Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৬

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৬

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৬
নুসরাত ফারিয়া

নতুন দিনের নতুন সকালের আগমন ঘটেছে। পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে নাস্তা করতে বসেছেন। ডাইনিংয়ে সবাইকে দেখা গেলেও আধার ও আলোকে দেখা গেল না। শেফালির মাধ্যমে ডাকা হয়েছিল, কিন্তু রুমের ভেতর থেকে কারোর সাড়াশব্দ না পেয়ে চলে এসেছেন। হয়তো ঘুমিয়ে আছে, তাই আর বিরক্ত করেনি কেউই। ডাইনিং টেবিলে পিনপতন নীরবতা ছেয়ে আছে। মাঝেমধ্যে সোবহান খানের সাথে মতিউর রহমান ও মাহবুব রহমান টুকটাক কথাবার্তা বলছেন। উনারা আজই চলে যাবেন। কারণ উনাদেরও তো কাজকাম আছে! তারওপর ছায়াও সবে ভার্সিটিতে উঠেছে, মেয়েটার ইচ্ছে ছিল বড় বোনের ভার্সিটিতে পড়ার, কিন্তু একটুর জন্য মিস হয়ে গেছে। অগত্যা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়েছে।

মায়ার পাশে ছায়া বসে থেকে খাবার খাচ্ছে আর সামনে বসা ব্যক্তিকে দেখছে। লোকটা মাথা নিচু করে চুপচাপ নাস্তা করছে, একবারের জন্যও মুখ তুলে কোনো দিকে তাকায়নি। শুধু রাত ভাইয়ার সাথে একটু কথা বলেছিল। তারপর থেকেই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।
মৃন্ময় পানি খেয়ে সবজি নিতে চাইল। সে হাত বাড়ানোর আগেই কেউ একজন পাত্রটা এগিয়ে দিল তার সামনে। মৃন্ময় মাথা তুলে সামনে তাকায়। এক জোড়া মায়াবী চোখের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হতেই সে নজর সরিয়ে নিল। এই পুচকে মেয়েটা বুঝল কীভাবে, সে সবজি নিতে চাচ্ছিল? নাকি মন পড়তে পারে? মৃন্ময় আবারো মেয়েটার দিকে তাকায়। গতকাল তার সাথে অনেক গল্প করেছে৷ মেয়েটা কবে থেকে তাকে চেনে, কবে ফ্যান হয়েছে, কবে তার গানে আসক্ত হয়েছে…ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছু বলেছে। আর সে এই প্রথম মনে হয় বোন ব্যতীত এই মেয়েটার সাথে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বকাবকি শুনেছে। এই মেয়েটা এত কথা বলতে পারে উফফ! একদম নিজের বড় বোনের মতো হয়েছে৷ প্রথম সাক্ষাৎ এই তাকে কোনো মেয়ে এইভাবে ধুয়েছে, তাও তারই বন্ধুর বউ ওরফে ভাবীজান। সে বুঝে গেছে এরা দুবোন ভীষণ সাংঘাতিক!
সবার নাস্তা করা শেষ হতেই আধার সিঁড়ি বেয়ে আস্তেধীরে নেমে এল। আলেয়া রহমান মেয়েকে দেখতে না পেয়ে কপাল কুঁচকালেন। তারমানে তার মেয়েটা এখানেও দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে? মেয়েটা আস্ত একটা অলস, সাথে ঘুমকাতুরেও।

