কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩১
তন্ময়ী তিতিক্ষা
প্রভাতী কিরণের উষ্ণ আলিঙ্গনে তন্দ্রা কেটে গেলো আর্শির। সম্পূর্ণরুপে কেটে গেল ঘুম। ঘুমঘুম চোখ দু’টো মেলতেই নিজেকে আবিষ্কার করলো আযরানের বুকে। আর্শি চমকালো না। এটা রোজকার অভ্যাসই বলা চলে। ছেলেটা যেন তাকে বুকে না নিয়ে ঘুমাইতেই পারে না। হুট করে বেলি ফুলের তীব্র ঘ্রাণ আর্শির নাসারন্ধ্র ভেদ করল। গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে ঘ্রাণটা টেনে নিল নিজের মাঝে। আর্শি খুব সাবধানে উঠে বসল। ফ্রেশ হয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে এলো সে। অপরিচিত জায়গায় কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না। তবুও সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিচে। রাতের আঁধার কেটে গেলেও সূর্যের দেখা মিলতে আরও কিছুটা সময় বাকি। নিচে একটা মানুষেরও দেখা নেই। রান্নাঘর থেকে আসা শব্দ অনুসরণ করে সেদিকে এগোলো আর্শি। রাইসার মা রুবিনা খাতুন রান্নায় ব্যস্ত। আর্শি ধীর পায়ে রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকতেই চুলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রুবিনা খাতুন ফিরে তাকালেন। মেয়েটাকে দেখেই তার মুখজুঁড়ে হাসি ফুটে উঠল। ঠোঁটের কোণের হাসিটা বহাল রেখেই বলে উঠল,
“আরে এত সকালে উঠে পড়েছিস? আরেকটু ঘুমালে পারতি।”
আর্শি মৃদু হাসল। রুবিনা খাতুনকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল,
“এত ব্যস্ত হচ্ছো কেন? তুমিও তো উঠেছো আমি কি কিছু বলেছি?”
“খালি পাকা পাকা কথা হ্যাঁ?”
কথাটা বলেই আর্শির কান চেপে ধরল রুবিনা খাতুন। আর্শি মুখ কুঁচকে খিলখিল করে হেসে ফেললো। রান্নাঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে সবজি কাটছিল রুবিনা খাতুনের ছোটজা রিনা বেগম। একপ্রকার কৌতূহলী তার দৃষ্টি। আর্শির মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে রুবিনা খাতুনের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“এটাও কি রাইসার বন্ধু আপা?”
“হ্যাঁ! সাথে রাইসার বন্ধু আযরানের বউও।”
সহসা বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালো আর্শির পানে। মহিলার দৃষ্টির মানে আর্শি বুঝলো না। তবে অস্বস্তি হলো বেশ! রিনা বেগম এবার কিছুটা মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল,
“ওতো সুন্দর ছেলেটার বউ এমন মোটা? মানায়নি তো আপা।”
আর্শি এতক্ষণে ঠাহর করতে পারলো এমন দৃষ্টির কারন। মহিলার কথায় মস্তক নত করে দাঁড়িয়ে থাকলো চুপচাপ। কিই বা বলবে সে? মোটা হয়েছে যেহেতু মানুষের এইটুকু কথা তো হজম করতেই হবে। কিন্তু হজম করতে পারবেন না রুবিনা খাতুন। জায়ের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আকস্মিক বলে উঠলেন,
“সংসার তো আর তুই করবি না রিনা। যে করবে তাকেই নাহলে বুঝতে দে মানাবে কিনা। আর আর্শি দেখতে খারাপ কোথায়? রুপে গুণে সবদিক দিয়েই ঠিক। শুধু স্বাস্থ্যের দিক নিয়ে পড়ে থাকলে হবে? সবাই একদম পারফেক্ট হবে এমন কোনো কথা নেই।”
থোতা মুখ ভোতা হয়ে গেল রিনা বেগমের। এইটুকু একটা মেয়ের সামনে এতগুলো কথা হজম করতে হবে ভাবতেও পারেনি। মনে মনে ক্রোধে ফেঁটে পড়ল। আর্শি রুবিনা খাতুনের দিকে পলকহীনভাবে তাকিয়ে রইল। আযরান বাদে কাউকে তার হয়ে এভাবে জবাব দিতে দেখেনি সে। আজ প্রথমবারের মতো এমনটা হওয়ায় মনে মনে পুলকিত হলো আর্শি। রুবিনা খাতুনের প্রতি শ্রদ্ধা যেন বেড়ে গেল আরও কয়েকগুণ।
উত্তপ্ত দুপুর। এই দুপুরের তেজকে উপেক্ষা করতে ছেলেদের দল ঝাপিয়ে পড়েছে পুকুরে। গ্রামের বাড়িতে আসবে আর পুকুরে গোসল করবে না তা কখনো হয়? উঁহু একদমই না। মিহির পানির নিচেই নিজের লুঙ্গিটাকে গিট্টু দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু বরাবরের মতো ব্যর্থ হয়ে অসহায় দৃষ্টি মেলে চাইলো দুই বন্ধুর দিকে। অন্যসব ছেলে পেলেদের মতো তারাও সাঁতরাতে ব্যস্ত। একি মহা বিপদে পড়ল সে। মাথা চুলকে ঠোঁট উল্টালো মিহির। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে বন্ধুদের ডেকে উঠল।
“বন্ধু……! এইদিকে আয় বাপ।”
আযরান আর প্রহর পিছন ফিরে দেখলো মিহিরের মুখখানা। দুজনেই এগিয়ে এলো তৎক্ষনাৎ। মিহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রহর চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠল,
“কি হইছে?”
