কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৯
তন্ময়ী তিতিক্ষা
দুপুর দু’টো। সবে দোতলায় পা রেখেছে আযরান। কিন্তু নিজেদের বাসার কাছাকাছি এসে কয়েকটা কন্ঠের হাসাহাসির শব্দ শুনেই নিমিষেই পদযুগুল থেমে গেল। কিন্তু কন্ঠগুলো চিনতে এক মূহুর্ত দেরি হলো না। সহসা আযরানের ভ্রুঁ যুগল কুঁচকে গেল। এই বাদরের দল এখানে এলো কি করে? নিজের ভাবনা আর দীর্ঘস্থায়ী না করে দ্রুত কদমে ভিতরে প্রবেশ করল আযরান। ভিতরের প্রবেশ করার সাথে সাথেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সামনে থাকা প্রত্যেকটা বান্দার ওপর। ড্রয়িংরুমের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এখানে মানুষ না, ঘূর্ণিঝড় এসে তাণ্ডব চালিয়ে গেছে।
মেঝেতে মাদুর পাতা। তার পাশেই সোফায় উল্টো হয়ে পড়ে আছে মিহির। মাথা নিচে ঝুলিয়ে পা ওপরে তুলে দিব্যি চিপস খাচ্ছে। মাঝেমধ্যে আবার মুখে চিপস পুরে নিজেই নিজেকে ফ্যান দিয়ে বাতাস করছে। তারপাশেই মেঝেতে প্রহর ঘুমে মগ্ন। তার কোলবালিশটা শক্ত করে চেপে ঘুমিয়ে আছে ছেলেটা। মুহুর্তে আযরান কপালে আরও কয়েকটা ভাঁজ দেখা দিল। প্রহর কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরে এমনভাবে ঘুমাচ্ছে যেন এটাই তার সাত জন্মের প্রেমিকা। এবার নিজের দৃষ্টি ঘুরালো আযরান রাইসা আর নীলার পানে। মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছে রাইসা। সামনে বাটি ভর্তি চানাচুর। মেয়েটা এক হাতে চানাচুর মুখে দিচ্ছে আর অন্য হাতে নীলার চুল টেনে বেণী বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। অপরদিকে নীলা পুরোপুরি কার্পেটের ওপর লেপ্টে আছে। মাথার নিচে কুশন, মুখে শসার টুকরো লাগানো। দেখে মনে হচ্ছে যেন পার্লারে ফেসিয়াল করাতে এসে ভুল করে অন্যের বাসায় ঢুকে পড়েছে। আযরান কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল সবার দিকে।পরক্ষণেই এগিয়ে গেল প্রহরদের নিকট। গিয়েই ঠাস করে লাথি বসালো প্রহরকে। বিরক্তির স্বরে বলে উঠল,
“তোরা কি গরু? যা বের হ আমার বাসা থেকে গরুর দল।”
প্রহর যেন বিরক্ত হলো। ঘুমের ঘোরে আধো আধো কন্ঠে বলে উঠল,
“সর শালা! ঘুমাবো।”
কথা শেষ না হতেই আযরান সামনে থাকা বালিশটা ছুঁড়ে মারল ওর মুখে। যা দেখে মিহির লাফিয়ে উঠতে গিয়ে চেয়ার থেকে উল্টে গেল। আযরান এবার রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীরস্বরে বলে উঠল,
“তোদের দেখে আমি অবাক হচ্ছি। আমার বাসাটাকে পুরো গরু বাজার বানিয়ে ছেড়েছিস। তোদের সাহস তো কম না।”
কথাটা কর্ণপাত হওয়া মাত্র দাঁত কিড়মিড় করল নীলা। চোখে থাকা শসাটুকু ছড়িয়ে ঝাঁঝের সহিত বলে উঠল,
“এমন করছিস কেন? তো যেন তোর বাসা আমাদের বাসা না?”
