Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৩

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৩

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৩
তন্ময়ী তিতিক্ষা

“বাড়ি ফিরে চলো আযরান। তোমার মা তোমার জন্য প্রতিদিন কাঁদে।“
সামনে বসে থাকা শাহরিয়ার হায়দারের কথায় গম্ভীর চক্ষুদ্বয় তুলে তাকালো আযরান। তবে কোনো প্রকার বাক্য ব্যয় করার প্রয়োজনবোধ করল না। মিস্টার শাহরিয়ার ছেলের মুখে একবার চক্ষুদ্বয় বুলিয়ে পুনরায় গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,

“নিজের অবস্থাটা একবার দেখেছো? কি অবস্থা হয়েছে। গত ১৫দিন বাড়ির বাইরে থেকেছো আর কত? এবার জেদ না করে বাড়ি চলো।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আযরান। ঘাড় বাঁকিয়ে পরিবেশটা চোখের পাতায় বন্দি করে নিল একবার। সুন্দর একটা রেস্টুরেন্ট। যদিও তার এখানে আসার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। তবে বাবার মন রক্ষার্থে অনেকটা বাধ্য হয়ে এসেছে। পুনরায় নজর ঘুরালো আযরান। দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বাবার পানে। কিছুটা নমনীয় স্বরে বলে উঠল,
“আর্শিকে যোগ্য মর্যাদা দিলে তবেই আমি ওই বাড়িতে ফিরবো এর আগে না।”
শাহরিয়ার হায়দার ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালেন। কথাটা তার খুব একটা পছন্দ হয়নি। ছেলেটা মাথা পুরোই গেছে। এবার তিনি কিছুটা ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠল,

“কি আছে ওই মোটা মেয়ের মাঝে? যার জন্য তুমি পরিবারকে ছেড়ে দিলে?”
আযরানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রাগে ধপ করে জ্বলে উঠল আযরানের মস্তিষ্ক। আর্শিকে নিয়ে একটা বাজে কথাও সে শুনতে চায় না। কয়েক সেকেন্ড স্থির চক্ষে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। তারপর চেয়ারটা টেনে সোজা হয়ে বসল আযরান। তীর্যক চক্ষুদ্বয় মেলে বলল,
“আর একটা বার আর্শিকে নিয়ে অসম্মানজনক কিছু বলবেন না।
শাহরিয়ার হায়দার ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফেললেন। ছেলের কথা প্রেক্ষিতে বললেন,
“সত্যি কথাই তো বলেছি। তোমার মতো ছেলের পাশে ওকে মানায়? মানুষ হাসে জানো?”
আযরান এবার নিচু স্বরে হাসল। অদ্ভুত সেই হাসি। চোয়াল শক্ত আযরানের। সারামুখ রক্তিম আভায় ছেঁয়ে আছে রাগে। সামনে বসা মানুষটা তার বাবা না হলে নিশ্চয়ই এতক্ষণে কিছু একটা করে বসতো। এবার আযরান কিছুটা তাচ্ছিল্য করেই বলে উঠল,

“মানুষ হাসে? নাকি আপনার অহংকারে লাগে কোনটা?”
“আযরান!”
আযরানের দৃষ্টি বরাবরের মতো নির্লিপ্ত। অনেককিছু বলার থাকলেও কিছু না বলে নিশ্চুপ রইল সে। শাহরিয়ার হায়দার রাগে ফেঁটে পড়লেন। তবুও নিজেকে শান্ত রেখে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“শোনো আযরান! প্রথম প্রথম সবকিছুই এমন রঙিন লাগে। যখন দেখবে অর্থের অভাবে একবেলা ঠিক মতো খাবার জুটছে না তখন এইসব বিয়ে..প্রেম, ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালাবে। তখন সেই বাবার ছায়ার নিচেই আশ্রয় নিতে হবে । তাই বলছি মেয়েটাকে ছেড়ে দেও আমার সাথে চলো। এমনিতেও ওই মেয়ে তোমার বড় বয়সে আর তোমার সাথে যায় না।”
আযরান নিশ্চুপ। শুধু শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাবা নামক মানুষটার দিকে। আকস্মিক উঠে দাঁড়ালো আযরান। এখানে আর এক সেকেন্ডও বসে থাকার প্রয়োজনবোধ করছে না। তবে যাওয়ার পূর্বে শেষবারের মতো তীক্ষ্ণ নজরের তাকালো শাহরিয়া হায়দারের পানে। নেত্রপল্লব কেমন জ্বলজ্বল করছে। শান্ত, দৃঢ় স্বরে বলল,

