এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২১
সেঁজুতি আক্তার
–ড্রয়িংরুমে ভারী নিস্তবতা। কারোর মুখে কোনো রা নেই।
–মাইরা সোফার হাতল ধরে চুপচাপ বসে আছে। তার করণীয় কি এখন? মানুষটাকেই বা কিভাবে সামলাবে ও। ভাবতে ভাবতেই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
–এই নিস্তবতা ভেদ করে হঠাৎ ভারী বুটের শব্দ ভেসে আসলো। শেহরান ভারী বুটের প্রতিধ্বনি তুলে এগিয়ে আসছে।
–রায়হান মির্জা শেহরানকে দেখে উঠে দাঁড়ালো। সাথে সাথে শাহানা বেগমও দাঁড়িয়ে পড়লেন।
–শেহরান ঝড়ের গতিতে এগিয়ে আসলো। একবার মাইরার দিকে শান্ত চোখে চাইল। তারপরে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সিঁড়িতে পা দিতেই বাবার ডাক শুনে থেমে গেল।
–বলছিলাম কি শেহরান?
–কি বলবে তোমরা? কোনো কিছু কি বলার আর বাকি আছে? তোমরা যেটা চেয়েছো সেটাই হয়েছে! এই বিষয়ে আমি কারোর সাথে কোনো রকম কথা বলব না। কথাগুলো বলে শেহরান হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
–মাইরা ছলছলে চোখে তাকিয়ে রইল শেহরানের যাওয়ার দিকে। মানুষটা খুব কষ্ট পেয়েছে। এসব তো আমার জন্যই হয়েছে। আমি যদি উনার জীবনে না থাকতাম তাহলে তো এরকম কিছু হত না। ভাবতেই মাইরার মনটা বিষিয়ে উঠল নিজের প্রতি।
–শাহানা বেগম এসে মাইরার কাঁধে হাত রাখলেন।
–মাইরা তুমি কষ্ট পেয়ো না। শেহরান একাই ঠিক হয়ে যাবে। ওকে কিছুটা সময় দাও।
–মাইরা শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরল।
–আম্মু আজ যা কিছু হয়েছে সব কিছু আমার জন্যই হয়েছে তাই না? আমি যদি আপনার ছেলের জীবনে না থাকতাম। তাহলে তো এমন কিছুই হত না। বলেই মাইরা ফুঁপিয়ে উঠলো।
–শাহানা বেগম মাইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন।
–মাইরা তুমি কখনো নিজেকে অপরাধী মনে করবে না। তোমাদের ভাগ্যে আল্লাহ তাআলা তোমাদের দুজনকে লিখে রেখেছেন। এতে তোমার তো কোনো দোষ নাই। সবকিছুই উপরওয়ালাই নির্ধারণ করেন। আমাদের সাথে কখন কি হবে সবকিছু তার হাতেই। তুমি নিজেকে কখনো দোষী মনে করবে না। তোমার কোনো হাত ছিল না।
-*রায়হান মির্জাও এগিয়ে আসলেন। মাইরার মাথায় হাত দিয়ে বললেন।
–তোমার শাশুড়ি একদম ঠিক বলেছে মা। কখনো নিজেকে দোষী মনে করবে না। আজ যা হয়েছে তা ওর ভাগ্যে ছিল। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। হয়তো এর থেকেও ভালো কিছু অপেক্ষা করছে। তুমি কষ্ট পাবে না একদম।
–মাইরা মাথা তুলে শ্বশুর-শাশুড়ির দিকে তাকালো। মানুষ দুটো বড্ড ভালো। তাকে তো খুব ভালোবাসে।
–ছায়রাও এগিয়ে আসলো।
–হ্যাঁ ভাবি আব্বু আম্মু একদম ঠিক বলেছেন। তুমি একদম কষ্ট পাবে না। ভাইয়ার সাথে যা হয়েছে এটা অন্যায়। কিন্তু তারপরও এতে তুমি দোষী না। এটা ভাইয়ার ভাগ্যে ছিল।
–ভাই ভাই আপনি তো জিনিয়াস। কিভাবে করলেন এটা ভাই। অবশেষে শেহরান মির্জা পদত্যাগ করে ফেলেছে। এটা একটা অসম্ভব কাজ ছিল ভাই। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।
ইলহাম ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বলল।
–বুঝলি মন্টু। যারা ধৈর্য ধরে তারা ধৈর্যের ফল পায়। আমিও পেয়েছি। বহু অপেক্ষার পরে অবশেষে আমি এই সময় পেয়েছি। শেহরান মির্জাকে একদম পথে নামিয়েছি। শুধু কালি মাখানো বাকি ছিল। ওর মুখটা যখন আমি দেখলাম। আমার যে কি শান্তি লাগলো মন্টু, তোকে বলে বোঝাতে পারবো না।
মন্টু হা হা করে হেসে ফেলল।
–ভাই আপনি সত্যিই অসাধারণ। আজকে তাহলে আমাদের ট্রিট দিবেন তো?