“খুইল্লা গেছে দোস্ত।”
“কি?”
“আরে বেডা লুঙ্গি।”
আযরান ভ্রুঁ কুঁচকালো। প্রহর তেঁতে উঠে বলল,
“হালা! কইছিলাম পড়িস না। এহন খুলে কেমনে। যা এমনেই ঘরে যা বাঙ্গি।”
“এমন করিস কেন? আমার সম্পত্তি অন্যরা দেখা যা তোদের সম্পত্তি দেখাও তা। আমারে বাঁচা তো তোরাও বাঁচবি।”
আকস্মিক মাথায় থাবা খেয়ে কুঁকড়ে উঠল মিহির। থাবাটা বসিয়ে আযরান সয়ং নিজেই। হাত দিয়ে মালিশ করতে করতে ব্যথাতুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পাশ ফিরে তাকালো মিহির। মুখশ্রী ছোট করে বলে উঠল,
“মারোস ক্যা? ইচ্ছা কইরা করছি নাকি?”
“পাকনামি করলে তো এমন হবেই। এইদিকে আয়।”
মিহির মুখ লটকিয়ে এগিয়ে এলো আযরানের কাছাকাছি। পানির নিচে হাত বাঁড়িয়ে আন্দাজে বাঁধতে চেষ্টা করল মিহিরের লুঙ্গি। ঠিক তখনই সেখানে উপস্থিত হলো মেয়েদের দল। পুকুরপাড়ে আস্তেই যেন সকলের পদচারণ স্থির হয়ে গেল। মিহির আর আযরানকে এতো কাছাকাছি দেখে একে অপরের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালো। আর্শির চক্ষুদ্বয় যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। তাদের মাঝ থেকে নীলা কপাল কুঁচকে বলে উঠল,
“এই জন্য বুঝি তোরা ছেলেরা একা একা গোসলে নেমেছিস?”
সকলে ফিরে চাইলো তাদের দিকে। মিহির আর আযরানের কপাল কুঁচকে গেল এহেম কথায়। কিন্তু কথার অর্থ বুঝতে পেরে বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকালো দুইজন দুজনের পানে। মুহুর্তে তড়িৎ বেগে ছিটকে সরে গেল। আযরান নাক মুখ কুঁচকে ধমকে উঠল,
“কি সব আজেবাজে ভাবনা। আমি তো জাস্ট মিহিরের…”
“নায়ায়ায়া…!
আযরানকে থামিয়ে চেঁচিয়ে উঠল মিহির। এখন যদি এই মেয়েদের দল জানতে পারে তার লুঙ্গি খুলে গেছে তাহলে তাকে পঁচানোর সুযোগ কখনোই হাতছাড়া করবে না। আর এই আযরানটা কিনা তার ইজ্জতের ফালুদা করে দিচ্ছে। আযরান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাতেই মিহির অসহায়ের মতো মাথা নাড়লো। যা দেখে একটা সূক্ষ্ণ শ্বাস ফেলল আযরান। ঠিক তখনই কর্ণপাত হলো আর্শি কুটিল কন্ঠস্বর। কিছুটা তিরস্কার করেই বলে উঠল,
”ওহহ হো ! তাই তো বলি, তোরা ছেলেরা আমাদের পুকুরে নামতে দিস না কেন! এখন তো দেখি অন্যরকম ‘বন্ধুত্বের’ চর্চা চলছে এখানে।”
কথাটা শুনেই মেয়েরা ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ হলো মেহর। হো হো শব্দে হেসে ফেলল মেয়েটা। তার তালে হেসে উঠল বাকি সকলে। আযরান প্রচন্ড রেগে গেল। চোখ পাকিয়ে তাকালো আর্শির পানে। এতে যেন আর্শি মজা পেল। বাম চোখ টিপে ভ্রুঁ নাঁচিয়ে ইশারা করে ঠোঁট পাউট করে চুমু দেখালো। আযরান নেত্রপল্লব ছোট ছোট করে তাকালো। আকস্মিক ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বাঁকা হাসি। যা আর্শির চক্ষু এড়ালো না। ঠিক তখনই শুনতে পেল আযরানের গম্ভীর কন্ঠস্বর। সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
“তোরা সবাই এখান থেকে যা। আর্শির সাথে আমার কথা আছে।”
নিমিষেই আর্শির ঠোঁটের কোণের হাসিটুকু মিলিয়ে গেল। পুকুর থেকে একে একে উঠে এলো সকলে। মিহির আর প্রহরের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি বিদ্যমান। আর্শিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় মিহির নিচু স্বরে বলল,
