Home কাছে আসার মৌসুম কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৬

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৬

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৬
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

​সময়ের নিজস্ব এক জাদু আছে। সে নিঃশব্দে সবকিছু বদলে দেয়! মানুষ, অনুভূতি, সম্পর্ক; এমনকি সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলোকেও সাড়িয়ে তোলে আনন্দে। দেখতে দেখতে আজ মৌসুমের কাছাকাছি সেই গল্পের পেরিয়ে গেছে ছয় ছয়টা বছর। সাথে বদলেছে কত কী!
কত্ত মানুষের জীবনের মোড় ঘুরেছে ঘূর্ণির মতো! রায়ানের বয়সটাও ছয়ে পড়ল এবার। কিন্তু ছেলেটাকে দেখলে এটুকু আন্দাজ করা কঠিন। সমবয়সীদের চেয়ে খানিকটা লম্বা গড়ন, সোজা হয়ে দাঁড়ালে ছোট্ট বুকখানা কেমন গর্বে ফুলে ওঠে।
কিন্তু, অতিরিক্ত চঞ্চল সে! ভীষণ চতুর চাউনি ওর। এত ছোটো বাচ্চার এমন দৃষ্টি মানায় না। অতিরিক্ত ছোটাছুটি করে। স্থির থাকে না দুদণ্ড। এক মিনিটে একশো বকবক করা রায়ানের বাম হাতের খেল। আর এজন্যেই এ ছেলেকে নিয়ে তুশির চিন্তার শেষ নেই। সার্থর মতো মানুষের ছেলে এরকম হবে ও কল্পনাও করেনি। অথচ রায়ান জন্মানোর পর তুশি ভেবেছিল, আরেকটা সার্থ এসেছে এ ঘরে। হলো না তবে। জুতোর ফিতে বেঁধে দিতে দিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তুশি। পড়লও বেশ বিপাকে। রায়ান নড়ছে,দুলছে! কথা বলছে।
তুশি চ সূচক শব্দ করে বলল,

“ দাঁড়াও চুপ করে!’’
রায়ান বলল,
“ আচ্ছা মাম্মাম, কই যাচ্ছি সবাই?”
“ বললাম না,পাপা আজ এওয়ার্ড পাবে!’’
“ এওয়ার্ডটা কীসের?”
“ বললাম তো বাবা! কাল রাতেও বললাম!’’
“ আবার বলো না!”
তুশি হার মানা গলায় বলল,
“ পাপা একটা সাহসিকতার পুরষ্কার পাচ্ছে।”
“ কে কে যাচ্ছে মাম্মাম?”
“ আমি তুমি,নানাভাই, দাদাভাই যাচ্ছে।”
“ মিমি যাবে না?”
“ মিমি অসুস্থ! আর কথা না বলে,চুপচাপ একটু থাকো। দেরি হচ্ছে।”
মা-ছেলের কথার মাঝেই জুতোর ঠকঠকে শব্দ তুলে এক জোড়া পা ঘরে এসে দাঁড়াল।
জিজ্ঞেস করল ছোট শব্দে,

“ হয়েছে?”
তুশি পাশ ফিরে চাইল। পূর্ণ পুলিশি ইউনিফর্ম পরা একটা হলদে ফরসা মুখ, সটান দেহ নিয়ে সামনে এসে থেমেছে। গাঢ় রঙের নিখুঁত ইস্ত্রি করা পোশাকে সার্থকে আজ অন্য দিনের চেয়েও দীপ্ত লাগছিল। আরো অনেক বেশি ব্যক্তিত্বময়! সার্থ এখন পুলিশ সুপার (এসপি)। কাঁধে শাপলা খচিত র‍্যাঙ্ক ব্যাজটা জ্বলজ্বল করছে। বুকের ওপর ঝকঝকে নামফলক আর সারিবদ্ধ রিবন বার। কোমরে কালো স্যাম ব্রাউন বেল্ট, পায়ে পালিশ করা কালো জুতো। মাথায় পিকড ক্যাপটা পরতেই যেন তার পুরো উপস্থিতিতে এক অন্যরকম গাম্ভীর্য নেমে এলো এখানে। বছরের পর বছর দায়িত্ব, ত্যাগ আর সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে আজ তার বুকে যুক্ত হবে পিপিএম! রাষ্ট্রপতির দেয়া পদক!
তুশি মোহময় ঠোঁটে হাসল স্বামীর উজ্জ্বলতায়। বলল,