–আরে দিব না মানে অবশ্যই দিব।
–আচ্ছা ভাই আপনি এটা করলেন কিভাবে।
ইলহাম ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বলল।
–এটা তো রহস্য মনা। তোমার আঁদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজ কেন? যা তোরা ইনজয় কর। আমাকে একদম ডিস্টার্ব করবি না।
–আচ্ছা ভাই! মন্টু হাসতে হাসতে চলে গেল।
ইলহাম মন্টুর দিকে তাকিয়ে বলল।
–শেহরান মির্জার খেলা শেষ। ভরা পানিতে নেমেছো। আর কুমিরের কামড় খাবে না। তা হয় না।
শেহরান নিজের রুমে এসে বিছানায় বসলো। শান্ত দৃষ্টিতে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে না ওর মনে কি চলছে।
হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। ক্যাবিনেট খুলে সমস্ত জামা কাপড় বের করল। তারপরে একটি লাগেজ নিয়ে গুছিয়ে নিল। লাগেজটা বিছানার উপরে রেখে ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।
–মাইরা আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসলো। রুমের সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিল। তারপরে আস্তে করে রুমের দরজা খুলে উঁকি মারল। শেহরান রুমে নেই।
মাইরা কপাল কুঁচকে আশে পাশে চাইলো। না কোথাও নেই। ওয়াশরুম থেকে পানির আওয়াজ আসছে। হয়তো শেহরান ওয়াশরুমে।
–মাইরা চুপি চুপি রুমে ঢুকলো। বিছানার উপরে লাগেজ দেখতে পেয়ে মাইরার বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো। এখানে এত বড় লাগেজ রাখা কেন। ভাবতেই মাইরার শরীর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। উনি কি কোথাও চলে যাচ্ছে।
–মাইরা অস্থির হয়ে উঠলো। রুমের মধ্যে কিছুক্ষণ পায়চারি করলো।
–হঠাৎ ওয়াশরুমের দরজা খট করে খুলে গেল। শেহরান ভেজা তোয়ালে জড়িয়ে বাইরে আসলো।
–আজ আর মাইরা শেহরানকে দেখে লজ্জা পেল না। এই লজ্জার চেয়ে মনের ভিতরে যেই ঝড় বয়ে চলেছে তার শক্তি বেশি। মাইরা শান্ত চোখে শেহরানের দিকে তাকিয়ে আছে।
–আপনি কি কোথাও যাচ্ছেন?
–হুম! শেহরান ছোট করে উত্তর দিল।
মাইরা কিছুই বলল না। এক পা দু পা করে পিছিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।
–শেহরান আয়নার মধ্যে মাইরার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে।
–আপনি বলেছিলেন আপনি সব ঠিক করে দেবেন। আমার কষ্টের দিন শেষ হবে। আপনি সময় নিয়েছিলেন। সে আপনি আজ পালিয়ে যাবেন?
–শেহরান কিছুই বলল না। মাইরার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনল।
–আমার বেশি কিছু বলার নেই। যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন। যেভাবেই থাকবেন আমায় মনে রাখবেন। বলেই মাইরা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না রুমে। একপ্রকার দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
–শেহরান মাইরার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা বড্ড বোকা। অভিমানীও বটে। এতদিন অভিমান করেনি। যেই সুযোগ পেয়েছে এখন তার সমস্ত অভিমান জমা হয়েছে।
–ভাবতেই শেহরান মুচকি হাসলো। পরক্ষণেই মুখটা আবার গম্ভীর হয়ে গেল।
ওকে যে চলে যেতেই হবে। ও জানে মাইরাকে ছেড়ে যাওয়া তার জন্যও সহজ নয়। কিন্তু এখন তার পাশে থাকলে মাইরার জীবন আরও বেশি আলোচনায় আসবে। মানুষ যতদিন তাকে নিয়ে কথা বলবে, ততদিন মাইরাকেও টেনে আনবে। ও তো সেটা হতে দিতে চায় না। আজ ও একটা জিনিস বুঝতে পেরেছে। মাইরার কাছাকাছি থাকলে নিজেকে ও কখনোই আটকে রাখতে পারবে না। বরংচ মাইরার ক্ষতি হবে। আর সেটা শেহরান চায় না।
মাইরা রুম থেকে দৌড়ে এসে সোজা ছাদে চলে আসলো।
–মানুষ এত নিষ্ঠুর কেন। কেউ এতটা পাষাণ কিভাবে হতে পারে। একবারও কি আমার কথা মনে হয়নি। এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে? উনি তো বলেছিল। উনি সবকিছু ঠিক করে দেবে। তাহলে আমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিল। যখন প্রতিশ্রুতি রাখতেই পারবেন না। তাহলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মানে কি।
কথাগুলো ভাবতেই মাইরার মনটা বিষিয়ে উঠলো।
–ঠিক আছে উনি আমাকে ছেড়ে যদি ভালো থাকতে পারে। ভালো থাকুক। ভালো থাকুক উনি।
মাইরা ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে ফ্লোরে বসে পড়ল। দুই হাত মুখে চেপে অঝোরে কান্না করতে লাগলো। আজ আর এই কান্নার আওয়াজ ভাঙবে না।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২০
সন্ধ্যার আজান হয়ে গেছে অনেক আগে। চারিদিকে ঘন অন্ধকার। এই অন্ধকারের মাঝে কারও কান্নার আওয়াজ ভৌতিক শোনাচ্ছে। আকাশটা মেঘলা। যেকোনো সময় বৃষ্টি
নামতে পারে।
ভারি নিস্তবতা ভেদ করে কারোর পায়ের শব্দ ভেসে আসলো। মাইরা আস্তে করে মুখ তুলে চাইল সামনে।
