Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৯

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৯

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৯
নুসরাত ফারিয়া

কয়েকদিন পরের কথা—
আজ শুক্রবার হওয়ায় সকলে বাড়িতেই রয়েছে। আলো খুব ভোরে উঠে নামাজ আদায় করে রুম থেকে বেরিয়েছে। তারপর সবার জন্য চা থেকে শুরু করে সকালে নাস্তাটাও বানিয়ে নেয়। মাঝেমধ্যে হালকা পাতলা ছ্যাকাও খায়। তবে সে পাত্তা দেয় না। আজকাল রান্না করতে ভালোই লাগে। যখন দেখে সবাই তৃপ্তি সহকারে তার হাতের রান্নাগুলো খাচ্ছে, তখন মনে হয় সব কষ্ট সার্থক হয়েছে।
আলো গুনগুন করতে করতে শাশুড়ী মা ও দাদাজানকে চা, বিস্কুট দিয়ে এসে এক কাপ চা নিয়ে দোতলায় উঠে গেল। উদ্দেশ্য স্যার নামক স্বামীকে চা দেওয়ার। আগেরবার এই চা দেওয়ার অভিজ্ঞতা মোটেও ভালো ছিল না। আর আজ সে কোনোরকম অঘটন ঘটাতে চাচ্ছে না। তাই খুব সাবধানে ও সর্তকতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওই যে কথায় আছে না? যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। ঠিক তেমনই তার সাথেও কিছু একটা ঘটল।

-“ইউউউ ষ্টুপিড!!”
স্যারের বাজখাঁই গলার ধমকে কেঁপে উঠলো আলো। একই সঙ্গে পেট জ্বলায় চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। সে হাজারবার যদি চায়, কোনো আকাম-কুকাম করবে না। কিন্তু বাজে পরিস্থিতি তার পিছু ছাড়ে না। সে বুঝি এসব অঘটন ঘটানোর জনই পয়দা হয়েছে। এই তো দিব্যি চা নিয়ে আসতেছিল। রুমের দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতে না রাখতেই একখানা শক্তপোক্ত পুরুষালী বুকের সাথে ধাক্কা খেল। ফলস্বরূপ হাতে থাকা চায়ের কাপ-টাও উল্টে পড়ে যায়। তবে এবার সেটা স্যারের গায়ে নয়, বরং তার-ই পেটের ওপর পড়েছে।
-“এ্যাই? তুমি কি চোখে কম দেখো? নাকি ব্রেনের সাথে চোখদুটোও গিলে খেয়ে নিয়েছো হুহ্?”
আলো প্রতিত্তোরে কিছু না বলে মাথা নিচু করে নিল। আধার দাঁতে দাঁত পিষে রাগ কন্ট্রোল করে মেয়েটার হাতের বাহু চেপে ধরে হনহনিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। আলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে ঝর্ণার নিচে দাঁড় করিয়ে পানি ছেড়ে দিল। এতে মেয়েটা আহাম্মক হয়ে যায়। সাত সকালে এমন ঠান্ডা পানিতে ভিজে হকচকিয়ে উঠে সরে আসতে চাইল। কিন্তু আধার বামহাতে তার কপাল চেপে ধরে আবারো পানির নিচে দাঁড় করিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“একদম নড়াচড়া করবে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।”
আলো আশ্চর্য না হয়ে পারল না। এইভাবে সক্কাল সক্কাল তাকে জোরজবরদস্তি করিয়ে গোসল করানোর মানেটা কী? এইদিকে ঠান্ডায় তার শরীর জমে যাওয়ার উপক্রম।
-“উমম…স্যার! শ-শীত করছে তো। ছাড়ুন, ছাড়ুন আমায়।”
আধার কিছুটা সময় নিয়ে নব বন্ধ করে দিল। তারপর বেরিয়ে যেতে যেতে বলে উঠলো,
-“নেক্টস টাইম যেন আমার জন্য চা নিয়ে আসতে না দেখি। নয়তো গরম চায়ের ড্রামে তোমাকে চুবানি দিবো। মাইন্ড ইট মিস. কালো!”
আলোর চোয়াল ঝুলে পড়ল। সে ভালো কিছু করতে চাইলেও উল্টোটা হয়। তার পুরো জীবনটাই লস প্রজেক্ট। আলো রাগে, দুঃখে পরণের ভেজা পোশাক টেনেটুনে খুলে তোয়ালে জড়িয়ে নিল। তারপর দরজা সামান্য খুলে মাথা বের করে উঁকি দিল। ওই তো বজ্জাত ব্যাটা দাঁড়িয়ে থেকে ফোনে কথা বলছে।
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে স্যারের অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য খুকখুক করে কাশি দিল। আধার ঘাড় ঘুরিয়ে বিরক্তিতে বলল, -“কী চাই?”

