কাজলরেখা পর্ব ৬০
তানজিনা ইসলাম
আজ ২৭ ই জুলাই। আঁধারের জন্মদিন। এ দিনটা নিয়ে আঁধার বরাবরই খুব এক্সাইটেড থাকে। ওর পরিবার, প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব সবাই এতো স্পেশাল ফিল করায় ওঁকে। না, ওর দুনিয়াতে আসায় কারো কোনো লাভ হয়নি। ও চলে গেলেও, কারো তেমন একটা ক্ষতি হবে না।সব আগের মতোই চলবে। তবুও ওরা সবাই, আঁধারের জন্মদিনে এতো কেনো খুশি হয় আঁধার জানে না। তবে আজ, আঁধারের সে উৎফুল্লতা কাজ করছে না।ওর মনে শান্তি নেই। এ বছরের জন্মদিনটা, অন্যান্য বছরের চেয়ে ভিন্ন। আঁধারের এ দিনটা নিয়ে অনেক পরিকল্পনা থাকে। তবে আজ ওর মনে শান্তি নেই। জন্মদিনের কথা মনেও ছিলো না। কাল রাত বারোটার পর থেকে ওর মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ,ইন্সটাগ্রাম ভরে গেছে জন্মদিনের শুভেচ্ছায়।
কেও ট্যাগ করে করে শুভেচ্ছা জানিয়েছে, কেও মেসেজ করেছে, কেও সরাসরি কল। এর মাধ্যমে আঁধারের মনে পরেছে আজ ওর জন্মদিন। তবে এতো এতো উইশের ভীড়ে আঁধার যাকে সবচেয়ে বেশি মিস করেছে, যার একটা টেক্সটের জন্য পুরে রাত অপেক্ষা করেছে সে-ই আঁধারকে উইশ করলো না। চাঁদনী ওঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো না। একটা টেক্সট পর্যন্ত করলো না। পাষাণী একটা! আঁধারের চুলগুলো এলোমেলো। মুখে হাসির লেশ মাত্র নেই। ও চাঁদনী কে কী বাজেভাবে যে মিস করছে! মনমরা হয়ে সোফার উপর বসে আছে আঁধার। সকালের ব্রেকফাস্টও করতে ইচ্ছে করছে না। চাঁদনী গতপরশু আকিব শিকদারের কাছে চলে গিয়েছিলো। মাঝখানে একদিন কেটে গেছে। গতকাল, আঁধার খুব ভোরে, আকিব শিকদারের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলো। পুরো রাত ঘুম হয়নি ওর। চাঁদনী ওর বলা মতো বাইরে থেকে, মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়নি। তবে চাঁদনী নিজের কক্ষে খিল দিয়ে বসেছিলো। আকিব শিকদার কে আঁধারের এতোটাও কঠোর মনে হয়নি। চাঁদনী সেখানে যাওয়ার পর আর কিছু বলেনি হয়তো তাকে। আঁধারের ওনার ব্যবহারে সেটাই মনে হলো।
আঁধার আরেকটা জিনিস খেয়াল করছে, ও চাঁদনীকে জোরাজুরি করে নিয়ে আসতে পারছে না। নয়তো ও এতো সহজে ঝেড়ে দেওয়ার বান্দা না। কিন্তু ও মেনে নিচ্ছে। ও বিরহে শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু চাঁদনীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে ওঁকে জোরজবরদস্তি করে নিয়ে আসছে না। আঁধার চাঁদনীর মতো করেই ভাবছে, চিন্তা করছে। একটা মানুষ একদিনে এতোটা ফেইডআপ হয়ে চলে যায় না। ধীরে ধীরে একটা মানুষের মনে আক্রোশ আর বিরক্তি সৃষ্টি হয়। চাঁদনীর জেদ, রাগ কোনোটাই অযৌক্তিক না। একটা মানুষ আর কতো টক্সিসিটি সহ্য করতে পারে! শুধু শাবিহার বিষয়টাই চাঁদনীর একমাত্র চলে যাওয়ার কারণ না। প্রথম থেকেই আঁধার যেভাবে একটু একটু করে ওর মন বিষিয়ে দিয়েছে। সেসবে প্রতিক্রিয়া ও একবারে দেখাচ্ছে। নয়তো ওর চাঁদ এতোটাও কঠোর না। আঁধার গত পরশু থেকে এসব ভাবছে। চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে ওর। চাঁদনী একেবারের জন্য যায়নি। রাগ গলে গেলে, ও নিজেই চলে আসবে। আঁধার জানে। চাঁদনী ওর উপর রাগ করে থাকতে পারে না। কিন্তু রাগ গলবে কখন! কখন চাঁদনী আসবে? ওঁকে ছাড়া একদিন থাকতেই তো আঁধারের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।প্রায় ৪০ ঘন্টা আঁধার চাঁদনীকে ছাড়া থেকেছে।
কতোটা কষ্ট হয়েছে ওর, চাঁদনী কে দেখতে না পেয়ে! সেটা কী চাঁদনী জানে? জানার চেষ্টা করেছে কখনো? করেনি। সে তো দিব্যি আছে। বেয়াদব একটা!