নীলার কথায় তার দিকে গম্ভীর চক্ষুদ্বয় নিক্ষেপ করল আযরান। নিজের কথা শেষ করে ফের চিল্লিয়ে উঠল নীলা,
“আর্শি দেখ তোর জামাই আমাদের তাঁড়িয়ে দিচ্ছে।”
রান্নাঘর থেকে এতক্ষণ কড়াইয়ে কিছু ভাজার টুকটুক শব্দ ভেসে আসছিল। নীলার চিৎকার শুনতেই সেই শব্দ থেমে গেল মুহূর্তে। কিছু সেকেন্ড নীরবতার পর রান্নাঘরের দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিল আর্শি। মুহুর্তে আযরানের নেত্রপল্লব শান্ত হয়ে গেল। নিষ্পলক তাকিয়ে রইল আর্শির পানে।হালকা গোলাপি রঙের ওড়নাটা একপাশে গুঁজে রেখেছে আর্শি। কপালে ঘামের ক্ষুদ্র বিন্দু বিন্দু ফোঁটা জমেছে। হাতে কাঠের খুন্তি। পাক্কা গিন্নি গিন্নি ভাব ফুঁটে উঠেছে আর্শির মাঝে। আযরানের প্রখর দৃষ্টি কেবল আর্শিতেই নিবদ্ধ। আর্শি চোখ রাঙালো। খুন্তি উঁচিয়ে আযরানকে শ্বাশানোর ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“ওদের কিছু বলবি না। নয়তো তোর কপালে দুঃখ আছে।”
কি হলো কে জানে। গম্ভীর আযরানের দৃষ্টি কেমন মিহিয়ে গেল। কিছুটা নার্ভাস হলো বোধহয়। সূক্ষ্ম একটা ঢোক আনমনে গিলতেই। কানের অতি নিকটে ভেসে এলো মিহিরের ফিসফিস করা কন্ঠস্বর,
“ভয় পেলি ভাই?”
আযরান সরু চোখে তাকালো পাশে থাকা মিহিরের দিকে। মিহির ভয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। আযরান স্বীকার করুক বা না করুক তার চেহেরায় স্পষ্ট ভয় ফুঁটে উঠেছে। গম্ভীর আযরানও বুঝি বউকে ভয় পায়?প্রহর ইতোমধ্যে উঠে বসেছে। এলোমেলো চুলে নেত্রপল্লব কচলাতে কচলাতে সামনে তাকিয়ে হাই তুলল বড় করে। তারপর পুরো পরিস্থিতি বুঝে মুখ চেপে হাসল। ঠাট্টা মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠল,
“ওস্তাদ শেষ! আর্শির এক খুন্তিতেই আযরান ঠান্ডা।”
“চুপ কর।”
আযরানের কথায় এবার রাইসা গানের সুর টানল। নিজের চুল নাড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিমায় গেয়ে উঠল,
“ভালোবাসিয়া গেলাম ফাঁসিয়া…”
আযরান বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাল সবার দিকে। কিন্তু অভ্যন্তরে অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছড়িয়ে পরেছে। সে জানে তাদের জন্যই বন্ধুরা ছুঁটে এসেছে। এইযে খালি বাসাটা হুট করে কেমন আসবাবপত্রে ভরে গেছে। সবটাই বন্ধুদের কারসাজি খুব তা খুব ভালো করেই জানে আযরান। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করল না কিছুই। বরং গম্ভীর ভাব ধরে রেখেই জুতো খুলতে খুলতে বলল,
“খাবার খেয়ে সবকটা এক মিনিটের মধ্যে বিদেয় হবি।”
তাকে কেউ পাত্তাই দিলো না। বরং আরও ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে পড়ল নিজের মতো। ধীর কদমে রান্নাঘরের দিকে এগোলো আযরান। আর্শির সমস্ত মনোযোগ রান্নার দিকে। ঠিক তার পিছনে গিয়ে থেমে গেল আযরান। একবার উঁকি দিয়ে নজর ঘুরাতেই চক্ষুদ্বয় আঁটকে গেল আর্শির ঘাড়ে। খুচরো চুলগুলো লেপ্টে আছে সেখানে। নিজেকে আর আঁটকাতে পারলো না আযরান। হাত বাঁড়িয়ে ছুঁয়ে দিল। সাথে সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো আর্শি। চমকে কিছু বলতে যাবে এর পূর্বেই ঠোঁট আঙ্গুল চেপে ধরল আযরান। নিচু স্বরে বলে উঠল,
“হুশশ! আওয়াজ করিস না।”
আযরানকে নিজের নিকটে দেখে গলা শুকিয়ে এলো আর্শির। ভাবুক হলো তার দৃষ্টি। এই সময় এখানে কি করছে এই ছেলেটা? আর্শির এমন ভাবান্তর দৃষ্টিতে আযরানের ঠোঁটে স্মিত হাসি প্রস্ফুটিত হলো। আর্শির হুশ ফিরতেই ভ্রুঁ কুঁচকে চাইল। হাতের থাকা খুন্তিতে উঠিয়ে আযরানের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“এখানে কি করছিস? জ্বালাবি না একদম। কাজ করতে দে আমাকে।”
আর্শির কথায় ভ্রুঁ উঁচু করল আযরান। তারপর একপা আরও এগিয়ে এসে দেয়ালের সাথে দুই হাত ঠেকিয়ে আর্শিকে প্রায় আটকে ফেলল নিজের মাঝে। আর্শি হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার পানে। আযরান মুচকি হেসে নিচু স্বরে বলে উঠল,
“বউ বউ ভাব দেখাচ্ছিস যে? ভালো টালো বেসে ফেললি নাকি?”
