Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৪৭

কাজলরেখা পর্ব ৪৭

কাজলরেখা পর্ব ৪৭
তানজিনা ইসলাম

নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই৷ চট্টগ্রাম আসার দরুন দলীয় বেশ কিছু কার্যক্রমে রাত ছিলো না। সেসব কাজ সাদিক এহসান সামলেছেন। সহযোগী হিসেবে ছিলো সুহাশ।
কিন্তু এবার সাদিক এহসান বেশিই জোড়াজুড়ি করছেন ওঁকে ঢাকা যেতে। নিজে ফোন করে বলছে না, জানেন রাত রিসিভ করলেও কথা বলবে না। তাই সুহাশ কে দিয়ে বারবার তাগাদা দিচ্ছে। যদিও রাতের আরো কিছুদিন পর যাওয়ার কথা ছিলো। তবুও সে সিদ্ধান্ত নিলো, সকাল সকালই সে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে।

রাতের একটা সমস্যা হচ্ছে, চট্টগ্রামে চলে এলে ওর আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। রোদেলা এহসান বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করেন। রাত ওনার কান্না সহ্য করতে পারে না।
সকাল হয়েছে মাত্রই। বাইরে কুয়াশার ঘনত্বে দেখা যাচ্ছে না কিছু। ভোর সাতটা। রাত পোর্চে এলো। পিছু পিছু এলো মোবারক হোসেন আর রোদেলা এহসান। রাত গাড়িতে ওঠার আগে রোদেলা এহসান আবার ওঁকে জড়িয়ে ধরলেন। রাতের মুখটা করুন। ও বারবার বলছে ওনাকে কান্না না করতে, কিন্তু ওনার কান্না থামছেই না। রোদেলা এহসান কাঁদতে কাঁদতে বললেন

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“তুমি কখন আসবে আবার? আমি খুব মিস করবো তোমাকে।”
-“চলে আসবো খুব তাড়াতাড়ি। তুমি কান্না করা বন্ধ করবে? আমার একটুও ভালো লাগছে না।তুমি চাও আমি মন খারাপ করে এখান থেকে যাই?”
রোদেলা এহসান ডানে বায়ে মাথা নাড়েন। নাক টেনে বললেন
-“আবরার তুমি আর ড্রাগস নেবে না।”
-“নিই না আমি।”
-“মিথ্যুক! মিথ্যে কেন বলছো? মা’কে কেও মিথ্যে বলে?”
-“আচ্ছা মিথ্যে বলবো না। আই প্রমিজ আমার বেশি কষ্ট না হলে ড্রাগসও নেবো না।”
-“কখনোই নেবে না। তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে আবার! তোমাকে আবার বাবা লন্ডনে পাঠিয়ে দেবে। আমি কী করে থাকবো তোমাকে ছাড়া?”
-“বললাম তো আর নেবো না।”
রাত ওনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো৷ কোমল স্বরে বললো
-“ভালো মেয়ে হয়ে থাকবে, কেমন! আমি যদি সময় মতো আসতেও না পারি, রাগারাগি করবে না।”
-“আচ্ছা।”

রোদেলা এহসান জানেন না, ড্রাগস কী! রাত কখনো ওনার সামনে এসব নেয়নি। অসহ্যরকম যন্ত্রণা না হলে ও এসব নেয়ও না। এবরোডে যাওয়ার পর ও কী করে এ নেশায় পরে গেছে ও নিজেও না। নিজের কষ্ট কমাতে কি এ খারাপ পন্হাটা বেছে নিয়েছে। ও একবার খুব অসুস্থ হয়ে পরেছিলো। ডক্টর রোদেলা এহসানকে বলেছিলো, রাতকে এসব নিতে না দিতে! এটা ভেতরে ভেতরে একটা মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়।মেরে ফেলে। এরপর থেকে রাতের প্রতি ওনার এই নিষেধাজ্ঞা টা শুরু হয়েছে। এর আগে অবশ্য মোবারক হোসেন জানলেও ওঁকে কিছুই বলতেন না। রাত ওনার বড্ড আদরের। নিজের সব আপনজনের উর্ধ্বে ও।

ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিলো। রাত একবার জানালা দিয়ে পিছু ফিরে তাকালো৷ হাত দিয়ে বিদায় জানালো, রোদেলা এহসানকে। ওনাকে মোবারক হোসেন ধরে ছিলেন। সে এখনো কাঁদছে।
রাত বাইরে তাকিয়ে আছে। ওর গায়ে একটা সাদা পাঞ্জাবি, আর মাখন রঙের চাদর। এ চাদর দিয়ে শীত মানছে না। তবুও ও উইন্ডো বন্ধ করছে না।কনকনে ঠান্ডা বাতাস হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করছে জানালা দিয়ে।

হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ড পার করার সময় রাতের হঠাৎ শ্যামাঙ্গিনীর কথা মনে পরলো। এ জায়গাটা তে সবসময় একটা জ্যাম থাকবেই। যেমন এতো সকালেও মোটামুটি একটা জ্যাম লক্ষ করা যাচ্ছে। বোরিং সময়টা রাত ফোন দেখে কাটালো না। ও জানালায় থুতনি রেখে তাকিয়ে থাকলো সরু গলিটির দিকে। চাদনীর বাড়ি হয়তো এদিক দিয়েই। আকিব শিকদার ওঁকে দাওয়াত দিয়েছিলো। ওর সময় হয়নি বেড়াতে যাওয়ার। ওর মাথা থেকেই ছুটে গেছিলো ব্যাপারটা। কিন্তু এখন গলিটির দিকে তাকিয়ে ওর মনে সুক্ষ্ম আফসোস হচ্ছে। আচ্ছা, এখন নিশ্চয়ই শ্যামাঙ্গিনী ঘুমাচ্ছে। ও যদি এখন গিয়ে শিকদার বাড়িতে উপস্থিত হয়। সে ঘুমঘুম চোখে নামবে। ওঁকে দেখে নিশ্চয়ই চোখ বড় বড় করে তাকাবে। রাত সে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করলো। আবার মাথা ডানে বায়ে নাড়িয়ে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলো ব্যাপারটা। ও কি কোনো কিশোর বা নিব্বা! এসব কি কল্পনা-জল্পনা শুরু করছে ও মাঝ রাস্তায়? তবুও ওখানে একবার যাওয়া উচিত ছিলো ওর। নাম দিতো প্রচারণার জন্য যাচ্ছে বা পরিচিতির জন্য। কিন্তু ওর উদ্দেশ্য হতো অন্য।আচ্ছা, শ্যামাঙ্গিনী কখন ঢাকায় যাবে? পরেরবার ঢাকা থেকে আসলে, ওঁকে অবশ্যই একবার শিকদার বাড়িতে যেতে হবে।

মাঝখানে কেটে গেছে কয়েকদিন। চাদনী কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।ও নিজেকে রিকোভারি চেষ্টা করছে একটু একটু করে। পড়াশোনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে সর্বোচ্চ।তবে বাড়ির কারো সাথে ও কথা বলে না। ওর কথাবার্তা শুধু বর্ষা বেগমের সাথে। এ একটা মানুষ, যার সাথে ওর কোনো দ্বন্দ্ব নেই। যে নিঃস্বার্থভাবে সবাইকে আগলে রাখে। চাদনী ছোটবেলা থেকে তাকেই মায়ের মতো ভেবে এসেছে। হ্যাঁ অনেক ক্ষেত্রে উনি চাদনীর পক্ষ নিতে পারেন না, চাদনীকে সাহারা দিতে পারেন না। ওনার নিজের মতামতেরই তো কোনো মূল্য নেই এ বাড়িতে। চাদণি অনলাইনে ক্লাস করছিলো। ও ঢাকা থেকে ওর সব বইপত্র নিয়ে চলে এসেছে। ওর আসলেই প্ল্যান ছিলো ও আর ঢাকায় ফিরবে না। কিন্তু আঁধার এসে সব ভেস্তে দিলো। কিন্তু ও আদোও কি থাকতে পারতো এখানে। ঢাকা যাওয়ার আগে যে প্রাণোচ্ছল ব্যাপারটা ছিলো ওর মধ্যে সেটা এখন আর নেই। ও এখন এ বাড়িতেও সেভাবে থাকে যেভাবে ও ঢাকার ফ্ল্যাটে থাকতে। নির্জীব, নিস্তব্ধ, সবার থেকে গা বাঁচিয়ে। ও মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলো। তক্ষুনি ধুম করে দরজা খুলে আঁধার ঢুকলো ওর কক্ষে।
চাদনী ধরফরিয়ে বললো