আঁধারের ফোনে কল এলো। আমান কল করেছে। ও রিসিভ করে বিষাদ স্বরে বললো
-“বল।”
-“কীরে, গলার আওয়াজ এমন কেনো?”
-“কেমন?”
-“মন খারাপ কিছু নিয়ে?”
-“না তো।”
-“আচ্ছা। তো, আসবি কখন?”
আঁধার জিজ্ঞেস করলো
-“কোথায় যাবো?”
-“কেক কাটবি না অন্ধকার? আজ তোর বার্থডে। আমরা পার্টি অ্যারেঞ্জ করেছি!”
-“হাহ! আর পার্টি। এক পার্টিই আমার জীবন তচনচ করে দিয়েছে। তোরা সবকটা কুফা।যাবো না আমি।”
-“এখনো এসব মনে নিয়ে বসে থাকলে হবে? ও, তুই চাঁদনীকে নিয়ে চিন্তা করছিস? ওর সাথে কেক কাটবি তাই না! ওর জায়গা আলাদা, অন্ধকার। বন্ধুদের জায়গা আলাদা। আমাদের সাথে কেক কেটে, তারপর রাতে ওর সাথে সেলিব্রেট করিস! কেমন? আমরা রেস্টুরেন্ট বুক করে ফেলেছি। আয় দোস্ত, প্লিজ। আর কতো পুরোনো কথা মনে নিয়ে বসে থাকবি!”
আঁধার বিষাদ হাসলো। আর বার্থডে সেলিব্রেট করা! চাঁদনী টাই তো নেই ওর কাছে। একবার উইশ পর্যন্ত করেনি। ওর সাথে আর কি কেক কাটবে! তার কি আর মনে আছে, আঁধারের জন্মদিনের কথা।
আঁধার ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললো
-“আচ্ছা, দেখি। সন্ধ্যায় আসবো।”
আমান আমতাআমতা করে বললো
-“শাবিহা বার্থডে উইশ করেছে?” ওরা কেও জানে না শাবিহার কথা। শাবিহা কী কী ঘটিয়েছে, আঁধার আবার শাবিহার সাথে কী কী করেছে। দুজনের, একজন বন্ধু হিসেবেই আমান জিজ্ঞেস করলো।
কিন্তু আঁধার স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারলো না। রেগেমেগে বললো
-“ওই মেয়ের নাম নিবি না। সবকিছু শেষ করে দিলো আমার। ওরে আমার বন্ধু বানানো, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো। ওর জন্য আমার মনে ঘৃণা ছাড়া আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। ওঁকে দেখলে বলিস, ওর মুখ যাতে আমাকে কখনো না দেখায়। আমি ওঁকে দেখলেই, ঘুষি মেরে ওর নাক ফাটিয়ে দেবো।”
আমানের কথা না শুনে,আঁধার কল কেটে দিলো। নিজের কক্ষে গিয়ে চাঁদনী কে কল দিলো বারকয়েক। চাঁদনী রিসিভ করলো না। ও গতকাল থেকে ফোন রিসিভ করাও বন্ধ করে দিয়েছে। আঁধার বেলকনিতে গিয়ে, অন্যমনস্ক হয়ে তাকালো সামনের বিল্ডিংটার দিকে। চাঁদনী গতকাল থেকে বেলকনিতেও আসেনি একবারো। অথচ আঁধার পুরোটা সময় নিজের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলো। পাখিগুলো সকাল থেকে বেশি কিচিরমিচির করছে। পালক ঝাপ্টাচ্ছে, ডাকছে কাওকে। আঁধার ওঁদের দানা আর পানি দিলো। ওরাও হয়তো আঁধারের মতো চাঁদনী কে মিস করছে। মেয়েটা তো সারাক্ষণ ওঁদের নিয়েই থাকতো। বা, হয়তো আঁধারের মতো অসম্ভব খিদে পেয়েছে ওঁদের।
