Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫০

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫০

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫০
নুসরাত ফারিয়া

এতগুলো দিনের জমিয়ে রাখা অর্ধাঙ্গিনীর মনের অভিযোগ শুনে আধার এক মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সে জানে, এই মেয়েটা তাকে পাওয়ার জন্য কম কষ্ট সহ্য করেনি। এমনকি সে অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করেছিল। কিন্তু, সেগুলো তো অতীত! সে বর্তমানে এই মেয়েটাকে খুব ভালোবাসে, খুউউব। নিজের অতীতের জন্য শুরুতে বিয়ে, ভালোবাসা কিছুই মেনে নেয়নি। নিজের মনের মধ্যে অনুভূতি তৈরি হলেও সে সেটা মানতে নারাজ ছিল। যার জন্য সে আজও মনে মনে আফসোস করে। প্রথমেই যদি সাহস করে নিজের অবাধ্য অনুভূতিকে মেনে নিয়ে নিজের ভালোবাসা স্বীকার করত, তাহলে হয়তো মেয়েটার কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো।
আধার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অর্ধাঙ্গিনীর পাশে বসে, দেয়ালের মাঝে নজর রেখে শান্ত গলায় বলল,

-“আমি শুধু তোমাকে বাস্তবটা বোঝাতে চেয়েছিলাম। তুমি তোমার ভালোবাসা পাওয়া জন্য অনেক কিছু করেছো, আমি সেটাকে ছোট করছি না! তুমি আমার জীবনে না এলে, আমি কখনোই এই নতুন জীবনটা পেতাম না। আমি সত্যিই তোমার ওপর কৃতজ্ঞ। সবকিছু জেনেশুনেও আমাকে ভালোবেসেছো। আমি তোমাকে শুরুতে অনেক কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য সরি! আমি তো আর আমাদের অতীত বদলাতে পারব না, তবে বর্তমান ও ভবিষ্যতে শুধুই তোমাকে চেয়ে যাবো, ভালোবেসে যাবো।”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,

-“আমি অন্য কারোর জন্য নিজের সংসারে অশান্তি চাই না। তুমি যদি চাও, তোমার বোন নিজের ভালোবাসা ভুলে অন্যকে বিয়ে করে নিক, তাহলে সেটাই হবে৷ আমি তোমাদের মধ্যে আসব না। মৃন্ময় একজনকে অনেক ভালোবেসেছিল, কিন্তু মেয়েটা ওকে ধোঁকা দিয়ে অন্য একজনকে বিয়ে করে নেয়। তারপর থেকে ছেলেটা আমার মতোই ছন্নছাড়া। সাহস করে দ্বিতীয় বারের মতো কাউকে ভালোবাসতে পারেনি৷ বলতে পারো, ওর বিশ্বাস উঠে গেছে। আমি শুধু চেয়েছিলাম, ওর জীবনটাও আমার মতো সুন্দর হোক। ও বলেছিল আমায়, তোমার মতো যদি কাউকে পায় তাহলে, নিজেকে আরেকটা সুযোগ দিবে। সেসময় সর্বপ্রথম তোমার বোনের কথা মনে হয়েছিল। আমি আড়াল থেকে দেখেছি ছায়ার চোখে মৃন্ময়ের প্রতি ভালোবাসা। তোমার পরিবারের সাথে আমার এত মেলামেশা না থাকলেও তোমাদের র ক্তের ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে। যেখানে বড় বোন নিজের ভালোবাসার জন্য এতকিছু করতে পারে, এবং মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে পারে, সেখানে নিশ্চয়ই ছোট বোনের ভালোবাসায় কোনো খাদ থাকবে না। আমি হয়তো স্বার্থপরের মতো কথা বলছি, কিন্তু কি করব বলো? আমি নিরুপায়!”
প্রতিত্তোরে আলো কিছু বলল না, শুধু চুপচাপ শুনে গেল। একটু পর খেয়াল করল তার ওপর থেকে কম্ফোর্টার গায়েব হয়ে গেছে। আর সে স্বামীর কোলের ওপর! আধার মেয়েটার কান্নাভেজা চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে, আলতো হাতে চোখের পানি মুছে দিয়ে, কপালের মাঝে ভালোবাসার পরশ একে দিল।