-“কী হয়েছে?”
-“রেডি হয়ে নে।ঢাকা চলে যাবো আমরা।”
-“হঠাৎ?বলেছি না কয়েকদিন পর।”
-“আর কয়দিন?”
চাদনী কিছুক্ষণ অবুঝ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো৷ পরক্ষনে চোয়াল শক্ত করে বললো
-“আর কোনোদিন না। যাবো না আমি।”
-“ত্যাড়ামি করবি না চাদনী। রেডি হয়ে নে, ফাস্ট। আজকে তোকে অনেক্ক্ষণ ধরে বোঝানোর সময় আমার নেই প্লিজ অবাধ্য হোসনা।”

-“হয়ছে টা কী?”
-“পরে বলবো।আগে ব্যাগ গোছা!”
চাদনী উদগ্রীব স্বরে বললো
-“ট্রেনে করে যাবো না?”
-“নাহ গাড়িতে। ট্রেনের টিকেট কাটার সময় নেই। এ বাড়িতে আর এক মুহুর্তও থাকবো না।”
-“আশ্চর্য! হয়েছে টা কী!”
-“কিচ্ছু হয়নি। ব্যাগ গোছা জলদি।”

-“না, বলো আমাকে আগে। কী হয়েছে বলো! হুট করেই বলছো চলে যাবে। আমার এখন যেতে ইচ্ছে করছে না।”
-“লিসেন,ওখানে যদি যাস আমি প্রমিস করছি আমি তোর থেকে দূরে দূরে থাকবো। কিন্তু এখানে হুটহাট কাছে আসবো। তোকে আসলে মেরে ধরে হবে না। তোর দুর্বলতা আমি বুঝে গেছি।যদি চাস আমি তোর থেকে দূরে থাকি বা আমার অপ্রত্যাশিত ছোঁয়া না চাস, তাহলে তোকে ঢাকা যেতে হবে। চয়েস ইজ ইউরস।”
চাদনী কোনো উত্তর দিলো না।শক্ত চোখে তাকিয়ে থাকলো আঁধারের দিকে।আঁধার দ্রুত ওর কাছে আসলো। চাদনী টেবিলে বসেছিলো। টেবিলের উপর এখনো মোবাইলে ক্লাস চলছে। আঁধার উদ্বিগ্ন স্বরে বললো

-“তুই আমার কথা শুনবি না চাঁদ! এ বাড়িতে থাকবো না আমি আর।তোকেও রাখবো না।এ বাড়িটা দাদিমার। আমার না। তোকে আমি আমার বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই।”
-“কী হয়েছে আগে বলো।”
-“অনেক সময় লাগবে। অতো সময় নেই আমার কাছে।”
চাদনী কিছু না বলে তাকিয়ে থাকলো ওর দিকে।আঁধার কেমন করে যেন জিজ্ঞেস করলো
-“তুই যাবি না জান?”

-“ঠিক আছে।আমি একায় চলে যাচ্ছি।”
আঁধার পিছু ফিরে চলে যাচ্ছিলো। চাদনী ব্যাকুল হয়ে ডাকলো
-“আঁধার ভাই।”
আঁধার পিছু ফিরলো। মলিন হেঁসে বললো

