এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৭
নুসরাত ফারিয়া
আজ ভার্সিটিতে যায়নি আলো। যায়নি বললে ভুল হবে, সে যেতে পারেনি। শরীরের ব্যথা, পায়ের ব্যথা নিয়ে সারাটাদিন বিছানায় শুয়ে-বসে কাটিয়েছে। দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে পড়ে যাওয়া তো আর মুখের কথা না। নাজুক শরীরে ভালো মতোই ব্যথা পেয়েছে। ফোনে নিজের পরিবারের সাথে কথা বলে নিয়েছে। তবে তাদের কিছু জানায়নি এই দূর্ঘটনার ব্যাপারে। শুধু শুধু চিন্তা দিয়ে কী লাভ? যা হবার তা হয়ে গেছে। দাদাজান ও শেফালি চাচি একটু পরপরই এসে দেখা করে যাচ্ছে। তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি-না বা কোনোকিছুর প্রয়োজন কি-না সবকিছুতে খেয়াল রাখছে। সোবহান খান দুপুর বেলা খাবার নিয়ে এসে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে মেয়েটাকে। নাতবউ হবার আগে মেয়েটা তার নাতনির জায়গা দখল করে নেয়। তাই তো এত ভালোবাসেন এবং কাঠখড় পুড়িয়ে নাতির বউ করে সারাজীবনের জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। এতকিছুর পরও তাহমিনা খান অসুস্থ মেয়েটার কাছে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি, আর না নিয়েছে কোনো খোঁজখবর! কারণ তিনি ভীষণ রেগে আছেন আলোর ওপর। মেয়েটার কতবড় সাহস! তার ভাগ্নিকে চড় মা’রে। ওই মেয়েটার জন্যই তো অত রাতে জ্যোতিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে৷ তিনি এত সহজে ভুলে যাবেন কীভাবে হুহ্? মনে মনে সমস্ত রাগ-ক্ষোভ আপাতত পুষে রেখেছেন। সময় মতো সবকিছুর হিসেব নিবেন।
তখন সময়টা সন্ধ্যা বেলা। আলো রুমে বিছানার মাঝে উবুড় হয়ে শুয়ে আছে৷ পাশের টি-টেবিলের ওপর রাখা গরম তেলের ছোট্ট বাটি। বিকেল থেকে পিঠ টনটন করে ব্যথা করছে। তাই সে শেফালি চাচির থেকে পিঠে তেল মালিশ করে নিবে। মানুষটা তেল রেখে বাহিরে গেছে তো গেছেই, আসার কোনো নামগন্ধ নেই। ওইদিকে তেলটাও ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আলো বিরক্তিকর মুখে বালিশে মুখ গুঁজে রইল। তখন পদাঘাতের মৃদু শব্দ পেয়ে বলল,
-“উমমম….চাচি! এতক্ষণ কোথায় ছিলেন বলুন তো? তাড়াতাড়ি পিঠে তেল মালিশ করে দিন। ব্যথায় মনে হচ্ছে পিঠ খুলে রেখে দিই। ওই শাঁকচুন্নির কতবড় সাহস, আলো রহমানকে ফেলে দেয়! এখানে এসে যদি ওই মেয়েটাকে হাতের কাছে পেতাম, তাহলে ওরে ছাঁদ থেকে টুপ করে ফেলে দিতাম। তাহলে হিসাব বরাবর হত। বাট আফসোস! আমার প্রতিশোধ নেওয়া হলো না। স্যারের কপালে ওই শাঁকচুন্নি জুটলেই বেশ ভালো হত। উনি আমার মতো ভালো মেয়েকে ডিজার্ভ করে না। একটা জলজ্যান্ত শাঁকচুন্নির পাল্লায় পড়লে উনার ইগো-টিগো বেরিয়ে যেত। তখন বুঝত বউ পালা কত কষ্টের হুহ্!”
