Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৬৭ (২)

এক দেখায় পর্ব ৬৭ (২)

এক দেখায় পর্ব ৬৭ (২)
সুরভী আক্তার

বর কনের উপস্থিতির ঘন্টা বাজলো ।
এক বাড়িতেই জায়া পতি উপস্থিত । তবে কারোর দেখাই মেলে নি এখনো । বিয়ে বাড়িতে একে একে মিহির পা ভেঙ্গে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে গেছে সবার কানে কানে । এজন্যই এখনো বর বউয়ের দেখা মেলে নি এটা কারোরই বুঝতে বাকি নেই ।
হরতাল শুরু হয়ে গেছে । সবার মাঝেই উদগ্রীবতা । অপেক্ষায় প্রহর শেষ হচ্ছে না । অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সবাই ।

মিহির সাজগোজ শেষ । ড্রেসিং টেবিলের পাশে একটা হাতল ওয়ালা চেয়ারে বসে আছে সে । ভাঙ্গা পা খানা সোজাসুজি করে সামনের নরম সোফায় তুলে রাখা । লেহেঙ্গা পড়ে নি , পড়েছে শাড়ি । শাড়ি পড়েই বিয়ে করার স্বপ্ন ওর । যদিও শাড়িটা এই অবস্থায় কম্ফোর্টেবল লাগছে না । তবুও সে এটুকু আনকম্ফোর্ট সহ্য করতেই পারে । বিয়ে তো এক বারেই করবে ।
সেই কখন সাজগোজ শেষ । অথচ এখনো এভাবে ঠায় বসে আছে ও । বাইরে বেরোবে কি করে ? কেউ তো ওকে নিতে আসছে না । এদিকে সময়ের কাঁটা টিকটিক করে চলছে আপন গতিতে । উদ্বিগ্ন মিহি । ভেতর ভেতর দূরু দূরু করছে । কাপছে নারী চিত্ত । হাত কচলাচ্ছে বসে বসে ।
রুহি টাও বাইরে বেরোলো ওকে এখানে রেখে । হেনা বেগম হাজার বার আসছেন আর দেখে দেখে যাচ্ছেন ।
বর্ষা , মিরা আর লিনা , ওরা ভিড় জমিয়েছে আয়নার সামনে । সাজগোজ শেষ । ফিনিশিং টাচ দিচ্ছে ।
মিহি বারবার উতলা হয়ে তাকাচ্ছে দরজার দিকে । সাবিনা বেগমকে অনেকক্ষণ দেখে নি । মিহি বউ সাজলো, অথচ ওর আম্মু একবারও ওকে দেখতে আসলো না ।
ছটফটে মিহি ঢোক গিলছে বারবার । দু রকমের অনুভুতি কাজ করছে নিজের মাঝে ।
এর মধ্যেই দরজার সামনে সাবিনা বেগম কে দেখে ছ্যাঁত করে উঠলো মিহি । উজ্জ্বল হেসে দ্রুত ডাকলো…

“ আম্মু ।
মুচকি হাসলেন সাবিনা বেগম । ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলেন । গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে মেয়ের সামনে দাঁড়ালেন । হাসি সমেত মাথা তুলে চাইলো মিহি ।
সাবিনা বেগম অনেকক্ষণ নীরব দৃষ্টিতে পরখ করলেন মেয়েকে । এক গাল হেসে সামনে বসে নরম কন্ঠে বললেন…
“ বাহ্ , আমার সেই ছোট্ট মিহি আজ বউ সেজেছে ।
খুব সুন্দর লাগছে তোকে ।
মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে আপন হাতে চুমু খেলেন ।‌ হাসলো মিহি । তাকিয়ে থাকতে থাকতে আকস্মিক কেমন ভার হয়ে আসলো । চোখে জ্বলন অনুভব করলো মিহি । বুঝলো চক্ষুদ্বয় ঝাঁপসা হয়ে আসছে । ঘোলাটে লাগছে আম্মুর স্পষ্ট সুশ্রী মুখখানা ।
শ্বাস টানে মিহি । ভীষণ কান্না পায় । কান্না চেপে রাখার মতো কঠিন কাজে বরাবরই খুব কাঁচা মিহি । ও হাত মুঠো করলো , খামচে ধরলো শাড়ির অংশ । তবুও সামলে নিতে পারলো না নিজেকে ।
সাবিনা বেগম অবস্থা বুঝতে বুঝতেই তড়িতে তাকে অকস্মাৎ জড়িয়ে কেঁদে উঠলো মিহি । ভড়কালেন সাবিনা বেগম ।‌ সাথে সাথে , মিরা বর্ষা আর লিনা । ওরা চকিতে তাকালো মিহির দিকে ।
মিহি শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো । তড়িঘড়ি করে মেয়ের পিঠে হাত রাখলেন সাবিনা বেগম । আঁতকে বললেন…

