এক দেখায় পর্ব ৫৯
সুরভী আক্তার
হেসে উঠলো উপস্থিত সকলে । ছলছল চোখে ফিক করে হাসলো রুহিও । মিহি ঘাড় কাত করে নাক কুঁচকে ভেংচি কাটলো রাফি কে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী এসে দাঁড়িয়েছেন । তাকেও ধরে বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে মেয়ে কে হলুদ লাগানোর জন্য । মেয়েটার সামনে আসার শক্তি কুলোচ্ছে না তার ।
মিহি রাফির গালে একেবারে লেপ্টে অনেকটা পরিমাণ হলুদ লাগিয়ে দিয়েছে । দাঁত চেপে হাসি সংবরন করলো রাফি । সবাইকে দেখিয়ে নিজের মাঝে রাগান্বিত ভাব টানার চেষ্টা করলো । খপ করে হলুদের বাটি থেকে মুঠো ভরে হলুদের মিশ্রণ তুলে নিলো । ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়িয়ে তাড়া লাগিয়ে বলে উঠলো….
“ দাঁড়াও , তোমাকে তো আমি….
দেখাচ্ছি মজা ….
আকস্মিক রাফির হাতে হলুদ আর তাড়া খেয়ে ভড়কালো মিহি । তাড়া থেকে বাঁচতে ছুট লাগালো । ছুটে গিয়ে লুকোলো হেনা বেগমের পেছনে…
ভড়কানো গলায় বলে উঠলো…
“ মামনি, বাঁচাও ।
রাফি হেনা বেগমের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে মিহি কে ধরতে গেলে অন্য পথে ছুট লাগালো মিহি । চিৎকার করে উঠলো….
“ মামনি , তোমার ছেলে কে আটকাও…..
রাফিও ছুটলো ওর পিছু পিছু । মিহি লুকালো লতা বেগমের পেছনে , কাজ হলো না ।
সে যেখানে যাচ্ছে রাফিও পিছু পিছু ধাওয়া দিচ্ছে । পুরো গার্ডেন অতগুলো মানুষের ভিড়ে বাচ্চাদের ন্যায় ছোটাছুটি করছে পিছন পিছন । সবাই হা বনে হতবাক হয়ে চেয়ে আছে দুজনের পানে । চেয়ে চেয়ে দেখছে ওদুটোর ছোটা ছুটি । হেনা বেগম ডাকলেন রাফি কে ।
পিছু নিতে গেলে বাঁধা দিলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী….
“ তুমি কোথায় যাচ্ছো ?
“ আরে দেখুন না , মেয়েটার পিছু পিছু কেমন বাচ্চাদের মতো ছুটছে এই বয়সে ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী চাপা স্বরে বললেন…
“ এই বয়সে ও বাচ্চাদের মতো ছুটছে বলে তোমাকেও এই বয়সে ছুটতে হবে ওদের পিছু পিছু ? ওদের কে ওদের মতো ছেড়ে দাও । তুমি রুহির কাছে যাও…
হেনা বেগম থামলেন । কথা বাড়ালেন না আর ।
মিহি ছুটতে ছুটতে হাঁফিয়ে উঠলো । শাড়ি পড়ে কি আর এভাবে ছোটা যায় নাকি । এদিকে রাফি পিছু ছাড়ার নাম নেই । মিহি ছুটতে গিয়ে সামনে ইভান কে পেলো । ইভানের পেছনে নিজেকে আড়াল করে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো….
“ ভাইয়া , আপনার বন্ধু কে আটকান । আমার দম বেরিয়ে যাচ্ছে । আমি শুধু মজা করে ওনার গালে হলুদ লাগিয়েছি একটু । আমাকে লাগাতে বারন করুন প্লিজ , আমার সাজগোজ নষ্ট হয়ে যাবে । এখনো একটাও ছবি তুলি নি আমি । প্লিজ ওনাকে আটকান , বাঁচান আমায়য়য়য়…..
ইভান রাফি কে কিছু বলার আগেই রাফি থেমে বললো…
“ আমাদের মাঝে আসলে তোর হালুয়া একদম টাইট করে দেবো, বলে রাখলাম । আগের বার জোলাপ খাইয়ে ৪১ বার ওয়াশ রুমে পাঠিয়েছিলাম মনে নেই ? এবার আমাদের মাঝে আসলে আর ওয়াশ রুম থেকেই বেরোতে পারবি না । হটট সামনে থেকে….
ইভান বিরাট চমকায় । চোখ কপালে তুলে টাস্কি খেয়ে বলে…
“ হোয়ট ? আগের বার তুই জোলাপ খাইয়েছিলি আমায় ?
“ হুম ! এবার সর সামনে থেকে….
মিহি ওদের কথা বুঝলো না । রাফি তেড়ে আসতেই এবার হন্তদন্ত হয়ে ছুট লাগালো বাড়ির ভেতরে । রাফি পিছু পিছু । ইভান আহাম্মক বনে তাকিয়ে রইল ওদের ছোটার পানে । কি বললো এই রাফি ? ও জোলাপ খাইয়েছিলো ইভান কে ? কিন্তু কেনো ? কি ভুল ছিলো ওর ? জানতে হচ্ছে তো ? রাফির থেকে জানতে হবে , হিসেব তুলতে হবে এর ।
নাক কুঁচকায় ইভান । নাক টেনে পিছু ফিরতেই মুখোমুখি হয় একটা মেয়ের । মেয়েটা ওকে দেখা মাত্রই ফ্যালফ্যালে হাসে ।
“ হাই ! ভালো আছেন ? আমি মিরা ! আগের বার মেহজাবিন আপুর বিয়েতে এসেছিলাম ! দেখেছেন আমায়, মনে আছে ?