আলো নিজ মনে বকবক করে থামলো। কিন্তু প্রতিত্তোরে কিছুই শুনতে পেল না। তাই সে পুনরায় বলল,
-“চাচি আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? জলদি মালিশ করে দিন। নয়তো তেল ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
বলতে বলতে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায় এবং মূহুর্তেই শান্ত চোখজোড়া বড়বড় হয়ে গেল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে আধার স্যার দাঁড়িয়ে থেকে হাতঘড়ি, টাই খুলছে। আলো চট করে নজর সরিয়ে নিলো। এই খচ্চর ব্যাটা আবার কখন এল? তারমানে এতক্ষণ যাকে শেফালি চাচি ভেবে কথাগুলো বলছিল, সেটা এই লোকটা! ধুর, ধুর! সে সবসময় ভুল জায়গায় সত্য কথাগুলো বলে দেয়।
আধার শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে স্বাভাবিক গলায় বলল, -“আমার ওয়াইফ হওয়ার যোগত্যা তুমিও রাখো না!”
-“আপনিও আমার হাসব্যান্ড হওয়ার যোগ্য না।”
-“তাহলে আমার সাথে রয়েছো কেন?”
-“আপনি কেন আমার সাথে আছেন?”
-“বাধ্য হয়ে।”
-“আমিও!”
মেয়েটার ত্যাড়ামি দেখে চোখমুখ কুঁচকে ফেললো আধার। কিছু না বলে বড় বড় পায়ে ওয়াশরুমের ভেতর চলে গেল। এই বাঁচাল মেয়েটার সাথে কথা বলা মানে, হাতিকে পোশাক পরানোর ব্যাপার-টা একই!
-“এ্যাই মেয়ে? উঠছো কেন?”
আধার শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসে দেখে আলো বিছানায় থেকে নামার চেষ্টা করছে। কিন্তু পা নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। এটার জন্য নিজের ক্ষত পা-কেই বকাবকি করছে মেয়েটা। তখন সে বিরক্তিকর কণ্ঠে উপরোক্ত বাক্যটি বলে।
-“শেফালি চাচিকে ডাকতে।”
আধার বিনিময়ে কিছু না বলে হাতে থাকা তোয়ালে সোফার ওপর রেখে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। রান্নাঘরে এসে দেখে শেফালি চাচি একগুচ্ছ ছোট মাছ কাটাকাটি করতে ব্যস্ত। মাছগুলো তার দাদাজানের ও ছোটমার ভীষণ প্রিয়। তবে সে এইগুলোর ধারেকাছেও নেই। এতগুলো মাছ কাটতে দেখে আধারের বোঝা হয়ে গেল, এত তাড়াতাড়ি মাছ কাটা শেষ হবে না। তাই সে পুনরায় রুমে গিয়ে আলোর উদ্দেশ্যে বলল,
-“চাচি মাছ কাটতে ব্যস্ত!”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বলল, -“তাহলে আপনি আমার পিঠে তেল মালিশ করে দিন।”
-“হোয়াটটটটট!”
মেয়েটার কথা শুনে আধার আশ্চর্য হয়ে গেল। আলো বিরক্তিতে বলল, -“এতে ষাঁড়ের মতো চেঁচানোর কী হলো আজিব। আজকে আমার এই অবস্থার জন্য শুধুমাত্র আপনি দায়ী। আপনার কারণেই ওই পাঁজি মেয়েটা আমাকে হার্ট করেছে। এখন আমার সেবাযত্ন করতে না পারলে আমাকে বাপের বাড়িতে দিয়ে আসুন। তবুও এইভাবে ব্যথা সহ্য করে পড়ে থাকতে পারব না। আমিও মানুষ, আপনার মতো কোনো এলিয়েন নই!”
আধার ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবলো। ইচ্ছে তো করছে এই মেয়েটাকে তার বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু বিষয়টা খুবই বাজে দেখাবে! তারওপর দাদাজান তো আছেই। উনি যদি একবার জানতে পারে, তাহলে তার কান ঝালাপালা করে দিবে। আর সে মোটেও অশান্তি চায় না। কিন্তু এখন অশান্তি নামক বড় কারণটাই ঘাড়ে এসে জুটেছে। যাকে সে চাইলেও সরাতে পারছে না। তার এলোমেলো জীবনটা আরো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আধার ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, -“ওকে ফাইন!”