“ এইত!”
তবে রায়ান দাঁড়ায় না। ‘’ পাপা” বলে এক ছুটে দৌড়ে যায় কাছে। একটু ঝুঁকে ছেলেকে চট করে কোলে তুলল সার্থ। মাথার পিকড ক্যাপটা রায়ান তুলে নিজের মাথায় পরলো। বাবা-ছেলর কথাবার্তার ফাঁকে তুশি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ছেলের চক্করে ওর নিজের তৈরি হওয়া হয়নি। খোলা চুল, শাড়ির আঁচল ঠিকঠাক করার মাঝেই,ঘাড়ের খাঁজে تপ্ত শ্বাসের ছোঁয়ায় একটু চমকাল ও।
ব্যস্ত ভাবে বলল,
“ রায়ান আছে।”
সার্থর বলিষ্ঠ দুই হাত পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরল কোমরে। নির্লিপ্ত চিত্তে স্ত্রীর মেয়েলি শরীরের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা বাড়িয়ে বলল,

“ নিচে পাঠিয়ে দিয়েছি。”
তুশির ছটফটানো চোখ আয়নায়। এত বছরেও ওর লজ্জা কেন কমে না কে জানে! মৃদূ স্বরে বলল,
“ ভালো লাগছে? লাগছে এসপি সার্থ আবরারের স্ত্রীর মতো?”
সার্থ বলল,
“ এসপির স্ত্রী লাগার দরকার নেই। তুমি যেমন তেমনই ভালোবাসি!”
তুশি গলায় চিবুক নুইয়ে হাসল।
নিচ থেকে তক্ষুনি হাঁক ছুড়লেন সাইফুল,
“ কই রে তুশি,সার্থ! আর কতক্ষণ বুড়োগুলোকে বসিয়ে রাখবি তোরা?”
তুশি ছটফটিয়ে নিজেকে স্বামীর থেকে ছাড়িয়ে বলল,

“ আ-আসছি,আসছি আসছি!”
​রায়ানের মাথায় সার্থর পিকড ক্যাপটা সাইজে বড়ো হয়েছে। এজন্যে বারবার খুলে পড়ে যাচ্ছে। এই যে ও সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে নামল,সঙ্গে সঙ্গে পেছনের সিঁড়ির ওপর পড়ে গেল সেটা। রায়ান আবার তুলল,মাথায় পরল। আবার ছুটে নামতে গিয়ে,ওটা আবার পড়ল নিচে। ভীষণ বিরক্ত হয়ে এইবার ক্যাপটা হাতে নিয়ে একটা চর মারল ও। খিটমিটিয়ে বলল,
“ বজ্জাত ক্যাপ,চুপ করে মাথায় বসে থাক।”
তারপর আবার ক্যাপটা তালুতে চড়াল রায়ান। তবে ওর ধমক ক্যাপ মানে না। ফের বাঁদড়ের মতো লাফ দিয়ে নামতেই,ওটা আবার পড়ে গেল। রায়ান রেগেমেগে ক্যাপটা তুলে মাথায় পড়ে হাত দিয়ে চেপে ধরল এবার। নামল সেই লাফিয়ে লাফিয়েই।
একদম শেষের ধাপে এসে খুলে ফেলল। বিজয়ের হাসি হেসে বলল,
“ কী ক্যাপ? পারলি আমার সাথে?”
​সৈয়দ বাড়ির অনেক কিছু এখন আর আগের মতো নেই। জয়নব,হাসনা দুজনেই বুড়িয়ে গেছেন। জয়নব পড়েছেন বিছানায়। হাঁটাচলা করতে পারেন না। ওখানেই সব! হাসনা টুকটুক করে পিঠ নুইয়ে হাঁটেন,ওনার সাথেই থাকেন এখন। ক্লাস নাইনে পড়া পনেরো বছর বয়সি মিন্তু এখন ইউনিভার্সিটিতে পা রেখেছে। ইন্টারমিডিয়েটে জিপি-এ ফোর পেয়ে পাশ করাতে ভাবসাবই আলাদা তার। তবে সে বাড়িতে নেই। রাজশাহী থাকে,ওখানেই পড়ে। বন্ধুবান্ধব, খেলা, সব নিয়ে তার ব্যস্ততা তুমুল। অয়ন, সে এখন দেশের খুব নামকরা শিশুবিদ।

