Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২০

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২০

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২০
তন্ময়ী তিতিক্ষা

নিস্তব্ধ পবন। আর্শি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাত তখনও আযরানের বক্ষের মাঝে চেপে ধরা। ধুকধুক শব্দটা যেন হাত বেয়ে সরাসরি ঢুকে পড়ছে আর্শির নিজের ভেতরে। আর্শি হাতটা ছাড়াতে চাইলেই ছেড়ে দিলো আযরান। একদম চুপচাপ হয়ে গেছে ছেলেটা। আযরান এবার আকাশের পানে তাকালো। পুনরায় দৃষ্টি ঘুরালো আর্শির দিকে। অদ্ভুত শান্ত সেই দৃষ্টি। ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটিয়ে আযরান বলে উঠল,
“জানিস তো আর্শি মানুষ থাকতে মূল্য দিতে জানে না। অথচ হারানোর পর আফসোস করে।”
আর্শির বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা ধাক্কা লাগল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল সে। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করল আযরানের মুখভঙ্গি। কিন্তু বরাবরের মতো ব্যর্থ হলো। আযরান হাসল অল্পবিস্তর। নিষ্প্রাণ কন্ঠে বলে উঠল,
“হারানোর ভয় অনেক খারাপ জিনিস আর্শি। যেটা আমি প্রতিমূহুর্তে অনুভব করি। সাবধান! কখনো যেন এমন না হয়..যা হারানোর ভয়ে আমি প্রতিমুহূর্তে ভীত থাকি। তা তুই নিজেই হারিয়ে ফেলেছিস।”

থমকে গেল আর্শি। আযরানের বলা এই কঠিন বাক্যটুকু বুঝতে একসেকেন্ডও সময় লাগল না। ভয়ে কুকঁড়ে উঠল ভিতরটা। কিছুক্ষণ স্তব্ধের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল আর্শি। ধীরে ধীরে অশ্রু জমতে শুরু করল চক্ষুকার্নিশে। চোখের পাতা পিটপিট করে অশ্রু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেও পারলো না। এবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকাল আযরানের দিকে। ধীর কদমে এগিয়ে গিয়ে আযরানের একহাত নিজের দু’হাতে চেপে ধরল। মুখ ঘুরিয়ে তাকালো আযরান। স্পষ্ট নজরে এলো আর্শির ভেজা আঁখিদ্বয়। আর্শির ভেজা চোখদুটোর দিকে কিছুক্ষণ স্থির তাকিয়ে রইল আযরান। হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে সামনে থাকা মেয়েটার দৃষ্টির মানে। আযরানের হাতটা আরও একটু শক্ত করে চেপে আর্শি কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল,
“আমি তোকে ভালোবাসি না আযরান…”
মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। আযরানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তবুও একটা বাক্যও ব্যয় করল না। বরং দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে রইলো আর্শির দিকে। ঠোঁট কামড়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। নিজের কথাগুলো নিজেই গুছিয়ে উঠতে পারছে না আর্শি। বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে অদ্ভুতভাবে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু এবার গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। পুনরায় মাথা উঁচিয়ে চাইল আর্শি। অশ্রুতে টলমল করতে থাকা আঁখিদ্বয় নিক্ষেপ করে কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল,

“তোকে আমি ভালোবাসি না আযরান। তবে তোকে হারাতেও চাই না বিশ্বাস কর। কেউ না জানুক কিন্তু তুই তো জা..জানিস, আমাকে ভালোবাসার কেউ নেই। কেউ না। ছোট থেকে যাদের আপন ভেবেছি সবাই কোনো না কোনোভাবে হারিয়ে গেছে। কিন্তু তু..তুই! তুই তো সেই ছোট থেকেই আমার পাশে ছিলি আযরান। আমি জানি তুই আমাকে আড়ালে থেকে সবসময় রক্ষা করতি। আমি সব বুঝতাম। তুই আমার অভ্যাস হয়ে গেছিস আযরান। ভয়ংকর রকমের অভ্যাস।”
এইটুকু বলেই থেমে গেল আর্শি। আযরান খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখে চলেছে আর্শির সমস্ত কর্মকান্ড। বুকের যন্ত্রণায় আর্শির পা দু’টো ভারী হয়ে আসছে ক্রমশ। তার জীবনে সুখ নেই তবুও সুখের প্রকট। সেও চায় অন্যসবার মতো সুখী হতে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছলো আর্শি। আচ্ছা! আযরানের বুকে একটু মাথা রাখলে কি সে রাগ করবে? আর্শি পুনরায় দৃষ্টি স্থির করল আযরানের পানে। সাহস করে এক পা এগোলো। আযরানের বুকের ঠিক মাঝে আলতো করে মাথা ঠেকিয়ে ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠল,
“প্লিজ আযরান! এমন কিছু করিস না যাতে আমাকে হারানোর ভয় কুঁড়ে খায়। আমি সেটা সহ্য করতে পারব না আযরান… একদম না।”