“যে মেয়েটাকে আপনি আজ অপমান করলেন, একদিন ঠিক সেই মেয়ের পরিচয়েই আপনি গর্ব করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। এটা আমার চ্যালেঞ্জ।”
শাহরিয়ার হায়দার কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
“স্বপ্ন দেখো আযরান। বাস্তবটা যখন সামনে আসবে, তখন নিজেই ফিরে আসবে।”
আযরান মাথা নেড়ে হালকা আলতো হাসল। যাওয়ার পূর্বে বলে গেল,
“বাস্তব আমি অনেক আগেই দেখে ফেলেছি, ড্যাড। এবার আপনাদের দেখার পালা।”
এই বলে ঘুরে দাঁড়াল আযরান। আর একবারও পেছনে তাকাল না। দৃঢ় পদক্ষেপে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে বর্ষণমুখর পরিবেশ। ধূসর আকাশ। বৃষ্টি নামবে বোধহয়। এই শীতল আবহাওয়া হওয়া শর্তেও আযরান নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। নিজের রাগকে দমন কর‍তে না পেরে পাশের দেয়ালে লাথি বসালো। রাগে ক্রোধে জ্বলছে পুরো শরীর। ফুলে উঠেছে কপালের পাশের রগগুলো। হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা চালালো আযরান। ঠিক তখনই তার মুঠোফোনটা স্বশব্দে বেজে উঠল। নিমিষেই বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ বেরিয়ে এলো কন্ঠনালি বেধ করে। ফোনটা হাতে নিতেই দেখতে পেল প্রহরের ফোন। রিসিভ করে কানে ধরতেই অপাশ থেকে ভেসে এলো প্রহরের আমোদ মেশানো কন্ঠস্বর,

“কিরে শালা! তোর তো দেখা সাক্ষাৎই নেই। ভার্সিটিমুখোও হস না এখন।”
আযরান বিরক্তিতে নেত্রপল্লব বন্ধ করল। এই মুহূর্তে কারো সাথে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় নেই সে। তবুও নিজেকে সংযত রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“না আমি তোর শালা আর না তুই আমার দুলাভাই। এখন ফাজলামি রাখ নাহলে বাসায় গিয়ে পিটিয়ে আসবো।”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে প্রহরের হাসি ভেসে এলো। ফোনের ওপাশে বিধায় এইভাবে হাসার সাহস পেল প্রহর। সামনাসামনি হলে হয়তো এতক্ষণে কয়েক ঘা তার পিঠে পরে যেতো। প্রহর আযরানের কন্ঠ শুনে আঁচ করতে পারলো ছেলেটা রেগে আছে। তাই আর ঘাটলো না। বলে উঠল,
“একটা গুড নিউজ আছে। পলাতক নোমাইন্নার খোঁজ পেয়েছি দোস্ত। শালা এতদিন গাঁ ঢাকার চেষ্টায় ছিল। মাঝরাতে ছেলেপেলেদের হাতে ধরা পড়েছে।”
নিমিষেই আযরানের ক্রোধপূর্ণ দৃষ্টি শান্ত হয়ে গেল। মুখের ভাবভঙ্গি বদলে গেল তার। ঠোঁটের কোণে ফুঁটে উঠল তীক্ষ্ণ হাসি। এবার শীতলকন্ঠে নিচু স্বরে বলে উঠল,
“রেখে দে যত্ন করে। সময় করে খাতির যত্ন করবো।”

টিউশনি শেষ করে সবে বের হলো আর্শি। পরিবেশের এমন গুমোট পরিস্থিতি দেখে এবার কিছুটা চিন্তায় পড়ল সে। আরও একটা টিউশনি এখনো বাকি এর মাঝে যদি বৃষ্টি শুরু হয় তখন? কথাটা বলতে বলতেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে আরম্ভ করল ধরনী জুঁড়ে। বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর্শি। ভাবনাগুলো বুঝি এত দ্রুত সত্যি হয়ে যায়? কি মুশকিল! একটা গভীর শ্বাস ফেলে দ্রুত গতিতে পা চালালো আর্শি। কয়েক কদম এগোতেই আকস্মিক প্রবলবেগে বর্ষণ শুরু হলো। আর্শি কি করবে ভেবে না পেয়ে ছুট লাগানোর সিদ্ধান্ত নিলো। যেই দৌঁড় দিতে যাবে ঠিক তখনই একটা হাত আঁকড়ে ধরল আর্শির বামহাতটা। আর্শি কিছুটা চমকে পিছুনে ফিরে চাইল। আযরান দাঁড়িয়ে। চক্ষুদ্বয় বরাবরের মতো শান্ত। বৃষ্টির টোপে পুরো শরীর ভিজে একাকার অবস্থা। আর্শি পল্লব ঝাঁকালো। চক্ষুদ্বয় খুলে রাখার চেষ্টা করে বলে উঠল,