ঢাকার সব চেয়ে বড়ো হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার ও। ইউশা অন্তঃসত্ত্বা! নয় মাস শেষ হয়েছে পরশুদিন। তুশির কমপ্লিকেশন যতটা কম ছিল,ওর ততটাই বেশি। রেহণূমা মাত্রই খাওয়ার জন্যে এক গ্লাস দুধ দিয়ে গেলেন। ইউশা বসে বসে গ্লাসটা মুখের সামনে ধরল,তুরন্ত এক লাফে সামনে এসে বলল রায়ান,
“ মিমি,তুমি অসুস্থ ক্যানো?”
হঠাৎ শব্দে কলিজা ছলকে উঠল মেয়েটার। হকচকিয়েও, রায়ানকে দেখে শ্বাস ফেলল ধীরে।
“ ওহ তুমি!”
রায়ানের চুলগুলো সামনে পেছনে একদম সমান করে ছাটা। সেজন্যে ভ্রু থেকে চোখ অর্ধেক ঢেকে থাকে। ইউশা হেসে হাত দিয়ে চুলটা একপাশে আচড়ে দিয়ে বলল
“ আমি একটু অসুস্থ যে বাবাই!”
রায়ানের চুলে হাত দেয়া পছন্দ না। ইউশার আচড়ে কপাল বার করে রাখা চুলটা মূহুর্তে ও আবার টেনে টেনে ভ্রু ঢেকে দিলো।
জিজ্ঞেস করল ছুড়ে ছুড়ে,

“ তুমি অসুস্থ কই? তুমি তো হাসছো!”
তনিমা পাশেই ছিলেন। অবাক হয়ে বললেন
“ ওমা,অসুস্থ বলে কি হাসবে না?”
“ বড়ো আম্মু তো অসুস্থ, সে তো হাসে না দিদান। সারাদিন শুয়ে থাকে。”
“ ওটা অন্য অসুস্থ! মিমির পেটে একটা বাবু আছে,ওর জন্যে যেতে পারবে না।”
​রায়ান চোখ নামিয়ে ইউশার ফোলা পেটের দিকে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“ তাহলে ওকে পিটিয়ে বের করে দিচ্ছি? আমরা ব্যাটটা নিয়ে আসি দাঁড়াও।”
ঘুরে হাঁটা ধরতেই,আঁতকে ওর হাত টেনে ধরল ইউশা।
“ না না, লাগবে না। তুমি যাও বাবাই,আমি পরে কখনো যাব কেমন?”
​রায়ান মানতে পারল না। ওরা বেড়াতে যাবে আজ। সেখানে নান যাচ্ছে না,দিদান যাচ্ছে না, চাচ্চু যাচ্ছে না। মিমি যাচ্ছে না। রায়ানের মজা লাগবে এতে?”

ও এদিক ওদিক চেয়ে বড়ো মামাকে খুঁজল। প্রশ্ন করল ইউশাকে,
“ চাচ্চু কোথায়?”
“ ঘুমোচ্ছে বাবাই। কাল অনেক রাতে ফিরেছে তো।”
সার্থ নেমে এলো এর মাঝে। রায়ানের থেকে ক্যাপ নিয়ে মাথায় চাপিয়ে মায়ের কাছে এসে সালাম করল পা ছুঁয়ে। এরপর রেহণূমাকেও করল। দিদুনের সাথে ওপর থেকেই দেখা করে এসেছিল সে।
দুই মা বুক ভরে দোয়া করলেন। ইউশা ‘’ অল দ্য বেস্ট জানাল! ও ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“ দেরি হচ্ছে। এসো তুশি।”
রেহণূমা বললেন,
“ এত্ত অলস হলে দেরি হবেই তো।”
তুশি বলল – “ আমি কিছু করিনি কিন্তু। সব তোমার নাতির দোষ! মোটে শান্ত থাকে না। জামাপ্যান্ট পরাতে কী কষ্ট হয়েছে আমার!”
​শওকত আর সাইফুল লনে আগে থেকেই বসেছিলেন। দু ভাইয়ের মধ্যে মিল দিনে দিনে আরো বেড়েছে। পার্কিং এ
বড়ো গাড়িটা তৈরি। এসপি সার্থর গাড়ি আলাদা এখন। একটা বিশেষ রঙের সিকিউরিটি স্টিকার আছে এতে। সবাই মিলে একে একে চেপে বসতেই গাড়ি রাজারবাগের উদ্দেশ্যে ছুটল। শওকত সামনের সীটে বসেছেন দেখতেই “দাতাভাই আমাকে নাও”
বলে এক আহ্লাদী চিৎকার ছুড়ল রায়ান। তুশি বলল,

