Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩০

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩০

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩০
তন্ময়ী তিতিক্ষা

আর্শির দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনে দাঁড়ানো আযরানের পানে। পলকহীনভাবে তার দিকেই তাকিতে আছে আযরান। চোখের দৃষ্টি কেমন নেশাগ্রস্থ। আর্শি শুকনো ঢোক গিলল। দূরত্ব বাড়াতে চাইলে আযরানের বাঁধার সম্মুখীন হয়ে তাও হলো না। পরনের জামাটা দু’হাতে খাঁমচে ধরল। আযরান আর্শির অবস্থা বুঝতে পেরে ঠোঁট কামড়ে আসলো। মেয়েটাকে ঘাবড়ে দিতে আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরল নিজের সাথে। দুষ্টুমির স্বরে বলে উঠল,
“ব্যাপার কি রে মুটি.. আজকাল গানের মাধ্যমে কাছে আসার ইশারা করছিস নাকি?”
কথাটা হুরহুর করে কর্ণে প্রবেশ করে আর্শির হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করল। এত অসভ্য কেউ হয়? এতটা নির্লজ্জ কেউ কীভাবে হতে পারে? আর্শি শুনেছিলো পুরুষ মানুষের লজ্জা নেই। তা এখন হারে হারে টের পাচ্ছে সে আযরানকে দিয়ে। প্রথমের গম্ভীর আযরানের সাথে বর্তমানের এই অসভ্য আযরানের মিল পাচ্ছে না। আর্শি নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইলো৷ আঁড়চোখে তাকিয়০০০ বলে উঠল,

“তোর কোনো কাজ নেই রে আযরান। ছাড়তো.. খালি চিপকে থাকিস কেন বেদ্দপ!”
আযরান হাসলো। মুক্ত ঝরা হাসি! এইটুকু হাসিই আর্শির হার্টবিট বাঁড়িয়ে দিতে যথেষ্ট। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সে। আযরান ঠোঁটের কোণের হাসিটা বহাল রেখেই বলে উঠল,
“একটু তো রোমান্টিক হতে পারিস মুটি। বউয়ের সাথে চিপকে থাকবো না তো কি অন্য মেয়েদের সাথে থাকবো?”
আর্শির চোখ ধাঁধিয়ে আসছে। চক্ষুদ্বয় নামিয়ে নিলো। পুনরায় নেত্রপল্লব ছোট ছোট করে চাইলো সে। এক মুহুর্তও বিলম্ব না করে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
“ছাড় ছাড়! ক্ষুধা পেয়েছে। খেয়ে ঘুমাতে হবে।”
আর্শির কথা শুনে আযরান ভ্রু কুঁচকালো। তারপর আরও একটু ঝুঁকে এলো তার দিকে। দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছে একে অপরের সাথে। আর্শি অস্থির হয়ে এদিক সেদিক তাকালো। ভিতরটা অস্থির হয়ে উঠছে তার অথচ আযরানের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। তার সমস্ত মনোযোগ যেন এই লাল টুকটুকে মেয়েটার মাঝেই আটকে আছে। হুট করে ধীর কন্ঠস্বরে বলে উঠল,

“ক্ষুধা পেয়েছে?”
আর্শি উপর নিচে মাথা নাড়ল। গভীর হলো আযরানের দৃষ্টি। ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি ফুঁটিয়ে বলে উঠল,
“আমারও তো পেয়েছে।”
আর্শির কোমড়ে হাত রেখে ঝুঁকে এলো আযরান। কিছু না বলেই অধরযুগল ছুঁয়ে দিলো আর্শির নরম ওষ্ঠে। তড়িৎ বেগে কেঁপে উঠল আর্শি। চক্ষুদ্বয় আযরানের নেশাক্ত চোখে রাখতেই ভেতরটা এলোমেলো হয়ে গেল। কোমড়ের বাঁধন গভীর হলো আর্শির। হৃদয়ে শীতল স্রোত অনুভব করলো। স্পর্শ গভীর হলো সময় সাপেক্ষে। তীব্র ভয়ংকর রুপ ধারণ করল অনুভূতিরা। আকস্মিক গলায় মুখ গুঁজলো আযরান। হৃদস্পন্দন বেগতিক ছুটতে শুরু করেছে আর্শির। শ্বাস প্রশ্বাস গাঢ় হয়ে আসছে। জামা আঁকড়ে ধরা হাতটা মৃদুভাবে কেঁপে চলেছে। আর্শি আযরানকে বাঁধা দিতে চাইলো। কিন্তু হায়! আজ যেন পরিস্থিতিও তার সঙ্গ দিচ্ছে না। চেয়েও নড়তে পারছে না এক ফোঁটাও। হুট করে আর্শি বাঁধা দিল। মুহুর্তে কোমড়ে বিচরণ করা হাতটা থেমে গেল আযরানের। মুখ উঁচিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো আর্শির পানে। মেয়েটা নেত্রপল্লব বন্ধ করে বড় বড় শ্বাস ফেলছে। কিছুটা সময় নিয়ে চক্ষুদ্বয় মেলে চাইল আর্শি। আযরানকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সূক্ষ্ম একটা ঢোক গিলল। আযরান দৃষ্টি স্থির রেখেই বলে উঠল,