-“তুমি যেটা চাও, সেটাই হবে। আমি কোনোরকম বাঁধা দিবো না। তবুও তুমি কষ্ট পেও না!”
আলো নাক টেনে মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল, -“আমি কষ্ট পেলে আপনার কি?”
-“বুকের মাঝে বড্ড ব্যথা করে।”
আলো কিছু না বলে সরাসরি মানুষটার দিকে তাকায়। চোখজোড়া ভীষণ লাল হয়ে আছে, সুন্দর মুখখানাও কেমন শুকিয়ে গেছে। আলোর হঠাৎই লোকটার অতীতের কথা মনে পড়ল। সে আবেগের বশে একটু বেশিই বলে ফেলেছে। এখানে তো লোকটার কোনো দোষ নেই। সে তো সবকিছু জেনেশুনেই ভালোবেসেছে, কাছে থেকেছে। কারণ দিনশেষে এই লোকটাই যে ওর শান্তির কারণ ছিল। আর এখন, তার ভালোবাসা স্বার্থক! সে যাকে খুব করে চেয়ে এসেছিল, আজ তাকেই পেয়েছে। হয়তো একটু দেরিতে, কিন্তু শেষটা একটু বেশিই সুন্দর ছিল। আর সেও চায় না, কোনো কারণে তাদের মধ্যে অশান্তি হোক।

আলো তপ্ত শ্বাস ফেলে স্বামীর বুকের মাঝে মাথা রাখল। আহ, শান্তি! এটাই তো তার একমাত্র শান্তির জায়গা। এত এত কষ্ট করার পর যদি এই মূহুর্তটা পেতে হয়, তাহলে সে নির্দ্বিধায় আবারো একই আগুনের মধ্যে ঝাপ দিবে। নিজের মনকে এটা বলে সান্ত্বনা দিতে পারবে, অবশেষে সে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়েছে। যে কি-না তাকেও পাগলের মতো ভালোবাসে। দিনশেষে মেয়েরা একটু যত্ন, একটু বিশ্বাস ও একটু ভালোবাসার কাছে গলে যায়। যেমনটা সে নিজের প্রিয় পুরুষকে পেয়ে অতীতের সব কষ্ট ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু আজ না চাইতেও সব কথা বেরিয়ে এসেছে।
আধার স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বাহুডোরে প্রিয়তমাকে শক্ত করে আগলে নিল। পুরো চেহারায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বলল, -“অতীতের কষ্ট মুছতে পারব না, তবে এখন তোমাকে কোনো কষ্ট ছুঁতে পারবে না। অন্তত আমার পক্ষ থেকে না-ই তো!”

-“আমিও এখন থেকে নিজের আবেগ কে কন্ট্রোল করব। যাতে দ্বিতীয় বার আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে অতীতের কোনো কথা না আসে।”
আধার মুচকি হেঁসে অর্ধাঙ্গিনীকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“মাঝেমধ্যে ঝামেলা হলে মন্দ হয় না!”
-“ঠিকই বলেছেন, নেক্সট টাইম ঝামেলা করে বাপের বাড়িতে চলে যাবো। তখন আপনি থাইকেন ঝামেলার সাথে।”
-“নো প্রবলেম জান। এই আধার খানও তার শ্যামা পাখির পাখা ধরে, উড়ে উড়ে শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে।”
-“আচ্ছা, আপনি আমাকে শ্যামা পাখি বলেন কেন?”
-“কারণ…তুমি সারাক্ষণ কিচিরমিচির করো এবং শ্যামা পাখির মতো মিষ্টি কন্ঠস্বরে গান গাও৷ যেটা শোনা মাত্রই ড্রাগের মতো নেশা ধরে যায়!”
-“কিন্তু…আপনি তো আগে এই গান গাওয়া নিয়ে ভার্সিটিতে বকাবকি করতেন। একবার তো গিটারও ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।”