-“আজকের পর এবাড়িতে থাকার রুচি নেই রে আমার।তুই থাক। আমি একাই নাহয় চলে যাচ্ছি। আমি সত্যিই টায়ার্ড হয়ে গেছি রে তোকে বোঝাতে বোঝাতে। এ বাড়ির সবাই তো তোর আপন।শুধু আমিই হতে পারলাম না। আমি তোর পর হয়েই রয়ে গেলাম রে। কেন তুই আমাকে আপন ভাবতে পারলি না? ওঁদের চেয়ে আমি তোকে বেশি কষ্ট দিয়েছিলাম? অথচ ওঁদের মাফ করে দিয়ে, ওদের কাছেই থাকতে চাস। আমার থেকে দূরে যেতে চাস। এবারে তোর ইচ্ছেকেই না-হয় প্রাধান্য দিলাম।তুই থাক তোর ভালোবাসার মানুষদের সাথে। তুই আমার ভালোবাসা কোনোদিন দেখলি না। সবসময় রাগ-জেদটাকেই বড় করে দেখলি। চোখের দেখাটাই জিতে গেলো সবসময়। যাহ, আজ তোকেও জিতিয়ে দিলাম। আমি হেরেই না-হয় চলে যাচ্ছি। কিন্তু মনে রাখবি,আমার লাশের পাশের আগরবাতির ঘ্রাণ তোকে ঘুমাতে দেবে না চাদনী।আমি চলে যাওয়ার পর খুব আফসোস করবি দেখিস। অনেক মিস করবি আমাকে।”

আঁধার চলে গেলো। চাদনী নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলো দরজার দিকে। আঁধার ভাই সত্যিই ওঁকে ফেলে চলে যাবে? এটা বলতে পারলো সে?
চাদনী ধপ করে বসলো বিছানায়।চুল টেনে ধরে মেঝের দিকে দৃষ্টি তাক করলো। কোথায় যাবে ও? ওখানেও যেতে ইচ্ছে করছে না। এখানেও মন মানছে না। ও তো নিজের বাবার সাথেই কথা বলছে না। আগের মতো আর কিচ্ছু নেই। ঢাকা থেকে আসার পর সব বদলে গেছে। ওর জেনে আসা সবকিছু মিথ্যে হয়ে গেছে। ও যতোই আধারের উপর রাগ দেখাক, তবুও তো এটাই সত্য ওর পরিচয় ও আঁধারের বউ।এ বাড়ির মেয়ে পরিচয় টা তো মিথ্যে ছিলো। তাহলে সে বাড়িতে থেকে নিজের অস্তিত্ব সংকটে ভোগার চেয়ে আঁধারের সাথে চলে যাওয়ায় ভালো নয়কি।

বাড়ির পরিস্থিতি থমথমে। শুধু যে চাদনী কারো সাথে কথা বলে না এমন না। বাড়ির সদস্যরাও একে অপরের সাথে কথা বলে না। চাদনী বুঝতে পারছে, কিছু তো একটা হয়েছে। নয়তো আধার হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেবে ন্। কিন্তু ও কারো থেকে জিজ্ঞেস করতে পারছে না। চাদনী শেষমেশ রাজি হলো ঢাকা যাওয়ার জন্য। ও যখন বারান্দা দিয়ে হেঁটে সিঁড়ির কাছে যাচ্ছিলো পথিমধ্যে ওর অর্পিতার সাথে দেখা হলো।কিছু না বলে ও মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছিলো। অর্পিতা আটকালো ওঁকে।

-“চলে যাচ্ছিস!”
-“হ্যাঁ। তোমার কী?”
-“আমার তো কিছুই না। বাড়ি থেকে বিদেয় হচ্ছিস জেনে ভালো লাগলো!”
চাদনী কিছু না বলে যেতে ধরলে, অর্পিতা বাঁকা হেঁসে বললো
-“আঁধার ভাই, কী যেনো বলেছিলো,আমাকে আর আমার জামাইকে বাড়ি ছাড়া করবে। এখন সে তোকে নিয়েই বাড়ি ছাড়া হচ্ছে। বেচারা! হাহ! আমাকে অপমান করেছিলো। এখন যে নিজে জায়গা না পেয়ে চলে যাচ্ছে!”
চাদনী অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। অবুঝ স্বরে বললো
-“কী বলেছো তোমরা দাদাভাইকে?”
-“ইগো টা একটু কমাতে বলিস। এতো ইগো ভালো না।অহংকারে তো মাটিতে পা পরে না। আমার জামাইকে কতো নিচু করে কথা বলেছিলো। এতে কী তার অবস্থান উঁচু হয়ে গেছে? আমার জামাই ঠিকই আছে এখানে, তাকেই চলে যেতে হচ্ছে।”

