Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৯

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৯

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৯
তন্ময়ী তিতিক্ষা

“সত্যি বলে বলতো মামা কি হইছে। রাইসার বিয়েতে যাবিনা ক্যা?”
মিহিরের কথায় গম্ভীর চক্ষুদ্বয় মেলে চাইল আযরান। পরক্ষণেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো সামনে থাকা বিশাল লেকটার দিকে। কিছুক্ষণ পূর্বেই তাকে একপ্রকার টেনে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে। প্রহর এগিয়ে এলো। আযরানের কাঁধে হাত রেখে চোখ দিয়ে ইশারা করল মিহিরকে। পরক্ষণেই বিচক্ষণ ব্যাক্তির ন্যায় তাকিয়ে বলে উঠল,
“জানি তুই কইবি না। কিন্তু আমরা তোর বন্ধু তো নাকি। না কইলে সমাধান দিমু কেমনে?”
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আযরানের অভ্যন্তর ভেদ করে৷ কিছুটা হতাশ হয়ে বলল,

“বেতন পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটাও হারিয়ে গেছে। হাতে টাকা পয়সা নেই। তাই যাবো না।”
একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল মিহির আর প্রহর। আযরান সূক্ষ্ম একটা নিঃশ্বাস ফেলে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করল। নিস্তব্ধ একদম জায়গাটা। কিছুটা দূরেই একজোড়া কাপল বসে আছে। দৃষ্টি ফিরাল সে। প্রহর এগিয়ে এলো আযরানের নিকটে। পরক্ষণেই মোবাইল বের করে কিছু একটা করল। সাথে সাথে বেজে উঠল আযরানের ফোনের নোটিফিকেশন। প্রহর ত্রিশ হাজার টাকা ট্রান্সফার করেছে। আযরান অবাক হলো প্রচন্ড। প্রহরের দিকে তাকাতেই প্রহর হামি তুলে বলে উঠল,
“এমনি এমনি দেইনি। লোন লোন! যেদিন বড়লোক হবি। ওইদিন ফেরত দিবি শালা। তাও দ্বিগুণ করে দিবি..একটাকাও কম না।”
প্রহরের কথার প্রেক্ষিতে শান্ত অভিব্যক্তিতে তাকিয়ে রইলো আযরান। আকস্মিক হুট করে জড়িয়ে ধরল প্রহরকে। প্রহর কিছুটা চমকালেও স্মিত হাসল। পরক্ষণেই চোখে মুখে ফুঁটে উঠল দুষ্টুমির ছাপ। নাক ছিটকে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলে উঠল,

“ইশশ! ছাড় ছাড়! তুইও শেষে কিনা মিহিরের মতো হয়ে গেলি। তোর থেকে এটা আশা করিনি আযরান।”
আযরান ছেড়ে দিল প্রহরকে। নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে থাপ্পড় বসালো মাথায়। প্রহর মাথা ডলতে ডলতে মিহিরের দিকে চাইলো। মুখটা মলিন হয়ে আছে ছেলেটার। প্রহরকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে জোরপূর্বক হাসল মিহির। আযরানকে সাহায্য করতে না পারায় নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে। তার নিজের বাড়ির অবস্থাই তো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। সে কি করে বন্ধুকে সাহায্য করবে? দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিহির। হুট করে কাঁধে কারো স্পর্শ অনুভব করতেই পাশ ফিরে চাইলো সে। আযরানকে দেখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলল। আযরান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কি! এমন সেন্টিখোর হলি কবে? সেন্টি খাওয়া অবস্থা থেকে বের করতে কি নীলার লাথি প্রয়োজন? ”
“মাফ কর বাপ! ওইটায় যে তোরে লাথি দেয়। আমার পশ্চাৎদেশ কবে জানি পটল তুলে।”
মিহিরের কথা শুনে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল আযরানের। বহুদিন পর যেন বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা একটু হলেও হালকা লাগছে। বন্ধু নামক জিনিসটা যে এখনও পৃথিবীতে বেঁচে আছে, সেটা হয়তো এই দুই উজবুককে না পেলে সে ভুলেই যেত। আযরান শান্ত স্বরে বলে উঠল,