-“জামাই!”
-“হোয়াট??”
-“ইয়ে না মানে….জামা! জামা।”
আধার ফোনে কথা বলতে বলতেই আলমারি খুলে আলোর পোশাক বের করল। তখনই অসাবধানতার জন্য কাপড়ের ভাজ থেকে কিছু একটা নিচে পড়ে গেল। আধার ভেবেছে রুমাল পড়েছে। তাই সে না দেখে ঝুঁকে বস্তুটা হাতে তুলে নিল। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখদুটো রসগোল্লার মতো হয়ে যায়। ওইদিকে এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখা মাত্রই আলো চট করে মাথা ভিতরে ঢুকিয়ে নেওয়ার সময় ধরাম করে বারি খেল দরজার সাথে। তবুও মেয়েটা লজ্জায় সব ব্যথা ভুলে ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। ইশশ্! কী লজ্জার ব্যাপার। মানুষটার হাতে কি-না শেষমেশ তার অন্তর্বাস…
প্রায় অনেকক্ষণ যাবত ওয়াশরুমের ভেতর ঘামটি মে’রে আছে আলো। এপর্যায়ে এসে আস্তে করে দরজা খুলে মাথা বের করে উঁকি দেয়। আশেপাশে কোথাও স্যারকে না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে চটপট বেরিয়ে এল। বিছানার ওপর রাখা পোশাকগুলো নিয়ে জলদি ছুটল ওয়াশরুমে।
দুপুর হতে চলেছে। আধার বাহির থেকে ফিরে গোসল করে একটা সাদা পাঞ্জাবি পরেছে জুম্মার নামাজের জন্য। প্রতি সপ্তাহে দুই দাদা-নাতি সেম পাঞ্জাবি পরে মসজিদে যায়। আজও সেটার ব্যর্তিক্রম হলো না। পাঞ্জাবির দু’হাতা বাহুতে গুটিয়ে রাখতে রাখতে সিঁড়ি বেয়ে নামছে আধার। ভেজা চুলগুলো সুন্দর করে সেট করে রাখা। রক্তিম নিচের ঠোঁট কামড়ে, ভ্রু কুঁচকে নিজের কাজ করতে ব্যস্ত। অন্যদিকে, কেউ একজন যে তার দিকে অপলক নয়নে চেয়ে আছে সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।

-“এ্যাই মেয়ে? এটা কি করছ তুমি? সব পানি তো নিচে পড়ে যাচ্ছে। তোমার ধ্যান কোথাই??”
তাহমিনা খান চিল্লিয়ে উঠলেন। এতে ভরকে গেল আলো। চটজলদি নজর সামনে থেকে সরিয়ে এনে নিজের হাতের দিকে তাকায়। সে তো ডাইনিংয়ে এসে পানি খাওয়ার জন্য গ্লাসে পানি ঢালছিল। কিন্তু জগের পানি গ্লাসে পড়ার বদলে টেবিলে ও ফ্লোরে পড়েছে। আলো দাঁত দিয়ে জিহ্বা কেটে দ্রুত জগ নামিয়ে আমতাআমতা করে বলল,
-“আসলে মা খেয়াল করিনি। আমি খুব দুঃখিত। এখনই জায়গাটা পরিষ্কার করে দিচ্ছি!”
একথা বলে আলো তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে ছুটতে চাইলে খেয়াল করল, শেফালি চাচি কাপড় ও ওয়াইপার নিয়ে এসে জায়গাটা পরিষ্কার করে দিচ্ছে। এটা দেখে আলো মনে মনে হাসলো। এই মানুষটা তাকে সবসময় সাহায্য করে এসেছে এবং করছেও। সে সত্যিই এই মানুষটার প্রতি মন থেকে কৃতজ্ঞ, তাকে ভালোবাসা ও আগলে রাখার জন্য!
-“তা আজকাল আমার নাতবউয়ের মনটা কোথায় থাকছে হুম? নিশ্চয়ই বরের কাছে?”