কাল থেকে আঁধার কিছু খায়নি। খাবার গলা দিয়ে নামছে না৷ কী যে অসহ্য লাগছে সবকিছু। মেয়েটা একদিন ওঁকে মেরে ফেলবে। ইমোশনাল অ্যাটাচম্যান্ট হয়তো একেই বলে। ও নেই বলে, আঁধারের সব উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কিচ্ছু নেই। বুকের বা-পাশটায় খালি খালি লাগছে শুধু। চাঁদনীর মুখটা একটু দেখতে পেলেও, মনটাকে বুঝ দেওয়া যেতো। ওঁকে দেখার আশাইতো গতকালকে আকিব শিকদারের ওখানে গিয়েছিলো। চাঁদনী কক্ষে বসেছিলো, দরজা বন্ধ করে। ওঁকে দেখা দেয়নি। আঁধারের আশাও পূরণ হয়নি। তারপর এসে আঁধার পুরো সময় শুয়ে বসে ছিলো। কোনো কাজ করেনি, খায়নি পর্যন্ত। কাল শুধু শার্টটা বদলেছে। আজও ঘুম থেকে উঠেছে বেলা দুটোয়। খিদের চোটে অবস্থা খারাপ ওর। তবুও খেতে পারছে না। আঁধার ভাবলো, একবার বাইরে যাবে। এভাবে ঘরে বসে থাকতে থাকতে ওর মন অসুস্থ হয়ে যাবে। ও চাঁদনীকে স্পেস দিতে চাচ্ছে। আর কতো জোর করবে। তার চেয়ে একটু সময় নিয়ে রাগগুলোকে শান্ত করুক। কিন্তু যে অবস্থা চলছে আঁধারের, তাতে মনে হয়না ও নিজেকে বেশিক্ষণ আঁটকে রাখতে পারবে। কখন গিয়ে আকিব শিকদারের সাথে কেচাল করে, ও চাঁদনীকে বগলদাবা করে নিয়ে আসব, ও নিজেও জানে না।
আঁধার মুখ ধুয়ে নিলো। কোনোমতে শার্টটা বদলে বেরোলো অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। ও পার্কিং লট থেকে ওর বাইকটা বের করলো। বাইকটাও, ও চাঁদনীর জন্যই কিনেছিলো। চাঁদনী একবার কথায় কথায় বলেছিলো, ওর বাইক পছন্দ। বাইকে করে ঘোরার খুব শখ। আঁধার শুধু একবার বাইকে করে ঘুরতে পেরেছিলো ওর সাথে। আঁধার আকিব শিকদারের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়ালো। এখন গিয়ে নিয়ে আসবে ও চাঁদনীকে? টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসবে একদম। চাঁদনী কি বলবে, কানেও তুলবে না।
আঁধার নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে রেখে,বাইক স্টার্ট দিলো। আজ সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই।কালো মেঘের আড়ালে ঢেকে গেছে তেজস্বী সূর্য। গুড়ুম গুড়ুম ডাকে আকাশ পাতাল এক করে বজ্রপাত হচ্ছে। ঘন কালো মেঘে ছেয়ে যাওয়া পৃথিবীকে হঠাৎ আলোকিত করে বজ্র ডাক দিচ্ছে বারংবার। ওঁকে একবার নদীর পাড়ে যেতে হবে। ওখানে সবকিছু নিস্তব্ধ। আঁধারের মনের একাকিত্বতার সাথে, ওই পরিবেশটা খুব যায়।