স্যারের কথা শুনে আলো ভরকে গেল। এখন সত্যি সত্যিই তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে নাকি? সে তো ভাব নেওয়ার জন্য বলেছিল। এই অবস্থায় বাড়িতে গেলে ব্যাপারটা মোটেও ভালো দেখাবে না। তাই সে কিছু বলতে যাবে তখনই খেয়াল করল আধার স্যার তেলের বাটি-টা নিয়ে তার পাশে বসেছে। এটা দেখে আড়ালে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে উবুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।
এইদিকে আধার থমথমে মুখে মেয়েটার পিঠ থেকে টি-শার্ট উপরে তুলে দেয়। সে জীবনেও এই মেয়েটার মতো নির্লজ্জ আর দুটো মেয়ে দেখেনি! আধার একপলক সাদা ধবধবে মসৃণ উন্মুক্ত পিঠের দিকে তাকিয়ে নজর সরিয়ে নিলো। তারপর কিছু একটা ভেবে উঠে গিয়ে আলমারি খুলে দুটো গ্লাভস বের করে হাতে পড়ে নিলো। এই মেয়েটা বেহায়া হলেও তো আর সে নয়!
কিছুসময় পর নিজের পিঠের মাঝে দুটো হাতের স্পর্শ পেয়ে আলো মাথা তুলে ঘাড় ঘুরিয়ে স্যারের হাতের দিকে তাকায়।কালো গ্লাভস পড়তে দেখে আলো বেকুব বনে গেল। তার শরীর কি নোংরা? যে স্পর্শ করতে গ্লাভস পড়তে হচ্ছে? আলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বালিশে মুখ ডুবিয়ে দিল। তার কেন জানি মালিশটা নিতে ভালো লাগছে।
অন্যদিকে, আধার ঠোঁট কামড়ে আলতো হাতে মেয়েটার পিঠে ও বাঁকানো কোমরে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। তবে তার চোখজোড়া বন্ধ! তবুও সে মেয়েটাকে অনুভব করতে পারছে। হঠাৎই মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। আধার মনে মনে শয়তানি হেঁসে হাতের শক্তি দিগুণ করতেই আলো হকচকিয়ে উঠলো!
-“আয়ায়া….স্যার লাগছে তো! আপনাকে মালিশ করতে বলেছি, পিঠের হাড্ডি ভাঙ্গতে নয়য়য়য়।”
আধার ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তবে আর কিছু করল না৷ ওইদিকে আলো দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বিরবির করে বলল, -“একদিন আমারো সুযোগ আসবে স্যার! তখন আপনাকে যদি নাকানিচুবানি না খাওয়াতে পেরেছি, তাহলে আমিও আলো নই।”
এক সপ্তাহ পর ভার্সিটিতে এসেছে আলো। সামনে আবার প্রথম ইনকোর্স পরীক্ষা রয়েছে। এ্যাসাইমেন্ট, প্রেজেন্টেশন কমপ্লিট করতে করতে তার জীবনটা শেষ। তারওপর যদি থাকে স্বামীনামক হিটলার স্যার, তাহলে তো রিল্যাক্স হয়ে থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আলো ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে অর্ধেক খেল। প্রথম ক্লাস শেষ হয়ে গেছে, এখন ফিজিক্স ক্লাস হবে, তাই সবাই বসে থেকে অপেক্ষা করছে স্যারের জন্য।
বেশি পানি খাওয়ার ফলে ওয়াশরুম পেল। আলো বান্ধবীদের বলে পানির বোতলসহ বাহিরে যেতে লাগল। ফেরার সময় নাহয় বোতল ভরতি করে নিয়ে আসবে। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় ফোনটা বেজে উঠলো। আলো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখে ছায়া কল দিয়েছে। সে কলটা রিসিভ করে কানে গুঁজে বোনের সাথে কথা বলতে লাগল। কথা বলার একফাঁকে বাম হাতটা রেলিংয়ে ওপর রেখে ভুলবশত কাত করে। ফলস্বরূপ বোতলের অর্ধেক পানি নিচে পড়ে যায়।
আলো হেঁসে হেঁসে কথা বলতে বলতে বোতলে চুমুক দিল। কিন্তু একি? পানি কোথায়? সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখে বোতল একদম ফাঁকা। চট করে রেলিংয়ের নিচের সিঁড়িতে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে যায়। সাথে মুখও অটোমেটিক হা হয়ে গেল। আধার স্যার ভেজা মাথা, চেহারা নিয়ে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। আলো নিচে নামার আর সাহস পেল না। সে ভয়ে উল্টো ঘুরে এক ছুটে ওখান থেকে পালিয়ে গেল। সব আকাম-কুকাম এই লোকটার সাথেই কেন হতে হয়?
