Home কালকুঠুরি কালকুঠুরি পর্ব ৬১

কালকুঠুরি পর্ব ৬১

কালকুঠুরি পর্ব ৬১
sumona khatun mollika

নাজিয়া জানালার শিকে মাথা ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। সামির সিকান্দার এর ফাঁসি হয়ে যাবে! সত্যি কি সামিরকে ওরা মেরে দেবে? নাজিয়া সেদিন থেকে সামিরের সাথে একবার দেখা করার জন্য ছটফট করছে। কিন্তু কেও ওকে আর বের হতে দিচ্ছে না। বাইরে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। সিভানের কোনো খবরও ওর জানা নেই কোথায় আছে, কেমন আছে! কি খাচ্ছে বেঁচে আছে না মরে গেছে কিছুই জানতে পারছেনা মেয়েটা।

মাত্র দু-তিন বছরে নাজিয়া সিকান্দার পরিবারের সাথে নিজেকে এতটাই জড়িয়ে ফেলেছে নিজ পরিবারের কিছু হলেও ও এতটা বিচলিত হতোনা। সামির ওকে ভালোবাসুক বা নাই বাসুক ও তো সামিরকে মন থেকে ভালোবেসেছে। বদলে সামির দিক তাকে একরাশ অবহেলা তবুও নাজিয়া না চাইতেও সামিরকে ভালোবেসে ফেলেছে। ভেতরটা কেমন অস্হির হয়ে আছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

একটাবারোকি নিষ্ঠুরগুলো সামিরের সাথে দেখা করতে দেবেনা! মেয়েটা সেই তিনচারদিন যাবত কেঁদেই চলেছে সমানে। যখনি ওই মুহূর্ত টা মনে পরছে যখন জর্জ সাহেব হাতুড় পিটিয়ে আওয়াজ তুলে ফাঁসির রায় ঘোষণা করেছিল, তখনি বেচারার গা কাটা দিয়ে শিউরে উঠছে।
পিরীতি কাঠাঁলের আঠা। একবার লাগলে সহজে ছাড়েনা। নাজিয়া না চাইতেও সেই আঠায় জড়িয়ে গেছে। মন মানেনা কি আর করার৷ ব্যাক্তিদেহের ওই মন নামের জিনিসটাকে কেও কন্ট্রোল করতে পারেনা । ভালোবাসা বলে কয়ে আসেনা৷ হয়ে যায় !

এদিকে সিকান্দার বাড়িতে বিষণ্নতার ছায়া সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে৷ ভূতের বাড়ির মতো চারদিকে ধু ধু নিস্তব্ধতা! কেও কোথাও নেই৷ ইনায়ার ঘরে মরার মতো পরে আছে সিভান৷ ইনায়া চলে যাবার পরে ও আর নতুন ঘরে যায়নি৷ ইনায়া যত খারাপি হোক, সিভানকে বড্ড যত্ন করত। সিভানও ওকে খুব ভালোবাসতো। তাই ইনায়ার প্রতি সবার ক্ষোভ থাকলেও ওর কোনো ক্ষোভ নেই৷ কিছু কি খেয়েছে ও! সকাল থেকে খালি পেটে৷
কাশেম মাত্র এসেছে খাবার নিয়ে৷ প্লেটে খাবার ঢেলে সিভানকে খাইয়ে দিতে চেয়েছিল। সিভান খায়নি। সে যথেষ্ট বড় হয়েছে তাছাড়া কোনো বিশ্বাসঘাতকের চেহারা দেখারও বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। কাশেম যখন জানতো মাহা বেঁচে আছে,, যখন জানতো কাকার একটা মেয়ে আছে যখন জানতো সামির ঠিক কতটা কষ্ট পায় ওদের কথা মনে করে!

তাহলে একবারোকি ওর মনে হয়নি সামির যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছে। সিভানের বয়সে কিশোরকালের মাঝামাঝি । অনুভূতি বলতে সে এখনো কিছু বোঝেনা। কার ওপর কেমন অনুভূতি হওয়া উচিৎ সেটা ও বোঝেনা। ও শুধু জানে, ওর কাকাকে ও ভিষণ ভালোবাসে। ওই লোকগুলো এতটাই খারাপ!
একবারো বোঝেনি, জানার চেষ্টা করেনি কাকা দুঃখের বোঝা টানতে টানতে পাথর হয়ে গেছে। শোয়া থেকে উঠে বসলো সিভান৷ হাঁটু তে ভর করে বেশ গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল। বুঝতে পারলোনা ওর হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। ও দেখতে পাচ্ছে সামির ওকে ডাকছে। কেমন ভুতুড়ে সামিরের কণ্ঠটা। সামির বলছে,, ” আয় বাপ, আমাকে নিয়ে যা, আয়, যে আটকাবে তাকে খুন করে ফেলবি আয়। ”