ইভান কপাল কুঁচকালো । আগা গোড়া পরখ করলো মিরা কে । খানিক চেনা ঠেকলো । গা ছাড়া ভাবে জবাব দিলো ইভান….
“ মনে আছে । স্মৃতি শক্তি অতো দূর্বল নয় আমার ! আর আমি ভালো আছি !
“ ওও , আপনার নাম ইভান , তাই না ?
“ হুম । আর আমি তোমার থেকে বড় , সো ইভান না বলে ইভান ভাইয়া বলে ডাকবে , ওকে ?
থতমত খায় মিরা । আর কিছু বলার আগেই ইভান ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় গুনগুন করতে করতে ।
এদিকে মিহি বাড়িতে ঢুকেছে । গোটা ড্রইং রুমে চক্কর কেটেছে দুজনে । পিছু ছাড়ছেই না রাফি । একটু জোরে দৌড়ালেই মিহি কে ধরা সম্ভব । কিন্তু সে এতো সহজে ধরবে না । আরো ছোটাবে মিহি কে । হাঁপিয়ে গেলে মিহি নিজেই ধরা দেবে ।
মিহি আর পারছে না । ও কোনো রকমে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো । রেলিং ধরে ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠলো । শাড়ি ইতিমধ্যে এলোমেলো । সিঁড়ি বেয়ে উঠে ঘরে ঢুকলো ও । ধপ করে বসলো খাটের উপর । হাঁপাতে হাঁপাতে ঠাস করে শুয়ে পড়লো । রাফি নেই আর । পিছু ছেড়েছে । মিহি উঠে হাত বাড়িয়ে গ্লাস হাতে তুললো । সম্পুর্ন পানি টুকু খেয়ে নিলো ঢকঢক করে । বুক ধড়ফড় করছে । হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে । এতো দৌড়ালো ও ? এই লোক ওকে এতোটা ছুটিয়ে তবেই ছাড়লো ?
মিহি জোরে জোরে শ্বাস টানলো । দম নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হেলে শাড়ির কুচি ঠিক করলো । দরজা তো খোলাই আছে । রাফি পিছে আসে নি , তার মানে পিছু ছেড়েছে ।
মিহি দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ল । দরজার দিকে এগোতেই এক ঝটকায় ঘরে ঢুকলো রাফি । চমকালো মিহি । তৎক্ষণাৎ কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিলো সামনে । নিজেকে বাঁচাতে বললো….
“ এই , আপনি এখনো পিছু ছাড়েন নি ?
“ ছাড়বোও না ! পিছু ছাড়ার জন্য তো পিছু নেইনি তোমার । ছুটিয়ে এখানে নিয়ে আসলাম কি পিছু ছাড়ার জন্য ?
মিহি মুখ কাতর করে । রাফির হাতের মুঠোয় হলুদ । মিহি পেছাতে পেছাতে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে….
“ দেখুন , প্লিজ এসব লাগাবেন না মুখে ! আমি অনেক কষ্টে সেজেছি । কাল ও একটাও ছবি তুলতে পারি নি । আজও সাজগোজ নষ্ট হয়ে গেলে ছবি ভালো আসবে না । প্লিজ লাগাবেন না । আপনি না ভালো মানুষ… ভালো মানুষের এসব করতে নেই । গুড বয় , ওসব পঁচা জিনিস হাতে রাখতে নেই । ফেলে দিন…
রাফি এক পা এক পা করে বাড়াতে বাড়াতে বলে অদ্ভুত স্বরে….
“ কে বলে আমি ভালো মানুষ ? আমি তো ভালো নই ! কাল কে যেনো আমাকে খারাপ বললো ?
মিহি ঠোঁট উল্টায় ।
“ আপনি খুব ভালো । খারাপ বলবো না আর …..
তবুও প্লিজ….
পেছাতে পেছাতে মিহির পিঠ ঠেকলো দেয়ালে । আরো বেশি ভড়কে গেলো মেয়েটা । ধক্ করে চাইলো রাফির দিকে । ফিচেল হাসলো রাফি । সে তো একই ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে । মিহির সম্মুখে দাঁড়ালো রাফি । থামলো একেবারে দূরত্ব ঘুচে অনেক টা কাছে । কুঁচকানো কাতর চোখে চোখ রেখে শুধালো শীতল কন্ঠে….
“ একটু লাগাবো শুধু ! লাগাই ?
“ না , প্লিজ ! বিয়ের আগে মেয়েদের হলুদ মাখতে নেই ।
“ কে বলেছে ?
“ আমি শুনেছি ! সরুন প্লিজ…
“ উঁহু , সরবো না তো । আমার কাজ করে তারপর সরবো । তুমি কি ভাবলে ? তুমি আমাকে এখানে তোমার পিছু ছুটিয়ে নিয়ে এসেছো ? নো , ম্যাডাম ! আমি আপনাকে এখানে এনেছি ! আপনার উপর প্রতিশোধ নিতে !
“ ক…কিসের প্রতিশোধ ?
“ হলুদ লাগালেন যে !
“ আর লাগাবো না !
“ লাগিয়েই ফেলেছেন । এবার আমার পালা….
মিহি আঁতকে সরতে চাইলে ডানপাশে দেয়ালে নিজের হাত ঠেসে দেয় রাফি । অন্য হাতে হলুদ বাটা । সেই হাতটা এগিয়ে দেয় মিহির দিকে । মিহি করুন চোখে চেয়ে শেষ বার আকুতি করে…
“ প্লিজ না…
রাফি থামে । ঠোঁটের কোণা কামড়ে ধীরে বলে…
“ একটা শর্তে ।
“ কি, শর্ত ?