আযরানের কথায় এবার ধুম করে ঘুষি বসালো আর্শি। নিমিষেই বুকে হাত চেপে ব্যথাতুর শব্দ তুলল আযরান। কিছুটা ব্যথা পেয়েছে সে। আর্শি চক্ষুদ্বয় রাখালো। বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
“আজেবাজে কথা বলবি না। সর এখান থেকে।”
আযরান নড়ল না। বরং আরেকটু কাছে এগিয়ে মাথা কাত করে নিবিড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর্শির দিকে। রান্নাঘরের ছোট্ট জায়গাটায় কেমন অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। মাদকতায় ভরপুর চোখ দু’টো আর্শির সারামুখে বুলালো। সারামুখে কিছুক্ষণের ব্যবধানেই লজ্জার ছাপ ফুঁটে উঠেছে। লজ্জায় রাখা মুখখানা দেখে নিমিষেই আযরানের মন ভালো হয়ে গেল। দুষ্টুমির স্বরে বলে উঠল,
“যদি না সরি তো?”
“তো আর কি? ক্ষুধায় আমরা পটল তুলবো।”
হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর। দু’জনেই চমকে পিছনে তাকালো। দেখল রান্নাঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিহির। দাঁত কেলিয়ে এমনভাবে হাসছে যেন শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রহস্য উদঘাটন করে ফেলেছে। ছিটকে সরে গেল আর্শি। লজ্জায় পুরো মুখশ্রী রক্তিম বর্ণধারণ করেছে তৎক্ষণাৎ। অপরদিকে আযরান এমনভাবে তাকালো যেন এক্ষুনি গিলে ফেলবে মিহিরকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“সবকিছু তুলে রাখছি। জাস্ট তুই বিয়েটা করে নে। পইপই করে সবকিছুর শোধ তুলবো।”
পুনরায় হাতের পাটি বের করে হাসল মিহির। চিপস মুখে পুরে বলে উঠল,
“যা ইচ্ছে করিস। আপাতত এইসব বাদ দে। সিঙ্গেল মানুষ তো..তোদের লুতুপুতু দেখলে বুকে ব্যথা হয়।”
নিকৃষ্ণ আধাঁরে ছেঁয়ে আছে চারপাশ। রাতের সৌন্দর্য যেন নিস্তব্ধতা, রহস্য এবং আকাশের অসীমতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। দিনের কোলাহল শেষে রাত নিয়ে আসে প্রশান্তি। ছাদে বয়ে চলা স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে মাখতে ব্যস্ত আর্শি। চারিদিকে শীতল হাওয়া বয়ে চলেছে। হয়তো বৃষ্টি আসার পূর্বাভাস। নিজের গায়ের ওড়নাটা আরেকটু ভালো করে প্যাচিয়ে নিল আর্শি। আযরান বাসায় নেই। সন্ধ্যায় সবার সাথে সেও কোথাও একটা বেরিয়েছে। রাত নয়টা বাজতে চলল ছেলেটার ফিরার কোনো খবর নেই। ঘরের বসে বসে বিরক্তি অনুভব করছিল আর্শি তাই আর দেরি না করে চলে এসেছে ছাদে। ছাদটা একদম পুরোনো। রেলিং গুলো কেমন নড়বড়ে। ছাদের একপাশে রেলিং নেই। হয়তো সেটা ভেঙে পরে গেছে। সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচে তাকালো আর্শি। অসংখ্য মানুষের আনাগোনা নিচের সরু গলিটায়। গলির পাশের দোকানগুলোয় উপছে পড়া ভীর। সকলেই আড্ডায় ব্যস্ত। আনমনে হেসে ফেলল আর্শি। তার ভালো লাগছে সবকিছু। অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব হচ্ছে। বহুদিন পর নিজেকে মুক্ত মনে হচ্ছে। মাথায় নেই কোনো প্রকার চাপ বা ছোটমার মার খাওয়ার ভয়। অবশেষে কি তাহলে জীবনের আসল মানে খুঁজে পাচ্ছে সে? আনমনে বিরবির করল আর্শি,