চাদনী চোখমুখ শক্ত করে বললো
-“তোমাদের মতো নির্লজ্জ না তাই। নির্লজ্জ হলে তো অপমানিত হয়েও এ বাড়িতে পরে থাকতো। ইগোবিহীন এভাবে বেহায়ার মতো ঘরজামাই হয়ে পরে থাকার চেয়ে ইগো বেশি থাকাই ভালো। ভাগ্যেস বেশি ইগো।”
-“তুই ওইদিনের মাইর ভুলে গেছিস?”
-“তুমি মাথা ব্যাথার কথা ভুলে গেছো? আঁধার ভাই সেদিন তোমার যে চুলগুলো আস্ত রেখেছিলো, সেগুলোও রাখবে না এবারে। যার জামাই ঘরজামাই থাকে, তাকে এতো বড় বড় কথা মানায় না। আর হ্যাঁ বড় বলেই সবসময় সম্মান করে এসেছি তোমাকে। নয়তো হাত আমারও আছে। এবার আমি অবশ্যই প্রতিরোধ করবো। সম্মান তাকেই করা যায় যে সম্মানের যোগ্য।”

অর্পিতা চোখমুখ লাল করে তাকালো। চাদনী পাত্তা না দিয়ে সিঁড়ির দিকে হাটা দিলো।
ড্রইংরুমে আকিব শিকদার, অপূর্ব শিকদার, আঁধার আর বর্ষা বেগম দাঁড়িয়ে ছিলো। রাফিয়া বেগম আঁধার কে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। আধারের চোখেমুখে বিরক্তি।
-“দাদুভাই, তুমি আমাকে ভুল বুঝছো। আমি তোমাকে চলে যেতে বলিনি। তোমাকে আমি অর্পিতার চেয়েও বেশি ভালোবাসি। এটা তোমার বাড়ি।তুমি কেন চলে যাবে?”
-“এটা আমার বাড়ি না। আমার বাপেরও না। এটা তোমার বাড়ি, তুমি ডিসাইড করবে কে থাকবে না থাকবে? তুমি যেহেতু বলেই দিয়েছো এ বাড়িটা তোমার,তাই অর্পিতা এখানে ওর হাসবেন্ড কে নিয়ে থাকবে।এজন্য আমিই চলে যাচ্ছি।”

-“এটা তো আমি তোমার জন্য বলিনি। কথাটা বলেছি আমি ওই মেয়েটার জন্য। তুমি কেন চলে যাবে?”
-” ওই মেয়েটা আমার চাঁদ দাদিমা। ওর অপমান আমার অপমান না? তুমি ওঁকে কটাক্ষ করে কথাটা বলেছো, কিন্তু আমার গায়ে লেগেছে। আর আমি তো বলেই দিয়েছি, হয় এ বাড়িতে অর্পিতা থাকবে, নয়তো আমি। অর্পিতা যখন যাচ্ছে না, আমিই চলে যাই।”
-“তুই আমাকে ভুল বুজছিস দাদুভাই। কথাটা আমি ওভাবে বলতে চাইনি।”
-“তুমি বলেছো আমি ডিসাইড করার কেও না এ বাড়িতে কে থাকবে। কারণ এ বাড়িটা তোমার। আমি কারো যাওয়া থাকা ডিসাইড করছি না, কিন্তু আমি নিজে চলে যাচ্ছি।এখানে তো তোমার সমস্যা হওয়ার কথা না।”
চাদনী নিচে নামলো। রাফিয়া বেগম ওঁকে দেখেই দোষারোপ করা শুরু করলেন।