“ চুমু খেতে হবে আমায় ।
রাফির সোজাসাপ্টা কথায় চকিতে বৃহৎ নয়নে চায় মিহি । ধক্ করে ওঠে অন্তঃস্থল । শুষ্ক ঢোক গেলে সে । রাফির চোখে মাদকতা । মিহি তাকিয়ে থাকতে পারলো না সেই চোখের দিকে । দ্রুত চোখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল….
“ সরুন !
“ সরবো না । তিনটে অপশন আছে । হয় হলুদ লাগাবো , নয়তো তুমি চুমু খাবে আর নয়তো আমি ।
মিহি মিইয়ে যায় । সিটিয়ে দাঁড়ায় দেয়ালের সাথে । কোন অবস্থায় পড়লো সে ! এই লোক টা দিনকে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে !
মিহি তাকাতে পারে না । চোখ নামিয়েই বলে ।
“ এভাবে না প্লিজ । আমরা এখনো বিবাহিত নই ।
“ হুঁ…
“ তো সরুন !
“ সরবো না । ডিসিশন তোমার উপর । আচ্ছা একটা অপশন কমিয়ে দিচ্ছি তোমার সুবিধার্থে । দুটো অপশন দেই ? আমাকে সরাতে হলে দু’টোর মধ্যে একটাতে রাজি হতেই হবে । বলি ?
হয় তুমি আমাকে চুমু খাবে , নয়তো আমি তোমাকে চুমু খাবো । এবার ভেবে দেখো….
মিহি তড়িতে চোখ গোল গোল করে তাকায় । কি বলে এই লোক ? মিহির তাকানো দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসে রাফি । কাঁধ উঁচিয়ে আবার বলে….
“ ডিসিশন তোমার ,তবে সময় আমি দেবো । তিন পর্যন্ত কাউন্ট করবো । এর মধ্যেই প্রথম অপশন অনুযায়ী তোমার কাজ তোমাকে করতে হবে । যদি না করো , তাহলে দ্বিতীয় অপশন টাই রয়ে যাবে । আর ঐটা আমার কাজ । আমার কাজে আমি সময় নষ্ট করবো না কিন্তু ।
মিহি খানিক রাগে । কন্ঠে চড়াও করে বলে….
“ কি শুরু করলেন ?
“ শুরু করি নি , করবো । ওয়ান….
ছলকে ওঠে মিহি । চিবুক গলায় ঠেকিয়ে নেয় । রাফি বাঁকা হাসে ঠোঁট পিষে ।
“ টু…..
“ প্লিজ !
“ উঁহু, কিচ্ছু শুনবো না । আচ্ছা সহজ করে দিলাম , ঠোঁটে নয় গালে চুমু খেতে হবে । এতেই চলবে , যদি থ্রি বলার আগে করতে পারো তাহলে তোমার জন্য ভালো । নয়তো থ্রি বলার পর আর বাহানা দেওয়ার সময় পাবে না…
রাফি পাশ ফিরে গাল বাড়িয়ে দিলো । ঠোঁটের কোণে এখনো বক্র হাসি ঝুলছে । সরছেই না তা । মনে মনে বিশাল লাড্ডু ফুটছে ওর । মিহি বিব্রত হলো ভীষণ । আবার জড়তায় গুটিয়েও গেলো । বুক ধক ধক করছে । শ্বাস পড়ছে ঘন ঘন । ওষ্ঠ শুকিয়ে আসছে । মিহি জিভে ওষ্ঠ জোড়া ভিজিয়ে নিলো । ঢোক গিললো শুল্ক । রাফি মুখে তিন উচ্চারণ করতে যাবে , এর আগেই এক ঝটকায় বিদ্যুৎ বেগে কিছু একটা ঘটলো । ঘটনা ঘটিয়ে সাথে সাথে দম খিচে দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেললো মিহি । রাফি তড়িতে তাকালো । অবাক স্বরে আওড়ালো….
“ এটা কি হলো ? এতো তাড়াতাড়ি তো ৮জি নেটওয়ার্ক ও চলবে না ।
মিহি আড়ালে মৃদু হাসে । হাত সরিয়ে নেয় মুখ থেকে । ওষ্ঠ জোড়া হাত দিয়ে চেপে ধরে মৃদু স্বরে বলে….
“ এবার সরুন !
“ উঁহু , কেউ আমাকে কিছু দিলে আমি তাকে সেটা হাজার গুণ করে ফিরিয়ে দেই । আপনি প্রথম বার এমন কিছু দিলেন । হাজার গুণ না হোক , আপাতত এক গুন করে ফিরিয়ে দেই ? এটা আমার কর্তব্য !
ঝটকা মেরে তাকায় মিহি । পরমুহূর্তে মুখ কুঁচকে বিকৃত করে ফেলে । হাতে হলুদের মিশ্রণ লেগে ছিলো । ঠোঁট চেপে ধরায় মুখে পৌঁছেছে তা । বিদঘুটে স্বাদে মুখ কুঁচকালো মিহি । থু করে থুথু ফেললো । রাফির কথায় প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই ঘটলো এমনটা । রাফি কপাল গুটিয়ে শুধালো চকিতে….
“ কি হলো ?
মুখ কুঁচকেই তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রকাশ করলো মিহি….
“ কি বাজে স্বাদ !
“ কিসের ?
“ হলুদের !
“ দেখি কেমন স্বাদ !
মিহি তড়িতে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলো নির্বোধের ন্যায় ।
“ দেখুন, দেখুন…
“ এভাবে নয়….
