এক শ্রাবণ হাওয়ায় গল্পের লিংক || কায়ানাত আফরিন

18110

এক শ্রাবণ হাওয়ায় পর্ব ১
কায়ানাত আফরিন

– মিস তায়্যিরাত ইবনে আহি।তোমার কাছে দুটো অপশন আছে। হয় নিজের পরিবারের মানসম্মান বাচাঁনোর জন্য আমায় বিয়ে করো,নয়তো আমার সাথে যে গুজব রটিয়েছে সেটাই মেনে নাও। সিদ্ধান্ত এবার তোমার হাতে।
লোকটার সুদৃঢ় কথা শুনে টুপ করে একফোটা জল গড়িয়ে পড়লো আমার চোখ বেয়ে।তবে সে দাঁড়িয়ে আছে কঠোর ভঙ্গিমায়,যেন এসব পরিস্থিতি উনার কাছে কোনো ব্যাপারই না। আমি জড়ানো গলায় বললাম,

-আপনি কি চান মিঃ আনভীর ?
আলতো হাসলেন উনি। চোখের দৃষ্টি আমাতে দৃঢ় করে বললেন,
-আমার চাওয়া পাওয়া সব এখন বাবার হাতে। আমার বাবা চায় যে আমি তোমায় বিয়ে করি , এতে আমার মত হোক বা না হোক। তুমি রাজি হলেই বিয়ের কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে।
আমার গলার স্বর ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে আসছে। আজ আমার ছোট্ট একটা ভুলের জন্যই এ পরিস্থিতির শিকার। ভরা বিয়ে বাড়ি এখন কেমন যেন নিস্তব্ধ পুরী। বিয়েটা আজ আমারই ছিলো তবে আনভীরের সাথে না, অন্য একজনের সাথে। আনভীর হলেন আমার বাবার বন্ধুর ছেলে। আমার বিয়ে উপলক্ষে সপরিবারে তারা এসেছিলেন আমাদের এই মফস্বল শহরে । তবে পরিস্থিতির শিকারে সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আমি তায়্যিরাত ইবনে আহি। মা’কে ছোটবেলাতেই হারিয়েছি। বাবা সরকারি চাকরির জন্য সারাবছর এ শহর ও শহর চলে যেত। আমি বড় হতে লাগলাম আমার চাচা-চাচীর কাছে। আর আনভীরের সাথে সে সূত্রেই আমার পরিচয়। আমাদের পাশের বাড়িটিতে উনারা থাকতেন। আমার এখনও মনে আছে উনার সাথে আমার প্রথম দেখার কথা। ক্লাস নাইনে পড়তাম আমি। আনভীর ছিলেন আমাদের এ পাড়ার সবচেয়ে সুদর্শন ব্যাক্তি। তাই তার কাছে প্রেমপত্র জিনিসটি অহরহ ব্যাপারই ছিলো।

কেউ কেউ তো সরাসরিই উনাকে প্রপোজ করেছে। তবে উনি সেসবে খুব বেশি নজর দেননি। হঠাৎ আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের মারু আপু হুট করে আমায় একটা চিঠি ধরিয়ে দিলেন হাতে। আমায় বললেন ছাদে পাশের ছাদে এক ছেলে আছে তাকে চিঠিটা দিতে হবে। নাইনে পড়তাম আমি । এসব শুনে কিছু একটা আন্দাজ করে নেওয়াটা খুব কঠিন হতো না আমার কাছে। আমি দ্বিধায় না করলেই আপু ধমকের স্বরে বলে ওঠলো ,’যা তো। নাহলে তুই যে আবারও কেমিস্ট্রিতে ফেল করছোস ; বলে দিবো তোর চাচী কে।’

এতটুকু হুমকি যথেষ্ট আমার জন্য। অগ্যতাই তাই ছাদে যেতে হয়েছিলো আমায়। তখন ছিলো শেষ বিকেল। শীতের আবরণে দূর দূর কুয়াশায় ছেয়ে গিয়েছিলো । আমি কাপা কাপা পায়ে ছাদে উঠে পাশের ছাদে উকি দিলাম। সত্যি সত্যি এক ছেলে বসে আছে রেলিংয়ে। পাশে মনে হয় বায়োলজির একটা বই উপুর করে রাখা সাথে গরম চায়ের একটা মগ। চা যে কেউ মগভর্তি খায় এটা আমার জানা ছিলো না। তবে ছেলেটা সেগুলো একপাশে রেখে গিটারে টুং টাং শব্দ তুলতে ব্যাস্ত ছিলো আনমনে।