দাদাজানের কথা শুনে আলো আড়চোখে দূরে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“তুমি ভুল ভাবছ দাদাজান। তোমার বেরসিক নাতির কাছে আমার মনটা রাখতে বয়েই গেছে। উনার কাছে পারলে আমি আমার মাথার একটা চুলও রাখব না। নয়তো দেখা যাবে, তোমার অতি ভদ্র নাতি চুলগুলোও পু’ড়িয়ে ফেলেছে!”
সোবহান খান শব্দ করে হেঁসে উঠলেন। আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলল, -“তোমার হাসা শেষ হলে এখন যাওয়া যাক দাদাজান।”
সোবহান খান মাথা নাড়িয়ে বলল, -“হুম…চলো!”
অতঃপর দুই দাদা-নাতি বেরিয়ে গেল। বাড়ির পাশে মসজিদ হওয়ায় গাড়ি নিয়ে যেতে হয় না। গল্প করতে করতে হেঁটেই চলে যাওয়া যায়। সোবহান খান হাঁটার সময় কিছু একটা অনুভব করে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। তিনি ঠিকই ধরেছিলেন! আলো গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে।
-“আজও কিন্তু জিলাপি নিয়ে এসো দাদাজান।”
আলো কাছে এসে ফিসফিসিয়ে কথাটি বলে। সেটা শুনে সোবহান খান কিছু একটা ভেবে বললেন,
-“আমার তো বয়স হচ্ছে৷ এই বয়সে জিলাপি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে পা জোড়া টনটন করে। তুমি বরং আজ তোমার স্বামীকে বলো। দেখো কি বলে!”
আলো ঠোঁট উল্টালো। তবুও সাহস করে এগিয়ে গেল মানুষটার দিকে।

-“স্যার?”
আলোর ডাকে পাশে ফিরে তাকায় আধার। বলল,
-“কী চাই?”
-“জিলাপি।”
-“মানেহ?”
-“মানে আসার সময় মসজিদ থেকে জিলাপি নিয়ে আসবেন আমার জন্য।”
মেয়েটার এহেন কথা শুনে আধার নাকমুখ কুঁচকে বলল,
-“হোয়াট ননসেন্স! আমি কি-না এখন তোমার জন্য মসজিদে লাইন ধরে জিলাপি নিয়ে আসব? সিরিয়াসলি? এটা তুমি ভাবলে কীভাবে?”
-“এমন ভাব করছেন যেন আমি আপনাকে জিলাপির বদলে জুতা চুরি করে নিয়ে আসতে বলেছি।”
-“জুতা কেন? আমি একটা পিঁপড়েও আনব না।”
বলেই আধার সেখান থেকে চলে গেল। আলো অসহায় চোখে দাদাজানের দিকে তাকায়। সোবহান খান এগিয়ে এসে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন,

-“মন খারাপ করো না। আমার বিশ্বাস, ও তোমার জন্য জিলাপি নিয়ে আসবে।”
-“আর যদি না নিয়ে আসে তাহলে?”
-“তাহলে আমি আনব।”
আলো মুচকি হেঁসে বলল, -“তোমাকে কষ্ট করতে হবে না দাদাজান। আমি খাব না! নিজের বাড়িতে যখন যাব, তখন বাবা, চাচা, ভাইয়াকে বললেই অনেকগুলো নিয়ে আসবে। আচ্ছা তুমি এখন যাও! উনি তো রাগ করে তোমাকে রেখেই চলে গেলেন। পাষাণ লোক একটা!”

আলো দুপুরের নামাজ পড়ে টেবিলে বসেছে বইখাতা নিয়ে। চারদিন পর ইনকোর্স পরীক্ষা। কম নাম্বার পেলে আবার ওই লোকটা উঠতে বসতে খোটা দিবে। তাই সে আপাতত পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করছে। পড়ার একফাঁকে খেয়াল করল—তার সামনে পাঁচটা ঠোঙা রাখা হয়েছে। মেয়েটা চোখ বড়বড় করে মাথা তুলে স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। অবিশ্বাস্য সুরে আওরাল,
-“আ-আপনি! আপনি আমার জন্য জিলাপি নিয়ে এসেছেন? তাও এতগুলো?”
আধার কিছু না বলে সরে গেল। পরণের পাঞ্জাবির বোতাম খোলার সময় শুনতে পেল,
-“মসজিদের নাম করে আবার কোনো দোকান থেকে কিনে নিয়ে আসেননি তো?”
এবারেও নিরুত্তোর আধার। সে মূলত নিজের ওপর ভীষণ বিরক্ত। একটা মেয়ের জন্য কি-না আজ আধার খান জিলাপি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল? এটা ভাবতেও অবাক লাগছে তার। কখনো যেটা ছোট বোনের জন্য করেনি, আজ সেটা এই দু’দিনের আসা একটা বাঁচাল মেয়েটার জন্য করেছে। আশ্চর্য!
-“উমম…মজা! আচ্ছা স্যার? আপনাকে এতগুলো জিলাপি কেন দিল?”
আলো কাগজের ঠোঙার ভেতর থেকে ছোট ছোট জিলাপি বের করে, খেতে খেতে জানতে চাইল। আধার পাঞ্জাবি খুলে টিশার্ট ও ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলে উঠলো,