আঁধার, নদীর পাড়ে গিয়ে একাকী বসে থাকলো অনেক্ষণ। নির্জন, জনমানবহীন একটা জায়গা। নদীর ওপারে হাট বসলেও, এদিকটায় তেমন কেও আসে না। ওর মতোই মাঝে মাঝে, দুঃখী কিছু মানুষ নিজের দুঃখ ভাগ করতে এখানে এসে বসে থাকে। ওর বসে থাকতে থাকতে সন্ধ্যা নেমে এলো। সন্ধ্যা হলেই জায়গাটাতে জোনাকিপোকা দের আনাগোনা দেখা যায়। কিছুদিন আগেই ও চাঁদনীকে নিয়ে এখানে এসেছিলো। আশেপাশে জোনাকিপোকা উড়ছে। কয়েকটা জোনাকি পোকা ওর গায়ে এসে বসলো। ওরা হয়তো আঁধারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে। আঁধার এখানে নিজের মন শান্ত করতে এসেছিলো। কিন্তু নদীর নির্মল, শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে আঁধারের ভেতরের অস্থিরতা বাড়ে। সেদিনের সাথে আজকের তুলনা করে, আঁধারের ভেতরটা শূণ্য হয়ে যায়। চাঁদনী, সেদিন ওর পাশে ছিলো। আজ নেই। সকাল থেকে আমান কল করছিলো। দুপুরের পর থেকে, রাবিব আর মাহাদীও শুরু করেছে। তবে তটিনী শুধু ওঁকে উইশ করেই কেটে পরেছে। ও নিজেও অনেক ভয়ে আছে আঁধারকে নিয়ে। আঁধারের এ ব্যাপারটা বেশ লাগে। ওর সব বন্ধুরা ওঁকে ভয় পায়।
আঁধার, মোবাইল সাইলেন্ট করে রেখেছে। ওর বন্ধুরা খুব জোরাজুরি করেছে, ওঁদের সাথে বেরোনোর জন্য। আঁধারকে সারপ্রাইজ দিবে ওরা। সেটা আঁধার জানে। প্রতিবছরই ওরা অনেক কিছু প্ল্যান করে রাখে আঁধারের জন্মদিনের জন্য।
আকাশে মেঘ জমেছে। ওর মনেও যে মেঘেদের আনাগোনা। ঝুম বৃষ্টি পরবে বোঝা যাচ্ছে। ঝড়ো বাতাস শুরু হয়েছে ইতোমধ্যেই। হুড়মুড়িয়ে বাতাস এসে, উড়িয়ে দিচ্ছে সবকিছু। ধুলো-বালি উড়ছে চারদিকে। আঁধার উঠতে গিয়েও উঠলো না। আরেকবার কল করলো চাঁদনীকে। চাঁদনী রিসিভ করলো না। আঁধার কল কেটে মেসেজ করলো
-“আসছি, আমি। আজকে যেভাবেই হোক, তোকে আমি নিয়ে আসবো। মেন্টালি প্রিপেয়ার্ড থাক।”
চাঁদনী রিপ্লাই করলো
-“যাবো না।”
-“তুই আসবি না, তোর ঘাড় আসবে। অনেক হয়েছে। আর নেওয়া যাচ্ছে না। অসহ্য লাগছে আমার সবকিছু।”
-“লাগুক। আরো অসহ্য লাগুক সবকিছু। চাঁদনী তোমার পুতুল না।”
চাঁদনী গোয়ারের মতো বললো। আঁধার আরো জেদ নিয়ে বললো
-“চাঁদনী আমার বউ। সে অধিকার থেকে, তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসবো আমি। কেও আটকাতে পারবে না। তার বাপও না।”
-“দেখা যাবে, তোমার কতো ক্ষমতা!”