ছোট্ট কথা শেষ করেই আকস্মিক ঝুঁকে মিহির ওষ্ঠ যুগল আঁকড়ে ধরলো রাফি । অধিকার ফলালো ওষ্ঠাধরে । মিহির অক্ষিযুগল আকস্মিক আক্রমণে কোটর ফেটে বেরিয়ে আসার দশা । ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো নারী দেহ । রাফি চোখ বুজে নিয়েছে । সে ব্যাস্ত নারি ওষ্ঠাধরের নির্যাস টুকু শুষে নিতে ।
হাতের হলুদ ফেলে মিহির গলার কাছে হাত চেপে ধরলো রাফি । হাতে লেগে থাকা হলুদ লেপ্টে গেলো গলায় । অন্য হাতে কোমর চেপে ধরে মিহি কে টেনে নিলো নিজের কাছে । মিহি ওর দুহাত রাফির বুকে রেখে দূরে ঠেলতে চাইলো রাফি কে । তবে শক্ত পুরুষালী শক্তির কাছে হার মানলো ওর ক্ষিণ শক্তি টুকু । ওষ্ঠাধরে কৃতিত্ব বাড়তেই সিটিয়ে গিয়ে চোখ বুজে নিলো মিহি । আঁকড়ে খামচে ধরলো রাফির পাঞ্জাবির কলারের অংশ ।
মত্ত রাফি সময় নিলো অনেক টা । দীর্ঘ সময় বাদ নিজেকে সরিয়ে আনলো । চোখ মেলে মিহির পানে তাকালো । চোখ বন্ধ মেয়েটার । রাফি মুচকি হাসলো । ওষ্ঠাধরে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল চেপে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করলো…
“ বিস্বাদ নয় , দারুন স্বাদ । ইটস টেস্ট সুইট…
আই হেইট সুইট , বাট সুইট যদি এমন হয় , তাহলে আই লাভ ইট । মাই ফেভারিট সুইট….
এনি ওয়ে , সরি ফর অল । এটাই লাস্ট , তোমার অনুমতি ব্যতীত আর কিচ্ছু করবো না । সরিই ব্লোসোম….
রাত ঘনীভূত হচ্ছে । বারোটা পেরিয়ে একটার কোঠায় ঘড়ির কাঁটা । হলুদের আয়োজন শেষ । ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে এখন যে যার ঘরে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী বারান্দায় বসে সেই কখন থেকে । চোখে ঘুম নেই । রকিং চেয়ারে বসে মাথা এলিয়ে দোল খাচ্ছেন তিনি । হেনা বেগম ঘরে ঢুকে তাকে পাননি । বারান্দায় দেখা মিলেছে । পিছন থেকে খানিক চুপটি মেরে দাঁড়িয়ে থেকে গলা খাঁকারি দিলেন হেনা বেগম । বললেন….
“ রাত অনেক হয়েছে , এখনো বসে থাকবেন ? ঘুমাবেন না ?
রাশেদ রায়হান চৌধুরী নিরুত্তর । হেনা বেগম উত্তর না পেয়ে এগিয়ে গেলেন । চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন আবার……
“ কি ভাবছেন এতো ? এতো ভেবে কি হবে ! মেয়েকে কি বিয়ে দিতে হবে না ?
দীর্ঘ শ্বাস পড়লো রাশেদ রায়হান চৌধুরীর ভারী বুক চিরে । হাসলেন তিনি । বললেন…
“ ভাবছি না তো । বিয়ে দিতে তো হতোই , শান্তর সাথে দিতে পারছি এটা ভেবেই ভীষণ তৃপ্তি লাগছে !
জানো , কতটা ভয়ে ছিলাম রুহি কে নিয়ে । মেহজাবিনের পর রুহি । মেয়েটা কে দূরে পাঠাতে হবে ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিতো । আগেই শান্ত কে নিয়ে ভেবেছিলাম । জানতাম না ওরা একে অপরকে পছন্দ করে । আফসানা যেদিন বিয়ের সম্বন্ধ তুলে ধরলো , সেদিন ওর মুখের উপর কিছু বলতে পারি নি । ভেবেছি সম্পর্কটা হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে কথা পাড়লে । ও তো লিনা কে পছন্দ করতো । তাই নিজে থেকে সাহস জুগিয়ে রুহির কথা বলতে পারি নি ।
কিন্তু দেখো , আমার বুক হালকা করে আমার মেয়েটা ও বাড়িতেই যাচ্ছে । আর যাই হোক , দূরে অন্য কোথাও তো আর পাঠাতে হচ্ছে না ওকে । এই নিয়ে অনেক খুশি আমি ।
মৃদু হাসলেন হেনা বেগম । বললেন শান্ত হয়ে…
“ এখন মেয়েকে নিয়ে চিন্তা বাদ দিন । আপনার মতো আমার ও চিন্তা কমেছে ।
এখন মিহির পালা , মেয়েটা কে নিয়ে ভাবতে হবে এবার । সারাজীবন কাছে পাই নি ওকে । এভাবে বিয়ে দিয়ে অন্যের বাড়িতে দূরে সরিয়ে রাখতে দ্বিধা জাগছে । ওকে নিয়ে এবার একটু ভাবুন । ওরও তো বিয়ে দিতে হবে এবার !!