“ মিহি । কি হয়েছে মা ? কাঁদছিস কেনো ? খুব সুন্দর লাগছে তো তোকে ! হঠাৎ কি হলো মা , এভাবে কেঁদে উঠলি কেনো ?
মিহির ক্রন্দনের শব্দ বাড়ে ।
বিচলিত হয়ে পড়েন সাবিনা বেগম । রুহি ছুটে আসলো । আসছিলোই সে , মিহির কান্নার শব্দে আরো জোর কদমে ছুটে আসলো ।
“ পাখি , কি হলো । আন্টি,পাখি কাঁদছে কেনো ? এই পাখি…
“ মিহি , মা ওঠ । তাকা আমার দিকে ।
তোর কান্নার কি আছে ? পাগলি , এমন বিয়েতে কাঁদে কে ?
মিহি কে সামলে নেন তিনি ।
চোখের কাজল ঘেঁটে গেছে এর মধ্যেই । পানি ঝড়ঝড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে । সাবিনা বেগম আলগোছে মেয়ের গাল মুছিয়ে দিলেন । বললেন রুদ্ধ গলায়…

“ কি হয়েছে বল ?
মিহি ফের কেঁদে ফেলে । ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সংবরণ করতে । ওর যে ওর আব্বুর কথা মনে পড়ছে , এটা ও কি করে বলবে ? আব্বুর যে খুব সখ ছিল মিহি কে বউ সাজে দেখার । মিহি আজ বউ সেজেছে , কিন্তু মিহির আব্বু নেই ।
মেয়ের মুখশ্রী দেখে কান্নার কারণ অনুমান করতে ভুল করলেন না সাবিনা বেগম ।‌ চিকচিক করে উঠলো তার চোখের কোণা । এজন্যই তো তিনি এতক্ষণ দূরে ছিলেন । নিজেকে ধাতস্থ করে এসেছেন এখন ।
ভরাট চোখ নিয়ে মুচকি হাসলেন সাবিনা বেগম । আম্মুর হাসি দেখে মিহি অস্ফুটে বলে থেমে থেমে…