-“হু, দেখাবো। আটটার মধ্যে ফ্ল্যাটে দেখতে পাবি আমাকে। আজ আমার জন্মদিন, জান। তোকে নিয়ে একসাথে কেক কাটবো।”
-“ইচ্ছে নেই আমার।”
-“তোর ইচ্ছে জানতে চায় কে? আঁধারের ইচ্ছে হয়েছে, ওর চাঁদের সাথে কেক কাটার। ও চাঁদের সাথেই কেক কাটবে। এখানে চাঁদের ইচ্ছে হোক বা না হোক।”
-“আসিও না। যাবো না আমি।”
আঁধার ওর কথা আমলে না নিয়ে বললো
-“শোন, কিছু রাখিস তো আমার জন্য। খুব খিদে পেয়েছে রে। কাল থেকে না খাওয়া। পানি খেয়ে আছি কোনোমতে।”
চাঁদনীর বুক ধ্বক করে উঠলো। মনটা ওর উতলা হয়ে গেলো নিমিষেই। ও চলে এলেই আঁধার খাওয়াদাওয়া কেনো ছেড়ে দেয়, চাঁদনী জানে না। ব্লেকমেইল করা পর্যন্ত ঠিক থাকে, কিন্তু এটা কেমন অত্যাচার নিজের উপর! চাঁদনী তড়িঘড়ি করে কল করলো আঁধারকে। আঁধার রিসিভ করতেই হুড়মুড়িয়ে বললো
-“সমস্যা কী তোমার? এমন কেনো করছো তুমি?”
-“কী করছি? সমস্যা তো তোর। আমার তো কোনো সমস্যা নেই। তুই-ই তো আসছিস না।”
-“যাওয়ার কোনো রাস্তা রেখেছো? যে, যাবো। কোনো রাস্তাই তো খুঁজে পাইনা ফিরে যাওয়ার।”
-“আমি রাস্তা বানিয়ে নিয়ে আসবো।”
-“যাবো না। পাগলামো করো না। খেয়ে নাও। কেনো এমন করছো?”
-“ওখানে গিয়ে খাবো?”
-“যাবো না আমি।”
-“আসিস না। আমি যাবো। খিদের চোটে সব ঝাপ্সা দেখছি। কিছু খাওয়াবি আমাকে।”
-“আসো, খেয়ে যাও।”
-“সত্যি?” আঁধার খুশি হয়ে বললো।
-“হুম। কিন্তু আমি যাবো না। তাড়াতাড়ি এসো।”
-“আটটার মধ্যে আসছি। তুই না আসলে, আমিই ওখানে থেকে যাবো।”
চাঁদনী কল কেটে দিলো। আঁধার চকচকে দৃষ্টিতে তাকালো স্ক্রিনের দিকে। একবার ওখানে যেতে পারলেই হবে। চাঁদনী কে মানানো ওর বাঁহাতের কাজ। আঁধার ওর নামটা এডিট করে চাঁদ নামটা কেটে দিলো। রাখলো, সেভেন মিনিটস। ওর মৃত্যুর আগের সাত মিনিট। ওর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে, সাতটা মিনিটের বেশিরভাগ জুড়েই শুধু ওর চাঁদের কল্পনা আসবে।
চাঁদনী পাংশুটে মুখে ফোনটা নামিয়ে রাখলো হাত থেকে। সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। আটটার মধ্যে আঁধার আসবে বলেছে। দু’ঘন্টার মধ্যে কিছু বানাতে হবে। কী বানাবে ও? ছেলেটা কালকে থেকে কিছু খায়নি। এমন কিছু বানাতে হবে, যেটা আঁধারের খুব প্রিয়। আঁধারের বিরিয়ানি খুব প্রিয়। চাঁদনীরও। ওঁদের দু’জনের বেশিরভাগ প্রিয় জিনিস ম্যাচ করে যায়। আঁধার ভাইয়ের যে আজ জন্মদিন ছিলো, চাঁদনীর দিব্যি মনে ছিলো। কিন্তু ও উইশ করেনি। ইচ্ছে করেই করেনি। তবে ওর খুব ইচ্ছে হলো, আঁধারের জন্মদিনে ওর জন্য স্পেশাল বিরিয়ানি বানাতে। কাকতালীয় ভাবে আঁধার লাস্ট টেক্সট করলো, ‘বিরিয়ানি রাঁধবি আমার জন্য? খেতে ইচ্ছে করছে খুব।’ চাঁদনী উত্তর দিয়েছে বানাবে।
চাঁদনী দ্রুত পায়ে কিচেনে গেলো। বিরিয়ানি বানানো মুখের কথা না। চাঁদনী, এর আগে কখনো বানায়নি। বানাতে গেলে, বেশ কসরত পোহাতে হবে ওঁকে। চাঁদনী আগে ইউটিউবে রেসিপি দেখে নিলো। সে অনুযায়ী বানানো শুরু করলো। আগে কাটিং শেষ করতে হবে। এরপর সব কাজ করবে। অনেক কাজ। দু’ঘন্টায় হয়ে যাবে হয়তো। আকিব শিকদার কিচেনের সামরে এসে অবাক হয়ে গেলেন। কিচেনের টুংটাং শব্দ শুনে উনি দৌড়ে এসেছেন। এসে দেখলেন, চাঁদনী পেয়াজ কাটছে। চোখের পানি নাকের পানি একাকার হয়ে গেছে ওর। আকিব শিকদার অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলেন
-“এসব কী? কী বানাচ্ছো তুমি?”