শীতল হাসলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । আবারো শ্বাস ফেললেন দীর্ঘ ।
আজ বিয়ে । বাড়িতে এই কদিন ধরে একেক দিন একেক আমেজ । একেক অনুভুতি হচ্ছে একেক দিন ।
আজও দেরিতে ঘুম থেকে উঠেছে রুহি । ওকে আজ কেউ ডাকে নি । উঠতে উঠতে নয়টা বাজিয়েছে সে ।
বর পক্ষ আসবে সেই বিকেলের পর । এখন দুপুর । সূর্যি মাথা মাথার ঠিক উপরে । রোদের তীব্রতা নেই আজ । সূর্যের সোনালী আলোর নরম পরত পরেছে ধরনীতে । শিরশির করে মিহি বাতাস বইছে । নিচে চলছে ভরপুর আয়োজন । পার্লার থেকে লোক আসবে , সাজানো হবে রুহিকে । গোসল সেরে একলা নিরিবিলিতে সবাইকে পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে ছাদে উঠেছে রুহি । চুল থেকে টুপটাপ পানি পড়ছে এখনো । রুহির খেয়াল নেই কোনো দিকে । ধীর পায়ে ছাদে উঠে আলগোছে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো ও । গার্ডেনে মানুষের আনাগোনা প্রচুর । শতাধিক মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছে । উপর থেকে নরম দৃষ্টিতে নিচে তাকালো রুহি । একেক বার একেকটা চেনা মুখ চোখে পড়ছে । ব্যাস্ত সবাই , ছোটাছুটি করছে এদিক ওদিক । রুহির মুখ মলিন । ও নীরবে অনেকটা সময় তাকিয়ে রইল নিচের দিকে । মিহির শীতল ডাকে ধ্যান ভাঙল….
“ পাখি !
চকিতে ফিরে তাকালো রুহি । মিহি কে দেখে মলিন মুখে হাসার চেষ্টা করলো । মিহি এগিয়ে গিয়ে পাশে দাঁড়ালো ওর । রুহির দৃষ্টি অনুসরণ করে নিচে তাকালো । অতঃপর মুচকি হেসে রুহির দিকে তাকিয়ে বলল….
“ পার্লার থেকে মেকআপ আর্টিস্ট এসেছেন । অপেক্ষা করছে , ডাকছে তোকে ।
রুহি প্রতিক্রিয়া দেখালো না । ধীরে শুধালো….
“ আমি আজ চলে গেলে আমাকে মিস করবি পাখি ?
ধক্ করে ওঠে মিহি । ঠোঁটে টেনে আনা মুচকি হাসি টুকু বিলিন হয় নিমিষেই । উত্তর করতে গলা কাঁপে…..
“ খুব বেশি মিস করবো তোকে ।
রুহি ছলকে তাকায় । চোখ ভরে উঠেছে ইতিমধ্যে । মুখ কাঁপছে । তবুও বলে ও….
“ ভেবেছিলাম তোকে ভাইয়ার সাথে বিয়ে দিয়ে তার পর আমি এ বাড়ি থেকে বেরোবো । কিন্তু দেখ , তা আর হলো না । আমিই আগে বেরিয়ে যাচ্ছি । তোকে ভাবি জান বানানোর আগে , আমিই তোর ভাবি জান হয়ে যাচ্ছি ।
মিহি নিজেকে সামলে বললো….
“ তাই বলে এভাবে মুখ গোমড়া করে থাকবি ? তুই না আমার ভাবি জান হচ্ছিস ! তোর ভালোবাসার মানুষটাকে পেয়ে যাচ্ছিস এতো সহজে । এভাবে মুখ ভার করে থাকলে লোকে কি ভাববে ? ভাববে তোকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে । তুই কতো লাকি ভাব, বাড়ি ছেড়ে দূরে যাচ্ছিস না বেশি । যখন খুশি তখন এ বাড়িতে আসতে পারবি । সবসময় থাকলেও কেউ বাঁধা দেবে না তোকে । তাহলে এমন মনমরা হয়ে থাকার মানে কি ?
“ আমার কেনো জানি খুব কষ্ট লাগছে রে । তোদের সাথে আর সবসময় থাকতে পারবো না আমি ।
তোর সাথেও থাকতে পারবো না । খুব মিস করবো তোদের ।
“ আরে ধুর পাগলি , ফুপি কতদিন ও বাড়িতে থাকে বল ? শান্ত ভাইয়াই বা কতক্ষন থাকে ও বাড়িতে ? সবাই তো এবাড়িতেই থাকে । তাহলে তোকে কি ঐ বাড়িতে রেখে এসে সবাই এ বাড়িতে থাকবে নাকি ?
“ তবুও । আমি তো আজ থেকে এ বাড়ির মেয়ে কম অতিথি বেশি হয়ে যাবো । সবাই ভুলে যাবে আমায়…
বলতে বলতে নাক টানলো রুহি । মিহি আঁতকে উঠলো । তড়িতে জড়িয়ে ধরলো রুহিকে ।
“ চুপ করবি ? কে ভুলে যাবে তোকে…
বেশি বেশি ভাবছিস তুই !
রুহির কান্নার বেগ বাড়লো । ফুঁপিয়ে উঠলো ও । মিহি আদুরে হয়ে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । চোখ ভরে উঠছে ওর নিজেরও । রাফির কন্ঠে দু’জনেই স্বাভাবিক হলো ।
রাফি ডাকলো বোনকে…
“ Sissy ?
পিছু ফিরে রাফি কে দেখা মাত্রই রুহি আরো বেশি ফিকড়ে উঠলো । করুন,আহত চোখে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে কান্না সংবরন করতে বৃথা চেষ্টা চালালো । মিহি ছাড়লো রুহিকে । রাফি কে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলো অবিলম্বে । রাফি বোনের দিকেই পূর্ণ মনযোগ দিলো । এগিয়ে গিয়ে বোনের চোখের পানি অতি আদরের সহিত মুছিয়ে দিয়ে বললো হীম শীতল কন্ঠে…
“ কি হয়েছে , কাঁদছিস কেনো ?