“ আব্বু নেই আম্মু । আমার আব্বু নেই । আমার আব্বু আমাকে বউ সাজে দেখতে পারলো না । আব্বুর খুব সখ ছিল বলো আমার বিয়ে দেওয়ার । কিন্তু সখ পূরণ করার আগেই আব্বু কোথায় হারালো আম্মু ? আমাকে বউ সাজে দেখবে না আমার আব্বু ? আমার আব্বু কোথায় আম্মু ?
থমকান সাবিনা বেগম ।
স্তব্ধ হয়ে যায় সকলে । হেনা বেগম দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে পড়েন । সাবিনা বেগম রুদ্ধ হয়ে গেলেন । টুপ করে গাল বেয়ে পানি গড়ালো ।
মেয়ের মুখ আগলে ধরলেন তিনি । দ্রুত চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন…
“ চুপ , একদম চুপ ।
কাঁদবি না একদম । আজ না তোর বিয়ে ।
আপা দেখুন না মিহি কাঁদছে । ওকে থামতে বলুন । ওর আব্বু কষ্ট পাবে নয়তো ।
হেনা বেগম এগিয়ে আসলেন । হাসার চেষ্টা করে বললেন আহত স্বরে…
“ মিহি, চুপ কর মা । তোর আব্বু আছেন । উনি হয়তো দেখছেন তোকে । ওনার সখ পূরণ হচ্ছে আজ । হয়তো উনি খুব খুশি ।
ফিকড়ে উঠলো মিহি । সাবিনা বেগম কে এখান থেকে সরানো প্রয়োজন । নয়তো নিজেকে সামলাতে পারবে না মিহি । ওদিকে রাফি তৈরি । হেনা বেগম ডেকে আসলেন ওকে । ও আসছে মিহি কে নিতে ।
হেনা বেগম সাবিনা বেগম কে তুলে দাঁড় করালেন । বাহানা দিয়ে ওনাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরোলেন ।
শান্ত হুড়মুড়িয়ে হাজির তিনি বেরোতেই । হাস্যোজ্জ্বল মুখে কিছু বলতে নিলেই মিহির কান্না ভেজা মুখখানা দেখতে পেলো । রুহি ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিচ্ছে আবার । ফিকড়ে ফিকড়ে উঠছে মিহি । শান্ত উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে আসলো । রুহির পাশে মিহির মুখ সম্মুখে হাঁটু মুড়ে বসলো । চোখ জোড়া সূক্ষ্ম করে ভ্রু জড়ো করে বিচলিতের ন্যায় শুধালো…

“ পরী , কাঁদছিস কেনো বনু ?
কি হয়েছে ? কে কি বলেছে তোকে ?
রুহি ইশারা করে বোঝালো আর এই বিষয়ে কথা না বাড়াতে । শান্ত বুঝলো । মুচকি হেসে মিহির হাত টেনে নিজের হাতের মুঠোয় আবদ্ধ করলো । নমনীয় স্বরে বলল ঠোঁট চেপে…
“ এই ছিঁচকাদুনে মেয়েটার সাথে থেকে থেকে তুইও কেমন ছিঁচকাদুনে হয়ে যাচ্ছিস পরী । দেখ দেখ , আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখ , তোকে পুরো রুহির মতো ছিঁচকাদুনে লাগছে ।
রুহি নিমিষেই শক্ত করে মুখ কুঁচকালো । কটমটিয়ে তাকালো শান্তর দিকে । বাঁকা চোখে তাকিয়ে ফিক করে হেসে শান্ত আবার বললো…
“ না না , রুহির থেকে একটু বেশিই ভালো লাগছে । একদম আমার পরী লাগছে তোকে । খুব সুন্দর । রাফি আসছে তোকে নিতে…

অমনি চোখ নামায় মিহি । নাক টানে ।
শান্ত রুহির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হাসে । দরজায় কড়া পড়তেই ছলকে উঠলো মিহি । সেই সুপরিচিত গন্ধটা ধক্ করে নাকে ধরা দিলো । অমনি বুঝতে বাকি রইলো না কে এসেছে । মুখখানা খানিক ফিরিয়ে চোখ বুজলো মিহি ।
সবাই চকিতে চাইলো দরজার দিকে । মিহির শাড়ির সাথে মিলি কালো খয়েরী শেরোয়ানি পড়নে রাফির । পুরো বর বেশে হাজির হয়েছে সে ।
লিনা রাফি কে একপলক দেখেই চোখ নামিয়ে নিলো । মিরা আর বর্ষা কে ইশারা করে দ্রুত রাফি কে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো ও ।
রাফির দৃষ্টি স্থির । গাঢ় চাহনির তীব্রতা ।
এক ধ্যানে এক দৃষ্টে সে মুখ ফিরিয়ে থাকা মিহির পানে তাকিয়ে আছে । যদিও মুখ দেখা যাচ্ছে না । এই মুখটা দেখার তীব্র আকুলতায় জ্বলছে হৃদয় । হাঁসফাঁস লাগছে বাহ্যিক দিক থেকে শান্ত হলেও ।
রাফি ধীর পায়ে এগোলো । শান্ত উঠে দাঁড়িয়েছে । বললো…

