কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২
তন্ময়ী তিতিক্ষা
চুপিসারে গুটিগুটি পায়ে ছাদে উঠে এলো আর্শি। মাথা থেকে ওরনাটা সরিয়ে দিতেই পিঠজুঁড়ে থাকা ঘন কালো চুল বেরিয়ে এল। একবার তাকালো হাতটার দিকে। হাতটার অবস্থা খারাপ। জ্বলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ফর্সা মুখবিবর, চোখ নাক কান্নার দরুন ফুলেফেঁপে আছে। ছাদের কিনারায় এগিয়ে যায় আর্শি। ওড়নার এককোণা ছাদের মেঝেতে স্পর্শ করছে। সেদিকে খেয়াল নেই তার। একদম কিনারা গিয়ে হাঁটুতে মাথা দিয়ে বসে পড়ল। সচ্ছ আকাশে তারারা ঝলমল করে জ্বলে চলেছে। কি অপরূপ দৃশ্য! খুব করে মুগ্ধ হলো আর্শি। হুট করে নজর আঁটকালো একটা তারাতে। যার আশেপাশে আর কোনো তারা নেই। একদম একা ঠিক তারই মতো।
আর্শি ছোট থেকেই সৎমায়ের মার খেয়েই বড় হয়েছে। পরিস্থিতির কারনে চাইলেও সাহসী হয়ে উঠতে পারেনি। উল্টো হয়েছে ভীতু, যে কিনা ছোট মায়ের মার খাওয়ার ভয়ে সবসময় আড়ষ্ট হয়ে থাকে। কত আঘাত সহ্য করেছে এইটুকুনি জীবনে। হাতের মতো পুরো শরীরের দাগের অভাব নেই। আর্শির সয়ে গেছে সব। জানেও না কবে মুক্তি মিলবে এই অন্ধকার জীবন থেকে। হুট করে কারো ডাক শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করতেই মাথা ঘুরিয়ে চাইল আর্শি। নিধি দাঁড়িয়ে। সম্পর্কে তার চাচাতো বোন। ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল নিধি। মৃদু স্বরে বলে উঠল,
“এখানে কি করছিস আপু? তাও একা একা?”
“কিছুই না এভাবে ভালো লাগছে।”
নিধি এগিয়ে এল। ঠাস করে বসে পড়লো আর্শির ঠিক পাশে। নিনির্মেষ চেয়ে তাকিয়ে রইল আর্শির পানে। হুট করে বলে উঠল,
“তোর খুব কষ্ট হয় তাই না আপু? ছোট মা তোকে খুব মারে?”
আর্শি ফিরে চাইল। নিধির বাচ্চা বাচ্চা মুখটায় একবার চক্ষুদ্বয় বুলিয়ে নিল। ঠিক তার বড়চাচার মতো হয়েছে নিধি। নিধিরা এসেছে তাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে এর দরুন হয়তো কাল পরশু চলেও যাবে। আবার সে একা হয়ে যাবে এই দমবন্ধ করা বাড়িটাতে। আবার সহ্য করতে হবে ছোটমার কটুবাক্য। অভ্যন্তর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আর্শির। বড়মা খুব করে চাইতো তাকে নিজের কাছে নিয়ে যেত। কিন্তু কোন এক কারনে বড় চাচা তাকে পছন্দ করে না। কিন্তু কেন করে না তা তার জানা নেই। নিধি পুনরায় বলে উঠল,
“আপু তুমি ঢাকায় যাবে না? চলো না এবার আমাদের সাথে আমাদের বাড়ি। আমরা সবাই একসাথে থাকবো।”
আর্শি হাসল। প্রাণখোলা হাসি। আলতো করে হাত রাখল নিধির মাথায়। চুলে হাত বুলিয়ে বলে উঠল,
“যাবো তো তবে তোদের বাসায় নাহয় আরেকদিন যাবো।”
“কালকে গেলে কি হয়? তুমি আর ভাইয়া একি ভার্সিটিতে পড়ো। কখনো কখনো বাসায় আসলেও পারো তাই না?”
আর্শির সারামুখে ম্লান হাসির রেশ। মুখশ্রী ক্লান্তিতে ছেঁয়ে আছে। শান্ত স্বরে বলে উঠল,
“চাইলেই তো যাওয়া যায় না নিধু। সারাদিন আমি ব্যস্ত থাকি সময় করতে পারি না। কোনো একদিন যাবো প্রমিজ।”
হঠাৎ করেই ভারী পদশব্দ ভেসে আসতেই দুজনে সেদিকে ফিরে তাকাল। ছাদের দরজা ঠেলে প্রবেশ করল একজন যুবক। লম্বা বলিষ্ট দেহে টিশার্ট আর্টশাট বেঁধে আছে। মৃদু হাওয়ার তালে তালে কপালের সামনে পড়ে থাকা চুলগুলো সামান্য দুলছে। চোখদুটো তীক্ষ্ণ, গম্ভীর। তাকে দেখা মাত্র নিধিদ মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“ভাইয়া!”