-“তোমাকে দেখে কিছু না হলেও, তোমার কণ্ঠস্বর, হাসি, পাগলামি, মনের মধ্যে অদ্ভুত অনূভুতি জাগিয়ে তোলে। আমি যেদিন তোমার গান শুনতাম, সেদিন রাতে ঘুমাতে পারতাম না। বারবার কানের কাছে তোমার কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়াত। এইজন্যই পছন্দ করতাম না তোমার গান গাওয়া।”
আলো সোজা হয়ে দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
-“আরো অনেক মেয়েই তো গাইত, ওদের বেলাতেও আপনার এমন ফিল হতো?”
আধার চোখমুখ কুঁচকে বলল, -“হোয়াট ননসেন্স! আমি তুমি ব্যতীত অন্য মেয়েদের গান শুনিনি। প্রয়োজনে কানে হেডফোন গুঁজে রাখতাম।”
আলো সরু চোখে তাকিয়ে শুধাল, -“তারমানে আপনি আমাকে আগে থেকেই পছন্দ করতেন?”
-“মোটেও না, তুমি আমার ভীষণ অপ্রিয় ছিলে।”
-“আর এখন?”
-“এখন আমার পুরো জীবনটাই তুমি।”
আলো হেঁসে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, -“আর আপনি আমার অক্সিজেন!”

বিকেলের দিকে ছোট বোন ও টুনা-টুনিকে নিয়ে বাগানে বসে আছে আলো। ছায়া আজকের রাতটা এখানে থাকবে এবং পরেরদিন ফিরে যাবে। মেয়েটাও খরগোশের মতো পাশে বসে থেকে গাজর চিবোচ্ছে। তিনজনকে দেখে একই দলের বললে ভুল হবে না৷ তাদের থেকে দূরে, দাদা-নাতি বসে থেকে গল্প করছে ও চা খাচ্ছে। মানুষটা কথা বলার ফাঁকেফাঁকে তার দিকে তাকাতেও ভুলছে না। আলো এসব দেখে আনমনে হেঁসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল,
-“তুই যথেষ্ট বড় হয়েছিস, আর নিজের ভালোমন্দও বোঝার জ্ঞান রয়েছে। তাই আমি সবকিছু তোর ওপর ছেড়ে দিলাম। আমি কখনোই নিজের সিদ্ধান্ত তোর ওপর চাপানোর চেষ্টা করব না। কারণ দিনশেষে আমার বোনের সুখেই আমার সুখ!”
ছায়া বড় বোনের পাশে বসে থেকে দোল খাচ্ছিল আর গাজর চিবোচ্ছিল, তখন কথাগুলো শুনে কপাল কুঁচকে গেল। জানতে চাইল, -“কোন বিষয়ে বলছো?”

-“তোর বিয়ের ব্যাপারে। আমার জন্য হুট করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। সময় নে এবং লেখাপড়া শেষ কর। তারপর যেটা ভালো হয় সেটাই কর। আমি তোর পাশে আছি সবসময়। আর এ বিষয়ে বাবাকে কিছু বলার দরকার নেই। মন দিয়ে শুধু লেখাপড়া করে যা আর নিজের প্রতি যত্ন নে। তোর ভাগ্যে যেটা রয়েছে, ওটাই হবে। আর সবকিছু ওপরওয়ালার ওপর ছেড়ে দে। আশা করছি, উনি তোকে নিরাশ করবেন না। যা করবে ভালোর জন্যই! আর তুই চাইলে ইভেন্টে যেতে পারিস। আমার এতে কোনো আপত্তি নেই। আসলে একটা বাজে স্বপ্ন দেখে একটু বেশিই রিয়াক্ট করে ফেলেছিলাম। তারজন্য তখন মানা করেছি। কিন্তু, এখন বলব, তুই তোর মতো করে জীবনটাকে উপভোগ কর! আর পারলে নিজের মনের কথাগুলো বলে দেওয়ার চেষ্টা করিস। নয়তো সারাজীবন অনুভূতি না প্রকাশ করার জন্য আক্ষেপ থাকবে। এরপর যা হবে সেটা নাহয় দেখা যাবে, তবুও মনে মনে একটু হলেও স্বস্তি পাবি। নয়তো প্রতিনিয়ত গুমরে গুমরে ম’রবি। অবাধ্য ভালোবাসাই যে এমন…!”
ছায়া কথাগুলো শুনে ভাবুক হয়ে পড়ল। সে চায় তার গায়ক সাহেবকে, খুব করে চায়। কিন্তু, এই চাওয়া যে ওর সাধ্যের বাইরে। এখন কি করবে ও? কি করা উচিত?
আলো চায়ের কাপে শেষ বারের মতো চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্য ছিল একটা গোলাপ ছিঁড়ার। কিন্তু সামনে পা বাড়াতেই হঠাৎ মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। তড়িঘড়ি করে একহাতে মাথা চেপে ধরে দোলনায় বসল। আজকাল শরীরটা অদ্ভুত লাগছে। সাথে মন-মেজাজও!