“ না। ওখানে কোথায় বসবে তুমি? দাদাভাইয়ের কষ্ট হবে না?”
“ আরে কীসের কষ্ট? দে তো। এসো রাজামিঁয়া ।”
শওকত দু হাত বাড়িয়ে কোলে এনে বসালেন ওকে। বংশের প্রথম প্রদীপ তার। আদর করে রাজামিঁয়া ডাকেন। তুশি ফোস করে শ্বাস ফেলল। ছেলেটা এত আশকারা পাচ্ছে। সামনে কী যে তৈরি হবে কে জানে!
​পুলিশ লাইন্সের গেইটের চারদিকে ইউনিফর্ম পরা কর্মকর্তাদের আনাগোনা। মাঠে এক রকম গম্ভীর অথচ উৎসবমুখর আবহ। এ ধরণের অনুষ্ঠানে সাধারণত প্রচুর প্রটোকল থাকে। পরিবার থেকে ১/২জনের বেশি মানুষ আনা যায় না। কিন্তু সার্থ যে নারী পাচারকারী চক্র ধরিয়ে দিয়েছিল, যে কারণে, যে সাহসিকতায় আজ তার এই বীরত্বের স্বীকৃতি, সেটা সরকার অবধি পৌঁছে গিয়েছে। সেজন্যে তার ক্ষেত্রে ভি আই পি পাস বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল বিশেষ ব্যবস্থায়!
​তুশি বেশ ঘাবড়ে যাচ্ছে। চারদিকে এত পুলিশ! এত অস্ত্র! এক সময় পুলিশ দেখলে ও উল্টোদিকে ছুট লাগাতো। ঐ ভয় হঠাৎ ফিরে আসছে ক্যানো? ও তো আর চুরি করেনি এখানে। ছোট্টো মুখটা আরো শুকনো করে এদিক-ওদিক দেখল ও।

গেইট পাসিং এর সব নিয়ম কানুন শেষ করে আসন গ্রহণের পালা এলো। এসপি সাহেবের আসন একদম স্টেজের অভিমুখে,সামনের সাড়িতে। আর ভি আইপি জোনে বসবে পরিবারের বাকিরা। সার্থকে না চাইতেও আলাদা পথ ধরতে হলো। আর তুশি, সাইফুল,শওকত এগোয় অন্যদিকে।
পথে রায়ানের গাল ধরল কেউ,কেউ কেউ হ্যান্ডশেক করল। এসপি স্যারের বাচ্চা,গদগদ বেশি। রায়ান হাঁটছিল তড়বড়িয়ে। শরীরে হাত দেয়া ওর পছন্দ না। যে যেখানে ধরে, মায়ের আঁচল তুলে মুছে ফেলে সেটা।
সামনের সাড়ির একটা চেয়ারে বসল সৈয়দ বাড়ির সকলে। স্যুটেড ব্যুটেড শওকত আলী পায়ের ওপর আরেক পা তুললেন। গর্বে তার বুকটা যে ঠিক কতখানি ছড়ানো,কাকে বোঝাবেন কী বলে বোঝাবেন! ছেলে সরাসরি রাষ্ট্রপতির পদক পাচ্ছে আজ। এই দৃশ্য দেখার পরে চোখ বুজলেও শান্তি। সাইফুল বসেছিলেন পাশে। খেয়াল করলেন ব্যাপারটা, বললেন,