আযরান একবার আঁখিদ্বয় বুলাল চারপাশে। তারপর দৃষ্টি গিয়ে থামল আর্শির ওপর। মাটিতে বসে থাকা মেয়েটার এলোমেলো চুল, কান্নায় ফুলে থাকা চোখ, হাতের পোড়া অংশ কোনোটাই দৃষ্টি এড়ালো না। কিন্তু মুখশ্রী একদম ভাবলেশহীন। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে গম্ভীর স্বরে বলল,
“নিধি, মা তোকে খুঁজছে।”
নিধি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“এখনই যেতে হবে নাকি?”
“হুম।”
নিধি বিরক্তিভরে উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে আর্শির দিকে ঝুঁকে মৃদুস্বরে বলল,
“আমি পরে আবার আসবো আপু।”
আর্শি কিছু বলল না। কেবল মাথা নাড়ল। নিধি চলে যেতেই পুনরায় নিরবতা এসে ভীর করল ছাদ জুঁড়ে। আর্শি নিশ্চুপ! সামনে থাকা ছেলেটার সাথে সে কোনো কথাই বলতে চায় না। আযরান পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়াল। দৃষ্টি স্থির করল সামনে থাকা মেয়েটার পানে। শান্ত স্বরে বলে উঠল,
“আপনার ড্রামা শেষ হয়নি?”
আর্শি নিরুত্তরভাবে তাকাল। আঁখিদ্বয়ে স্থান পেয়েছে একরাশ অভিমান। একবার তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে আবার অন্যদিকে তাকাল। আর্শির এহেম কান্ডে কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পরল আযরানের। গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“ম্যাডামের ভাব বেড়েছে নাকি? এখন কাউকে পাত্তা দেওয়ারও দেখি সময় নেই।”
“তুই আমার সাথে কথা বলিস না আযরান।”
“কে বললে কি করবি?”
আর্শি এবার মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। চোখদুটো তখনও লালচে, কান্নার দাগ স্পষ্ট। কিন্তু সেই দৃষ্টিতে আজ অদ্ভুত এক অভিমান জমে আছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎই মৃদু স্বরে বলে উঠল,
“কারণ তুইও সবার মতো কথা শুনিয়েছিস।”
আযরানশুনল কথাটা। পরক্ষণেই শান্তস্বরেই বলে উঠল,
“কি কথা শুনিয়েছি?”
আযরানের দিকে এবার সরাসরি ফিরে চাইল আর্শি। চক্ষুদ্বয় ছলছল করে উঠল অশ্রুতে। আযমান নির্বাক থাকল। শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সামনে থাকা মেয়েটার দিকে। আর্শি ধরা গলায় অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল,
“সবাই আমাকে মোটা বলতো আমি সহ্য করে নিতাম। কি..কিন্তু তুই আমার বেস্টফ্রেন্ড। ছোটবেলার সুখ দুঃখের সাথী হয়েও কি করে মুটি বললি? জানিস আমি কতটা কষ্ট পেয়েছি? আমার ভিতরে থাকা যন্ত্রণাগুলোর কথা তুই জানিস না আযরান। এতদিন তোকে সব বললেও এখন থেকে তোকেও কিছু বলবো না৷ তুইও একটা পাষাণ মানুষ।”
একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল আর্শির কপোল বেঁয়ে। ছেলেটা দূর্বোধ্য হাসল। শুধু নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর্শির দিকে। হুট করে আর্শির দিকে চেয়ে ভারী কন্ঠে বলে উঠল,
“এইদিকে আয় তোকে গালে একটা ভালোবাসা দেই।”
মূহুর্তে কান্না ভুলে চোখ কটমট করে চাইল আর্শি। এই ভালোবাসা দেই বলেই ছেলেটা সবসময় তাকে মেরে বসে। নাক ফুলে উঠতেই আযরানের ঠোঁটের কোণে হালকা দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। আর্শি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“একদম কাছে আসবি না। এবার চড় মারলে তোকে আমি থাপড়াবো বলে দিলাম।”
রাগে মুখটা লাল হয়ে গেল আর্শির। কপাল কুঁচকে সেদিকেই তাকিয়ে রইল আযরান। হুট করে বসে পড়ল আর্শির থেকে দূরত্ব রেখে। দুর্বোধ্য হেসে বলে উঠল,
“তুই আগের মতোই আছিস আর্শি। ছোটবেলার মতোই কান্নাকাটি করা মুটি।”
আর্শি থমকে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকাল আযরানের দিকে।
“আবার বললি?”
আযরান ভ্রুঁ উঁচাল। অবুঝের ন্যায় বলে উঠল,
“কি বললাম?”
“মুটি!”
“হুম, তো?”