“ এসে গেছে পালকি ।
তো বর বাবু , বউকে বহন করে নিয়ে চলুন । দেরি হয়ে যাচ্ছে তো । বিয়ের পর আরো কত কি বাকি ।
রাফি নির্বিকার । শুনেও শুনলো না । রুহি পিছন থেকে সজোরে একটা চিমটি কাটলো শান্তর কোমরের পাশে । অমনি মৃদু কুকিয়ে উঠলো শান্ত । কুঁকড়ে গিয়ে মুখে ব্যাথার ছাপ ফুটিয়ে রুহির দিকে ফিরলো । রুহির ক্ষুব্ধ দৃষ্টি দেখে বললো ফিসফিসিয়ে….
“ জান..
এই ‘জান’ হওয়ার জন্যই বেঁচে যাও বারবার । নয়তো সব চিমটির হিসেব তুলতাম ।
রুহি মুখ বাঁকালো । শান্তর হাত চেপে ধরে পা বাড়ালো , উদ্যত হয়ে তাড়া দিলো…
“ ভাবি জান কে তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো ভাইয়া ।
আমরা গেলাম । দেরি হয়ে যাচ্ছে…
ওরা দুটো চলে গেল ।

রাফি মিহির পাশে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিলো । অমনি ঝাঁকুনি দিয়ে চোখ খিচে ফেললো মিহি । ঠোঁট পিষে মৃদু হাসলো রাফি । আলগোছে সামনে বসলো । হাত বাড়িয়ে তর্জনী দিয়ে মিহির চিবুক ধরে মুখখানি ফেরালো নিজের দিকে । চোখ বন্ধ মিহির । লজ্জায়,জড়তায় কাঁপছে মুখশ্রী । গোলাপি রঞ্জনে রাঙিত অধর যুগল কাঁপছে তিরতির করে । রাফির দৃষ্টি থমকালো । স্থির হয়ে আসলো । বউ সাজে সজ্জিত মিহির আকর্ষণীয় মুখখানা দেখে স্তব্ধ হতে ভুললো না সে । এ কেমন সৌন্দর্য !
এমন তো আগে দেখে নি ! আগের গুলোর থেকে এবার সম্পূর্ণ আলাদা । মিহি এক , তবে ওর প্রত্যেক রুপেই আলাদা আলাদা সৌন্দর্য শানিত । আজ বউ রুপি সৌন্দর্য । রুজান রাফি চৌধুরীর বউ রুপি ।
রাফি শুল্ক ঢোক গেলে । অধর ভেজায় জিভে । চোখে পলক ফেলতেও ভুলে গেছিলো , ভুল ভাঙল অনেকক্ষণ বাদ । পলক ফেলে কয়েক সেকেন্ড চোখ বুজে রাখলো রাফি । অতঃপর চোখ খুললো ।
মিহির দুহাত ধরলো । হাতের তালুতে ওর নিজের নামটা লক্ষ্য করলো আগে । মৃদু হেসে দুহাত জড়ো করে দুহাতের তালুতে উষ্ণ ঠোঁট ছোঁয়ালো । কম্পিত হয়ে হাত সরাতে চাইলো মিহি , পারলো না । নুইয়ে পড়লো মেয়েটা ।
রাফি ওষ্ঠ সরিয়ে ফের চোখ তুলে দৃষ্টি পাত করলো মিহির দিকে । মেয়েটার চোখের বৃহৎ পাপড়ি যুগলে পানির বিন্দু কণা চিকচিক করছে ।‌ চোখের কোণে ঘেঁটে যাওয়া কাজল এখন লক্ষ্য করলো রাফি । কেঁদেছে এটা ঠাহর হতেই কপালে ভাঁজ ফেললো । বললো মৃদু স্বরে…