“ ভাইজানের হাসি তো দেখি ধরছে না।”
শওকত আরো বেশি করে হাসলেন কথাটায়। নড়েচড়ে বললেন,
“ সার্থর যেদিন বাড়িতে এসে জানালো,আমি খুব আশা করছিলাম আমাকেও বলুক! বলেনি। পরে বিশ্বাস করতে পারিনি ও নিজে গিয়ে আসতে বলবে!”
​তুশি ছিল বাবার পাশে। কথাটা শুনল সে। মুচকি হেসে রায়ানের চুলে হাত বোলাল। বাবার সাথে সার্থর এইটুকু দুরুত্ব যে ঘুচেছে তার পেছনে এই ছোট্ট বাচ্চা ছেলেটাই তো মূল। গত পরশুর আগ অবধি বাড়ির সবাই একবার করে হলেও সার্থকে অনুনয় করেছে,বাবাকে গিয়ে যাওয়ার কথা বলতে। শোনেনি, উলটে মায়ের সাথে চ্যাঁচামেচি করেছে এক চোট। অথচ পরশু রাতে যখন বাবা ফিরতেই রায়ান ছুটে গিয়ে শুধাল,
” পাপা, দাদুভাই যাবে না?”
সার্থ থম ধরে চুপ করে রইল। তুশির মুখটা শুকনো তখন। হাঁসফাঁস করছিল। পারছিল না ছুটে গিয়ে ছেলের মুখ চেপে ধর‍তে।
রায়ান বুকে দুই হাত বেঁধে গাল ফুলিয়ে বলল,

” হুহ,তুমি কেন দাদুভাইয়ের সাথে এমন করো পাপা? আমি কি তোমার সাথে এমন করি?”
তুশি চোখ রাঙিয়ে বলল,
” রায়ান চুপ করো।”
রায়ান কষ্ট পেলো। কাঁদোকাঁদো গলায় বলল,
” কাল প্রোগ্রামে দাদুভাই না গেলে রায়ানও যাবে না।”
সার্থ শান্ত চোখে চায়। ছোট্ট বাচ্চার রাগ নিশ্চুপ চেয়ে দেখে। রায়ানের মুখটা লাল হয়ে এসছে!
ও কত কী ভাবল, উঠে বেরিয়ে গেল হঠাৎ!
তুশি উদ্বেগ নিয়ে স্বামীর পিছু পিছু আসে। সার্থকে বাবা-মায়ের দরজার সামনে দেখে থেমে যায় আবার। সার্থ টোকা দেয়ার আগেই
শওকত যেন কী কাজে বেরিয়ে এলেন।
মুখোমুখি হলো দুইজন। ছেলেকে দেখে একটু থমকালেন ভদ্রলোক। সার্থ সেদিন বলেছিল কথা বলবে,কিন্তু বলেনি। রায়ানকে কোলে দেয়ার পরদিন থেকেও সেই আগের মতোই ছিল ওনার সাথে। রয়েসয়ে শুধালেন,

” কিছু বলবে?”
সার্থর চোখ নিচে,চোয়াল শক্ত। বলল,
” আমার প্রোগ্রামে আপনিও আসবেন।”
শওকত বিস্ময় নিয়ে বললেন,
” তুমি চাও আমি যাই?”
” চাই।”
বলে দিয়েই ফিরে গেল সার্থ। তুশি অবাক হয়ে চেয়ে রইল পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানুষটার পানে। মাথায় হাত পড়তেই মুখ তুলে চাইল রায়ান।
সার্থ মুচকি হেসে বলল,
” দাদুভাই যাবেন,রায়ান খুশি?”
উচ্ছ্বল ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটা। গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
” খুব খুশি,পাপা।”
পেছন থেকে তুশি বলল,
” বাবাহ,আমি এতবার বললাম,শুনলেনই না। ছেলে একবার বলতেই ব্যাস?”
সার্থ ছেলের দিকে চেয়েই বলল,
” আমি আমার ছেলেকে সব দেবো, তুশি।
ও মুখ ফুটে শুধু বলবে,পাপা এটা চাই! আমি তাই এনে দেব। পাপা কেমন হয়,দুনিয়া দেখবে না?
” হ্যাঁ হ্যাঁ , তারপর আশকারা পেয়ে পেয়ে এটা মাথায় উঠে যাবে। কোনোদিন যদি এসে মেয়ে-টেয়ে চায় তখন?”
সার্থ হেসে ফেলল। ভ্রু কুঁচকে বলল,