“এত খুশি হোস না আর্শি। তোর কপালে সুখ বেশিদিন থাকবে না এটা তো তুই খুব ভালো করেই জানিস।”
হুট করে আসা দমকা হাওয়ায় কাঁপন ধরল আর্শির সর্বাঙ্গে।দূরে একজোড়া কাপল দাঁড়িয়ে। হয়তো তাদের মাঝে কিছু একটা হয়েছে। মেয়েটা কাঁদছে আর ছেলেটা কিছু একটা নিয়ে চেঁচাচ্ছে। নিচে দাঁড়ানো দম্পতিদের দিকে তাকিয়ে হুট করেই চোখের পাতায় নোমানের মুখশ্রীটা ভেসে উঠল। নিমিষেই অন্ধকারে ঢেকে গেল আনন্দিত মুখশ্রী। মনে পড়ে গেল নোমানের দেওয়া ধোঁকাগুলো। নেত্রপল্লব মুহুর্তে অশ্রুসিক্ত হলো। বক্ষস্থলে ভারী অনুভব হতেই হাত মুঠোবন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা চালালো আর্শি। কিছুটা সময় নিয়ে শান্ত হলোও। আকাশের পানে তাকিয়ে আনমনে গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
“প্রেমে পড়া বারণ..
কারণে অকারণ।
আঙুলে আঙুল রাখলেও হাত ধরা বারণ..”
“হাতটা না হয় ধরেই দেখ একবার।”
তড়িৎ গতিতে পিছনে ফিরল আর্শি। আযরান দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুঁজে। মুখভঙ্গি বরাবরের মতো শান্ত। আর্শির বিবর্ণ, মলিন মুখশ্রীর পানে তাকিয়ে মন্থরগতিতে এগিয়ে এলো। চারিদিকে অন্ধকারে থৈ থৈ করছে। তবুও নিচের অল্পস্বল্প আলোয় আর্শির কন্দনরত মুখটা আযরান দেখলো। হাত বাঁড়িয়ে আর্শির চোখের পানিটুকু মুছে দিয়ে শান্তস্বরে বলে উঠল,
“ভুল মানুষের জন্য নিজের মূল্যবান অশ্রু বিসর্জন দিতে নেই। আর স্বামী থাকার স্বর্তেও পরপুরুষের জন্য কান্না করাটা পাপ ছাড়া কিছুই না।”
আর্শি শুনলো। কিন্তু আজ বুঝার চেষ্টা করল না কিছু। বক্ষের মাঝে তীব্র পীড়নে আযরানের কথাটুকুও যেন অসহনীয় ঠেকছে। কিছুটা রুক্ষ কন্ঠে বলে উঠল,
“জোর খাটিয়ে বিয়ে করে নিজেকে স্বামী দাবি করা বোকামি আযরান।”
আর্শির কথাটুকু বাতাসে মিলিয়ে যেতেই চারপাশটা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দূরে কোথাও মৃদু বজ্রপাতের শব্দ হলো। আকাশজুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা। আযরান কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল আর্শির দিকে। চোখে কি কিছুটা অভিমান ভেসে উঠল? কি জানি! আর্শি দৃষ্টি সরিয়ে নিল। সে জানে না কেন এই ছেলেটার সামনে দাঁড়ালেই বুকের ভেতর এত অস্থিরতা কাজ করে। অথচ এই মানুষটার ওপর রাগ করাটাই তো উচিত ছিল তার। ঘৃণা করলেও অস্বাভাবিক হতো না। তাহলে কেন আজকাল আযরানের সামান্য স্পর্শেও বুকটা কেঁপে ওঠে? সহসা আযরান নিচু স্বরে বলে উঠল,
“বোকামি হোক। তবুও আমি তোকে নিজের স্ত্রীই মনে করি।”
আর্শি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠল,