আধার চুপচাপ এসে নাস্তা করতে লাগল৷ মাংসের ঝোল ঠোঁটের কোণে একটু লাগতেই জ্বলে উঠল। সে টিস্যু দিয়ে কেটে যাওয়া রক্তিম ঠোঁট মুছে নিল। পাঁজি মেয়েটা ইচ্ছে করে কামড় দিয়েছে। আর একটু হলে তার গালেও লাভ বাইট দিত। ভাগ্যিস, আগেই মেয়েটার পরিকল্পনা বুঝতে সক্ষম হয়েছিল। নয়তো আজ আর কাউকে মুখ দেখাতে পারত না। মাক্স পরে থাকতে হতো!
তাহমিনা খান চেয়েছিলেন কিছু বলতে, কিন্তু বলতে পারলেন না বড় ছেলের কঠিন চেহারা লক্ষ্য করে৷ ছেলেটা ভীষণ রেগে আছে তার উপর। এবং এই রাগ করে থাকাটাও একদম স্বাভাবিক। তিনি না বুঝেশুনে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। তাই তো আর কোনোরকম অশান্তি করেনি। কারণ তিনি চান না, এ বাড়ি থেকে আধার চলে যাক! নিজের স্বার্থের জন্য হলেও উনার বড় ছেলের এ বাড়িতে থাকাটা জরুরী। নয়তো এত এত সুখ, বিলাসিতা কীভাবে পাবেন? ছেলেটা চলে গেলে কি আর তাদের খরচ বহন করবে? তখন নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তাদেরকে দেখার আর সময় হবে না। তাই আপাতত পরিবেশ শান্ত রাখতে হবে। নয়তো তীরে এসে সব ডুবে যাবে।
-“এটাকে বাপের বাড়ি পেয়েছো? যে দুপুর পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমাবে? তোমার শ্বাশুড়ি সকাল থেকে একা সবদিক দেখছেন, আর তুমি বাড়ির বড় বউ হয়ে কিনা ঘুমাচ্ছ? এই শিক্ষা দিয়েছি তোমাকে?”

আলো থমথমে মুখে মায়ের রাগান্বিত চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে। সে মাত্রই ঘুম থেকে উঠে গোসল নিয়ে বাইরে এসেছিল। তখনই আলেয়া রহমান তার সামনে হাজির হোন। আর মেয়েটাকে কিছু কথা শোনায়। কারণ তিনি চান না, অন্যকেউ উনার মেয়েকে কথা শোনানোর সুযোগ পাক! হাজার হোক, এটা তার শ্বশুরবাড়ি। বউয়ের দায়িত্ব পালন করতেই হবে, যেখানে আজ বাড়ি ভর্তি মেহমান। আর সেখানে মেয়েটা ঘুম থেকে উঠল দুপুর বেলায়। কে কি ভাবছে কে জানে!

-“এখনো খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? নিচে গিয়ে শ্বাশুড়িকে সাহায্য করো।”
আলো ঠোঁট উল্টে কিছু বলতে যাবে, তখনই পেছন ভেসে এল কিছু বাক্য—
-“আপনার মেয়েকে কাজের মেয়ে হিসেবে নিয়ে আসিনি মা। ও বাড়ির বড় বউ হওয়ার আগে আমার বউ! এটা তার শ্বশুরবাড়ি বলে এই না যে, নিজের সুখ-শান্তি, ঘুম, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চাওয়া-পাওয়া, স্বাধীনতা বিসর্জন দিবে। অন্তত আমি বেঁচে থাকাকালীন হতে দিবো না। কাজ করার জন্য লোক রয়েছে, দরকার হলে আরো দু’জনকে রাখব। এই খান বাড়ি শুধু আমার নয়, আপনার বড় মেয়েরও। ও যেভাবে থাকতে পছন্দ করে, সেই ভাবেই এখানে থাকবে। আর আপনার মেয়ে নিজের দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করে। আপনাদের ওখানে থাকাকালীন যেটা যেটা করেনি, তার সবটাই এখানে এসে করেছে। উমম…বলতে পারেন আমার বউ সবদিক থেকে একদম পারফেক্ট!”
ছেলেটার কথা শুনে আলেয়া রহমান মুগ্ধ হলেন। তিনি তো তার বড় মেয়ের জন্য এমনই একজনকে চেয়েছিলেন। যেই মানুষ তার মেয়েটার পাশে থাকবে, তাকে বুঝবে এবং সমস্ত পাগলামি সহ্য করবে। কারণ তিনি তার মেয়েকে ভালো করেই চেনেন, মেয়েটা কেমন!
আলেয়া রহমান একগাল হেঁসে ছেলেটার সামনে এসে শান্ত গলায় বলল,