-“কিরে এমন করে হাঁপাচ্ছিস কেন? কোনো সমস্যা?”
তামান্নার কথা শুনে আলো জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বিরবির করে বলল, -“আমার দ্বারা কখনো ভালো কাজ হয় না। সবসময় ভুল জায়গায় উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে থাকি।”
ফারাহ্ কপাল কুঁচকে জানতে চাইল, -“আবার কি করেছিস?”
-“আমি কিছু করিনি। যা করেছে এই শয়তান বোতলটা।”
বলেই আলো জানালা দিয়ে ছুঁড়ে মা’রলো বোতলটি। সঙ্গে সঙ্গে নিচ থেকে একটা ছেলের চিৎকার, চেঁচামেচির শব্দ ভেসে এল। আলোসহ বাকীরা সবাই থতমত খেয়ে যায়। শালুক তড়িঘড়ি করে জানালার কাছে গিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখে একজন সিনিয়র ভাই আলোর বোতল হাতে নিয়ে অন্য হাতে নিজের কপাল চেপে ধরে আছে। শালুক ভয়ার্ত কণ্ঠে বিরবির করে বলে উঠলো,
-“আলো তুই আজ শেষ!”
ক্লাসরুমের লাস্ট বেঞ্চে ঘাপটি মে’রে বসে আছে আলো। ভয়ে রীতিমতো হাতপা জমে যাচ্ছে। সে আজ ভুলবশত যার কপাল ফা’টিয়েছে সেই ছেলেটা এক নাম্বারের শয়তান। বড়লোক বাপের বিগড়ে যাওয়া ছেলে। মেয়েদের সম্মান দেওয়া তো দূরে থাক, সুযোগ পেলে অসভ্যতামিও করতে ছাড়ে না। ভার্সিটির অনেক মেয়েই ভয় পায় ওই ছেলেটাকে।এমনিতেই ওই ছেলেটার সাথে তার সম্পর্ক ভালো না! ভার্সিটির প্রথম দিনেই বড়সড় একটা ঝামেলা করেছিল সে। রাগে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে সবার সামনে থাপ্পড় মে’রেছিল ওই ছেলেটাকে। কারণ ওই ছেলেটা নিজের দলবল নিয়ে র্যাগিং করার নামে তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। তারপর থেকেই ওই ছেলেটার দুচোখের বিষ সে। সুযোগ পেলেই তাদের সাথে লাগার চেষ্টা করে। আর আজ সে অজান্তেই ছেলেটাকে সুযোগ করে দিল ঝামেলা করার জন্য। সবচেয়ে বেশি এখন নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। তখন কেন যে বোতলটা ছুঁড়তে গিয়েছিল….
-“আমরা কী ভেতরে আসতে পারি স্যার?”
আধার ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে লেকচার দিচ্ছিল আর টুকটাক প্রশ্ন করছিল সবাইকে। তখন দরজা থেকে ভেসে আসা বাক্যটি শুনে চশমা ঠিক করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। চার-পাঁচজন সিনিয়র ছেলেপুলে দাঁড়িয়ে আছে। সে সবাইকে চেনে। তাই গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“ক্লাস চলাকালীন নো ডিস্টার্ব! পরে এসো।”
সুজন পুনরায় বলল, -“আপনার স্টুডেন্টের মধ্যে একজনের এই পানির পট ভুলবশত নিচে পড়ে গিয়েছিল। তাই দিতে এসেছি।”
আধার কপাল কুঁচকে বোতলটার দিকে তাকায়। বেগুনি রঙা বোতলটার গায়ে পান্ডার স্টিকার দেখে একটুও চিনতে অসুবিধা হলো না, এটার আসল মালিক কে! সে ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকায়। আলো নিজেকে আড়াল করে রেখেছে বান্ধবীর পিছনে। কারণ সে কোনোরকম ঝামেলা চায় না। আধার নজর সরিয়ে সুজনের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। ছেলেটার কপালে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগানো রয়েছে। সে ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভেবে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
-“এই বোতলটা কি তোমাদের মধ্যে কারোর?”
সঙ্গে সঙ্গে সবাই না বলে। আধার সুজনের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, -“তোমার কোথাও একটা ভুল হয়েছে। এটা এখানকার কারোর নয়! হতে পারে অন্য ডিপার্টমেন্টের কারোর। এটা আপাতত আমার কাছে থাক, আমি খোঁজ নিয়ে আসল মালিকের কাছে পৌঁছে দিবো৷ তোমরা এখন আসতে পারো!”