-“তোর জন্য আমার দাদুভাইটা চলে যাচ্ছে।”
-“আমি কিছু করিনি। নিজেই একমুখে ছয় কথা বলছো।”
-“দেখ আকিব দেখ, তোর বেয়াদব মেয়ে আমার সাথে কেমন করছে!”
-“কিন্তু আমি তো দেখলাম, খোঁচা প্রথমে তুমি দিলে। মেয়েটা নামতে না নামতেই দোষারোপ করা শুরু করে দিলে।”
রাফিয়া বেগম গরম চোখে তাকালেন চাদনীর দিকে।

আঁধার মনে মনে হাসলো চাদনীকে দেখে। ঠিকই তো যেতে হচ্ছে ওর সাথে। ও এজন্যই তো এতো এফোর্ড দিয়ে একা চলে যাওয়ার কথা বলা। ও কী কখনো চাদনীকে ছাড়া একা চলে যেতে পারে!যার জন্য নিজের ফাইনাল পরীক্ষা ড্রপ দিলো, নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভাবলো না,একটা বছর নষ্ট করে দিলো। শেষ সময়ে এসে তাকে না নিয়েই চলে যাবে! এমন বোকামি আঁধার শিকদার করতে পারে না। তীরে এসে তরি ডোবানোর মতো বোকা ও না। মানুষকে ঘোল খাওয়ানোতে ওর জুড়ি নেই।খুব সুন্দর করে সবাইকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে জানে। এই যে চাদনী গলে গেলো। এখানেই তো বোঝা যায় ও অভিনয়ে কতটা পারদর্শী।
চাদনী আকিব শিকদারের সাথে কথা বললো না। ওর খুব অভিমান চলছে বাবার সাথে। আকিব শিকদার মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। আরো একবার ক্ষমা চায়লেন ওর কাছে। চাদনী কিছু বললো না।
আঁধার আকিব শিকদারের থেকে বিদায় নিতে গেলো। ওনি ওর হাত ধরে আবেগে আপ্লূত হয়ে বললো

-“আমার মেয়েটাকে দেখিস বাবা।”
-“তোমার চেয়ে ভালো খেয়াল রাখবো। তুমি কখন যাবে?”
-“খুব তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করবো।”
-“ঠিক আছে তাহলে। আমি অপেক্ষা করবো। এখান থেকে তোমাকে ছুটতেই হবে চাচ্চু। এ অকৃতজ্ঞদের সাথে থেকে লাভ নেই।”
-“আচ্ছা, তুই যা তো। তোকে এতো চিন্তা করতে হবে না। ভালো করে পড়াশোনা করিস। এমনিতেই একবছর গ্যাপ গেছে।”

-“আচ্ছা।”
আঁধার উঠে বসলো গাড়িতে। চাদনী যেমন একটা বড় সাইজের ট্রলি গুছিয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলো, সেভাবে আবার সে ব্যাগ নিয়েই ঢাকা রওনা হচ্ছে। আঁধারের পাশে চাদনী বসতেই ও মুখে হাত দিয়ে হাসলো। খোঁচা মেরে বললো
-“তুই না বলেছিলি যাবি না।”
-“নেমে যাবো?”
-“যাহ।”
চাদনী নামতে গেলো। আঁধার ধরে ফেললো ওর হাত।ওঁকে এক হাতে জড়িয়ে নিয়ে বললো

-“তোকে আমি আর যেতে দিচ্ছি না।এখানেও আসতে দেবো না কোনোদিন। আমিও আসবো না, তোকেও আসতে দেবোনা।আজ থেকে আবারও তোকে নিজের বন্দী বানালাম আমি। একবার ছুটে গেছিলি বলে, খাঁচায় ভরতে অনেক এফোর্ট দিতে হয়েছে আমাকে। আর সে ভুল করছি না আমি।”

কাজলরেখা পর্ব ৪৬ (২)

চাদনী বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো আঁধারের দিকে। গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে ততক্ষণে। একটা মানুষ এতোবড় নাটকবাজ কি করে হয়! শুধু ওঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এতো কাহিণী করলো ও। এখন আবার ওঁকে আটকে রাখবে আঁধার! চাদনীর বন্দিত্বের জীবন আবারো শুরু হলো!

কাজলরেখা পর্ব ৪৮