-“তুমি ঠিক আছো?”
মেয়েটাকে মাথা ধরে বসতে দেখে আধার তড়িঘড়ি করে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করল। ওর পিছু পিছু সোবহান খানও এসে জানতে চাইলেন,
-“কোনো সমস্যা হচ্ছে?”
পাশ থেকে ছায়া বড় আপুর হাত ধরে বলল,
-“তুমি ঠিক আছো, আপু?”
আলো নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আস্তে করে বলল,
-“আমি ঠিক আছি, শুধু একটু মাথা ব্যথা করছে।”
সোবহান খান নাতির উদ্দেশ্য বললেন, -“মেয়েটাকে ঘরে নিয়ে যাও! একটু আরাম করুক।”
উনার বলতে দেরি হলেও নিজের বউকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে ভেতরের দিকে যেতে একটুও দেরি হলো না আধারের। এই দৃশ্যটা দেখে ছায়া হেঁসে বলল,

-“ভাইয়া আপুকে অনেক ভালোবাসে, তাই না দাদু?”
সোবহান খান আরেক নাতনির পাশে বসতে বসতে বললেন,
-“উঁহু, তোমার আপু আমার ত্যাড়া নাতিকে খুউউব ভালোবাসে।”
ছায়া আবারো হাসল৷ প্রতিত্তোরে বলল, -“তারা দু’জন দু’জনকেই অসীম ভালোবাসে দাদু। আর এই ভালোবাসায় যেন কারোর নজর না লাগে। তারা দুজন সারাজীবন একে অপরের পাশে এমন করেই থেকে যাক। নিজের ভালোবাসার মানুষটার সাথে সংসার করার সৌভাগ্য আর কতজন মেয়ের হয়? সবাই যদি পূর্ণতা পেত, তাহলে হয়তো আর জীবনে কোনো আফসোস বলে কিছু থাকত না। তবে, এত অপূর্ণতার মাঝেও এমন পূর্ণতা দেখতে ভালোই লাগে।”
সোবহান খান মাথা নাড়িয়ে বললেন, -“ভালোবাসা সুন্দর।”
-“উঁহু, ভয়ংকর সুন্দর…!”

রাত ওইদিনের পর আর অফিসে যায়নি। বরং দেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে একটা কোম্পানিতে কাজের অফার পেয়েছে, আর সে ওখানেই যাচ্ছে। পরিবারের সবার সাথে এই বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়ে গেছে। আধার প্রথমে আপত্তি জানায়, কারণ সে ভাবছে তার ছোট ভাই দেশের বাইরে গেলে আবারো বিগড়ে যাবে। কিন্তু রাত কথা দিয়েছে সে আর এসবের মধ্যে নিজেকে জড়াবে না। একবার যেই পথ থেকে ফিরে এসেছে, ওই পথে চলার কোনো প্রশ্নই ওঠে না৷ আধার শেষ বারের মতো ছোট ভাইকে বিশ্বাস করেছে। দেখা যাক, রাত কতটুকু ওর কথা রাখতে পারে।
তাহমিনা খান আজকাল নিজের ঘর থেকে আর বের হোন না। বলতে গেলে, নিজের এক পা হারিয়ে বিছানায় পড়ে থেকে অনুশোচনায় ভোগেন। উনাকে দেখার জন্য আলাদা করে দুজন মহিলা থাকলেও আলো মাঝেমধ্যে এসে শ্বাশুড়ি মায়ের সেবা করে যায়। হাজার হোক, শ্বাশুড়ি বলে কথা! সে তো আর ফেলে দিতে পারবে না। আর না উনার মতো বাজে ব্যবহার করতে পারবে। তিথি এসে সারাদিন থেকে রাতের বেলা চলে গিয়েছে চট্টগ্রামে। তাকে তিহান নিতে এসেছিল! মেয়েটা এখন আর হোস্টেলে থাকে না, বরং শ্বশুর বাড়িতে থাকে। এবং ওখানে সুখেই আছে।