আমি শুধু পেছন থেকে দেখতে পারছিলাম তাকে। তার পরনে হলদে কমলা রঙের টিশার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। আমি কৌতুহলতার জন্য উনার নাম জানতে গিয়ে অজান্তেই খুলে ফেললাম মারু আপু দেওয়ার চিঠিটা। উপরের একটা লাইনও পড়িনি আমি,,,,,শুধু শেষ নামটিই দেখেছিলাম…..আনভীর। চিঠিটি ভাঁজ করে আমি কাঁপাকাঁপা স্বরে বলে ওঠলাম,,,
-‘এইযে একটু শুনুন?’

আমার কন্ঠে পেছনে ফিরলেন উনি।আমি যেন বড়সড় এক ধাক্কা খেলাম এবার এমন মানুষটিকে দেখে। ফর্সা মুখে চিকন ফ্রেমের খয়েরি চশমা,,,বাতাসের দোলায় উড়ে যাচ্ছে মসৃন কালো চুল ; যার কারনে উনার কপাল দৃশ্যমান আমার কাছে। খাড়া নাক….লালচে ঠোঁট এসব সৌন্দর্য আমার ১৫ বছর বয়সী মনে তোলপাড় শুরু করেছিলো আবছাভাবে। আমি বিলম্ব না করে চিঠিটা এগিয়ে দিয়ে বলে ওঠলাম,,
-‘এই নিন।’
কৌতুহলবশত উনি নিয়ে নিলেন চিঠিটা। পুরোটা পড়া শেষ করে উনি শান্ত কন্ঠে আমায় জিজ্ঞেস করলেন,
-‘কিসে পড়ো তুমি?’
-‘ক্লাস নাইন।’

-‘এই বয়সেই এই অবস্থা ! আমি কিসে পড়ি জানো? অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। আর এইটুকু একটা পুচকি মেয়ে কি হিসেবে লাভলেটার লিখো আমায়?’
ভড়কে গেলাম আমি। তাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম , ‘মানে?’
-‘মানে হলো………এসব প্রেম-ট্রেমের চিন্তা বাদ দাও। ছোট তুমি। আগে পড়াশুনা করো। এসব করার জন্য দিন অনেক আছে। এখন তোমার প্রেম করার বয়স না পিচ্চি,,,,হামাগুড়ি দেওয়ার বয়স !’
অপমানে আমার মুখখানা থমথমে হয়ে ওঠলো এবার। নিশ্চয়ই মারু আপু নিজের নাম চিঠিতে লেখিনি তাই এই চশমিশ বিলাইটা মনে করেছে আমি লিখেছি এটা।আমায় পিচ্চি বললেন উনি? এবার তাই রাগে গজগজ করতে করতে বলে ফেললাম,
-‘দেখুন চিঠিটা আমি না,,,,,,,আমার পাশের ফ্ল্যাটের মারু আপু দিতে বলেছিলো আপনাকে। তাই দিয়ে দেই। এখন এসব উদ্ভট চিন্তা বাদ দিন।আর হ্যাঁ,,,,আমি জানি আমি পিচ্চি। প্রেম করার বয়স এখনও আমার হয়নি। কিন্ত যদি প্রেম বা বিয়ে করার বয়স হয়েও যায়,,,আর যাই হোক; আপনার মতো চশমিশ বিলাইকে আমি বিয়ে করবো না।’

সেই প্রথম সাক্ষাতের কথা মনে পড়ে হঠাৎ আমার ঠোঁটকোলে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠলো এবার। এতসময় পর আজ পরিস্থিতি বাধ্য করছে আমায় উনাকে বিয়ে করতে। আনভীরের সাথে ছোটবেলা থেকেই খুব বেশি একটা কথা হয়নি আমার। পরবর্তীতে আমি ক্লাস টেনে পড়াকালীন সময়েই উনারা সপরিবার ঢাকায় চলে যান। আমার বাবার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও একপ্রকার আমি ভুলেই গিয়েছিলাম তাকে। আর এতবছর পরে উনারা এসেছিলেন আমার বিয়েতে।