“কি হলো মুটি?”
আর্শির আঁখিদ্বয় নিভু নিভু। কোনোমতে কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল,
“আয..আযরান আমাকে একটু সময় দিবি? এমন জোর কর…”
“তোকে আমি জোর করছি?”
কথাটা বলেই আকস্মিক দূরত্ব বাঁড়িয়ে নিল আযরান। হুট করে এভাবে দূরে সরে যাওয়াটা মেনে নিতে পারলো না আর্শি। তড়িৎ বেগে এগিয়ে আযরানের হাত আঁকড়ে ধরলো। অস্থির স্বরে বলল,
“আমি ওইটা বলিনি। আমি তো…”
“থাক!”
আর্শির কথা শেষ হতে দিলো না। এরপূর্বেই হাত ছাড়িয়ে নিল আযরান। একবার চক্ষুদ্বয় আর্শির মুখে বুলিয়ে দ্রুত কদমে চলে গেল রুমের ভিতর। আর্শি হতভম্ব, নির্বাক। ভাবতেই পারেনি ব্যাপারটা এমন হয়ে যাবে। সে তো এমন চায়নি শুধু একটু সময় নিতে চেয়েছিলো। ধীরে ধীরে নেত্রপল্লব ভিজে উঠল আর্শি। অশ্রুসিক্ত চক্ষে চেয়ে রইল দরজার পানে।

বাইরে চলছে নির্মল প্রবন। রাতের শীতল বাতাস ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছে সকলের। কক্ষে প্রবেশ করতেই একরাশ শীতল হাওয়া ছুঁয়ে গেল আর্শিকে। আকস্মিকতায় কেঁপে উঠল সমস্ত অঙ্গ। চক্ষুদ্বয় বুলিয়ে আযরানের অবস্থান বুঝে নিল আর্শি। কপালের ওপর হাত রেখে চোখ বুঁজে আছে আযরান। ঘুমাচ্ছে নাকি? আর্শির উপর কি একটু বেশি রেগে গেল ছেলেটা? হয়তো বা! নিজের ভাবনাকে দূরে ঠেলে ধীর কদমে এগোলো সে। খুব একটা শব্দ না করে ধীরে সুস্থে শুয়ে পড়ল আযরানের পাশে। বুক ধরফর করছে আর্শির। যদি আবার রেগে যায় তার উপর তখন? আযরান পাশ ফিরেও তাকালো না আর্শির দিকে। আর্শি ধীরে ধীরে হাত বাড়ালো। কিছুটা ইতস্তত করে শেষমেষ আঙুলের ডগা ছুঁইয়ে দিল আযরানের বাহুতে। সাথে সাথেই আযরানের শরীর শক্ত হয়ে উঠল। কিন্তু হাত সরালো না সে।আর্শি ক্ষীণ স্বরে ডাকল,

“আযরান…”
কোনো উত্তর এলো না। আর্শি এবার একটু কাছে সরে এলো।কাঁপা গলায় বলল,
“রাগ করেছিস?”
ওপরপাশে একদম নিরবতা। আর্শির কান্না পেল। জলে টলমল করে উঠল নেত্রপল্লব। দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে আর্শি। সাহস করে এবার আরেকটু চেপে গেলো আযরানের নিকটে। মুখমন্ডল এগিয়ে নিয়ে নাক মুছলো আযরানের বাহুতে। মৃদুস্বরে বিরবির করে বলে উঠল,
“সরি।”
আযরানের ভ্রু কুঁচকে গেল। কপালের উপর রাখা হাতটা নামিয়ে মুখ ফিরালো। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর্শির দিকে। চাঁদের আবছা আলোয় মেয়েটার ভেজা চোখদুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,