ফুঁপিয়ে চিবুক গলায় ঠেকিয়ে দুদিকে মাথা ঝাঁকায় রুহি । রাফি বলে….
“ তোকে কি কাঁদার জন্য শান্তর সাথে বিয়ে দিচ্ছি ?
রুহি ফোপায় শুধু । রাফি আবার বললো বোনকে জড়িয়ে নিতে নিতে…
“ লক্ষি বোন আমার , তোকে বলেছি না কখনো কাঁদবি না ! এখন কাঁদছিস কেনো ? আর ,কে বলেছে বলেছে আমরা তোকে ভুলে যাবো ? আমার বোন কি আমার বাড়িতে কখনো অতিথি হতে পারে ? মেহজাবিন কে দেখছিস না , ওকে কি কেউ ভুলে গেছে ?
আর আমার বোন , আমি কি ভুলবো নাকি ! আমি নিজেকে ভুলে যাবো , তবুও আমার বোনকে ভুলবো না । মাই লিটিল সিস্সির বিয়ে হচ্ছে আজ । এমন গোমড়া মুখে মানাচ্ছে না ওকে ।
রুহি খানিক হাসে ছলছলে চোখে ।
রাফি হেসে বলল….
“ নিচে যা এখন….
রুহি ঘাড় কাত করে । মিহি রাফি কে উপেক্ষা করে মুখ বাঁকিয়ে রগরগে গলায় ফোঁস করে বলে ওঠে…
“ নিচে চল পাখি !
রাফি এবার তাকালো মিহির দিকে । মুখে পরিবর্তন আনলো ও । এই মেয়েটা কাল থেকে চটে আছে । কালকের ওটুকু ঘটনার পর এক ধাক্কায় রাফি কে সরিয়ে দিয়েছিলো নিজের থেকে । আর তাকায় নি একবারও । আবারো এড়িয়ে এড়িয়ে চলছে রাফি কে । সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলেও রাফির দিকে তাকায় নি । রাফি কে দেখা মাত্রই মুখ ভার করছে বারংবার । ভুলক্রমে চোখাচোখি হলে ভেংচি কেটে চোখ সরাচ্ছে ।
ফুঁসছে , এটা দেখাচ্ছে উপর উপর । রুহি পা বাড়াতে গেলে রাফি গলা খাঁকারি দিয়ে বললো..
“ তোর ভাবি জানের কি হয়েছে বলতো ? আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে কেনো ?
রুহি থমকে দাঁড়ালো । মিহি ও থেমে কটমটিয়ে তাকালো রাফির দিকে । রাফি ভ্রু নাচালো ঠোঁট কামড়ে । মিহি রুহির হাত চেপে ধরে বাজখাঁই গলায় বলে উঠলো….
“ চলতো এখান থেকে । আর আমি তোর কোনো ভাবি জান টাবি জান কিচ্ছু নই , বুঝলি ? আমি তোর পাখি । তোর এই অসভ্য ভাইকে বিয়ে করবো না আমি । তোর ভাবি জান হওয়া তো দূরের কথা ।
রাফি হেসে ফেলে । রুহি অবুঝের ন্যায় দুজনের দিকে তাকাচ্ছে একে একে । এদের দুটোর আবার কি হলো কে জানে !
রুহি ঘাড় উঁচিয়ে শুধালো…
“ কি হয়েছে পাখি ?
“ হ্যাঁ, হ্যাঁ , বলো ,বলো , কি হয়েছে ? আমাকে অসভ্য বললে কেনো ? অসভ্য হওয়ার মতো কি এমন করেছি আমি ? রুহি জিজ্ঞেস করতো ওকে , তোর ভাইয়াকে এভাবে রিজেক্ট করছে কেনো ও ?
মিহি রি রি করে জ্বলে ওঠে । রাগের মাত্রা বাড়ে । ওর রাগ টুকুতে ঘি ঢেলে ঠোঁট চেপে হাসে রাফি ।
রুহির হাত হেঁচকা টান দিয়ে পা বাড়াতে বাড়াতে একই স্বরে বলে উঠলো মিহি….
“ তোর ভাইয়াকে তো জীবনেও বিয়ে করবো না আমি । অসভ্য, বেহায়া লোক , কথাও বলবো না আমি ওনার সাথে…
বলতে বলতে বড় বড় ধাপ ফেলে নিচের দিকে পা বাড়ালো ওরা । সিঁড়ির মাঝপথে দেখা ইভানের সাথে ।
ইভান ওদের পাশ কাটিয়ে উপরে উঠে আসলো । নাকের পাটা ফুলিয়ে ধারালো দৃষ্টিতে তাকালো রাফির দিকে । যেন চোখ দিয়েই কেটে ফেলবে । মিহি চলে যেতেই হাসি চাপলো রাফি । ইভান কে দেখে বুক টান টান করলো । ইভান ফোঁস করে এগিয়ে গেলো । শুধালো কঠিন স্বরে….
“ শালা , আগের বার আমার জুসে তুই জোলাপ মিশিয়েছিলি ?
রাফির গা ছাড়া উত্তর….
“ হুম !
তিরিক্ষি মেজাজ আরো বেশি বিগড়ে গেলো ইভানের । কটমটিয়ে প্রশ্ন করলো….
“ ক্যান ?
রাফি একটু এগিয়ে আসে । ইভানের কাঁধ জড়িয়ে কাঁধে চাপড় মেরে মেরে বলে….