ঘটনাটি হয়ে ছিলো গতকাল গায়ে হলুদের রাতে।অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আমি ঘুমিয়ে পড়ি আমার রুমে। আমাদের এ ভিটে শহর থেকে তুলনামূলক একটু দূরে হওয়ায় নীরবতার প্রকোপও বেশ। এমন কোলাহল বিহীন সময় আমার রুমের দরজায় হালকাভাবে টোকা পড়লো হঠাৎ। রাত প্রায় ৩ টা বাজে। এমন সময় দরজায় টোকা পড়াতে একটু চমকে যাই আমি। মনে জাগছে অজস্র চিন্তা। তাই উঠে দরজা খুলে দেখলাম আনভীর দাঁড়ানো আছে দরজায় ভর দিয়ে ।শরীরটা ক্লান্ত…চোখ-মুখ লাল। আমায় দেখে অপ্রস্তুত হয়ে বলে ওঠলো,

-‘ওহ সরি , তোমায় ডিস্ট্রাব করার জন্য। আমি এটা আমার আব্বু আম্মুর রুম ভেবে নক করেছিলাম।’
-‘কি হয়েছে আপনার?’
আমি না চাইতেও উনার গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে উনার শরীর। হয়তো ওষুধের জন্যই এসেছিলেন। উনার দাঁড়াতে একটু কষ্ট হচ্ছে দুর্বলতার জন্য। আজ গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে তো বড্ড ব্যস্ত ছিলো,,,এ জ্বর নিয়ে চলাফেরা করলেন কিভাবে উনি?আমি নরম কন্ঠে এবার বললাম,,
-‘আপনি ভেতরে এসে বসুন প্লিজ। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।’

উনি প্রথমে চাচ্ছিলেন না ভেতরে আসতে। কিন্ত দুর্বলতার জন্য আর না করতে পারেননি। আমি ওষুধ দিলাম এবার। কিন্ত কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো আনভীরের শরীর ভার হয়ে আসছে। আমি এবার বললাম….
-‘এমন জ্বর নিয়ে ঘুরাফিরা করলে তো এমনটাই হবে। ওষুধের কাজ শুরু হতে একটু সময় লাগবে। আপনি এখানেই ঘুমিয়ে পড়ুন।’
-পাগল তুমি? আমি কখনোই এতরাতে একটা মেয়ের ঘরে ঘুমাতে পারবো না।’
-‘এমন দুর্বল শরীর নিয়ে যাবেন কিভাবে শুনি? তাছাড়া আঙ্কেল আন্টি এই বিয়ে বাড়িতে কোন ঘরে শুয়েছে তাও আমার জানা নেই। এতরাতে পরে আপনার জ্বর নিয়ে হৈ হুল্লোড় শুরু হয়ে যাবে।’

আনভীর ভাবলেন কিছুক্ষণ। উনার মাথাটা এতটাই ধরেছে যে উঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি নেই। চোখ-মুখ যেন রক্তিম লাল। আমার কথায় সায় দিয়ে উনি খাটে ঘুমাতেই আমি নিচে একটা বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়লাম। আর উনাকে আমার ঘরে আনাটাই ছিলো আমার জীবনের চরম একটি ভুল। আমি কখনও ভাবতেই পারিনি যে আমার চাচি বা চাচির বোনেরা সকালে আমার ঘরে এসে বিষয়টা এভাবে নোংরা বানিয়ে দিবে। আমি তো শুধু উনার জ্বরের জন্য এখানে ঘুমাতে দিয়েছিলাম। কারন তখন হেঁটে চলার মতো তার অবস্থা ছিলো না। আর এত রাতে কাকেই ডাকতাম আমি? আমি সবাইকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে আমাদের মধ্যে কোনোরূপ সম্পর্ক নেই এমনকি রাতের বিষয়টাও বলেছিলাম । কিন্ত আমার চাচি মোটেই এ কথা বিশ্বাস করলেননা। একপর্যায়ে বরপক্ষের কানে বিষয়টা যাওয়াতে বিয়ের দিনই আমার বিয়ে ভেঙে গেলো।