“ কেঁদেছো কেনো ?
আলতো মাথা নাড়ালো মিহি । রাফি কথা বাড়ালো না । বাড়াতে ইচ্ছে করলো না । শুধু চেয়ে থাকতে ইচ্ছে হলো । আর ও চেয়েই রইলো । মিহি একবার টুক করে চোখ তুললো রাফির দিকে । রাফির দৃষ্টি বুঝে অমনি চোখ নামালো । হেসে ফেললো রাফি । হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধা আঙ্গুলে চোখের কোণের ঘেঁটে যাওয়া কাজল মুছিয়ে দিলো । কালচে ঠেকলো কার্নিশ টুকু, এদিকে গাল বেয়েও পানি গড়িয়েছে । রাফি নিচের অধর কামড়ে উঠে দাঁড়ালো । ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে একটা মেকআপ ব্রাশ তুলে নিলো । ঘেঁটে ঘেঁটে খুঁজে বের করলো একটা ফেস পাউডার । মিহির দিকে ফিরতেই মিহি আলতো করে বললো…
” এখন আপনিও মেকআপ করবেন ?
” আমার বউ করবে ।
বলেই মিহির ফেসের উপর হাত চালালো । তব্দা মেরে বসে রইলো মিহি । তাকিয়ে রইলো ফ্যাল ফ্যাল করে । রাফি কাজ সেরে , চোখ সরু ঘাড় বাঁকিয়ে পরখ করলো মিহি কে । অতঃপর বললো…
” এবার ঠিক আছে ।
একদম পারফেক্ট । তো , এবার যাওয়া যাক । চলুন ম্যাডাম …। উঠুন , দাঁড়ান…
মিহি মুখো ভঙ্গিমা মলিন করলো । রাফির আহ্লাদ বুঝে তাকালো নিজের পায়ের দিকে । অতঃপর করুন চোখে রাফির দিকে । রাফি খানিক হাসলো । ব্রাশ আর ফেস পাউডার রেখে অতি যত্নের সহিত আলগোছে কোলে তুললো মিহি কে । নিমিষেই লাজুক হাসে মিহি । রাফি ওর কপালে চুমু খায় । পা বাড়াতে বাড়াতে মৃদু ক্ষিণ স্বরে গেয়ে উঠলো গুনগুন করে…..
” hai tamanma hume Tumhe Dulhan banaye , tere hatho pe mehendi apnee naam ki sajaiyen
tere Lele balaye ,tere sadqe utare..
hai tamanma hume Tumhe apna banaiye….

পুষ্প বৃষ্টি ঝড়ছে । আর সেই বৃষ্টির মাঝে বউ সাজে সজ্জিত এক রমনীকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে দৃঢ় পায়ে হেঁটে আসছে রুজান রাফি চৌধুরী । আশপাশের সবাই চেয়ে আছে স্তব্ধ হয়ে মূক বনে । এটারই প্রতিক্ষায় ছিলো সবাই । অবশেষে নতুন বর বউয়ের দেখা মিললো । তবে অপ্রত্যাশিত ভাবে । সবাই ভেবে কূল পাচ্ছিলো না , কি করে ভাঙা পা নিয়ে বিয়ের আসরে আসবে মিহি ?
সবার ভাবনার ছেদ ঘটালো রাফি । নিজের স্ত্রী কে দ্বিধা হীন সবার সামনে দিয়ে নিজেই তুলে আনলো সে । অবাক করলো সকলকে । জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের চাকচিক্য বাড়লো । শানাই বাজলো বিয়ের ।
মিহি লুকিয়ে ফেলেছে নিজেকে । রাফি ওকে এভাবে সবার সামনে দিয়ে নিয়ে আসলো , লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে ওর । সবাই কিভাবে দেখছে কে জানে ? কি ভাবছে সবাই ?
মিহি তো চোখ তুলে তাকায়ই নি এখনো । আশপাশ , এতো সব মানুষজনের অবাক ড্যাপ ড্যাপে দৃষ্টির মুখোমুখি হয় নি ও ।