দমকা বাতাসে ওর ঘোর কাটে । বেশ সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে কাকা এখানে নেই। সে জেলে আটক। সিভানের রাগ হচ্ছে, ভীষণ রাগ হচ্ছে। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে সিভান নিজেই নিজেকে বলল,, ” ওই বাচ্চাটাকে ছাড়বো না। সব দোষ ওর”

সিভানের চোখে কেমন লাভার মতো লাল আভায় ভরে যায় ৷ এই পনের ষোল বছরের জীবনে ও নিজের কাকাকে এতটা দুর্বল কখনো দেখেনি, তখন যতটা দেখাচ্ছিল। রাগের সঙ্গে সিভানের হিংসাও হয়। কাকা শুধু ওই মেয়ে টাকেই ভালোবাসলো! ওর জন্য জেলে চলে গেল, সব ঠিক থাকলে ৫ তারিখ ফাঁসি! ওই মেয়ে টাকে সিভান কি করে ছেড়ে দিতে পারে! সিভান খাবারের থালাটা হাতে বাইরে বেরিয়ে যায়। রিটোকে দেখে কাছে ডাকে। পেট ভরে খাওয়ায় ওকে। গলায় হাত বুলিয়ে বলে,,

“রিটো! তুই যাবিতো আমার সাথে! ওই মেয়ে কে ধরলেই কাকাকে ছাড়ানো যাবে। যাবিতো? ”
রিটো দুটো ঘেউ ডেকে সিভানের প্রস্তাবে রাজি জানায়। এটা ওর স্টাইল মালিকের প্রশ্নের পজিটিভ উত্তর দেয়ার৷ রিটো অভ্যস্ত শুধু হ্যা বলতে। কোনোকিছু তে না বলতে শেখেনি ও। ছোট থেকে ও শুধু সামিরের সব ইনভাইটে হ্যা জানিয়েছে।
আজো তাই করল। সিভান সামিরের সাদা কালো চেক রুমালটা দিয়ে চেহারা ঢেকে ফেলল। বেরিয়ে রইল সূক্ষ্ম দুই চোখ । না, তাকে সামিরের মতো লাগছেনা। তাকে আরেকজনের মতো লাগছে তার বাবার মতো। সাফিন সিকান্দার এর মতো। সিভান জানে ঠিকানা। সামিরের সাথেইতো একদিন গিয়েছিল তাছাড়া রনির থেকে খোঁজ নিয়েই বেরিয়েছে ও।

সিভান যখন অন্ধকারের বুক ঠেলে এগিয়ে চলেছে নিজ গন্তব্যে সামির তখন জেলের ভেতরে বসে আছে । সামির ভয়ানক খুনি তাই তার সঙ্গে কোনো কয়েদিকে রাখা হয়নি। তার সামনে বরাবর শেলে আরেকজন কয়েদিকে আজ নতুন শিফট করা হয়েছে। লোকটা মধ্য বয়স্ক পরকীয়া করার অপরাধে বউকে হত্যা করেছে। এটাকে নিজের অপরাধ বলে গন্য করেনা লোকটা। যে তার সাথে বেঈমানী করেছে তাকে বাঁচিয়ে রাখার কি দরকার!
সামির জিজ্ঞেস করেনি। লোকটা নিজ উদ্যোগেই শোনাচ্ছে । লোকটা বুঝতে পারছে সামিরের কথা গুলো শোনার মুড নেই তবুও বকবক করেই যাচ্ছে । সামির শেষে বিরক্ত হয়ে কেঁকিয়ে উঠলো,
“চোপ শালা বাঙ্গি! শাইয়ার বকবক মারাচ্ছে, চুপ কইরে থাক। পরশুদিন এমনেও মারা খামু।

” ক্যান বে ছুড়া, তর ফাঁসি নাকি বে? ”
“তোকে কেন বুইলবো বে, তুই কোন বাঙ্গি ক্ষেতের মুলা! ”
“তেজ তো ভালাই তো মারা খাইলি কি কইরা? ”
“বেশি কুদলে তো মারা খাওয়াই লাগবো। আশ্চর্য এক সময় পুরো রাজশাহী হাতের ইশারায় নাচাইছি আর এখন এই বাঙ্গিরা আমার মাজায় বিছা পরায়া নাচাইতাছে। ”