আমার বাবার অবস্থা খারাপ । বিয়ের দিন বিয়ে ভেঙে যাওয়ার মতো ভয়াবহ দৃশ্যের সম্মুখীন হয়ে উনার বুকে চাপ পড়েছে।তারপরই আনভীরের বাবা হঠাৎ প্রস্তাব দিলেন তার ছেলের সাথে আমার বিয়ের জন্য। আমার কাছে আর কোনো উপায় নেই আর এটি ছাড়া। হ্যাঁ, এটা সত্য যে মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আমায় একপ্রকার ফেলনা বানিয়ে রেখেছিলো। কিন্ত তাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি। আমি মাথা নাড়ালাম এবার। আনভীরকে মৃদুভাবে বললাম,,
-‘আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজী।’

বড় ঘরটিতে সবার আকর্ষণ এবার আমার আর আনভীরের দিকে। কাজী সাহেব ইতিমধ্যে আমাদের বিয়ে সম্পন্ন করেছেন।এখন থেকে আমি আর আনভীর স্বামী স্ত্রী। কবুল বলার পরই আনভীর নিশ্চুপ হয়ে সোফায় বসে রইলেন। মুখ দিয়ে টু শব্দও বের করলেন না। আমি এখনও বুঝতে পারছিনা যে উনি এই বিয়েতে রাজী ছিলেন কি-না। উনার ভাবভঙ্গি একেবারই নির্মল। বাবা নিজের ঘরে শুয়ে আছেন এখন। উনার অবস্থা আগের তুলনায় এখন অনেক ভালো। আনভীর এবার হেসে উঠলে হঠাৎ। সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
-‘কি আজব না? বিয়ের দাওয়াত খেতে এসেছিলাম এখানে আর দিনশেষে আমারই বিয়ে হয়ে গেলো তাও একটা সো কল্ড গুজবের জন্য।’

সবাই চুপ। আনভীর আবার বললেন,,,
-‘আমাদের মধ্যে এরকম কখনোই কিছু ছিলো না কিন্ত কি করলেন আপনারা?এই মেয়েটার বিয়ে ভাঙিয়ে আমার সাথে বিয়ে করাতে ওকে বাধ্য করলেন। সবসময় চোখে যা দেখা হয় সেটা সত্যি হয়না। কিন্ত আপনাদের চিন্তাভঙ্গি কি……দৃষ্টিভঙ্গিটাই পঙ্গু।
-মুখ সামলে কথা বলো,…….

চাচি বলা শেষ করার আগেই আনভীর চেচিয়ে বলে উঠলো, ‘কি মুখ সামলাবো আমি? আপনাদের জন্য আমাদের দুজনের লাইফই যে একটা অন্য মোড় নিলো সেদিকে কারও খেয়াল আছে?………(কিছুটা দম ফেলে) শুনুন সবাই,,, আহি যতদিন আমার সাথে থাকবে ততদিন আপনাদের কারও ছায়াও আমি দেখতে চাইনা আমি। এমন লো মেন্টালিটির মানুষদের থেকে দূরে থাকাই উত্তম। আপনাদের আমি কখনোই আমি আমার আত্নীয় হিসেবে মানবো না।’
ভয়ঙ্করভাবে রেগে আছেন উনি। আমি এবার সোফায় পাথর হয়ে বসে আছি। মনে অজানা ভয় হানা দিচ্ছে। আনভীরের বাবা এবার উনাকে জিঙ্গেস করলেন,,,

-আহিকে মানতে পারবে?
আনভীর শান্ত হলেন। অতঃপর জড়ানো কন্ঠে বললেন,,,
-সেটা দেখা যাবে। আহি,,,,,,,চলো এখান থেকে।
বলেই আনভীর কোনোদিকে না তাকিয়ে প্রস্থান করলেন জায়গাটি। আমার চোখে অজান্তেই পানি চলে আসলো এবার। বাবার সাথে এখন চাইলেও দেখা করতে পারবোনা। বাইরে এসে দেখি আনভীরের বড় ভাই আজরান ভাইয়া গাড়ি ইতিমধ্যে বের করে নিয়ে এসেছে । তার পাশেই বসা শিউলি ভাবি। আনভীর চুপচাপ ওই গাড়িতে বসে পড়লো। একবার বসতেও বললৈ না আমায়। আমি দ্বিধায় পড়েছি যে গাড়িতে বসবো কি-না। তারপর পেছন থেকে উনার বাবা বলে ওঠলেন….