-“আমার সাঙ্গপাঙ্গরা যখন জানতে পারল, আমাদের বাড়িতে নতুন একটা পেটুক ইঁদুর এসেছে। তাই ওদের ভাগেরটাও দিয়ে দিছে!”
-“প্রতি সপ্তাহে এমন করে জিলাপি পেলে ওই ইঁদুরটা মাইন্ড করত না।”
আলোর কথা শুনে আধারের পা জোড়া শ্লথ হয়ে গেল। সে চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। হঠাৎ স্যারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি খেয়াল করে আলো হাসার চেষ্টা করল,
-“হেহেহে মজা করলাম!”
বিকেলের দিকে তাহমিনা খান জানতে পারেন উনার বাবার শরীরটা খারাপ। ইমার্জেন্সিতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খবরটা পেয়ে তাহমিনা খান কোনোমতে ছেলে, শশুরের সাথে ছুটে গিয়েছেন। সোবহান খান সঙ্গে করে আলোকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েটা যেতে রাজি হলো না। কারণ সে খেয়াল করেছিল, তাহমিনা খান চান না তাদের সাথে আলো যাক উনার বাপের বাড়িতে। তাই আলোও নিজের শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে যায় না। শুধু শুধু ঝামেলা বাড়িয়ে কী লাভ? তারচেয়ে বরং সে এখানেই ভালো আছে।

সন্ধ্যা থেকেই নীল আকাশটা আজ মেঘালয়ে ঢাকা। হয়তো বৃষ্টি আসবে। তাই রাতের খাবার হিসেবে খিচুড়ি রান্না করে নিয়েছে আলো। শেফালি চাচি নয়টার দিকে চলে গিয়েছে। মানুষটা এখানে সারাদিন থাকলেও রাতের বেলা নিজ পরিবারের কাছে ফিরে যায়, আবার সকাল সকাল চলে আসে। আলো দাদাজানের থেকে খবর নিয়েছে অসুস্থ মানুষটা এখন কেমন আছে৷ তেমন বড় ধরনের কিছু না, জাস্ট প্রেসার বেড়ে গিয়েছিল। আপাতত উনাকে বাড়িতে নেওয়া হয়েছে এবং সুস্থও আছে। সবটা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেদের খেয়াল রাখতে বলে ফোন রেখে দেয়।
তখন বাজে রাত বারোটা। পুরো নিস্তব্ধ বাড়িতে একা আছে আলো। বাহিরে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভিডিও কলে ছোট বোনের সাথে কথা বলার সময় ছায়া আবদার করে বসল, তার নাচ দেখার। কারণ তারা একসাথে থাকাকালীন প্রায়শই বৃষ্টিতে নৃত্য করেছে। তাদের ফোনের গ্যালারি ভর্তি নাচের ভিডিও দিয়ে। একপর্যায়ে এসে আলো রাজি হয়ে যায়। তারও বহুদিন বৃষ্টিবিলাস করা হয়নি। তারওপর আজ বাড়িটাও একদম ফাঁকা! এই সুযোগে নিজেকে একটু আনন্দ দেওয়ায় যায়। আবার কবে না, কবে বৃষ্টি হবে কে জানে!

আলো ছোট বোনের দেওয়া সুতির, পাতলা আকাশি রঙা শাড়িটা জলদি পড়ে নিলো। তারপর চুলগুলো খোলা অবস্থায় রেখে চোখে গাঢ় করে কাজল, দু’হাতে কাঁচের চুড়ি, কানে দুল পড়ে—হাতে ফোন নিয়ে দৌড়ে ছাঁদে উঠে যায়।
বৃষ্টিতে ভিডিও, ছবি তোলার জন্য ওয়াটারপ্রুফ ফোন নিয়েছিল। ছায়ারটাও ওয়াটারপ্রুফ! তাই আজও কোনো অসুবিধা হলো না বৃষ্টিতে নাচের ভিডিও করার জন্য। আলো দোনলায় ক্যামেরা চালু করে ফোন সেট করে রাখল। সে অলরেডি ভিজে জবজবে হয়ে গেছে।
আলো কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে নিল। আকাশ চিঁড়ে ঝুম বর্ষণের আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে তার দু’হাতের চুড়ি ও নুপুরের রিনঝিন শব্দ যোগ হলো। একই সাথে সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেদ করে খালি গলায় গুনগুন করে উঠলো,

