এক দেখায় পর্ব ৪৯
সুরভী আক্তার
চোখ পিটপিট করে চেয়ে সামনে সরাসরি রাফি কে দেখে ছ্যাঁত করে উঠলো মিহি । মুহুর্তেই বৃহৎ হলো ঘুম কাতুরে অক্ষি যুগল । ও চোখ খুললেই পর পর দুই বার ডান ভ্রু নাচালো রাফি । মিহি চোখ সূক্ষ্ম করে এক পলকেই নিজেকে আড়াল করলো । এই লোকের সামনে পড়া দায় । চোখে চোখ রাখা তো দুর । মিহি তড়িতে সফেদ চাদর টেনে ঢেকে ফেললো নিজেকে । একেবারে মাথা অবধি ঢেকে চোখ বুজলো । হেসে ফেললো রাফি । খানিক শব্দ করেই । লজ্জা পেয়েছে তার ব্লোসোম ! কালকের ঘটনাটার পর চোখ তুলেও তাকায় নি । রাফি ভাব নিয়ে ভ্রু যুগল জড়ো করলো । গলা খাঁকারি দিলো সে । মিহির সাঁড়া শব্দ নেই । রাফি একটু ঝুঁকলো । চাদরের উপর থেকে মিহির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করলো হিমায়িত কন্ঠে…..
” ম্যাডাম..! আর ইউ ওকে ! ডক্টর ডাকবো …
” সরুন আমার কাছ থেকে । একদম কাছে আসবেন না । কিচ্ছু হয়নি আমার । ডাক্তার কেনো ডাকবেন !
চাদরের ভেতর থেকে ছটফট করে ঘুম জড়ানো গলায় খেকিয়ে উঠলো মিহি । রাফি দূরে সরলো । কন্ঠ খানিক ভার করে বললো….
” যেভাবে লজ্জা পাচ্ছেন । আমি কি না কি করেছি যেনো ! এতেই এতো ? অবশ্য লজ্জা নারীর ভূষণ । আর এই ভূষণ টুকু আমার কাছ থেকেই পেতে হবে আপনাকে । সারাজীবন । সারাদিন , সারারাত । আমি লজ্জায় রাঙাবো আপনাকে । লজ্জায় লালিত রাঙা বউ আপনি আমার । আপনাকে লজ্জা আমিই দেবো , আর আমিই ভাঙ্গবো । আপনার লজ্জা লজ্জা মুখখানা ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে ম্যাডাম…ধরা দিন আমার চোখে…
” নির্লজ্জ লোক ,, মুখে কথা ফুটছে কিভাবে দেখো ?
হাওয়ায় বিড়বিড় করলো মিহি ।
” নির্লজ্জ হওয়ার মতো কি এমন করলাম শুনি ?
” কি করেননি সেটা বলুন ?
” কিছুই তো করি নি । একটু চুমু খেয়েছি শুধু । আর তো কিছু করি নি । কি কি করি নি শুনবেন ?
অধর কামড়ে ফিচেল স্বর রাফির । মিহি মুখ কুঁচকালো । চোখ মুখ গরম হয়ে আসছে ওর । ঘাম জমছে উষ্ণ গরম শরীরে । মিহি শোয়া অবস্থায় রাফির থেকে সরে এসে বললো….
” চুপ করবেন ?
” আচ্ছা চুপ করলাম । চাদর সরাও এবার…
” নাহ ,,,
” কেনো ?
” আপনার দিকে তাকাতে পারবো না আমি !
” তাকাতে হবে না , চোখ বুজে থেকো ।
মিহি তড়িতে চড়ে উঠলো….
” আজ আর চোখ বুজবো না ভাই ,, আপনাকে বিশ্বাস নেই । আমি তাকাবো না আপনার দিকে…
কুঁচকানো মুখশ্রী শিথিল করে হেসে ফেললো রাফি । নিঃশব্দে মৃদু হাসি ওর । আর কিছু বললো না । চুপ করে রইলো ।
অনেকটা মুহূর্ত নীরবে থাকার পর চাদরের নিচে কপাল গুটালো মিহি । রাফির কোনো সাড়া শব্দ নেই । এই লোক কি চলে গেলো নাকি ? সন্দেহ কাটাতে মিহি ধীরে ধীরে চাদর সরালো । পিটপিট করে চোখ তুলতেই মুখোমুখি হলো রাফির তীক্ষ্ণ দৃষ্টির । অমনি ছ্যাঁত করে উঠলো । ফের এক ঝটকায় চাদর টানলো ,, ঢেকে নিলো পুরো মাথা । রাফি এবার কুন্ঠা ঠেলে জোর খাটিয়ে চাদর খানা সরিয়ে দিলো মিহির থেকে । মিহি আর আটকে রাখতে পারল না । রাফি চাদর সরাতেই কাত হয়ে দুহাতে মুখ আড়াল করলো সে ,, রাফি ওকে ওভাবে দেখে কাতর হয়ে আসলো…
” মিহি ,, আই এম সরি….
আই নো তুমি হেজিটেসন ফিল করছো ! আমার বোধহয় ওভাবে তোমাকে জোর করা উচিত হয়নি । আই সরি মাই গার্ল…
আর এমনটা হবে না । এবার তো এসব ছাড়ো ,, তাকাও আমার দিকে প্লিজ…
মিহি ধীরে ধীরে হাত সরালো । রাফির কন্ঠ শুনে কেমন যেনো ফ্রাসটেটেড লাগলো । মিহি আজকাল অনেক বাড়াবাড়ি করে ফেলে । সে পেছনে ফেরার আগেই রাফির একই স্বর কানে আসলো….