“ তোর এই চাঙ্গা শরীর টা একটু ঘেঁটে দেওয়ার জন্য । জাস্ট জোলাপ মিশিয়েছিলাম , আর বেশি কিছু না ।
এই শরীর টা তো দেখিয়েছিলি আমার ব্লোসোম কে ! আমাকে ঠিক ঠাক ভাবে দেখার আগেই তোকে দেখে ফেলেছে । তাই হিংসে হয়েছিল আমার । তোর টানটান ফিট শরীর টা পছন্দ হয় নি । তাই আর কি….
“ ওরে শালা , তাই তুই আমাকে জোলাপ খাওয়াবি ? ৪১ বার হাগু করার পর আমার কি অবস্থা হয়েছিল জানিস ?
রাফি পেট চেপে হেসে উঠলো হো হো করে । বললো হাসতে হাসতে…
“ সেটা দেখার জন্যই তো জোলাপ খাইয়ে ছিলাম !
“ তবে রে শালা….
“ উঁহু উঁহু , শালা নয় ! আমার আর বোন নেই তোর সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য ! জেনি ছোট এখনো । তোর এতদিনে বিয়ে হলে ওর মতো একটা বাচ্চা থাকতো । নিজের বাচ্চার মতো আমার ছোট্ট বোনটার দিকে নজর দিস না …
ইভান তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো । কাল থেকে রাফি কে বাগে পায় নি । আজ পেয়েছে । রাফি ওকে ছেড়ে দিতেই ইভান ওকে আচ্ছা মতো চেপে ধরলো । রাফির পেট চেপে ধরতেই কুকিয়ে উঠলো রাফি । বাচ্চাদের টেকনিক খাটিয়ে রাফির পেটে সুরসুরি দিতে লাগলো ইভান । অন্য হাত দিয়ে আলতো আঘাতে কয়েকটা কিল বসালো বাহুতে । দুষ্টু মিষ্টি মারামারি দুটোর ।
রাফি কে কাত করে এক ছুটে নিচে নামলো ইভান ।
ছাদ থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে গেলে সিঁড়ির কাছে আসার আগেই অসাবধানতাবশত করিডোরে ধাক্কা খেলো একটা নরম নারী দেহের সাথে । আকস্মিক ধাক্কায় নারী দেহ খানা ছিটকে দূরে সরে মেঝেতে পড়লো ঠাস করে । সাথে সাথে চিকন মেয়েলি আর্তনাদ । ইভান নিজেকে সামলে নিয়েছে পড়া থেকে । সামনে দৃষ্টি পাত করতেই ছলকে উঠলো ও । লিনা চোখ মুখ কুঁচকে পড়ে আছে মেঝেতে । ব্যাথা তুর মুখো ভঙ্গিমা ওর । কোমর চেপে ধরে মৃদু স্বরে কুকিয়ে উঠলো লিনা ।
ইভান মুহুর্তেই জিভে কামড় বসালো । ছটফটিয়ে লিনার সামনে বসলো । ব্যস্ত হয়ে পড়লো….
“ এই মিস লিনা , এভাবে মেঝেতে বসে আছেন কেনো ? পড়লেন কি করে ?
ওর ভুলভাল বকায় তড়তড়ে মেজাজে ক্ষুব্ধ দৃষ্টি মেললো লিনা । ব্যাথা ভুলে ফোঁস করে উঠলো….
“ লুডু খেলার জন্য এভাবে মেঝেতে বসে আছি , খেলবেন ?
তাল মেলালো ইভান…..
“ আচ্ছা ? লুডু খেলবেন ? তা এখানে করিডোরে কেনো ? চলুন , ঘরে চলুন ! আচ্ছা সাপ লুডু খেলবেন না এমনি লুডু ? সাপ লুডু ছাড়া খেলি না আমি । আমাকে সাপে কাটুক , তবুও আমি কাউকে খেতে পারবো না । আর আপনার মতো সুন্দরী মেয়েকে তো একেবারেই না । মানে, গুটির কথা বলছিলাম আরকি…
লিনা তাজ্জব বনে । ইভান ফিক করে হাসে । পরমুহূর্তে ইয়ার্কি বাদ দিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে..
“ আই এম সরি,মিস লিনা ! লেগেছে আপনার ? আসলে দেখতে পাই নি । হুট করে ধাক্কা লেগে গেছে । উঠুন….
রাগ উঠলেও রাগ টুকু গিলে নেয় লিনা । ওর উঠে দাঁড়ানোর সুবিধার্থে ইভান নিজের এক হাত বাড়িয়ে দেয় । তবে হাত টা ধরে না লিনা । উপেক্ষা করে নিজে নিজেই উঠে দাঁড়ায় । চড়াও করে ওঠে কোমর । খানিক বেঁকে দাঁড়িয়ে আছে ও । ইভান হাত গুটিয়ে নিয়ে শুধায়…
“ খুব বেশি লেগেছে ?
“ হুম !
“ সরি !
“ ইটস্ ওকে !