-“বিরিয়ানি।”
-“বিরিয়ানি! এই অসময়ে?”
-“আঁধার ভাই আসবে বাবা। আটটার মধ্যে। জানো, সে কালকে থেকে কিছু খায়নি। তার আজ জন্মদিনও। আমি উইশ করিনি জানো। এজন্য বিরিয়ানি বানাচ্ছি। একসাথে উইশ করবো। ওঁকে?
আকিব শিকদারের মুখ দিয়ে কথা বের হলো না। এই না তার মেয়ে গতকাল আঁধার এসেছিলো বলে, রুমের দরজা বন্ধ করে বসেছিলো। আঁধারের এতো ডাকাডাকি, ওঁকে রুম থেকে বের করতে পারেনি। সেখানে আজ সে একই মানুষটার জন্য বিরিয়ানি বানাচ্ছে। আহ! তার মেয়ের মুড সুইং। আকিব শিকদার বললেন
-“হেল্প লাগবে বাবার?”
-“নাহ। লাগবে না। আমি পারবো। শুনো, আমি কিন্তু যাবো না। সে এসে খেয়ে যাবে। বা, থেকেও যেতে পারে। বিশ্বাস নেই। কিন্তু, আমি যাবো না।”
-“আচ্ছা।”
আঁধার বাইকে বসতেই আকাশ কাপিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। মুখ দিয়ে চবর্গীয় শব্দ করলো আঁধার। হেলমেট না নিয়েই চলে এসেছে। বেরোনোর সময় এতো অস্থির লাগছিলো যে হেলমেট আনতেই ভুলে গেছে ও। গতকাল থেকে সব কাজ উল্টাপাল্টা হচ্ছে ওর সাথে।
আকাশ পাতাল এক করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে।আকাশপানে তাকিয়ে আকাশের কালো রূপ দেখে, আঁধার।
ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে তো বহু আগেই। কপালের বেবিহেয়ারগুলো, বৃষ্টিতে ভিজে কপালের সাথে লেপ্টে আছে। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির তোপে সবকিছু ঘোলাটে দেখা যাচ্ছে।গাড়ি ফুল স্পিডে চালানোয় আঁধারের মুখের উপর বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পরছে।এই ঝুম বৃষ্টির মধ্যে বাইক চালাতে আঁধারের বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে। প্রলয়ঙ্কারী বৃষ্টি তার দাপুটে রূপে চারপাশ গ্রাস করে নিচ্ছে। জনমানবশূণ্য রাস্তা।ক্ষণে ক্ষণে বিজলি চমকাচ্ছে,বাজ পরার শব্দ হচ্ছে। এই ভারী বর্ষণে গাড়ি নিয়ে সামনে আগাতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে আঁধারকে। তবুও থামলে চলবে না।আটটার মধ্যে ওঁকে চাঁদনীর কাছে যেতে হবে। চাঁদনী যতোই বলুক আসবে না, ও অপেক্ষা করে থাকবে আঁধারের জন্য। আঁধার চায়না চাঁদনী কে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হোক। আচ্ছা, ও বিরিয়ানি বানাচ্ছে তো না, আঁধারের জন্য! বানাবে তো বললো। ফোনটাও সাইলেন্ট করে জিন্সের পকেটে রেখেছে।
আমান, মাহাদী ওরা হয়তো কল করছে ওঁকে। আঁধার তো বলেছিলো, সন্ধ্যায় যাবে। এখন তো যেতে পারবে না। ও যে বললো, চাঁদনীর সাথে কেক কাটবে।একটা কেক কেনা দরকার। আঁধারের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।