“কাঁদছিস কেন?”
“কাঁদছি না তো।”
কান্নার চোটে আর্শির ফর্সা মুখটা রক্তিম আকার ধারণ করেছে লাল হয়ে যাওয়া নাকটা দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আযরান। মুহুর্তে সমস্ত রাগ পানির মতো গলে গেল। হাত বাঁড়িয়ে কন্দনরত আর্শিকে জড়িয়ে নিলো বুকের মাঝে। চুলে আলতো হাত বুলিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“কাঁদিস না। যত ইচ্ছে সময় নে সমস্যা নেই।”
আর্শির চোখ বুঁজে এলো আবেশে। মুঠোয় পুরে নিলো আযরানের শার্টের অল্প একটু অংশ। চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল বুকের মাঝে। আযরানের হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে শুনতে ধীরে ধীরে সমস্ত অস্থিরতা কমে এলো আর্শির। বাইরে তখনও শীতল বাতাস বইছে। জানালার পর্দা উড়ছে হালকা হাওয়ায়। আর সেই নীরব রাতের মাঝে দু’টো অভিমানী হৃদয় আবারও নেমে গেলো মান অভিমানের খেলায়।

বিকেলের শেষ প্রহর। সূর্যের রশ্মি কমে এসে গোধূলির সময়কে আহ্বানে ব্যস্ত। ট্রেনের জানালা দিয়ে সূর্য ডোবার দৃশ্যটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে আর্শি। তারপাশেই মোবাইলে ব্যস্ত আযরান। কিছুক্ষণ পূর্বেই তাদের ট্রেন চলতে শুরু করেছে নিজের গন্তব্যে। তাদের আশেপাশের সিট গুলো দখল করে বসে আছে তাদের বন্ধুমহল। তাদের ঠিক সামনের সিটেই মেহর আর রাইসা একসাথে বসেছে। আর মেহরদের পাশাপাশি সিটে বসেছে মিহির আর নীলা। প্রহর বেচারা সবসময়ের মতো সিঙ্গেলই রয়েছে। বহুকাল পর তারা বন্ধুরা সকলে একত্রে কোথাও যাচ্ছে। এজন্য বেশ উৎফুল্ল আর্শি। মেহরকে সাথে নিতে ভুলেনি। মেয়েটা গেলেও মন্দ হয়না। আর্শির নজর হুট করে আটকালো মিহির আর নীলার দিকে।

ঘুমন্ত নীলা বার বার এদিক সেদিক হেলে পড়ছে। তা নিয়েই হয়তো চিন্তিত মিহির। হুট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে চেপে বসলো নীলার দিকে। নীলার নড়বড়ে মস্তকটা খুব সাবধানে আগলে নিলো নিজের কাঁধে। নতমস্তকে তাকিয়ে চক্ষুদ্বয় বুলিয়ে নিল কিছুক্ষণ। জাগ্রত অবস্থায় মেয়েটা তার সাথে সবসময় রেগে থাকে। মিহিরের ব্যাপারটা বড্ড ভালো লাগে। আপন আপন অনুভূতিরা ঘিরে থাকে সবসময়। ঘুমন্ত নীলার তেলে চকচকে করতে থাকা মুখশ্রী দেখে মুগ্ধ হলো মিহির। পলকহীন তাকিয়ে রইলো। পুরো ব্যাপারটাই দেখলো আর্শি। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুঁটে উঠল মিষ্টি হাসি। আর্শি অনুমান করতে পারে, মিহিরের মনে হয়তো নীলার জন্য অন্যরকম অনুভুতি কাজ করে। আর্শি চোখ ফিরালো। মনে মনে আওড়ালো,
“থাক না কিছু লুকোচুরি অনুভূতি!”