-“আমার মেয়ে ভাগ্যবতী, তোমার মতো একজনকে স্বামী হিসেবে পেয়েছে।”
-“উঁহু, আপনার মেয়ে নয়, মা! বলুন আমি ভাগ্যবান, যে কিনা আপনার বড় মেয়েকে পেয়েছে।”
আলেয়া রহমান হাসলেন। ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন
-“অনেক সুখী হও বাবা! আর আমার মেয়েটার পাশে সারাজীবন থেকো।”
-“ইনশাআল্লাহ মা! আপনার মেয়ে চাইলেও ওকে কখনো ছাড়ব না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।”
আলেয়া রহমান হেঁসে সেখান থেকে চলে গেলেন। তখন আলো এসে দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
-“ভালোই তো শ্বাশুড়িকে পটাতে পারেন দেখছি!”
আধার মেয়েটার কোমর চেপে ধরে আরো ঘনিষ্ঠ করে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আপনার মা শুরু থেকেই আমার সাথে ছিল। উনাকে আলাদা করে আর পটাতে হয়নি!”
আলো কিছু না মানুষটার কেটে যাওয়া ঠোঁটের দিকে তাকায়। তারপর আস্তে করে বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে ঠোঁট স্পর্শ করল।

-“ব্যথা?”
-“উঁহু, একটুও না!”
-“তাহলে আরেকবার দেই?”
আধার এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“তুমি এই কামড়াকামড়ি ছাড়া আর কিছু পারো না?”
আলো হেঁসে স্বামীর নাকের সাথে নাক ঘষাঘষি করে বলল,
-“না। আমার সাথে থাকতে হলে কামড় খেতেই হবে, মিস্টার!”
আধার বাঁকা হেঁসে বলল, -“আর আমার কাছে থাকতে হলে, আপনাকে প্রতিদিন কষ্ট সহ্য করতেই হবে, মিসেস খান।”
আলো স্বামীর লাল হয়ে ওঠা ঠোঁটে চুমু খেয়ে, চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,

-“সকল কষ্ট মনজুর! তবুও দিনশেষে এই আপনিটাকেই চাই।”
ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। রহমান পরিবারের সবাই বিদায় নিয়ে বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়েছেন। এখন মৃন্ময় ও মিরা সবার থেকে বিদায় নিল।
-“আই হোপ, অতীত ভুলে নিজের জীবনকে আরেকটা সুযোগ দিবি।”
মিরা গাড়িতে বসেছে আর মৃন্ময় বাইরে দাঁড়িয়ে আধারের সাথে কথা বলছিল৷ বন্ধুর কথা শুনে মৃন্ময় চাবির রিং আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
​-“সিঙ্গেল লাইফ ইজ দ্য বেস্ট লাইফ!”
​আধার দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে কঠোর প্রতিবাদ করল,
​-“ভুল! ম্যারেড লাইফ ইজ দ্য বেস্ট লাইফ।”
-“তোর কপালে ভালো বউ জুটেছে, তাই বেস্ট লাইফ মনে হচ্ছে। নেগেটিভ কেউ জুটলে, বুঝতি বিয়ের আসল মজা!”
-“তুই মুভ অন করবি কিনা সেটা বল?”
-“তোর শ্যামা পাখির মতো কাউকে পেলে ভেবে দেখব।”
আধার কিছু একটা ভেবে আনমনে বলল, -“একজন আছে!”
মৃন্ময় কপাল কুঁচকে জানতে চাইল, -“কে?”
আধার কিছু বলতে যাবে তখনই সেখানে রাত এসে উপস্থিত হয়। ভাইকে দেখে আর কিছু বলল না। রাত মৃন্ময়ের সাথে টুকটাক কথা বলল। একসময় মৃন্ময় ও মিরা তাদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়!

