে গুটিয়ে যায় মিহি । এসব লাগালে জ্বলবে ভীষণ ।
ডক্টর তুলো আর স্যানিটাইজার নিয়ে এগোতেই চেঁচিয়ে ওঠে মিহি….
” নাহ…
আমি এসব লাগাবো না । আমি জানি এসব লাগালে জ্বলবে ভীষণ !
আমি কিছুতেই লাগাবো না এসব ।
” কে বলেছে জ্বলবে ? কিচ্ছু হবে না । বরং এসব লাগালে আপনার ক্ষতস্থান আরো তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে, আর না লাগালে ইনফেকশন হয়ে যাবে ।
ডক্টরের কথায় এক লাফে বেড থেকে নেমে পড়ে মিহি । পায়ের ব্যথা নিমিষেই উধাও হয়ে গেছে ওর । ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখিয়ে বলে….
” দেখুন, আমি একদম ঠিক আছি । এসবের কোন প্রয়োজন নেই আমার ।
রাফি ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় । মিহি ঠোঁট উল্টে পিটপিট করে করুন চোখে তাকালো রাফির দিকে । রাফি ডাক্তার কে উদ্দেশ্য করে বলল….

” আমাকে দিন…
আমি লাগিয়ে দিচ্ছি ।
রাফির কথা মতো ডাক্তার তুলো আর স্যানিটাইজার ধরিয়ে দেয় রাফির হাতে । তার ডাক পড়তেই কেবিন থেকে বেরিয়ে যান তিনি । রাফি বসে বেডের সামনের চেয়ারে ।
মিহিকে উদ্দেশ্য করে গলা নামিয়ে বলে….
” এসে বসুন….
” লাগবে না…
” বসতে বলেছি আমি….
মিহি উপায় না পেয়ে গুটি গুটি পায়ে আবারো আগের জায়গায় গিয়ে বসে । রাফি চেয়ার এগিয়ে সামনাসামনি মুখোমুখি হয়ে বসে । মিহির দিকে একবারও তাকাচ্ছে না ও । গম্ভীর স্বরে আবারো বলে….
” হাত দেখি…
মিহি ক্ষিয় কাল স্থির বসে রইলো । তার পর বাড়িয়ে দিলো হাত ।
কনুইয়ের ক্ষত স্থানে আলতো হাতে তুলো চেপে ধরতেই চিনচিনে ব্যাথায় আহহ্ সূচক শব্দ করে কুঁকড়ে যায় মিহি । রাফি তড়িঘড়ি করে ফুঁ দিতে থাকে সেখানে । মিহি চোখ বন্ধ করে নিয়েছে । ফুঁ দেওয়ার ফলে খানিক বাদে ঠান্ডা হয় হাতটা । এখন আর চিনচিন করছে না । মিহি আধো আধো চোখ খোলে । রাফি স্যানিটাইজ করে ব্যান্ডেজ করে দিতে দিতে ভারী কন্ঠে শুধায়…..

” ছেলেটা কে ?
মিহি চকিতে চেয়ে বলে….
” কোন ছেলে টা…?
রাফি নিজের হাত চালাতে চালাতে কপাল কুঁচকে বলে…
” ঐ যে… সাফি না কে শুনলাম….
কে ও ?
” উনি..? উনি তো আব্বুর পরিচিত ! ঢাকায় এসেই পরিচয় হয় ওনার সাথে । খুব ভালো,, সবসময় আব্বুর খেয়াল রাখে…
রাফির কপালে আরো কয়েকটা ভাঁজ পড়ে । দাঁত পিষে বলে….
” আর…
আর কি সম্পর্ক ওর সাথে ?
মিহি ভাবেলাশ’হীন জবাব দেয়….
” আর তো কিছু নেই ।
” Sure তো ? আর কিছু নেই ?
” না…
জানেন, আপনার পাগলী বোন কাল থেকে ওনার জন্য ক্ষেপে আছে আমার উপর । কি জানি কেনো ? উনি তো আমাদের কিছুই হয় না । কিন্তু আপনার বোন বুঝতেই চাইছে না ।
রাফি মুখ বাঁকায় । মনে মনে বিড়বিড় করে সে….