” আমি ভালো নেই মিহি…
তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরলো মিহি । রাফির শুকনো মলিন চেহারা খানা দেখে ধক্ করে উঠলো । ও কি পরিমান স্বার্থপর ! ও তো একবারও খোঁজ নেয় নি রাফির ! রাফি কেমন থাকলো না থাকলো জানতে চায়নি একবারও । অথচ রাফি ? সে কি না করলো মিহির জন্য ।
রাফির ও তো গুলি লেগেছে । কেমন বেমালুম ভুলে গেছিলো মিহি । রাফির অবস্থা দেখে মনে পড়লো এখন । বাহুতে এখনো ব্যান্ডেজ রাফির । মিহি আঁতকে উঠলো । উঠে বসার ক্ষমতা নেই । শোয়া অবস্থায় রাফির বাহুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ছটফট করে উঠলো মিহি….
” আপনি ? আ…আপনার গুলি লেগেছিল …
আপনি ঠিক আছেন ?
” ঠিক আছি বলেই তোমার সামনে বসে আছি । নয়তো উপরে চলে যেতাম এতক্ষণে….
” চুপ করুন । সবসময় এসব কথা বলেন কেনো আপনি ?
রাফি কিছু বললো না । চেয়ে থেকে একটু হাসলো । মিহি গলা নামালো । নিচু স্বরে বলল…
” আমাকে একটু ধরুন তো , হেল্প করুন , উঠে বসবো ….
” উহুম…ব্যাথা পাবে ?
” আপনি তো আছেন , পাবো না ব্যাথা ! ধরুন…
” না মিহি ,, ব্যাথা পাবে তুমি ? ডাক্তার নড়াচড়া করতে বারন করেছে । উঠে বসা যাবে না । কি প্রয়োজন বলো , আমি দিচ্ছি…
” আপনাকে প্রয়োজন…
আচমকা মুখ ফসকে বলে বসলো মেয়েটা । কথাটা বোধগম্য হতেই সম্বিতে ফিরলো । চোখে ঘন ফেললো এদিক ওদিক । রাফি বুঝেও বুঝলো না । শুধালো সন্দিহান হয়ে….
” হ্যাঁ ?? কি বললে ? শুনতে পাই নি….
” কিছু না । আপনার হাতে ব্যান্ডেজ ? গুলি লেগেছিল তো ?
” হুম …
” তাহলে ?
” বেশি কিছু হয় নি । ব্লাড লস হয়েছে একটু । চামড়া ঘেঁষে বুলেট বেড়িয়ে গেছে…
নাউ , আই এম ফাইন….
মিহি খানিক নীরবে শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকলো । সবকিছু মনে আসতেই ধীর কন্ঠে জড়তা নিয়ে বললো…
” আ…আপনি রাফি ?
” তো কে ?
” উনি আপনাকে মারতে চাইলো কেনো ? কিসব বলল উনি ! আপনি ,, আপনি ওনার বোন কে মেরে….
” মিহি ..?
খানিক ধমকের স্বর । কথার মাঝে ধমক পেয়ে তৎক্ষণাৎ থেমে গেল মিহি । তবুও রাফির থেকে চোখ সরালো । কম্পিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল । রাফি শান্ত হয়ে একটু এগোলো , বললো নরম গলায়…
” আমাকে বিশ্বাস করো ?
সময় নিয়ে উপর নিচ মাথা নাড়ালো মিহি । মুখে বললো না কিছু । রাফি বললো…
” কিছু কথা বলি , শুনবে ?
আবারো উপর নিচ মাথা নাড়ালো মিহি । নরম কন্ঠ আরো বেশি শীতল করলো রাফি । দীর্ঘ শ্বাস টেনে বললো মিহির হাত দুখানা জড়িয়ে…
” জানো ,, সারফারাজ কে ?
আমার বেস্ট ফ্রেন্ড । শান্তর মতোই , শান্তর থেকে বোধহয় বেশিই ছিল ও । আমার রক্তের সাথে মিশে গেছিলো ও , যেভাবে তুমি আমার প্রতিটা শ্বাস প্রশ্বাসে জড়িয়ে আছো , ঠিক সেভাবেই বন্ধু হিসেবে ও আমার শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে জড়িয়ে ছিলো ।
ওর একটা বোন আছে , আছে না ছিলো , মেহজাবিনের বয়সী । আজ থেকে ছয় বছর আগে আমি ওকে থাপ্পড় মেরেছিলাম । ও সারফারাজের বোন , আমার ও তো বোন বলো ? ওকে বোন ভাবতাম আমি ! বোনের মতো খুনসুটি করতাম ওর সাথে । ও বোধহয় এই খুনসুটি গুলোকে অন্য চোখে দেখেছিলো । অন্য কিছু ভেবেছিল আমাকে । ও মেন্টালি নরমাল ছিলো না , প্রবলেম ছিল ওর । ভীষণ জেদি আর সাইকো ছিল ।
ওর মনভাব যখন বুঝলাম আমি , তখন দূরত্ব বাড়িয়ে ছিলাম ওর থেকে । প্রথম প্রথম বুঝিয়ে ছিলাম । কিন্তু ও বুঝতে চায় নি । উঠতি বয়সে নিজের মেন্টালিটি ভুল দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে । নিজের জেদকে ধরে আমাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য ঐ পুঁচকে মেয়েটা কতটা নিচে নেমেছিল সেটা সারফারাজ জানতো । আমাকে সিডিউজ করতে চেয়েছিল ওর বোন । ওদের বাড়িতে সবসময় যাওয়া আসা হতো আমার । আন্টি আঙ্কেল বাড়িতে ছিলেন না একদিন । সেদিন ও আমাকে ফোন করলো । ওর মাইগ্রেন এর প্রবলেম ও ছিলো । মেন্টালি ডিপ্রেসড হলে ওকে সামলানো যেতো না । মাইগ্রেনের ব্যাথায় ছটফট করতো । সব জানা আমার । ও আমাকে বললো ওর নাকি মাইগ্রেন পেইন উঠেছে । সারফারাজ ও বাড়িতে নেই ।