” তোমার মাথাতেই আসে এসব।”
” হুহ,ধরুন হলো। তখন কী করবেন?”
সার্থ একদমে বলল,
” হোক না,সমস্যা কোথায়? ওর পাপা তো ওর মাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে বিয়ে করেছিল, ও চাইলে নাহয় পূত্রবধুও তুলে আনব।”
​“ কী ভাবছো? অ্যাই চোর!’’
তুশির ঘোর ভাঙল। তাকাল পাশ ফিরে।
অবাক হয়ে বলল,
“ এখানে কখন এলেন?”
পরপরই ভাব নিয়ে বলল,
“ আমি কিন্তু আর চোর নেই। এখন এসপি সাহেবের বউ আমি। সম্মান দিন!”
সার্থ ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ এসপির ফুল মিনিং জানো?”
তুশি চুপসে গিয়ে বলল,
“ মাত্র ক্লাস টেনে পড়ছি। এসব তো অনেক শক্ত জিনিস তাই না!”
ওরা আস্তে আস্তে কথা বলছিল। রায়ান শুনতে পাচ্ছিল না। পাপার পেটানো দেহ ঠেলে মায়ের থেকে সরিয়ে,فাঁক গলে মাথা বের করে বলল,

“ পাপা তোমরা কী কথা বলছো?”
তুশি রেগে রেগে বলল,
“ সেটাও তোমাকে বলতে হবে রায়ান? তুমি না ছোটো?”
সার্থ মৃদূ ধমকায়,
“ তুশি, বকছো ক্যানো?”
আমরা কিছু বলছি না রায়ান। তুমি পাজল মিলিয়েছ?”
রায়ান সানন্দে বলল,
“ মিলিয়ে ফেলব তো, আজকের দিনটা দাও।”
​কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রধানমন্ত্রীর আগমন, জাতীয় সঙ্গীত, আর কুচকাওয়াজের পর পালা ফুরালো অপেক্ষার।
অধীর চোখে স্টেজের পানে চেয়ে রইল তুশি। বড়ো, লম্বাটে নলে দাঁড় করানো মাইক্রোফোনের সামনে থাকা ভদ্রলোক তার দরাজ স্বরে নাম ঘোষণা করলেন,

“ এবারে প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেল, পিপিএম-বীরত্ব গ্রহণ করবেন..
সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ সৈয়দ সার্থ আবরার!”
নামটা উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই ভিআইপি গ্যালারির প্রথম সারিতে বসা সার্থ আবরারের স্ত্রী- মেহরিন রহমান তুশির শীর্ণ বুক কেঁপে উঠল গর্বে। পাশে বসা রায়ান পাজল ফেলে দুই হাত তুলে লাফিয়ে বলল,
“আম্মু, দেখো পাপা!”
সাইফুল,শওকত আপ্লুত ভঙ্গিতে দুজন দুজনের হাত চেপে ধরলেন।
মাঠের নির্দিষ্ট আসন থেকে উঠে দাঁড়াল সার্থ। গায়ে কুচকুচে কালচে নীল রঙের জমকালো ড্রেস ইউনিফর্ম, মাথায় সুসজ্জিত ক্যাপ, পায়ে চকচকে বুট। অত্যন্ত মাপা, দৃঢ় আর সুশৃঙ্খল কদমে মার্চ পাস্ট করে এগিয়ে গেল মূল মঞ্চের দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপে তার একজন বীরের প্রবল আত্মবিশ্বাস চুইয়ে পড়ল যেন।
​লাউডস্পিকারে তখন পড়া হচ্ছে তার অসীম সাহসিকতার বিবরণ;
কীভাবে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে এক সুকঠিন অভিযানে সে অপরাধী চক্রকে দমন করেছিল, কীভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে এনেছিল কয়েকশো মেয়ে।
​মঞ্চের সামনে এসে সার্থ প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি দাঁড়াল। এক হাত কপালে ঠেকিয়ে এক দুর্দান্ত, নিখুঁত রাষ্ট্রীয় স্যালুট জানাল তাকে।