-“কোথায় যাচ্ছো?”
ডিনার শেষে, ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে দেখে—আলো বড় পুতুলটা বগলদাবা করে, খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে বাইরে যাচ্ছে। তখন আধার উপরোক্ত প্রশ্নটি করে। আলো থেমে গিয়ে পাশে তাকিয়ে বলল,
-“ছায়ার কাছে।”
-“কেন?”
-“নাচতে।”
জবাব শুনে আধার বিরক্ত হয়৷ গমগমে গলায় আওরাল,
-“যা করার এখানেই করো, অন্য কোথাও যেতে হবে না।”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিরবির করে বলল, -“এখন যদি গরম গরম রসগোল্লা বানিয়ে খাওয়ান, তাহলে যাবো না কোথাও।”
-“অপেক্ষা করো, বানিয়ে আনছি।”
একথা বলে আধার রুম থেকে চলে গেল আর আলো গিয়ে সোফায় বসল।
প্রায় অনেক্ক্ষণ পর আধার বউয়ের জন্য রসগোল্লা বানিয়ে নিয়ে এল। এতে আলো মূহুর্তেই খুশি হয়ে যায়। সে একটা মিষ্টি নিয়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে বলল, -“খাবেন?”
-“উঁহু, তুমি খাও!”
আলো আর কিছু না বলে খেতে শুরু করল। পাঁচটার মতো মিষ্টি খেয়ে বাদবাকি রেখে থম মে’রে বসে থাকল। তাকে এইভাবে বসে থাকতে দেখে আধারের কপাল কুঁচকে গেল। কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, -“কি হলো? মিষ্টি ভালো হয়নি?”

আলো কিছু না বলে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। তখনই ঘটিয়ে ফেলল এক অঘটন! স্বামীর গায়ের ওপরই বমি করে দিল। আধার চমকে মেয়েটার দুগালে হাত রেখে অস্থির গলায় শুধাল, -“তুমি ঠিক আছো? শরীর খারাপ লাগছে?”
আলো স্বামীর নোংরা টিশার্টের দিকে তাকিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলল, -“সরি, আমি ইচ্ছে করে এমনটা করতে চাইনি।”
-“হুঁশশশ…ডোন্ট সরি। আমার এতে কোনো যায় আসে না।”
একথা বলে মেয়েটাকে নিয়ে সে ওয়াশরুমে চলে গেল। আলো চোখেমুখে পানি দিয়ে বিরবির করে বলল, -“আজ থেকে আমার মিষ্টি খাওয়া বন্ধ, আমি চাইলেও আর এনে দিবেন না।”
আধার টিশার্ট খুলতে খুলতে জবাব দিল, -“মিষ্টির দোষ না, সব দোষ তোমার আর দাদাজানের। আরো বেশি বেশি করে খাও বাহিরের জিনিস। তারপর পেট খারাপ করে নিয়ে বসে থাকো!”
-“বললেই হলো? সব দোষ আপনার মিষ্টির।”
আধার হতাশ কণ্ঠে বলল, -“ঠিক আছে ম্যাডাম, মানলাম সব দোষ আমার মিষ্টির। এখন চলুন, আরাম করবেন!”
আলো কিছু না বলে স্বামীর সাথে বাইরে এল। তারপর বিছানায় শুয়ে বুকের মাঝে মাথা রেখে শান্ত গলায় বলল,
-“কিছুদিনের জন্য বাবার বাড়িতে যেতে চাই।”
-“সুস্থ হয়ে নাও, তারপর।”
-“ঠিক আছে।”

তখন বাজে রাত দুইটা। এসময়ে সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন থাকলেও ছায়ার চোখে ঘুম নেই। আজ যেন মেয়েটার সব ঘুম হারিয়ে গিয়েছে। সে তো নির্জন বারান্দায় এসে একা দাঁড়িয়ে থেকে আকাশের চাঁদ দেখছে। হালকা বাতাসে উড়ছে খোলা চুল! মেয়েটাকে একটু অগোছালো লাগছে। হয়তো কিছু একটা নিয়ে ভাবছে। একসময় সকল পিনপতন নীরবতা ভেঙে রমণী উদাস মনে বলে উঠল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৯

❝আপনাকে পাবো না জেনেও ভালো বাসলাম। আপনি ঠিক ওই নীল আকাশের চাঁদের মতো। যাকে শুধু দেখা যায়, ছোঁয়া নয়। আপনিও ঠিক তেমনই আমার সাধ্যের বাইরে…গায়ক সাহেব! যাকে ছায়া কোনোদিনও নিজের করে পাবে না৷ হয়তো আমাদের এটাই ভবিতব্য।❞

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here