আমি কোনো কিছু না ভেবে ছুটলাম । সারফারাজ কে ফোন করে পেলাম না । ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখি ও একদম ঠিক , কিচ্ছু হয় নি ওর । বাড়িতে কেউ নেই এটা সত্য,বাকিটা মিথ্যে । টেনশনে ছুটে গেছিলাম , ধমকালাম ওকে । আমার ধমকে ও কখনো মন খারাপ করে নি । হেসে উড়িয়ে দিয়েছে সবসময় । সেদিন ও তাই করলো ।
কিন্তু তার পর ও আমার, আমার কাছে আসার বাহানা করতে লাগলো । সেই সময় আমি কিন্তু ফেমাস ছিলাম জানো , এখন হয়তো নেই । আমার গানের ক্যারিয়ারের মূলে ছিল সারফারাজ । ও আমাকে এই গানের জগৎ দেখিয়েছে , ওর জন্য আমি সংগীত শিল্পী রুজান রাফি চৌধুরী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলাম । গান নিয়ে কখনো সিরিয়াস ছিলাম না । ওর জোরে গাইতাম । ও আমাকে চিয়ার করতো অনেক ।
যখন গানের জগতে সবার প্রায়োরিটি পেলাম, তখন থেকে ওর বোনের জেদে পরিনত হয়েছিলাম আমি । ও যে করেই হোক শুধু আমাকে পেতে চাইতো । বয়স কতোই বা ছিলো ওর । সেদিন ওর নোংরামিতে ভীষণ অবাক হয়েছিলাম । ঐ মেয়ে টাকে সেদিন চিনতে পারি নি আমি । ও আমাকে ভাইয়া ডাকাও বন্ধ করে দিয়েছিল ।
সেদিন ওর বিহেবিয়ারের জন্য ওকে থাপ্পড় মারতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি । দুটো থাপ্পর মেরেছিলাম । তার পর বেরিয়ে এসেছিলাম বাড়ি থেকে ।
রাতে শুনলাম,খবর পেলাম ও আর নেই , সুইসাইড করেছে । আর সুইসাইড নোটে লিখে গেছে সব । নোটটা শুধু সারফারাজ দেখেছিল । আর তখন থেকেই আমার প্রতি ভুল ধারণা জন্মায় ওর । বন্ধু থেকে শত্রুতে পরিণত হয় ও আমার । এতে আমার কি দোষ বলতো ? আমি তো ওর বোনকে বোঝাতে চেয়েছিলাম , ইভেন বুঝিয়েছি অনেক । কিন্তু সেদিনের ওর কর্মকান্ডের জন্য ওকে মারতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি ।
সারফারাজ কে বুঝিয়েছিলাম অনেক , ও নিজেও বুঝতে চায় নি ।
হঠাৎ একদিন দেশ ছাড়লো । কোথায় গেলো পেলাম না খুঁজে । ফিরে আসলো ছয়টা বছর পর । এসে কি করলো ? হারিয়ে গেলো..
ধরে আসলো রাফির কন্ঠস্বর । থামলো ও । মিহি নীরবে শুনলো সবকিছু । এসবের জন্য এতো কিছু ?
রাফি চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করতেই ধীর কন্ঠে বলল মিহি….
” আপনি ঐ মেয়েটা কে ভালোবাসতেন ? ছুঁয়েছিলেন ওকে…?
কম্পিত স্বরে আপনা আপনি মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো বাক্য দুটো । কেনো প্রশ্ন করলো জানা নেই । রাফি চাইলো তৎক্ষণাৎ । মিহির ধরে রাখা হাত দুটো ছেড়ে দিলো । তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল…
” হাহহ…তুমি আমাকে এই প্রশ্ন টা করতে পারলে মিহি ? আমাকে কেউ কেনো বোঝে না, বলতে পারো ?
” আমি বুঝি তো ।
” বোঝো ?
” বুঝতে চাই ।
” তাহলে বুঝে নাও , আমার জীবনে আসা একমাত্র মেয়ে তুমি । প্রথম তোমাকেই ছুঁয়েছিলাম , তাও ভুল করে । চোখেও, মনেও আর স্পর্শেও । এই জীবনে আর কেউ কোনদিন আসে নি বিশ্বাস করো ।
একটু থেমে আবার বললো…
” তুমি সেই ছোট বেলায় এসেছিলে আমার জীবনে । আমাদের জীবনে । রুহির পর যখন তোমাকে দেখলাম , আমার হিংসে হয়েছিল জানো ? আমার বোনের আদরের ভাগিদার হিসেবে তুমি এসে গেছিলে । শান্ত বলতো রুহি নাকি বেশি কাঁদে , আর তুমি হাসো । আমি তোমাকে কাঁদতে দেখতে চেয়েছিলাম । আমার বোন কেন কাঁদবে ? কাঁদবে তো তুমি ? কিন্তু তুমি তো কাঁদতে না…
” আপনি আমাকে কাঁদতে দেখতে চেয়েছিলেন ?
” চেয়েছিলাম ! হিংসে করে ! এখন আর চাই না । তোমার প্রতি আরো একটা কারনে খুব রাগ হতো আমার । একদম খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করতো তোমায় ।
” কি কারণ ?
” সেটা বলবো না । তখন ছোট ছিলে , আর আমিও । এখন আর কেউ ছোট নেই । আর না আমাদের সম্পর্ক টা সেই কারনে আটকে আছে । তুমি আমার মামনির মেয়ে হওয়ার আগে আমার বউ…
মামনির মেয়ে হিসেবে তোমাকে কাল পেলাম , যেটা হিসেবে আগে পেয়েছি সেটাই চালিয়ে নিয়ে যাই । আমার বউ রানী , আমার ব্লোসোম হিসেবে ধরে রাখতে চাই আপনাকে ম্যাডাম । থাকবেন তো আমার হয়ে ?