” ঐ বেটা কে দেখে আমার বোনই জ্বেলাসে ফেটে যাচ্ছে, তাহলে ভাবুন আমার কি অবস্থা । দেখতেই হচ্ছে কে সেই ব্যক্তি…..
যার কথা শুনেই পরান জ্বলে যাচ্ছে….
হাতে ব্যান্ডেজ করা শেষ । রাফির কুঁচকানো গম্ভীর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মিহি । হয়তো কিছু বুঝলো, রাফির এই ভঙ্গিমার কারণ । আনমনে হেসে উঠলো ও । কি সুন্দর যত্ন সহকারে মিহির হাতে ব্যান্ডেজ করে দিলো সে । অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছেয়ে যায় মিহির মনে ।
” পা টা দেখি…..
রাফির কথায় ধ্যান ভাঙ্গে মিহির । ঘন ঘন চোখ ঝাপটে একটু পিছিয়ে গলা নামিয়ে বলে…
” আমাকে দিন,, পায়ে আমি করে নিতে পারবো ।
রাফি ভ্রু কুঁচকে তাকালো । বললো না কিছু । মিহি নিজে নিজে পায়ে ঔষধ লাগিয়ে পাতলা ব্যান্ডেজ করে নিলো । রাফি স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো ওর দিকে ।
সবশেষে মিহি তাকালো রাফির দিকে । রাফি দৃষ্টি সরিয়ে বললো….

” এখন ঠিক লাগছে…?
নামুন দেখি… হাঁটতে পারবেন ঠিক মতো ?
মিহি ডাকলো….
” শুনুন….
” হুম… বলুন….
” আ.. আপনার হাতে তো অনেকটা কেটে গেছিলো । জখম হয়ে আছে । আপনি ঔষধ লাগিয়ে নিন ।
রাফি তাকালো নিজের হাতের দিকে । ডান হাতের উল্টো পিঠটা থেঁতলে যাওয়ার মতো জখম হয়ে আছে । তখন ছেলেটা কে ঘুষি মারার ফলে ওর দাঁত লেগে ক্ষত হয়ে গেছে । কেটে গেছে অনেক জায়গায় । রক্ত জমেছিল অনেকটা । হসপিটালে এসেই ভেজা টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলেছে রক্ত । এতক্ষণ খেয়াল করে নি ঠিকমতো । বেখেয়ালে থাকায় ব্যাথাও অনুভব হচ্ছিলো না । এখন খেয়াল আসতেই চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলো রাফি । তবে পাত্তা দিলো না । চোখ ফিরিয়ে বলল…

” লাগবে না….
এমনিতেই সেরে যাবে । আপনি চলুন….
মিহি কপাল কুঁচকে খানিক তেজি স্বরে বলল…
” লাগবে না মানে..?
আমার থেকে বেশি আপনার ক্ষত হয়েছে । দেখুন তো হাতটার কি অবস্থা ।
কে বলেছিল ওভাবে মারতে ?
এখন কোন কথা না বলে ঔষধ লাগিয়ে নেবেন আপনি । বসুন….
রাফি চোখ সরু করে মৃদু হাসলো । বসলো চেয়ারে । হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো…
” আপনি লাগিয়ে দিন….
যদি সমস্যা না থাকে , নয়তো আমি একাই লাগিয়ে নিচ্ছি ‌।
মিহি কথা না বাড়িয়ে রাফির হাত টা নিজের কোলে রাখলো । মনযোগ সহকারে লাগিয়ে দিল ঔষধ । রাফি ইচ্ছে করেই মিহির অভিব্যক্তি অনুধাবনের জন্য নড়ে উঠে ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো একটু । সহসা ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে মিহি বললো….