❝রিমঝিমের ধারাতে চায় মন হারাতে,
রিমঝিমের ধারাতে চায় মন হারাতে—
এই ভালোবাসাতে আমাকে ভাসাতে।
​এল মেঘ যে এল ঘিরে,
বৃষ্টি সুরে সুরে সোনায় রাগিণী।
মনে স্বপ্ন এলোমেলো,
এই কি শুরু হলো প্রেমের কাহিনী….(২)❞
গানের সাথে তাল মিলিয়ে চমৎকার ভাবে নাচছে আলো। তার মিষ্টি সুরে আজ প্রকৃতিও সামিল হয়েছে। বৃষ্টির সচ্ছ বিন্দু, বিন্দু জলকণাগুলো তার সর্বাঙ্গ ছুয়ে দিচ্ছে। সে বৃষ্টিবিলাসে এতটাই মগ্ন হয়েছে যে, খেয়ালই করেনি দরজার কাছে কেউ একজন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

~​আগে কত বৃষ্টি যে দেখেছি শ্রাবণে,
জাগেনি তো এত আশা, ভালোবাসা এ মনে….।~
আলো দু’হাত মেলে চোখ বুজে মাথা আকাশের দিকে করে ঘুরতে লাগল। অন্যদিকে, আধার এখনো অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে। সে তো একটু আগেই ফিরেছে। তাহমিনা খান এত রাতে তাকে আসতে না দিতে চাইলেও সে চলে এসেছে। কারণ ঐ বাড়িতে তার মনটা কখনোই টিকতে চায় না। শুধুমাত্র আজ দাদাজানের জন্য গিয়েছিল। তারমধ্যে আবহাওয়াটাও খারাপ, আর মেয়েটাও এখানে একা রয়েছে। ভুলবশত যদি কিছু সমস্যার মধ্যে পড়ে তখন কি হবে? যেখানে ওই মেয়েটা মানেই আস্ত একটা মসিবতের গোডাউন! সবসময় কিছু না কিছু অঘটন না ঘটালে পেটের ভাত হজম হয় না। তাই তো একপ্রকার ওই ঝামেলার বস্তার

জন্যই ছুটে এসেছে। হাজার হোক, সে তার বাবাকে কথা দিয়েছে একটু হলেও খেয়াল রাখার চেষ্টা করবে মেয়েটার।
ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে বাড়িতে ঢুকে সোজা দোতলায় উঠে যায় আধার। ভেবেছিল মেয়েটা একা একা ভয় পেয়ে গুটিশুটি মে’রে এক কোণে পড়ে রয়েছে নয়তো ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু রুমে এসে আলোকে দেখতে না পেয়ে কপাল কুঁচকে যায়। বেলকনি, ওয়াশরুম, নিচতলায় ও উপরতলায় খুঁজেও যখন মেয়েটির দেখা পেল না, তখন না চাইতেও বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। কারণ এত রাতে এই মেয়েটা হুট করে গায়েব হয়ে যাবে কোথায়? কোনো বিপদ হয়নি তো আবার!

আধার চিন্তিত হয়ে ঠিক করল, শশুর মশাইকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করবে—ওখানে আলো গিয়েছে কি-না। নেটওয়ার্কের সমস্যা হওয়ার জন্য কল লাগছে না। আধার অধৈর্য্যের মতো পায়চারি করতে করতে হঠাৎই কিছু একটা মনে হতেই সে বড় বড় পা ফেলে ছাঁদের দিকে এগিয়ে গেল।

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৮

উদ্দেশ্য ছিল, ছাঁদে এসে যদি মেয়েটাকে না পায় তাহলে সে নিজেই খুঁজতে বের হবে। তারপর কানের নিচে কয়েকটা লাগিয়ে মেয়েটার বাঁদরামি সোজা করে দিবে। কিন্তু এখানে এসে যে এমন কিছু দেখবে সেটা কল্পনারও বাইরে ছিল।
বৃষ্টিতে ভেজা এক নৃত্য প্রদর্শনকারী রমণীকে দেখা মাত্রই হাত থেকে ফোনটা বেখেয়ালে লুটিয়ে পড়ে শক্ত মেঝেতে। এমন অপ্রত্যাশিত দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে, এক মূহুর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে যায় আধার খান…..

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১০