“চল এবার৷ মেয়েরা অপেক্ষা করছে।”
“মেয়েরা না বল তোর বউ অপেক্ষা করছে। শালা বউ পাগলা!”
মিহির মুখ বাঁকিয়ে কথাটা বলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের উপর। আযরান “এই এই!” করতে করতেই দুই পাগলের মাঝে আটকা পড়ল। লেকের উপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সূর্যের আলো পানিতে চিকচিক করছে। সেই শান্ত পরিবেশের মাঝেই তিন বন্ধু হুটোপুটি চলছে।
আকস্মিক ধাক্কায় ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো আযরান। প্রহর আর মিহির এখনও ধাপাধাপিতে ব্যস্ত। হুট করে ঘরে প্রবেশ করল আর্শি। বিছানার অবস্থা দেখে কিছুক্ষণ স্তব্ধের ন্যায় দাঁড়িয়ে পড়ল। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠল,

“তোরা দুইটা কি অবস্থা করেছিস। বের হো আমার রুম থেকে। কত কষ্ট করে গুছিয়েছিলাম।”
সকলের পর্দা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। ভয়ে সূক্ষ্ম ঢোক গিলল মিহির। বিপদ যে অতি নিকটে তা বুঝতে বাকি নেই। কোনোদিকে না তাকিয়ে দৌঁড়ে পালালো রুম থেকে। তার পিছু পিছু ছুটলো প্রহর নিজেও। শুধু রয়ে গেল আর্শি আর আযরান। রাগে ফোঁস ফোঁস করে চলেছে আর্শি। তার এত কষ্ট করে গুছানো রুম এই হারামজাদা গুলো এলোমেলো করে দিলো।
“ম্যাডাম দেখি আজকাল রাগতেও পারে।”
কথাটা কর্ণপাত হতেই কপালে ভাঁজ পড়ল আর্শির। আঁখিপল্লব ললাটে স্পর্শ করলো কিঞ্চিৎ। ভ্রুঁ কুঁচকে আযরানের পানে চাইলেই এগিয়ে এলো সে। আর্শি মনে মনে ঘাবড়ালেও বুঝতে দিলো না। আযরান বাঁকা হাসল। এক কদম এগিয়ে এসে বলল,

“রাগ ফুঁস?”
আর্শি কিছু বললো না। ছোট্ট একটা ঢোক গিলে পিছিয়ে গেল। কর্ণে পুনরায় বাড়ি খেল আযরানের ফিচেল কন্ঠস্বর,
“রাগিস না মুটি। বউ বউ লাগে। তখন কিছু অবাধ্য ইচ্ছে এসে উঁকি দেয় মন পাঁজরে। যা তোর জন্য একদমই মঙ্গলজনক না।”
ঘোরের মধ্যে ডুবে গেল আর্শি। কথাগুলো কর্ণ ভেদ করে সোজা বিঁধছে বুকে বা পাশে। প্রভাব ফেলছে প্রগাঢ়ভাবে। হুট করে সরে গেল আর্শি। বড় বড় পা ফেলে একপ্রকার পালিয়ে এলো। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরালো। নেত্রপল্লব ছোট করে তাকালো আযরানের ঠোঁটের পানে। স্পষ্ট চোখে বিঁধল আযরানের ঠোঁটের কোণে প্রস্ফুটিত হওয়া হাসিটুকু। অনুভুতিরা সাঁদরে লুফে নিলো সেই হাসি। আর্শি খেয়াল করছে আযরান যখনই তার দিকে লজ্জার বান ছুঁড়ে ঠিক তখনই অভ্যাসবশত হাসিটুকু অধঁর স্পর্শ করে। ইশশ! কি মাদকতা ভরপুর হাসিতে। আর্শি বিরবির করল,
“ভয়ংকর! মারাত্মক ভয়ংকর!”