“চল এখান থেকে। ভিজে যাচ্ছি তো আমরা।”
আযরান কিছু বলল না। শুধু শক্ত করে ধরে রাখা আর্শির হাতটা আলতো টানে নিজের দিকে টেনে নিল। প্রবল বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ঝাপসা হয়ে গেছে প্রায়। আযরান এবার আশেপাশে নজর দিতেই রাস্তার পাশের একটা ছোট্ট ফার্মেসির সামনে টিনের ছাউনি দেখতে পেল। এক মুহূর্ত দেরি করল না সে। আর্শির হাত ধরে দ্রুত কদমে এগিয়ে গেল সেদিকটায়। ছাউনির নিচে এসে দাঁড়াতেই দু’জনেই হাঁপাতে লাগল। টিনের চালে টুপটাপ শব্দে বৃষ্টি আছড়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে দুজনেই শান্ত হল। আর্শি ফিরে চাইল আযরানের পানে। একদৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে আযরান। কেমন নিশ্চুপ হয়ে আছে সে। মন খারাপ নাকি তার? আর্শি জানে না। তবে এমন নিস্তব্ধ আযরানকে তার মোটেও ভালো লাগছে না। আশপাশ বৃষ্টির জন্য একদম জনশূন্য হয়ে পড়েছে। একটা কাকপক্ষীরও দেখা নেই বললেই চলে। দুকদম এগোলো আর্শি। কাঁধে থাকা ব্যাগটা থেকে রুমাল বের করল। কোনো কথা না বলেই আযরানের হাত টেনে বসিয়ে দিলো পাশে থাকা বেঞ্চিতে। রুমালের সাহায্যে আযরানের ভেজা চুলগুলো মুছে দিতে দিতে বলে উঠল,

“কি হয়েছে? মন খারাপ?”
কিছুটা চমকাল আযরান। আর্শির থেকে এমন কিছু আশা করেনি। ঠোঁট কাঁমড়ে কীয়ৎক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। খুব মনোযোগ সহকারে তার চুল মুছতে ব্যস্ত মেয়েটা। আযরানের কি হলো কে জানে। হুট করে আর্শির কোমড় জড়িয়ে কাছে টেনে নিল। কোনো কথা না বলে মুখ গুঁজে দিলো আর্শির পেটে। দরফর করে কেঁপে উঠল আর্শির হৃদপিন্ডটা। আকস্মিকতায় শিউরে উঠল পুরো শরীর। আযরান এবার আরেকটু ঘনিষ্ট হলো। স্তব্ধের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো আর্শি। মৃদু মৃদু কাঁপছে সর্বাঙ্গ। তাদের এত কাছাকাছি কখনোই আশা হয়নি। হুট করে আযরানের এমন কান্ডে যেন আর্শির বোধ শক্তি লোপ পেয়েছে। সরে আসবে সেইটুকু শক্তি পাচ্ছে না। তখনই শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল আযরানের মিহি কন্ঠস্বর,
“যত যাই হয়ে যাক আর্শি। কখনো আমাকে ছেড়ে যাস না।”
আর্শি কিংকর্তব্যবিমুঢ়। আযরানের বলা কথার প্রেক্ষিতে কি বলবে বুঝে পেল না। সে কেন হারাবে? আর আযরানই বা এমন কথা কেন বলছে? হতবিহ্বল হয়ে খানিকটা সময় চেয়ে রইল আর্শি। পরক্ষণেই কাঁপতে থাকা হাত এগিয়ে নিয়ে গুঁজে দিল আযরানের চুলের মাঝে। আলতোভাবে হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠল,
“আমি তোকে কেন ছেড়ে যাবো আযরান? আমার কি আর কোথাও যাওয়ার জায়গা আছে? আপাতত আমার গন্তব্য শুধু তুইই।”

আযরান মাথা তুলে চাইল। এতক্ষণে খেয়াল হলো আর্শির ভেজা স্নিগ্ধ রুপটা। নিমিষেই হৃদপিন্ডে তোলপাড় শুরু হলো আযরানের। সব রূপেই মেয়েটা তার হৃদপিন্ডকে ঘায়েল কর‍তে সক্ষম। ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ মোহনীয় নজরে তাকিয়ে থাকল আযরান। পরক্ষণেই আর্শিকে বসিয়ে দিলো নিজের কোলে। হতভম্ব আর্শি! হতবাক তার দৃষ্টি! আযরানের নেশাক্ত দৃষ্টিতে গলা শুকিয়ে এলো তার। মাদকতার নেশার ন্যায় আর্শির মনে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেল আকাশসম লজ্জা। কাঁপা কন্ঠে কোনোমতে উচ্চারণ করল,
“কি কর..করছিস! ছাড়, ব্যথা পাবি।”

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২২

আযরান শুনল। তবুও ছাড়লো না একচুল পরিমাণও। নিনির্মেষ দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইলো আর্শির পানে। লজ্জায় জুবুথুবু অবস্থা মেয়েটার। আযরানের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস বক্ষস্পন্দন বাঁড়িয়ে দিচ্ছে আর্শির। বাহ্যিক ক্ষেত্রে আর্শি শক্ত। কিন্তু ভিতর জুঁড়ে প্রলয়। শক্ত আবরণে আবদ্ধ আর্শির রূপটা হয়তো আযরানের পছন্দ হলো না। হুট করে অধরযুগল ছুঁয়ে দিলো আর্শির কম্পনরত ওষ্ঠে। মুহুর্তেই আর্শির পুরো দুনিয়া থমকে গেল। তীব্র বর্ষণের শীতলতার মাঝে গভীর স্পর্শে কম্পন ধরল শরীর জুঁড়ে। আযরানের যেন সহ্য হলো না তা। শক্ত করে মেয়েটাকে চেপে ধরল নিজের সাথে। তীব্র থেকে তীব্রতর হলো স্পর্শ। আযরান সম্পূর্ণ মত্ত হলো আর্শির ওষ্ঠে।

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৪