-একি আহি? গাড়িতে বসো গিয়ে। আমরা অন্য গাড়িতে আসছি। আনভীর ওকে এভাবে দাঁড় করে রেখেছো কেনো?
ভেতরে বসেই দরজাটা খুলে দিলো আনভীর। আড়ষ্ট কন্ঠে বললো,
-ও কি এখনও পিচ্চি যে দরজা খুলে দিতে হবে?…….(কিছুটা থেমে আমার উদ্দেশ্যে বললো)…….বসো।
কথা না বাড়িয়ে গাড়ির ভেতরে বসে পড়লাম আমি। আজরান ভাইয়া এবার গাড়ি স্টার্ট দিলো। আমি অশ্রুসিক্ত চোখে দেখে নিলাম আমাদের বাড়িটি। যা আপন মানুষের মতো সময়ের ব্যবধানে পর হয়ে গিয়েছে। আনভীরের সাথে আমার নতুন বিবাহিত জীবনের কোনো পরিণতি হবে তো?

পরিশেষে গাড়িটি এসে থামলো বিলাসবহুল একটি এপার্টমেন্ট এর সামনে। এই কলোনিতে এরকম আরও বেশ কয়েকটি এপার্টমেন্ট আছে। শিউলি ভাবি দরজা খুলে দিতেই আমি বেরিয়ে এলাম। তারপর সবার পিছু পিছু বিল্ডিংয়ের ভেতরে একটি লিফটে ঢুকলাম আমি। আনভীর নিঃশব্দে লিফটের ৯ নম্বর চাপলো।আমি আমার শ্বাশুড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে আছি।সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আজ এতকিছু হয়ে গেলো আর উনার মুখে টু শব্দও না পাওয়াতে আমি আগেভাগেই অবাক।নিজের ছেলের হঠাৎ বিয়েতে উনি খুশি আছেন নাকি রাগে আছেন সেটাও তার ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে না। একপর্যায়ে লিফটি ৯ তলায় এসে থামলো।
করিডোরের একেবারের শেষ প্রান্তেই উনাদের ফ্ল্যাট। ভেতরে প্রবেশ করেই বুঝলাম ফ্ল্যাটটি বিশাল। আনভীরের বাবা এবার বললেন,,

-রুমে গিয়ে রেস্ট নাও মা।শিউলি তোমায় রুম দেখিয়ে দিবে। আজ তোমাদের ওপর দিয়ে আসলেই অনেক ধকল গিয়েছে।যাও তাহলে।
-জ্বি আঙ্কেল।

-এখনও আঙ্কেল বলছো কেনো? আমায় বাবা বলে ডাকতে হবে। তুমি কিন্ত আমার মেয়ের মতোই আহি।
বিনয়ী হাসলাম আমি। সত্য কথা বলতে আমার প্রচুর পরিমাণ অস্বস্তি লাগছে। শিউলি ভাবির সাথে আমি এবার চলে গেলাম আনভীরের রুমে। শুনেছি যে উনি ভার্সিটিতে ম্যাথম্যাটিক্সের প্রফেসর। তাছাড়া উনি ম্যাথে আগে থেকেই অনেক দুর্দান্ত ছিলেন তাই এই বিষয় নিয়েই নাকি পড়াশোনাটা করা।রুমে গিয়ে তো মাথায় বাজ পড়লো আমার। একে রুম কম লাইব্রেরি বেশি মনে হবে। দুনিয়ার যত বই গিজগিজ করে বুকশেল্ফভর্তি করে রেখেছে।তবে রুমটা প্রচন্ড রকমের গোছালো। শিউলি ভাবি চলে যাওয়ার পর আনভীরের আসার আগেই জামা নিয়ে আমি ওয়াশরুমে চলে গেলাম আমি।

গোসল সেরে বাইরে আসতেই দেখি সিংগেল সোফায় আয়েশ করে উনি বসে আছেন পায়ের ওপর পা তুলে। চোখের দৃষ্টি আমার দিকে তীক্ষ্ণ। আমি বিব্রত হয়ে পড়লাম। ওড়নাটা গায়ে ভালোমতো পেচানোর চেষ্টা করতেই উনি বলে ওঠলেন,,,,,
-‘হাউ স্ট্রেন্জ ! বিয়ে করা বউ তুমি আমার। তাহলে এত ওড়না প্যাচাপ্যাচি করছো কেনো?তুমি চাইলে ওড়না কেন সব খুলেই পেত্নীর মতো ঘুরতে পারো ।আই ডোন্ট মাইন্ড!

এক শ্রাবণ হাওয়ায় পর্ব ২+৩