কেটেছে মাসের পর মাস! এই তিনমাসে বদলেছে অনেক কিছুই। আধার আর আলোর সম্পর্ক আগের থেকেও গভীর হয়েছে। মেয়েটা আগের মতো রয়ে গেলেও আধার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। একসময় যেই মানুষটা সামান্য হাসাহাসি করত না, এখন সেই মানুষটাই কথায় কথায় বউয়ের সাথে হাসাহাসি করে। তাদের দুজনের ঝগড়াঝাটি, খুনসুটি পুরো খান বাড়িকে মাতিয়ে রাখে। আধার বাইরের জগতে ভিন্ন হলেও সে তার বউয়ের কাছে সম্পূর্ণ আলাদা এবং একান্তই একজন প্রেমিক পুরুষ। সময়ের সাথে সাথে তার জীবনের কালো অধ্যায়গুলো মুছে যেতে শুরু করেছে। তার অন্ধকার জীবনে এক মুঠো চাঁদের আলোর মতো মেয়েটা এসে আলোকিত করে দিয়েছে। একসময় এলোমেলো জীবনের থেকে পালাতে চেয়েছিল, আর এখন সেই জীবনের মাঝেই বড্ড থাকতে ইচ্ছে করে। অর্ধাঙ্গিনীর হাতে হাত রেখে বাকী পথটা একসঙ্গে পার করতে চায়। নিজের শেষ নিঃশ্বাস অবধি মেয়েটাকে ভালোবেসে যেতে চায়।

ছেলেটার পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে সোবহান খান। উনি তো এতগুলো বছর এই দিনটা দেখার জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। এবং সেটা পূরণও হয়েছে। তিনি সবসময় চেয়ে এসেছেন, তার বড় নাতি ভালো থাকুক, সুখে থাকুক এবং তাকে কেউ একজন খুব করে ভালোবাসুক। নিজের ভালোবাসা দিয়ে ছেলেটার সব কষ্ট দূর করে দিক। উনার চাওয়া ওপরওয়ালা পূরণ করেছেন। এখন তার ছন্নছাড়া নাতিকেও কেউ একজন নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। আর সেই মানুষ হচ্ছে তার নাতবউ! তিনি বেছে বেছে নিজের নাতির জন্য সঠিক মেয়েই খান বাড়ির বড় বউ বানিয়ে নিয়ে এসেছেন।
এত এত সুখের মাঝেও দুঃখ রয়েছে। একমাস আগে তাহমিনা খান বাপের বাড়িতে যাওয়ার সময় এক্সিডেন্ট করেন এবং নিজের এক পা হারিয়ে ফেলেন। ভাগ্য ভালো হওয়ায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন, নয়তো তাহমিনা খানকে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলতেন।

আধার এত মাস পরেও ছোট মায়ের সাথে স্বাভাবিক হয়নি। তবে সে নিজের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছে। উনাকে দেখা শোনা করার জন্য দুজন মানুষও রেখেছে। আলো সেবাযত্ন করতে চাইলে সে কিছু কঠিন বাক্য শুনিয়েছিল মেয়েটাকে। কারণ সে ওইদিনের জঘ’ন্য অপবাদ ভুলে যায়নি। তবুও সে চেষ্টা করেছে বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব পালন করার। খুব দরকার ছাড়া তাহমিনা খানের সাথে কথা বলে না। বর্তমানে পুরো সংসারের দেখাশোনা করে আলো।
রাতের মধ্যেও বেশ ভালোই পরিবর্তন এসেছে। ছেলেটা আজকাল বড় ভাই, দাদাজানের সাথে মসজিদেও যাওয়া শুরু করেছে। যাকে বলে এক কথায় ভদ্রলোক তৈরি হয়েছে। আর এতে আধার ওপরওয়ালার কাছে লাখো শুকরিয়া আদায় করে। অবশেষে তার ছোট ভাইয়ের মাথায় সুবুদ্ধি এসেছে। সে তো কম চেষ্টা করেনি, ভাইকে ভালো পথে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু…ছেলেটার গায়ে বিদেশি হওয়া লেগেছিল। খারাপ কিছু ছেলেদের পালায় পড়ে যবে থেকে নেশা করা শুরু করেছিল, ঠিক তবে থেকেই নষ্ট হয়ে গেছে। তারওপর খোলামেলা পরিবেশে আরো বিগড়ে গেছিল। কিন্তু এখন একটু দেরিতে হলেও নিজেকে শুধরে নিয়েছে। এমনকি তার বউকে ভাবীও বলে ডাকে। তবে তার সামনে বোম্বাই মরিচ ছাড়া ডাকে না। ছেলেটা আজকাল ভীষণ জ্বালায় তাকে।