বিকেলের আগে এক অতিথির আগমন । নতুন নয় ঠিক । তবে তার আগমনে বেশ অবাক হয়েছে মিহি । আপ্লুত হয়েছে পরমুহুর্তে । নাদিয়া এসেছে । মেয়েটার মধ্যে পরিবর্তন এসেছে হাজার খানেক । গুলুমুলু মেয়েটা শুকিয়ে কাঠ । মিহি ওর বর্তমান অবস্থার কথা শুনে একপ্রকার বাক রুদ্ধ । ডিভোর্স হয়েছে নাদিয়ার । আজ নয় , সেই বিয়ের চার মাস পরেই ।
বিয়ের কদিন পর নাদিয়া কে নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলো ওর স্বামী ।
সেখানে ওদের সংসারটা টেকে নি । একেই বয়সের তফাত অনেক । নাদিয়া মানিয়ে নিতে পারে নি প্রথম থেকেই । তার উপর ওখানে গিয়ে জানতে পেরেছে , ওর স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী সে । প্রথম জন কখনো মা হতে পারবেন না । তাই শুধু মাত্র একটা সন্তানের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন তিনি । সন্তান হলে সন্তান নিয়ে নাদিয়া কে ছেড়ে দেবেন , এটাই তার চুক্তি । নাদিয়ার পরিবারের কাছে যখন এসব তথ্য আসলো , তাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল তখন । মেয়েটার অমতে জোর পূর্বক বিয়ে দিয়ে মেয়েটার পুরো জীবনটাই বরবাদ করে দিয়েছেন তারা ।
নাদিয়া অভিযোগ করে নি আজ অবধি । ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরা স্বভাব ওর । সেভাবেই মরেছে , আজ অবধি মরছে । একটু খোঁজ খবর নিয়ে ওর জীবনটা সাজিয়ে দিলে হয়তো আজ এমনটা হতো না ওর সাথে ।
বিদেশে নিয়ে এসব শোনার পর পুলিশের সাহায্যে নাদিয়া কে ডিভোর্স করিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে । এখন সে বাপের বাড়িতেই আছে । গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে । আগে থেকেই মুখ চাপা ও , এখন স্বভাবটা আরো বেশি রক্তে মিশে গেছে ।
মিহি ওর অবস্থার , ওর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা শুনে থম মেরে ছিলো ।
এখন সামলে নিয়েছে নিজেকে । বিকেলের পর পর বরপক্ষ এসেছে । রাফি বরপক্ষের দলে । শান্তর একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে ঐ পক্ষ থেকে এসেছে ও । কনে পক্ষে ছিলো দুপুর পর্যন্ত । বিকেলের পর থেকে সে বর পক্ষ । শান্ত ওকে ছাড়া আসবে না বিয়ে করতে । একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কথা । রাফিও শান্ত কে সায় দিয়েছে । শান্তর বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবেই বিয়েতে এসেছে ও ।
বরপক্ষের সাথে গেটের সামনে কথা কাটাকাটি হচ্ছে কনে পক্ষের । রাফি আর শান্তর সব বন্ধরা গেটের একপাশে । অন্যপাশে মিহি , লিনা , জেনি , মেহজাবিন , মিরা , বর্ষা , আরো গুটি কয়েক মেয়ে । নাদিয়াও আছে একপাশে । মেহজাবিন বড় , তবুও ওর এখানে থাকতে কোনো ইতস্ততা নেই । সে রুহির পাশাপাশি শান্তর ফড়েও । মিহির বেসুরো আবদার শান্তর কাছে…..
“ ভাইয়া , আমরা এখানে কথা কাটাকাটি করতে আসি নি । তুমি কি আমাদের ডিমান্ড পূরন করবে , নাকি গেইট থেকেই তাড়াবো তোমায় ?
শান্ত মুখে কুলুপ এঁটেছে । ওকে কথা বলতে দিচ্ছে না ওর বন্ধুরা । মুখে টু শব্দ করলেই একেক বার একেক জনের চিমটি খাচ্ছে এখানে ওখানে । মিহির কথার প্রত্যুত্তরে রিফাত খানিক প্রগাঢ় হয়ে বলে উঠলো….
“ আরে আপু , রেগে যাচ্ছেন কেনো ? এতো তাড়া কিসের । সবে তো কথা শুরু হলো আপনার সাথে ।
রাফির ধ্যান ভাঙ্গে এবার । এতোক্ষণ মোহময় এক দৃষ্টে দেখছিলো মিহি কে । ওর পছন্দ করে কিনে দেওয়া বেবি পিংক কালারের ভারী গর্জিয়াস লেহেঙ্গা পড়নে । মাথায় একই গর্জিয়াস হিজাব । আজ সাজগোজ করে নি তেমন । মেকআপ নেই মুখে । মেকআপ ছাড়াই অসম্ভব সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে ।
মিহি রিফাতের কথায় চটচটে গলায় বলল….
“ অতো কথা বলার সময় নেই আপনাদের সাথে । ভাইয়া , তুমি কি দশ লাখ ফেলবে নাকি আমার পাখি কে নিয়ে বিয়ে বাড়ি থেকে পালাবো আমি । বিয়ে করবে না ওকে ?
শান্ত অসহায় চোখে চায় । মাথা ঝাঁকায় উপর নিচ । লিজান বলে ওঠে….
“ আপু , এমাউন্ট টা একটু বেশিই হয়ে গেলো না ? আপনি ছোট মানুষ,এতো টাকা নিয়ে কি করবেন ?
রাফি এবার মুখ খুললো….
এক দেখায় পর্ব ৫৮
“ এই যে বেয়াইন সাহেবা , আমার দিকেও তাকান একটু । আমাকে বললে কিন্তু আমি আপনার পুরো ডিমান্ড পূরন করে দেবো । কজ , টাকা যা আছে সব আমার কাছে । বেকার বেকার আপনাদের ভাইয়ার কাছে চেয়ে লাভ নেই । তাকে ঝাড়লেও এক টাকাও পড়বে না আজ । আমাকে একটু আদর দিয়ে বলুন , আমি আদর পেলে সব টাকা দিয়ে দেবো সত্যিই ….
মিহি চোখ কুঁচকায় । মুখ বাঁকায় সাথে সাথে । মেহজাবিন গলা খাঁকারি দেয় ….
“ ভাইয়াআআআ….