গতকাল থেকে পানি খেয়ে আছে ও। জাস্ট গলা ভিজিয়েছে এই যা। কেক কিনতে নামলে, একটা পানির বোতলও নামতে হবে। হাইওয়ে ধরে চলছে ওর বাইক। আঁধার যতো পারছে, স্পিড বারাচ্ছে। দু’ঘন্টার রাস্তা একঘন্টায় যাওয়া সম্ভব না। এমনিতেই বৃষ্টির বেগ বেশি। আঁধার আশেপাশে তাকালো। কোনো দোকান খোলা নেই। বৃষ্টির জন্য এই অসময়ে দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষজনও নেই তেমন একটা। মাঝেমধ্যে দু’একজন দেখা যাচ্ছে, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। ওরাও আঁধারের মতো বৃষ্টিতে ফেসে গেছে। আঁধার সামনে তাকালো। বাইকের ব্যালেন্স রাখা যাচ্ছে না। রাস্তা খুব পিচ্ছিল। বারবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে আঁধার। ভাগ্যেস গাড়ির সংখ্যা কম। তেমন একটা গাড়ি যাচ্ছে না ওর পাশ দিয়ে।নয়তো আঁধার নির্ঘাত গাড়ির নিচে পরতো এখন। আঁধার অন্যমনস্ক হলো৷ এমন একটা বৃষ্টিস্নাত দিনে চাঁদনী কে নিয়ে ঘোরার স্বপ্ন ওর স্বপ্নই থেকে গেলো। এবারে ও চাঁদনী কে নিয়ে এলে, এ ইচ্ছেটুকু পূরণ করবে। চাঁদনী কী আজও কক্ষের দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে? কাল যেভাবে ছিলো। না বেরোবে, একটু দেখার জন্য। চাঁদনীর কী একটুও দেখতে ইচ্ছে করছে না ওঁকে।আঁধার উদাস হয়ে ভাবছিলো এসব।
আচমকাই সামনে থেকে, একটা ট্রাক এগিয়ে এলো ওর দিকে। আঁধার সামনে তাকিয়ে গাড়ি ঘোরাতে চায়লো। কিন্তু এতোটা তাড়াহুড়োয় টার্ন নিতে গিয়ে, আঁধার বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললো। ব্রেক কষতে গিয়েও পারলো না। ট্রাকটা ছুটে এলো ওর দিকে। আঁধার বহু কষ্টে বাইক নিয়ে টার্ন নিলো ঠিকই, কিন্তু ট্রাকের চাকার সাথে বেজে বাইক কাত হয়ে নিচে পরে গেলো। ট্রাক পাশ দিয়ে চলে গেলো। পিচ্ছিল রাস্তায় আঁধার বাইক সমেত পিচলা খেয়ে দূরে গিয়ে পরলো। তক্ষুণি বিকট শব্দ করে, আরেকটা ট্রাক এসে ওর উপর দিয়ে চলে গেলো। আঁধার প্রথম কয়েক সেকেন্ড বুঝলো না ওর সাথে কী হলো! ও শুধু অনুভব করতে পারলো, ওর দেহ থেকে অনেকাংশে রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে। ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পরছে ওর মুখের উপর। লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাস্তা। সেসব আবার বৃষ্টির পানিতে ধুয়েমুছে যাচ্ছে। ওর দেহ অক্ষত থাকলো, কিন্তু ট্রাকের চাকা মাথার উপর দিয়ে গেছে। ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে ওর মুখমন্ডল। আঁধার ব্যাথা অনুভব করলো না কেনো যেনো। ওর চোখ দু’টো ঝাপ্সা হয়ে আসছে। একটু হলেই, চোখের পাতা দু’টো অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাবে। ট্রাকের গাড়ির চাকা ওর মুখের উপর দিয়ে গেছে। থেতলে দিয়েছে ওর মুখ। রক্ত চুইয়ে পরছে, ওর মাথাসহ পুরো মুখ থেকে। আঁধার শ্বাস টানতে পারে না।