লোকটা বুঝলো বয়স কম হলেও ছেলেটার জীবনটা দীর্ঘ । মনটা বিষণ্ণ যার দরুন ও চুপচাপ হয়ে আছে । লোকটা আর ওকে খোঁচায়নি। শান্ত হয়ে এগিয়ে এসে বসল। সামির এখনো হাঁটু মুড়িয়ে বসে আছে। লোকটা একটু পানি খেয়ে জিজ্ঞেস করল,,
” ও বাপ, ক না তর কি হইছে? কি করছস তুই, খুন? ”

সামির নিঃশ্বাস ফেলে একটু শান্ত হোলো। লোকটাকে এবারে নরম সুরে বলল,,
“শুধু খুন লয় কাকা আমি মহাখুন কইরেছি। এই দুই হাত দিয়া কয়জনরে যে মারছি জানিনা কাকা। কয়ানরে বিধবা করছি, বাপ ছাড়া, ভাইছাড়া করছি জানিনা। গুনিনি কখনো। আমি খারাপ কাকা। বহুত খারাপ ”

“তরে কেও ছাড়াইতে আইসবে না? ”
“কে আসবে, আমার যে কেও নাই কাকা। যার আসার কথা সে নিজেই আমারে জেলে দিয়া গেছে”
বেশ কিছুক্ষণ নিরবতা। লোকটা একধার বসেই বলল,
” সময় তো যায় না বাপ, কিছু ক শুনি, কেমন কইরা এই পযন্ত আইসেছিস ”
সামির রাগেনি। মেজাজ হারায়নি। জেলের শিক ধরে দাড়িয়ে বিষণ্ণ মনে লোকটাকে শর্টকাটে তার ছোটবেলার অতীত শুনিয়েছে। তার বয়স কম কিন্তু জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে । মায়ের সাথে যে জঘন্য অপরাধ হয়েছে, সেটুকু বলেই থেমে গেছে। লোকটার দম ধরে এসেছে। সামির যেভাবে বলেছে আর যা বলেছে তা কল্পনা করে লোকটার দেহ শিউরে উঠছে ।
সামির জেলের শিক ধরে দাড়ালো। সেদিনকার কথা মনে হতেই সামনে বসা কয়েদিকে উদ্দেশ্য করে বলল,,

” ধর্ম কর্ম কখনো করা হয়নি। তবে শুনতাম মৃত্যুর দূতের নাম আজরাইল। ছোট্ট মনডায় বারবার বুইলছিল , ইশশহ যদি আজরাইল বাঙ্গিডারে ধরতে পারতাম, তাইলে জানডা বাইর কইরা নেয়ার লাইগা পায়ে ধরতাম ”

কথাটা বলেই সামির আনমনে তাকিয়ে রইল মেঝের দিকে। তার চোখটাতো ভেজে না। খারাপের কি কখনো চোখ ভিজতে আছে? না নেই হয়ত । সামনে বসা আজাদ নামের কয়েদিটি বয়স্ক। সামিরের কথাগুলো শুনে তার ভিষণ করে একটা গান গাইতে ইচ্ছে হোলো। সে নড়েচড়ে বসে গান গেয়ে উঠলো,,

” তারে ধরতে পারলে মন বেড়ি
ধরতে পারলে মন বেড়ি..
দিতাম পাখির পা-আয়
ও সে কেমনে আসে যায়
খাঁচার ভেতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়! ”

কালকুঠুরি বোনাস পর্ব

সামির ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো একটু। গলাটা ধরে এসেছে। যখনি ও পুরোনো সেই কথাগুলো মনে করে ওর হ্যালুসিনেশন হয়। মাথায় ঝিম ধরে আসে।
মনে করতে চায়না। আবার ভুলতেও পারেনা। হয়ত ওর জীবনের সবচে প্রথম ভালোবাসা ছিল ওর মা। হয়ত।
এসব কথাবার্তা মাঝে আচমকা একদল পুলিশ গিয়ে সামিরের লকাপ খুলে দিল। জেলার নাজমুল ইসলাম গিয়ে বললেন তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে যান। আপনার ভাতিজা সিভান সিকান্দার গোলমাল বাধিয়ে ফেলেছে। সামিরের হম্বিতম্বি সব উল্টোপাল্টা হয়ে গেল। সিভান! কি করেছে ও, কোনো ভুল করেনিতো। মাহবুব উদ্দিন এসে সামিরকে সঙ্গে নিয়ে গেল।

কালকুঠুরি পর্ব ৬২