মিহি তৎক্ষণাৎ মুচকি হাসলো । মাথা নাড়ালো উপর নিচ । হাসলো রাফিও । মিহি হাসি থামিয়ে কপাল গুটিয়ে ভারী গলায় বলল আচমকা…
” আমি কিন্তু আপনার বোন , সো বোন হিসবেই থাকবো ।
কপাল কুঁচকালো রাফি । মিহির মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো পরমুহূর্তে । দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে হেনা বেগম গলা ছাড়লেন…
” কি এতো কথা হচ্ছে ভাই বোনের মধ্যে ? দু’জনেই দেখি খুব হাসছো ! এতো হাসাহাসি কিসের হ্যাঁ ?
হেনা বেগমের কথায় চমকে তাকালো দুজনে । সাবিনা বেগম তব্দা খেয়ে চোখ গোল গোল করে তাকালেন । রাফির অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য পরমুহূর্তেই ঝট করে তাকালেন রাফির দিকে ।
মিহি কে পুরো বেড রেস্ট দেওয়া হয়েছে । একটুও নড়াচড়া করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ওর জন্য ।
পুরো এক সপ্তাহ হসপিটালে থাকার পর ওকে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয়েছে আজ । আজ ওকে চৌধুরী বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে । সবাই অপেক্ষায় আছে তাদের মেয়ের জন্য । হেনা বেগম, হালিমা বেগম যত্রতত্র প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি । মেয়ে আসলে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত সব । রান্না বান্নার হিরিক পড়েছে দ্বিগুণ । রাশেদ রায়হান চৌধুরী, জুবায়ের চৌধুরী হসপিটালে । রাফি, শান্ত,রুহি ওরা তো আছেই । সাবিনা বেগম ও সাথে আছেন । সব ফরমালিটি শেষ করে রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর জুবায়ের চৌধুরী বাইরে বেরিয়েছেন । বাইরে তাদের দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে । মিহির হাঁটা চলা বারন । ওকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে কেবিন থেকে বের করেছেন সিস্টার । রিসিপসন থেকে কেবিনের উদ্দেশ্যে উপরে উঠতে উঠতে সাবিনা বেগম আর রুহি, মিহি কে নিয়ে কেবিন ছেড়ে বেরিয়েছে । মেয়েটা শুকিয়েছে আরো । এই কদিনে চেহারায় অদ্ভুত ফ্যাকাশে ভাব এসেছে । হিমোগ্লোবিন কম এখনো । আগামী চার মাসে এক ব্যাগ করে চার ব্যাগ রক্ত দিতে বলা হয়েছে । রুহি হুইলচেয়ার ঠেলে করিডোর দিয়ে নিয়ে আসছে মিহি কে । সাবিনা বেগম মেয়ের দিকে সতর্কিত নজরে চেয়ে পাশাপাশি হাঁটছেন । মিহির মুখখানি থমথমে । অদ্ভুত জেদি ভাব জন্মেছে এই কদিনে । বিরক্তি বেড়েছে । সবকিছুতে বিরক্তি আসে ।
রাফি আর শান্ত ওদের মুখোমুখি পড়লো লিফটের সামনে । রাফি কে না দেখেই লিফটের সামনে থামতেই চোখ মুখ কুঁচকে ক্যাট ক্যাট করে উঠলো মিহি….
” আমি লিফটে উঠবো না । সিঁড়ি দিয়ে নিচে নিয়ে চলো আমায় । আমি হাঁটতে পারবো…
” সিঁড়ি দিয়ে নামলে কষ্ট হয়ে যাবে । ওভাবে কষ্ট করে নামার প্রয়োজন নেই ।
সাবিনা বেগমের স্বাভাবিক স্বর । মিহি চোখ তুলে তাকিয়ে গলা নিচু করলো….
” আম্মু ,,, আমার লিফটে ভয় লাগে । আমি তো এখন ঠিক আছি । হাঁটতে পারবো । সিঁড়ি দিয়ে নামতে কোনো কষ্ট হবে না আমার….
” নিজের কষ্টের কথা নিজে না ভাবলেও চলবে তোমার । চুপ চাপ বসে থাকো । ভয় কিসের ? আমরা তো আছি….