“আমি করি না।”
কিছু প্রহর কেটে গেল নিস্তব্ধতায়। আকস্মিক আযরান হালকা মাথা নেড়ে মৃদু হেসে ফেলল। সেই হাসিতে কেমন এক ক্লান্তি লুকানো। ধীরস্বরে বলল,
“সমস্যা কি জানিস আর্শি? তুই কথায় খুব শক্ত হওয়ার চেষ্টা করিস। কিন্তু চোখদুটো তোর হয়ে মিথ্যে বলতে পারে না।”
“আজেবাজে কথা বলবি না।”
আযরান এবার ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। শান্ত গলায় বলল,
“আমি জানি তুই আমাকে এখনো মেনে নিতে পারিসনি। জোর করে তোকে এই সম্পর্কে এনেছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, তোর জীবনে আর কোনো নোমান আসতে দিব না আমি।”
নোমানের নাম শুনতেই আর্শির মুখশ্রী শক্ত হয়ে গেল। চোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু এবার গড়িয়ে পড়ল ধীরে ধীরে। অনেক চেষ্টার পরও নিজেকে শক্ত রাখতে পারল না আর্শি। ফুঁপিয়ে বলে উঠল,
“সবাই একরকম হয় আযরান। প্রথমে খুব আপন সাজে। তারপর প্রয়োজন শেষ হলে ফেলে দেয়। তুইও তাই করবি আমি জানি।”
আযরান কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। মেয়েটার কণ্ঠে ভাঙচুরের শব্দ শুনল আযরান। এতদিন শুধু রাগ দেখেছে, ভয় দেখেছে, অভিমানও দেখেছে। কিন্তু আজ যেন আর্শির ভিতরের ভেঙে পড়া মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছে। আযরান হাত বাড়ালো। আর্শি চমকে তাকালো আযরানের দিকে। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠল,
“কি?”
“হাত ধর।”
আর্শি ভ্রুঁ কুঁচকালো। মিনমিনে কন্ঠে বলে উঠল,
“ধরতে ইচ্ছে করছে না।”
“তবুও ধর।”
“জোর করবি?”
“হুম।”
অপলক দৃষ্টিতে হাতটার দিকে তাকিয়ে রইলো আর্শি। দমকা হওয়া হুঁ হুঁ করে হিম ধরিয়ে দিল সারাদেহে। সূক্ষ্ম কম্পন ধরলো আর্শির মনে। হাতটা ধরবে না ধরবে না করেও বাঁড়িয়ে দিল নিজে হাত। আযরান বুকের বাঁ পাশে আর্শির হাতটা চেপে ধরতেই থমকে গেল আর্শি। কাঁপছে!খুব দ্রুত কাঁপছে আযরানের বক্ষস্থল। যেন বুকের ভেতর কেউ অবিরাম ধাক্কা দিয়ে চলেছে। ধুকধুক শব্দে বেজে চলেছে হৃদপিন্ড নামক যন্ত্রটা। কিছু মুহূর্তের জন্য চারপাশের সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল আর্শির কাছে। শুধু শুনতে পাচ্ছে সেই উন্মত্ত হৃদস্পন্দন। আযরান শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতরের অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো। আর্শির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে এলো।আযরান নিচু স্বরে বলল,
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৮
“শুনতে পাচ্ছিস?”
আর্শি কিছু বলল না। শুধু নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আযরান মৃদু হেসে আবার বলল,
“এই জিনিসটা খুব বেয়াদব জানিস? ঠিক তোরই মতো। তুই আশেপাশে থাকলেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।”