-“হাই চাশমিস!”
খুব পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে ঈশিতা মাথা তুলে সামনে তাকায়। এবং বলে,
-“বাই পটেটো।”
রাত হাসল। হাতে থাকা কফির মগ বাড়িয়ে দিল। ঈশিতা সেটা নিয়ে ইশারা করে বসতে বলল। রাত সামনের চেয়ারে বসে মেয়েটার ল্যাপটপ নিয়ে দেখল, কি কাজ করছে। যেহেতু সে সিনিয়র আর কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাই নিজেই ফাইলটা রেডি করতে শুরু করল।
ঈশিতা চেয়ারে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে কফির মগে চুমুক দিয়ে সামনে বসা মানুষটার দিকে তাকায়। তারা দুজন এখন খুব ভালো বন্ধু। প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি হলেও ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সে একসময় যাকে চিনত না, জানত না, আর আজ সেই মানুষটাকেই মনের সব কথা বলে। ছেলেটা অন্যের চোখে কেমন তা জানে না, তবে তার চোখে ভীষণ ভালো। একদম অন্যরকম! যাকে সে ঝগড়ার মাঝে থাপ্পড় মা’রলেও কিছু মনে করে না, শুধু সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু…সূর্যের আলো ফুটতে না ফুটতেই তার বাড়ির সামনে বাইক নিয়ে হাজির। সে তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেটার মজা নিত অনেক। একবার তো পানি ফেলে গোসলও করে দিয়েছিল। সে মানুষটাকে এত এত জ্বালায়, অথচ মানুষটা কখনো বিরক্ত হয়নি। বরং তার সবকিছুতে খুশিই হয়।

-“যেদিন স্যারের কাছে ধরা পড়ব, সেদিন আমাদেরকে ঘাড় ধরে বের করে দিবে।”
রাত কাজ করতে করতে কফির মগে চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-“তুমি কি ভয় পাচ্ছো?”
-“ভয় পাওয়াটা কি অস্বাভাবিক কিছু? জব চলে গেলে কি করব আমি?”
-“কেন? বিয়ে করে সংসার করবে।”
বিয়ের কথা শুনে ঈশিতার মুখটা মলিন হয়ে গেল। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
-“সবার কপালে সব কিছু থাকে না, রাত!”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“ছোট বোনকে বিয়ে দিতে হবে, তারপর ভাইটার লেখাপড়া শেষ হলে ও নিজের ক্যারিয়ার গড়লে তারপর নাহয় আমি নিজের জীবনের কথা ভাববো।”
-“ততদিনে বুড়ী হয়ে যাবে তুমি।”
-“সমস্যা নেই। একাই নাহয় জীবনটা পর করে দিবো।”
-“বিয়ের পরেও তো এসব করতে পারো? না মানে, তোমার তো একটা জীবন রয়েছে।”
-“বিয়ের পর যদি স্বামী জব করতে না দেয়? নিজের মা, ভাই-বোনকে দেখা শোনা না করতে দিলে তখন?”
-“সবাই তো আর এক নয়, ঈশু! একবার চেষ্টা করে দেখতে পারো। ইনশাআল্লাহ ভালো কাউকে পাবে।”
ঈশিতা কফি শেষ করে টেবিলের ওপর মগ রেখে বলল,
-“আমার কথা বাদ দাও! এখন বলো তুমি কবে বিয়ে করছো?”
-“আমার অতীত জানলে, বাঙালি মেয়েরা জুতা মে’রে চলে যাবে।”
একথা শুনে ঈশিতা শব্দ করে হেঁসে উঠল। অন্যদিকে, রাতের হাত জোড়া কিবোর্ডের ওপর থেমে গেছে। সে অপলক নয়নে হাসতে থাকা রমণীর পানে তাকিয়ে রইল। এবং বিরবির করে বলল,
-“তোমার হাসি খুব সুন্দর….!”