আর্শির শেষ কথাটুকু যেন সরাসরি গিয়ে আঘাত করল আযরানের বুকের গভীরে। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর হঠাৎই একহাতে আর্শির কোমর জড়িয়ে টেনে নিয়ে এলো একদম কাছে, অতি নিকটে। সাথে শক্ত করে মিশিয়ে নিল নিজের সাথে। আকস্মিকতায় কেঁপে উঠল আর্শি। নিঃশ্বাস আটকে এলো মুহূর্তেই। তাদের মাঝে নেই কোনো দুরত্ব। কিঞ্চিৎ ফাঁক নেই। আযরান মুখ গুঁজে দিল আর্শির ঘাড়ে। চোখদুটো বন্ধ করে গভীর শ্বাস টেনে নিল নিজের মাঝে। যেন বহুদিনের অস্থিরতা একটু একটু করে শান্ত করছে। আর্শি হকচকিয়ে গেল। শিরশির করছে পুরো শরীর। ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে সর্বাঙ্গ। তবুও নড়লো না আর্শি। সেভাবেই পড়ে রইল আযরানের বক্ষমাঝে। এভাবেই কেটে গেল বেশ খানিকটা সময়। আকস্মিক আযরান আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরল আর্শিকে ফিচেল স্বরে বলে উঠল,
“এক মিনিট! তুই কি বললি তখন? আমাকে ভালোও বাসিস না আবার হারাতেও চাস না?”
আর্শি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা তুলতেই আযরান ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

“এটা কেমন অত্যাচার মুটি?”
ভড়কে গেল আর্শি। মাথা উঁচিয়ে তাকাল আযরানের দিকে। কিন্তু চোখ রাখতে পারছে না। দৃষ্টি বারংবার এলোমেলো, অবিন্যস্ত হয়ে পড়ছে। খুব তো কথাগুলো বলে দিয়েছে। এখন তার নিজেরই কেমন লজ্জা লাগছে। আর্শি সরে আসতে চাইলো। মিনমিনে স্বরে বলে উঠল,
“ছাড়! রুমে যাবো।”
আর্শিকে রেলিং এর পাশে দাঁড় করিয়ে দিল আযরান। দুইহাত দু’পাশে রেলিং এ রেখে ঝুঁকে এলো আর্শির কাছাকাছি, অতি নিকটস্থে। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া থেমে গেলো আর্শির ক্ষণিকের জন্য। তবুও নিজেকে শক্ত করে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে রইল নিকটে থাকা মানুষটার দিকে। আর্শির মুখের দিকে চেয়ে আযরান বলে উঠল,
”প্রেম করবি মুটি?”
“নাহ!”
আযরান আড়চোখে তাকালো সামনে দাঁড়ানো আর্শির দিকে। ছিচকাঁদুনি মেয়েটা দিন দিন কেমন ঘাড়ত্যাড়া হয়ে যাচ্ছে। আযরান একদম এগিয়ে এসে নিচুস্বরে বলল,

“করলে সমস্যা কী?”
“আমি তোর বড় তাই এইসব প্রেম টেম নিষিদ্ধ। আমাকে আপু বলে….”
নিমিষেই চুপ হয়ে গেল আর্শি। কি বলতে যাচ্ছিলো ভাবতেই মনে মনে নিজের গালে চড় বসাল। আযরান ভ্রুঁ কুঁচকাল। পরক্ষণেই নাক ফুলিয়ে বলে উঠল,
“বউ হয়ে আপু ডাকতে বলছিস? আদব শিখিস নি? বেয়াদব মেয়ে। অসভ্য..ইতরনী।”
আর্শি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল আযরানের দিকে। কয়েক সেকেন্ড যেন বুঝতেই পারল না ছেলেটা ঠিক কী বলল। বুঝতে পারার সাথে সাথে রেগে বোম হয়ে গেলো আর্শি। ধুম করে কিল বসিয়ে দিল আযরানের বুকে।
‘আউচ’ শব্দ করে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল আযরান। পরক্ষণেই রেগে আর্শিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এতটা শক্ত করে ধরায় ঘাবড়ে যায় আর্শি। হাত মা নেড়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল আযরানের শক্ত বাঁধন থেকে তাকে শক্ত করে চেপে আযরান ফিচেল স্বরে বলে উঠল,
“বেয়াদব মেয়ে! স্বামীকে মারিস। আজকে দম আঁটকে তোকে মেরে ফেলবো।”