এতক্ষণ মিহির আর নীলার দিকেই অপলক চেয়ে ছিল মেহর। বুকের মাঝে কিছু একটা তীব্র যন্ত্রণা দিচ্ছে। দহন হচ্ছে হৃদপিন্ডতে। চক্ষুদ্বয় ফিরিয়ে পুনরায় তাকালো সে। মিহিরের ঠোঁটের হাসিটুকুর মানে বুঝতে এক মুহুর্তও দেরি হলো না। থমকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। বক্ষের মাঝে হতে থাকা রক্তক্ষরণকে পাত্তা না দিয়ে বলে উঠল,
“ইশশ! এইগুলো তোর আবেগ মেহর। দুইদিনের পরিচয়ের একটা ছেলের জন্য বুকে ব্যথা তুলে ফেললি? ছিহ! মেহর কতটা বাচ্চা তুই।”
ভিতরে তোলপাড় হচ্ছে। তীব্র তোলপাড়! তবুও সেসবে পাত্তা না দিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল মেহর। না চাইলেও চোখের কোণে জমে উঠা অশ্রুটুকু মুছে নিয়ে মনোযোগী হলো প্রকৃতিতে উপভোগ করতে। কিছু জিনিস হয়তো দূর থেকেই সুন্দর!

বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে বসে আছে প্রহর। তার একমাত্র বিরক্তির কারন হচ্ছে পাশে থাকা ভদ্রলোকের নাক ডাকার শব্দ। কিছুক্ষণ পরপর ‘গরগর’ শব্দ তুলে ডেকে উঠছে লোকটা। প্রহরের বিরক্তি ধীরে ধীরে চরমে উঠছে। লোকটার নাক ডাকার শব্দ প্রহরের কাছে ট্রেনের চাকাকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে। একবার ডাকে তো মনে হয় পুরো বগিটাই কেঁপে উঠলো। এবার আর টিকতে না পেরে নিজেদের পার্সোনাল গ্রুপে মেসেজ দিয়ে ব্যাপারটা সকলকে জানালো প্রহর। সবার দৃষ্টি একত্রে এসে পড়ল তাদের উপর। প্রহর অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো সকলের দিকে। মেহর মুখ চেপে হাসছে। লোকটাকে গভীর ঘুমে মগ্ন দেখে এবার প্রহর দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“এই লোকটা মানুষ তো? নাকি ডিজেল ইঞ্জিন। এত শব্দ করে নাক ডাকে কে ভাই?”
রাইসা হেসে কুটিকুটি। হাতের ফোন তুলে নিলো ভিডিও করার উদ্দেশ্যে। ভিডিও অন করতে করতেই বলে উঠল,
“ভাইয়া ভাইয়া, আরেকটু জোরে ডাকুক। ভাইরাল করে দিবো।”
“চুপ কর আপদ!”

মুখ টিপে হেসে ফেলল সকলে। কিন্তু যাকে নিয়ে এতকিছু তার কোনো খবর নেই। গভীর নিদ্রায় তলিয়ে শব্দ তুলে নাক ডাকতে ব্যস্ত হেসে। মিহির যেন মজা পেল। নিচু স্বরে বলল,
“দোস্ত, লোকটার দোষ কি? শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।”
“এইডারে শান্তি বলে? এমন শান্তি আল্লাহ কোনো মানুষরে সাত জন্মেও না দেক বাল।”

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৯

কথাটা শুনে এবার আর্শিও হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই আযরানের দিকে তাকালো সে। আযরান তখনও মোবাইলেই ব্যস্ত। তবে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি স্পষ্ট। আর্শি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাহুতে কনুই ঠেকালো। আর্শি জানে আযরান প্রকাশ না করলেও বন্ধুদের এইসব কর্মকান্ড তার পছন্দ। সরাসরি কিছু না করেও আযরান সবসময় বন্ধুদের সঙ্গ দেয়। ছুটে চলআ ট্রেনের শব্দ চারপাশে মুখরিত। সাথে মিশে রয়েছে বন্ধুদের হাসাহাসি আর কিছু না বলা অনুভূতির ভিড়ে গচ্ছিত বন্ধুত্ব। মেহর পূর্ণ দৃষ্টি মেলে চাইলো সবার দিকে। মনের এককোণে বড্ড আফসোস হলো। তার কেন এমন বন্ধু নেই?

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here