না জানি , সবাই কিভাবে চেয়ে আছে । অথচ ,রাফি ? ওর তো কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই । শত শত মানুষের মধ্য দিয়ে সে দৃঢ় পায়ে হেঁটে আসছে । এতসব জোড়া জোড়া দৃষ্টির মাঝেও একটুও অস্বস্তি , জড়তা আসলো না ওর মাঝে । সে নিরুদ্বেগ । আপন মনে মিহি কে কোলে করে পুষ্প বৃষ্টি কাটিয়ে স্টেজে উঠলো ও । মিহি কে বসাতেই টনক নড়লো মিহির । রাফির থেকে আলাদা হলেই এখন সবার সম্মুখীন হতে হবে ওকে । ইশ্ ,কি লজ্জা ? সবাই ওকে কি নজরে দেখবে কে জানে ?
জড়িয়ে যাচ্ছে মিহি । কোনো রকমে আলাদা হয়ে মাথা নোয়ালো ও । চোখ তুলবে না কিছুতেই ।
রাফি পাশে বসতেই বাঁকা চোখে তাকালো মিহি । শত শত চোখের সাথে সাথে ক্যামেরা বন্দি হলো রুজান রাফি চৌধুরী আর মাহিতা ইসলাম মিহির এই মুহুর্ত টুকু । ওদের আগমন টুকু ।
আইনি ভাবে আগে থেকেই বিয়ে হলেও পুনরায় বিয়ে হলো ওদের । এবার সজ্ঞানে,জেনে শুনে নিজ সম্মতিতে মিহি সাক্ষরিত হলো রুজান রাফি চৌধুরীর নামে ।
মিহি যখন তিন বার কবল পড়লো , প্রত্যেক বার উচ্চারণের সময় একেকটা ঢোক গিলেছে রাফি । মিহির অস্বস্তি বোধ হয় নি একটুও । তবে রাফি কেঁপেছে । হাত পায়ে কম্পন অনুভব করেছে ও ।
রাফির পালা যখন আসলো , তখন গলায় কথা জড়িয়ে আসছিলো । আটকে যাচ্ছিলো শব্দরা ।
অবশেষে আবদ্ধ হলো ওরা ।
কাজি সাহেব পাশ থেকে উঠে চলে যেতেই চোখ বুজে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো রাফি । অতঃপর ঝট করে পাশে মিহির দিকে তাকালো । রুহি মিহির কানে কানে কিছু বলছে । বলেই কিছু একটা ইশারা করে স্টেজ থেকে নেমে চলে গেলো রুহি । রাফি ভাবলো না বেশি । ঠোঁট ভিজিয়ে আরো কাছ ঘেঁষে বসলো । সামনের দিকে ঝুঁকে ঘাড় বাঁকিয়ে মিহির দিকে তাকালো ।
বললো ফিসফিসিয়ে…..

” অনেক অপেক্ষার পর আজ পূর্নতা আসলো, ম্যাডাম । যদিও আমি আপনাকে নিজের নামে লিখিয়েছি অনেক আগেই । তবে আজ , এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে জীবনটা হঠাৎ করেই পূর্ণ হয়ে গেলো । উবে গেলো সব শূন্যতা । তুমি অবশেষে হয়ে গেলে আমার । আর আমি তোমার । আজ সবাই জেনে গেলো , তুমি আমার । এই মুহূর্ত থেকে তুমি শুধুই আমার ।
রুহির বিয়েতে রৌনক আসতে পারে নি ।
তবে মিহির বিয়েতে এসেছে । সোহেলের সাথে এসেছে ও । ওরা দুজন একসাথে এসেছে । মিরা তখন নিচে নেমেই নাদিয়ার সাক্ষাৎ পেয়েছে । ওরা একসাথেই ছিলো ।
সোহেল আর রৌনক টুকটাক গল্প করেছে ওদের সাথে ‌। নাদিয়া মুখ খোলে নি । বরাবরের ন্যায় চুপচাপ ও । এখন তো আরো বেশি মুখ গোমড়া হয়ে গেছে ।
রৌনকের সাথে টুকটাক কথায় গলা মেলালেও,একটা বারের জন্যেও সোহেলের দিকে তাকায় নি নাদিয়া । কথা বলা তো অনেক দূর । সোহেলও কথা শুরু করে নি ।
নাদিয়া থাকতে পারবে না বেশিক্ষণ । ওকে ফিরতে হবে । মিহির সাথে একটু আগে কথা বলেছে । রুহিও ব্যাস্ত । ছোটাছুটি করছে এদিক ওদিক । মিরা , নাদিয়া, সোহেল আর রৌনক ওরা একপাশে দাঁড়িয়ে ।
মিরা থাকবে না আজ । নাদিয়া ভারী গলায় মুখ খুললো..