নিকৃষ্ণ কালো আধাঁরে ছেঁয়ে আছে চারপাশ। বাইরে বইছে নির্মল পবন। এ যেন কেবল নির্মল নয় সুখেরও বটে। ছাদের ওপর ঘুমন্ত অবস্থায় আযরান আর্শি। জোৎস্নার আলো দু’জনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আযরানের বুকে মাথা রেখে ঘুমে মগ্ন আর্শি। আকস্মিক কিছু একটা শব্দ কানে পৌছাতেই নড়েচড়ে উঠল আর্শি। পুনরায় আযরানের বুকে মুখ গুঁজে ঘুমে তলিয়ে যাবে এমন সময় কর্ণে এসে প্রবেশ করল নুপুরের ঝুনঝুন শব্দ। নিমিষেই কান খাড়া হয়ে গেল আর্শির। বুকের ভিতর হাতুড়ি পেটাতে আরম্ভ করল। নুপুরের শব্দটা আবারও ভেসে এলো।এবার আর্শির পুরো শরীর কেঁপে উঠল। নিঃশ্বাস আটকে এলো মুহূর্তেই। ঘুম জড়ানো চোখদুটো ধীরে ধীরে খুলে চারপাশে তাকাল সে। ছাদের চারদিক জোৎস্নার আবছা আলোয় ডুবে আছে। বাতাস বইছে ধীর ছন্দে। অথচ সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই শব্দটা কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। এবার সেই শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেল আর্শি। তার আঙুলগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে মুঠো হয়ে এলো আযরানের শার্টে। গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে ভয়ানকভাবে।

“আ..আযরান!”
কাঁপা স্বরে ডেকে উঠতেই আযরান অল্প নড়েচড়ে উঠল। গভীর ঘুমে থাকলেও আকস্মিক ডাকে কপাল কুঁচকে গেল আযরানের। আর্শি এবার আরও কাছে সরে এলো। ফিসফিসিয়ে বলল,
“আযরান..উঠ, প্লিজ উঠ।”
নুপুরের শব্দটা এবার আরও কাছে শোনা গেল। আর্শির চোখ ভিজে উঠল আতঙ্কে। হাত কাঁপছে পুরোপুরি। এবার আর্শি এক ঝটকায় আযরানের বাহু আঁকড়ে ধরে ফেলল। আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল,
“আযরান! উঠ না.. কেউ আছে এখানে!”
আর্শির আতঙ্কিত কণ্ঠ কানে পৌঁছাতেই ধড়ফড় করে উঠে বসল আযরান। ঘুমজড়ানো চোখে প্রথমেই তাকালো আর্শির পানে। ভয়ে মেয়েটার ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে প্রায়। আযরান ভ্রু কুঁচকে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই শ্রবণশক্তিতে কিছু একটা প্রবেশ করল। মুহূর্তেই আযরানের দৃষ্টি বদলে গেল। ঘুমের ঘোর একসেকেন্ডে উধাও। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো সেই সাথে। কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে বোঝার চেষ্টা করল শব্দটা। একহাতে আর্শিকে টেনে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। এতটাই কাছে টেনে নিল যে আর্শির কাঁপতে থাকা নিঃশ্বাস এসে লাগছে আযরানের গলায়। মেয়েটা অবিরামহীনভাবে কেঁপে চলেছে। আযরান অভয় দিয়ে বলল,

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১৯

“ভয় পাস না জান। আমি আছি তো।”
খুব নিচুস্বরে বলল আযরান। আর্শি নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। আযরান দৃষ্টি ঘুরালো ছাদের দরজার দিকে। সেদিক থেকেই ভেসে আসছে শব্দটা। ধীরে ধীরে নুপুরের শব্দটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ছাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। একহাতে আর্শিকে আগলে নিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ছাদের দরজার পানে। আকস্মিক কিছু একটা দেখতেই চমকে উঠল আযরান। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সেই দিকে।

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২১