সকালের স্নিগ্ধতা পেরিয়ে সূর্য তার উত্তাপ ছড়াচ্ছে। আযরানদের পুরনো ছোট্ট ড্রয়িং রুমে বসে আড্ডায় ব্যস্ত সকলে। তাদের আলোচনার মধ্যে বিন্দু রাইসার বিয়ে। কিন্তু কথায় আছে ‘যার বিয়ে তার হুশ নেই পাড়া পরশীর ঘুম নেই’ বন্ধুমহলের অবস্থাও যেন ঠিক তাই। বিয়ের কনে সোফায় বসে ফোন টিপতে ব্যস্ত। অপরদিকে পুরো বন্ধুমহল সিরিয়াস আলোচনায় মগ্ন। একেকজনের মুখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন বিজনেস মিটিং বসেছে সকলে। সিরিয়াস ভঙ্গিতে সোফার মাঝখানে বসে আছে প্রহর। হাতে একটা খাতা আর কলম। এমন ভাব করছে যেন দেশের অর্থমন্ত্রী বাজেট ঘোষণা করতে এসেছে। অপরপাশে পা তুলে বসে আছে মিহির। মুখখানা কুঁচকে আছে প্রবল চিন্তায়। আযরান দেয়ালে হেলান দিয়ে গম্ভীর দৃষ্টিতে সবার কাণ্ডকারখানা পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের মাঝে সবথেকে নিরীহ প্রানীটি হলো মেহর। না পারছে বসে থাকতে আর না বুঝছে তাদের কার্যকলাপ। আর্শি তাকে কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না। একপ্রকার হা করেই গিলছে সকলের কান্ডকারখানা। তাদের মাঝেই হুট করে উঠল মিহিরের ফোন। সকলেই ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো সেদিকে। মিহির উঠলে দাঁড়ালো। মায়ের ফোন দেখে সরে এলো খানিকটা দূরে। ফোন রিসিভ করতেই ওইপাশ থেকে ভেসে এলো মায়ের কন্ঠস্বর,

“হ্যালো মিহির!”
“বলো আম্মা।”
“ঘরে চাল নাই বাপ। আসার সময় চাল আনিস। নাইলে দুপুরে কারো পেটে খাবার জুটবে না।”
চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো মিহির। দৃষ্টি বাইরের দিকে। জানালার বাইরে সারি সারি দালান কোঠা নজরে আসছে। শহরের এত কোলাহল। মিহিরের ভালো লাগে না এই শহরটা। এই শহরে শান্তি নেই আছে শুধু বিষণ্ণতা। মায়ের কথায় ঠোঁট কামড়ে ধরল সে। লহুস্বরে বলে উঠল,
“নিয়ে আসবো আম্মা।”
“মনে করে আনিস। আর তোর বোনের পরিক্ষার ফি লাগবে। নাইলে পরিক্ষায় বসতে দিবে না।”
“আচ্ছা আমি দেখছি।”
কল কেটে মিহির ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি অনুভূতিশূন্য। অথচ দেহের অভ্যন্তরে বিষাদের ছড়াছড়ি। সূক্ষ্ম একটা নিঃশ্বাস ফেলে পুনরায় এসে বসলো বন্ধুদের মাঝে। তৎক্ষনাৎ বদলে ফেলল নিজের অভিব্যক্তি। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুঁটিয়ে মেতে উঠল বন্ধুদের সাথে। পুরো ব্যাপারটাই লক্ষ্য করল একজন ব্যক্তি, সে হলো মেহর। অবাকও হলো বেশ। সে দেখেছে মিহিরের মলিন মুখটা কিন্তু পরক্ষণেই এভাবে হাসি ফুঁটিয়ে সকলের তালে তাল দেওয়াটা তাকে অবাক করল বৈকি। মিহিরের দিকে দৃষ্টি রেখেই আওড়ালো,
“অদ্ভুত মানুষ তো লোকটা।”
.
.
কৃত্রিম আলোয় ঝলঝল করছে পুরো কক্ষ। আযরান বাসায় নাই। সেই সুযোগে আর্শি ব্যাগ পত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। খুব বেশি গোছানোর না থাকলেও যেটুকু সম্ভব এগিয়ে রাখছে সে। কালকে বিকেলেই তাড়া রওনা দিবে গ্রামের উদ্দেশ্যে। আর্শি নিজের জন্য আযরানের আনা থ্রি পিস গুলো ব্যাগে রেখে দিলো। আলমারির এককোণে যত্ন করে রাখা আযরানের শাড়িটা। সেটা নিতেও ভুললো না। বিয়েতে পরা যাবে এটাই। ভেবে শাড়িটা নিয়ে নিলো আর্শি। নিজের কাপড় গুছিয়ে আযরানের টা গোছাতে গিয়ে দ্বিধায় পরে গেল সে। আযরানের জন্য কি কি নিবে বুঝে উঠল না। তবুও হাতের কাছে যা পেল তাই গুছিয়ে নিল। ব্যাগের চেইন লাগিয়ে এবার পুরো রুমটা গুছিয়ে নিল আর্শি।
সব কাজ শেষ করেও যেন আর্শির সময় ফুরাচ্ছে না। এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো সে। বিছানায় শুয়ে পড়ল স্টান হয়ে। কিছুক্ষণ হাত পা ছুড়োছুড়ি করে আলসেমি দূর করে পুনরায় উঠে দাড়ালো। কিছুক্ষণ চক্কর কাটলো পুরো রুম জুঁড়ে। হুট করে দাঁড়িয়ে বিরবির করে বলে উঠল,
“কেমন জামাই এ? একা বাসায় বউ বসে বসে বিরক্ত হচ্ছে অথচ এই বেডার কোনো খবর নেই।”
ব্যাস! একরাশ মন খারাপ ছুঁয়ে দিল তাকে। মোবাইলটা হাতে নিয়েও কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে বসে রইল আর্শি। কল দিবে? নাহ! একদমই না। সে কেন আগে কল দিবে? জামাইয়ের দায়িত্ব কি শুধু বউকে খেপানো? একটু সময় দেওয়া লাগে না? ঠোঁট ফুলিয়ে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলল পাশে।