“বেস্ট অফ লাক বাল্টুপি।”
আর্শি চোখ রাঙালো। পারলে এক্ষুনি ভষ্ম করে দিতো এই বজ্জাতটাকে। তাকে এভাবে তাকাতে দেখে দাঁত কেলিয়ে হাসল মিহির। পরমুহূর্তেই সকলকে একপ্রকার টেনে নিয়ে জায়গা ত্যাগ করল। রয়ে গেল কেবল আর্শি আর আযরান। আযরান বাঁকা হেসে পাড়ে উঠে আস্তে লাগলো। আর্শি ঘাবড়ে গেল। ধুরুধুর বুকে পিছিয়ে পালানোর পূর্বেই খপ করে হাতটা আঁকড়ে ধরল আযরান। চমকিত নয়নে চাইল আর্শি। সূক্ষ্ম একটা ঢোক গিলে কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল,
“আমি মজা করেছি আযরান। এবারের মতো মাফ করে দে। আর করব না।”
“উমম! আর করার সুযোগই দিবো না।”
কথাটা কর্ণপাত হওয়ার সাথে সাথে নিজেকে শূণ্যে অনুভব করল আর্শি। প্রচন্ডভাবে চমকালোও। বিচলিত কন্ঠে বলে উঠল,
“এই এই! নামা আমাকে তোর কষ্ট হবে।”
“তোর স্বামী এতটাও দূর্বল না। সময় মতো প্রমাণ দিবো না হয়।”
আর্শি বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকালো আযরানের হাসোজ্জল মুখটার দিকে। লজ্জায় কয়েকবার পিটপিট করে চক্ষুদ্বয় সরিয়ে নিল। আযরান হুট করে তাকে ছুঁড়ে ফেলল পুকুরে। হকচকিয়ে কয়েকবার চুবুনি খেয়ে ভেসে উঠল আর্শি। কাশতে কাশতে আযরানের দিকে তাকাতেই লাফ দিয়ে তার ওপর পড়ল আযরান। আকস্মিকতায় আর্শির অবস্থা করুণ। নিঃশ্বাস নিতে না পেরে পানির উপরে উঠে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো আর্শি। নিভু নিভু চক্ষে আযরানের পানে তাকাতেই নজরে আটকা পড়ল আযরানের ফিচেল হাসিটুকু। কি অসভ্য! তাকে শাস্তির নাম করে এভাবে নাকানিচুবানি খাওয়ালো? রাগে নাক ফুঁলে উঠল আর্শির। রেগে তেড়ে গিয়ে আযরানের গলা আঁকড়ে ধরতে যাবে এর পূর্বেই হাত বাঁকিয়ে নিজের সাথে চেপে ধরল। পরক্ষণেই কানের লতিতে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল আযরান।। থরথর করে কেঁপে উঠল আর্শির সারা শরীর। আর্শির ভীষণ রাগ হলো । তেঁতে উঠে বলল,
“ছাড় শালা লুচ্চা।”
দূবোর্ধ্য হাসল আযরান। আর্শিকে আরেকটু জ্বালাতে অন্যহাতটা এগিয়ে নিলো উদরের নিকট। আকস্মিক অবাধ্য হাতের বিচরণে ঢোক গিলে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালালো আর্শি। কর্ণের অতি নিকট হতে শুনতে পেল আযরানের ফিসফিসে কন্ঠস্বর,
“কিছু না করে লুচ্চা ট্যাগ পাওয়ার থেকে। কিছু করেই লুচ্চা ট্যাগ পাওয়া ভালো।”
“তুই ছাড় হারামজাদা। নাহলে এখন মেইন পয়েন্ট লাথি মেরে উঁড়িয়ে দিবো।”
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩০
হতভম্ব আযরান। নিজের বউয়ের মুখ থেকেই এমন কিছু শুনে যেন সে অবাক হতেই ভুলে গেল। থতমত খেয়ে বেক্কলের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। মানে সিরিয়াসলি? একটা বউ কখনো তারই স্বামীকে এই কথা বলতে পারে? অদ্ভুত! বিস্মিত, নির্জীব ছিল আযরান কয়েক পল। অবাকতার রেশ কাটিয়ে উঠার পূর্বেই শোনা গেল চিকন কন্ঠের অতি ন্যাকামিতে পরিপূর্ণ একটি কন্ঠস্বর,
“একি আযরান ভাই.. তুমি এই আপুর সাথে পুকুরে এত কাছাকাছি কি করছো?”