​প্রধানমন্ত্রী মৃদু হাসলেন। সার্থের চওড়া বুকে পরম মমতায় আর সম্মানে পরিয়ে দিলেন চকচকে সোনালী ও লাল ফিতার সেই কাঙ্ক্ষিত মেডেল—PPM। হ্যান্ডশেক করলেন এরপর, মুখে বললেন প্রশংসাসূচক কিছু বাক্য। অফিশিয়াল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল একের পর এক। ​রাজারবাগ লাইন্সের সুবিশাল মাঠ ভেঙে পড়ল করতালির জোয়ারে। হাজারো মানুষের সেই তুমুল হাততালির শব্দে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠল। তুশির চোখটা ভিজে গেল জলে। মুখে হাসি রেখে হাত তালি দিতে দিতে ঠোঁট দুটো পিষে ধরল কান্না আটকানোর চেষ্টাতে। মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইল স্টেজের ওই মানুষটায়।
রায়ান তখনো লাফাতে লাফাতে বলছে,
“ পাপা দ্য বেস্ট,পাপা দ্য চ্যাম্পিয়ন!’’
​পুরো মাঠের সেই করোতালি চলছে তখনো। সার্থ আবরারের এত বছরের ত্যাগ, সততা আর বীরত্বের এক পরম স্বীকৃতি হয়ে বাতাসে ভাসছিল সেসব। সাথে স্মরণ করাল- ন্যায় কখনো বিফলে যায় না।
​তুশির ফোন বাজল হঠাৎ। মায়ের কল। ধরল ও। কিন্তু কথা বললেন বড়ো মা।
কান্নাভেজা কণ্ঠে ডাকলেন,

“ তুশি,তুশি রে!”
তুশির মুখটা সাদা হয়ে গেল। হড়বড়িয়ে বলল,
“ কী হয়েছে বড়ো মা?”
“ তুশি রে,ইউশাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। ওর চোখ উলটে যাচ্ছে।”
“ কীহ!”
সাইফুল পাশে থাকায় শুনতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
“ কী হয়েছে?”
তুশি এক্ষুনি বাবাকে বলতে চাইল না। বাবার বয়স হয়েছে,ভেঙে পড়বে তো! নিজে ঢোক গিলতে গিলতে বলল,​ইউশা হাস-হাসপা…” “ হাসপাতালে নিয়েছে?” “ হ-হ্যাঁ। বাবা চলো যাই।” রায়ানের হাতটা ধরতেই ও ছাড়িয়ে নিলো। “ আমি পাপার এখানে থাকব মাম্মাম。” তুশি আর জোর করে না। শওকতকে বলল, “ বাবা, তাহলে তুমি ওকে নিয়ে বসো। আমি আর বাবা যাই।” “ সিরিয়াস কিছু না তো রে তুশি?” “ না না সিরিয়াস না। তুমি থাকো বাবা। জানোই তো আমি একটু ওই ইউশাকে বেশি ভালোবাসি! আমি যাই হ্যাঁ?” বলতে বলতে আঁচল দিয়ে গলা মুখ মুছল তুশি। বাবাকে বলল – “ চলো বাবা!”
​সার্থ পদক পরা ফাঁপা বুকটা নিয়েই এক ছুটে ভি আইপি পাসের দিকে চলে এলো। কিন্তু সাইফুল আর তুশির সীটটা খালি। রায়ানের দিক চেয়ে বলল,

“ তোমার মাম্মা কোথায়?”
রায়ান মহা ধরিবাজ। ইচ্ছে করে বলল,
“ আমি জানি না। দাদাভাইকে বলে গেছে।”
সার্থ তাও বাবাকে প্রশ্ন করল না। পকেট থেকে ফোন বের করে তুশিকে কল করল,এরপর সাইফুলকে। কেউ ধরছে না।
রায়ান বলল,
“ পাপা দাদাভাই জানে তো।”
ও না চাইতেও এবার বাবার দিকে চাইল। জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায় সব?”
“ হাসপাতালে গেল। ইউশার ডেলিভারির সময় হয়েছে। আমরাও তাহলে উঠি এখন?”
“আমি গাড়ি গেইটে আনতে বলে দিচ্ছি!”
রায়ান খেয়াল করছে পাপা,দাদাভাইয়ের মুখটা চিন্তিত। মাম্মামও কেমন কেমন করে ছুটল। ও খুব কৌতূহল নিয়ে বলল,

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৫

“ আমরা এখন কই যাব পাপা?”
সার্থর কানে ফোন। ব্যস্ততা চোখেমুখে।
তাও জানাল,
“ মিমির একটা বাবু আসবে,সেখানে।”
রায়ানের কপালের ভাঁজ অমনি ত্যারা হয়ে বসল।
আবার বাবু আসবে বাড়িতে? তাও মিমির! মিমি তাহলে ওকে আদর করবে তো!

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here