” ইশশশ…সরি,,সরি….
লাগলো ?
রাফি মাথা নাড়ালো দুদিকে । মুচকি হাসলো ‌একটু ।
সবশেষে মিহি কে নিয়ে বাড়িতে এসেছে রাফি । এমনিতে অন্য সময় বাড়ির সামনে নামিয়ে দেয় মিহিকে । তবে আজ নিজে থেকেই বাড়িতে ঢোকার পরিকল্পনা করেছে সে । দেখতে হবে এই সাফি কে !
কলিং বেল বাজতেই দরজা খুলে দেন সাবিনা বেগম ।
মিহিকে কোঁকড়ানো অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি ‌ । সহসা বুক টেনে নেন মেয়ে কে ।
মিহির হাত পায়ে ব্যান্ডেজ দেখে অস্থির হয়ে বলেন…..
” কি করে হলো এসব ? তোর হাত পায়ে ব্যান্ডেজ কেনো ? কি হয়েছে ,বল ?
” আম্মু,, আম্মু এতো প্যানিক করো না , আমি ঠিক আছি । ঐ একটু পড়ে গেছিলাম রাস্তায় । একটু ছিলে গেছে । বেশি কিছু হয় নি ।
” এতক্ষণ কোথায় ছিলি তুই ? সাফি বললো লাইব্রেরীতে না কোথায় গেছিলি । বলে যাবি না আমাদের । তুই তো জানিস আমরা সবসময় টেনশনে থাকি তোকে নিয়ে ।
একটু ও ভাবিস না তুই আমাদের নিয়ে ।
জানিস তোর আব্বুর কি অবস্থা হয়েছিল আজকে ? কতবার ফোন করেছে তোকে….
একনাগাড়ে কথা গুলো বলতে বলতে নজর যায় মিহির পিছনে রাফির দিকে । অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন সাবিনা বেগম । হাসার চেষ্টা করেন তিনি ।

” আরে,, রা…রাফি, বাবা তুমি ?
” জ্বি আন্টি…
আসসালামুয়ালাইকুম….
ভালো আছেন ?
” ওয়ালাইকুমুস সালাম, বাবা….
বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেনো ? ভেতরে এসো । আমিও কেমন , খেয়ালই করি নি তোমায় ‌!
রাফি পা বাড়ায় ভেতরে । মিহি মুচকি হাসে । আশেপাশে দেখে আব্বু নেই ।
” আব্বু কোথায় আম্মু…?
সাবিনা বেগমের মুখটা চুপসে যায় খানিক । তিনি গলা খাদে নামিয়ে বলেন…..
” তোর আব্বু ঘরেই আছেন ।
সাফি এতক্ষণ ছিলো,, তোর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে চলে গেছে ও । কি একটা জরুরী মিটিং ছিল , তাই যেতে হয়েছে ।
রাফির কপালে আবারো ভাঁজ পড়ে । সাফির কথা শুনে রাফির অভিব্যক্তি পর্যবেক্ষণের জন্য মিহি তাকায় রাফির দিকে ।‌ রাফি একটা প্যাকেট এগিয়ে দিতে দিতে বলে….
” আন্টি….
আমি আসি ? এখানে কিছু মেডিসিন আছে, খাইয়ে দেবেন আপনার মেয়ে কে । পড়ে গিয়ে হাত পা ছিলে গেছে একটু ।

এক দেখায় পর্ব ২৩

” এক্ষুনি তো এলে বাবা,, এতো তাড়াতাড়ি চলে যাবে ?
বসো একটু,,, অন্তত এক কাপ কফি তো খেতে পারো , আমি কফি বানিয়ে আনছি তোমার জন্য ।
” না না আন্টি ….
আজ আর বসবো না । অন্য একদিন আবার আসবো । আজ আসি…
সাবিনা বেগম বাঁধা দিলেন না আর । সরু চোখে লক্ষ্য করলেন রাফির হাতের ব্যান্ডেজ ।
রাফিও কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে আসে বাড়ি থেকে । সাবিনা বেগমের সামনে আর একটাও কথা বলে না মিহির সাথে । মিহির মন উসখুস করছিল কিছু বলার জন্য , তবে আম্মুর সামনে পারলো না বলতে । রাফি বেরিয়ে আসতেই ও ধীরে ধীরে উঠে গেল আব্বুর কাছে ।

এক দেখায় পর্ব ২৫