আম্মুর চড়া গলায় চুপসে গেলো মিহি । মুখখানি আরো থমথমে করে মাথা নোয়ালো । নিজের হাত খামচে ধরলো নিজেই ।
রাফি একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলো । অমন হাবভাব দেখে না দাঁড়িয়ে এগিয়ে আসলো ও । করিডোরে অনেকের চলাচল । আজ নার্সদের একটু বেশি । মিহির পিছু পিছু অনেকেই ছিলেন আজ । তারাও বেরিয়েছেন কেবিন থেকে । আজ চলে যাচ্ছে চৌধুরী বাড়ির এই পেসেন্ট । রুজান রাফি চৌধুরীর বোন । এটাই জানা তাদের । এই মেয়ে টার জন্য গত এক সপ্তাহ হসপিটালে ছোটাছুটি করেছে রাফি । স্বয়ং রুজান রাফি চৌধুরী ।
জুনিয়র সিস্টারদের মধ্যে অধিকাংশই রাফি সম্পর্কে অবগত । একাংশ অজ্ঞাত । যারা জানে না তারাও জেনেছে এই কদিনে । সুদর্শন রাফি কারোর চোখই এড়ায় নি । যারা দেখেছে তারাই হাঁ বনে তাকিয়ে ছিলো ।
অনেকের স্বাপ্নিক পুরুষ তাদের সামনে বাস্তবে । কিছু ছুঁয়ে দেখা বা কাছে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই । রাফি রূঢ় হয়ে সবাইকে এভয়েড করেছে । অনেকে সুযোগ বুঝে এক বাক্য কথা বলার পায়তারা করেছে অনেক । কিন্তু ব্যার্থ হয়েছে । রাফির থেকে কোনো রেসপন্স পায় নি । তার উপর অতিরিক্ত এগোয়নি কেউ , যদি কমপ্লেইন যায় , তাহলে তাদের ক্যারিয়ারে টানাটানি পড়বে । আজ শেষ দিন । আর শেষ সুযোগ ও ।
এক জোট হয়ে এগিয়ে এসেছে আজ সবাই । লিফটের সামনে রাফি সহ বাকিদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিক দাঁড়িয়ে আবারো হাঁ বনে চেয়ে দেখলো রাফি কে । দেখা শেষ করে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে আসলো মেয়েদের পুরো দল । রাফি মিহির সামনে এসে দাঁড়াতেই বিরক্তি নিয়ে চোখ তুলে তাকালো মিহি । সাবিনা বেগম তাকিয়ে হাঁফ ছেড়ে কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই একজন নার্স ছটফট স্বরে বললেন…
” এক্সকিউজ মি…
রাফি… উই মিন ভাইয়া…
উই ক্যান টেক ওয়ান পিকচার উইথ ইউ ? প্লিজ !! জাস্ট,ওয়ানস…
প্লিজ না করবেন না ।
রাফি চোখ তুলে স্বাভাবিক ভাবে দৃষ্টিপাত করলো তাদের দিকে । মিহি তাকিয়েছে চকিতে । রুহি আর সাবিনা বেগম ও তাকালেন । রাফি মেয়ে গুলোর থেকে অবিলম্বে চোখ সরিয়ে সাবিনা বেগমের দিকে তাকালো । সাবধানি শীতল কন্ঠে বলল…
” আপনি নিচে যান আন্টি । আমি ওকে সিঁড়ি দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি ।
কথা বাড়ালেন না সাবিনা বেগম । তার হাতে ছোট ছোট দুটো ব্যাগ । মিহির ঔষধ পত্র সহ সবকিছু তার হাতেই । তিনি দ্বিমত না করে লিফটে উঠলেন ।
চলে যেতেই রাফি সোজাসুজি মিহির দিকে তাকালো । কাঠ স্বরে বলল….
” হোয়াটস প্রবলেম ?
মুখ বাকালো মিহি । বিড়বিড় করে বললো ভেংচি কেটে…
” আমার কি সমস্যা থাকবে ?
” খুব সুস্থ হয়ে গেছো,, না ? সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামবে ? এতো কনফিডেন্স ?
ফের মুখ বাঁকালো মিহি । ওকে তো জোর করে অসুস্থ বানিয়ে রাখা হয়েছে । দিব্বি সুস্থ আছে ও । হাঁটা চলা করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে হাঁটতে পারছে না । একঘেয়েমি ধরেছে এভাবে সপ্তাহ জুড়ে শুয়ে বসে থেকে । বিরক্তির চরম পর্যায়ে মিহি । ওকে বিড়বিড় করতে দেখে নিঃশব্দে তপ্ত শ্বাস ফেললো রাফি । শান্ত ফিচেল হেসে বাঁকা স্বরে একটু চেপে টিটকারী মারলো….
” আরে ব্রো ,, সুযোগ হাতছাড়া করতে নেই । বেচারি বাহানা করে সুযোগ দিচ্ছে তোকে । তুই কাজে লাগাতেই পারিস । এই সুযোগেই তো ছিলি ।
” স্যার ,, প্লিজ । ওয়ান ফটো প্লিজ । উই আর ওয়েটিং ফর ইউর রিপ্লাই । আজ তো চলেই যাচ্ছেন আপনার বোনকে নিয়ে । আর হয়তো সুযোগ পাবো না । ট্রাস্ট আছ… উই আর ইউর বিগ ফ্যান….
আপনাকে দেখার ইচ্ছে ছিলো অনেক । এতো দিন আপনাদের কান্ডিসন দেখে কিছু বলি নি । বাট টুডে ইজ লাস্ট…
প্লিজ স্যার ,, আমরা জাস্ট একটা করে পিকচার ক্লিক করতে চাই আপনার সাথে । আমরা বেশি নোই , জাস্ট এগারো জন । এগারো টা পিকচার, প্লিজ… ডোন্ট মাইন্ড এন্ড ইগনোর প্লিজ…
মেয়েলি চিকন স্বরে মিহি ফের ঝট করে তাকালো । এ্যাহ,,সখ কতো ? ওরা নাকি এগারো জন , তাও মাত্র !! কিভাবে রসিয়ে রসিয়ে গদগদ হয়ে কথা বলছে দেখো ? ইংরেজি ও ঝাড়ছে কথায় কথায় , ভাব দেখাচ্ছে এই মেয়েটা ? এই মেয়েটাই তো মিহির দায়িত্বে ছিলো । মিহি আগেও লক্ষ্য করেছে,, এই মেয়েটা সবসময় কেমন ভ্যাটভ্যাট করে তাকিয়ে থাকতো রাফির দিকে । রাফি আসলে ছলে বলে আরো বেশি দেখাশোনার পাঁয়তারা করতো মিহির । হেসে হেসে কথা টানার চেষ্টা করতো ,সাথে অবশ্য আরো দু একজন ছিলো । কিন্তু এই মেয়েটা একটু বেশি বেশিই । যদিও রাফি পাত্তা দেয় নি । মেয়েটার দিকে কটমট করে তাকালো মিহি । কেমন ফ্যাল ফ্যাল মিটিমিটি হাসছে দেখো ? ঠোঁটে লিপস্টিক ও লাগিয়েছে , এটা তো ওদের ডিউটি বহির্ভূত ।
মেয়ে গুলো কেমন চকচক নয়নে আপ্লুত হয়ে চেয়ে আছে রাফির পানে । মিহি এবার রাফির দৃষ্টি পর্যবেক্ষণের জন্য ঝট করে তাকালো রাফির দিকে । তৎক্ষণাৎ ওর থেকে চোখ সরালো রাফি । মিটিমিটি হেসে মেয়ে গুলোর দিকে তাকিয়ে আলতো করে বললো….