আঁধারে ছেয়ে গেল আর্শির মুখশ্রী। তমসার ঘোর আঁধারে বিলিন হয়ে গেল আর্শির রাগেরা। সেখানে এসে স্থান পেল একরাশ মলিনতা। মন খারাপ করে বলে উঠল,
“তুই খুব খারাপ আযরান। খুবই খারাপ।”
আযরান এবার আর হাসল না। একটু চুপ করে তাকিয়ে রইল আর্শির দিকে। ছাদের মৃদু বাতাসে আর্শির চুলগুলো উড়ে চলেছে। এলোমেলো চুলের ফাঁকে ভেজা নেত্রপল্লব দুটো আরও খানিকটা বড় দেখাচ্ছে। কেটে যায় খানিকটা প্রহর। আযরান ধীর স্বরে বলল,
“খারাপ হলে কি হয়েছে? তোর সাথে খারাপই থাকবো।”
আর্শি কিছু বলতে যাবে এরপূর্বেই হঠাৎ করেই মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। আর্শি চমকাল। ওড়নার ভাঁজ থেকে মোবাইলটা বের করল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই মুখের অভিব্যক্তি এক মুহূর্তে বদলে গেল নিমিষেই। ফোনের স্ক্রিনে ঝলঝল করছে,
“নোমান কলিং!”
আর্শির মুখের অভিব্যাক্তি বদলে গেল। ওষ্ঠের কোণে ফুঁটে উঠল মুচকি হাসি। যা সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খেয়াল করল আযরান। তার মুখশ্রী একদম স্বাভাবিক। আর্শি তড়িঘড়ি করে ফোনটা রিসিভ করল।
“হ্যালো।”
ওপাশ থেকে নোমানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“কোথায় তুমি?”
“বাসায়..ছাদে।”
“একা?”
“হুম।”
আর্শি আর একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। যেন আযরানের কানে কথাগুলো না পৌঁছায়। আযরান দাঁড়িয়ে বসে রইল আগের জায়গাতেই। কিন্তু তার দৃষ্টি একবারও সরল না আর্শির দিক থেকে। মেয়েটার মুখটা যেন এখন উজ্জ্বলতায় ভরে গেছে। ভালোবাসার মানুষের সাথে কথা বলার সময় বুঝি মেয়েদের চেহেরা এভাবেই উজ্জ্বল হয়ে উঠে? কি জানি! হয়তো। আযরান দৃষ্টি ফিরাল। বিস্তর আকাশের পানে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। অদ্ভুত সুন্দর আজকের আকাশটা। সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আযরান আওড়াল,
“মানুষ ভুলকে ফুল ভেবে আঁকড়ে ধরে। অথচ তারা ভুলেই যায় কিছু কিছু ফুলেও বিষাক্ত কাঁটা লুকিয়ে থাকে। বারবার কাঁটার আঘাত পেয়েও কিছু মানুষ ভুলকেই আবার ফুল মনে করে বুকের বাঁ পাশে স্থান করে দেয়।”
আযরান ঢাকা ফিরে গেছে। কথাটা শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করতেই প্রচন্ড অবাক হলো আর্শি। মুখভঙ্গি একদম নির্বাক। কিন্তু আযরানের তো আর্শিকে নিয়ে একত্রে ফিরে যাওয়ার কথা তাহলে? হুট করে কি হলো ছেলেটার? সকাল সকাল নাস্তা বানানোর সময় কথাটা কানে এসেছে তার। বড়মা আর নিধিকে ফেলেই চলে গেছে ছেলেটা। আর্শি চিন্তিত হলো। কিন্তু তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না দিনা হায়দার প্রবেশ করায়। তিনি ঢুকেই কর্কশ কন্ঠে বলে উঠল,
“কিরে নবাবজাদী! তোর নাস্তা বানানো এখনো শেষ হয়নি? সবাইকে খালি পেটে মারবি?”
“এই তো শেষ ছোটমা। আর একটু।”
কথাটুকু বলেই দ্রুত হাত চালাল আর্শি। দিনা হায়দার ভেংচি কাটলেন। কোনো কারন ছাড়াই বলে উঠল,
“একেকজনের ঢং এর শেষ নেই বাব্বাহ! একজনের হাত চলে না। আবার আরেকজন বিয়ের জন্য লাফাচ্ছে। কত নাটক যে দেখবো। যত্তসব!”
আর্শি অবাক নেত্রে চাইল। বিয়ে? কে আবার বিয়ের জন্য লাফাচ্ছে? আর্শির মনটা উশখুশ করে উঠল। তবে সাহস করে জিজ্ঞাসও করতে পারছে না। যদি আবার ছোটমা রেগে যায়? শেষমেষ টিকতে পারল না। সাহস সঞ্চার করে মিনমিন করে বলেই ফেলল,
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ১
“কে বিয়ের জন্য লাফাচ্ছে ছোটমা?”
দিনা হায়দার তাকাল। মুখে একরাশ বিরক্তির ছড়াছড়ি। তীর্যক কন্ঠে বলে উঠল,
“কে আবার আছে না একজন, আযরান! তোর তো আবার পরানের বন্ধু যত্তসব।”