” মিরা , তুই বাড়ি যাবি এখন ?
আমাকে যেতে হবে , নয়তো দেরি হয়ে যাবে । এখন যাবি তো, একসাথে যাই ?
” যাবো তো । এখানে আর থেকে কি করবো ?
” চল , আমার গাড়ি আছে । একসাথে যাই । নামিয়ে দেবো তোদের ।
সোহেলের স্বাভাবিক কন্ঠ ।
তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া নাদিয়ার….
” না ,, আমি গাড়িতে যাবো না ।
মিরা চল…
” কেনো ? বেকার বেকার টাকা ভাড়া দিয়ে অন্য গাড়িতে যাবি কেনো ? আমার গাড়ি তো আছে….
” তোর গাড়ি আছে , তুই যা । আমরা চলে যেতে পারবো । আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে মিরা । যাবি তো চল ।
মিরা মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বললো নাদিয়ার উদ্দেশ্যে….
” সবসময় এমন খ্যাট খ্যাট করিস কেনো বলতো ? নিজের সুযোগ সুবিধা বুঝিস না নাকি ? ও যেচে পড়ে নিয়ে যেতে চাইছে , তো বাঁধ সাধছিস কেনো ? একটু বেশি বেশিই করে ফেলিস সবসময়….
শিথিল হলো নাদিয়া । মৃদু হাসলো অদ্ভুত । বললো….

” যা তুই । আমি একা চলে যেতে পারবো ।
আসি রে রৌনক , ভালো থাকিস । আবার একদিন দেখা হবে….
নাদিয়ার কথা শুনে চোখ উল্টে তাচ্ছিল্য করলো মিরা । নাদিয়ার এমন শক্ত পোক্ত বাহ্যিক দিকটা মোটেও পছন্দ নয় ওর ‌। ও বিড়বিড় করলো…..
” ঢং….
অমনি ঝাড়ি পড়লো তপ্ত……
” চুপপপ ।
ঢংয়ের কি বুঝিস ? ঢং ও করছে , না তুই ? ওকে কোনো দিন ঢং করতে দেখেছিস তুই ?
চমকালো মিরা । সোহেলের মুখপানে তাকাতেই বৃহৎ হয়ে আসলো দৃষ্টি জোড়া ‌। সোহেল নির্বিশেষে নাদিয়ার দিকে তাকাতেই আসার পর এই প্রথম চোখাচোখি হলো নাদিয়ার সাথে । অমনি শিথিল হলো সোহেল ‌ নরম কন্ঠে বলল…

এক দেখায় পর্ব ৬৭

” বন্ধু তো , আর কিছু ভাবতে হবে না ।
তোর অস্বস্তির কারণ হতে চাই না আমি । আগে যেমন ছিলাম তেমনই থাকবো । অপ্রকাশিত যখন ছিলো , তখন অপ্রকাশিতই থাক । আমাকে সেই আগের সোহেল মনে করে ফ্রি হতে পারিস । চল , আমার বাবার দেওয়া প্রথম উপহার ছিলো ঐ গাড়িটা । আর আমার গাড়িতে প্রথম উঠেছিলি তুই , ঐ রুহির বিয়ের দিন ।‌ সেদিনই কিনেছিলাম গাড়িটা । চল ,আজ আবার উঠবি । বন্ধু হিসেবেই…..

এক দেখায় পর্ব ৬৮