” ডোন্ট ওয়ারি…আই ডোন্ট মাইন্ড ।
ইউ ক্যান…!
খুশিতে চিকচিক করে উঠলো মেয়ে গুলো । ঝেড়ে উঠলো সকলে । গদগদ হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো । রাফি মিহির সম্মুখ থেকে একটু সরেছে । মিহিও তেঁতে উঠে ছলকে তাকিয়েছে রাফির পানে । একেই বিরক্ত সে , তার উপর বিরক্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিলো এই লোকটার নরম কথাটা । কটমট করে উঠলো মিহি । নিজের হাত চেপে ধরে কপাল কুঁচকালো অধিক মাত্রায় । ছবি তোলার জন্য রাফির পাশে একটা মেয়ে দাঁড়াতেই না তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল রাফি….
” একটু দুরে ।
কথাটা মেয়ে গুলো বাদে মিহির কানে পৌঁছায় নি । ক্ষুব্ধ হয়ে ফুঁসছে সে । রাফির পাশে অন্য মেয়েকে কবে থেকে সহ্য করতে পারে না জানা নেই । আজ একটুও সহ্য হলো না । গর্জে উঠলো ও….
” রুহি ,,, নিচে নিয়ে চল আমায় । আমি থাকবো না এখানে ।
ভাইয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে মুচকি হাসলো রুহি । একটু হেলে চাপা স্বরে বললো মিহির কানের কাছে….
” হিংসে হচ্ছে ভাবি জান ? আর ইউ জ্বেলাস ?
” এসব সেলিব্রিটি দের কারবার দেখার ইচ্ছে নেই আমার । আমি গেলাম….
বলেই বসা থেকে উঠতে উদ্যত হলো মিহি । খালি পা মেঝেতে রাখতেই শিরশির করে উঠলো পুরো শরীর ।
দাঁড়ানোর আগেই হুট করে তেড়ে আসলো রাফি । চেয়ারের দুই হাতলে নিজের দুহাত ঠেসে ঝুঁকে পড়লো । মিহি দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা পাল্টে আগের অবস্থায় বসে পড়লো ভিমড়ি খেয়ে । ছ্যাত করে উঠলো আচমকা আক্রমণে । সবাই চমকেছে । রাফি বাঁকা হেসে গলা বাড়িয়ে বললো…..
” এতো তাড়া কিসের বেইব ? আমি তো আছি । তোমায় কষ্ট করে হাঁটতে হবে না ।
অতঃপর মেয়ে গুলোর দিকে একপলক চেয়ে বললো একই ভাবে…
” নো মোর টুডে গার্লস…. ওয়ান ডে এগেইন…!
কথা শেষ করেই সোজা হয়ে দাঁড়ালো । মিহি বোকার মতো চেয়ে আছে । রাফি ঠোঁট পিষে হাসলো বাঁকা । গলা খাঁকারি দিয়ে সরে এসেছে রুহি । শান্তর পাশে দাঁড়াতেই ভ্রু নাচালো শান্ত । ওদের আরো বেশি অবাক করে ঝট করে মিহি কে নিজের দখলে তুললো রাফি । একই সাথে বললো হাস্কি স্বরে….
” কোলে এসো জান….
রাফির আচমকা কান্ডে ভ্যাবাচ্যাকা খেলো সবাই । মিহি অনড় একমাত্র । ও ভ্যাট ভ্যাট করে নির্বোধের ন্যায় চেয়ে আছে । রাফি ওকে পাজা কোলা করে তুলতেই আকস্মিক নিজেকে সামলাতে রাফির গলা জড়িয়ে ধরলো আপনা আপনি । বিরক্তিতে কুঁচকানো কপাল স্বাভাবিক হলো , বৃহৎ হলো অক্ষি যুগল । ও নিজেও থতমত অবস্থায় পড়েছে অকস্মাৎ । মেয়ে গুলো ড্যাপ ড্যাপ করে চেয়ে আছে । মিহির সম্পর্কে তারা যা জানে , তাতে মিহি রুজান রাফি চৌধুরীর কাজিন সিস্টার । সম্পর্কে বোন ।
তবে এসব কি ? রাফির কথায় তো মনে হলো না ! যা মনে হলো তাতে এই মেয়েটা রুজান রাফি চৌধুরীর কি তা একাংশ বোধগম্য হতে সময় লাগলো না ।
আকাশ থেকে পড়লো মতো অবস্থা সবার । চোখ গোল গোল করে অবিশ্বাস নয়নে তাকিয়ে আছে গোনা ধরা একে একে চৌদ্দ জোড়া দৃষ্টি । মিহির ডাগর দৃষ্টি যুক্ত সেই দৃষ্টি দ্বয়ের সাথেই এক । আশেপাশেও অনেকেই তাকাচ্ছে হাঁটার মাঝে । তাদের দৃষ্টি গুলো পরিগণিত নয় । রাফি মিহি কে কোলে তুলে পা বাড়াতে গেলে মেকি স্বরে গলা ঝেড়ে বলে উঠলো শান্ত…
” তুই যা ব্রো ,, আমরা আসছি….