নাকেও রক্ত জমাট বেঁধেছে। এতোটাই যন্ত্রণা হচ্ছে যে, আঁধার ব্যাথাও অনুভব করছে না। ওর মোবাইলটা রাস্তায় পরে রইলো। আঁধার ঝাপ্সা চোখে আকাশের দিকে তাকািয়৷ চোখের কার্ণিশ বেয়ে ওর অশ্রু গড়িয়ে পরে। ও তলিয়ে যাচ্ছে অতল গভীরে। ইশ! চাঁদনী টা যদি থাকতো। চাঁদনী থাকলে ওঁকে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতো। ওর মাথা বুকে নিয়ে বাচ্চাদের মতো কাঁদতো। ইশ! ও যে মারা যাবে, চাঁদনী তো জানতেও পারবে না। মৃত্যুর আগের সাত মিনিট নাকি মানুষের মস্তিষ্ক সজাগ থাকে।একটা মানুষ পুরো সাত মিনিট সময় তার প্রতিটা প্রিয় মানুষকে মনে করে। খারাপ স্মৃতি, ভালো স্মৃতি সব একে একে ভেসে উঠে চোখের সামনে। অথচ সে সাতমিনিট ও শুধু চাঁদনীকেই কল্পনা করে গেলো। মেয়েটার সাথে কতো কী করেছে ও! মেয়েটা ছাড়েনি ওঁকে কখনো। বারংবার আঁকড়ে ধরেছে। ওর গায়ের রং নিয়ে কতো কথা বলেছে, অহংকারের বশবর্তী হয়ে। ও চোখ বোজার আগে, ছোটবেলা থেকে কথা শোনানো, খোঁটা দেওয়া ওই শ্যামমুখটাকেই কল্পনা করে গেলো। আঁধার শেষ সময়ে এসে হয়তো রিয়ালাইজ করলো, ওর কাছে সবচেয়ে সুন্দর চাঁদনীই ছিলো। নয়তো পুরো স্মৃতি জুড়ে শুধু ওর মুখটাই কেনো!
কাজলরেখা পর্ব ৫৯
আঁধার তো সুন্দরের পূজারী ছিলো সবসময়। ওর কাছে সুন্দরের ডেফিনেশনও চাঁদনীই ছিলো। আঁধার ওর অবশ হাতটা নিজের মুখের উপর রাথে চায়লো। ও বুঝতে পারছে না, ওর মুখের কী অবস্থা! রক্ত বেয়ে পরছে শুধু। এ মুখ, সৌন্দর্য নিয়ে ওর কতো না অহংকার ছিলো! মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করতো না। নিজের মানুষটাকেই তো কতো দুঃখ দিয়ে দিলো। কোথায় গেলো সেসব! আচ্ছা, চাঁদনী ওঁকে দেখার পর কী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দূরে সরে যাবে। নাক কুঁচকে ফেলবে! না, চাঁদনী সেটা কখনোই করবে না। ও চাঁদনী! আঁধার না। ওর কাছে ওর আঁধার ভাই সবসময়, দুনিয়ার সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ। সর্বাবস্থায় আঁধার চাঁদনীর কাছে সুন্দর।আঁধার লম্বা শ্বাস নিলো। চাঁদনী অপেক্ষা করে আছে। ও যে যেতে পারছে না। এটা কেনো হলো! কেনো হলো এটা? কীসের শাস্তি দিলো ওঁকে, সৃষ্টিকর্তা? ওর যে বিরিয়ানি খাওয়া হলো না। চাঁদনীকে দেখা হলো না শেষবার। চাঁদনী, ওঁকে শেষবার দেখতে পাবে তো? আঁধার চোখ বুজে ফেললো।
প্রথম খন্ডের সমাপ্তি

Ea na mane arektu boro korle hoina api ….
আপু করলে কি আপু গো তাড়াতাড়ি পর্বগুলো দেন নাইলে অপেক্ষা করতে করতে আমরা স্ট্রোক করমু
Apu uponnash ki ses naki aro acha
Next part
গল্প টা এখানে শেষ করো না আপু আরও একটু লম্বা তো করতে পারতে
আপু এটা কি করলা এইভাবে শেষ করে দিও না আপু অনেক কষ্ট লাগতাছে ওদের মিল করে দিয়ে শেষ করে দিও এইভাবে শেষ কইরো না
আপু এটা কি করলে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে পিল্স আর একটা পাট দাউনা সেস হয়ে গেল আঁধার শিকদার আর চাঁদনী সাথে
😭😭🥹💔❤️🩹 আর আধাঁরের সাথে চাঁদনীর মিলন আর হলো না 😭😭