পরক্ষণেই হুট করে মাথায় এলো এক বুদ্ধি। চোখদুটো চকচক করে উঠল। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ছোট ব্লুটুথ স্পিকারটা অন করল। মুহূর্তেই পুরো রুমে ভেসে উঠল পুরনো এক চঞ্চল গান। হুট করেই রান্নাঘরের দিকে ছুটল আর্শি। আজকে সে রান্না করবে। একদম জম্পেশ রান্না! আযরান বাসায় ফিরেই অবাক হয়ে যাবে সিউর। ফ্রিজ খুলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজেই বিড়বিড় করে বলল,
“হুমম…ডিম আছে, মুরগি আছে, আলুও আছে। ব্যাস! আজকে বিরিয়ানি রান্না করাই যায়।”
কথাটা ভেবেই রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল আর্শি। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে গানের তালে নাচতে ভুললো না। এলোমেলো হাতে থাকা খুন্তি নাড়িয়ে হুট করেই গেয়ে উঠল,
O bheegi bheegi raat mein…
lekar ke tujhko saath mein.
Madhosh huye jaaye hum,
aa faasle karne de kam…

ঠিক তখনই দরজার কাছ থেকে ভেসে এলো আযরানের কন্ঠস্বর। চক্ষুদ্বয় বৃহৎ আকার ধারণ করলো আর্শির। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই নজরে এলো আযরানের ঠোঁটের কোণে ফুঁটে থাকা বাঁকা হাসিটা। আযরান এগিয়ে এসেই আর্শির কোমড় আঁকড়ে হ্যাচকা টানে মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে। বিস্ময়ে হতবাক আর্শি। সারা শরীর শিরশির করে উঠল। লজ্জায় চুপসে গেল একদম। শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল আযরানের ফিচেল কন্ঠস্বর,

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৮

“Zara paas tu aa mere…
Dheere se chhu jaa mujhe..
Kho jaaun tere pyar mein,
Baahon mein bhar le mujhe …

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here