আমার জান আবার লিফটে উঠতে ভয় পায় না । দুর্ভাগ্য আমার ।
রাফি বেশি কান দিলো না । হাসলো অদ্ভুত । কয়েক পা এগোতেই মেয়ে গুলো একই সাথে পিছন ফিরে তাকালো ওর হাঁটার পানে । মিহি গলা জড়িয়ে অদ্ভুত ঘোরে ডুবে বিমূর্ত হয়ে চেয়ে আছে রাফির পানে । রাফি আড়চোখে ওকে দেখলো , সে হাঁটছে টানটান হয়ে । মিহির ছোট্ট শরীর টা ওর সুঠাম দেহের মাঝে গুটিয়ে হারিয়ে গেছে প্রায় । ওকে ছোট বাচ্চার ন্যায় কোলে নিয়ে যাচ্ছে রাফি ।
ওরা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দৃষ্টি অগোচর না হওয়া পর্যন্ত ওদের দিকে অবাক বিস্ময়কর লোচনে চেয়ে দেখলো সবাই । চোখের আড়াল হলে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো মেয়ে গুলো । শান্ত মুচকি হাসলো রাফিকে ওভাবে দেখে । শেষের দিকে হাসিটা আরো প্রশস্ত হলো ওর । রুহির দিকে ফিরে দেখে রুহি এখনো মুগ্ধ নয়নে সেদিকটায় চেয়েই আছে । শান্ত গলা ঝাড়লো । শুকনো কেশে বললো ধীর কন্ঠে…
” দেখো জান ,, তোমার ভাইয়া মিহিকে পেয়ে এই দেড় বছরেই অনেক কিছু করে ফেলেছে । মাত্র দেড় বছরে ,, আর আমি ? গত ঊনিশ টা বছরেও এখনো কিছুই করতে পারলাম না । ছিঃ ,, লজ্জা করে না তোমার , নিজেও কিছু করো না , আমাকেও কিছু করতে দাও না । কেমন গার্লফ্রেন্ড তুমি আমার ?
” আমি আপনার গার্লফ্রেন্ড ?
তীর্যক প্রশ্ন রুহির । শান্তর সাথে তাল মিলিয়ে ধীর কন্ঠে…
শান্ত উত্তর করলো…
” নাহ,, জানু তুমি আমার ? মামুর বেটি….
আম্মুর হবু বউমা…
আমার বাচ্চার হবু মাম্মা ! আমার নাতি নাতনির দাদিমা । আমার ছেলের বউয়ের শাশুড়ি মা । আমার দিলকি রাণী , আমার একমাত্র বউপাখি তুমি…
বুঝলা জান ??
রুহি ওর কথায় তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালো না । তপ্ত শ্বাস ফেলে মেয়ে গুলোর দিকে চাইলো আবার । ওরা বোধহয় আগ্রহী হয়ে চেয়ে আছে কিছু বলার অপেক্ষায় । রুহি তাকাতেই সেই মেয়েটা সন্দিহান হয়ে বলে উঠলো…
শান্তর দিকে তাকিয়ে শান্ত কে উদ্দেশ্য করে…
” আচ্ছা ভাইয়া ,, রুজান রাফি চৌধুরী কি সিঙ্গেল ?
” নাহ বোইন , রুজান রাফি চৌধুরী ম্যারেইড ,, সামনের বছর বাচ্চার বাপ হবে । বাচ্চার আকিকা অনুষ্ঠানে তোমাদের দাওয়াত দিবো , কেমন ? আসবে কিন্তু !!
মেয়ে গুলো চুপসে গেল । পুনরায় তাকালো একে অপরের দিকে । শান্তর কথা গুলো বিশ্বাস হয় নি । ওর মেকি স্বরে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলা কথা গুলো বিশ্বাস হওয়ার মতোও ছিল না । কিন্তু রুজান রাফি চৌধুরী কে নিয়ে, তাকে বুঝতে , মিহি সম্পর্কে বুঝতে তাদের সন্দেহ জাগলো না । হাঁফ ছাড়ল ওরা । শান্ত কেও চেনা । শান্ত ও সেলিব্রিটি থেকে কম কিছু নয় । শান্ত কে ধরলে খারাপ হয় না । রাফি গেছে তো কি , শান্ত তো আছে । রাফির পর শান্তর সাথে সেকেন্ড টাইম সেলফি তোলার প্লান ছিল ।
এটাই এখন সই । একটা মেয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে গদগদ হয়ে বলল….
” ভাইয়া ,, আপনার সাথে দুটো সেলফি তুলতে পারি ?
শান্ত একবার রুহির দিকে তাকলো । মেয়েটার দিকে কটমট করে চেয়ে আছে রুহি । শান্ত বললো ভ্যাঙ্গানো গলায়….
” নাহ বোইন , আমি এক নারীতে আসক্ত । তোমাদের সাথে ছবি তুললে আমার বউ আমারে ঘরে ঢুকতে দিবে না । আসলে বউ ছাড়া আমি আমার কারোর কাছে ঘেঁষি না । তোমরা থাকো , আমি আমার বউকে নিয়ে বাড়ি যাই । রাফির বাচ্চার আকিকা অনুষ্ঠানে আসলে আমার সাথেও ছবি তোলার একটা সুযোগ করে দেবো সেদিন, কেমন ? আজ আসি…
টা টা বাই বাই,, আর কোনো দিন যেন দেখা না পাই…
কথা শেষ করে শান্ত রুহি কে টেনে লিফটে উঠেছে । মেয়ে গুলো পুরো আহাম্মক । তারা ঠিক চেয়ে আছে বোকা বোকা নয়নে ।
সিঁড়ি দিয়ে মিহি কে নিয়ে নিচে নেমেছে রাফি । আশেপাশের সবাই তাদের কাজ থামিয়ে একে একে তাকাচ্ছে ওদের দিকে । রাফির খেয়াল নেই কোনো দিকে । সে নিজেই বেখেয়ালি হয়ে আছে । রাফি কে চিনতে কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথা নয় । মূক বনে চেয়ে আছে সকলে । এমনিতেও দৃশ্য টা উপভোগ্য । একটা সুদর্শন পুরুষ, একটা মেয়ে কে কোলে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আপন গতিতে,আপন ঠিকানায় । মেয়েটা গুটিয়ে আছে তার কোলে ।
মিহি পিটপিট করে এদিক ওদিক তাকালো । অনেকের মিলিত একাধিক নজর ওদের দিকে দেখে অপ্রস্তুত অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়লো ও । মিহি নিজের মুখখানা আড়াল করলো রাফির গলার কাছে মুখ লুকিয়ে । গলা জড়ালো আরো শক্ত করে । মিহির তপ্ত গরম শ্বাস রাফির গলায় পড়তেই আচমকা পা থেমে গেল ওর । মিহি গলায় মুখ গুজে ফিসফিস করলো….