আলো চকলেট খেতে খেতে বাগানে এল। টুনা-টুনি কচি ঘাস খাচ্ছে আর এদিক-সেদিক লাফালাফি করছে। সোবহান খান দোলায় বসে থেকে চা খাচ্ছেন আর আধার স্যার সুইমিংপুলের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ফোনে কথা বলছে বোনের সাথে। একটু আগেই ভার্সিটি থেকে ফিরেছে লোকটা!
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই আলোর মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। সে তাড়াতাড়ি চকলেট খেয়ে নিয়ে পা থেকে নূপুর জোড়া খুলে ওড়নার আঁচলে বেধে রেখে দিল। সে আগের মতো আর ভুল করতে চায় না। খুবই সাবধানে পা টিপে টিপে এগোতে লাগল। মেয়েটার হাবভাব দেখে সোবহান খান হাসলেন। তবে কিছু বললেন না। কারণ তিনি সবসময় মেয়েটার দলে।

আলো স্বামীর পিছনে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস আঁটকে রাখল। এই বজ্জাত লোকটা গতকাল তাকে বাথটাবের পানিতে ফেলে দিয়েছিল, তাও মাঝরাতে! তাই এখন সেটার প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। সে মনে মনে শয়তানি হাসি দিয়ে ধাক্কা দিতে যাবে, তখনই আধার পিছনে ফিরে মেয়েটার মাথা চেপে ধরে সুইমিংপুলের পানিতে ফেলে দিল।
ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে যায় যে সোবহান খানের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে যায়। তিনি আঁতকে উঠে নীলচে পানির মাঝখানে তাকালেন। বেচারির পানি খেতে খেতে অবস্থা খারাপ। কোনোমতে দেয়াল ধরে ভেসে উঠে হতভম্বের মতো স্বামীর দিকে তাকায়। লোকটা যে এমন কিছু করবে, ভাবতেই পারেনি। সে চোখমুখ মুছে কাশতে কাশতে দাদাজানের দিকে ছলছল চোখে তাকায়। নাকেমুখে পানি ঢুকে চেহারা রক্তিম হয়ে উঠেছে। সোবহান খান তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন।

-“এটা কি করলে তুমি? মেয়েটাকে ফেলে দিলে কেন?”
আধার কল কেটে কপাল কুঁচকে বলল,
-“তোমার নাতবউ যে আমাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন? তুমি তো সবটা দেখেও চুপ করে ছিলে।”
ধরা পড়ে সোবহান খান এদিকওদিক তাকাতে তাকাতে বললেন,
-“তাই বলে অসময়ে মেয়েটাকে পানিতে ফেলে দিবে?”
-“তুমি আমার দাদা নাকি ওর দাদা, হুহ্?”
-“ওর দাদা…ইয়ে না মানে, তোমাদের দুজনেরই।”
আধার শান্ত চোখে দাদাজানের দিকে তাকায়। সোবহান খান চলে যেতে যেতে বললেন,
-“মেয়েটাকে নিয়ে এসো।”
আধার ঘাড় ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তুমি ভালো হবে না, তাই না?”
আলো কিছু না বলে সুইমিংপুল থেকে উঠে এল। তারপর জানতে চাইল,
-“আমি তো নূপুর খুলে রেখেছিলাম, তাহলে আপনি জানলেন কীভাবে?”
আধার এগিয়ে আসতে আসতে স্বাভাবিক গলায় বলল,
-“তোমার শরীরের ঘ্রাণ টের পেয়েছিলাম।”
একথা শুনে আলো নিজের শরীর শুকতে লাগল, কই সে তো কোনো ঘ্রাণ পাচ্ছে না! মেয়েটার কান্ড দেখে আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল,

-“ওটা তুমি অনুভব করতে পারবে না।”
আলো হতাশ হয়। তারপর কিছু একটা খেয়াল করে চিন্তিত মুখে বলল,
-“আমার নূপুর পানির মধ্যে রয়ে গেছে।”
আধার কপাল কুঁচকে এগিয়ে এসে সুইমিংপুলের ভেতর তাকায়। কোথাও নূপুর দেখতে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, তার আগেই আলো ধাক্কা মে’রে পানির মধ্যে ফেলে দিল তাকে। তারপর খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৫

-“নিন, এখন হিসাব বরাবর পঁচা স্যার।”
একথা বলে আলো নিজের জুতা হাতে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল আর আধার খান পানির ভেতর থেকে উঠে চেঁচিয়ে উঠল,
-“তোমাকে আমি দেখে নেবো….শয়তান মেয়েএএএ!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৭