কথাগুলো বলে আধার এগিয়ে এসে সুজনের হাত থেকে বোতলটা নিয়ে নিলো। ছেলেগুলো কিছু বলতে চেয়েও স্যারের গম্ভীর চেহারা দেখে বলতে পারল না। কারণ তারা কমবেশি সবাই জানে এই লোকটা কেমন! তাই কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চলে গেল। এই বিষয়টা না-হয় পরে দেখা যাবে। তাদেরকে যেতে দেখে আলোর বন্ধুমহলের সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। ফারাহ্ ফিসফিসিয়ে বলল,
-“স্যারের জন্য বেঁচে গেলি!”
আলো মুখ গোমড়া করে মনে মনে বিরবির করল,
-“ওই লোকটার জন্যই এমনটা হয়েছে!”
ক্লাস শেষে আধার বেরিয়ে গেল। নিজের অফিস-রুমে ঢোকার সময় ডাস্টবিনে বোতলটা ছুঁড়ে ফেলতেও ভুললো না!
ভার্সিটি শেষে বাড়িতে এসে গোসল নিয়ে খাওয়াদাওয়া করে, দাদাজানের সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলে ভাতঘুম দিয়েছে আলো। ঘুম ভাঙলো সন্ধ্যার দিকে। আড়মোড়া ভেঙে হামি তুলে উঠে বসে বাম পাশে তাকাতেই দেখতে পেল—আধার স্যার সোফায় বসে থেকে ল্যাপটপে কাজ করছে। পরণে টি-শার্ট ও ট্রাউজার, ঘন বড় বড় চুলগুলো ভেজা, চোখে রিডিং গ্লাস, চিকন রক্তিম নিচের ঠোঁট কামড়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে স্ক্রিনে! শ্যাম বর্ণের সুন্দর মুখশ্রীর দিকে না চাইতেও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মেয়েটা। আজকাল ঘুম থেকে উঠার পরপরই এই মানুষটার মুখখানা দর্শন হয়। মাঝেমধ্যে তো সকাল সকাল আপত্তিকর পরিস্থিতিতেও পড়ে যায়। এইতো আজ সকালের ঘটনা! ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর নিজেকে আবিষ্কার করে মানুষটার নগ্ন বুকের মাঝে। লোকটা তখন গভীর ঘুমে মগ্ন ছিল, অথচ তার ঘুম মূহুর্তেই উড়ে যায়। সে লজ্জায় লাল, নীল, সবুজ হয়ে চট করে সরে আসে৷ মানুষটা তো আর এমনি এমনি বলে না, তার ঘুমানোর কোনো ছিঁড়ি নেই।
আলো এসব ভেবে আনমনে হাসলো। সে সজ্ঞানে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখলেও ঘুমের ঘোরে মানুষটার কাছে চলে যায়। এতে তারই বা দোষ কোথায়? ওইদিকে সোফায় শুয়েও শান্তি নেই। ধপ, ধপ করে উল্টে পড়ে যায়। তাই তো একপ্রকার বাধ্য হয়েই বিছানাতে থাকে। এতে ঘুমটাও ভালো হয়! আর এই বিছানাটা একটু বেশিই নরম। তাই সে সবকিছু জেনেশুনেও মটকা মে’রে পড়ে থাকে। কারণ দিনশেষে নিজের সুখ, শান্তিই আগে!
আলো এসব ভাবতে ভাবতে অন্যমনষ্ক হয়ে বিছানা থেকে নামতে যাবে, তখনই প্লাজুর সাথে পা আঁটকে ধপাস করে কম্ফোর্টারসহ পড়ে গেল নিচে।
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৬
-“শালার সব অঘটন আজ আমার সাথেই হ!”
আধার একপলক তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিয়েছে। আলো বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে বিরবির করে কম্ফোর্টার সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। খোলা চুলগুলো হাত খোপা করে ওয়াশরুমের দিকে যেতেই পিছন থেকে শুনতে পেল, ভারী পুরুষালী কণ্ঠে বলা কিছু বাক্য—
-“নিজের হাত-পা কন্ট্রোল করতে শিখুন মিস. কালো! সবাই আধার খান নয় যে আপনাকে ছেড়ে দিবে।”