” সবাই দেখছে কেমন করে ,, নামিয়ে দিন প্লিজ । আমি হাঁটতে পারবো….
আবেশে চোখ বুজে ছিল রাফি । চোখ দুখানা খুললো ও । এক মুহুর্তে খেই হারিয়ে ফেলেছিল যেন । ফের পা বাড়াতে বাড়াতে শীতল কন্ঠে বলল রাফি….
” আই ডোন্ট কেয়ার….
বাট আই কেয়ার ইউ… । কেয়ার করছি তো হচ্ছে না ? এতো যত্ন করে কোলে নিয়েছি, ভালো লাগছে না ? তোমাকে কোলে নিয়ে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগছে মাই ডিয়ার ব্লোসোম….
” বাইরে আঙ্কেল আছেন । আম্মু ও আছে । নামিয়ে দিন প্লিজ….ওনারা দেখে ফেলবেন …
” সো হোয়াট ?
আর আঙ্কেল কাকে বলছো ? আব্বু বলবে এখন থেকে ? আর যাই হোক , আফটার অল শশুর মশাই তিনি তোমার ।
” ধুর….
আলতো হাসলো রাফি । মিহি কে নিয়ে বাইরে বেরিয়েছে সে । হসপিটালের গেটের সামনে দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী, জুবায়ের চৌধুরী গাড়ির বাইরে । পেছনে হাত গুটিয়ে গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে জুবায়ের চৌধুরী কে কিছু বলছেন তিনি । সাবিনা বেগম গাড়িতে উঠে বসেছেন । রাফি আব্বুদের দেখেও ভাবমূর্তি পাল্টালো না । আর না হেজিটেড করলো । সে একই ভাবে সোজা এগিয়ে আসলো । পিছনে রুহি আর শান্ত ও আসছে । শান্তর হাত খামচে ধরে দাঁত কপাটি পিষে কিছু একটা বিড়বিড় করছে রুহি । হয়তো রাগ ঝাড়ছে কোন কিছু নিয়ে । কি নিয়ে আর হবে ? নিশ্চয়ই মেয়ে গুলো কে নিয়ে । শান্ত চুপচাপ ওর বিড়বিড়ানো শুনে যাচ্ছে । আব্বু দের দেখে শান্ত কে ছাড়লো রুহি । স্বাভাবিক হয়ে দূরত্ব বাড়ালো শান্তর থেকে । রুহির হাতের খামচি থেকে ছাড়া পেতেই দাঁড়িয়ে পড়লো শান্ত । ভেংচি কেটে মুখ বাঁকিয়ে এগিয়েছে রুহি । শান্ত নিজের হাতের দিকে তাকালো । কনুইয়ের নিচের দিকে পুরো চারটে নখের দাবা বসে গেছে । রুহি বেশ শক্ত করেই ধরেছিল । খামচে ধরা স্বভাব রুহির । এই স্বভাবের শিকার শুধুই শান্ত । শান্তর ফর্সা হাতে দাগ স্পষ্ট । লালচে হয়ে গেছে মুহুর্তেই । তবুও মুচকি হাসলো শান্ত । হাতের ক্ষতের কাছটায় নরম ঠোঁট ছুঁইয়ে এগোতে এগোতে বিড়বিড় করলো নিজের মাঝে…
” সবকিছু সুদে আসলে শোধ করবো মেরি জান ! ছোট থেকে আজ অবধি ,, এসব কিছুর মাশুল এক দিনেই দিতে হবে তোমায় । উঁহু, এক রাতেই । এখন আমি সহ্য করছি,পরে তোমাকে সহ্য করতে হবে । এক থেকে ঊনিশ বছরের ঋণ তিন কবুলের পর শোধ করবো আমি । শাহরিয়ার শান্ত ছাড়বে না তোমাকে জান….
রাফি আর মিহি কে ওভাবে দেখে খানিক স্তম্ভের ন্যায় তাকিয়ে রইলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । চোখ কপালে তার । হেনা বেগমের কথা মিথ্যে নয় , আসলেই তার ছেলে পাল্টেছে ? বোনের প্রতি ভালোবাসার জাগরণ ঘটেছে । চোখ নামিয়ে নিজের মাঝে খানিক শব্দ করে হাসলেন তিনি । অতঃপর চোখ তুলে গলা খাঁকারি দিলেন ।
সাবিনা বেগমের পাশে মিহি কে বসালো রাফি । মিহি চোখ নামিয়ে নিচের অধর কামড়ে নুইয়ে আছে । রুহি পিছন ঘুরে পাশে গিয়ে বসলো । রাফি আব্বুর দিকে তাকাতেই তিনি বললেন….
এক দেখায় পর্ব ৪৮
” তোমরা এসো ,, আমরা ঐ গাড়িতে যাচ্ছি ।
” আপনি এই গাড়িতে যান আব্বু । আমি, শান্ত আর ছোট আব্বু অন্য গাড়িতে চলে যাবো ।
তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো রাফি । রাশেদ রায়হান চৌধুরী পুরো কথা শেষ করতে পারেন নি ।
